নামে কি এসে যায়!

নীতা মন্ডল

(এই লেখাটির অংশবিশেষ এর আগে লেখকের ফেসবুক পেজে প্রকাশিত হয়েছিল)

“বোলপুর থেকে যখন যাদবপুরে পড়তে আসি, আমার গম্ভীর মুখ আর মোটা চশমা দেখে অনেকে সন্দেহ প্রকাশ করেছিল যে আমি সত্যি কোনওদিন হেসেছি কিনা! তারপর কি করে যেন আমার ফিচেল স্বভাবটা প্রকাশ পেয়ে গেল! ওষুধ নিয়ে দীর্ঘদিন পড়াশুনো বা গবেষণা করলেও আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি, সুস্থ থাকার জন্যে সব চেয়ে কার্যকরী ওষুধ হল মন খুলে একটু হাসি। আর সেই হাসির উপাদান ছড়িয়ে আছে আমাদেরই চারিপাশে। শুধু তাকে চিনে নেওয়ার অপেক্ষা… তাই সব সাধারন কথার পিছনে মজার অসাধারণত্ব খুঁজে বেড়াই আমি। বন্ধুদের সঙ্গে দীর্ঘ ফোনালাপ, কর্মক্ষেত্রে সহকর্মীদের একে অন্যের মুন্ডুপাত করা, ছাত্রছাত্রীদের লুকিয়ে চুরিয়ে প্রেম করা, বাড়িতে বর বা ছেলের সঙ্গে টক, মিষ্টি, নোনতা নানান মুহূর্ত অথবা বাড়ির নিরীহ কাজের মাসির হঠাৎ একটা মহামূল্যবান মন্তব্য, সবকিছুই হতে পারে একটা গল্পের আকর। রোজকার নীরস দিনপঞ্জী একটু সরস উপায়ে লেখার চেষ্টা করি। তাই সেই লেখা পড়ে কারোর ঠোঁটে মুচকি হাসি খেলে গেলেই আমার লেখা সার্থক।” – নীতা

নামে কি এসে যায়! (এক)

একটা বিয়ের নেমতন্ন পেলাম। পাত্রীর বাবার নাম সেন্সর পাল সিং। পাত্রীর কাকার সূত্রে পাওয়া এই নিমন্ত্রণপত্র। আমি যখন প্রথম এখানে এসেছিলাম, ভদ্রলোকের (পাত্রীর কাকা) নাম শুনে জিজ্ঞেস করেছিলাম ওনার নামের মানে কি?

উনি বলেছিলেন, ‘দেখুন মশাই ওই নাম নিয়ে মাতামাতি আপনারা বাঙ্গালিরা বেশি করেন। বাচ্চাদের মিনিংফুল নাম রাখতে হবে, এক্সট্রাঅর্ডিনারি নাম রাখতে হবে। আমাদের ও সব নেই, একটা নাম রাখলেই হল। ‘নামে কি এসে যায়!’ তাছাড়া আমি আমার বাবা মায়ের নবম সন্তান। এতগুলো ছেলেমেয়ের নাম ওই ভাবে রাখা সম্ভব? ডাকতে হয় তাই একটা নাম ধরে ডাকা।’ সেই সময়ে ভদ্রলোক আরও বলেছিলেন, ‘এই তো আমার এক দাদা, নাম সেন্সর পাল সিং। ওই নামে তার সারাজীবন দিব্যি কেটে গেল। তিনি আর্মিতে বড় অফিসার ছিলেন। কোথাও আটকেছে?’

এ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারি নি। বরং ভদ্রলোকের বকুনি খেয়ে আমি চুপ করেছিলাম। আজ কার্ড দেখে সেই কথাটা মনে পড়ে গেল। এরই মধ্যে আমার সহকর্মীদের মধ্যে পাত্রীর বাবার নাম নিয়ে গুঞ্জন উঠেছে। একটু হাসাহাসির পর নাম নিয়ে যে যার অভিজ্ঞতা বলতে শুরু করেছে।

একজন বলল, ‘আমার মাসির ভাশুরের তিন ছেলে। একজনের নাম কালেক্টর, একজনের নাম ইন্সপেক্টর আর একজনের নাম ক্যাপ্টেন।’

তাই শুনে একজন বলল, ‘সত্যি সত্যি? এগুলো নাম? মানে ওরা স্কুলেও এই নাম লেখে?’

