‘হ্যাশট্যাগ ক্রিকেট’

সর্ব‌জয়া ভট্টাচার্য

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংলিশ ডিপার্টমেন্টে এম. ফিল.-এর ছাত্রী

বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসন দেশকে বুঝেছিলেন এক কল্পিত কমিউনিটি হিসেবে। গেরুয়া-শাদা-সবুজ রঙের একটি পতাকা এক দল মানুষকে বলে দেয়- এটা তোমার দেশ। একটা গান পঞ্জাব থেকে দ্রাবিড়, মারাঠা থেকে বঙ্গকে গেঁথে ফেলে একই সুরে, একই কথায়। আর এগারো জন পুরুষ নীল রঙের জামা পরে যখন ক্রিকেট মাঠে খেলতে নামে, তাদের বলা হয় ‘টিম ইন্ডিয়া’।

ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের সাম্প্রতিক দু্নীতির কথা না হয় নাই বললাম, না হয় নাই বললাম কী করে নয়ছয় করা টাকার অঙ্ক কোটির সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছে। এমনিতেও ক্রিকেট গরীব মানুষের খেলা নয়। ফুটবল খেলতে লাগে এক ফালি ফাঁকা জায়গা আর একটা বল, আরেকটু উঁচু স্তরে খেলার জন্য বুট। ক্রিকেট খেলার সরঞ্জাম অনেক। অন্তত ঠিক ভাবে খেলার। অতএব জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক স্তরে যে এই খেলার পেছনে টাকা খরচ হবে, এবং সেই টাকার অঙ্ক যে খুব একটা কম হবে না তা স্বাভাবিক। এবং এই টাকার অনেকটাই যে আসবে বিজ্ঞাপন থেকে তাও বলাই বাহুল্য।

খেলা কেন, কবি তো বলেছেন যে ব্যক্তিগত যা কিছু, তাও বিকিয়ে গেছে অনেক আগেই। তবে সে অন্য গল্প। ক্রিকেট মাঠে ফিরে এলে দেখতে পাব, খেলোয়াড়দের জার্সির ওপর আঁকা আছে নানা বাণিজ্যিক সংস্থার লোগো। বল যখন তীরবেগে ছুটে যায় বাউন্ডারির দিকে, দেখতে পাব মাঠ ঘিরে রেখেছে বিজ্ঞাপন। একেকটি বিজ্ঞাপনে বল লাগলে একেক অঙ্কের টাকা। একজন পেশাদার ক্রিকেটার খেলে যত টাকা রোজগার করেন, তার সমপরিমাণ বা তার থেকেও বেশী টাকা উপার্জন করেন বিজ্ঞাপন থেকে। তবে বিশ্বকাপ এবং বিজ্ঞাপনের সম্বন্ধটা একটু অন্যরকম। তার জন্য আলাদা করে বিজ্ঞাপন তৈরি হয়। অন্যরকম বিজ্ঞাপন। এবছরও তৈরি হয়েছে স্টার নেটওয়ার্কের পক্ষ থেকে।

সাধারণত দেখা যায় বিশ্বকাপের সময় তৈরি বিজ্ঞাপনের নায়ক জনতা। ক্রিকেটকে ঘিরে, বিশ্বকাপকে ঘিরে মানুষের জাতীয়তাবাদী উন্মাদনা এবং উচ্ছ্বাসের প্রতিফলন। এবছর স্টার প্রথম যে বিজ্ঞাপনটি তৈরি করেছে সেটি এইরকম- বিজ্ঞাপনে দেখা যাচ্ছে দেশের মানুষ রাস্তায় নেমে এসে একসঙ্গে হাত ধরে বলছে, ইংরেজিতে বলছে, “We won’t give it back”। অর্থাৎ, আর যাই ফিরিয়ে দিই না কেন, যেমন গালাগাল, যেমন মানসিক চাপ, ওয়ার্ল্ড কাপ কিছুতেই ফেরত দেব না। এই জনতা তরুণ এবং মধ্যবিত্ত। হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করা, ইংরেজিতে কথা বলা নতুন ভারতবর্ষ। বিজ্ঞাপনের শেষে ক্যামেরা দেখে ধোনিকে। একা মাঠে নামছেন। ক্যামেরা তার কাঁধে চাপিয়ে দিয়েছে এই নতুন জনতা এবং নতুন দেশের প্রতিনিধিত্ব করবার দায়িত্ব।

নায়ক মানে অনেক থেকে এক হয়ে যাওয়া। আলাদা হয়ে যাওয়া। এক দিক থেকে দেখতে গেলে, এটাই তো ঠিক। এই ক্রিকেট টিমের কেউই আমার আপনার মত নয় আদপেই। কিন্তু আগে বিজ্ঞাপনগুলির একটা চেষ্টা ছিল তারকাকে জনতার মধ্যে নিয়ে আসার। ব্যবধান কখনই মুছবে না জেনেও শচীনকে পেপসির বিজ্ঞাপনে দেখা যেত গলিতে বাচ্চাদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলতে। গত বিশ্বকাপের বিজ্ঞাপনে দেখা গেছিল সাধারণ মানুষ বিভিন্ন দেশের ক্রিকেটারদের পরামর্শ দিচ্ছেন। এইবারের বিজ্ঞাপনগুলি তো সেদিক থেকে দেখতে গেলে সৎ। এই ব্যবধানকে তারা আরো প্রকট ভাবে দেখিয়েছে। ভারতের প্রতিটি খেলার আগে একটি করে বিজ্ঞাপন বের করছে স্টার। সেখানে ভারতের জনতার, কোনো ধরণের কোনো জনতারই কোনো চিহ্ন দেখতে পাওয়া যায় না। দেখা যায় একজন ভদ্রলোককে। করাচির বাসিন্দা। পাকিস্তানের সমর্থক। ১৯৯২ থেকে যতবার ভারত পাকিস্তানের মোলাকাত হয়েছে বিশ্বকাপে প্রত্যেকবার তিনি এক বাক্স বাজি নিয়ে খেলা দেখতে বসেন। তবে একবারও সেই বাজি ফাটানোর সুযোগ মেলে না। ভারত-পাক ম্যাচ নিয়ে যে ধরণের সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সাধারণ ভাবে মিডিয়া সৃষ্টি করে, যে ভাবে বারবার ম্যাচের বিবরণ দিতে গেলেই চলে আসে যুদ্ধের অনুসঙ্গ, তার তুলনায় বিজ্ঞাপনটিকে বেশ নিরীহ বলা চলে। কিন্তু সাম্প্রদায়িকতা তো শুধুমাত্র যুদ্ধ, দাঙ্গা, ধর্ম বিদ্বেষ নয়। সাম্প্রদায়িক মনোভাব আরো গোপনে, আরো নিঃশব্দে আমাদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এই বিজ্ঞাপন তার একটি উদাহরণ।

