কাঙ্গাল মালসাট

সুতনয়া চক্রবর্তী

”অনেক দিন ধরেই নানা লোকের কাছ থেকে ফ্যাতাড়ু, কাঙ্গাল মালসাট ইত্যাদি সম্পর্কে উচ্চ প্রশংসা শুনে আসছি, “না পড়লে বুঝবি না কেন এত ঘ্যামা” জাতীয়। পড়ে ফেলার পর একটু অবাকই লাগল, যে মানুষগুলো লিঙ্গবৈষম্যের নানা দিক নিয়ে এত সচেতন, তারা একবারও বলল না এ বইগুলোর এদিকটার কথা? তাই কথাটা পাড়া।

আমি ক্রান্তিকারী নওজোয়ান সভা নামে একটি সংগঠনে আছি, নারীবাদ, পুঁজিকে-বাদ ইত্যাদি ব্যাপারে আগ্রহী।” – সুতনয়া
 

কাঙ্গাল মালসাট বইয়ের পেছনে লেখা, “বাংলা সাহিত্যে ফ্যাতাড়ুদের আবির্ভাব এক মহাচমকপ্রদ ঘটনাফ্যাতাড়ুদের আবির্ভাব গৌরবের নাকি ভয়ের, আনন্দের নাকি ডুকরে কেঁদে ওঠার এ বিষয়ে কোন স্থির সিদ্ধান্তে আমরা এখনও উপনীত হতে পারিনি।”

মহা চমকপ্রদ সন্দেহ নেই। ভাষায়, বাচনভঙ্গীতে, গল্পের বিষয়বস্তুতে বিলকুল চমকপ্রদ। ফ্লোটেল হানা, সাহিত্য সম্মেলন বানচাল, ফ্যাশন প্যারেড ছত্রভঙ্গ – জঞ্জালপোকাদুর্গন্ধগুমুতের মধ্যে বেঁচে থাকা মানুষ সেই জঞ্জাল ইত্যাদি দিয়েই আক্রমণ করে, তাদেরকে জঞ্জালে রেখে যারা শৌখিনতায় থাকে তাদের।

তা এ ব্যাপারটা আমাদের অনেকের বেশ ভালই লাগেনানা লোক তাদের ফ্যাতাড়ুপ্রেম ঘোষণা করে। কেউ নিজেদেরকে ফেসবুকে ফ্যাতাড়ু উপাধি দেয়।

ফ্যাতাড়ুচোক্তাররা লিঙ্গসাম্য নিয়ে বিশেষ চিন্তিত এমন কোন ইঙ্গিত গল্প থেকে পাওয়া যায় না। (কোন কিছু নিয়েই খুব সময় নিয়ে চিন্তা করেন তাঁরা এমন নয়।) ফ্যাতাড়ুপুঙ্গব ডি এস এক মেয়েকে কনুই মারেন, কবি পুরন্দর ভাট এক “একলা মেয়েকে সাইজ করার (মানে ঠিক জানিনা, তবে খুব সুবিধের বলে তো মালুম হয় না) ধান্দা” করেছিলেন, এক বড়লোকের গাড়িতে ঢুকে গিয়ে “ঢেমনি মাগি” প্ল্যান কেঁচিয়ে দিল। এবিষয়ে আরেক ফ্যাতাড়ু মদনের মত, অমন “হারামি মাগি”র “গলা টিপে দিতে হয়”।

লেখকও যে তাঁর বর্ণনায় লিঙ্গসাম্যের খুব পরোয়া করেছেন তা নয়। নারীচরিত্রগুলির বর্ণনায় চেহারা, পোশাক ও হাবভাবের বাইরে খুব বেশি কিছু আসেনি। ডি এসের বউ কালো, মোটা, “কোলাব্যাঙের” মত দেখতে, ডি এসকে ছেড়ে চলে গেছিল, বেচামণি হাসে কাঁদে কথা বলে, বেগম জনসন ফন্দি করে, বাকিরাও হাঁটে চলে কথা বলে। মোটের ওপর, কোন মানুষকে খুব ওপরওপর দেখলে যা চোখে পড়ে, নড়াচড়া ইত্যাদি। তার কাজকর্মের পেছনে ভয় পাওয়া ইত্যাদির থেকে সূক্ষ্মতর কোন অনুভূতির কোন উল্লেখ নেই। এই উল্লেখ কিন্তু প্রধানঅপ্রধান বেশ কিছু পুরুষচরিত্রের ক্ষেত্রে আছে। ভদির ভাবনার (কথা বলা নয়) বর্ণনা এসেছে। কমরেড আচার্যর ভাবনার বর্ণনা আছে। বেচামণির নেই। এমনকি বেগম জনসনেরও নেই। বিভিন্ন ক্ষেত্রে পুরুষের পোশাকের উল্লেখ না থাকলেও মেয়েদের পোশাকের উল্লেখ এসেছে, সে পোশাক সমাজে ওই অবস্থায় সাধারণভাবে পরিহিত পোশাকের চেয়ে বিশেষ আলাদা না হলেও। দুটি ছেলের মধ্যে আলোচনার উদাহরণ পাওয়া যাবে কাঙ্গাল মালসাট বা ফ্যাতাড়ুর বোম্বাচাকে। দুটি মেয়ের মধ্যে আলোচনা – নেই। অপ্রধান নারীচরিত্রগুলি নিয়ে পুরুষদের ভাবনার উল্লেখটা নারীর যৌন আবেদনের রেটিংকেন্দ্রিক জোয়ারদার ‘বাবু’র স্বগতোক্তি রয়েছে তাঁর স্ত্রী ললিতার চেহারা সম্পর্কে। মেঘমালা সম্পর্কেও একাধিক পুরুষের অনুরূপ মন্তব্য রয়েছে। পুরুষের যৌন আবেদন নিয়ে নারী বা পুরুষের ভাবনার বর্ণনা – নেই। আর মেয়েদের চেহারার বর্ণনার ফোকাস মেয়েদের সেই অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বা হাবভাব যার সাথে যৌন “আবেদনে”র (হ্যাঁ, যৌন আবেদন শব্দটা অসুবিধেজনক) প্রচলিত ধারণা জড়িত। একটি উদাহরণ দেখা যাক – “গোলাপি লিপিস্টিক চুলবুলে ঠোঁট আবছা ফাঁক করে ট্রেইনি নার্স মিস চাঁপা এসে ফিসফিসিয়ে উঠল”।

