জনযুদ্ধ: প্রাক্তন কর্মীর কথোপকথন

ত্রিদিব সেনগুপ্ত

“এক-দশক-দেরি-করে-ফেলার-নোটস: নিচের তারিখেই দেখা যাচ্ছে, এটা নেওয়া হয়েছিল ৫ মে, ২০০৬। আর আজ এই নোটস যোগ করার তারিখ ১৩ এপ্রিল, ২০১৬। মানে, ঠিক এক দশক। কথোপকথনটা শেষ হওয়ার পর পড়তে গিয়ে, তখনই এটা ছাপা হলে কেউ কেউ বিপদে পড়ার একটা সম্ভাবনা মাথায় এসেছিল। তারপর ঘটেছে বহু কিছু, গোটা জনযুদ্ধ রাজনীতিটাই বিস্মৃত হয়ে গিয়েছে জনমনে। আজ এটা ইতিহাস, যে ইতিহাসের কোনও সূত্রই আর জ্যান্ত নেই। ছাপার এই প্রকৃষ্ট সময় আসতে আসতে পেরিয়ে গেল একটা দশক।” – ত্রিদিব

তিমির,যার নাম অবশ্যই তিমির নয়, আমার কাছে যারা মাঝে মাঝে আসে, তাদের মতই আর এক জন, কিন্তু তাদের অনেকের থেকেই অনেকটা আলাদা। মাত্র কিছুদিন আগেও ওকে জীবনমরণের সংশয় নিয়ে পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছিল, জনযুদ্ধ রাজনীতি থেকে বসে যাওয়ার আগে ও পরে। প্রথম দিকে ও নিজেও কিছু বলতে চাইত না, আমিও কিছু জানতে চাইনি। নিজের নিরাপত্তার খাতিরেও। শুধু ওর ওই পরিচিতিটা জানতাম, যে নামে ওকে জেনেছিল বা ডেকেছিল আনন্দবাজার বা টাইমস এর সাংবাদিকরা। তারপর, গত কিছু দিন ধরে, বারবার আমার মনে হত, কিছু কথা বলে নিলে, টেপ করে নিলে বেশ হত। সেটাকে খুব ভালো করে পড়াও যেত। তখন বাদ সাধছিল একটা টেপ রেকর্ডারের অভাব, আর, সেই টাকা যোগাড় হওয়ার পর, বাদ সাধছিল যে এনজিও-য় ও এখন কাজ করে সেখান থেকে ওর ছুটি পাওয়া, আর আমার নিজের ব্যস্ততা। গত পাঁচই মে, পশ্চিম বাংলার নির্বাচন তখন চলছে, একদিন রাত নটা নাগাদ আমরা বসলাম। মধ্যে মধ্যে খাওয়ার, বাথরুম যাওয়ার, ছাদে গিয়ে দুচার মিনিট দাঁড়িয়ে আসার ব্রেক বাদ দিয়ে একটানা দুশ ষাট মিনিট, চার ঘন্টা কুড়ি মিনিট, নিট, আমরা কথা বলেছিলাম। সেই অর্থে ধারাবাহিকতাটা ছিল, কারণ, আমরা আগের কথার শেষটুকু শুনে নিয়েই নতুন করে শুরু করছিলাম। বহু জায়গায় ওর বলাটা ধরে রাখাটাই নয়, একটা ইনফর্মাল আড্ডার চরিত্রও পেয়ে যাচ্ছিল, অতক্ষণ ধরে কথা বলে চললে যা হয়। যখন শেষ হল, তখন প্রায় শেষ রাত। আমার ইচ্ছে আছে, আবারও একবার বসার। বেশ কিছু দিন পরে, এই সবগুলো খুব ভালো করে পড়ে নেওয়ার পরে। ওর অভিজ্ঞতাটাকে জেরা করার। তিমিরের কথা বলার ভঙ্গীটা মোটেও ভালো নয়, অকারণে গুচ্ছ গুচ্ছ ‘আরকি’, ‘অর্থাত’ এবং ‘সেটা হচ্ছে’ বলে, প্রায়ই শব্দ বা বাক্য শেষ করেনা, কোথায় থামছে বোঝা যায় না ঠিক, কথা বলতে গিয়ে ভুল করে, একটা কর্তা দিয়ে বাক্য শুরু করে, তিন শব্দ পরেই, অন্য কর্তা দিয়ে বাক্য শেষ করে। প্রশ্ন দিয়ে বাক্য শুরু হয়ে শেষ হয় বিবৃতি দিয়ে। একই কথা এক এক জায়গায় এক এক উচ্চারণে, এক এক রকমে বলা, এসব সমস্যা তো ছেড়েই দিলাম। কথা শোনার সময় সমস্যা হয় না, কিন্তু লেখাটা দুষ্কর। তাও, যতটা পারা যায় আমি হুবহু রাখার চেষ্টাই করেছি। যেখানে যেমন উচ্চারণ সেরকমই রেখেছি। ‘আসলাম’, ‘আসল’ ইত্যাদি কিছু শব্দ ছাড়া। ক্যাসেটগুলো নষ্ট করে ফেলার কথা হয়েছিল আগেই, লিখে ফেলা মাত্রই, কড়ার হয়েছিল যে, আমি ছাড়া কেউ কানে শুনতে পাবে না, তাই যতটা পারা যায় সেই রিয়ালিজম নামক প্রহেলিকাটা ধরে রাখার চেষ্টা করেছি। কিছু এমন ভুল, যাকে ভুল বলে বুঝে নেওয়া যায়, সহজেই, ইচ্ছে করেই রেখে গেছি। প্যারাগ্রাফ করে কেউ কথা বলে না, প্যারাগ্রাফগুলো আমারই আমদানি। একটা হালকা ছায়া রাখতে চেয়েছি সুরের, লয়ের, আবেগের বদলের। যতিচিহ্নও তাই। বলা গদ্য আর লেখায় একটা তফাত তো থাকেই, যতিচিহ্নগুলো দিয়ে আমার বোঝা অর্থের সবচেয়ে কাছাকাছি আনার চেষ্টা করেছি। একটা জিনিস জানিয়ে রাখি, ‘অর্থাৎ’ আমি ‘অর্থাত’ করে লিখেছি, কারণ, ওপনঅফিস বাংলায়, সোলেমান লিপি ফন্টে, লাইনশেষে ‘ৎ’-র একটা সমস্যা আছে। ‘য়্যা’ বানানও সেই কারণে, এতে, ‘অ’-এ ‘য’ ফলা দেওয়া যায়না, এখনো।

শনিবার, পাঁচই মে, দুহাজার ছয়, রাত নটা

ত্রিদিব।। তোর সাথে আমার যে আলোচনাটা এখন হবে, এক অর্থে সেটা কখনোই কোনো সাক্ষাত্কার নয়। কারণ, সাক্ষাত্কার মানে, একটা লোকের বলা, আর একটা লোক সেটা লিপিবদ্ধ করছে। কিন্তু এক্ষেত্রে, আমার নিজের মধ্যেও তো একটা খোঁজা আছে, আমার নিজের পোজিশন আছে। যে লোকটা সাক্ষাত্কার নেয়, আমরা ধরে নিই, সে পলিটিকালি নিউট্রাল। এখানে তা নয়। তার পোজিশন আছে। মার্ক্সবাদী রাজনীতির প্রতি তার আগ্রহ এবং আবেগ আছে, নানা কিছুতে তার আপত্তি সহ। আবার, একই সঙ্গে, পার্সোনাল ভায়োলেন্সের প্লেনটা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারে না। যে রকম ‘ভালো আমেরিকা, কালো আমেরিকা’-য় লিখেছিলাম, যে, যে-কোনো এই ধরনের ভায়োলেন্স যা শেষ অব্দি যেতে পারে না, তা, আসলে, পাওয়ারকে লেজিটিমাইজ করে। নাইন বাই ইলেভেন আমেরিকাকে ইরাক আক্রমণের লাইসেন্সটা দিয়ে দিয়েছিল। এনিওয়ে। অর্থাত, তোর আর আমার মধ্যে পরিষ্কার একটা পোজিশনাল ডিফারেন্স আছে। আমি তোর সম্পর্কে শুধু এটুকুই জানি যে তোর একটা পিডব্লুজি রাজনীতির অতীত আছে। এবার, আমরা দুজনে, এই জায়গা থেকে: আমি তোর প্রক্রিয়াটাকে বোঝার চেষ্টা করব।

এবার, আমার ক্ষেত্রে প্রথম যে প্রশ্নটা হবে, একদম শুরু থেকে শুরু করা যাক, তুই কী ভাবে এই রাজনীতির সঙ্গে ইনভলভড হলি, সেটা, ঠিক যা যা কথা তোর মাথায় আসবে, এমনকি যা খুব একটা সম্পর্কিত মনে হবে না, এই সবটাই তুই বলবি। কারণ, গোটাটার থেকেই আমরা পরবর্তী আলোচনাতে যেতে পারব। এবার শুরু কর।

তিমির।। পিডব্লুজি প্রসঙ্গটা তো অনেক পরের। সেটা তো অনেক পরে এসেছে। তার আগে তো, যে রাজনৈতিক জীবন, অনেক আগে শুরু হয়, যেটা প্রায় না-বোঝার বয়েস থেকেই আরকি। একটা রাজনৈতিক পরিবারেই জন্মগ্রহণ করেছি। সেক্ষেত্রে, তার রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা, সবার মধ্যেই ছিল। সেখানে বিভিন্ন ধরনের লোক ছিল। কংগ্রেসের ‌‌– ইনডিপেন্ডেন্সের আগে কংগ্রেস করেছেন এরকম লোক আছে, আমার আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে, মানে, আমার ক্লোজ আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে, আমার নিজের দাদু আইএনএ-তে ছিল। ধরা পড়েছিল। বাবা কমিউনিস্ট পার্টির, অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির মেম্বার। পরবর্তীকালে সিপিএম করেছে। আমি যখন জন্মেছি তখন তিনি সিপিএম-ই।

আর ছোটবেলায় পভার্টি দেখেছি। পভার্টিটা আমি ফিল করি না এরকম ব্যাপারটা তো নয়। গরিব ব্যাপারটা আমরা খুব ভালো ভাবেই বুঝেছি। আমাদের জীবনেও ছিল। আর তাছাড়া আমাদের আশেপাশেও ছিল। মূলত কলোনি ছিল। কলোনিগুলোতে দারিদ্র ছিল ভীষণ রকমের। আকাঙ্খা ছিল প্রচুর, মানুষের। কিন্তু সেগুলো ফুলফিল করার মত কিছুই ছিল না। যে বন্ধুবান্ধব ছিল আমার, ছোটবেলার বন্ধুরা, সেই প্রাইমারি ইস্কুলের, এক দু-জন ছাড়া কেউ পয়সাওয়ালা ছিল না। খুবই গরিব ছিল, বেশির ভাগই। এগুলো যে কোনোটাই ভালো নয়, মানে এই গরিবিটা, তা ছোটবেলা থেকেই মনে হয়েছিল, এবং, পলিটিকাল টিচিংও বাড়িতে সব সময়ই থাকত আরকি। একটা বদল ঘটার দরকার আছে, এর জন্য কমিউনিস্ট পার্টি করার দরকার আছে, এই সমস্ত গল্প বাবার কাছ থেকেও শুনেছি। তো, সেই জায়গা থেকে, কমিউনিস্ট পার্টি বলতে সেই সময় তো সিপিএমের ধারণা, সিপিআইয়ের ধারণাও ছিল, বাবা মোর-অর-লেস মানে, কিছুটা হলেও, থিওরেটিকাল লোক ছিলেন। থিওরিটা কিছুটা হলেও বুঝতেন। এবং সেই থিওরি দিয়েই গোটাটা বোঝানোরও দায়িত্ব নিতেন। কোনোদিন সেই রকম ভাবে কেরিয়ারিস্ট করার কথা ভাবেও নি। তার জন্যে আমরা তিন ভাই বোন, তিন ভাই বোনের প্রত্যেকেই কোনো না কোনো ভাবে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছি। সমাজ বদলটা করা দরকার আছে, এই জায়গা থেকে। তো আমরা সিপিএম করেছি, কিন্তু নিজস্বতার প্রশ্নটা অনেককিছু ছিল। যেমন, একটা সময় শুনতাম, কংগ্রেস পার্টিটা কেউ করে না, খারাপ লোক। আবার দাদু কংগ্রেস করত — কন্ট্রাডিকশন থাকত। একদিন একটা ভোটের মিছিল যাচ্ছে, দেখি প্রচুর কংগ্রেসি লোক সেখানে, প্রচুর গরিব মানুষও আছে। তা নানা রকম কনফিউশানও মনের মধ্যে প্রথম দিকে থাকত।

তো খুব ছোটবেলায় এসএফআই করা শুরু করেছিলাম, ছোটবেলায় বলতে তখন নাইনে পড়ি। কিন্তু ইলেভেন গিয়েই এসএফআইটা আমি ছেড়ে দিই। ছেড়ে দিই বলতে, আমাদের সেই সময়ে, ইলেভেন টুয়েলভে যখন, টুয়েলভে পড়ি, তখন সিপিএমের মধ্যে পাওয়ার এনজয় করবার বিষয়টা চলে এসেছে। খুব স্বাভাবিক ভাবেই, সেই পাওয়ারের ভাগ নিয়ে লড়াইও চলে এসেছে। পাওয়ারের ভাগ নিয়ে লড়াইয়ের প্রশ্নে সেখানে লোকাল নাগরিক কমিটি তৈরি হয়েছিল। তারা খুব বিপ্লবী বিপ্লবী কথাবার্তা বলতে শুরু করেছিল, যেটা ভীষণ য়্যাট্রাক্টিভ, ওই মনে, আমার কাছে, আমার ওই মনটার কাছে ছিল। তার জন্যে আমরা নাগরিক কমিটির সঙ্গে টাচে চলে গেছিলাম। কিন্তু প্রচণ্ড কনফিউশান ছিল। নানা রকম। তারপরে, এদের নেতাদের সঙ্গে মিটিং করতে গিয়ে, কোনো রকম গপ্পোই নেই সেখানে, কোনো বিপ্লবের ধরাছোঁওয়াও নেই। এবং পরিষ্কার ভাবে, আমি যতটুকু তখন পড়তে শিখেছি আরকি, মানে বাবার হাত ধরেই আরকি, ছোট ছোট মার্ক্সবাদী রচনা যেগুলো, সেখানে রাজনৈতিক জায়গাটাই যেহেতু প্রধান বিষয়, এবং আলাদা একটা সংগঠন তৈরি হচ্ছে, কিন্তু কোনো রাজনৈতিক দিক নেই তার। তো সেইগুলো নিয়ে আমাদের ভীষণ কনফিউশান ছিল।

তা সেই সময়ের যে সার্চিং, সেই সময়ের যে বয়েস, সেই বয়েসে তো খুব দ্রুতই চারিদিক থেকে অনেক হাওয়া আসতেই থাকে, সেরকমই একটা জায়গা থেকে নকশালাইট পলিটিক্স সম্পর্কে আমি জানতে শুরু করি। তখনো ছোটই আরকি, তখনো রাজনীতিতে নবীনই। সেটা হচ্ছে সিপিআইএমএল পিসিসি, এবং পরবর্তী কালে জেনেছিলাম, একটা কালচারাল টিমের সঙ্গে আমি যুক্ত ছিলাম, সেটা আসলে এমসিসি-র সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু তাদের যে রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা, তারা এমন একটা জায়গায় ছিল, আমি সেই মুহূর্তে ওই রকম পোজিশনে ছিলাম না যে, ভোট বয়কট করতে হবে, সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু থেকেই তৈরি করতে হবে, এই রকম পোজিশন আমার ছিলনা।

ত্রিদিব।। সাংস্কৃতিক গ্রুপ মানে? কী? গান টান নাটক এইসব?

তিমির।। অঙ্কুর। হ্যাঁ, অঙ্কুর। তো, সিপিআইএমএল পিসিসি বলে একটি, মানে সন্তোষ রাণা তার নেতা ছিলেন, সন্তোষ রাণা একবার ১৯৭৭ সালে জিতেও ছিলেন, তো ১৯৭৭ সালে জেতার পর থেকে, তারপর যে ডিক্রিজিং অবস্থা পিসিসির, তার মধ্যেও দেখলাম, কমিউনিস্ট পার্টির প্রত্যেকবারের অভিজ্ঞতাই তাই আমার, সেখানে আমি দেখেছি, ঢুকলাম তার মধ্যে, তাত্ত্বিক কচকচানি অনেক বেশি ছিল, ইন্টেলেকচুয়াল স্যাটিসফেকশন ওতে বেশি মিলত, তার সঙ্গে ওখানে আমি একটা ছাত্র সংগঠনের সঙ্গেও যুক্ত হই, তার নাম হচ্ছে আইএসএ। এবং এই আইএসএ-তেই আমি বড় হই আরকি। মানে রাজনীতিতে বড় হই এই আইএসএ-র মধ্যেই। আইএসএ থেকে সিপিআইএমএল পিসিসি, পার্টিমেম্বার হওয়া, এরিয়া কমিটির মেম্বার হওয়া, রিজিওনাল কমিটির কনফারেন্সে য়্যাটেন্ড করা।

তো, এই ধরনের ব্যাপারগুলো, কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যে একাত্মতা, সেই একাত্মতাটা অনেক বেশি করে গড়ে ওঠে সিপিআইএমএল পিসিসির মধ্যে। কিন্তু সিপিআইএমএল পিসিসির মধ্যে যে প্রশ্নগুলো গড়ে উঠতে থাকে সেটা অনেকটাই মার্ক্সবাদী ওরিয়েন্টেশনে। যে তাদের যে বক্তব্য ছিল, ক্লাস কাস্ট সমান, এগুলো। তারা যে ভোটে অংশগ্রহণ করত, তার যে কী রেজাল্ট, এই সব। তারপরে, মণ্ডল কমিশন এসেছিল সেই সময়ে, মণ্ডল কমিশনের মুভমেন্টে এসসি-র যে সংরক্ষণের প্রশ্নটা এল, সেই সংরক্ষণের প্রশ্নে আমরা প্রচুর প্রোপাগান্ডা করলাম, ঝাড়খণ্ড মুভমেন্টের সাপোর্টে আমরা প্রচুর করলাম, কিন্তু, সমস্ত ক্ষেত্রেই দেখলাম যে, আমরা একটা লেজুড়বৃত্তিই করছি। লেজ। অর্থাত, নিজস্ব ইনিশিয়েটিভ, নিজের যে…

ত্রিদিব।। কার লেজুড়বৃত্তি?

