মৃত মহাদেশে হে মাধবী আজো……

শ্রাবণী দাশগুপ্ত

“কলকাতার মেয়ে। জে.ইউ. থেকে মাস্টার্স সাতাশি সালে।  তারপর বিয়ে, সংসার। লিখতে ভালো লিখি। তবে বেশ অনিয়মিত।  খেয়াল খুশি মতন।  দু-এক জায়গায় বের হয়েছে – বর্তমান, রবিবাসরীয় আনন্দবাজার। দেশেও একবার। আর কিছু লিটল ম্যাগাজিনে।  বই টই বার করিনি। গল্প লিখতে ভালো লাগে, কবিতা আসেনা. রাঁচিনিবাসী বহুদিন।  এখানে একটি স্কুলে পড়াই। ”     – শ্রাবণী

(১)

অনিন্দ্য বাড়ি ফিরে দেখল সব আলোগুলো জ্বলেনি! ডিজাইনার আলোয় ছায়াস্নিগ্ধ থাকে ড্রইংরুম। দামী সোফাসেটে, সেন্টার টেবলে, শোকেসের কোণে যথাযথ ও পরিমিত উজ্জ্বলতা অন্ধকার লাগছে। নিরানন্দ। অন্দরসাজের কৃতিত্ব মোনার, অনিন্দ্যর শুধু স্পনসরশিপের দায়িত্ব – সে নিশ্চিন্ত। ছোট্ট মোড়াটায় বসে নীরবে জুতো খুলছিল, এব্যাপারে মোনার যথেষ্ট কড়াকড়ি আছে। কয়েকদিন ধরে নিয়ম শিথিল, চাপহীন। নিয়মভাঙার গোপন মজাটুকু… নাঃ নেই।

নিঃশব্দে এসে সামনে দাঁড়িয়েছে ঋত্বিক… রিকু। কখন এসেছে হস্টেল থেকে? জানায়নি মোনা! অবশ্য কয়েকদিনে ক’টাই বা কথা হয়েছে তাদের? ঊণিশ বছরের রিকু তার সমান লম্বা। তার মত ভারী, মুখটায় মোনার আদল। মাতৃমুখী পুত্র! ছেলের চোখে দীপ্র সরলতা ভালো লাগল অনিন্দ্যর। বলল, “রিকু তুই?” “বাবা তুমি যাবেনা? আমরা যাচ্ছি…।” ডাকটুকু কেমন আন্তরিক। “কোথায় রে?” অন্ধকারে ছেলের দৃষ্টির অনুসরনে সে তাকাল। মোনা!বাইশ বছরের গভীর নৈকট্য অদ্ভুত অচেনা। কালো সালোয়ার কামিজ, মাথা ঢাকা কালো ওড়নার ফ্রেমে ধপধপে আলোকিত মুখ। এতবড় টিপ পরতে মোনাকে আগে দেখেনি। হাতে মোমবাতি, দেশলাইবাক্স। মোনা সোজা তাকিয়েছিল। তার সাথে চোখাচুখি করল না। ছেলেকে ডাকল, “আয় রিকু।” অনিন্দ্য ছেলের দিকে চেয়ে অন্যমনস্কভাবে বলল, “নাঃ।” ওরা বেড়িয়ে গেলে অন্ধকার ড্রইংরুমে বসে রইল সোফায়। বলে না গেলেও কোথায় গেল, আন্দাজ করতে অসুবিধে হলনা। মোনা… অবিশ্বাস্য লাগছিল অনিন্দ্যর। আজ রাস্তায় মিছিল, ভিড়, জ্যাম। এর মধ্যে? কিভাবে ফিরবে, কখন, কে জানে? রিকুর আজকাল সাহস বেড়েছে কলেজে ঢুকে। কিন্তু মোনা সন্ধ্যেবেলা তাকে বাদ দিয়ে গাড়ি ছাড়া…! খুব অস্বস্তি হচ্ছিল।

সকাল থেকে অফিসে উত্তেজিত স্বাক্ষর অভিযান! কারা প্রতিবাদ মিছিলে যাবে সেই লিস্ট তৈরি-টৈরি নিয়ে ব্যস্ততা। অনিন্দ্য মাথা ঘামায়নি। এমনিতেই কাজ ছাড়া অন্য ব্যাপারে সে আলগা থাকে। পদাধিকারে সম্পূর্ণ দায়বদ্ধ। নিয়মানুবতির্তা, কাজের নেশা সময়ের আগেই তুলে দিয়েছে অনেক ওপরে। ফাইন্যান্সের হেড্‌ সে। দুপুরের দিকে জোনাকী কেবিনে এসেছিল স্বাক্ষর সংগ্রহে। তারই ডিপার্টমেন্টের জোনাকী সরকার, প্রখর নারীবাদী। পিটিশনে সই দিয়েছে অনিন্দ্য।জোনাকী অনুরোধ করছিল মোমবাতি মিছিলের পদযাত্রায় থাকার জন্যে। অনিন্দ্য নিশ্চুপ। চোরা বাধা কোথায় যে! জোনাকী বেরিয়ে যাবার ঠিক পরেই হেমাঙ্গদা, ওমপ্রকাশ ও দিগন্তকে একসঙ্গে দেখে সে স্তম্ভিত। জোনাকী নাকি পাঠিয়েছে। ওরাও পদযাত্রায়? চমৎকার। ওয়ার্কিং আওয়ারে মেয়েসম্পর্কিত চটচটে আলোচনায় অফিসদূষণের জন্যে ইউনিয়ন থেকে ওয়ার্নিং পেয়েছে। জোনাকী নামগুলো শুনলেই জ্বলে ওঠে। হেমাঙ্গদা অর্থপূর্ণ হেসেছিল “কি ভাদুড়ি যাবেনা শুনলাম? চলো চলো!” অনিন্দ্য সন্ত্রস্ত। বলেছিল, “নাঃ।” উত্তর শুনে তির্‍যক তাকিয়েছিল তিনজনে। কয়েকদিন আগে ঘটে যাওয়া ঘৃণ্য বীভৎস ঘটনার প্রবল প্রতিবাদ হওয়া উচিৎ! কিন্তু এমন অসংখ্য যেসব ঘটে যাচ্ছে প্রায় প্রতিহপ্তায়, প্রতিরোজ? শুভবুদ্ধি মানবতা সমানাধিকার শব্দগুলো অভিধানের ভেতরে ভেপ্‌সে উঠেছে। একটার পর একটা কেস জমে থাকছে ধুলোমাখা বন্ধ ফাইলে, কোর্টের অন্ধকার ঘরে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাও নয়! কে রাখছে নথিপত্র?