‘কেন লিখবে না। নামই তো। এছাড়া জানেন আমি যদি আমার পূর্বপুরুষদের নাম বলি, আপনারা ভয় পেয়ে যাবেন।’ যিনি বললেন তিনি উত্তরপ্রদেশের আজমগড়ের বাসিন্দা।

জিজ্ঞেস করলাম, ‘কেন? তোমার বাবার নাম কি?’

বলল, ‘অভিমন্যু।’

বললাম, ‘বাঃ, বেশ সুন্দর নাম তো।’

বলে, ‘হ্যাঁ, কিন্তু বাবার বাবার নাম ভয়ঙ্কর সিং আর তাঁর বাবার নাম জালিম সিং।’

শুনে আমরা কোরাসে হেসে উঠলাম।

সবাই যখন বলছে, আমিই বা পিছিয়ে থাকি কেন? আমারও মনে পড়ে গেল। সময়টা আশির দশকের প্রথমদিক। আমরা তখন ছোট। আমাদের বাড়িতে কাজ করত, বেজা বায়েন। অনেক পরে জেনেছি, ভদ্রলোকের আসল নাম বিজয় দাস। বেশ অনেকটা বয়স হয়ে যাবার পর ভদ্রলোকের একসঙ্গে যমজ বাচ্চা হল। একটা ছেলে একটা মেয়ে। ওই বয়সে বাবা হয়ে ভদ্রলোক যে কি খুশি!

আমার ঠাকুমা জিজ্ঞেস করলেন, ‘তা বেজা, বেটাবিটির নাম রাখলি?’

ভদ্রলোক উত্তর দিলেন, ‘বিটিটোর নাম দেলাম ‘ইন্দিরা গান্ধী’ আর বেটাটোর ‘জ্যোতি বসু।’

ওরা যখন স্কুল যেতে শুরু করল, ওরা নিজেদের নাম লিখত ‘ইন্দিরা গান্ধী দাস’ ও ‘জ্যোতি বসু দাস।’ আমার গল্প শেষ হতে আরও একবার হাসির হুল্লোড় উঠল স্টাফরুমে।.

নামে কি এসে যায়! (দুই)

বিমলবাবুর মন ভাল নেই। কারণটি বিচিত্র। কাল ওনার স্ত্রী একটি পুত্র সন্তানের জন্ম দিয়েছেন। বিমলবাবুর একটি কন্যার বড় শখ। কিন্তু ওনার স্ত্রী কেবল পুত্র সন্তানই প্রসব করেন। উদাস মনে বিমলবাবু কাজে বের হলেন। উনি একটি বিদ্যালয়ে অঙ্কের মাস্টারমশাই।

ধীরে ধীরে উনি মন খারাপ কাটিয়ে উঠছেন। এখন উনি গভীর চিন্তায়। এবারে ছেলেটির কি নাম দেওয়া যায়! নাম রাখার ব্যাপারে বিমলবাবু অত্যন্ত খুঁতখুঁতে। বেশ অর্থপূর্ণ নাম দিতে হবে আবার আগের ছেলেদের সঙ্গে ছন্দমিলও থাকতে হবে।

স্টাফরুমে ঢুকে নতুন বাংলার মাস্টার উত্তমকে দেখে হালে পানি পেলেন। সোজা পৌঁছলেন উত্তমের কাছে। সবাই যে বিমলবাবুকে অভিনন্দন জানাচ্ছেন সেদিকে ওনার নজর নেই। উত্তমের সামনে চেয়ার টেনে নিয়ে ধপ করে বসে পড়লেন, ‘আমার ছেলের জন্যে একটা যুতসই নাম বল দেখি। ওর দাদাদের সঙ্গে মিলিয়ে মিলিয়ে।’

বিমলবাবুর কয়টি ছেলে সে বিষয়ে উত্তমের ধারনা ছিল না। বলল, ‘কি নাম আপনার আগের ছেলের?’