তিমির।। কখনো ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চার, কখনো জনতা পার্টির…

ত্রিদিব।। ও, মূল রাজনৈতিক আন্দোলনের?

তিমির।। মূল রাজনৈতিক আন্দোলনের কখনোই সামনের সারিতে আমরা নই এই ইশুগুলোতে। অর্থাত, এমন কিছু ইশুর পিছনে তখন আমরা দৌড়চ্ছি, যে ইশুগুলো আসলে বুর্জোয়া যে পার্টি আমরা মনে করি, সেই পার্টিগুলোরই ইশু। তারই পার্ট আমরা, আমরা মুভ করছি, এবং রীতিমত তাদের লেজ। অর্থাত, মানুষ যাচ্ছে তাদের পিছনে, আমরা তাদের পিছনে। ঠিক আছে? মনে করছি যে আমরা মানুষের সাথে আছি। আমাদের নিজস্ব অস্তিত্ত্ব নিয়ে, এরকম ভাবে কিছু গড়ে উঠছে না। তো, তখন নকশালবাড়ি সম্পর্কে জানাবোঝাও আমাদের যে খুব যথেষ্ট ছিল তা নয়। পিসিসির যে সাম্প্রতিক স্ট্যান্ড ছিল সেটার উপরে দাঁড়িয়েই পিসিসিতে জয়েন করাটা ঘটেছিল। তাহলে, নকশালবাড়িটা কী, সে সম্পর্কে জানা বোঝার দরকার হল। এবং আমাদের মধ্যে প্রচুর কন্ট্রাডিকশন শুরু হল। পার্টির মধ্যে ইনার পার্টি কন্ট্রাডিকশন। সেই কন্ট্রাডিকশনে আমিও য়্যান্টিপার্টি জায়গাতেই বিলং করছিলাম: যে, নকশালবাড়ির যে প্রকৃত ধারা সেই ধারা থেকে আমরা ক্রমাগত বিচ্যুত হয়ে গেছি। এবং, তখন, প্র্যাকটিকাল নলেজ যা আছে, তার থেকে অনেক বেশি বুকিশ ওয়েতে আমরা দেখতে শুরু করেছিলাম। দেখতামও।

তো, এই ভাবে যখন দেখতে শুরু করি, একটা সময়ে, যে একটা, পড়াশুনো করার পাশাপাশি যে ধরনের রাজনৈতিক আন্দোলন বা প্রক্রিয়ায় অন্যদের নাড়া দিতে পারে, আজকের নেপাল যেমন অনেককে নাড়া দেয়, তেমনি ভাবে সেই সময় নাড়া দেওয়ার একটা বিষয় ছিল অন্ধ্রের ওয়ারাঙ্গল, নিজামাবাদ, করিমনগরের যে কৃষক আন্দোলন, সেই আন্দোলন। সেই আন্দোলন সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে নিতেই পৌঁছে যাই আরকি জনযুদ্ধের কাছে। তো, সেই সময় আমরা একটা গ্রুপ হিশেবে স্টাডি সার্কল মেনটেন করতাম। তার মধ্যে আট জন ছিল।

ত্রিদিব।। সেই পিসিসি থেকেই?

তিমির।। হ্যাঁ, সেই আট জনই ছিল। তারা কখনোই মনে করতাম যে আমরা একটা পার্টি ফর্ম করার মত জায়গায় — আমরা মনে করতাম যে, নিশ্চয়ই একটা অর্গানাইজেশন আছে, তার বেশিরভাগটাই খুব পজিটিভ, এবং লড়াই করতে পারে, এবং যে লড়াইকে ভারতীয় বিপ্লবী পার্টি…

ত্রিদিব।। তোরা কী মনে করতি? যে পার্টি…

তিমির।। যে পার্টি ফর্ম করা উচিত। নিজেরাই কাজ করব এরকম ভাবে কখনোই মনে করবার জায়গায় ছিলাম না। আমরা মনে করতাম যে নিশ্চয়ই কোনো পার্টি আছে যেটা জানা নেই। যে, সংগ্রাম যেহেতু হচ্ছে ভালো, ওয়ারাঙ্গলে, কখনো কখনো বিহারে, কখনো কখনো অন্ধ্রপ্রদেশে, শোনা যাচ্ছে সেই সংগ্রামের কথা, তাদের সঙ্গে একাত্মতার দরকার। সেই মুভমেন্ট সম্পর্কে জানার দরকার আছে। তো, সেইটার থেকে সার্চিং করতে গিয়ে আমরা বিভিন্ন জায়গায় পৌঁছে যাই। কখনো গয়ায় পৌঁছে যাই। ওদের আন্দোলনের ধরন-ধারন দেখতে। কখনো দিল্লি পৌঁছে গেলাম, এআইআরএসএফ বলে কোনো সংগঠনের অস্তিত্ত্বকে জানবার পর, তাদের সাথে কথা বলতে। তো, এই ভাবে ছুটে বেড়ানো হয়েছে। টিউশনির পয়সা জমিয়ে বই কেনা হয়েছে।

এবং আট জনের এক জন। একটা টিম। তার মধ্যে মূলত, মূল ব্যাপারটা, আমরা দুজন মাত্র, একজন আমি, আর এক জন, আর এক জন ব্যক্তি ছিলেন আমাদের সাথে, যে এখন নেই। জেলে। দুজনেই মূলত এই গোটা ব্যাপারটাকে লিড করতাম আরকি। স্টাডি সার্কলটাকে। কখনো আমি ক্লাস নিতাম। কখনো ও ক্লাস নিত। এ নিয়ে আমাদের মধ্যেও অনেক বিতর্ক হত। এবং, একটা পোজিশনে আমরা বিভিন্ন বইপত্র আস্তে আস্তে — অসিত সেনের একটা লেখা খুবই ইনফ্লুয়েন্স করে, যে, লেনিন বলছেন যে, পার্লামেন্টকে ইউজ করতে হবে, ব্যবহার করতে হবে, বিপ্লবী পরিস্থিতি অনুযায়ী সেই, সম্পূর্ণ সেই, সিদ্ধান্ত নিতে হবে, কারণ কখনো কখনো এরকমটা হয় যে, আমি পার্লামেন্টকে ব্যবহার করতে না-গিয়ে আল্ট্রা-লেফ্ট ট্রেন্ড জন্ম নিতে পারে, কিন্তু কখনো কখনো এরকমটাও হয় যে, আমাদের বয়কট করতে হবে, কারণ, সমাজটা বড্ড বেশি মোহগ্রস্ত হচ্ছে, ওই তাকে নাড়া দেওয়ার জন্যেও। তাহলে তো বয়কটটা এরকম, বয়কট বা ইসেটা ভীষণ ভীষণ রকমেরই একটা কৌশলগত প্রশ্ন। সেটা নীতির সঙ্গে যুক্ত নয়। তাই ভোট বয়কট বা এটা দিয়ে চিরন্তন কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। যদি গোটাটাই কৌশলগত প্রশ্ন হয়, তাহলে কোন পরিস্থিতিতে সেটা কৌশল, কোন পরিস্থিতিতে সেটা নীতি — তাহলে আমরা কি সেটা নীতির পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছি? ভোট বয়কটটাকে কেউ কেউ নীতির পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে। যদি বয়কটটাই কৌশল হয়? তাহলে সেটা সার্চ করা উচিত।

তা ঠিক সেই সময়েই আমাদের কাছে কিছু লেখাপত্র পৌঁছয়। এরকম, সিপিআইএমএল জনযুদ্ধের। আর, একটা পরিস্থিতি সেই সময়ে যে বহু গ্রুপ, ছোট ছোট গ্রুপ, ব্রেক করে গেছে।

ত্রিদিব।। একটা জিনিষ, এটা একটু অপ্রাসঙ্গিক। এই যে আট জনের গ্রুপ, এর পুরোটাই কি তোরা পরে পিডব্লুজিতে যাস?

তিমির।। হ্যাঁ, পুরোটাই। পুরো অংশটা। পুরো অংশটাই যাওয়া হয়। এবং, মানে, প্রথমত, আমরা একটা জায়গায়, আলোচনা করছিলাম যে, পিপলস ওয়ার এরকম কোনো ডগমা আমাদের মধ্যে ছিলনা। আমরা আসলে আলোচনা করতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি ক্লোজ জায়গায় পড়েছিলাম, পার্টি ইউনিটি বলে একটা জায়গা। পিইউ-র সঙ্গে। ভীষণ। আমরা হয়ত পার্টি ইউনিটিতে জয়েন করে যেতাম। একটা অদ্ভুত ঘটনার পর… রেড ফ্ল্যাগ থেকে একটা অংশ বেরিয়ে আসে, এবং বেশ বড় অংশ।

ত্রিদিব।। রেডফ্ল্যাগটা কী?

তিমির।। রেডফ্ল্যাগ বলে আর একটা এই রকম, সিপিআইএমএল রেডফ্ল্যাগ বলে, একটা গোষ্ঠী ছিল। পিসিসির থেকেও একটু বড়ই গোষ্ঠীটা। ওদের অন্ধ্রেও প্রোগ্রাম ছিল। অন্ধ্রেতেও ছিল তাদের অর্গানাইজেশন। তো সেই সূত্রেই, পশ্চিমবাংলার প্রশ্নটায় ব্রেক করার পরে, ওদের অন্ধ্র সম্পর্কে ওদের জানাবোঝা অনেক বেশি ছিল। তারা এসে হঠাৎ করে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে, যে, এক্ষুনি যোগাযোগ করবার কোনো সিদ্ধান্ত নিও না তোমরা। ওদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ ছিলই। কেননা, ব্রেক করার পরে বিভিন্ন বইপত্র, স্টাডি করা, ওদের এক্সপিরিয়েন্স, আমাদের এক্সপিরিয়েন্স আদানপ্রদান করার প্রশ্নগুলো আমাদের ছিলই। তা, ওদের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল, আমরা যখন পার্টি ইউনিটির ডিসিসন নিচ্ছি, আমরা জানাই, আপনারা জয়েন করুন আর না-ই করুন, আমরা কয়েকদিনের ভিতর জয়েন করছি, কারণ, এরকম ভাবে ইনডিভিজুয়ালি থেকে যাওয়া যায়না, একটা অর্গানাইজড শেপে আমাদের আসতেই হবে, এবং সেখান থেকেই আরো শিক্ষাগ্রহণ করতে হবে।

এবং, এই সিদ্ধান্ত নিচ্ছি, এই রকম সময়ে একদিন রাত্তিরবেলায় ওঁরা দুজন আসে, যে এরকম একটা পাওয়া যাচ্ছে, যে ওরা আমাদের যোগাযোগ করতে চাইছে, এবং জনযুদ্ধ ডিসিশন নিয়েছে যে, ওয়েস্ট বেঙ্গলে তারা কাজ করবে। এটা নাইন্টিফোর। নাইন্টিফোর থেকে নাইন্টিফাইভের এই প্রক্রিয়ায় আমরা দেখতে পেলাম, অন্ধ্র থেকে এক জনকে এখানে ডেপুট করা হল।

ত্রিদিব।। একবার বিরক্ত করি আমি। তোর এসএফআইয়ের রাজনীতিটা মোটামুটি কত সালে শুরু হল?

তিমির।। ওটা এইটিফাইভ।

ত্রিদিব।। এইটিফাইভে এসএফআই।

তিমির।। এইটিসেভেনে ছেড়ে দিয়েছি।

ত্রিদিব।। এইটিফাইভ থেকে এইটিসেভেন এসএফআই। এইটিসেভেন থেকে পিসিসি চলছে?

তিমির।। এইটিসেভেন না। দুটো বছর চুপচাপই ছিলাম। পড়াশুনো করেছিলাম।

ত্রিদিব।। এইটিনাইন থেকে পিসিসি চলছে? সন্তোষ রাণা গ্রুপ?

তিমির।। নাইন্টিথ্রি-তে ছেড়ে দিয়েছি। এইটিনাইন হবে এটা। এইটিনাইনের শেষ দিকে।

ত্রিদিব।। এবার নাইন্টিফোরে এই যোগাযোগটা করল রেডফ্ল্যাগ?

তিমির।। এবং আমরা তখন ছেড়ে দিলাম। ওটা, ডিসিশনটাকে চেঞ্জই করলাম। যে, এদের সঙ্গেও বসা উচিত। এবং প্রক্রিয়া এগোল। নাইন্টিফাইভে একটা প্লেনামের মধ্যে দিয়ে একটা মার্জার মিটিং হল। অর্থাত, পিপলস ওয়ার আমাদের গ্রুপগুলোকে আলাদা ভাবে স্বীকৃতি দিল। এবং সেখানে সিদ্ধান্ত হল যে, যেহেতু, দীর্ঘস্থায়ী জনযুদ্ধের প্রশ্নে, যে, গ্রামীন এলাকায় নিজেকে উদ্যোগ নিয়ে কাজ করবার প্রশ্নটা আমাদের কারুরই ছিলনা, এবং আমরা দীর্ঘদিন যাবত ঘরোয়া পরিবেশে, এবং ঘরে থেকে রাজনীতি করছি, তাই জন্যে, মিডলক্লাস ভাইসেসগুলো আমাদের থাকবেই, এবং বিভিন্ন নকশালপন্থী অর্গানাইজেশনের মধ্যে যে পরনিন্দা পরচর্চাটা — যে — বেশি চর্চিত হত আরকি, পরনিন্দা পরচর্চাটাই বেশি হত, নিজেদের কাজ ফেলে রেখে, সেই জায়গাটার ট্রেন্ড আমাদের রয়েছে, এইগুলোকে রেকটিফাই করবার জন্যে আমাদের একদম ইনটেন্স ওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হতে হবে, এবং তার মধ্যে দিয়েই কাজ করতে হবে। ওরা কিছু টাস্ক ঠিক করে দিয়েছিল। এবং সেই এক বছরের টাস্কের মধ্যে আমি ছিলাম, একদমই ইনিশিয়াল স্টেজে আমাকে গ্রামে ঠিক করা হয়েছিল, কিন্তু শহরে একটা তখন সিটি কমিটি তৈরি হয়েছিল, ওরা আমাকে ছাড়ে না, কারণ ওরা তখন আমাকে ছেড়ে দিলে অর্গানাইজেশনটা খুব দুর্বল জায়গায় পড়ে যাবে। বা দু-চারজনের উপর এত চাপ পড়বে যে চাপটা তারা নিতে পারবে না বলে আমাকে গ্রামে পাঠানো হয়না। নাইন্টিফাইভের মার্জার মিটিং এর পর। অর্থাত, সেই সময় জনযুদ্ধ ফর্ম হচ্ছে এটা ধরা যেতে পারে।

ত্রিদিব।। বল তুই। আমার লেখাটার দিকে দেখতে হবে না। আমি তো তোর কথারই নোট নিচ্ছি। তুই বল।

তিমির।। নভেম্বর মাস। নভেম্বর মাস। নভেম্বর মাসে। এইটা হল, এইটা হচ্ছে আমার জয়েনিং। এই ভাবে আমি পিপলস ওয়ারে এলাম। এর পর তুমি যদি পিপলস ওয়ার সম্পর্কে প্রশ্ন করো তাহলে আমি বলতে পারি, নইলে আমি গড়গড় করে বলে যেতে পারি সমস্ত কিছু।

ত্রিদিব।। একজ্যাক্টলি। আলাদা করে প্রশ্ন নয়। আমি একজ্যাক্টলি তোর গড়গড় করে বলাটাই চাইছি। ঠিক যে রকম যে ফ্লোতে এতক্ষণ বলে যাচ্ছিলি। ওই ভাবে বলতে থাক। আমি তার পরে তার মধ্যে যে অংশ বেশি প্রশ্ন দরকার করে নেব।

তিমির।। এর পর কতকগুলো ইন্টারেস্টিং সিচুয়েশন। যেগুলোকে বাদ দিলে খুব বাজে হয়। বিভিন্ন গ্রুপ থেকে যারা এল, তারা — নিজেদেরকে বড় প্রমাণ করার একটা প্রচেষ্টা কিন্তু তাদের ছিল। বিভিন্ন ভাইসেস নিয়েই তারা কিন্তু এসেছিল। কেউ মনে করত যে, পিপলস ওয়ারের সঙ্গে তারাই প্রথম উদ্যোগ নিয়েছিল, তারা এসেছিল, এবং তাদেরই মূলত লিডারশিপে আসার কথা। উচিত। হ্যাঁ। কেউ মনে করত, আমি গ্রাম থেকে এসেছি — আমি হচ্ছি ক্রিম পার্সন…

ত্রিদিব।। মানে, পিডব্লু জিটা কী হল? এক ধরনের একটা গ্রুপ? অনেকগুলো গ্রুপের একটা সমাহার?