আজ কাজের চাপ ছিলনা, তবু ক্লান্তিতে মাথায় দপ্‌দপ্‌। রান্নাঘরের অভ্যস্ত ঠুংঠাং আওয়াজ আসছিল। ফোড়নের হাল্কা গন্ধ। নরম সোফায় গা ডুবিয়ে একান্ত গৃহকোনে আলস্যটি বড় আরামের। রাতের রান্না করছে পুতুল, ‘ডোমেস্টিক হেল্প’। মোনার তালিমে শিখেছে ভালোই। ইচ্ছে করছিল না কাপড় ছাড়ার জন্যে উঠে শোবার ঘরে যেতে। পুতুল এসে দাঁড়াল। ওর কাজ শেষ। বয়স ত্রিশের এধারে বা ওধারে, সিঁথিতে সিঁদুরের আভাস। ইদানিং বেশ চৌখস। আঁটসাঁট ছাপা কামিজের ওপরে আড়াআড়ি ঘুরিয়ে বেঁধেছে ওড়নাটা। বলল, “মাইনের দু’শো এ্যাডভান্স দিন তো দাদা। বৌদিকে বলতে মনে ছিলনা।” অনিন্দ্য পকেট থেকে ওয়ালেট বের করে টাকা দিল। ইচ্ছাকৃত ছিলনা, আঙুলে ঠোকাঠুকি হয়ে গেল। কয়েকদিনের অভুক্ত শরীর, সজাগ লিবিডো। পূণর্দৃষ্টিতে জরিপ করল মেয়েটার আপাদমস্তক, ভেরি সেক্সি। দু’হাত দূরত্বে প্রায়ান্ধকারে রৈখিক ঘনকে উদগ্র নারীদেহের আঁচ। অনিন্দ্য জোর করে চোখ সরিয়ে ওর মুখের দিকে তাকাল। থ্রেডিং-করা ভ্রূরেখার নিচে ছোট চোখ সরু করে সামান্য বাঁকা হাসল কি মেয়ে? মুহূর্তে দরজার কাছে পিছলে গিয়ে বলল, “বন্ধ করে দিন।” শিরশিরানি নেমে গেল অনিন্দ্যর পিঠ বেয়ে। ডাইনিং টেবিলে সাজানো নৈশাহার, প্লেট। নিয়ে খেয়ে নেওয়া যায়, ইচ্ছে করলনা। শোবার ঘরে মৃদু আলো জ্বলছে। দেওয়ালে শোভন সবুজ ইমালশন, এসি-র পরিমিত শৈত্য, ধপধপে বিছানার আহ্বান। তার জন্যেই গুছিয়ে রাখা শুভ্র কাপড়জামা, তোয়ালে, নিচে হাওয়াই চটি। স্বপ্নপুরের নিটোল স্নিগ্ধতায় অস্থিরতা থিতিয়ে যাচ্ছিল। বিছানার পাশের রকিং-চেয়ারে বসল অনিন্দ্য। চোখ বুঁজে এলেও ঘুম এলনা। গোপন দংশন – এতবছর পেরিয়ে! সত্যিই কি দুব্যবর্হার করেছে মোনার সঙ্গে? হয়তো যথেষ্ট মনোযোগ দেয়না, অনেকটা উদাসীনতা… তবু তো! মোনার বিশ্ব ড্রইংরুম বেডরুম ঠাকুরের আসন। অনিন্দ্য-রুহি-রিকু মোনার ব্রহ্মান্ড। শপিংমল, বিউটি পার্লার মোনার অবসরযাপন। মোনা ভরপুর। কিন্তু সেদিন মোনা ঐভাবে কথাগুলো তাকে…! আহত পৌরুষে ক্ষত বড় গভীর। কেউ কি কিছু জানিয়েছে মোনাকে? সম্ভাবনা কম। তাহলেও নিঃসন্দেহ হতে পারা যায় কই? সংশয়াচ্ছন্ন অনিন্দ্য আলোহীন ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়াল। মার্চ শুরু। পরিষ্কার আকাশে লক্ষকোটি হীরককুচি দিয়ে অনবদ্য প্যাটার্ন। দু’বছর আগে বিশতম বিবাহবার্ষিকীতে অমন আংটি উপহার দিয়েছে মোনাকে। সে আবেশে ডুবে যাচ্ছিল। এমনভাবে একা দাঁড়িয়ে স্তব্ধ আকাশ দেখেনি কোনোদিন। অন্ধকারে অসংখ্য অনিশ্চিত শিখা দপদপ করে জ্বলছে। খানিক পরে অনিন্দ্য ব্যালকনির দরজা বন্ধ করে ভেতরে এল। নিঃশব্দ পায়ে ঘুরে বেড়াতে লাগল। এই ফ্ল্যাট নিজস্ব ক্ষমতার্জিত বৈধ সাড়ে বারোশ স্কোয়ারফিট; লোন নিয়ে, যথাযথ প্রিমিয়াম জমা দিয়ে।

ডাইনিংরুমের লাগোয়া ঋত্বিকের ঘর। খুব জেদী ছিল রিকুটা ছোটবেলায়, মারকুটে। দেড়বছরের বড় রুহির সঙ্গে তুমুল হিংসে। কবে থেকে যে বদলে গেছে খেয়াল করা হয়নি। বেশ ইন্ট্রোভার্ট। গতবছর হলদিয়ায় হস্টেলে যাবার পর থেকে ওর ঘরও শূন্য। বহুদিন এঘরে ঢোকেনি অনিন্দ্য, এখন ঢুকতে ইচ্ছে করল। আলো জ্বালাল। সমযত্নে সাজানো ঘরখানা আপাতত অগোছালো। টীশার্ট, বারমুডা, তোয়ালে, চটি এদিক ওদিক ছড়িয়ে। অস্তিত্বের উষ্ণ ঘ্রাণ। সিংগলবেডের ওপরে ল্যাপটপ। ছড়ানো বই, ফাইল, প্রিন্টআউট, পেনড্রাইভ! আনমনা হয়ে নাড়াচাড়া করছিল সে। কিছু স্মৃতি ঠোকর দিয়ে গেল। কোন্‌ দুঃস্বপ্ন? মাথায় ঝাঁকুনি দিয়ে হাল্কা চকলেটরং দেওয়ালে তাকাল। ব্লোআপে গাওস্কার সচীন সৌরভ দ্রাভিড! খেলাপাগল ছেলেটা। কলেজে খেলে নাম করেছে, মোনা বলে মাঝে মাঝে। কাঠের ওয়ার্ড্রোবে অনেকগুলো ছবি সেঁটেছে… বরফঢাকা হিমালয়ের, অভিযাত্রীদের। খুঁটিয়ে দেখছিল অনিন্দ্য। প্রবল ইচ্ছে গুঁতো মারছিল। অনধিকারচর্চা বুঝেও নিজেকে সামলালো না। হাল্কা টান মারতেই খুলে গেল না-বন্ধ ওয়াড্রোবের পাল্লা। থমকে গেল চৌর্‍যবৃত্তির হাত। কাজটা ঠিক হচ্ছে? পরক্ষণেই মরিয়ার মত আঁতিপাঁতি খুঁজতে লাগল। যেকোনো একটা চিহ্ণ, বই ছবি সিডি ম্যাগাজিন অন্তত পেপারকাটিং যাতে…! ছিল অনেক কিছু। হিমালয়-এক্সপিডিশন নিয়ে ম্যাগাজিন, ক্রিকেটের ওপরে বই। কিন্তু নিজের যে বিশ্বাসে বয়সোচিত স্বাভাবিকত্বের কথা ভাবছিল, তেমন একটাও দৃষ্টান্ত পেলনা। বইয়ের শেলফ ঘেঁটে দেখল। নাঃ সেরকম কিচ্ছু না! অবচেতনে কবেকার শুকনো নদর্মায় পড়ে যাবার অনুভব বয়ে নিয়ে দ্রুত দরজা টেনে বের হয়ে এসেছিল। স্বস্তি অস্বস্তির দোলাচলে ফেঁসে নিঃশ্বাস ফেলল, “ছেলেটা একেবারে আলাদা হয়েছে।” মনে হল রিকু ভারী গলায় বলছে, “কি খুঁজছ বাবা এখানে?আমার ঘর ঘেঁটে?” চমকে দেখল কেউ নেই। কবজি উলটে ঘড়ি দেখল, রাত হয়েছে বেশ। এখনো ফিরলনা ওরা?