বিমলবাবু বললেন, ‘নিলয়, প্রলয়, আলয়, মলয়,…।’

উত্তম বলল, ‘আচ্ছা আচ্ছা, বুঝতে পেরেছি। এবারে তাহলে রাখুন ‘আর লয়’।

.

নামে কি এসে যায়! (তিন)

বেশ কয়েক বছর আগের কথা। আমি তখন জয়পুরে। চাকরির একদম গোড়ার দিকে। পশ্চিমবাংলার বাইরে অত দূরে গিয়েছি সেই প্রথম। জায়গাটা জয়পুর শহরের উপান্তে। বড় ক্যাম্পাস। ক্যাম্পাসেই আমার থাকা, খাওয়া সব। এত সুন্দর ক্যাম্পাস যে রাজস্থানে আছি মনেই হয় না। মাঠ ভর্তি সবুজ ঘাসের গালিচা। ধারে ধারে নানা রঙের গোলাপ ফুটে আছে। গোলাপ ছাড়াও বাগানে আরও কত রংবেরঙের ফুল। দোতলায় আমার ঘরের বাইরেই একটা শিমুল গাছ। টিয়া পাখির ঝাঁক এসে বসে ওই গাছের ডালেডালে। পুবে তাকালে দূরে পাহাড়। আমি প্রতিদিন ওই পাহাড়ের মাথায় সূর্য ওঠা দেখি। ওখানেই জয়গড় দুর্গ। উত্তরে তাকাই, সেখানেও পাহাড়। যেখানে আমাদের ক্যাম্পাস শেষ হচ্ছে সেখান থেকেই ওই পাহাড় শুরু হয়েছে। নাম বেনাড পাহাড়।

এত সৌন্দর্যেও আমার বুকের ভেতরে হু হু করে। মাছ নেই, ভাত নেই, কথা বলার মানুষ নেই, মুঠোর মধ্যে ফোন নেই। কথা যে বলব, ভাষা সেখানে এক বড় বাধা। হিন্দি বলতে মুখ দিয়ে অতিকষ্টে শুধু ‘হ্যায়’ টুকু বের হয়। ক্লাসে পড়াতে যাই, আমার ইংরাজি উচ্চারণ ছেলেমেয়েরা বুঝতে পারে না।

তার সঙ্গে আছে গোদের উপর বিষফোঁড়া। আমি বাঙ্গালী শুনে কেউ শুধোয়, ‘পথের পাঁচালি’ কথাটার মানে কি? কেউ শুধোয়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘জনগণমনঅধিনায়ক…’ কাকে উদ্দেশ করে লিখেছেন?’

একদিন ছাত্রছাত্রীরা দাবী করল, ‘আজ পড়ব না, আপনার সঙ্গে গল্প করব।’ আমিও রাজী। সেই সময় ঋতুপর্ণ ঘোষ ‘চোখের বালি’ চলচ্চিত্রায়িত করেছেন। একজন জিজ্ঞেস করল, ‘চোখের বালি’ কথাটার মানে কি? সেই মানে বোঝাতে গিয়ে আমি ঘেমে নেয়ে একাকার। ছাত্রছাত্রীরা সেই দিনই বলল, ‘আপনি হিন্দিতে না পড়ালে আমাদের খুব অসুবিধা।’ আমি বল্লাম, ‘কিন্তু আমি যে হিন্দি বলতেই পারি না, এত ভুল হিন্দি বলে কি পড়ানো যায়?’ ওরা বলল, ‘আপনি ভুলই বলুন। আমরা ঠিকটা বুঝে নেব।’

তারপর শুরু হল যুদ্ধ। সে এক বিচিত্র ক্লাস। ক্লাসে দুপক্ষই ছাত্র। ওরা আমার কাছে পড়া শিখছে আর আমি ওদের কাছে স্পোকেন হিন্দি শিখছি। আবিস্কার করলাম, যত বেশি কথা বলব, তত বেশি ভুল বলব আর যত ভুল বলব তত তাড়াতাড়ি ঠিকটা শিখে নিতে পারব। প্রাক্টিক্যাল ক্লাসগুলো তো ভারি মজা। প্রত্যেকের সঙ্গে আলাদা করে অন্তত দশ মিনিট। খাতা দেখাতে আসে, পর্যবেক্ষণ নিয়ে আলোচনা করা হয়। প্রশ্ন-উত্তর পর্ব হয়। তাই আমি শুরুটা করি ওদের নাম দিয়ে।

প্রথমজন আসে। অতি সমাদরে তাকে পাশে বসাই, ‘নাম কি?’