তিমির।। একটা সমাহার। সমাহার হল। মানে ওয়েস্টবেঙ্গলে। ওয়েস্টবেঙ্গলের বিভিন্ন ফোর্স এক জায়গায় য়্যাকুমুলেট হল। এবার বিভিন্ন ফোর্স বিভিন্ন চিন্তা নিয়ে এল। যে চিন্তাগুলো তারা কিন্তু ছেড়ে এল এরকমটা নয়। সব কিছু ছেড়ে দিয়ে চলে এল, পিপলস-ওয়ারের চিন্তার সঙ্গে ঐক্যমত হয়ে গেল এরকম ভাবে হয় না, একটা দীর্ঘ প্র্যাকটিসের মধ্যে দিয়েই এটা হওয়া সম্ভব বলে পার্টি বিশ্বাস করত এবং অন্যরাও বিশ্বাস করত। কিন্তু দীর্ঘ প্র্যাকটিস বা হেনতেন-র বাইরেও, যখন এক সঙ্গে কাজ করতে দেওয়া হল, তখন কিন্তু বিভিন্ন কন্ট্রাডিকশনের এখানে জন্ম হল। এবং ভেরি পিকিউলিয়ার সিচুয়েশন। কেউ কাউকে দেখতে পারেনা এরকম একটা অবস্থাও তৈরি হয়েছিল কখনো কখনো। লাঠালাঠি, মারামারি। ধরো একটা মিটিং-এর কন্ডিশন বলি তোমাকে। একটা মিটিং-এ মেদিনীপুর থেকে কয়েকজন মানুষ এসেছেন। আমরা শহর থেকে কয়েক জন এসেছি। তবে শহরের মধ্যে তিনটে গ্রুপ আছে।

ত্রিদিব।। ও, তুই যে শহরের দায়িত্ব পেলি, রাজনীতির, শহর এলাকায়, কোন এলাকায় তুই তখন করতে শুরু করলি?

তিমির।। না, আমি দায়িত্ব পেলাম না। প্রথম কথা হচ্ছে, আমি এটা বলে নিই। মার্জার মিটিং-এর কম্পোজিশনটা বলে নিই। আমি জয়েনিংটা বললাম তোমাকে। আমি কী দায়িত্ব পেলাম, সেটা পরের প্রশ্ন আসছে। প্রথমেই দায়িত্ব পেয়ে গেছিলাম এরকমটা নয়। প্রথমে একটা পিকিউলিয়ার কন্ডিশনের মধ্যে আমি পড়েছিলাম।

তো সেইখানে দাঁড়িয়ে দেখা গেল যে, যখন, কে সেক্রেটারি হবে? অতয়েব, ওয়েস্টবেঙ্গলে কে সেক্রেটারি হবে? ঠিক আছে? তো, গ্রাম থেকে যারা এসেছিল, মনে করেছিল, গ্রামের কন্ডিশন আমরাই সবচেয়ে বুঝি। এবং এখানে এই এই এই এই দরকার। শহরের এই লোকগুলো সব বাজে। শহরের লোকগুলো সব লাল ফর্সা ফর্সা চেহারার লোক, এরা কোনো দিন বিপ্লব করবে না, এরা বড় বড় বুকনি ঝাড়ে, আমরাই ক্রিম অংশ, আমাদেরই লিডারশিপে, ডাইরেক্ট লিডারশিপে নিয়ে আসতে হবে, কৃষিবিপ্লবে। কৃষি। আমরা কৃষক। আমরাই দীনদরিদ্র, আমরাই ক্ষেতমজুর। তা, এরকম একটা ডগম্যাটিক ধারণা তাদের মধ্যে ছিল।

আবার শহরাঞ্চলের মানুষের মধ্যে ছিল। তাদের মধ্যে অনেক ভাইসেস ছিল। তারা ভাবত যে, বিপ্লব সম্পর্কে এরা কী, কবে বুঝল? এরকম অদ্ভুত ধরনের। এত পড়েছে। ইস, কিছু পড়েনি, কিছু জানেনা।

ত্রিদিব।। হ্যাঁ, এটা তো জানা কথাই, ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রোলেতারিয়েতই তো নেতৃত্ব দেয়।

তিমির।। হ্যাঁ, শ্রমিকরাই তো। এই ধরনের বায়াসডনেস তাদের থাকছে, ভীষণ। য়্যাকচুয়ালি, ওরা ছিল একদম ফিউডাল মানসিকতার লোক, এক দল, আর এক দল পেটি বুর্জোয়া মানসিকতা। অর্থাত, ফিউডাল মানসিকতার সঙ্গে পেটি বুর্জোয়ার কন্ট্রাডিকশনে — তবে আপাত ভাবে তোমার ওই মিটিং-এর চেহারাগুলোতে শহরই ডমিনেট করে যেত। তার কারণ, পেটি বুর্জোয়া ক্লাসটা অপেক্ষাকৃত…

ত্রিদিব।। কথাও তো — ভালো বলে।

তিমির।। হ্যাঁ, কথাবার্তাও ভালো বলতে পারে, অপেক্ষাকৃত ভাবে তারা প্রোগ্রেসিভ ছিল। বা, তাদের শো-টা যে ছিল, তোমার সাথে আমি একাত্ম হতে চাইছি। বা, তুমি এরকম আমায় বলছ কেন ভাই, দুঃখ দিচ্ছ কেন? আমি তো তোমার জন্যেই লড়াই করতে, আমি তো যাব। তো, শহর থেকে এক দল লোককে এবার দায়িত্ব দেওয়া শুরু হল। শহর থেকে এক দল লোককে পাঠিয়ে দেওয়া হল গ্রামে।

ত্রিদিব।। তুই যে বললি প্রথম দিকে তোকে…

তিমির।। পাঠিয়ে দেওয়া হল গ্রামে। এবং তার মধ্যে আমিও একজন ছিলাম। ওকে? দুটো কমিটি তৈরি হল। একটা হচ্ছে রুরাল কমিটি, একটা হচ্ছে সিটি কমিটি। কোনোটাই স্টেট কমিটি বা ডিস্ট্রিক্ট কমিটির মর্যাদা পেলনা। কারণ, স্টেট বা ডিস্ট্রিক্টকে চালানোর মত যোগ্যতা এদের এখনো আছে, অর্থাত, এই প্রসিডিওরে আছে, হ্যাঁ, এরা হয়ত কেউ স্টেট কমিটির লিডার ছিল, আমি নিজেই ডিস্ট্রিক্ট কমিটির মেম্বার ছিলাম, কিন্তু প্রশ্নটা হচ্ছে, এরা যে, ওই প্রসিডিওরে, অর্থাত, একটা ইউনিটিতে তো আসতে হবে, ইউনিটিটা কতদূর পর্যন্ত এসেছে সেটার তো কোনো গ্যারান্টি নেই। তুমি এই একটু প্রসেসের মধ্যে এক বছর দু বছর চলো, তার মধ্যে দিয়ে তুমি থাকবে না যাবে…

ত্রিদিব।। আর, ইন ফ্যাক্ট, তখনো তো স্টেট কমিটি তৈরিই হয়নি…

তিমির।। না, স্টেট কমিটি তৈরি করার প্রশ্ন হয়নি। তার মানে, স্টেট কমিটি ক্যানসেল হয়ে গেছে, ডিস্ট্রিক্ট কমিটি ক্যানসেল হয়ে গেছে, এটাকে ওরা কিন্তু খুব ভালো ভাবে য়্যানালিসিস করল, যারা এপি থেকে এসেছিলেন তারা। তো, তারা এসে খুব ভালো ভাবে য়্যানালাইজ করলেন, দেখুন, আপনারা এভাবে তো ঝগড়া করতে পারেন না। আপনারা বিভিন্ন জায়গা থেকে এসেছেন, বিভিন্ন ভাবে কাজ করুন। আগে কাজ করুন, বড্ড বেশি কথা বলছেন। কাজটা না-করা পর্যন্ত তো বোঝা যাবেনা। তো ডকুমেন্টগুলো নিয়ে প্রচুর ডিসকাশন হল। ডকুমেন্টের বিভিন্ন জায়গায় আমরা বিভিন্ন সংশোধনী দিলাম। যেমন, চারু মজুমদার প্রশ্নে য়্যানালিসিস ছিল। সেই য়্যানালিসিসের সংশোধনী দেওয়া হল। শহরে আর্বান ওয়ার্ক সম্পর্কে যে ডকুমেন্ট ছিল, সেই সম্পর্কে সংশোধনী দিল। এরকম অনেক কিছু।

ত্রিদিব।। এক আধটা উল্লেখ কর।

তিমির।। যেমন ধরো, চারু মজুমদারকে একটা জায়গায় বলা হয়েছিল বুরোক্র্যাটিক। আমরা বলেছিলাম যে, এই সম্পর্কে প্রকৃত ডেটা তোমার নেই যে তুমি ওকে বুরোক্র্যাটিক বলতে পারো।

ত্রিদিব।। এটা কারা বলেছিল?

তিমির।। ওই — পিপলস ওয়ার। বুরোক্র্যাটিক য়্যাটিচিউডে ছিলেন, পরবর্তী কালে একটা বুরোক্র্যাটিক য়্যাটিচিউড বা আমলাতান্ত্রিকতা দোষে দুষ্ট হয়েছিলেন।

ত্রিদিব।। তুই বলছিস পিপলস ওয়ারটা এইসময় ফর্মড হচ্ছে — আবার তুই বলছিস এটা পিপলস ওয়ার বলেছিল… ও তুই অন্য স্টেটের পিপলস ওয়ারের কথা বলছিস? আমি ওয়েস্ট বেঙ্গল পিপলস ওয়ার গ্রুপের রেস্পেক্টে ভাবছিলাম।

তিমির।। জনযুদ্ধ তো অনেক — পিপলস ওয়ার গ্রুপ তো রয়েছেই। পিপলস ওয়ার গ্রুপ ফর্মড হয়ে গেছে এইটিটুয়ে। এটা মার্জার মিটিং হচ্ছে — তখন আমার জয়েনিংটা দিয়ে শুরু হচ্ছে, তার মানে ওয়েস্ট বেঙ্গলে শুরু হচ্ছে, তার আগে কিন্তু ওয়েস্ট বেঙ্গলে জনযুদ্ধের অস্তিত্ত্ব নেই। অর্থাত, ওয়েস্ট বেঙ্গলে জনযুদ্ধকে ফর্ম করছি আমরা। এবং বিভিন্ন গ্রুপ থেকে এসে। কেউ নতুন ভাবে শুরু করছে না। ফ্রেশ কেউ শুরু করছে না। আসলে কিছু পোড় খাওয়া লোকজন এসেই জুটেছিল। তার জন্যে কন্ট্রাডিকশনটাও বেশি ছিল। এবার যারা গ্রামে গেলেন, চলে গেলেন যারা গ্রামে, আমার যাওয়াটা হল না, তার কারণটা হল, যে, তখন সিটি কমিটিতে যে দু-জনকে রেখে দেওয়া হল, য়্যাকচুয়ালি, তার পরের নেক্সট লিডারশিপ, অর্থাত, গ্রাউন্ডে কাজ করার জন্যে, আর কেউ ছিল না। সেই জন্য, আমার জন্য, একবছর পেন্ডিং হয়ে গেছিল। তাই, নাইন্টিফাইভে, নাইন্টিফাইভে আমার যাওয়া হয় না। নাইন্টিসিক্সের শেষ দিকে আমি গ্রামে চলে যাই। তাও, গ্রামের একটি শহরে। এবং, সেই শহরে তিনমাস থাকার পর, য়্যাকচুয়ালি আমি নাইন্টিসেভেনে পাকাপাকি ভাবে গ্রামে যাই। নাইন্টিসিক্স থেকে আমার গ্রামের জীবন শুরু হয়ে যায়। নাইন্টিসিক্সের প্রথম থেকেই। চার মাস পাঁচ মাস বাদেই আরকি।

ত্রিদিব।। এটা কোন এলাকা? বলা যায়? না, না বলাই ভালো?

তিমির।। না না, পশ্চিম মেদিনীপুর। বর্তমান পশ্চিম মেদিনীপুরের যে জায়গাটাকে ধরা হয়েছে, চিহ্নিত, সেখানেরই একটা জায়গাতে, শুরু করা হয়। এবং, আমাকে যখন কাজ করতে বলা হল, সেটা হচ্ছে যে এভাবেই কাজ করছে, সবাইকে এরকম ভাবেই কাজ করতে হয়, সেটা হচ্ছে, ডিক্লাসড হওয়ার জন্য ভীষণ ভাবে জরুরি, যে, খুটে খাও। একশোটি টাকা হাতে দিয়ে, একটা গোটা অঞ্চলের ম্যাপ দেখিয়ে, আমাকে বলে দেওয়া হল, এই অঞ্চলটা তোমার দায়িত্ব। তার আগে ওখানে এক জন অর্গানাইজার ছিল। সে, তোমাকে, কিছু কানেকশন ছিল, সেই কানেকশনগুলো দেওয়া হবে। আলটিমেটলি, সেই অর্গানাইজার হচ্ছে, ভীষণ রকমের, মানে, ভীষণ আরকি, সে কারুর সাথেই তার বনিবনা হয়নি। সে নিজেকে ভীষণ ভাবে পণ্ডিত মনে করে আরকি, গ্রামের সম্পর্কে তার কাছ থেকেই জানা উচিত, এবং সে-ই সবচেয়ে বেশি বোঝে, সবাইকে নিগেট করে দাও। এবং, ভদ্রলোক কাজও করতেন না। ভীষণ পিছুটান ছিল। হোমসিকনেস ছিল। বাড়ির আলুর চাষটা কী হচ্ছে সেটার স্বপ্ন উনি ভীষণ দেখতেন, বাড়ির লোকগুলো কী কষ্ট করছে। অর্থাত, কৃষক মানসিকতার লোক ছিলেন।

ত্রিদিব।। উনি কি অন্য এলাকার লোক ছিলেন?

তিমির।। হ্যাঁ, উনি কৃষক ছিলেন।

ত্রিদিব।। না, কিন্তু, অন্য এলাকা থেকে আসা?

তিমির।। হ্যাঁ, অন্য এলাকা। পাশাপাশি দুটো এলাকা। ওইখানেই। এর মধ্যেও অনেক গ্রামের দিকে উলটপালট হয়েছে, যে, যেটা আরকি তোমাকে খুব ভালো ভাবে বলতে পারব না, দুটো সাইড, গ্রাম এবং শহরের, এই প্রশ্নটা, থিওরেটিকাল যে ডিসকাশন, যে কন্ট্রাডিকশন, ইনার পার্টি কন্ট্রাডিকশন সেই সময় হয়েছিল, সেটা আলাদা সাইড, পরে ধরছি। গ্রামের যে জীবনটা তোমাকে প্রথমে বলি, আমার জীবনটা কী ভাবে স্টেপ বাই স্টেপ এগিয়েছে। আমাকে একটা জায়গা ছেড়ে দেওয়া হল, সেখানে আমি সেন্ট্রাল অর্গানাইজার। সেন্ট্রাল অর্গানাইজার হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছিল খুব কম লোককেই সেই সময়। যারা লিডারশিপ হিসাবে তাদেরকে, মানে পরবর্তী লিডারশিপ হিসাবে দেখা হচ্ছিল, মানে তাদের মধ্যে থেকেই ডিস্ট্রিক্ট কমিটি স্টেট কমিটি এইসব ফর্ম হবে। আমি যখন যাচ্ছি তার কিছু দিনের মধ্যেই সব গ্রামীন অঞ্চলে একটা ডিভিশনাল কমিটি তৈরি হয়েছিল। অর্থাত, কিছুটা ঝাড়খণ্ড, কিছুটা উড়িষ্যা, কিছুটা পশ্চিম বাংলার একটা গোটা রিজিয়ন ধরে, ছড়িয়ে ছিটিয়ে, কাজটা করা হয়েছিল। এই কাজগুলো যত বাড়বে, এই জায়গাগুলোকে লিংক আপ করা হবে। এবং ম্যাপ। খুব জরুরি প্রশ্ন ছিল এইখানে আমাদের কাছে। গোটা স্ট্র্যাটেজিটা প্রথম থেকেই সাজানো হত যে, অর্গানাইজেশন বিল্ড আপ হবে, মাস অর্গানাইজেশন তৈরি হবে, সমস্ত কিছুই হবে জনযুদ্ধের স্বার্থে। অর্থাত, শুরু থেকেই, যে সশস্ত্র সংগ্রামটা আমাদের গড়ে তোলার কথা, সেই সশস্ত্র সংগ্রামের দিকে তাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। তার জন্যে স্ট্র্যাটেজি, প্রথম থেকে, একদম ফার্স্ট ডে থেকে, যে, এইখান থেকে আমি অর্গানাইজেশন গড়ে উঠব, ভিলেজ কমিটি তৈরি করব, ভিলেজ কমিটির মধ্যে থেকে আমি স্কোয়াড কমিটি তৈরি করব, এবং গ্রামরক্ষা-বাহিনী যাদের বলা হয়, এবং তার মধ্যে একটা সেন্ট্রাল স্কোয়াড তৈরি করব। এবং মাস মুভমেন্টগুলোকে একটা পলিটিকাল মুভমেন্টের রূপ দেব। অর্থাত, য়্যান্টি-স্টেট স্ট্রাগলে ডাইরেক্টলি সেটাকে পার্টিসিপেট করাব।

ত্রিদিব।। এবং, ক্রমশ, নানা এলাকার স্কোয়াডগুলোকে মিলিয়ে একটা সশস্ত্র সংগ্রামের দিকে এগোনো?