(২)

“সুযোগ পেলে কে ছাড়ে ? ত্রিশঙ্কু মধ্যবিত্ত বাঙালির আইন কেনার পয়সা বা ঘানিটানার শক্তি দুটোর কোনোটা নেই। তাই নীতি বিবেকের ধুয়ো তুলে নিজেকে সরিয়ে রাখে।” নীলাঞ্জন বলেছিল। অফিসে কনিষ্ঠ, বছরতিন আগে বি.টেক করে এসেছে। প্রবীন প্রকাশ বধর্নের হাইশুগার কোলেস্ট্রেরল, বেশ খিটখিটে। নিজের মনে খাচ্ছিলেন। ক্ষেপে উঠলেন, “কি বলতে চাও? স্থানকালপাত্র নেই, লঘুগুরু জ্ঞান নেই? এত মানুষ যে প্রতিবাদে নেমেছে, সব তোমার মতে ভন্ডামি? লোক-দেখানো?” নীলাঞ্জন আলগা হাসল, “প্রতিবাদ? তুমি খ্যালো আর আমি চীয়ার আপ করি?” প্রকাশবাবু তেতো গলায় বললেন, “দেবে তো, বাপের বয়সীদের তোমরাই জ্ঞান দেবে স্যর! শ্রীতমা আর তুমি… যা সব শুনি! কিছু বুঝিনা ভেবেছ? বাতেলা। নিজেদের আগে শোধন করো… তারপর!”মজা দেখছিল অনেকেই। নীলাঞ্জন আর শ্রীতমা একই কলেজের, শ্রীতমা একবছর জুনিয়র। শ্রীতমা অস্বস্তিতে উঠে পড়েছিল সীট থেকে। নীলাঞ্জন আক্রমণ করল, “বোস্‌ শ্রীতমা! এই আলোচনার সঙ্গে আমাদের কি সম্পর্ক স্যর? পার্সোন্যাল ব্যাপারে নাক গলাচ্ছেন কেন? আমার ফিলোজফি আমার!” “ফিলোজফি দেখাচ্ছ? আঁতলামো! ঘোমটা দিয়ে খ্যামটা।” গরগর করছিলেন প্রকাশবাবু। “কীসব কথাবার্তা!” জোনাকী বলে উঠেছিল, “আসলে জানো নীল, বিনা চেষ্টায় মোয়াটা পেয়েও শেয়ালের দল সন্তুষ্ট হয়না। ভাবে খাবলে খেতে পারলে জিত হল! তাতে যা গাট্‌স্‌ লাগে সেটা কিন্তু নেই, এমনকি চুরি করে স্বীকার করার সাহসটাও দেখিনা। তখন বসে বসে ধুনুচি নাড়ায়। আশ্চর্‍য! ধষর্ণ শব্দটা আজকাল দেখছি ন্যাজগুটোনো এলেবেলেরাও উচ্চারন করে? ছিঃ।” অগ্নিবর্ষণ করে সে বেরিয়ে গিয়েছিল! চুপ করে গিয়েছিল অনেকে। ওমপ্রকাশ ঝা জন্ম থেকে কোলকাতায়। নির্লজ্জ ইঙ্গিত করল, “যা ক্কেলো! চটছিস কেন নীল? ফিলোজফির বদলে অন্য কিছু দেখাতে পারিসনা? বাঘিনী ক্ষেপেছে! প্রকাশদা, কোল্ড হয়ে গেছেন, হাইবারনেটেড স্নেক! জাপানি তেল, এ্যাড দেখেছেন? লিভটুগেদার বোঝেন? মেয়েছেলে যখন বগল দেখায়… সরি সরি!” অধর্নিমীলিত চোখে হেমাঙ্গ লাহা স্বগতোক্তি করল “বীরভোগ্যা বসুন্ধরা!” দিগন্ত বলেছিল, “চেপে যাও,প্যাঁদানি খাবে নাকি? সব হট্‌ হয়ে আছে!” নোংরা হাসি, গূঢ়াথর্ক উত্তর-প্রত্যুত্তর, বিষোদ্গার। অনিন্দ্য সাধারণত যোগ দেয়না। কালেভদ্রে দুয়েকটা …। এখানে তার ইমেজ অমল। সে নীরবে মাথা নিচু করেছিল। অসময়ে তলপেটে চাপধরা ব্যথা, ধরা পড়ে যাবার ভয়। অফিস প্রায় খালি হওয়ার পরেও অনেকক্ষণ বসেছিল। জোনাকী সরকার অসম্ভব বিক্ষুব্ধ। কার ওপরে নিজেও সঠিক জানেনা।