তাও কিছুটা স্বস্তি হত, যদি পরবর্তী ম্যাচগুলির জন্য অন্য কারুর মুখ ব্যবহার করা হত। মানে, ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে খেলায় সেই দেশের সমর্থকের, দক্ষিণ আফ্রিকার ক্ষেত্রে তাদের সমর্থকের ইত্যাদি। কিন্তু প্রায় প্রতিটি বিজ্ঞাপনে শুধু এই ভদ্রলোককেই দেখা যায়। একমাত্র দক্ষিণ আফ্রিকার ম্যাচের আগের বিজ্ঞাপনটিতে তিনি নেই। সেখানে এক দল ছেলে মেয়ে ঘরে বসে খেলা দেখছে। হঠাৎ বেল বেজে ওঠে। তাদের মধ্যে একটি ছেলে দরজা খুলে অবাক হয়ে দেখে তার সামনে দক্ষিণ আফ্রিকার দু’জন সমর্থক। বোধহয় সচেতনতা দেখানোর জন্য একজনের চামড়ার রঙ সাদা এবং অন্য জনের কালো। তাদের হাতে বাজির বাক্স। ভারত বিশ্বকাপে কখনো দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারাতে পারেনি এর আগে। এবার সুযোগ।

পাকিস্তানের সেই সমর্থক আবার ফেরত আসেন ভারত-ইউএই ম্যাচের আগের বিজ্ঞাপনে। তিনি আগের বিজ্ঞাপনে যে দু’জন দক্ষিণ আফ্রিকার সমর্থকদের দেখা গেছিল, তাদের সঙ্গে বসে খেলা দেখছেন। আগের বিজ্ঞাপনের মতই ঘন্টা বেজে ওঠে। একটি ছেলে এসে ইউএই’র জার্সি দিয়ে যায়। এর মানে, পাকিস্তানের সমর্থককে পরের ম্যাচে ইউএই-কে সাপোর্ট করতে হবে। চতুর্থ বিজ্ঞাপনের শুরুও এক। আবার সেই ঘন্টার আওয়াজ। আবার দরজার বাইরে সেই ছেলে। এবার ওয়েস্ট ইন্ডিজের জার্সি নিয়ে। কিন্তু শেষটা অন্যরকম। ছেলেটি বলে, ভদ্রলোক যেহেতু পটকা ফাটানোর সুযোগ পাবেন না, তিনি যেন পরের শুক্রবার দোল-ই খেলেন।  পঞ্চম বিজ্ঞাপনে পাকিস্তানের সেই সমর্থক স্টুডিওতে যান। পেছনে শোনা যায় ভারত পরপর চারটি ম্যাচ জিতে গেছে। দেখা যায়, ভদ্রলোক ভারতের জার্সি পরে আছেন। ব্যাখ্যা? ভারত যদি পরের ম্যাচ জেতে তাহলে পাকিস্তানের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা সহজ হবে। শেষ বিজ্ঞাপনে প্রথম বার শোনা যায় পাকিস্তানের জয়ের খবর। বিজ্ঞাপনের নায়কের জার্সির রঙ পাল্টে হয়ে যায় নীল থেকে সবুজ। আর পেছনে বাজতে থাকে সব ক’টি বিজ্ঞাপনের ট্যাগ লাইন। ‘মওকা মওকা’।

প্রশ্ন ১: নায়ক পাকিস্তানের সমর্থক কেন? তিনি ওই পুলের যেকোনো দলের সমর্থক হতেই পারতেন। তবে তা হলে বিজ্ঞাপনের কাটতি যেত কমে। বাজারে সাম্প্রদায়িকতা বিক্রি করা সহজ।

প্রশ্ন ২: পাকিস্তানের বাসিন্দা হলেই কি তার ক্রিকেট দলের সমর্থক হতেই হবে? আমি যদি নিজেকে ভারতীয় বলে মেনেও নিই, তাহলেই কি আমাকে ভারতকে সমর্থন করতে হবে যে কোনো খেলায়? এমনিতে যে হয়ত নাদাল-ভক্ত, সে কি নাদালের সঙ্গে সোমদেব দেব বর্মণের খেলা হলে সমর্থন করে দ্বিতীয় জনকে? করা কি বাধ্যতামুলক? এটা ঘটনা যে ভারতের পুরুষ ক্রিকেট দলের কথা বলার সময় অনেকেই প্রথম পুরুষে কথা বলেন। কারণ সেই কল্পিত কমিউনিটি। কারণ আমরা যারা কিছুই পারি না, কিছু পারব-ও না, আমরা খেলার মাঠে জিতে গেছি। তাই ওদের জয় আমাদের জয়। ওদের হার আমাদের হার। ক্রিকেট ভদ্রলোকের খেলা তো শুধু নামে। আসলে তা যুদ্ধ। আসলে কোহলির ব্যাট যখন বলকে বাউন্ডারি লাইনের ওপারে পাঠায়, তার পেছনে শুধু কোহলির কব্জির জোর নয়, থাকে একশো কোটি মানুষের সমবেত চিৎকার। আর  যেই আমরা এক হয়ে গেলাম, সেই মুহূর্তে আমরা আলাদা করে দিলাম ওই ভদ্রলোককে, ১৯৯২ থেকে যিনি অপেক্ষা করে আছেন বাজি ফাটাবেন বলে।