তিমির।। না, প্রথমে প্লাটুন। এগুলোর থেকে প্লাটুন ফর্মেশন হবে। কম্পানি ফর্মেশন হবে। তার পর ব্যাটালিয়ন ফর্মেশন হবে। অর্থাত, মিলিশিয়া তৈরি হবে। মানে, গ্রামে, দলে দলে মানুষ, যা হয়, সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে তাদের উইনওভার করা হবে। তা, প্রথম থেকেই এই মিলিটারি স্ট্র্যাটেজি, মিলিটারি স্ট্র্যাটেজি কিন্তু প্রথম থেকেই ভীষণ ভাবে ডমিনেট করতে শুরু করল। কোন ভাবে? অন্তত আমাদের অঞ্চলের জন্য। আমি যখন গেলাম, আমার কাছে পলিটিক্সটা খুব বড় ব্যাপার ছিল। আমি খুব পলিটিকাল টিচিং-এর উপর জোর দেওয়া শুরু করলাম। সেটায় খুব হার্ট-ও হল। বিভিন্ন ভাবে।

আমাদের মধ্যে, সেই শুরু থেকেই আট জনের মধ্যে কিন্তু ছিল, যে পশ্চিম বাংলার ফিচার কিন্তু আলাদা। আমরা কিছু পড়াশুনা করা লোকজন ছিলাম, তো আমরা জানতাম, আমরা জানতাম যে, পশ্চিম বাংলায় কিছুটা হলেও মানুষ জমি পেয়েছে, এখানে সাঁইবাড়ির মত ঘটনা ঘটেছে, সেখানে সিপিএম নিজে জমিদার জোতদারকে খতম করেছে, ওটা জোতদার খতমের রাজনীতির মধ্যে সংঘবদ্ধ হয়নি, কিন্তু মাস স্ট্রাগল। দশ হাজার লোক মিছিল করে গিয়ে একটা জমিদার বাড়ি দখল করে সেটাকে য়্যানিহিলেট করল, তার প্রভাব নেই কিছু — হয় না — তার প্রভাব তো আজকের বর্ধমান। যেখানে গরিব মানুষকে সে অনেক বেশি রেজিমেন্টেড রাখতে পেরেছে এখনো, এবং, যে কোনো শক্তির বিরুদ্ধে তাকে খাড়া করবার ক্ষমতা তার রয়েছে। এবং ফ্রেশ ভাবমূর্তি রয়েছে। এখনো সেই ধুতি পাঞ্জাবি পরা সেই মুভমেন্টের লোকগুলো, সেই চেনা মুখগুলো এখনো ঘুরে বেড়ায়। এবং তারা যদিও বা আজকের নেতা, তারা যদিও বা আজকের শাসক শ্রেণীরই পার্ট, কিন্তু তাদের যে সমাজের ক্ষেত্রে ইনফ্লুয়েন্স সেটা অস্বীকার করা সম্ভব নয়। এবং তার কিছু চেঞ্জেস-ও তো হতে বাধ্য।

প্রথম কথা হচ্ছে যে, আমাদের কাছে এই প্রশ্নগুলো প্রথম থেকেই ছিল। যে প্রশ্নগুলো আমাদের বহুত, সম্ভবত, আমি ছাড়া আট জনের ছয় জনেরই নষ্ট হয়ে গেছিল। এক জন সম্পর্কে আমি খুব শিওর নই।

তার মধ্যে ছিল। সে য়্যাকচুয়ালি ভীষণ ট্যালেন্টেড একজন অবশ্য। যে আমাদের মূল লিডার ছিল। আসলে, য়্যাকচুয়ালি আমাদের গ্রুপের এক জনই নেতা ছিল। তার পরে ধরা যেতে পারে আমিই। যে ডিসকাশনটা চালাতে পারতাম।

ত্রিদিব।। যে এখন জেলে আছে?

তিমির।। হ্যাঁ। তো সেই ক্ষেত্রে, আমার মনে হয়, এই সার্চিংটা আমি বাদ দিলে সবারই, কী রকম ভাবে যেন, নষ্ট হয়ে গেছিল। প্রথম কথা হচ্ছে, সে আর বেঙ্গলে ছিল না। ওই লোকটা আর বেঙ্গলে ছিল না। আমি যখন একটা লেখা ওকে পাঠালাম, তখন ও উত্তর দিল যে, এই ব্যাপারটা বোঝা আমার পক্ষে কষ্টকর। এই ব্যাপারটা, কেননা আমি এখন বাংলায় নেই, বাংলাকে বোঝার জন্য যথেষ্ট সময়ও আমাকে দেওয়া হয়না যে সার্চিংটা তোর সাথে আমি রাখতে পারি। তাই, এটা তোরই টাস্ক। ওখানকার কমরেডদের প্রতি সহানুভূতিশীল হও, এবং, এটা বলার একটা ভিন্ন উৎসাহ ছিল, সহানুভূতিশীল হও, এটা বলার মধ্যে একটা কারণ ছিল। সহানুভূতিশীল হও এবং ওদের সাহায্যেই তুমি ব্যাপারটাকে সার্চ করার চেষ্টা করো। তা, সহানুভূতিশীল হও, কিন্তু ও ভীষণই কষ্টের মধ্যে ছিল, ওকে প্রচণ্ড ভাবে — ও শহুরে, ওর… ও ভীষণ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ছিল, ভীষণ সফিস্টিকেটেড একটা লোক ছিলেন আরকি। ভীষণ সফিস্টিকেটেড। মনে, মানসিকতায়, হৃদয়ে, সমস্ত কিছুর দিক দিয়েই খুব সফিস্টিকেটেড ছিলেন। চূড়ান্ত সেন্সিটিভ ছিলেন। ছোট ছোট সূক্ষ ব্যাপারগুলো খুব… আর এই গুলো খুব গোদা মানসিকতা ধরতে পারত না বলে, ওকে ভীষণ দুঃখ পেতে হয়েছে। বিভিন্ন কারণে দুঃখ পেতে হয়েছে। পার্টিরই প্রক্রিয়ার মধ্যে।

পরবর্তী কালে আমার মনে হয়েছিল, সেটা পরবর্তী কালের প্রশ্ন, তুমি আগের স্টেপগুলো দেখো, যে আমাকে সেন্ট্রাল অর্গানাইজার হিসাবে যখন ইশু করা হল, আমার মাথায় তখন ওই আট জনের করা আলোচনা কিন্তু রয়েছে। যে পশ্চিম বাংলার বিশেষ অবস্থায় কী ভাবে এটাকে ইম্প্লিমেন্ট করা যায়। কী ভাবে সশস্ত্র সংগ্রামের রাজনীতিকে চ্যাম্পিয়ন করানো যায়। কী ভাবে সিপিএমের আধিপত্যকে ব্রেক করে এগিয়ে যাওয়া যায়। এগুলো থাকা সত্ত্বেও, আমরা খুবই ডগম্যাটিকালি একটা থিওরিকে… নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করব না, এগুলো থাকা সত্ত্বেও, আমরা কিন্তু, অন্তত আমাদের এই আট জনের আট জনই, খুবই, খুবই পার্টিলাইনকে ফলো করে, সেটাকে ইম্প্লিমেন্ট করবার চেষ্টা আমরা চূড়ান্ত ভাবে করলাম।

যেমন, আমি যাওয়ার আগে, বিভিন্ন রকম মাস মুভমেন্ট হওয়ার কথা হয়েছিল। কিন্তু কোনোটাই কোনো শেপ পায়নি। বা, সেটাকে ধরে যে পার্টি ফর্মেশন হতে পারে, সে রকমটা হয়নি। আমিই ফার্স্ট, জঙ্গল নিয়ে গোয়ালতোড়ে একটা মুভমেন্ট তৈরি করলাম। তার আগে, জঙ্গল নিয়ে সে একটা বিরাট মুভমেন্টের সম্ভাবনা, কেউ কেউ ভয় পাওয়ার কারণে, পরবর্তী কালের য়্যানালিসিস, যে, একজন ব্যক্তি ভয় পেয়ে সেটাকে পিছিয়ে দিয়েছিল।

ত্রিদিব।। একটা জিনিস, দাঁড়া, একটা মিনিট আমি একটু বিরক্ত করি। তার মানে একটা জায়গায়, যে সার্চ থেকে তোরা ওই জায়গাটায় মিলিত হলি, কোথাও একটা কিন্তু, ফর দি টাইম বিয়িং, সার্চটা স্টপ করে, একটা লাইনে তোরা পারসু করতে শুরু করলি।

তিমির।। সার্চটা স্টপ হল। একটা লাইনেই পারসু করতে শুরু করলাম। অর্থাত, মিনিমাম একটা জায়গায় তো পৌঁছতেই হবে, হতেই পারে তো, জমি তো আছেই, কিন্তু, তুমি কতকগুলো জিনিস দেখার চেষ্টা করো, আমরা কোন জায়গায় কোন জায়গায় করছি। এক নম্বর, আমাদের কাছে যেগুলো, যেগুলো প্রশ্ন হিসাবে আমার এখনো আছে, আমাকে যে জায়গাটায় দেওয়া হল, সেখানে আমি এক জন জমিদার খুঁজে পেলাম না। নট এ সিঙ্গল জমিদার। এবার, জমিদার কে, এই সার্চিং চলছে, যেখানে কোশ্চেন হচ্ছে, অর্থাত, অকৃষক জমির মালিক, অকৃষক জমির মালিক হচ্ছে জমিদার। ক্লাসিকালি এরকম করা হচ্ছে। জমির মালিক। ঠিক আছে? প্রশ্নটা হচ্ছে, অকৃষক জমির মালিক সন্ধান করতে গিয়ে আমি দেখলাম যে একজন স্কুল টিচার, ঠিক আছে? স্কুল টিচার, সিপিএম করে, হ্যাঁ? পঁচিশ বিঘা জমি আছে। সে কৃষির সঙ্গে যুক্ত নয়। সে কৃষির সঙ্গে যুক্ত নয়। হুঁ?

ত্রিদিব।। তোকে একটা খাতা দেব, তাতে লিখবি? (তিমির এই সময় একটা সিগারেট প্যাকেট খুলে নিয়ে তাতে এই মুখে বলা কথা গুলোই লিখছিল।)

তিমির।। না, স্কুল টিচার একজন, একজন ব্যক্তি এইখানে, স্কুল টিচার, সিপিএম করে, পঁচিশ বিঘা জমির মালিক, সে কৃষির সঙ্গে যুক্ত নয়। তার মানে সে অকৃষক। সে স্কুল টিচার, তার জমি আছে। সেই জমিতে সে কী করে? জমিতে সে করে হচ্ছে, যে, দশ জন লোককে খাটায়। হুঁ? লোককে খাটায়। তাহলে এই দশ জন লোক হচ্ছে সেই জমি — মালিকানা পেতে পারে। অর্থাত, হি ইজ দি জমিদার। অর্থাত, ল্যান্ডলর্ড। এরকম একটা য়্যানালিসিস আসতে শুরু করল। ভীষণ কনফিউশান ছিল এই য়্যানালিসিস নিয়ে। তাহলে, এই ডেজিগনেশনটাকে আমি অস্বীকার করি কী করে? এ কি পেটি বুর্জোয়া ক্লাস নয়? একই সঙ্গে সে পেটি বুর্জোয়া এবং জমিদার কী করে হয়? তাহলে, প্রথম থেকে প্রশ্নটা থাকলে, তাহলে আমরা এটাকে নিগেট করি। মেইনলি, এই বিতর্কে, প্রায় যখন এটা লাইন হিসাবে দাঁড় করানোর একটা প্রচেষ্টা চলতে শুরু করে…

ত্রিদিব।। যে স্কুল টিচার নয়, শেষ অব্দি সে একজন জমিদার?

তিমির।। এরকম ধরা যাক সে স্কুল টিচার, স্কুল টিচার সে না-ই হতে পারে।

ত্রিদিব।। না, আমি তা বলছি না। মানে, এরকম একটা জায়গা দাঁড়িয়ে যায় যে সে জমিদারই? অন্য সব আইডেন্টিটি তার ভুলে যাও।

তিমির।। হ্যাঁ, আইডেন্টিটিগুলো ভুলে যাও। আরও প্রশ্ন আছে। প্রশ্নগুলো কী রকম ভাবে এসেছিল  — পড়াশুনা করতে করতেই এসেছিল। আমি বলি, এটা কিন্তু ভীষণ রকম কনফিউশান তৈরি করে, এবং প্রচুর স্ট্রাগল হয়। এই স্ট্রাগলটায় পার্ট নিতে গিয়ে, আমি, একটা এরিয়া কমিটি মিটিং, আমাকে এরিয়া কমিটিতে য়্যাটাক করা হয়, তখন আমি একটা জঙ্গল নিয়ে কিছু মুভমেন্ট তৈরি করাই, এবং আশি বিঘা জমি দখল করে ফেলি আমি, এক বছরের মধ্যে। এবং সিপিএম-ই ফার্স্ট আমাকে য়্যাটাক করেছিল, যে ব্যক্তি য়্যাটাক হয়েছিল, এবং সবাই তো মজা করেই, আনন্দ করেই সংগঠন করছে, আমিই একমাত্র যে কাজ করার মধ্যে দিয়েই আসলে য়্যাটাকড হই।

ত্রিদিব।। আরও অনেক জায়গায় সংগঠন করছে বললি?

তিমির।। অন্যান্য অর্গানাইজেশন, তাদের প্রতি কোনো য়্যাটাক নেই, তাদের কোনো শত্রু  কোনো কিছুই করছে না। অথচ আমি, যখন কাজ করছি, শত্রু  করবে কেন, যদি শত্রুর কোনো ক্ষতি না-হয়? অথবা শত্রু  ভীষণ উইক সেখানে, সেখানে কিছু না। একটা জায়গা থেকে, আমার প্রথমেই ইনটেনশন ছিল, আমাকে এমন কোনো জঙ্গলের মধ্যে…

ত্রিদিব।। শত্রু  মানে এখানে মূলত সিপিএম? এবং স্টেট পাওয়ার?

তিমির।। হুঁ, সিপিএম এবং স্টেট পাওয়ার। তা, সেই ক্ষেত্রে, আমি, যেটা হয়, যে, আমাকে যখন জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরতে বলা হচ্ছে, সেই জঙ্গল জঙ্গল কিন্তু আমার পছন্দ হচ্ছে না। তার কারণ হল, ওখানে, একটা গ্রাম, একটা ভিলেজ, ওয়ান ভিলেজ, সেখানে কী হচ্ছে, চল্লিশজন লোক — মানে, পরিবার আছে, ফরটি ফ্যামিলিজ। হ্যাঁ? আর আদিবাসী ফ্যামিলিতে, তুমি যে, প্রচুর সংখ্যায় ছেলেমেয়েরা জন্মগ্রহণ করে, এরকম ব্যাপারটা নয় কিন্তু। বেশিরভাগটাই মরে যায়। ঠিক আছে? মরে যায়। মানে, অযত্নের কারণে। চিকিত্সার অভাবে। অযত্নটাও কিন্তু তোমার এই কারণে নয় যে তার জমি নেই। আমি তোমায় সেগুলোর উদাহরণ দিচ্ছি, খুব ইন্টারেস্টিং ফিচার আছে। দিচ্ছি, আস্তে আস্তে, হ্যাঁ।

তো, সেই জায়গায় আমার পছন্দ নয়, তাই আমি ঢুকেছিলাম কৃষি যেখানে হয় সেরকম জায়গায়। অর্থাত, কৃষিটা যেখানে হয়, অর্থাত, ডেভেলপড ইকনমিক জায়গা আরকি। ওই একই ব্লকের মধ্যেই দুটো হয়। মানে, দুটো সেকশন আছে, আমার ব্লকটার, ইসেটার ভিতরে, ছিল। প্রত্যেকটা জায়গা। নদীর ধারে, ডেভেলপড ইকনমিক পোজিশন ছিল ওখানে। কংসাবতীর পাড়ে, অর্থাত, ক্যানেলের পাড়ের যে জমি ছিল সে জমি রিকভার হয়ে, উঠেছিল।

ত্রিদিব।। সে জমি খুব উর্বর?

তিমির।। হ্যাঁ, বিধান রায়ের সময়ে হওয়া এই ক্যানেলকে ওখানকার মানুষ আশীর্বাদ হিশেবেই জানে। স্টেটের সমস্ত কাজকে তুমি নিগেট করতে পারো না। অন্তত, যে কাজটাকে ডেভেলপড করার প্রশ্নটাও রয়েছে। তা সেখানে যদি ভুল ভাবে সেটা ইম্প্লিমেন্ট হয়ে যায়, হয়ে থাকে — সেটাকে সংশোধন করতে পারো তো। য়্যানালিসিস করো — সায়েন্টিফিক আউটলুক দরকার হয় যা-র জন্যে। তা, ডেভেলপড যেখানে ধরেছিলাম, আমি ওখানে যখন জমির প্রশ্নটাকে তুলতে শুরু করলাম — মাস মুভমেন্টটা, মজুরি বৃদ্ধির স্ট্রাগল। মজুরি বৃদ্ধির স্ট্রাগলেই মেইনলি তো কনসেন্ট্রেট করে গেছিল লোকজন। আমি প্রথম সেটাকে জমি দখলে রূপান্তর করলাম। জঙ্গলের জমি। কেন? সেখানে এই যুক্তিটা আনলাম, যে জঙ্গলের একটা ফাঁকা জমি আছে…

ত্রিদিব।। মানে সেটায় আপাতত চাষ হচ্ছে না, কৃষি হচ্ছে না?

তিমির।। না, জঙ্গলের জমি বলে কেউ ওটা নিতে পারছে না। জঙ্গলের জমি কিন্তু বহু লোক চাষ, দখল করে কাজ করছে। এমনি এমনি। কিন্তু, তুমি এক জন ব্যক্তি, তুমি তোমার গায়ের জোরে, কিছুটা জঙ্গল, তিন বিঘা জমি, দখল করে কাটছ, এটা কিন্তু পলিটিকাল মুভমেন্ট নয়। আমরা একটা সংগঠন, পঞ্চাশ জনকে জড় করে, সেটাকে পলিটিকালি মোটিভেটেড করে আমি ওটাকে জমি দখল করছি, সেটা কিন্তু পলিটিকাল মোটিভ। বরং, কন্ট্রাডিকশনটা এইখানে, কন্ট্রাডিকশনটা এইখানে যে, তুমি জঙ্গলের যেখানে, জঙ্গলের তো দরকার আছে, যেখানে আমাদের গ্রস ডোমেস্টিক প্রোডাকশনের ওয়ান পারসেন্ট হচ্ছে জঙ্গল, খুব বেশি এফেক্ট রাখেনা, তবুও জঙ্গলটার দরকার হচ্ছে, আদারস যে গ্রস… অর্থাত, কৃষি, যেটা আমার ফরটিফাইভ পারসেন্ট, তার উপর একটা বড় পরিবেশগত প্রভাব রাখে। তাহলে, জঙ্গলটাকে বাড়ানোর চেষ্টা করব, না, জঙ্গলের জমিটা দখল করব?