গতসপ্তাহের সেই সকালটায় অফিস যাওয়ার আগে অভ্যেসমত নিউজ চ্যানেল খুলেছিল অনিন্দ্য। পর্দা জুড়ে হেডলাইন, ব্রেকিং নিউজ, শিরোনাম! পূবর্দিন রাত সাড়েদশটা নাগাদ দেশের প্রধান শহরে, চলন্ত বাসে গণধষির্তা হয়েছে চৌত্রিশ বছরের এক মহিলা। বেসরকারি হাসপাতালের নার্স। বি-শিফট ডিউটির পরে নিকটবর্তী বন্ধুর বাড়ি থেকে এগারবছরের ছেলেকে নিয়ে বাড়ি ফিরছিল। ড্রাইভার ও সঙ্গীরা পলাতক। চ্যানেল ঘোরাচ্ছিল অনিন্দ্য, উত্তেজিত জনতার প্রতিক্রিয়া, ইন্টারভিউ। সংবাদপাঠিকার আবেগরুদ্ধ উত্তেজিত নাটকীয় স্বরে দৃশ্যায়ন, ‘পাঁচজন ক্রমাগত নৃশংস ধর্ষণ করার পরে খোলা বুকে, তলপেটে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঁকিবুকি করেছে। শেষে লোহার শিক মহিলার যৌনাঙ্গে প্রবেশ করিয়েছে, ভলকে ভলকে বেড়িয়ে এসেছে রক্ত। তারপর বিবস্ত্র মৃতপ্রায় দেহটি ফ্লাইওভারের নিচে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে গিয়েছে। বালকের গায়ে আঘাতের চিহ্ণ থেকে অনুমান, মায়ের সম্ভ্রমরক্ষার জন্যে যথাশক্তি চেষ্টা করেছে। মহিলার অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন, ছেলেটি চিকিতসাধীন। মহিলার স্বামী পঙ্গু, একটি ছোট দোকান আছে।’ ঘটনার বীভৎসতায় গায়ে কাঁটা দিচ্ছিল, খেয়াল করেনি রান্নাঘর ছেড়ে এসে দাঁড়িয়েছে মোনা। সংবাদপাঠিকা বিশদ বিবৃতিতে, ‘পুলিশ এসে পৌঁছনোর আগে পর্‍যন্ত মহিলার নিরাবরণ অসহায় দেহ ঘিরে দাঁড়িয়েছিল কিছু মানুষ। কিন্তু একখানা কাপড় ছুঁড়ে নগ্নতা আড়াল করার রুচি বা সাহস দেখায়নি কেউ।’ হঠাতই মোনার দিকে নজর পড়েছিল অনিন্দ্যর। বিস্ফারিত চোখ, আতঙ্কিত মুখ, শরীরের প্রত্যেক রন্ধ্রে অনুভব করছে যন্ত্রণা। হাতে ময়দার লেচি, রান্নাঘরে জলখাবার বানাচ্ছিল। অনিন্দ্য বন্ধ করেছিল টিভি। চেঁচিয়ে বলেছিল, “কি করছ এখানে? রান্নাঘরে যাও।’’ দুর্জ্ঞেয় কারণে রুক্ষ্ম হয়েছিল বলার ভঙ্গি, হয়ত বা তেমনটাও নয়। মোনা একটু স্পর্শকাতর, সামান্য অবুঝ, সে জানে। দুবোর্ধ্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে যন্ত্রমানবীর মত চলে গিয়েছিল। আর কথা হয়নি। ভেবেছিল রাত্রে মিটমাট করে নেবে। সারাদিন ধরে অফিসেও আলোচনা! অসংখ্য সাম্প্রতিক ঘটনার দৃষ্টান্ত, মেয়েদের খোলা পোশাকের সমালোচনা, কটূক্তি! জোনাকি সরকার ঝল্‌সে উঠেছিল, “পোশাকের সঙ্গে ধষির্ত হবার সম্পর্ক থাকতে পারেনা। দোজ পিপল আর ফ্রাস্টেটেটেড, নাহলে সাইকিক! তাহলে মধ্যযুগে পদার্নশীন মেয়েরা বাড়ীর মধ্যে ধর্ষিতা হত কেন?” ঘরে কিম্বা অফিসে মুখ্যমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রী, টিপ্পনি কবিতা, ভ্যাজানো দেওয়াল-লিখন আর ফেসবুক! অন্তহীন বিতর্ক, অবান্তর কচকচানি, হঠাৎ রেগে-ওঠা মানুষ। এর নামই ‘প্রতিবাদ’! কে জানে? এ.সি.তে বসেও অনিন্দ্যর ঘাম হচ্ছিল, মাথায় ঘোলাটে জলের ঘূর্ণি।

অন্যদিনের চেয়ে আগে সে বাড়ি ফিরেছিল। চিকেন কবিরাজি নিয়েছিল ভালো দোকান থেকে, মোনার খুব প্রিয়। মোনা দরজা খুলেছিল, কথা বলেনি একটাও। খাবারের বাক্সটা টেবলে রেখে নীরবে ব্যালকনিতে গিয়ে বসেছিল। অনিন্দ্য বিয়ারের বোতল খুলেছিল ড্রইংরুমে। বেশ রাতে মোনা ডেকেছিল, “ডিনার দিয়েছি।” নিঃশব্দে আহার, মৌনব্রতী নারী ও পুরুষ। খচখচ করে কিছু বিঁধছিল, পায়ের নিচে অস্থির চোরাবালি। কিছুক্ষণ মোনা রান্নাঘরে ব্যস্ত, তারপর বাড়ি নিঝুম অন্ধকার। শোবার ঘরে রাতবাতি। ড্রইংরুমে নিচু ভল্যুমে টিভি খুলে বসেছিল অনিন্দ্য। সংবাদ চ্যানেলগুলোয় বিরামহীন পুনারাবৃত্তি! মাঝে চাটনির মত রাজনৈতিক নেতাদের বিবৃতি, বিশ্লেষণ, প্রতিশ্রুতি। উল্লেখযোগ্য হলো পুলিশি প্রতিরোধ উপেক্ষা করে বিচারপ্রার্থী অসংখ্য মানুষ রাস্তায়। মাথা ধরেছিল অনিন্দ্যর। গলাজ্বালা, চোঁয়া ঢেঁকুর। কাটলেট দুটো হজম হয়নি। “শালা!” বিরক্তিতে চ্যানেল বদলে দিয়েছিল। কি এক স্পনসরড্‌ চ্যানেলে বিরতিকালীন বিজ্ঞাপনমালা পরপর। নারী – ভীষণ শরীরি ভাসমান তরঙ্গ! রেশম চুলে চোখে ঠোঁটে আহ্বান। আবরণহীন কাঁধ, রাজহংসি গলা, নিদাগ বাহুমূল থেকে গহীন বিভাজিকা,মসৃণ কোমর, তলপেট, নিটোল ঊরু… অধরা দুলর্ভ মহার্ঘ্যের আভাসে ঠিকরে আসা নীলাভ লালসা। সৌন্দর্‍যের পাঠশালায় ঝলসানো আলোর কেন্দ্রের আঁধার জালে মাছিগুলো টপাটপ…! আশ্চর্‍য। যেন কোথাও কিছু ঘটেনি সদ্য। কোনো নারীর চূড়ান্ত অবমাননা ঘটেনি। অথবা ওটা কোনো ঘটনাই নয়, নিতান্ত স্বাভাবিক… মূল লক্ষ্য বিপনন। নিভুর্ল পরিপাটি সাজিয়ে রাখা জীবন্ত পণ্য ও ভোগ্য! প্রত্যেক অংশ আলাদা আলাদাভাবে। গা ছমছম করে উঠেছিল। ঘুরিয়ে দিয়ে আবার সংবাদ চ্যানেল… পুনরাবৃত্তি চলছে। ব্রেকিং নিউজ! ধষির্তার অবস্থা আশঙ্কাজনক, মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই, ধরা পড়েছে ধষর্ক, শাস্তির দাবিতে প্ল্যাকার্ড, গণআন্দোলন ইত্যাদি। টিভি বন্ধ করে উঠে পড়েছিল সে।