প্রতিটি বিজ্ঞাপনের শেষে এক পুরুষকন্ঠ দর্শককে জানায়- “এটা বিশ্বকাপ নয়, এ হল ভারত বনাম বিশ্ব।” সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা। প্রথমেই আমরা নিজেদের বিচ্ছিন্ন করেছি। তারপর নিজেদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা তৈরি করেছি। ওই যে একদম প্রথম বিজ্ঞাপনের জনতা, সে নাকি ভারতবর্ষ? এই দেশের কত শতাংশ মানুষ নিজেদের মেলাতে পারবেন এদের সাথে? অথচ, সাধারণ ভাবে বলতে গেলে খেলা, এবং বিশেষ ভাবে বলতে গেলে ক্রিকেটের কিন্তু সেই সুযোগ ছিল। সুযোগ ছিল কেবল কল্পিত নয়, সত্যি সত্যি এক ধরণের জাতীয় পরিচিতি তৈরি করা এক বিশেষ ধরণের রাজনীতির স্বার্থে। ভারতবর্ষে তা ঘটেনি। কিন্তু ঘটেছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজে। ঘটেছিল শ্রীলঙ্কায়।

উত্তর অতলান্তিক মহাসাগর আর ক্যারিবিয়ান বেসিনের একগুচ্ছ দ্বীপ। একসঙ্গে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। এই লেখার মধ্যে ওয়েস্ট ইন্ডিজের দীর্ঘ, ভয়ানক সাম্রাজ্যবাদের অভিজ্ঞতার কথা বলার সুযোগ মিলবে না, তবে ক্রিকেট সম্পর্কে বলতে গেলে কিছুটা ইতিহাস মনে করা দরকার। এই দ্বীপগুলো ছিল প্লান্টেশন কলোনি। আখ চাষের প্রাধান্য ছিল। আর এই চাষের মাধ্যমে মুনাফা টিকিয়ে রাখার জন্য সাম্রাজ্যবাদীদের প্রয়োজন ছিল আরো, আরো বেশী মানুষ যারা বিনা প্রতিবাদে তাদের শ্রম দিয়ে যাবে। এদের তারা ‘কিনে’ এনেছিল আফ্রিকা থেকে।

বিভিন্ন সময়ে ইয়োরোপের বিভিন্ন দেশ তাদের আধিপত্য স্থাপন করেছিল এই দ্বীপপুঞ্জে। নিজেদের নিজেদের অংশ ভাগ করে নিয়েছিল তারা। ইংরেজদের অংশকে যেমন বলা হত ব্রিটিশ ওয়েস্ট ইন্ডিজ। তেমনই ছিল স্প্যানিশ ওয়েস্ট ইন্ডিজ, বা ফ্রেঞ্চ ওয়েস্ট ইন্ডিজ। এর থেকে বোঝাই যাচ্ছে যে প্রতিটি দ্বীপের ঔপনিবেশিক ইতিহাস গড়ে উঠেছিল তাদের নিজস্ব সাম্রাজ্যবাদের অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়েই। ব্রিটিশ শাসিত একটি দ্বীপের সঙ্গে ডাচ শাসিত একটি দ্বীপের পার্থক্য থাকাটাই স্বাভাবিক। এই কথাটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ দেখা যায় যে স্বাধীনতা অর্জন করবার পরেও এদের মধ্যে থেকে যায় নানা ফারাক- সরকারের, ভাষার, সংস্কৃতির। এই বিষয়টি সম্পর্কে আমাদের সচেতন করেছেন মাইকেল হোল্ডিং, ফায়ার ইন ব্যাবিলনে তাঁর ইন্টার্ভিউয়ের একটি অংশে।

এই আলাদা আলাদা দ্বীপগুলোর মধ্যে ব্রিটিশ শাসিত অংশতে সাম্রাজ্যবাদ নিয়ে এলো ক্রিকেট। কিন্তু প্রথম দিকে তা চামড়ার রঙকে যথেষ্ট প্রাধান্য দিয়েছিল। সি এল আর জেমস লিখছেন যে বড়লোকদের ক্লাবগুলোতে কালো চামড়ার মানুষদের প্রবেশাধিকার (খেলোয়াড় হিসেবে) ছিল দুর্লভ। কিছু ক্ষেত্রে দেখা যেত যে মুলাত্তোরা খেলার সুযোগ পাচ্ছেন। কিন্তু কোনো কালো চামড়ার মানুষ কুইন্স পার্ক জাতীয় ক্লাবের সদস্য হচ্ছেন, এমন ঘটনা ছিল বিরল। ওয়েস্ট ইন্ডিজ টেস্ট টিম হিসেবে স্বীকৃত হয় ১৯২৬ সালে। তখন থেকে শুরু করে পাঁচের দশকের শেষ অব্দি ক্যাপ্টেন হতেন শুধুমাত্র শাদা চামড়ার খেলোয়াড়রা। এর পরিবর্তন ঘটল ১৯৬০এ। ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রথম ব্ল্যাক ক্যাপ্টেন হলেন ফ্র্যাঙ্ক ওরেল।