তো না, ইন ফ্যাক্ট, আমরা এইখানে ডিসকাসই করে নিলাম, ওখানে, যে জঙ্গলের এই জমিটাকে আমরা দখলই করব, চাষের জন্য। জঙ্গলের অন্য সাইডের জমি আমরা প্রেশার করব, গভমেন্টকে ওখানে জঙ্গল তৈরি করবার জন্য, বা আমরা নিজেরাই জঙ্গল তৈরি করব। কেননা আমরাই একটা ভিন্ন স্টেট। অর্থাত, পলিটিকাল পাওয়ার। ওই স্টেটকে আমার কাছে ডিমান্ড করবার কিছু নেই। যেহেতু আমি এটা করতে পারি।  তা, কমিটির মধ্যে ডিসিশন করে আমরা জমি দখল করলাম। তীর-ধনুক সহ। সমস্ত কিছু রেখে। হৈ হৈ। প্রচুর ফেটে গেল। পলিটিকালি য়্যাটাকড হলাম। চ্যালেঞ্জড হলাম। হৈ হৈ হল। যত প্রোপাগান্ডা হতে শুরু হল, অর্গানাইজেশনও বিভিন্ন ভাবে পোলারাইজড হতে শুরু করল। মানুষের একটা পোরশন আমাদের দিকে আসতে শুরু করল। একটা পোরশন ব্রেক করে ওদিকে চলে যেতে শুরু করল।

যেহেতু প্রোপাগান্ডার জায়গাটা, গ্রামীন লেভেলে, শহুরে অঞ্চলের মত নয়, অর্থাত, শহুরে প্রোপাগান্ডার ধরনে সিপিএম চ্যাম্পিয়ন হয়ে গিয়ে অন্যকে মনে করলাম যে তার অস্তিত্ত্বই নেই, এরকমটা নয়। একটা ব্যক্তির পক্ষে সেখানে সম্ভব, ওই ধরনের পশ্চাত্পদ এলাকায়, যে থ্রু আউট, টানা তার ডেডিকেশন দিয়ে, প্রোপাগান্ডা করে, গোটা ব্যাপারটাকে কিছুটা হলেও একটা য়্যাচিভমেন্টের জায়গায় নিয়ে যাওয়া যায়। তা, সেটা আমরা করতে পারলাম। স্টেপ বাই স্টেপ, প্রতি বছর। বিভিন্ন ধরনের। ক্লাব নিয়ে মুভমেন্ট। যে কোনো য়্যান্টি-সিপিএম মুভমেন্ট, একটা য়্যান্টি-স্টেট মুভমেন্ট আসলে ওটা।

আমরা দেখতে শুরু করলাম। তা, সেইখানে, এই করতে গিয়ে আমার কাছে কিছুটা প্রশ্ন এল। স্কুল টিচার, আমি বললাম, স্কুল টিচার, সে কি কোনো লোকাল পাওয়ার হোল্ড করছে? প্রথম কথা হল, লোকাল পাওয়ার হোল্ড করছে? লোকাল পাওয়ার হোল্ড করছে?

ত্রিদিব।। অবশ্যই করে। একটা স্কুল টিচার নিজের মত করে করে।

তিমির।। লোকাল পাওয়ার হোল্ড করছে? না। কী রকম ধরনের লোকাল পাওয়ার হোল্ড করছে? লোকাল পাওয়ার হোল্ড করছে — একই সঙ্গে তোমাকে স্কুল টিচার মানে এই হলে হবে না। স্কুল টিচার এবং সিপিএম করে। ব্যাপারটাকে দেখতে হবে। অর্থাত, পাওয়ারের সঙ্গে সে রিলেটেড একটা কোশ্চেন। লোকাল পাওয়ার হোল্ড করছে? কী ভাবে করছে? এক, স্কুল টিচার, শুধু সে স্কুল টিচার নয়, সে সিপিএম করে। এবং, সিপিএমের সে, ধরা যাক, লোকাল কমিটি মেম্বার। তাহলে সেই অঞ্চলের, যেহেতু সিপিএম ডমিনেটিং একটা জায়গায়, তাহলে সেই অঞ্চলের সেই সিপিএম নেতাটা কিন্তু — একটা সত্যি সত্যিই লোকাল পাওয়ার হোল্ড করে।

এইবার, আসা যাক, এইখানে, প্রশ্নটা তখন আমরা, যেটা, প্রশ্নটা যখন নেক্সট আসে, তা এই লোকাল পাওয়ার হোল্ড যে করছে উনি, এরকম ধরা যাচ্ছে, একটা লোকাল পাওয়ার হোল্ড করছে, এবার উনি কি সেই লোকাল পাওয়ারটাকে এমন ভাবে হোল্ড করছেন যেখানে উনিই একমাত্র ব্যক্তি যে রাজত্ব করতে পারে? অর্থাত, য়্যানাদার যে পাশের যে সিপিএম লিডার, একই ভাবে তার চল্লিশ বিঘা জমি আছে, এবং স্কুল টিচার। ধরা যাক, স্কুল টিচার বা ব্যাংকে চাকরি করে। ব্যাংক এমপ্লয়ি। তার সঙ্গে তার ইউনিটি আছে? না, তার সাথে কন্ট্রাডিকশন আছে? অর্থাত, এইখানে যদি আমি লোকাল পাওয়ার ক্যাপচারের জায়গায় পৌঁছই, এ কি এর সাপোর্টে আসবে? না এ চুপচাপ থাকবে, নিজের প্রোটেকশনের জায়গাটাকে বাঁচাবে? ক্যারেকটারিস্টিক্সটা কী রকম হবে? আমরা দেখলাম যে এই সিপিএম লিডার, আমি বললাম যে এই সিপিএম লিডার, আরো য়্যানালিসিসে যাওয়া যাক, এই সিপিএম লিডার এই সিপিএম লিডারের একটা ইউনিটি আছে। সে কি, একই সঙ্গে, লোকাল কমিটির ডিস্ট্রিক্ট কমিটির মেম্বার। ঠিক আছে? এবার ধরা যাক, এই এলসিএমরা কতটা পাওয়ার হোল্ড করে? এইটা স্ট্রাকচার, অর্থাত, সিপিএমের স্ট্রাকচারে যেতে হবে। অর্থাত, কমিউনিস্ট পার্টির স্ট্রাকচারে যেতে হবে। একটা স্টেট কমিটি, হ্যাঁ? তার নিচে ডিস্ট্রিক্ট কমিটি। তার নিচে…

ত্রিদিব।। জোনাল কমিটি…

তিমির।। জোনাল কমিটি। জেসি। তার নিচে লোকাল কমিটি। হ্যাঁ? এবার এইখানে এলসিএস আছে। (তিমির আবার কাগজ পেনে এগুলো লিখতে শুরু করে, যা বলছে, সেগুলোই।) হ্যাঁ? এখানে জেসিএস আছে। এখানে ডিসিএস আছে। এখানে সেক্রেটারি আছে। এসসি, সেক্রেটারি আছে। ঠিক আছে? এসসি, সেক্রেটারি, ডিসিএস, জেসিএস। (‘এসসি’ মানে স্টেট কমিটি।) এই ডিসিএস এসসি সেক্রেটারির সঙ্গে যুক্ত, যে টোটাল পাওয়ারটা হোল্ড করে।

ত্রিদিব।। কিন্তু, আর একটা জায়গাকে ভাবলি না কেন? ধর স্টেট সেক্রেটারি, এই মুহূর্তে দেখ, বিমান বসু, প্রায় একটা সাইফার ক্যারেকটার। তাকে বসিয়েছে…

তিমির।। আমি বলছি… এইটা তো স্টেট কমিটি তো? আমি প্রথমে পাওয়ার স্ট্রাকচারের জায়গাটায় যাই। সিপিএম মানে…

ত্রিদিব।। তুই সিপিএম মানে এখানে স্টেট সেক্রেটারিকে ধরছিস। কিন্তু, স্টেট সেক্রেটারির চেয়ে তো অনেক বেশি পাওয়ারফুল সিএম।

তিমির।। উঁহু। আমি স্টেট কমিটিকে ধরছি। তার উপরে… স্ট্রাকচারটা ধরছি।

ত্রিদিব।। আর তুই মুখ্যমন্ত্রী-টন্ত্রী ওই স্ট্রাকচারটাকে আলাদা করে রাখছিস?

তিমির।। দুটোর সঙ্গে… স্টেটের সঙ্গে সিপিএম কোনোভাবেই বিচ্ছিন্ন করা যায়না — এটাই আমি প্রুভ করতে চাইছি।

ত্রিদিব।। না, আমি বলতে চাইছি, এখানে (কাগজে দেখিয়ে) এই যে স্টেট কমিটির হায়েস্ট অথরিটি, স্টেট কমিটির সেক্রেটারিকে তো হায়েস্ট অথরিটি ধরলি — কিন্তু তা তো নয়। অলরেডি তো এইটা দাঁড়িয়েছে…

তিমির।। এ তো হায়েস্ট অথরিটি নয়ই, এর পরে আছে ন্যাশনাল কমিটি।

ত্রিদিব।। না। স্টেটের লেভেলে হায়েস্ট অথরিটি কে?

তিমির।। মুখ্যমন্ত্রী।

ত্রিদিব।। হ্যাঁ, মুখ্যমন্ত্রী। হওয়ার কথা পার্টি সেক্রেটারির। কিন্তু, তা তো নয় সিপিএমে। এবং এই মুহূর্তে সেটা ভয়ানক ক্লিয়ার। অনিল বিশ্বাস থাকা অব্দি, অতটা ক্লিয়ার ছিল না।

তিমির।। অনিল বিশ্বাস কেন? আমরা যখন কাজ করছি তখন কিন্তু শৈলেন দাশগুপ্ত।

ত্রিদিব।। হ্যাঁ, সেও সত্যি, অনেকটাই…

তিমির।। এবং পার্টির কমিটি — পার্টি বড় না গভমেন্ট বড়, এক্ষেত্রে গভমেন্টে যারা ছিল, বরাবরই, মানে, জ্যোতি বসু বরাবরই কোনঠাসা হয়েছে। কারণ, পার্টির কমিটিকে, অর্থাত, পার্টির স্ট্রাকচারকে হোল্ড করেই এই বুদ্ধ ভট্টাচার্যরা কিন্তু আজকের এই পোজিশনে এসেছে। নাহলে, অনেকদিন আগেই জ্যোতি বসুরা গভমেন্টকে চ্যাম্পিয়ন করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল।

ত্রিদিব।। এটা একদম ঠিক কথা। শৈলেন দাশগুপ্ত অব্দি কিন্তু পরিস্কার, অনিল বিশ্বাস অব্দিও ছিল, বদলাচ্ছিল সেটা ক্রমে…

তিমির।। তো, সেটা সত্যিই ইন্টারেস্টিং, সেটা ওই দিকেই যাবে — মানে এখন আমার মনে হয় — ওটা ওই দিকেই যাবে। যেতে বাধ্য। কেন? সেটা পরের প্রশ্ন। আগে আসা যাক — পার্টির নীতি বদলেছে, তাই কারণে ওটা হয়েছে।

ত্রিদিব।। আচ্ছা, ঠিক আছে। তুই যে আলোচনাটা করছিলি, সেখানটায় ফেরত আয়।

তিমির।। তো (আবার কাগজটা দেখিয়ে), এসসি সেক্রেটারি আছে এখানে। তার উপরে যা যা যা থাক, আমি স্টেট নিয়ে ভাবছি। স্টেট কমিটিকে ধরছি। এই ডিসিএস মেম্বাররা, অর্থাত, ডিসি সেক্রেটারি যে, ডিস্ট্রিক্ট কমিটির প্রত্যেক সেক্রেটারি, কিন্তু, স্টেট কমিটিতে আছে। কেউ কেউ স্টেট সেক্রেটারিয়েট বডিতে আছে। তাহলে একটা পাওয়ার স্ট্রাকচার রয়েছে। যেটা পিরামিডের মত। এটা থেকে কেউ কিন্তু বিচ্ছিন্ন নয়। প্রথম কথা হচ্ছে, আমরা এই জায়গাটায় কনক্লুড করি, সিপিএম কি একটা রেজিমেন্টেড পার্টি না নয়? ততটা পর্যন্ত ভাবনা কিন্তু আমার আসেনি। এবার বলি। তাহলে, আমি এই স্ট্রাকচার দেখিয়ে ওদের বোঝাতে পারলাম, দ্যাট দে আর নট দি অনলি… লোকাল… লোকাল পাওয়ার। দে আর দি সেন্ট্রাল পাওয়ারের একটা পার্ট।

তাই, পুরোনো কায়দায় তুমি যদি এই জমিদারকে, এই লোকাল কমিটির মেম্বারকে পুরোনো জমিদারের সঙ্গে তুলনা করে স্ট্র্যাটেজি ঠিক করো, তাহলে সেই স্ট্র্যাটেজিটার মধ্যে ভুল থাকতে বাধ্য।

ত্রিদিব।। অবভিয়াসলি। কারণ, এটার মধ্যে অনেক জটিল একটা স্টেট স্ট্রাকচার এখন আছে।

তিমির।। হ্যাঁ। তো, সেই জায়গাটা থাকতে বাধ্য। তাহলে, সার্চিং কী? প্রথম কথা হল…

ত্রিদিব।। আচ্ছা, এক সেকেন্ড। আচ্ছা, আজকে কোনো ভাবে তোর স্মৃতি তোর সঙ্গে কোনো খেলা করছে না তো? মানে, এতটা ইনোসেন্ট লজিক নিয়েই অনেকে সেই সময় কথা বলেছিল? তুই নিশ্চিত?

তিমির।। দেখো, এটা নিয়ে এত বিতর্ক হয়েছে, এটা ভুলে যাওয়ার মত বিষয় আমার নয়। মানে এতটা আইকিউলেস নয়, যে, যেটা নিয়ে আমি পাঁচ বছর ধরে স্ট্রাগল করেছি, অর্থাত, শুরুর দিন জয়েন করবার পর থেকে আমাদের স্ট্রাগল ছিল, এবং লাস্ট ডে, আমি যখন স্ট্রাগল করেছি, তখন আমার কাছে ফরম্যাটেড ডকুমেন্ট ছিল আমার হাতে, মানে, আমি যেটা ফরম্যাট করে দিয়েছি।

ত্রিদিব।। জাস্ট একজন জমিদার, এবং একজন লোকাল এজেন্ট পাওয়ারের, এটা বলেই মনে করছিল?

তিমির।। অকৃষক জমির মালিকই হচ্ছে জমিদার। এই থিয়োরি, মাও-এর এই থিওরাইজেশনের উপর দাঁড়িয়ে, বেস করে ওরা চালানোর চেষ্টা করছিল। এবং তারা যে খুব আইকিউলেস  এরকমটা নয়। তারাও প্রচণ্ড ভাবে সেটাকে বিশ্বাস করতে লেগেছিল। য়্যান্টি-সিপিএম জায়গা থেকে য়্যাকচুয়ালি। য়্যান্টি-সিপিএম জায়গাটা এখানে খুব ভাইটাল। ডমিনেট করছিল। যেখানে থিওরিকে, বা ফর্মেশনকে জটিল করে তুলছিল।

ত্রিদিব।। মানে সিপিএম এখানে অত্যন্ত বড় একটা ভ্যারিয়েবল।

তিমির।। এবং আমার কাছেও তাই। আমার কাছেও তাই। সিপিএমকে ফেস না-করে ভারতের বিপ্লবকে কমপ্লিট করা সম্ভব নয়। আজকের এই পোজিশনে এরকম জায়গায় চলে গেছে।

ত্রিদিব।। কিন্তু তুই এটাকে এইটুকু অন্তত বুঝতে চাইছিস, যে সিপিএমের পজিটিভ রোল যেটুকু ছিল, সেটাকে ধরে, বুঝে নিয়ে, সেটাকে যথেষ্ট স্বীকৃতি দিয়ে, এই পলিটিক্সটায় এগোতে হবে। আর, এদের ছিল, যে কোনো ভাবে সিপিএমকে নিগেট করা…

তিমির।। সিপিএমকে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রশ্ন নয়। সিপিএম যে প্রসেসে…

ত্রিদিব।। আমি ‘স্বীকৃতি’ বলতে ওটাকেই বুঝিয়েছি…

তিমির।। একটা জিনিস — তোমাকে যেটা দেখাতে চাইছি — আমরা কি কখনো অস্বীকার করতে পারি ইন্ডিপেন্ডেন্স মুভমেন্টে কংগ্রেসের রোলকে? এবং কংগ্রেসের চূড়ান্ত মাসবেসকে? মহাত্মা গান্ধীর মাসবেসকে? কংগ্রেসকে বিচ্ছিন্ন ভাবে, তখন তো কমিউনিস্ট পার্টি ছিল, তারা কৃষক সংগ্রাম গড়ে তুলেছিল তেলেঙ্গানায়, তারা কংগ্রেস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কখনো তাদের এক্সিস্টেন্সকে রাখতে পেরেছিল ? বরঞ্চ কংগ্রেসের মুভমেন্টের মধ্যে তাকে থাকতে হয়েছিল। এটার মধ্যে কোন ভুল ব্যাখ্যা আছে কি? বা, ভুল বলছ তুমি? করছ না। ফলে, তেভাগা থেকে কন্টিনিউয়াস, নকশালবাড়ি পর্যন্ত, নকশালবাড়িও সিপিএমের মধ্যে হচ্ছে… সেখান থেকে ব্রেক করছে সিপিএম…

ত্রিদিব।। আমি ‘স্বীকৃতি’ বলতে — স্বীকৃতির উল্টোটা এখানে ‘অস্বীকার’ — মানে, সিপিআইএমের যে একটা যথেষ্ট অস্তিত্ত্ব রয়েছে, রাজনৈতিক, এটাকে স্বীকার করে নিয়ে তুমি এবার বোঝার চেষ্টা করো… হয়েছে?