নিঝুম শয়নকক্ষ। ভেবেছিল মোনা ঘুমিয়ে পড়েছে। বুঝল, ওঘরে নেই। ঝকঝকে সীগ্রিন বাথরুম। বেসিনে বমি করল অনিন্দ্য। ছেটানো হলুদ বমির ওপরে আস্তে আস্তে জল ঢালল। বেড়িয়ে এসে বিড়ালপায়ে মোনাকে খুঁজেছিল। রুহির ঘরের নিচ থেকে ক্ষীণ আলোর তির। মেয়ে বছর দুই প্রবাসিনী। ফ্যাশন-টেকনোলজি নিয়ে পড়তে গেছে। অনিন্দ্য সন্তপর্নে ফাঁক করেছিল আলগা ভেজানো দরজা। অন্ধকার ঘরে ডেস্কটপের সামনে মোনা, কানে হেডফোন। দরজার দিকে পিছন করে স্কাইপে কথা বলছে মেয়ের সঙ্গে। অনিন্দ্য চূড়ান্ত বিস্ময়ে আবিষ্কার করেছিল, অবিশ্বাস্য সাদৃশ্য রুহির ঐবয়সি মোনার সঙ্গে! উত্তেজিতভাবে কন্যা কিছু বলছে তার মাকে। তার গমরঙা খোলা কাঁধ ছুঁয়ে উজ্জ্বল চুল। ঢাল বেয়ে বুকের বিপজ্জনক খাদ… আগ্রাসী পোশাক। তার আত্মজা? পণ্য শব্দটা গোঁত্তা মেরে গেল, উত্তাপে কান লাল। আবিষ্কার করেছিল, লুকোনো সাপটা পায়জামার মধ্যে দৃঢ় ফণা তুলছে! প্রবল ভয়ে, অস্বস্তিতে প্রকান্ড “ছিঃ” ঘুলিয়ে উঠছিল। নিঃশব্দে বেড়িয়ে এসে, বিছানায় অস্থির অপেক্ষায় ছিল মোনার জন্যে। রাত গভীর। মোনা সাবধানে এসে বিছানায় নিজের অংশটুকুতে অধিকার নিয়েছিল। অনিন্দ্যর বৈধ নারী, বাইশবছর ধরে পথহাঁটার সঙ্গিনী। পাশ ফিরেছিল অনিন্দ্য, অভ্যস্ত আত্মবিশ্বাসী থাবা রেখেছিল মোনার অসামান্য জলশঙ্খে। নীচে ঢালনামা তট, রাতপোশাকের আব্রুতে সুতনুকা। সজোরে ঠেলে সরিয়ে মোনা দাঁতেদাঁত চেপে বলেছিল, “কি চাই?” এই প্রথমবার! দমিত রাগ ফেটে পড়ছিল। সে বিস্মিত প্রশ্রয়ের আবদারে বলেছিল, “কাম’ন সোনা! জানোনা?” মোনা নিজেকে কঠিন করে নিয়ে ধাক্কা মেরেছিল। বাধা পেয়ে উত্তেজিত হয়ে উঠেছিল অনিন্দ্য। অনুভব করছিল ব্যাপারটা আহ্লাদিপনা বা খেলার পর্যায়ে নেই। মাথায় রক্ত চড়ে গিয়েছিল। কি ঘটেছে যে এত তেজ? দ্রুত নিরাবরণ করেছিল নিজেকে। অসংযত টান মেরেছিল মোনার নাইটির বোতামে। মোনা বাধা দেবার চেষ্টা করেছিল এবং সে সবলে ঠেসে ধরেছিল তাকে। চোরা আলোয় ভয়ঙ্কর হিংস্র দেখাচ্ছিল মুখ। মোনা আর বলপ্রয়োগ করার চেষ্টা করলনা। সিলিঙে তাকিয়েছিল নিস্পৃহ, আনমনা! কথা বলছিল অনুদ্দেশ্যে, “বিয়ের দিন সেকেন্ড-টাইম তোমায় দেখেছিলাম, পরিচয় হয়নি। আর ফুলশয্যাতেই আমরা ফিজিক্যাল… কী লজ্জা, অস্বস্তি! হাঁটতে পারছিলাম না।” সামান্য কেঁপে উঠেছিল অনিন্দ্য। মোনা থামলনা, “তারপর হনিমুন… সাতদিন আমরা দু’জনে শুধুই হোটেলের রুমে। ঢেউয়ের ফেনায় পা ডোবানো হলোনা, জলে হুটোপাটি হলোনা, সী-বিচে পাশাপাশি বসা হলোনা…।” ওর মুখ দেখা যাচ্ছিল না, চোখের দুপাশ গড়িয়ে চিকচিকে জল। অনিন্দ্য মোনাকে ঝাঁকুনি দিয়ে বলেছিল, “কি হয়েছে তোমার মোনা?” মোনা বলেই চলল, “বিয়ের দশমাসের মাথায় রুহি জন্মালো, আমার সবে একুশ তখন। দেড়বছর পরে রিকু! তারপরেও এতবছর…! কতবার রেপ্‌ করেছ আমাকে তুমি?” অনিন্দ্যর পিঠ ঠেকে গিয়েছিল ধৈর্‍য্যের শেষে, “কি? রেপ্‌ করেছি? তোমাকে? মোনা তোমাকে আদর…!” মোনার ধপধপে দাঁত একটু দেখা গেল। “তাই-ই! কষ্ট হচ্ছে বললেই বলেছো – আমি এত সুন্দর, এমন ফিগার, সেজন্যে… তুমি।” ধূমায়িত প্রচন্ড রাগটা দানবাকার নিতে গিয়েও ধ্বসে গেল। নিরুত্তেজ হাত ছেড়ে দিল মোনাকে। চাদর টেনে নিল নিজের নির্গ্রন্থি শরীরে।