‘আশুতোষ।’

‘নামের মানে বল।’

‘শিব ঠাকুর।’

‘বাঃ ঠিকই বলেছ। কিন্তু ব্যুৎপত্তিগত মানে চাইছি, বল দেখি।’

ছেলেটি বলতে পারল না।

আমি ভাঙ্গাচোরা হিন্দিতে বোঝাতে শুরু করলাম। ছেলেটিরও মনে পড়ে গেল, হ্যাঁ, এরকম একটা মানে তো সত্যি আছে ওর নামের।

ছেলেটি বলল, ‘আমি জানতাম, কিন্তু ভুলে গিয়েছিলাম।’ তারপর আরও এক রাশি বিস্ময়ের সঙ্গে বলে, ‘ম্যাডাম, আপনি যে বলেন আপনি হিন্দি জানেন না কিন্তু হিন্দিতে তো আপনার গভীর জ্ঞান!’

পরদিন শনিবার। আমার ওই মরুভূমির রাজ্যে মরূদ্যান বলতে আমার দুই বন্ধু। জয়পুরের দুটি আলাদা জায়গায় থাকে। আমাদের দেখা হয় প্রতি শনি-রবিবারে। আমরা সারা সপ্তাহের ঘটনাগুলো, অভিজ্ঞতাগুলো নিয়ে আড্ডা মারি। জয়পুর শহরের আশেপাশে বিখ্যাত ও অখ্যাত জায়গায় ঘুরে বেড়াই। দিনের শেষে সেন্ট্রাল পার্কে পা ছড়িয়ে বসে গল্প হয়। তারপর রেলওয়ে ক্যান্টিনে ডিনার করি। সেও এক আবিষ্কার। একমাত্র ওখানেই সস্তায় মাছ ও ভাত পাওয়া যায়।

সেদিন ওদের সঙ্গে দেখা হতেই আমি কলার তুলে বল্লাম, ‘তোরা সব আমার হিন্দি শুনে হাসিস, দেখ আমার ছাত্র বলেছে, ‘হিন্দিতে তো আপনার গভীর জ্ঞান’। বলাই বাহুল্য, সেদিনের বাকি সময়টা আমি ওই দুজনের খোরাক হয়ে গেলাম। আর ডিনারের খরচটাও আমাকেই দিতে হল।

.

নামে কি এসে যায়! (চার)

শুরু হয়েছিল আশুতোষকে দিয়ে। ওদের নামগুলো সব আদ্যঅক্ষর অনুসারে পরপর। এন পেরিয়ে এবার পি দিয়ে শুরু হবে। এদিকে ততক্ষণে ওদের মধ্যে মহামারীর মত খবর ছড়িয়ে পড়েছে। ঠিক যেন ‘দিকে দিকে এই বার্তা রটি গেল ক্রমে।’

মৌখিক পরীক্ষায় প্রথম দিকে যারা থাকে তারা চিরকালই অনিশ্চয়তায়, দুশ্চিন্তায় থাকে। কোন মাস্টারমশাইয়ের মনে কি আছে, কে কি জিজ্ঞেস করবে, আগে থেকে তার আভাস পাওয়া যায় না। ওরা ফিরে আসতেই বাকিরা তাদের ছেঁকে ধরে, ‘এই, এই, কি শুধোল রে?’ ‘এর উত্তর কি হবে রে?’