কিন্তু তাতে অসুবিধে কি? নারীকে যৌনভাবে দেখাটায় কি অসুবিধে? – একেবারেই না। তাহলে কি গল্প কেবল পুরুষের একধরণের বিষমকামী যৌন দৃষ্টিভঙ্গী থেকে লেখায় বিরোধ? – না। গল্পে নারীচরিত্রগুলির ওপরওপর বর্ণনা, চিন্তাঅনুভূতির উল্লেখ না থাকায় অসুবিধে? – না। সব মিলিয়ে অসুবিধে? – না।

তবে এতক্ষণ এসব নিয়ে এত ঘ্যান ঘ্যানের কি মানে হল?

আসলে, অসুবিধেটা শুধু গল্পের মধ্যে খুঁজতে যাওয়াটা ভুল। মানুষের চিন্তাভাবনার ওপর সেই গল্পের প্রভাবের ওপরে নির্ভর করে যে রকমের অসুবিধে, তার কথাই এখানে বলার। একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। একটা ছেলের তিরুপতির ভিড় সিঁড়ির ওপর “বোমা! বোমা!” বলে চেঁচিয়ে ওঠা আর এক নাটকের সংলাপে “বোমা! বোমা!” বলে চেঁচিয়ে ওঠা – এই দুটোর মধ্যে কোন চেঁচানিতে আপনার অসুবিধে থাকতে পারে? শুধু যদি আমরা অসুবিধে খুঁজতে যাই “বোমা!” চেঁচানিটার মধ্যে, তাহলে দুক্ষেত্রেই হয় অসুবিধে থাকবে নয় থাকবে না। কিন্তু আমরা সেই চেঁচানিটা তার পরিস্থিতির সাপেক্ষে বিচার করি, তাই নয় কি? গল্পটার পরিস্থিতির ক্ষেত্রে এখানে আমাদের বিচার্য মানুষের চিন্তার ওপর গল্পটার প্রভাব।

ব্যাপারটা একটু বড় হয়ে গেল না কি? কত রকম মানুষ আছেন, তাঁদের ওপর কত রকম প্রভাব পড়তে পারে গল্পটার। ঠিকই। তাই শুরু করা যাক এই ধারণাকে স্বীকার করে যে ১) বর্তমানে সমাজে একটা বেশ বড়সড় অংশ আছে যারা নারীর চিন্তাঅনুভূতি নিয়ে মাথা বিশেষ ঘামায় না। আশা করি এ বিষয়ে খুব দ্বিমত নেই। এই অংশটি যে তাদের মতামত সম্পর্কে খুব নীরব নন তা বাসেট্রামেইন্টারনেট ফোরামের কথাবার্তা শুনলেই প্রমাণ পাওয়া যায়। এঁদের মধ্যে একাংশ বামপন্থী রাজনীতির সাথেও যুক্ত। পরিবারের মধ্যে এখনও আমরা অনেকে চোখের সামনেই দেখতে পাই নারীর চিন্তাঅনুভূতিমতামতকে গুরুত্ব না দেওয়ার প্রচুর উদাহরণ। এমনকি ভারত রাষ্ট্রও এখনও বৈবাহিক ধর্ষণকে আইনত স্বীকার করে না।

) আমাদের পরিস্থিতি, বা চারপাশের পরিমণ্ডল, আমাদের কাজকর্ম ও চিন্তাভাবনাকে প্রভাবিত করে। এও এমন কিছু কথা নয়, মানুষকে ত তার পারিপার্শ্বিক বিভিন্ন ভাবে প্রভাবিত করছেই। সবাই পারিপার্শ্বিকের একই জিনিসের প্রভাবে একই কাজ করছে তাও নয়।