কোনো একসময় ঘুমিয়ে পড়েছিল দু’জনেই। ভোরের দিকে স্বপ্ন দেখল সে। মুখঢাকা তিনটি তরুণীকে তাড়া করেছে অদ্ভুতদর্শন অতিকায় প্রাণী। তার দুর্গন্ধ জটালো নোংরা চুল, ঘোলাটে পুঁজভর্তি চোখ, ধারালো নখ, উলঙ্গ শরীর। থামের মত দু’পায়ের মাঝে দৃঢ উত্থিত লিঙ্গটি লোহার, এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিতে পারে। যে তরুণীটি মুখ থুবড়ে পড়ে গেল, তার নগ্নতা ঘিরে ভিনভিন ডাঁশমাছি। মুখ দেখে আঁতকে উঠল সে – মোনা! অন্যদুটি প্রাণভয়ে পালাচ্ছিল। বিকট জীবটা তার আদলে, কিন্তু আদপে তা নয়! ভয়ার্ত আর একটি মুখ আবরণ সরিয়ে ফিরে তাকাল একবার। ভীষণ আতঙ্কে ঘুম ভেঙে গিয়েছিল অনিন্দ্যর। এই কদাকার মুখ সে কবে কত বছর আগে…! ঘামে বিছানা ভিজে, সে হাঁফাচ্ছিল। দেওয়াল ঘড়িতে ভোর হবার সঙ্কেত। মোনা কখন বিছানা ছেড়েছিল টের পায়নি। আবছায়ায় দেখল পাশের খালি জায়গায় চুলবাঁধার মোটা রাবার-ব্যান্ড। হাতে তুলে নিল। খুব লম্বা দুগাছি কালো চুল জড়ানো ওতে।

(৩)

কলেজ জীবনে সযত্নে উদাসী দাড়ি রেখেছিল অনিন্দ্য। সিগেরেট, বিদেশি নভেল, সপ্তাহে দুটো এ-মার্কা বিদেশি সিনেমা। এক সহপাঠী বলত, “মেয়েছেলে হচ্ছে চায়ের ভাঁড়, খাবি আর ফেলবি। শালা, মুখে একটা তোয়ালে চাপা দিলেই সব এক।” উক্তিটা তখন বেশ লাগসই ছিল।

সংবাদে জানাচ্ছে, ধর্ষিতার মৃত্যুর আশঙ্কা কম। কি অবস্থায় বাঁচবে, সে বিষয়ে চিকিৎসক মহল যথেষ্ট আতঙ্কিত। দূরদর্শন বারবার ইন্টারভিউ দেখাচ্ছে তার বালকপুত্রের। এখন মানসিক স্থিতিহীনতার শিকার ছেলেটি। কথা বলতে গিয়ে শিহরে উঠছিল বারবার। চোখের সন্ত্রস্ত চাহনিতে বিভীষিকার স্মৃতি। আকুল ভরসাহারা ছেলে বলেছিল, “ম্যাঁয় জব রো রহা থা, কিঁউ মেরি নঙ্গী মম্মি পর কিসিনে এক কপড়া ভী নহীঁ ফৈঁক দিয়া?” কার এই লজ্জা? জনগণের চাপে আংশিক হলেও তৎপর সরকার ও বিচারবিভাগ। পুলিশি অকর্মণ্যতার সোচ্চার সমালোচনা। শোনা যাচ্ছে, বিল পাশ হবে, কড়া হবে অনুশাসন। চার্জশীট তৈরি হচ্ছে অপরাধীদের বিরুদ্ধে। গণতন্ত্র বলে এখনো কিছু আছে তাহলে! সামান্য ভাঁটা পড়েছে, তবু বিতর্ক ও আলোচনার অবসান ঘটেনি। আরো দু’বার মোমবাতি মিছিল বেড়িয়েছিল এই শহরেও। মোনা যায়নি। রিকুর কোনো পরীক্ষা চলছিল, আসতে পারেনি। সে রাতের ঘটনা অনিন্দ্যকে আপাত বদল দিয়েছে। ইদানিং বাড়িতে সে গম্ভীর, মোনাও চুপচাপ। এই নিরুত্তাপ সহাবস্থান সুসম্পর্কের নির্দেশক নয়, অনিন্দ্যর মনে হয়। বা হয়ত এই ভালো, বোঝাপড়ার জন্য সময় প্রয়োজন। অনেক পুরোনো ভাঁজকরা বাক্সবন্দি কথা থাকে, না খোলাই মঙ্গল। ভেতরে তিরতিরে উদ্বেগ ওঠে নামে, তমসাবৃত ছায়া। ভালো লাগেনা শরীর। শেষ মিছিলটায় নীলাঞ্জনও যায়নি। ক্যান্টিনে বসে অনুতপ্তভাবে বলেছিল, “খারাপ কী লাগে জানিস তমা, মিছিলে গিয়েও বয়স্ক লোকগুলো চোখ দিয়ে পাশে হাঁটতে থাকা মেয়েটার শরীর চাটতে থাকে, পারলে ছুঁয়ে দেয়!” শ্রীতমা সহজভাবে বলেছিল, “মেয়েরা খোলা বা টাইট ড্রেস না পরলেই পারে।” জোনাকী হেসেছিল, “ঠিকই বলেছিস, যেদেশ যেমন। আফ্রিকার ট্রাইব্যালরা বা আন্দামানে জারোয়ারা তো… দ্যাট ওয়ে এরা কত সুসভ্য আধুনিক।” নীলাঞ্জন বলেছিল, “তাই কি? জানিনা। সভ্যতার সংজ্ঞা গুলিয়ে যায় যখন আশেপাশের মানুষজন দেখি…! জোনাকীদি’ এটা ঘটনা। ওখানেও অত্যাচার আছে, ফর্মটা আলাদা।” পাশের টেবিলে কফির কাপ নিয়ে একা বসেছিল অনিন্দ্য। নীলাঞ্জন ডেকেছিল, “আসুন না স্যর।” সে ধন্যবাদ জানিয়ে প্রত্যাখ্যান করেছিল। “দেখো জোনাকীদি, এদেশটা ওয়েস্টার্ণ কান্ট্রিও না, আফ্রিকার জঙ্গলও না,” বলছিল শ্রীতমা, “কি অদ্ভুত বলো, মোস্ট অর্ডিনারি সিনেমাগুলোতেও নায়কেরা ফুল্লি কভার্ড, আর নায়িকারা? ঈস্‌! আর বিজ্ঞাপনগুলো? বলোতো, আমরা কি আধুনিক হতে গিয়ে নিজেদের সুলভ বানিয়েছি?” সুলভ… গণভোগ্য! ফেলো কড়ি, করো ‘ত্যাগ’! অনিন্দ্য চমকে তাকিয়েছিল শ্রীতমার দিকে। লাজুক, চুপচাপ মেয়ে..। কথাগুলো তেমন ভেবে বলা নাও হতে পারে, কিন্তু গেঁথে গিয়েছিল। পাপবোধ? কতযুগ পরে! ‘বীরভোগ্যা বসুন্ধরা’ মনে পড়ে গেল। জোনাকী মাথা নিচু করে হতাশায় ফুঁসছিল, “একুশ শতকে দাঁড়িয়ে একথা ভাবতে হচ্ছে। কি বলব বল!” শ্রীতমা বলেছিল, “এদের কি অনুশোচনা হয়, জঘন্য কাজটা করার পরে?” জোনাকী হেসেছিল, “মনে হয় তোর? ভোক্তা আর ভোগ্য… অনুতাপটা কিসের? ব্যাকরণে পুংলিঙ্গ আছে। মনুষ্যলিঙ্গ? নেই। দেখে নিস, এশতাব্দির শেষে রেপ শাস্তিযোগ্য অপরাধের তালিকাতেও থাকবেনা!” নীলাঞ্জন নিবার্ক। অনিন্দ্যর কানে গরম শিক ফুঁড়ে গেল আজও! উঠে গিয়েছিল সে।