তিমির।। শুধু অস্তিত্ত্বের প্রশ্ন নয়… সে কিছুটা হলেও ইকনমিক স্ট্রাকচারে বদল নিয়ে এসেছিল। এই বদলটা নিয়ে এসেছিল সোভিয়েত সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থে। তুমি… সোভিয়েত অনেকদিন আগে সাম্রাজ্যবাদী নকশালবাড়িরা বলেছিল… সোসাল… মানে সামাজিক সাম্রাজ্যবাদী, সোসালিস্টিক ইম্পিরিয়ালিজম।

ত্রিদিব।। তুই যে ভাবে বললি, এতটা সরল বলে এই জায়গাটাকে আমি ধরি না, এনিওয়ে, হ্যাঁ, তুই তোর যুক্তিটা বল।

তিমির।। সামাজিক সাম্রাজ্যবাদী বলে তাকে দেখানো হয়েছিল। কিন্তু সেটা… সেটা করা হয়েছিল তো। কারণ, বিগ পুঁজি… মানে… অস্বীকার করা হোক আর না-হোক, সিক্সটিটু-এর পর, এই, হ্যাঁ, সেভেন্টিটু-এর পর, ব্রেজনেভের সময় থেকে, যে বিগ ক্যাপিটাল ঢুকতে শুরু করেছিল, সেটাই ভারতবর্ষের কৃষিকে সবচেয়ে বেশি হার্মফুল করে… মানে, ক্ষতিকারক জায়গায় নিয়ে গেছিল।

ত্রিদিব।। আচ্ছা, ওই আলোচনাটা… আমরা অন্য জায়গায় চলেও যাচ্ছি। দু-নম্বর, আমার মনে হয়, এখানে আরো অনেকগুলো জটিলতা আছে, পোস্টওয়ার পলিটিক্সের সঙ্গে অনেকটা সম্পর্ক আছে… তুই, আমরা যেখানটায় আলোচনা করছিলাম সেখানটায় ফেরত আয়।

তিমির।। হ্যাঁ। তো সেইখানটায় দাঁড়িয়ে, দাঁড়িয়ে, আমি যে, গোটাগুটি তখনো, ফরম্যাটেড পোজিশন আমার নেই… এবার ততদিন পর্যন্ত ওইখানটায় আটকে দেওয়া গেল, যে না, এরাই শ্রেণীশত্রু  এরকমটা নয়। ঘটনা হচ্ছে, এটাও এখনো পরিষ্কার নয়। এই জায়গা থেকে এল। তার মানে? আরো ইন্টেন্সিভ ওয়ার্ক। ওয়ার্কের মধ্যে দিয়ে, কোন জায়গা থেকে বাধা আসতে শুরু করছে সেটা…

ইন-দি-মিন-টাইম, নাইন্টিএইটে তৃণমূল য়্যারাইজ করল। তৃণমূল ভীষণ ভাবে এল। এবং, আমাদের আশেপাশে তৃণমূল ভাসিয়ে নিয়ে গেল, সিপিএম পালিয়ে গেল। মেরে কেটে একদম শেষ। এলাকার থেকে এলাকায়। কেশপুর গড়বেতায়। সেখানে দেখা গেল আমাদের কোনো ভূমিকা নেই। য়্যাকচুয়ালি, তৃণমূল সিপিএমের লড়াই, তৃণমূলের… মানে জাস্ট অভ্যুত্থানের ইনসারেকশনের মত জায়গা হল মানে… হাজারে হাজারে মানুষ হাজারে হাজারে মানুষ তৃণমূলের হয়ে নেমে পড়ল মাঠে ময়দানে।

ত্রিদিব।। এটা কী ভাবে হল?

তিমির।। পরবর্তীতে সেটা আসছে। সেইখানে দাঁড়িয়ে, তো আমার মাথায় খেটে গেল, এইটা পারল কী করে? এটা তো সম্ভব না? স্টেট পাওয়ারে ওর হেল্প পেয়েছে ঠিক আছে, কিন্তু হাজার হাজার মানুষ তো মবিলাইজড হয়। আমরা তো এখনো হাজার হাজার মানুষকে মবিলাইজড করতে পারিনা। হাজার হাজার মানুষ মবিলাইজড হয়ে গেল। একটা বিরাট অঞ্চল জুড়ে যদি সেটা সম্ভব হয়…

ত্রিদিব।। এবং, স্টেট পাওয়ার ছাড়া…

তিমির।। স্টেট পাওয়ার ছাড়া। সেটা তো ইনসারেকশনও হতে পারে সেই লোকালের জন্যে। সেটা যদি ব্যর্থও হয়, সেখান থেকে তো আমি একটা হাজার মানুষের বাহিনী তৈরি করতে পারি। তখন আমি মাও নিয়ে আবার পড়তে পড়তে দেখলাম, যে, মাও-এর কিন্তু প্রথম থেকেই একটা সেনাবাহিনী ছিল। মাও যখন জনযুদ্ধের কথা বলছে, তখন তার একটা রেডফোর্স তৈরি। সাংহাইয়ে যে ইনসারেকশন হচ্ছে, সেই ইনসারেকশনে শ্রমিকশ্রেণীর একটা বিরাট অংশ স্টেটের আক্রমণে ভিলেজে চলে গেছে। এবং সেখানে খুব খারাপ অবস্থা। পার্টির খুব খারাপ অবস্থা। কিন্তু শ্রমিকগুলো আছে। তার একটা সাবজেক্টিভ ফোর্স রয়েছে। সৈন্যবাহিনী নয়, তুমি সাবজেক্টিভ ফোর্সটা দেখো। যে ফোর্সের উপর দাঁড়িয়ে তুমি লড়াই করছ। সাবজেক্টিভ ফোর্সটা রয়েছে।  তাদেরকে নিয়ে, উনি বেশ কিছুটা অংশকে নিয়ে উনি চলে যাচ্ছেন। হুনানে। এবং সেখানে গিয়ে কৃষকদের জাগরণ করানোর চেষ্টা করছেন। এবং চিনের কন্ডিশনও অনেক বেশি হেল্পফুল ছিল যে, একটা পাহাড়ের উপরে, যেখানে কোনো স্টেট পাওয়ার নেই। কিছুই নেই। ওখানে বসে দিব্যি তারা… কাজ চালিয়ে যাচ্ছে…

ত্রিদিব।। এবং সময়টাও অনেকটা পিছিয়ে, তখন কমিউনিকেশন ইত্যাদিও অনেক…

তিমির।। অনেক পিছিয়ে…

(এখানে প্রথম নব্বই মিনিটের ক্যাসেটের প্রথম দিক শেষ হল।)

ত্রিদিব।। এবার, যেখানে কথা হচ্ছিল — সেই চিনের আলোচনাটা তোর উপর কী প্রভাব ফেলল?

তিমির।। চিনের আলোচনা কেউ করেনি।

ত্রিদিব।। না, চিন নিয়ে এই যে পড়াশুনোটা করলি। আলোচনা বলতে, তুই তো চিন নিয়ে লেখাপড়া শুরু করলি, সেটা তোর নিজের রাজনীতিতে…

তিমির।। খুব বেশি আমার উপর প্রভাব ফেলেছিল, এমনটা নয়। কোনো ভাবেই, লেনিনের উপরে আমি কোনো ভাবেই, অন্য কোনো প্রভাবকে আমার… মাও-এর তিনটে লেখা ছাড়া। হুয়েনান কৃষক আন্দোলনের রিপোর্ট, দ্বন্দ্বমূলক মানে ডায়ালেক্টিকাল মেটিরিয়ালিজম, ওই দ্বন্দ্ব প্রসঙ্গে একটা…

ত্রিদিব।। অন কন্ট্রাডিকশন।

তিমির।। অন কন্ট্রাডিকশন। এবং আর একটা হচ্ছে, লেখাটা খুব ইম্পর্টান্ট লেখা, সেটা হচ্ছে, ইয়ুথদের নিয়ে লেখা, যুবকদের প্রতি একটা লেখা আছে।

ত্রিদিব।। হ্যাঁ, আমিও নামটা মনে করতে পারছি না, হ্যাঁ, ওটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ লেখা।

তিমির।। খুব গুরুত্বপূর্ণ লেখা। এই তিনটে লেখাকে আমার ভীষণ রকমের, মনে হয়েছে, আর, মিলিটারি স্ট্র্যাটেজিতে মাও অবিসংবাদিত, এটাও মনে হয়েছে। মিলিটারি স্ট্র্যাটেজির প্রশ্নে। এবং, সিচুয়েশনকে ইউজ করবার মত, মানে, বিভিন্ন সিচুয়েশনকে ব্যবহার করবার যে যোগ্যতা, একটা হাইলি কোয়ালিফায়েড ইন্টেলেক্ট আরকি। ভীষণ রকমের কোয়ালিটি। যে ফিলোজফি, ম্যাথামেটিক্স, এবং মিলিটারি য়্যাকশনস, মানে যুদ্ধবিদ্যা — এই তিনটেতে সমান গতি ছিল। সেক্ষেত্রে, অনেক বেশি থিওরেটিকাল পোজিশনের উপরে দাঁড়িয়ে, জাস্ট সিচুয়েশনকে, মানে, বৈপ্লবিক চেতনার উপরে দাঁড়িয়ে, সেটাকে কোনো রকম সামরিক বিদ্যা না-ছাড়াই, সত্যি সত্যি জনগণের উপরে নির্ভর করে একটা অভ্যুত্থান ঘটে দেওয়া — অভ্যুত্থানের সঙ্গে জনযুদ্ধের পার্থক্যটা বোধহয় এখানেই। যে অভ্যুত্থান অনেক বেশি মাস ডিপেন্ডেন্ট। জনগণের উপর ডিপেন্ড করে হয়।

তো, আমি অতটা শিওর নই, ব্যাপারগুলোকে, সমস্ত কিছুই যে খুব শিওর, বা, পড়াশুনাটা আমি চালিয়ে গেছি এরকমটা তো নয়। ছেড়ে দেওয়ার পর কী রকম একটা লেথার্জেটিক হয়ে গেছি। কারণ, ছেড়ে দেওয়ার পর তো, পালাতে হচ্ছে, পালাতে হচ্ছে, পালাতে হচ্ছে… খাটতে হচ্ছে, বেসিকালি একটা জিনিস, আমি বললাম না, থিংকিং প্রসেস, সেই সময় বলছিল আমাকে, যে ওরা ভাবতে শুরু করেছিল ডব্লু বিসিএস অমুক তমুক, এ ভাবছে আমি সাংবাদিক হব, অমুক হব, অমুক তমুক হব, মানে যার ইন্টেলেকচুয়াল, বিরাট ইন্টেলেক্ট আমার আছে, এবং আমি, এ দিয়ে আমি আমার যোগ্যতা, যোগ্যতাকে প্রমাণ করবার জায়গাটাও ঠিক ওরকম ওরকম… (এই প্রসঙ্গটা আমাদের টেপকৃত কথোপকথন শুরু হওয়ার আগের, যারা যারা বসে গেছে ওদের রাজনীতি থেকে, সেই ছেলেমেয়েদের অনেকেরই তারপর কী ঘটে, সেই প্রসঙ্গের উল্লেখ থাকছে এখানে)… যোগ্যতাকে প্রমাণ করবার জায়গা না, এদের, সবথেকে কঠিন অবস্থার মধ্যে থেকেও আমি একটু, মানে, শাক  তুলে এনে, সে জঙ্গল থেকে শাক তুলে নিয়ে এসে খেয়েও, সামান্য কিছু বানিয়ে, সেটা বিক্রি করে অন্নসংস্থান করে নিয়ে আমার সারভাইভালের কোশ্চেনটা… করতে পারি। মানে, সেইখান থেকেও শুরু হতে পারে — এই ভাবনাটা — আসলে, আমার মত পোজিশনে গিয়ে পৌঁছলে, তবেই হয়। নাহলে হয়না।

কেননা, এইটা ঘটনা যে, সেই সময়ের যে এসপি-রা এসেছিল, অর্থাত, গড়বেতার পরবর্তী কালের যে, ফ্লাশ আউট করল, ঝাপুর ঘটে যাওয়ার পর, যারা এসেছিল তারা আমাকে যে নামে চিনত আরকি, বাই নেম, সেই নামে আমাকে যদি পেয়ে যেত, তাহলে, গুলি করে সঙ্গে সঙ্গে একটা বিরাট সাকসেস এটা দেখাতে পারত। এবং তখন আমি ছাড়া আর কারোর নামই সেরকম ভাবে…

ত্রিদিব।। যেমন কাঞ্চনের কথা বলছিলি, যাকে অকারণে মেরে দিল… (এটাও টেপ করার আগের একটা আলোচনার সূত্র ধরে)

তিমির।। সেই সাকসেসের থেকেও অনেক বড় সাকসেস দেখাতে পারত। কারণ, আমিই, আমিই একমাত্র লোক তখন। আমার নামই পেপারে এসেছে। বিভিন্ন জায়গায় প্রোপাগান্ডা হয়েছে। কবিতাও লিখে ফেলেছে কে কে যেন… সেই কবিতা আবার আমার হাতে এসে পৌঁছচ্ছে। বুঝতে পারছ ? এরকম একটা ফিগার হয়ে যাচ্ছি। মানে, আমি, ফিলিংস-এ নেই ওটা, আমার একদম ফিলিংস-এ নেই। কেননা, এখনো তো তুমি আমায় দেখতে পাচ্ছ, যে, ওটা ফিলিংস-এ থাকার মত কোনো কারণও নেই।

সেটা ঘটেছিল পরে। কিন্তু, এইগুলো চলছিল। এইবার কী হচ্ছে, এইবার কী হচ্ছে তুমি দেখো, পার্টির মধ্যে ফিরে যাই আমি আবার। যখন এরিয়া কমিটির মিটিংগুলো হচ্ছে, এই ধরনের ডিসকাশনগুলো হচ্ছে, পলিটিকাল ডিসকাশনগুলো হচ্ছে, তার সঙ্গে মুভমেন্টের আলোচনা হচ্ছে। যে যে মুভমেন্টগুলো করা হচ্ছে, তার য়্যানালিসিসগুলো হচ্ছে। সেই য়্যানালিসিসে বেশির ভাগ লোক পার্টিসিপেট করতে পারছে না। খুব টেকনিকাল মেথডে চলে যাচ্ছে। ভীষণ চেজিং হত ব্যাপারগুলো। যে, তুমি এটা করোনি কেন? ডিসিশন হয়েছে, করোনি কেন? ডিসিশন করে, না-করে, তুমি কী প্রমাণ করতে চাইছ? তো, বিভিন্ন হত। সম্ভব নয়, অনেকে অনেক বলত, কেউ পুরোটা করে উঠতে পারত না, কেউ পুরোটা করত, কেউ কখনো কখনো বেশ কিছুটা করত। কেউ হয়ত অন্য ভাবে সেটা করে ফেলত। পুরোটাই ডিসিশন মোতাবেক হতনা। একটা লাস্ট মিটিং-এ আমরা বললাম, আমি বললাম, যে দেখুন, আমার কাজে, গোটাটাই আমি একটা ডিসিশন করে যাচ্ছি, মাঠে যখন করছি, কাজ করতে গিয়ে সেই ভাবে কিন্তু গোটা ব্যাপারটা কোনো ভাবেই হচ্ছে না। ফিল্ড বলে দিচ্ছে, এই ভাবে করতে হবে। সেই অনুযায়ী আমি ডিসিশন নিচ্ছি। তখন একজন সেন্ট্রাল কমিটির লিডার ছিলেন, তিনি বললেন, তা, সেটাই তো ঠিক। যে অর্গানাইজার, তাকে… না-হলে তুমি অর্গানাইজার কেন? তুমি যদি তোমার নিজের মাটিকে বোঝো… সিদ্ধান্ত নিচ্ছি, কী ভাবে করবে তা তো বলে দেওয়া যায়না। তা, কী ভাবে করবে তুমি, তা তো ওখানে গিয়েই ঠিক করতে হবে, এটাই তো সবার কাছে ডিমান্ড আমাদের। যারা সেন্ট্রাল অর্গানাইজার, য়্যাট লিস্ট, তারা গাইড করতে পারে ফিল্ডে গিয়ে। দে আর দা লিডার।

এই ভাবে তো আমি নেতা হতে শুরু করলাম। এরিয়া কমিটির সেক্রেটারি হয়ে গেলাম। ডিস্ট্রিক্ট কমিটি তৈরি হয়ে গেল। জাস্ট আমার উপর বেস করে। ডিস্ট্রিক্ট কমিটি তৈরি হল। বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন কাজের ওয়ার্ক ডেভেলপমেন্ট হতে শুরু করল। এইবার, গড়বেতা এবং তৃণমূলের প্রশ্নটায় তো আমি এসেছিলামই, জাস্ট, দেখালাম যে…