যাদের নাম পরেরদিকে ছিল, ধীরে ধীরে তাদের চাপা টেনশনটা কমে এল। ওদের তখন আর বুঝতে বাকি নেই, কি এক্সপেরিমেন্ট করল, কেন করল, কি ভাবে করল, করে কি পেল এসব নিয়ে ম্যাডামের কোনও মাথাব্যাথা নেই। তার চেয়ে বরং ভেবে দেখ, তোর নিজের নামের মানে কি? কে দিয়েছিল তোর নাম? কেন দিয়েছিল? যদি জানা না থাকে বাড়িতে চট করে একটা ফোন করে জেনে নে।

অতঃপর একজন ছাত্র এল। রোগা পাতলা চেহারা। পাশে বসল। নৈবেদ্যর মত ল্যাবরেটরি নোটবুকটি দুহাতে বাড়িয়ে দিল আমার দিকে।

আমি নোটবুক খুলে ওর পর্যবেক্ষণ অংশটা লাল কালি দিয়ে গোল করে সই করতে যাবো এমন সময় ছেলেটি বলল, ‘ম্যাডাম আমার নাম, প্রবেশ শরমা।’

আমি ওর উচ্চারণকে নকল করে বল্লাম, ‘কি বললে? পারভেজ? পারভেজ মুসারফ!’ (হি হি)

একটু থেমে, ‘বাঃ, বাঃ বেশ অন্য রকম নাম তো!’ ভাবলাম ওকে আর মানে জিজ্ঞেস করার দরকার নেই। প্রবেশ মানে না জানার কিছু নেই। আমিও জানি, ও ও জানে।

জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছি, যে পরীক্ষাটি যে এতক্ষণ করল, তা কেন করল? তার আগেই ছেলে বলতে শুরু করে দিল, ‘আসলে ম্যাম, আমি তো আমার তিন দিদির পরে হয়েছি।’

বুঝলাম ছাত্র একদম প্রস্তুত, না বলে থামবেই না। এরপর ছেলেটি যা বলল তার মানে, ‘আমার বাবা তিনটি কন্যার পিতা হবার পর আমি জন্মেছি। তাই আমার বাবা একটা অন্য দিগন্তে প্রবেশ করেছিলেন সেই সময়। তাই আমার নাম প্রবেশ।’

আমি গম্ভীর হয়ে ওর খাতা সই করলাম। তবে জানতে ইচ্ছে করছিল যে ওই অন্য দুনিয়ায় তিনি আর কতবার বিচরণ করেছিলেন। এ কথাটা জিজ্ঞেস করি নি। মনে পড়ে গিয়েছিল আমার বাবার পিসির কথা। ভদ্রমহিলার আট মেয়ে ও দুই ছেলে। ‘বাবা! এতগুলো ছেলে মেয়ে!’ বললে আমার ঠাকুমা খুব গর্বের সঙ্গে বলতেন, ‘দশ জন জীবিত। বাকি তিনজন মৃত। ওর মোট সন্তান তেরটি।’ তো ওই পিসি ঠাকুমার ছয় মেয়ের পর যখন এক ছেলে জন্মায় তখন উনি ভেবেছিলেন এবার বুঝি উনি নিষ্কৃতি পেলেন। জন্ম নিয়ন্ত্রনের কথা ভয়ে ভয়ে উত্থাপন করতেই ওনার শাশুড়ি বলেছিলেন, ‘এই তো ছেলে হতে শুরু করল, এখনই এরকম অলুক্ষুণে কথা!’

তারপর পিসিঠাকুমার আবার তিনটি মেয়ের পর দ্বিতীয়বার ছেলে জন্মায়। পিসি ঠাকুমার বড় ছেলের নাম ‘প্রবেশ’ ছিল না। তবে ওনার ছয় নম্বর মেয়েটির নাম রাখা হয়েছিল ‘থামু’।

 .

নামে কি এসে যায়! (পাঁচ)

এবছর ছাত্রছাত্রী হিসেবে বেশ কিছু বিখ্যাত মানুষকে পেয়েছি। তারা ভীম, দুর্যোধন, চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য এবং এলিজাবেথ। ভীমকে নিয়ে আমার বিশেষ কৌতূহল ছিল না। মহাভারত থেকে নাম দেওয়া এক বহুল প্রচলিত প্রথা। তাছাড়া ভীমের মত বীর সন্তান কে না চায়! ছোটবেলায় এমন পরিবারও দেখেছি যেখানে চার ভাইয়ের নাম, ভীম, অর্জুন, নকুল আর সহদেব। তবে এই ভীম বড্ড রোগাপাতলা। নামের সঙ্গে একদম যায় না। বেচারা কিই বা করে? ‘কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন’ এর উদাহরণ তো চারদিকে ভুরিভুরি। বর্তমানে আমি যে লোকটার কাছ থেকে মাছ কিনি তার নাম মেঘনাদ সাহা। আমার মোবাইলে ওর ফোন নম্বর সেভ করব বলে নাম জিজ্ঞেস করেছিলাম। নামটা শুনে মনে হয়েছিল বোধ হয় ভুল শুনেছি। তাই ওর মুখের কাছে কান এগিয়ে নিয়ে গিয়ে আরও একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘কি নাম বললে?’ লোকটা অবাক হয় নি। হয়ত ভেবেছিল আমি কালা। আবার বলেছিল, ‘মেঘনাদ সাহা।’