জরুরি মিটিং-এ তলব ওপরমহল থেকে, পরদিন সকালে দিনদুয়ের জন্যে দুগার্পুর যাবার নিদের্শ। মোনা শুনল। অনিন্দ্য বলেছিল, “তুমি পণর্শ্রী চলে যেও, নাহলে, কসবাও যেতে পারো।” পণর্শ্রীতে মোনার বাবা-মা’র ফ্ল্যাট, কসবার বাড়িতে অনিন্দ্যর বড়দা-বৌদি মা। মোনা আনমনা, “দেখছি।” অনিন্দ্যর সঙ্গে জুনিয়র দীপঙ্কর সাহা, দায়িত্বশীল ছেলেটি। সকাল ছ’টা, ঘণ্টাতিনের জার্ণি। রানওয়েসুলভ হাইওয়ে, টাটা ইন্ডিকার মসৃণ চলন, নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রা, মোলায়েম আবহাওয়া। পেছনের সীটে একা অনিন্দ্য। ইদানিং নিরুতসাহ সব কিছুতেই,অকারণ ক্লান্তি। একটা চেক-আপ দরকার। কাজের নেশায় খেয়াল থাকেনা প্রৌঢ়ত্বের ভনভনানি! ‘লাইফ স্টার্টস এ্যাট ফর্টিফাইভ’। পঞ্চাশ হতে বছরদুই বাকি। বয়সটা ভালো নয়। পান-ভোজনবিলাসীর ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকেনা, নেইও। বাবার হাই-প্রেসার ছিল, বড়দার আছে। রিকু হয়তো আসবে, পরের সপ্তাহে দোল। এই ঋতুতে চারপাশে খুব ধুলো ওড়ে। ধূসর সামনের রাস্তা, গাড়ির বনেট, কাঁচ। এপথে এখনো এত ধুলো হয়? ড্রাইভার আলম রীয়ার উইন্ডোতে দেখেছিল চোখ বুঁজে আছেন অনিন্দ্যস্যর। অনিন্দ্যর পৃথিবীময় এখন শুধু ধুলো, ধুলোর ঘূর্ণি সরালেই…! অনেকবছর তারা রানিগঞ্জে ছিল, বাবার পোস্টিং। স্কুলের পরীক্ষার পরে বাবা তাদের নিয়ে বেড়াতে যেতেন। বোলপুরের কাছে গুশকরায় থাকতেন বাবার রাঙামামা, বাবার চেয়ে অল্প বড়। নিঃসন্তান দম্পতি খুশি হতেন। রাঙাঠাম্মার কথার ভঙ্গিতে অন্য টান ছিল। সম্ভবত হিন্দুস্থানি বলে পরিবারে গৃহীত হননি। রাঙাদাদুর দেড়বিঘে জমিতে টালি-ছাওয়া প্রশস্ত একতলা বাড়ি। চারদিক প্রায় জনশূন্য, ধূধূ রুক্ষ। বড়বড় ঘর, ঘুলঘুলিতে চড়াইয়ের ডিম। বিশাল ইঁদারা, অসংখ্য গাছ, আমগাছে কাকের বাসা। ঘুরে বেড়াতে দারুণ লাগত অনিন্দ্যর। পাঁচিলের শেষপ্রান্তে জঙ্গলের মধ্যে অদৃশ্যপ্রায় খড়েছাওয়া দু’খানা মেটেঘর। মালির ঘর বলত সবাই। ওখানে ছোট্ট কুয়োতলার পাশে সজনে গাছ ফুলে ছেয়ে থাকতো ফাল্গুণের শুরু থেকে। কিন্তু ওদিকে যাওয়ায় কঠোর নিষেধ ছিল। কতদিন দূরে গাছের আড়াল থেকে দেখছে, শাড়ি-পরা কেউ, একটা উলঙ্গ মেয়েকে সাবান ঘষছে। রহস্যভেদ হয়নি। তিনভাই মস্ত ইঁদারায় বালতি ডুবিয়ে মহানন্দে স্নান করত। বাগানে বসে কলাপাতায় পিকনিক। রান্না করতেন রাঙাঠাম্মা। শান্তিনিকেতনের বসন্ত উতসবে আকাশছোঁয়া লাল ধুলোয় ছিল আবিরের উচ্ছ্বাস। যত্রতত্র পলাশ-কৃষ্ণচূড়ার লাল-হলদে দাঙ্গা। আনন্দময় সেসব দিনক্ষণ মনে পড়লে পরে প্রত্যেকবার নিজের স্মৃতিবিলুপ্তি কামনা করেছে অনিন্দ্য। তার তখন সেই বয়সটা, যখন জীবনবিজ্ঞানের ‘রিপ্রোডাকশন চ্যাপ্টার’-এর অন্ধিসন্ধি কণ্ঠস্থ, যখন তখন লিঙ্গোত্থান, গোপনে স্বমেহন, বন্ধুদের সঙ্গে নিষিদ্ধ আমিষি রহস্যে মশগুল হওয়া। শরীর দেখার চরম কৌতূহল, ছোঁবার ইচ্ছে। মা’র ভাঁড়ারে নিরীহ উল্টোরথ বা নবকল্লোল ছাড়া পাওয়া যেতনা কিছু। সে কোলকাতায় কলেজে ভর্তি হল, দাদারা চাকরি পেল। বাবা বাড়ি করলেন কসবায়। ওঁর আর গুশকরায় যাওয়া হয়নি।

শেষবার অনিন্দ্য গিয়েছিল সেই দোলে, পোস্টগ্র্যাজুয়েশন শেষ। প্রতীক আর দেবেশকে নিয়ে আগের দিন বিকেলে পৌঁছেছিল রাঙাদাদুর বাড়ি। কয়েকবছরে পরিবর্তন অনেক। শীলা! সেই আঁশটে গন্ধটা। নিষিদ্ধ সাফল্য চেখে দেখার প্রথম আস্বাদ! অনিন্দ্য ঘুরে ঘুরে দেখাচ্ছিল বিশাল জমি, বাগান। যত্নের অভাবে শ্রীহীন, ধ্বস্ত। কবে যেন ভুলেই গিয়েছিল কৈশোরের ‘প্রবেশাধিকার-বর্জিত’ অঞ্চলটুকুর অস্তিত্ব। এবার কেউ বাধা দেননি। বার্ধক্যভারাক্রান্ত রাঙাদাদু দুঃখী হেসেছিলেন, “আজকাল পরিশ্রম করতে পারিনে দাদুভাই। দেখোনা, কেমন জঙ্গল হয়ে গেছে।” চমৎকার লাগছিল হেঁটে বেড়াতে, রঙিন গোধুলিতে অন্য রঙ। বাউণ্ডারি দেওয়াল সবর্ত্র অক্ষত নেই, ভেঙে গেছে। শেষপ্রান্তে পৌঁছে সেই জীর্ণ মেটেঘর। পা থেমে গিয়েছিল। একলা যুবতি আপনমনে এক্কাদোক্কা খেলছিল কুঁয়োর পাড়ে। তার দু’বেনী ও অন্তবার্সবিহীন স্থূল ঊর্ধাঙ্গ একসঙ্গে দোলায়িত। দেবেশ জিজ্ঞেস করেছিল, “মালটা কে রে?” অনিন্দ্য একদৃষ্টে তাকিয়ে ফিসফিস করেছিল, “মেয়েছেলে।”