গড়বেতা এবং তৃণমূলে তখন, তার পাশের একটা ব্লকে আমি কাজ করতাম। সেই ব্লকে তখন একটা কাজের ডেভেলপমেন্ট এসেছে। সেখানে, কখনো সিপিএমকে ফেস করতে হয়েছে, কখনো, কোনো কোনো জায়গায়, তৃণমূলকে ফেস করতে হয়েছে। বেশ কিছু জমি ডিস্ট্রিবিউটেড করেছি আমরা। বেশ তিন চারটে মজুরি বৃদ্ধির স্ট্রাগলকে আমরা সাকসেসফুল করেছি। তো, সেইখানে দাঁড়িয়ে, সেইখানে দাঁড়িয়ে, আরো… এবার সেটাকে দিয়ে… একদম পার্টি যে ফর্মেশন চাইছে, সেই ফর্মেশনে পৌঁছে যেতে পারছে তা না। কিন্তু, তীব্র সংঘাতের মধ্যে দিয়ে ওখানে একটা স্কোয়াড ফর্মেশন হয়েছিল। এবং, আমি আল্টিমেটলি ওটাকে মেনে নিয়েছিলাম। কেননা, পার্টির লাইন অফ য়্যাকশন, আমি, সাপোর্টে গিয়ে, বললাম, ঠিক আছে। শুরু থেকে সশস্ত্র সংগ্রামের প্রশ্ন, ছোট ছোট আর্মস, এমনিতেই ছোট ছোট আর্মস তো ব্যবহারের চল ছিলই, কারণ, সেটা হচ্ছে আত্মরক্ষার জন্যে।

অর্থাত, একজন সেন্ট্রাল অর্গানাইজারকে, সেটা, কী ভাবে খেতে হয়, আমার লাইফ স্টাইলের ব্যাপারেও বলব। যে, শুরুতে আমার লাইফ, জীবনে, মানে, কী ভাবে আমাকে খাবার যোগাড় করতে হয়েছিল। প্রথম দিকে। সেটা পরের প্রশ্ন। কিন্তু, গড়বেতায় এক জনকে ডেপুট করা হল। এবার, তার সঙ্গে আর এক জনকে ডেপুট করা হল। সিচুয়েশন অনুযায়ী। তখন কী হয়েছে, তৃণমূল ঘরে ঘরে অস্ত্র পৌঁছে দিয়েছে। এবং, পলিটিকালি এডুকেটেড নয় এরকম একটা অংশের হাতে প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র আছে। সে কোন দিকে যাবে? সে তো লুম্পেনাইজড হবে। সে আর্মসের ব্যবহার জানেনা। অস্ত্রের ব্যবহার জানেনা। পলিটিকালি, পলিটিকালি সে অস্ত্রকে ব্যবহার করেনা। সে ব্যবহার করতে শুরু করেছে। পরবর্তী কালে, পলিটিকাল পাওয়ার যখন সে হোল্ড করেছে, সে তো য়্যান্টিসোশাল কাজ, ডাকাতি, রেপ, অসংখ্য উদাহরণ তৈরি হয়। যার শেষ নেই। তাহলে, তৃণমূল গড়বেতা কেশপুরের জন্য প্রধান শত্রু তে পরিণত হয়েছিল সেই সময়। তবে সেই যে ক্ষোভ, সিপিএমের যে…

ত্রিদিব।। কার প্রধান শত্রু ?

তিমির।। মানে, জনগণের শত্রু ।

ত্রিদিব।। মানুষের শত্রু ?

তিমির।। জনগণের শত্রু । সেখানে তো আমাদের কাজ নেই… জনগণের শত্রু তে পরিণত হয়েছিল। মানুষ হাঁফ ধরে গেছিল, একটা বছরে। এটা ঘটনা। তৃণমূল যদি দুটো — বছরের মধ্যে মানুষের মধ্যে হাঁফ ধরিয়ে দিয়েছিল। বেশ কিছু অঞ্চল জুড়ে। যেটাকে ক্যাপিটালাইজ করতে — পরবর্তী কালে…

ত্রিদিব।। এখানে একটা জিনিস আমাদের ফাঁক রয়ে গেল। তৃণমূল কী ভাবে হঠাৎ করে এই জায়গাটা তৈরি করল? এটার সম্পর্কে তোর মতামত কী? মানে, এই যে প্লাবিত হয়ে গেল গড়বেতা কেশপুর , তৃণমূলী রাজনীতিতে… এটা…

তিমির।। এটা আমি সেই সময়েই যে জানতে পেরেছিলাম এরকমটা নয়। তবু, ধাপ বাই ধাপ এগোচ্ছি, বলছিলে, এই রিয়ালাইজেশনটা আমার এসেছিল অনেক পরে যে, কেন মানুষ তৃণমূল বা কর…

ত্রিদিব।। করেছে… ?

তিমির।। করেছে। কাজের মধ্যে দিয়েই ওটাতে ফিরে আসতাম, মানে, কেন মানুষ ওটা হয়েছিল, এবং, কেন আমরা কী করেছিলাম। বা, আমরাও কেন সাকসেসফুল হয়েছিলাম।

ত্রিদিব।। ঠিক আছে, সেটাই ভালো, তুই তোর মত এগো। আমি ভেবেছিলাম তুই এটা ভুলে…

তিমির।। অদ্ভুত সেই জায়গা। এটা ভীষণ ইন্টারেস্টিং। তৃণমূল এক ভাবে সাকসেসফুল হল। এবং গড়বেতাতেও আমরা সাকসেসফুল হলাম। এবং সেটা অন্য ভাবে। দুটো দু ধরনে হল।

ত্রিদিব।। ঠিক আছে, তুই এটায় ফেরত আসিস, আপাতত যে ভাবে এগোচ্ছিস এগো।

তিমির।। তো, সেইখানে দাঁড়িয়ে যেটা দেখা হল, যে, তৃণমূল যেটা করল, একটা ওয়ার সিচুয়েশন তৈরি হল। মাঝেমধ্যেই এক দল সিপিএম ও এক দল তৃণমূলের মধ্যে মারপিট হয়, এবং, এক জন দু জন করে মারা যায়, তারপর ডিসপার্সড হয়ে যায়। পুলিশ আসে অনেক পরে। এ ভাবে বহু দিন ধরে, মানে, প্রায়, একটা বছরে প্রায় হাঁফ ধরে গেল এই লড়াইয়ে। লড়াই হয়ে গেল, ওরা য়্যান্টিসোশালে পরিণত হল শুধুমাত্র এইটার জন্যে নয়, সিপিএম কন্টিনিউয়াস ওখানে পেনিট্রেট করার চেষ্টা করল, জায়গাকে উইনওভার করার চেষ্টা করল। কারণ, বিধানসভা ইলেকশন আছে। ওই জায়গাটাকে রিভাইভ করতে না পারলে, কেশপুর গড়বেতাকে মডেল খাড়া করে দিয়েছে, মমতা ব্যানার্জি ততক্ষণে। গোটা পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে হইহই ফেলে দিয়েছে, কেশপুর গড়বেতা বানিয়ে দেব। মানে, সেখানে সিপিএমের কোনো অস্তিত্ত্ব নেই। ভোট হলে ভোটও হয়না। মানে, গোটা, গোটা সিট তৃণমূল। এবং, ঘটনা হচ্ছে, পরবর্তী কালে যখন সিপিএম দখল করল, আমরা দেখেছিলাম যে, মাস সাপোর্ট তৃণমূলের দিকে ছিল। নাহলে ছোট-আঙারিয়া ঘটল কোথায়? পুরো গ্রামের পর গ্রাম তৃণমূল কংগ্রেস হয়ে গেছিল। হ্যাঁ। এটা কেন হয়েছে?

এবার ধরো, এবার ধরো, ছোট ছোট ডিসকাশনের কথা বলি। এর পরে যখন, আমি যাচ্ছি গড়বেতায়, কখন যাচ্ছি? প্রচণ্ড টেরর। গড়বেতায় একটা, আমাদের এরকম, ভিলেজ ক্যাম্পেন হত।

ত্রিদিব।। এটা কত সাল?

তিমির।। এটা নাইন্টিএইট। ভিলেজ ক্যাম্পেন হত। খুব ফাস্ট গেছে লাইফটা। তার জন্যে এত গড়গড় করে এগোচ্ছে গোটা ব্যাপারটা। এক একটা বছর টুক টুক করে, পার হয়ে যাচ্ছে। ছোট ছোট ব্যাপারগুলো আমি বাদ দিয়ে যাচ্ছি। এর মধ্যে অনেক ইন্টারেস্টিং, আরো ছোট ছোট ব্যাপার আছে।

ত্রিদিব।। আন না, যতটা পারিস, আন।

তিমির।। আনব, আনব, পরে, পরে আনব ধীরে ধীরে। কতকগুলো পার্টে ভাগ করে নিলে সুবিধা হয়। একটা, পলিটিকাল পার্টটা হয়ে যাক। তো, সেই জায়গাটায় দাঁড়িয়ে, দেখো তুমি, কী হয়েছে, ওখানে, দুজনকে পাঠাল, ভীষণ টেররের কন্ডিশনে। একজন, সে হচ্ছে সেখানকার ভূমিপুত্র। ওই যে, যে আমাকে ছেড়ে দিয়ে গেছিল। তো, সে, শহর থেকে আর এক জনকে পাঠানো হয়েছিল। তার প্রচুর ভাইসেস ছিল। প্রথমত, তার ভীষণ হোমসিকনেস ছিল। গড়বেতায় কাজের ক্ষেত্রে, স্টুডেন্টদেরকে, বিভিন্ন স্টুডেন্ট, এইখানকার কিছু স্টুডেন্ট, এবং, গ্রামের কিছু লিটারেট, টিম বানিয়ে ভিলেজ ক্যাম্পেন টিম করা হত। ভিলেজে গিয়ে ক্যাম্পেন করতে হবে। দিনের বেলা, গ্রামে গ্রামে ঘুরে ঘুরে, সেখান থেকে, গ্রামের মানুষের কাছ থেকে, খাবার পেলে খাও, তাদেরকে গান শোনাও, বিপ্লবী গান শোনাও, বিপ্লবী প্রচার করো, পুস্তিকা বিলিবণ্টন করো। গ্রামকে গ্রাম, তিরিশখানা গ্রাম, বা, পনেরোখানা গ্রাম, এরকম একটা করে দেওয়া হত। তৃণমূলের দ্বারা কোনো কোনো জায়গায় ওরা হ্যারাসড হল। তারপর, ওখানে যে পলিটিকাল কর্মীদেরকে ডেপুট করা হয়েছিল, তাদের দ্বারা কোনো রেজিস্টান্স হলনা। তার আগে তারা রিপোর্ট দিয়েছিল, তারা দুটো গ্রামে বেশ ভালো জায়গা করেছে। তাদের নিয়ে কোনো রকম জমায়েতও তো করতে পারল না, রেজিস্টান্সও তারা দিতে পারল না। ঠিক আছে।

ত্রিদিব।। তৃণমূল ওদের কী করল? মারল? না, মারা অব্দি গেল না?

তিমির।। মারল, মারল। হাতও তুলেছিল। ওই টিমটা প্রায়, প্রোপাগান্ডা না-করতে পেরে, ব্যাক করে এল। শহর থেকে এক জনকে পাঠানো হল। তার পরে। এবার তার সঙ্গে তার একটা তীব্র কন্ট্রাডিকশন — মানে, এ ওর মুখ দেখে না। এরকম জায়গায়, এই দুজনকে সেট করবার জন্য, তখন আমি লিডার, আমাকে পাঠানো হল। আমি ওদের গোটা সিচুয়েশনকে দেখে, আমি পার্টিকে রিপোর্ট করলাম, ওখানে আমাকে থেকে কাজ করতে হবে। সেই থেকে শুরু হল, পার্টি য়্যাকসেপ্ট করল যে, ওইটা এবং এইটা, দুটোই, পনেরো দিন পনেরো দিন করে। আমি, গড়বেতার সিচুয়েশনটা এত ইন্টারেস্টিং ছিল, যে আমি গোটাটাতে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে, শুধু গড়বেতার জন্য নিজেকে ডেপুট করার কথা পার্টিকে বললাম। পার্টি য়্যাকসেপ্ট করল।

আমি কাজ করতে শুরু করলাম। একাধারে ওখানকার যে ইনার পার্টি কন্ট্রাডিকশন সেটাকে সল্ভ করবার জন্য। দ্বিতীয়ত, গড়বেতার যে বীভত্স সিচুয়েশন — অন্যরকম একটা সিচুয়েশন,  হয়েছিল, সেটাকে যত দ্রুত সম্ভব আমাদের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে আসার জন্য। এইখানে এবার শুরু হল মূল প্রশ্নটা। কন্ট্রাডিকশনটা। তৃণমূলের হাতে অস্ত্র আছে। সিপিএমের হাতে অস্ত্র আছে। প্রচুর পরিমাণে অস্ত্র ওদের হাতে। নানা রকমের অস্ত্র আছে। আমাদের হাতে অস্ত্র নেই। তখনো পর্যন্ত কিন্তু আমাদের হাতে সেই রকম কোনো অস্ত্র নেই। বা, পিপলস ওয়ার অস্ত্র ধরার কমপ্লিট ডিসিশনটা নিয়েছে এরকমটা নয়। স্রেফ সেল্ফ-রেজিস্ট্যান্সের জন্য কিছু ওয়ান-শাটার ধরনের, তাপাঞ্চা বলে একটা জিনিস, এই ধরনের।

ত্রিদিব।। ‘তাপাঞ্চা’ কী বস্তু?

তিমির।। তাপাঞ্চা ওয়ান-শাটারই। একটু লম্বা ধরনের। পার্টি নিজেরা — নিজের কারখানায় বানানো আরকি।

ত্রিদিব।। এই নামটা কেন? ‘তাপাঞ্চা’ নামটা কেন?

তিমির।। নাম দিয়েছে, ‘তাপাঞ্চা’। অন্ধ্র মেড আরকি। এখানে কিছু হত না। ওয়েস্ট বেঙ্গলে কিছু তৈরি হত না। অন্ধ্র মেড আরকি। সেগুলো আসত। কোনো ভাবে কোনো ভাবে। আমদানি করা হত। যেগুলো আমরা জানতাম না। সেগুলো একটা টেকনিকাল সেক্টর। ওরাই জানে। ইভেন, আমি, এখনো কিচ্ছু বলতে পারব না, কোথায় ডেন ফেন আছে। সত্যি সত্যিই এগুলো মেনটেন করত। এবং, এগুলো জিনিস আরকি।

ত্রিদিব।। এগুলো তো মেইনটেইন করা উচিতও, যদি সংগঠন টেকাতে হয়।

তিমির।। হ্যাঁ, বিশ্বাস করো, আমি, আমরা কখনো, বেশির ভাগ লোক, অনেকে, আগ্রহ দেখাত, এবং, জানবার চেষ্টা করত। আমরা — আমার তো সেরকম কিছু ছিলই না। খুবই ডিসিশনকে ফলো করবার জায়গা আমার ছিল। আর আমি তো প্র্যাক্টিকালি, আমাকে ডেপুট করা হয়েছিল, লাস্ট টাইম যখন, অরগানাইজিং, সকলে বলল, তখন হচ্ছে, আমি অন্যান্য অঞ্চলে পলিটিকাল টিচার হিসাবে কাজ করা শুরু করলাম। মানে, ওইখানে পড়াশুনা করা লোক বলতে তখন আমিই একমাত্র দেখা যাচ্ছে, ছিল… মানে, যেটা, থিওরেটিকালি, কিছুটা রয়েছে… ক্লাস, দর্শনের ক্লাস নেওয়াটা, দর্শনের ক্লাস নেওয়াটা একদম পাক্কা হয়ে গিয়েছিল, যে আমার, প্রচুর ক্লাস এরকম, আমাকে করে দেওয়া হত টিচার। এবং, গড়বেতাতেও পাঠানো হল কিন্তু ওই টিচিং করার জন্য। কিন্তু, আমি অর্গানাইজেশনালিও, পেনিট্রেট করলাম। যেখান থেকে আমার নামটা ফাটতে শুরু করল।

এইখানে শুরু হল, ওই দুই কমরেড, পুরো কন্টিনিউয়াস বলতে শুরু করল, আমাদের অস্ত্র চাই। আমি বললাম, আমরা এখনি যদি অস্ত্র নিই, আমরা শেষ হয়ে যাব। বলল, অস্ত্র না-নিলে আমরা শেষ হয়ে যাব। কারণ কী? ওরা আমাদের গুলি করে মেরে ফেলবে। বলল, গুলি করে মেরে ফেলাটা, আমি, বড় কথা বললাম না। তো আপনি জানেন-ই না, তৃণমূল কেন ওখানে আপসার্জ করতে পারল। দিস ইজ এ আপসার্জ। প্রথম দিন, গিয়ে, আমার মনে হয়েছে। প্রথম দিন গিয়ে মনে হয়েছে। যে, তুমি, যাচ্ছ… সিপিএম যেটা করেছিল, সিপিএম যেটা করেছিল, কী করেছিল? আপসার্জ করেছিল। তেভাগায় লাখ লাখ মানুষের জমায়েত হয়েছিল। লাখস অফ পিপল জমায়েত হয়েছিল। কখন হয়েছিল? যখন কিনা… ওই… নামটা ভুলে গেলাম, উনি মারা গেলেন। মুভমেন্ট তো ছিলই। জমি দখল, ফসল দখল চলছিলই। ফসল দখলের মধ্যে একটা আপসার্জ হয়ে গেল, যখন পুলিশ গিয়ে, ওই তিনজন মহিলাকে… মারল। পুরো পাওয়ারটাকে ক্যাপচার করে নিল। আমি এখনো জানি…  আমি, আমি গেছি এই কারণে যে পলিটিকাল সিচুয়েশনকে ওইখানে তেভাগায় কী ছিল আসলে জানবার জন্য — চন্দনপিঁড়ি গিয়েছি আমি।

ত্রিদিব।। লাল তেভাগায় ঝলসে ওঠা গ্রাম চন্দনপিঁড়ি/ দেখতে দেখতে দেখতে…

তিমির।। হুঁ। তো, সেখানে আমার যা, দেখে মনে হয়েছে, পড়ে যা মনে হয়েছে, সোমনাথ হোড়ের ছবি দেখে যা মনে হয়েছে, সোমনাথ হোড়ের ছবিগুলো তো ডকুমেন্ট, বিরাট ডকুমেন্ট। তো, সেইখানে দাঁড়িয়ে, যা দেখে মনে হয়েছে, বুঝে মনে হয়েছে, সেটা হচ্ছে — একটা আপসার্জ ছিল। ঘটনা ঘটেছিল। তৃণমূলও আমার কাছে মনে হয়েছে একটা আপসার্জ।

ত্রিদিব।। চন্দনপিঁড়িটা ঠিক কোনখানটায় রে?