এমন একটা পরিস্থিতি, যেখানে নারীর চিন্তাঅনুভূতিমতামতের গুরুত্ব অনেক ক্ষেত্রেই খুবই কম, সেরকম পরিস্থিতিতে কাঙ্গাল মালসাট – ফ্যাতাড়ুর কি কোনও সাধারণ প্রভাব রয়েছে? বলা মুশকিল।

কিন্তু, ফ্যাতাড়ুকাঙ্গাল মালসাট নিয়ে বহু বিষয়ে প্রগতিশীল বামপন্থী রাজনীতির সাথে যুক্ত প্রচুর মানুষের বিপুল উচ্ছ্বাস রয়েছে, কিন্তু ফ্যাতাড়ুকাঙ্গাল মালসাট যে দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা, এই গল্পগুলির মধ্যে যে নারীর চিন্তাঅনুভূতি অনুপস্থিত, সে কথাটা এত উচ্ছ্বাস যাঁরা দেখাচ্ছেন তাঁদের কেউ একবারো বলছেন না?

তাহলে প্রত্যেক ব্যক্তির ক্ষেত্রে কিছু সম্ভাবনা আছে। হতে পারে কেউ ব্যাপারটা লক্ষ্য করেছেন ও ধরে নিয়েছেন যে যাঁরা পড়েছেন তাঁরা নারীকে এভাবে দেখাটা সমর্থন করেন না? কিন্তু এমন ধারণা যদি কেউ করে থাকেন তাহলে বলতে হবে তিনি ১) ও ২) এর বাস্তব সম্পর্কে অবগত নন বা অবগত হয়েও তাঁর বিচারে সেটা প্রতিফলিত হয়নি।

হতে পারে কেউ লক্ষ্যই করেন নি? তবে তাঁকে লক্ষ্য করানোটাই এই লেখার অন্যতম উদ্দেশ্য। এবং ১) এর বাস্তব যে গল্পের পরিপ্রেক্ষিতের অংশ, তাও মনে করান।

হতে পারে কেউ লক্ষ্য করেছেন, কিন্তু ভেবেছেন যে এই বিষয়টার কোনও সেরকম প্রভাব নেই, তাই এ নিয়ে বলে কোনও লাভ নেই, তাই তিনি চুপ আছেন। কিন্তু এমন ভাবনারই বা কারণ কি? যদি কোনও বামপন্থী মনে করতে পারেন (এবং বেশিরভাগই মনে করেন) যে সংস্কৃতির মধ্যে যে দৃষ্টিভঙ্গীগুলি রয়েছে তা নিয়ে আলোচনাসমালোচনা জরুরি, তবে সে কথা এখানে খাটবে না কেন? বরং এই বিষয়গুলো নিয়ে চর্চা কোন দৃষ্টিভঙ্গিকে চিনতে সুবিধে করতে পারে, অনেক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার দরজা খুলে দিতে পারে।

কিন্তু আরেকটা ভয়ানক সম্ভাবনাও আছে। হতেই পারে কেউ কেউ ভাবেন, নারীমুক্তি ইত্যাদি বিষয় নিয়ে বেশি মাথা ঘামানোর প্রয়োজন নেই? ওসব নিয়ে চর্চা মোটেই গুরুত্বপূর্ণ নয়? বা নারীমুক্তির কথা অর্থনৈতিক লড়াই জেতার পরে ভাবা যাবে?

তবে তাঁকে এটাই বলার, যে আমরা তা মনে করি না!!

শেষ করার আগে একটা ব্যাপার পরিষ্কার করে নেওয়া ভাল। এই গল্পতে একরকম দৃষ্টিভঙ্গীর ব্যবহার হয়েছে মানেই লেখকও সেই দৃষ্টিভঙ্গিরই লোক, এরকম ধারণা করাও যৌক্তিক নয়। শিশুসাহিত্য যাঁরা লেখেন, তাঁরাও অনেকে চেষ্টা করেন তাঁদের শিশু মনস্তত্ত্ব, ভাষাজ্ঞান ইত্যাদির ধারণা অনুযায়ী লিখতে। তার মানেই এই নয় যে তাঁরাও ওই মনস্তত্বের লোক। আর ফ্যাতাড়ুকাঙ্গাল মালসাট ভাল লাগার মানেই এই নয় যে পাঠক নারী সম্পর্কে ঐ দৃষ্টিভঙ্গির মানুষ। ভাল লাগার নানা কারণ হতে পারে।

3 thoughts on “কাঙ্গাল মালসাট

  1. Pingback: Content and Contributors – November 2013 | aainanagar

  2. লেখাটা দাঁড়াল না, মূলত: ছোটো প্রিসর বলে। অনেকটা সময় ও শব্দ নিয়ে আরেকটু বড় করে এই বিষয়টি নিয়ে সুতনয়ার বক্তব্যের অপেক্ষা রইল। মূলত: স্প্যান টা দরকার।

  3. Ki aschoryo! Dhemni maagi ki nei naki? Dhemni maagirai to amaader moto gnerechudider jeebone shomoshya deke aney!

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s