এই সময় থেকেই ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটে একটা পরিবর্তন ঘটতে শুরু করে এবং তা চূড়ান্ত পর্যায় পৌঁছয় সাতের দশকে। এই দশকে ক্লাইভ লয়েডের নেতৃত্বে ওয়েস্ট ইন্ডিজ হয়ে ওঠে টেস্ট ক্রিকেটের সবচেয়ে শক্তিশালী টিম। এই গল্প নিয়েই স্টিভেন রাইলি’র ডক্যুমেন্টারি- ফায়ার ইন ব্যাবিলন। ওয়েস্ট ইন্ডিজের অবস্থা তখন কেমন ছিল? স্বাধীনতা এসে গেছে, কিন্তু দেশের সাধারণ মানুষের উন্নতির কোনো চিহ্ন নেই। ক্ষমতার হস্তান্তর ঘটেছে মাত্র, তার রূপ পাল্টায়নি। এই ছবি ঔপনিবেশিক দেশগুলোর ক্ষেত্রে খুব নতুন নয়। অনেক সময়ই দেখা গেছে যে স্বাধীনতা প্রাপ্তির পর সমাজের কিছু স্তর নিজেদের আখের গোছাতে এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়ে যে নীচু তলার মানুষদের দিকে তাকাবার সময় তারা পায় না। ওয়েস্ট ইন্ডিজেও আমরা এই ইতিহাসেরই পুনরাবৃত্তি ঘটতে দেখি। ঘরে বাইরে বর্ণ বৈষম্য, সদ্য অর্জিত স্বাধীনতা, যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সঙ্কট- এই সমস্ত কিছুর মধ্যে দিয়ে উঠে এসেছিল লয়েডের টিম। লয়েডের জন্ম গায়ানাতে। হোল্ডিং জামাইকান। ভিভিয়ান রিচার্ডসের জন্ম আন্টিগায়। গর্ডন গ্রিনিজ জন্মেছিলেন বার্বেডসে। গায়ানা। জামাইকা। আন্টিগা। বার্বেডস। এদের প্রত্যেকের পতাকার রঙ আলাদা। জাতীয় সঙ্গীত আলাদা। সরকারের গঠন আলাদা। ব্রিটিশ কলোনি হওয়ার আগে কেউ ছিল স্পেনের অধীন, কেউ নেদারল্যান্ডের। এত পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও ক্রিকেট মাঠে এরা এক হয়ে যেতে পেরেছিল। অস্ট্রেলিয়ার দর্শক যখন “লিলি, লিলি, কিল কিল কিল” বলে চিৎকার করছিল, দর্শকাসন থেকে যখন ছুঁড়ে দেওয়া হচ্ছিল রেসিস্ট উক্তি, যখন টোনি গ্রেগ বলেছিলেন, “We intend to make them grovel”, তখন, তার আগে, আর তার পরেও, এদের সবার মনে ছিল যে এক জায়গাতে তারা সবাই এক। তাদের চামড়ার রঙ এক। তাদের চামড়ার রঙ বাকিদের থেকে আলাদা। মনে ছিল দাসত্বের ইতিহাস। মনে ছিল আফ্রিকা। তাই ভিভিয়ান রিচার্ডস ব্যাট করতে নামতেন যখন, তার হাতে থাকত রাস্তাফারিয়ান রঙ। রাস্তাফারি একটি আফ্রিকা-কেন্দ্রিক ধর্ম যা সমস্ত কালো মানুষদের আফ্রিকায় প্রত্যাবর্তনের কথা বলে। ৩এর দশকে জামাইকাতে এই ধর্মের প্রচলন শুরু হয়। ভিভ নিজে ব্যাখ্যা করছেন, লাল- ওদের ঝরানো রক্ত, সোনালি- ওদের নিয়ে যাওয়া সোনা, আর সবুজ- এই দেশের প্রতীক। আর এরা বুঝতে পেরেছিল যে শুধু বাইরের দেশগুলোর কাছে নয়, ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের বাসিন্দাদেরও দেখানো দরকার যে বিভিন্ন দ্বীপ থেকে এসে একদল মানুষ একসঙ্গে খেলতে পারে। জিততে পারে। তাদের ক্রিকেট মাঠের জয় গোটা বিশ্বের কাছে তো বটেই, নিজেদের দেশের মানুষের কাছেও তাদের ক্ষমতার বার্তা পৌঁছে দিতে পেরেছিল।

শ্রীলঙ্কা। ভারত মহাসাগরে একটা ছোট দ্বীপ। আন্দাজ দু’কোটি লোকের বাস। সিনহালা, তামিল, বার্গের, মালয়, মুর- বিভন্ন ধর্মের, বিভিন্ন ভাষার, বিভিন্ন জাতের মানুষ থাকেন এই দ্বীপে। উনিশ শতকে ব্রিটিশরা শ্রীলঙ্কায় তাদের উপনিবেশ স্থাপন করে, যদিও শ্রীলঙ্কার ঔপনিবেশিক ইতিহাসের কাহিনীর সূচনা তার অনেক আগে থেকে। সেই ইতিহাসের কথা এখানে বলা সম্ভব নয়। আমরা বরং এগিয়ে যাই স্বাধীনতা-পরবর্তী শ্রীলঙ্কায়। ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতা লাভের পর থেকে শ্রীলঙ্কার সরকার একের পর এক বৈষম্য-মুলক আইন প্রনয়ণ করে। যেমন, Sinhala Only Act। এই অ্যাক্ট অনুযায়ী একমাত্র সিনহালাকে অফিসিয়াল ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল। উদাহরণ আরো দেওয়া যেতেই পারত, কিন্তু শব্দ সংখ্যা না বাড়িয়ে এটুকু বলে রাখা ভালো যে ১৯৪৮এর পর থেকে নানা বৈষম্য-মূলক আইন তামিল এবং সিনহালাদের মধ্যে দূরত্ব বাড়িয়ে দিচ্ছিল। কাগজে-কলমে সিনহালাদের দেওয়া হচ্ছিল অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধে। দীর্ঘ কাল ধরে ক্ষোভ জমছিল। ৮এর দশকে তা ফেটে পড়ল। শুরু হল গৃহযুদ্ধ। প্রায় পঁচিশ বছর ধরে শ্রীলঙ্কার সরকার এবং এল টি টি ই’র মধ্যে যুদ্ধ জারি ছিল। কখনো কখনো শান্তির আশা দেখা দিয়েই আবার মিলিয়ে গেছিল। প্রাণ হারিয়েছিলেন প্রায় এক লক্ষ মানুষ। ঘর-হারা হয়েছিলেন আরো বেশী। অনেকে ঘর ছেড়ে অন্য দেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। বোমা বিস্ফোরণ, মানব-বোমা, রাস্তায় পরে থাকা লাশ- এই সমস্ত শ্রীলঙ্কার সাধারণ মানুষের জীবনের অংশ হয়ে গেছিল। আর এই যুদ্ধের মাঝখানে, ১৯৯৬ সালে, শ্রীলঙ্কা’র পুরুষ ক্রিকেট টিম প্রথম বিশ্বকাপ জিতেছিল।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের মত শ্রীলঙ্কাতেও ক্রিকেট এসেছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকদের হাত ধরেই। প্রথম দিকে খেলার সুযোগ ছিল সীমিত। কুমার সাঙ্গাকারা তাঁর কাউড্রি মেমোরিয়াল লেকচারে শ্রীলঙ্কায় ক্রিকেটের গোড়াপত্তনের কথা বলেছেন, “Cricket club were formed around the dawn of the 20th century, designed to cater for the school leavers of affluent colleges. The clubs bore communal names like the Sinhala Sports Club (SSC), Tamil Union, Burgher Recreation, and the Moors Club, but if they were considered together they were all uniformly cultured with Anglicized values.”