কথা হচ্ছিল আমার ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে। দুর্যোধনকে শুধোলাম, ‘বাবা, তোর এরকম ভিলেনের নাম কেন দিল?’

দুর্যোধন জানাল ওর বাবা আর এই ক্লাসের ভীমের বাবা হলেন বাল্যবন্ধু। যাকে বলে হরিহর-আত্মা। গ্রামে গ্রামে পৌরাণিক যাত্রাপালা করে বেড়ানো দুই বন্ধুর পেশা। দু-এক মাসের এদিকওদিকে ভীম আর দুর্যোধনের জন্ম। ওনাদের ইচ্ছে যে এই ছেলেরা বড় হয়ে মস্ত বীর ও পালোয়ান হোক। অতএব ওদের দুজনের নাম রাখা হয়েছিল ভীম এবং দুর্যোধন।

চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য সম্পর্কে আমার প্রভূত কৌতূহল থাকলেও জানার সুযোগ পাই নি। তিনি রাজাগজা মানুষ। ক্লাসে তাঁর দর্শন মেলা ভার।

এলিজাবেথ, জেসিকা ও আরও ক’জন মেয়ের সঙ্গে কাল একটি মজার ঘটনা ঘটেছে। সেই কথাটা আজ সকালে চায়ের টেবিলে বসে বসে বলছিলাম। নামগুলো শুনেই আমার তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘এলিজাবেথ, জেসিকা! কি সব নাম বলছ। এরা তোমার ছাত্রী নাকি? এরা কি খ্রিষ্টান?’

আমি বল্লাম, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, এলিজাবেথ হচ্ছে গে।’

আমার কথা শুনে তাঁর চোখ দুটো গোল গোল হয়ে গেল। কপালে বেশ কয়েকটি ভাঁজ। মুখে অস্ফুট প্রশ্ন। বুঝতে পারলাম, মাঝেখানে ‘হচ্ছে’ শব্দটা ঢোকানো ঠিক হয় নি।

‘আরে মেয়েটার নাম, এলিজাবেথ গে। গে হচ্ছে ওর পদবী।’

তাঁর কপালের ভাঁজগুলো মিলিয়ে গেল। চোখের আকারআকৃতি স্বাভাবিক হল। বললে, ‘তাই বল। আমি ভাবছি, মেয়ে কি করে গে হয়! আবার হোমোসেক্সুয়ালও যদি কেউ হয়, এত বুকের পাটা কার? যেখানে অন্যজাতির ছেলের সঙ্গে প্রেম করলে ‘অনার কিলিং’ হয়, সেখানে নিজেকে গে ডিক্লেয়ার করে বুক ফুলিয়ে কে ঘুরে বেড়াচ্ছে!’

.

নামে কি এসে যায়! (ছয়)

তিনি একদিন সন্ধ্যেবেলা ঘোষণা করলেন, ‘আজ থেকে আমার নাম রাহুল গুপ্তা আর আমার বাবার নাম ন্যন (নয়ন) স্যাইনি।’

‘মানে?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম।

‘স্পন্দনটা কেউ ঠিক মত করে বলে না। তাই আমার খুব রাগ হয়। স্পন্দন নামটা মোটে ভাল নয়। তার চেয়ে রাহুল নামটা অনেক ভালো।’