লালধুলো উড়িয়ে পরদিন দোলের ভোরে নদীর পাড়ে পৌঁছেছিল তিনজন। সিদ্ধিপানের মত্ততা, আদিবাসী মেয়েপুরুষের ঘামগন্ধ, গায়ে-গা লাগিয়ে উদ্দাম নাচ। শেষবিকেলে ফিরে এসেছিল। ঝিম্‌ঝিম্‌ অশান্ত মাদকতা। এলোমেলো পা ফেলে মচমচে শুকনো পাতা মাড়িয়ে যেন খানসেনা। কিসের নেশায় পৌঁছেছিল সেই আধভাঙা পাঁচিলের পাশে, শুকনো খটখটে কুঁয়োতলায়। খাটিয়ায় বড়ি শুকোচ্ছিল। বাঁশে-বাঁধা দড়িতে আধময়লা শাড়ি। ত্রিসীমানায় ছিলনা কেউ। একদিকে নিচু দরজার আধোভেজানো পাল্লা। অনুমতি নেওয়ার প্রশ্ন ওঠেনি, চোরের মত ঢুকে পড়েছিল তারা। দুখানা পাশাপাশি ঘর আবছায়া, জানালার মত পথ বেয়ে কৃপণ আলো। মাটির ঠান্ডা মেঝেতে ছড়ানো ন্যাকড়ার পুতুলের পাশে আলুথালু সুষুপ্ত বেওয়ারিশ কুমারী শরীর। ব্লাউজের আড়াল সরে সুগোল স্তন এবং হাঁটু পর্‍যন্ত উঠে থাকা কাপড়। ঝনঝন করে উঠেছিল নিবার্ধ উত্তেজনা। নিঃশব্দ ইশারায় যোগাযোগ হল তিনজনের। পরষ্পরকে লজ্জার অবকাশ ছিলনা। দেবেশ ইতস্তত করছিল, বাধবাধ, ভয়। অবশ্য কয়েকমুহূর্তই কেবল! নিমেষে দু’জনে চেপে ধরেছিল শিকারের হাত ও মুখ। এত সতর্কতার প্রয়োজন ছিলনা,বুঝেছিল পরে। প্রথমে অনিন্দ্য আক্রমণাত্মক ক্ষিপ্রতায় ঝাঁপিয়ে পড়ে দখল নিয়েছিল। দু’হাতে দলিত কাঁচামাটি, নিমর্ম ও অব্যর্থ প্রবেশ মেয়েটির অভ্যন্তরে – দ্রুত, খুব দ্রুত এবং নিঃশেষিত হয়েছিল। অনাস্বাদিত জিত এবং উল্লাস! বিরতিহীন পরপর একইভাবে প্রতীক ও দেবেশ। আচমকা ঘুম ভেঙে মেয়েটির। আর অনিন্দ্য চূড়ান্ত ঘেন্নায় আবিষ্কার করেছিল, জঘন্য ভোঁদড়ের মত এক মুখ! শীত করে উঠেছিল তার, হাত কাঁপছিল। রক্তাক্ত মেয়েটার কাপড় নামিয়ে দেওয়ামাত্র মেয়েটা স্বরযন্ত্রের ত্রুটিযুক্ত ব্যাঙের আওয়াজে হেসে উঠেছিল, “ফিরসে খেলেগা রে?” কি ঘটল ভাবার আগেই পেছন থেকে সাপের শিসের তীক্ষ্ণ আওয়াজে, “শী-লা!” আতঙ্কের প্রান্তে পৌঁছে অনিন্দ্য দেখেছিল পাঁজরসবর্স্ব জরতিকে, যার অস্তিত্বের কথা মনে আসেনি…। ধূমাবতী কোটরাগত চোখে দোজখের আগুন জ্বালিয়ে বলেছিল, “হারামিলোগ আদমি বে! ইন্সান নহীঁ!” দুগর্ন্ধ থুতু ছিটিয়ে গোবরমাখা দু’হাতে মেয়েটাকে জাপটে চাপা আতর্নাদ করেছিল, “তুঝকো বচানে নহী সকে!” ছুট ছুট ছুট… কোন গাছ থেকে একঝাঁক টিয়া আকাশফাটানো চিৎকার করে উড়ে গেল মাথার ওপর দিয়ে। রাঙাঠাম্মার আন্তরিক নিষেধ অগ্রাহ্য করে ভরসন্ধ্যেয় ইঁদারার জল বালতি বালতি মাথায় ঢেলে স্নান করেছিল তিনজনে এবং রাত্রের ট্রেন ধরে কোলকাতায়… হ্যাঁ পালিয়েছিল! দিনদশেক প্রবল জ্বরে ভুগেছিল অনিন্দ্য। পাপবোধ অনুতাপ – এসব কোনো ঘাত অনুভব করেনি। সে শুধু ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকত, এই বুঝি কেউ কিছু… ঘটেনি। এতবছরেও।

বেলা বারোটায় মোনা অনিন্দ্যর মোবাইলে কল করে অপরিচিত গলা শুনেছিল, “নমস্কার বৌদি, দীপঙ্কর বলছি। রাস্তায় স্যরের একটা মাইল্ড এ্যাটাক হয়েছিল। আমরা নার্সিংহোমে এ্যাডমিট করেছি। টেনশন করবেন না, একদম ঠিক আছেন।” সন্ধ্যে সাড়ে সাতটা নাগাদ অনিন্দ্য মাত্র মিনিটপাঁচেকের জন্যে কপালের ওপরে নরম হাতের চেনা স্পর্শ পেয়েছিল। তারপর অপেক্ষায় থেকে থেকে চোখ খুলে দেখেছিল, কেবিনের জানালা দিয়ে বাইরের দিকে মুখ করে সে দাঁড়িয়ে আছে। তার সুদীর্ঘ একরাশ খোলা চুল। সে খুব কাছের, কিম্বা একেবারেই নয়। বাইশবছরের না-মেলা অঙ্ক ও সমঝোতার এখনো অনেক বাকি।

(চিত্রণ – রু)

3 thoughts on “মৃত মহাদেশে হে মাধবী আজো……

  1. Pingback: Content and contributors – March 2014 | aainanagar

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s