১৯৮১ সালে শ্রীলঙ্কাকে টেস্ট টিম হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। কিন্তু সাঙ্গাকারা বলছেন যে যদিও এই সময় থেকে ক্রিকেটের একটা পরিবর্তন ঘটতে শুরু করে, সাধারণ মানুষের খেলার সুযোগ বেড়ে যায়, তাও একটা সমস্যা থেকে গেছিল। খেলার মধ্যে এমন কিছু ছিল না যা দেখেই বলে দেওয়া যেত- “এটা শ্রীলঙ্কার ক্রিকেট।” সাঙ্গাকারা বলছেন, “I guess we were in many ways like the early West Indian teams: Calypso cricketers, who played the game as entertainers and lost more often than not albeit gracefully. What we needed at the time was a leader. A cricketer from the masses who had the character, the ability and above all the courage and gall to change a system…”

ওয়েস্ট ইন্ডিজের ছিলেন ক্লাইভ লয়েড। শ্রীলঙ্কার অর্জুন রাণাতুঙ্গা। ১৯৮৮ সালে ক্যাপ্টেন। এই সময়ের শ্রীলঙ্কার টিমের সাথে লয়েডের টিমের মিল অনেক। টিম তৈরি হয়েছিল গোটা দেশ থেকে খুঁজে আনা সেরা খেলোয়াড়দের নিয়ে। এদের মধ্যে অনেক পার্থক্য ছিল। কিন্তু খেলার মধ্যে দিয়ে তারা এক হয়ে গেছিল। এবং দেশের কাছেও তারা হয়ে উঠেছিল ঐক্যের প্রতীক। সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ হল এই যে তারা নিজেদের জাতীয় পরিচিতিকে কাজে লাগিয়েছিল একটা ভাগ হয়ে যাওয়া দেশকে এক করার জন্য। ৯৬ সালে বিশ্বকাপ জয় এই কাজে ভীষণ ভাবে সাহায্য করেছিল।

শেহান করুণাতিলকের উপন্যাস ‘চায়নাম্যান’ এক অবসরপ্রাপ্ত ক্রীড়া সাংবাদিককে নিয়ে, যিনি খোঁজ করছেন শ্রীলঙ্কার এক স্পিন বোলারের- প্রদীপ ম্যাথিউ। এই উপন্যাসের মধ্যে দিয়ে শুধু শ্রীলঙ্কার ক্রিকেট নয়, উঠে আসে শ্রীলঙ্কার সমাজের ছবি। যুদ্ধে, দাঙ্গায়, বোমা আর গুলির আঘাতে ছিন্ন হয়ে যাওয়া একটা দেশ। আর তার মাঝখানেই ক্রিকেট নিয়ে উন্মাদনা। ক্রিকেটকে ঘিরে এক হয়ে যাওয়া। একটা কোথাও জিতে যাওয়া। সাঙ্গাকারা’র লেকচার-ও শেষ হয় এই ঐক্যের কথা দিয়েই, “My responsibility as a Sri Lankan cricketer is to further enrich this beautiful sport, to add to it and enhance it and to leave a richer legacy for other cricketers to follow…I will do that by keeping paramount in my mind my Sri Lankan identity…My loyalty will be to the ordinary Sri Lankan fan…fans of different castes, ethnicities and religions who together celebrate their diversity by uniting for a common national cause. They are my foundation, they are my family…I am Tamil, Sinhalese, Muslim and Burgher. I am a Buddhist, a Hindu, a follower of Islam and Christianity. I am today, and always, proudly Sri Lankan.”

আগেই বলেছি যে ভারতবর্ষেও ক্রিকেটের একটা সুযোগ ছিল এই ধরণের পরিচিতি তৈরি করার। বিভিন্ন ভাবে, বিভিন্ন ভাগে টুকরো হয়ে যাওয়া একটা দেশকে, দেশের মানুষকে, এক জায়গায় আনার। আমার মনে হয়, প্রধানত দু’টি কারণে তা সম্ভব হয়নি। প্রথমত, বেশীর ভাগ দর্শকই খেলোয়াড়দের বসিয়েছেন নায়কের আসনে। নেতার আসনে নয়। কপিল দেবের সঙ্গে লয়েড বা রাণাতুঙ্গার মূল ফারাক হল এই যে প্রথম দু’জন নেতা ছিলেন- শুধু একটা দলের নয়, তাঁরা যে দর্শন থেকে ক্রিকেট খেলেছিলেন, ক্রিকেট যে ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হয়েছিল তাঁদের দেশে, তার ফলে তাঁরা সাধারণ মানুষের কাছেও নেতার মর্যাদা পেয়েছিলেন। কপিল দেব ভারতের ক্রিকেট দর্শকের কাছে কোনোদিন নেতা ছিলেন না। হিরো ছিলেন। স্বাধীনতার পর থেকে ভারতের ক্রিকেট ইতিহাসে কোনো দলকে আলাদা করে মনে করা হয় না। এই সময়ের ক্রিকেটের গল্প নায়কদের নিয়ে- পটৌডি, গাভাস্কার, কপিল দেব, আজহার, শচীন, সৌরভ, ধোনি, কোহলি- একেকটা সময়ের একেকটা নাম। ওয়ার্ল্ড কাপ জেতার পর থেকে স্বাভাবিক ভাবেই ভারতবর্ষে ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। নব্বইয়ের পর থেকে ভারতের অর্থনৈতিক অবস্থার দ্রুত পরিবর্তনের ফলে মধ্যবিত্তের আয় বৃদ্ধি’র একটি ফল ছিল ঘরে ঘরে টিভি’র আগমন। কেবল টিভির দৌলতে চ্যানেল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখা যেত শাহরুখের ছবি এবং শচীনের ব্যাটিং। দু’জনেই নায়ক। এই নায়কতন্ত্রকে আবার ফিরে আসে সেই বিজ্ঞাপনে যেখানে ধোনিকে দেখতে পাই শেষে। বিজ্ঞাপনে কখনোই গোটা টিমটাকে একসাথে দেখা যায় না। দলের থেকে ব্যক্তির ওপর স্থাপন করা হয় বেশী গুরুত্ব। খোলা বাজারের নয়া-উদার অর্থনীতিতে তো এটাই নিয়ম। এটাই রেওয়াজ। রাস্তায় হাঁটার সময়ও কানে হেডফোন, হাতে মোবাইল, চোখের চশমার রঙ কালো, গাড়ির কাঁচের রঙ কালো। ‘আমি আমার মত’। তাই আমি আলাদা। আর তাই আমি একা। তাই দল-টল বলে কিছু বুঝি না। বিশ্বকাপ সেমি ফাইনালে হেরে গেলে সেটা দলের দোষ নয়, কোহলি’র দোষ। কারুর মতে ধোনি’র দোষ। কেউ বা দায়ী করবেন জাদেজা-কে। আর কেউ কেউ আবার, কোনো অজ্ঞাত কারণে, দায়ী করবেন দর্শকাসনে বসা অনুষ্কা শর্মাকে।