আমি বল্লাম, ‘আচ্ছা তোমার বাবা আসুক তারপর আলোচনা করে দেখি।’ মনে মনে ভাবলাম, একেই বোধ হয় বলে, ইতিহাস ফিরে ফিরে আসে। আমি অবশ্য তখন ওর মত অতটা ছোট নই। বাবাকে প্রায়ই বিরক্ত করতাম আমার এরকম একটা দৈর্ঘ্য-প্রস্থহীন নাম রাখার জন্যে। কেন আমার কি একটা ভাল নাম রাখা যেত না? আমার ক্লাসের মেয়েদের কত সুন্দর সুন্দর নাম। কুসুমিকা, স্বাগতা, মুনমুন, সুদেষ্ণা। আমাদের পাশের বাড়ির দিদি তন্দ্রা। সেখানে আমার নাম? ‘নীতা’। নিদেন পক্ষে অনিতা বা নবনীতাও তো রাখা যেত। বাবা কেবল হাসতেন। শেষে একবার বললেন, ‘এখনও উপায় আছে। মাধ্যমিকের ফর্ম ফিলাপ করার সময় পাল্টে দেব। তুই পছন্দ করে নিস তোর নাম।’ সেটা আর হল না। ওই বয়সে নতুন নাম!

পরে নবনীতা দেবসেন পড়েছি। উনি লিখেছেন ছোট বেলায় নবনীতা নামটা ওনারও পছন্দ ছিল না। নামটার মধ্যে কোনও ছন্দ নেই। একদিন স্কুল যেতে যেতে উনি দেখলেন রাস্তায় একটা দোকানের মাথায় লেখা, ‘বীণাপাণি বিপণি’। দুবার মনে মনে বলতেই মনে হল বাঃ বেশ সুন্দর ছন্দ তো! তারপর বাড়ি ফিরে উনি স্কুলের সব বইয়ে নিজের নাম কেটে লিখে দিলেন, ‘বীণাপাণি বিপণি দেব’। পড়ে বেশ মজা লেগেছিল। মনে হয়েছিল, এ তাহলে নতুন কিছু নয়।

কাল একবার অ্যাকাউন্ট সেকশনে যেতে হয়েছিল। ট্যাক্স বাঁচানোর তাগিদে সেভিংস প্ল্যানের কাগজপত্র জমা দিতে। আমার প্রিমিয়ামগুলোর একটা ছেলের নামে। সেই ব্যাপারটা আমাকে প্রতিবার নিয়ম করে ব্যাখ্যা করে আসতে হয় আর অ্যাকাউন্ট্যান্ট সাহেব প্রতিবার নিয়ম করে ভুলে যান। ফোন করে আমাকে ডেকে পাঠান। গোদের উপর বিষফোঁড়া হল, ছেলের আর মায়ের আবার আলাদা আলাদা পদবী। কাল গিয়ে অপেক্ষা টপেক্ষা না করে কাগজ হাতে গরগর করে শুরু করে দিলাম, ‘এ আমার ছেলে। ওর পদবী আলাদা বলে ভাববার কিছু নেই। ও ওর বাবার পদবী লেখে, আমারটা আলাদা। এই পলিসির আমিই প্রপোজার, তাই আমি ট্যাক্সে বেনিফিট পাই।’

তিনি অবশ্য কিছু শুনছিলেন না। চেয়ার দেখিয়ে আমাকে বললেন, ‘আরাম করে বসুন, দেখছি।’

তারপর নাকের ডগায় চশমা এঁটে পড়তে লাগলেন, ‘স্পান, স্পান্দা, স্পান্দান… ও আপনার মেয়ের নাম?’

একথাটা কাল থেকে চেপে আছি। এখানেই প্রথম বললাম। ওকে বলতে পারছি না। এ শুধু নাম নিয়ে টানাটানি নয়। একথা শুনে যদি সত্যি ওর পৌরুষে ঘা লাগে, তাহলে নির্ঘাত রাহুল গুপ্তা হয়ে যাবে!

আহ্লাদ করে ‘স্পন্দন’ নামটা আমিই দিয়েছিলাম। তখন ভাবি নি যে ও কোনদিন এই নামের জন্যে আমাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে, যেমন আমি করতাম আমার বাবাকে।

2 thoughts on “নামে কি এসে যায়!

  1. Pingback: Content And Contributors – April 2015 | aainanagar

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s