কিন্তু এই যে খেলোয়াড়কে নায়কের আসনে বসালাম, তার কারণ কি? এই প্রশ্নের উত্তর এবং কেন ভারতবর্ষে ক্রিকেট একতার বদলে বিভাজন তৈরি করেছে সেই প্রশ্নের উত্তর এক। ভারত এবং ক্রিকেট নিয়ে কথা বলতে গেলেই যে বাক্যটি বারবার শুনতে হয় সেটি হল- ক্রিকেট এই দেশে একটি ধর্ম। দর্শকের পোস্টার শচীনকে শুধু নায়ক নয়, বসায় দেবতার আসনে। জাতীয়তাবাদের সঙ্গে ধর্মের মিশেল বড় সাংঘাতিক বস্তু। পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের ‘শত্রুতা’কে ক্রিকেট কখনো মেটানোর চেষ্টা করেনি, বরং তাকে আরও জোরালো করতে সাহায্য করেছে। ভারতবর্ষের মধ্যে হিন্দু-মুসুলমান বিভাজনকে আরো প্রকট করে তুলেছে। মানুষের মধ্যে সাম্প্রদায়িকতার যে বীজ অনেক সময় সুপ্ত থাকে, তাকে এক ধাক্কায় জাগিয়ে তুলেছে। প্রথমেই পাকিস্তানের সঙ্গে মুসলমানদের এক করে দেওয়া হয়েছে, আর ভারতবর্ষের সঙ্গে হিন্দুদের। আর কে না জানে যে হিন্দু আর মুসলমানরা ‘জাত শত্রু’? ১৯৯৯ সালে ভারত-পাকিস্তান টেস্ট খেলা নিষিদ্ধ করল বিজেপি সরকার। সিদ্ধান্ত হল, একমাত্র আই সি সি স্বীকৃত যে সমস্ত টুর্নামেন্টে বহু দেশ অংশগ্রহণ করে, শুধুমাত্র সেই টুর্নামেন্টেই ভারত-পাকিস্তান পরস্পরের বিরুদ্ধে খেলতে পারে। মনে রাখা দরকার, এই নিষেধাজ্ঞা একমাত্র ক্রিকেটের ক্ষেত্রেই জারি করা হয়েছিল। তৎকালীন ক্রীড়ামন্ত্রী উমা ভারতী বলেছিলেন, “We see cricket not just as a game but as a symbol of a nation’s sentiments.”

শুরুতে যে কথাটা বলেছিলাম সেটা এখন ফিরিয়ে নিচ্ছি। ভারতবর্ষে ক্রিকেট মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে। শারদা উগ্রা জানাচ্ছেন, ১৯৮৭ সালের একটি পোস্টারে কপিল দেব (হিন্দু), আজহার (মুসলমান), রজার বিনি (ক্রিশ্চান) এবং মনিন্দর সিং (শিখ)-এর ছবি’র তলায় লেখা ছিল- “If we can play together, we can live together.” কিন্তু কোনো ভারতীয় ক্রিকেটার আজ অব্দি সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে সরব হননি। কার্গিল যুদ্ধের সময় ক্রিকেটকে নিশ্চয়ই শান্তি’র জন্য, মৈত্রী’র জন্য ব্যবহার করা যেত। সে তো হলই না, উল্টে তাকে ব্যবহার করা হল যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে। যে ধরণের একতা ভারতের মধ্যে কাম্য ছিল, তা পোস্টার থেকে বেরোতে পারল না; আর যে ধরণের একতা তৈরি হয় ধর্মের নামে মানুষ মেরে, যুদ্ধক্ষেত্রে, ক্রিকেটকে ভিত্তি করে সেই ধরণের একতা তৈরি হল। উগ্রা তাঁর প্রবন্ধের শেষে যে কথাটা বলেছেন, ভারতীয় ক্রিকেট বিষয়ে আলোচনায় ইতি টানবার জন্য তা বেশ উপযুক্ত, “In Indian public life, cricket is everything, except just the game it needs to be.”

4 thoughts on “‘হ্যাশট্যাগ ক্রিকেট’

  1. Pingback: Content And Contributors – April 2015 | aainanagar

  2. Ah, yet another article condemning cricket in India, sparing neither its players nor its supporters, although admittedly, a fluent, well-written piece as expected from someone as academically accomplished. It is, perhaps, nothing short of impertinence on my part to even try to write a polemic of a seemingly well thought of article. But frankly I am quite tired not only of the patronizing attitude of the people academically well endowed but also of using Cricket as a mean to achieve so (I must confess, being so mundane and obtuse as I am, it is entirely possible that I ‘didn’t quite get it’).

    At first glance, your article does have the appearance of a logical, eloquent one adorned with appropriate analogies, quotes from experts of the field and befitting references. But once we scrape of the luster, separate the sheen from the substance what remains is best described by Vinny Gambini from My Cousin Vinny “ He’s going to show you the bricks with straight sides and the right shape. But when you look at the bricks from the right angle, they’re as thin as this playing card. His whole case is an illusion, a magic trick.” I am paraphrasing of course, but it adequately puts the point across.

    The article starts with mocking the concept of team India then moves on to proving claiming how just by playing Cricket one apparently alienates themselves from the poor as according to you “ক্রিকেট গরীব মানুষের খেলা নয়” I am sorry, but such ‘blanket’ statement makes me wonder whether you are really qualified to even discuss cricket. So many successful cricketers have come from not-so-well-to-do families that making such a cliched statement only exposes your ignorance of cricket. Have you heard of the small incident termed “The Bodyline Series”? The’ main man’ of English captain Douglas Jardine to employ this ‘strategy’ was Harold Larwood. He grew up with four brothers in a family provided for by his coal miner father. He had to start working for a living at the age of 13! Yet he turned out to be the bowler to destroy Sir Donald Bradman, arguably the best batsman the world has ever seen. What’s that you say? “This was possible in early phases of cricket without all the completion to take a share of the money from the sponsors” (which, incidentally, according to you is virtually same as selling your soul to the Devil!). Let us look at the current crop of Indian cricketers, Umesh Yadav, again son of a coal miner. Hero no but an indispensable part of team India’s exquisite pace bowling attack in the past world cup. Pathan brothers, Irfan only bowler in the history of the game to take a hat trick in the first over of a test match and Yousuf fastest fifty in IPL. Ravindra Jadeja, Mohammad, Shami, Manoj Tiwary, the list could go on but I have made my point.

    You also pose two distinct questions and provide answers to them to dissect out the intent behind the design of some ‘evil’ advertisements that apparently disseminated religious discord. If we are to go by your logic, those ads represent a Pakistani supporter just because it’s very easy to sell anything in the free market if you ’tickle’ the religious sentiment of the ‘customers’. Now where in the ads was it depicted that he was a Muslim? If his religion wasn’t overtly displayed where does the issue of religious enmity come from so stop trying to make it such (again it may be my ineptitude to fully comprehend the sinister motive behind the ads)? As for the second one, you try to prove that citizens of one country need not necessarily support their own country. Whether that conclusion holds water is beyond the scope of this writing. However, the analogies you provide do give rise to the suspicion that you do not fully grasp the concept of ‘argument from analogy because the ones you use are prime examples of ‘false analogy’. Lets inspect your statement ‘এমনিতে যে হয়ত নাদাল-ভক্ত, সে কি নাদালের সঙ্গে সোমদেব দেব বর্মণের খেলা হলে সমর্থন করে দ্বিতীয় জনকে? ‘ a little more closely. You are comparing tennis to cricket! Only three international tennis tournaments (and Olympics of course) are played on country-by-country basis. So in realty, in almost all cases when you are supporting Nadal or Federar for that matter you are rooting for that person and that person and not Spain or Switzerland. In cricket, even with your limited knowledge, I hope you can guess the situation is somewhat different. Also it appears, to you India-Spain relationship are analogous to India-Pakistan relationship. (I didn’t want to use this word but) Seriously!! If you really don’t understand that history between two countries dictate their current outlook towards each other, just ask an Ukrainian about Russia, or an Argentine about England, or a Palestine about Israel.

    What you say about the West Indian and Sri Lankan cricket team is true enough however, without going into details, lets just say your argument and supporting evidence are replete with large, gaping holes. Also as far as I know none of the Sri Lankan spoke up against the Tamil genocide under the rule of Mahendra Rajapakshe. I would of course love to be proved wrong at least this once. So please provide any information you have on this topic. The other point, if there is really a point, is, as they say, ‘full of contradiction’. It seems you are already prejudiced against the Indian cricket team. You are ‘hell bent’ to prove that nothing good came of or from them. Cricket apparently played a pivotal part in aggravating the enmity between India and Pakistan. Of course, and the current state of affair had nothing to do with the several wars raged between them or the constant tension between them in the issue of Kashmir or the fact that Pakistan has provided safe haven for one of India’s most wanted terrorists. You say no cricketer has ever done to strengthen the religious unity in India and you provide the evidence they have, albeit it’s not enough according to you. I also don’t see why cricketers should bear additional responsibility to any other crowd puller of India to do the same. In an ideal world, Cricket or any other sports, could theoretically be used to pacify growing tension between two countries. But unfortunately we do not have a perfect world. Playing Cricket would do nothing to resolve the issues the politicians have to stay at the helm of power so would be less than helpful in stopping a war such as the one Kargil. I cannot and do not speak for all Indians but I do speak for those I have personally witnessed to have ben touched by cricket. Yes we belong to that group of who haven’t achieved anything significant in their life, who just work everyday relentlessly so that at least the dreams of their children will become a reality. To us, when team India wins a match we feel like we have achieved something special. To us Cricket has been the best ant-depressant.

    As I said, I am academically crippled. So I haven’t read any of the serious and poignant books you refer. And quite unsurprisingly, my favourite series is Harry Potter. However, there is a statement made by the character of Ginny Weasly which I think captures how I feel about your argument rather well. She said, and again I am paraphrasing, “ Stop acting like you understand Quidditch, Hermione”. You should also listen to her advice and stop using Cricket or any other popular subject, to prove that you not only do not share the mentality of the masses but also your thoughts and ideas are above and beyond of what we, the lesser people, can even dream of because you know #it’snotcricket.

    • Dear friend, thanks for stopping by and thanks for your comment. What is the point of publishing articles if there are no questions raised! 🙂 . The books (and movie) that Sarbajaya mentions here are not that particularly serious or poignant though. Since you are a cricket fan, you would surely find Fire of Babylon and Beyond the Boundary quite enjoyable.

      We do believe that cricket, or for that matter anything at all, is not just what five or a hundred or a million people perceive it to be. Every single action or object has its manifold politics. We respect yours. We are grateful to you for the time and energy that you spent to read and to reciprocate.

      But enough of us. We are happy to convey what Sarbajya Bhattacharya, the author of this article would like to say in order to take this discussion forward –

      “1. It was not my intention to claim that playing cricket alienates one from the poor and whether or not it actually does so is another story to be argued somewhere else. What I intended to argue was the fact that the sport is expensive. It might not be unique in this aspect, but it is expensive. This is not to say that people from economically backward groups do not or cannot play cricket. They can. They have. But it is also an undeniable fact that while many sports persons in India struggle due to the lack of funds, cricketers rake in more money than these players can imagine. And it is also a reality that this money comes from commercials. I have tried, therefore, to speak out against commercialization, against the commodification of players, and a sport. I had hoped to make this quite clear.

      2. Nowhere in the article have I stated that the man in the commercials is a Muslim. What I have stated is what the commercial itself tells the viewer- that he lives in Karachi, and supports Pakistan. I have also not written anything about tickling the ‘religious’ sentiments of the consumer in the beginning, but have spoken of communalism which is not restricted to religion alone, but may be extended to show differences based on ethnicity. Overall, I have tried to criticise the way in which communalism, in some cases, is often narrowed down to a Hindu-Muslim binary, how India and Pakistan become synonymous with two different religions, and how a certain kind of politics encourages such binary formations and tries to reap benefits from creating divides. In the process, I have tried to show the way in which the mixing of religion with nationalism and sports in harmful and dangerous.

      3. I do not need to prove that as citizens of India, for instance, we have to support India at every stage. My point is that as individuals, we should have the choice to make a choice. I should not be branded a ‘traitor’ because I do not support the India’s men’s cricket team at the world stage. My aim was to establish this point, not worry about comparing tennis and cricket.

      4. About Sri Lankan cricket, I have tried to show that the team could stick together with people from different identities in spite of a civil war. I have not claimed that all or any Sri Lankan cricketer has made sensitive remarks about any period of Sri Lanka’s violent history, but that their cricket spoke for itself at a given period of time. To argue that we cannot criticise Indian cricketers for not speaking up against religious intolerance or communal violence because Sri Lankan cricketers did not take a stand in their own country seems like a weak argument.

      5. I have nothing against those who choose to support India in the arena of world cricket. I have nothing against the teams. But I am against jingoism, fanaticism, the language of violence and hate that surrounds cricket fandom in India. I am against equating cricket with religion. I am against equating anything with religion. I am against public personalities shrugging off responsibilities, forgetting that as public figures they have the power to influence the minds of the masses.

      6. Cricket is such a big deal in this country that everyone has an opinion. I have only tried to add my own understanding of cricket to a long tradition of formal and informal discussions about cricket in India. This article is a reflection of my opinion and nothing else.

      7. I too am a fan of the Harry Potter series.”

      – Sarbajaya

  3. 1. I believe you when you say your intention was just to say that cricket is expensive. In your original article, however, your intention was hard to visualize (I agree with the sorry state of my literature skill, I may not have understood your refined analysis completely). You even mention how football, in comparison, requires much less (financial) resources, presumably to prove Cricket is not a sport for the underprivileged though it was not your intention. Perhaps there may not have been such a huge gap between your intention and your writing had you not tried so hard to stick to the ideologies prevalent among your peers. Ideologies that would have us believe that every sport
    You also complain how cricketers ‘rake in money” while there is a dearth of funding in other sports. It is true. Is it fair? Of course not! But why should it be? All sports would be treated equally probably in a ‘communist’ (?) world (never really studied political systems, may be some other ‘ist’!). Unfortunately (or fortunately) we do not live in such a world order. Cricket had to work hard to increase its value in this free market. So why should it not reap the rewards now? While Cricket altered its strategies to market itself better, other sports remain emerged in petty politics and age-old policies. One good example of how the mindset changes everything is the Indian Super League that brought about such enthusiasm rarely seen in recent years. Indeed, looking at the state of Football in India right now it’s hard to believe we were once a dominant force in Asian football. I am sure you would criticize ISL too citing how it is also highly commercialized. But you can’t have you cake and eat it too! You either prepare yourself so that who have the money are willing to spend it for you (of course they benefit from it too) or you continue to “struggle due to the lack of funds”.

    2. Of course you haven’t stated that the man is Muslim, ‘directly’. But according to you those series of advertisements are actually an embodiment of the idea that narrows ‘down to a Hindu-Muslim binary……… two different religions’. As far I can see, you haven’t provided any tangible proof how the ads imply that. It’s you who is inferring! In the episode “Chef Goes Nanners” of the series South Park, it is shown how even a flag depicting four white figures hanging a black one on a gallows is not perceived as a racial issue by the children before it is pointed out to them by the more ‘sensitive’ adults! I don’t know about the whole Muslim community of India but I have a few Muslim friends, Indian and otherwise, none of them see these ads how you depict them to be. To them, they are just ads exaggerating the completion and sentiment between two competing nations. Cricket world cup is a competition after all! And as for the other team being Pakistan only, it may be because of the history the two countries share, which however unfortunate would always be there. But it may also be for the simple cricketing reason that Pakistan never won a match against India in the world cup just as India failed to beat South Africa, which was indeed the other team in the ads!

    3. Few things,
    You indeed have the choice to support anyone in any circumstance be it competitive sport or war. But utilizing that same freedom, rest of us (or even any or one of us) has the right to brand you traitor or whatever they wish to as long as they are within the boundaries of law. It’s foolish and arrogant to think you can exercise your fundamental right to freedom while others can’t.

    At the same time, not supporting India and supporting Pakistan are not the same thing. Supporting Pakistan is considered blasphemy in India, just not supporting India is not. And as I said in previous writing, it’s not that difficult to find pairs of countries where such feeing exists mutually. Although you were not explicit about supporting Pakistan, just wanted to make that clear anyway.

    Again as I said previously, “Whether that conclusion holds water is beyond the scope of this writing. However, the analogies you provide do give rise to the suspicion that you do not fully grasp the concept of ‘argument from analogy because the ones you use are prime examples of ‘false analogy’.”
    IF IT WAS NOT CLEAR ENOUGH LAST TIME. NO MATTER WHAT YOU WANTED TO PROVE, THE ARGUMENT YOU USED TO PROVE YOUR POINT WAS WEAK, UNNECESSARY AND FAR FETCHED.

    4. If you don’t think, that cricket in India has not played its part in unifying India, may be you need to study a little more about the history of Indian Cricket. The essays of Ramachandra Guha would not be a bad place to start.
    Of course it’s a weak argument and not one I was trying to make. I was trying to point out Sri Lankan cricketers may not be as different from their Indian counter parts as you try to prove them to be. However, I really would have loved to be proven wrong about how no Sri Lankan cricketer spoke out against the Tamil genocide.

    5. Mostly I agree, except I don’t see why public personates should bear more responsibility to make the society better than any one else. Just because they have the power to do so doesn’t mean they should or they would. In a perfect, ideal world may be, but not the one we live in.

    6. As was my reply.

    7. They are good, right!

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s