তিমির।। ওটা নামখানায়। তো, সেই জায়গাটায়, তো সেইখানে দাঁড়িয়ে, এটাকে, অস্বীকার করা যায় না, মাস মুভমেন্টকে। তাহলে, তুমি এটাকে পলিটিকালি হ্যান্ডল করবে না? আর্মসে হ্যান্ডল করবে? কাকে হ্যান্ডল করবে তুমি? পিপলস-কে? প্রথম কথা হচ্ছে, পিপলস-কে, আর সিপিএমকেও? সিপিএমের প্রশ্নটাও ওখানে ছিল। যে, তুমি আর্মস দিয়ে যদি গোটা ব্যাপারটাকে হ্যান্ডল করার চেষ্টা করো, তাহলে তুমি কাকে হ্যান্ডল করছ? তুমি কাকে, তুমি পলিটিক্সকে হ্যান্ডল করছ… না…তো… তুমি পলিটিক্সটাকে, তার উপর ডিপেন্ড করছ, নাকি আর্মসটাকে…

ত্রিদিব।। একদম ফিজিকাল পাওয়ারটাকে…

তিমির।। ফিজিকাল পাওয়ারকে হ্যান্ডল করছ? পলিটিক্সটাকে হ্যান্ডল করো। এর পিছনে পলিটিক্সটা কী? তৃণমূল কেন চ্যাম্পিয়ন হল?

ত্রিদিব।। একজ্যাক্টলি।

তিমির।। তৃণমূল চ্যাম্পিয়ন করল, ওখানে, কেন জানো? তৃণমূল চ্যাম্পিয়ন করল — ভীষণ ভীষণ রকম একটা পলিটিকাল ইশুতে, যেটাকে, যখন আমার মাথায় নক করে গেল… আমি বললাম, পঞ্চায়েতে দাঁড়ানো উচিত আমাদের। সেই সময় আমাকে রাইটিস্ট ট্রেন্ড বলতে শুরু করল। আমার… অনেকদিন… আমি কিন্তু বলিনি সহজে… আমার কিন্তু ওখানে গিয়েই এটা মনে হয়েছে, এখানে পঞ্চায়েতে দাঁড়ানো উচিত।

কী রকম? তিন নম্বর বলে একটা অংশ আছে। ওইখান থেকে কিন্তু শুরু। সেখানে মুকুন্দ পাত্র বলে একজন সিপিএমকে… তাকে য়্যানিহিলেট করে তৃণমূল। কী রকম? ওই অংশটায়, ওই তিন নম্বরে, সিপিএম হচ্ছে সবচেয়ে স্ট্রংহোল্ড। এবং তিন নম্বর দিয়েই ডমিনেট করত সে, গোটা গড়বেতাকে। তা, সেইখানে, সিপিএম, পঞ্চায়েত ইলেকশনে, ইভেন, বিরোধীদের, প্রার্থীও দিতে দিত না। প্রার্থী দাঁড়ালেও তাকে, ঘরে তালা দিয়ে রাখত। এরকম ছিল। য়্যায় — ঘর থেকে বেরোবি না — এত বড় সাহস, তুই দাঁড়িয়েছিস? দাঁড়িয়েছু? আমি… এইবারে নজরে এল, যেটা গোয়ালতোড় ফোয়ালতোরে, বা বাঁকুড়া ফাকুরার দিকে ওরকম ভাবে কিছু নজরে পড়েনি, ওই জঙ্গলের মধ্যে কিছু নজরে পড়েনি…

ত্রিদিব।। ইলেকশানে দাঁড়ানোটাই একটা বৈপ্লবিক কাজ?

তিমির।। ইলেকশানে দাঁড়ানোটাই একটা রেভলিউশনারি ওয়ার্ক। অর্থাত, ওইখানে, তোমাকে, একটা ফ্যাসিজমে পরিণত হয়েছে। স্টেট পাওয়ার, রুলড করছে কোন প্রসেসে? না, ফ্যাসিস্ট প্রসেসে।

ত্রিদিব।। ঠিক। বাঃ।

তিমির।। আমি, অনেকদিন আগে, সোসাল ফ্যাসিজম তুমি বলেছ এটাকে, কিন্তু সেটাকে ডিফাইন করার জায়গা তো এইখানে এসে দাঁড়াল। আমি পরিষ্কার বুঝলাম যে, এইখানে পঞ্চায়েত ইলেকশানে দাঁড়ানোটাই তো… তুমি দেখো, কোনো পঞ্চায়েত ইলেকশানেই যেখানে দাঁড়াতে দেয় না, এই গনতান্ত্রিক অধিকারটাও যেখানে নেই —

ত্রিদিব।। তোর কথাটা কী রকম মিলছে দেখ। এই যে, এখনো তো ইলেকশন শেষ হয়নি, আরো একটা দিন বাকি। এই গোটা ইলেকশনে, এবার, এই ২০০৬-এর, বিধানসভা নির্বাচনে, লোকের মধ্যে এই যে আনন্দটা, এবার আমি নিজের ভোট নিজে দিয়েছি, ভোট দিতে পেরেছি, দেখ, লক্ষ্য কর। অনেক ছোট স্কেলে, একজ্যাক্টলি ওই ফ্যাসিজমেরই কিন্তু একটা ছাপ আমরা পাচ্ছি। লোকের মধ্যে এত আনন্দটা কেন ? এবার আমি আমার নিজের ভোট নিজে দিতে পেরেছি। ভোটটা ঠিকমত হওয়াও। অর্থাত, তুমি বুর্জোয়া সিস্টেমটাকেই অন্তত ঠিক ভাবে রান করাও প্রথমে। ভেবে দেখ, এটা তো একদম জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব ইত্যাদির স্লোগানগুলোর সঙ্গে একদম খাপে খাপে মিলে যাচ্ছে। হ্যাঁ, বলে যা তুই, আমি তোকে ডিস্টার্ব করব না। তোর কথা আমি শুনছি।

তিমির।। না, না। ঠিকই আছে। তো, সেক্ষেত্রে তুমি দেখো, এইখানে আমায় প্রচণ্ড নক করে, কিন্তু আমার বলতে সাহস হয়নি। ঘটনা হল, এতদিনের একটা সেট আপে, ভোটে অংশগ্রহণ, ইলেকশনে অংশগ্রহণ, অন্তত পঞ্চায়েত লেভেলে, এমএলএ ঠেমেলে ছেড়ে দাও, ওখানে ছেড়ে দাও, ওখানে তো ভোট দিতে দেয় না, সেখানে মানুষ তার ডেমোক্র্যাসির মুভমেন্টটাকে এস্টাব্লিশ… আমাকে ভোট দিতে দিতে হবে। ওটা বিহারের জন্যে… তুমি, সত্যি করার দরকার নেই। কিন্তু এখানের জন্যে সত্যি। তুমি এখানে দাও না — এখানে একটা পিপলস ফোরাম তৈরি করো, যে ভোটে দাঁড়াবে, পার্টি দাঁড়াবে না। পার্টি তার স্ট্র্যাটেজিক পয়েন্টে ঠিক থাকবে। ভোট বয়কটের স্ট্র্যাটেজিক পয়েন্টে। সেন্ট্রাল পাওয়ারের পয়েন্টে। সেটাও আলাদা কথা। হবে কি হবে না,… তোমার, না,… তুমি তোমার গ্রাউন্ড ওয়ার্কটা করছ কিনা। তুমি তোমার পার্টি ফর্মেশন করছ কিনা। তাকে তোমার যে লক্ষ্য, অর্থাত, সশস্ত্র সংগ্রামই একমাত্র ক্ষমতা দখলের জায়গা তৈরি করতে পারে, সেই জায়গায় তুমি তৈরি করছ কিনা। প্রসিডিওরটা কী হবে সেটা…

তাহলে, সেই জায়গাটায় আসার পর আমি দেখলাম, যে, তৃণমূল কী করল? তিন নম্বরটাকে দখল করল। ভোটে প্রার্থী দিল। তৃণমূল এবং বিজেপি মিলে। বিজেপি তার একটা ফোর্সকে, ক্যাডার-বেসড অর্গানাইজেশন, ভাল অর্গানাইজার, ক্যাডার-বেসড অর্গানাইজেশন, প্রথম থেকেই আর্মসও দিল, পুস্তিকাও দিল, ভোটেও দাঁড় করাল। ঠিক হ্যায়? এবার যখন, হাজার হাজার মানুষ নিয়ে ওই একটা ছোট পকেটকে, ও যখন, দখল করল, হাজার হাজার মানুষ নিয়ে, সিপিএম কী করল?

ত্রিদিব।। তার পলিটিকাল ফ্রন্ট-এন্ডটা দাঁড়াল তৃণমূল। ইম্পর্ট্যান্ট এখানে দেখ, বিজেপি আবার সেই একটা কোর গ্রুপ, এবং তার পলিটিকাল ফ্রন্ট-এন্ডটা হচ্ছে তৃণমূল।

তিমির।। হ্যাঁ, তৃণমূল। পাস করছে তৃণমূলের মধ্যে দিয়ে। এক্সপোজার ঘটছে তৃণমূলের মধ্যে দিয়ে। ঘটনাটা হল দেখো, মুকুন্দ পাত্র সহ, ওদেরকে কী করল, রাতারাতি একদিন ওরা একটা য়্যাটাক করে, জনতাকে নিয়ে, বেশ প্রচুর মানুষজনকে নিয়ে, ওদেরকে তাড়িয়ে দিল। ভোটে জেতার পর। ভোটে জিতল কিন্তু। তারাই জিতল।

ত্রিদিব।। কে জিতল?

তিমির।। তৃণমূল বিজেপি। দখল করল পঞ্চায়েত।

ত্রিদিব।। করে, সিপিএমকে তাড়িয়ে দিল?

তিমির।। হ্যাঁ। সিপিএম যখন এবার য়্যাটাক করল, সিপিএম যখন য়্যাটাক করল, সেই য়্যাটাকটা কিন্তু গোটাগুটি ভাবে ওরা রেজিস্ট করে দিল। মানুষ দিয়ে। সিপিএম-এর সঙ্গেও আসছে, প্রচুর মানুষ এসেছে, ওই পাশে। লড়াই হল। মুকুন্দ পাত্র য়্যানিহিলেট হয়ে গেল। গোটা গড়বেতা তৃণমূল-বিজেপি হয়ে গেল। তার মানে, একটা অংশের আপসার্জ, অর্থাত, একটা আপসার্জ…

ত্রিদিব।। মুকুন্দ পাত্র এতটা পাওয়ারফুল ছিল? ওর পার্টিতে পজিশন কী ছিল?

তিমির।। এলসিএম।

ত্রিদিব।। আর পেশায় কী ছিল?

তিমির।। বোধহয় প্রাইমারি স্কুলের টিচার ছিল। প্রচুর জমির মালিক ছিল।

ত্রিদিব।। এমনিতে ব্যক্তিগত ভাবে কী? লুম্পেন?

তিমির।। হ্যাঁ, লুম্পেন। পরিষ্কার।

ত্রিদিব।। ক্রিমিনাল য়্যাক্টিভিটিতেও জড়িত ছিল?

তিমির।। হুঁ?

ত্রিদিব।। কী রকম?

তিমির।। ক্রিমিনাল য়্যাক্টিভিটি বলতে সেই রকম ক্রিমিনাল না, পলিটিকাল ক্রিমিনাল। পলিটিক্সেই করত। সিপিএম করার মধ্যে দিয়েই, তার স্বার্থ রক্ষিত হত। তাই সেই সিপিএমটাই করত।

কিন্তু, সেইখানে দাঁড়িয়ে কী হল, তুমি, ওখানে দাঁড়ানো, ভোটে দাঁড়ানো, গোটা অংশটা হয়ে গেল। তার মানে, ওর পলিটিকাল জায়গাটা ও গেইন করে গেল। মানুষকে ও উইনওভার করেছিল। তিন নম্বর দুই নম্বর এই করে করে করে করে… বেশ কিছুটা অঞ্চল সে দখল করে ফেলল। তৃণমূল বিজেপি। মানুষ উত্সাহিত হল। সিপিএম ওকে আক্রমণ করবে বললে, এই লজিকেই, অস্ত্র নেওয়াটা কোনো অসুবিধা হলনা। এবং অস্ত্রকে মেনটেন করবার জন্য — এর পরের স্টেপে সে ডাকাতি করল। কৃষকদের কাছে পয়সা তুলতে শুরু করল। এবার, এদের যেহেতু সেই পলিটিকাল টিচিং নেই, মানুষের প্রতি দরদ নেই, মানুষের প্রতি কমিটমেন্ট নেই, তাই দুই পক্ষ যখন লড়াই করে, ধানের ক্ষেত মাড়িয়ে যায়, লঙ্কার ক্ষেত গুড়িয়ে যায়, আলুর ক্ষেত ইসে হয়ে যায় — এটা লক্ষ্য করলাম।

আমি ঠিক এই জায়গাটাকে ধরতে চাইলাম। গড়বেতায়। আমার সাকসেস হওয়ার জায়গাটা হচ্ছে এইখানটায়। জায়গায় জায়গায় গিয়ে আমাদের ছেলেদেরকে বললাম, যে আলুর ক্ষেত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, সেই আলুর ক্ষেত তুমি গড়ে দাও গিয়ে, যাও। শ্রম দাও। তুমি যে পিপলস-এর সঙ্গে একাত্ম এটা প্রমাণ করতে হবে। আমি নিজেও যাই আলুর ক্ষেতে। কাজ করতে শুরু করলাম। ধান কাটতে শুরু করলাম। ধান বাঁচাতে শুরু করলাম। অর্থাত, কী? আমি যে তোমার পেটের জায়গা, তোমার যে অধিকারের জায়গা, সেটাকে রেজিস্টান্স দেওয়ার জন্যে এসেছি। এর জন্য আমাকে অস্ত্র নিতে হলে, নিতে হবে।

ইন্টেন্সিভ পলিটিকাল প্রোপাগান্ডা, এবং, তার সঙ্গে স্ট্রাগল যে, আমাদের অস্ত্র চাই, কী না, একেফরটিসেভেন চাই, রাইফেল চাই, গ্রেনেড চাই, মাইন চাই। উড়িয়ে দেবে। কাকে ওড়াবে? হাজার হাজার মানুষ মেরে দেবে? সে প্রচণ্ড — সে কী চাপ — সেই সময়, কী বলব তোমায়, কী প্রচণ্ড প্রেশার।

তো, পলিটিকাল প্রোপাগান্ডা একদিকে, তার মধ্যে ইনার পার্টি কন্ট্রাডিকশন চলছেই আরকি। মানে, ওটা যে বলছি ওদেরকে, ওটা করো, অস্ত্র আমাদের এখুনি লাগবে না, মানুষকে, মানুষ যদি না-থাকে কাকে তুমি অস্ত্র দেবে ধরাবার জন্য। তা, এটা, সব সময় চ্যাম্পিয়ন করানোও সম্ভব হচ্ছে না। কখনো কখনো, তৃণমূল কংগ্রেস, বা বিজেপি, আমাদের বিরুদ্ধে আক্রমণ চালাচ্ছে। মানে, গ্রামে গ্রামে এসে থ্রেট করে দিয়ে যাচ্ছে। ওদেরকে জায়গা দিলে, খেতে দিলে, মেরে দেব, কেটে দেব, বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেব। এরকম প্রচুর উদাহরণও আছে বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়ার।

ঠিক আছে? তা, এই যে অবস্থাটাকে, এই সিচুয়েশনটাকে দাসত্ব করতে শুরু করছি। যে, সিচুয়েশনটাকে ইউজ করার বদলে সিচুয়েশনটার দাসত্ব করা হয়ে যাচ্ছে। আমি বলছি, এটাকে তুমি, এই সিচুয়েশনটা, ও যে বলছে, এটার দাসত্ব কোরো না। ও যদি তোমাকে এই মুহূর্তে অস্ত্র হাতে নিয়ে নামিয়ে দিতে পারে, ওর যা পলিটিকাল… ওর যা স্ট্রেংথ আছে, আমার যা স্ট্রেংথ আছে, সেখানে আমি হেরে যাব। আমি, ওখানে হারাটাকে নিশ্চিত কোরো না তোমরা। বরঞ্চ তোমরা মানুষের মনটাকে জয় করবার চেষ্টা করো। এইটাকে শক্তিশালী করার চেষ্টা করো, যে, আমরা তোমাদের ফেলে দিয়ে যাচ্ছি না, আমরা লড়ব প্রয়োজনে, কিন্তু, মানুষও চাইছে আমরা… কখনো কখনো মানুষ এসে দল বেঁধে… না, আমাদের অস্ত্র, অস্ত্র ধরতে হবে, ওকে মেরে দিতে হবে, তাকে মেরে দিতে হবে — ও এই অত্যাচার করছে, এ এই অত্যাচার করছে। এরকম হচ্ছে। তা আমরা যে…

ত্রিদিব।। এই সময় এই অপোনেন্টটা গোটাটাই তৃণমূল? সিপিএম কি…

তিমির।। হ্যাঁ। সিপিএমের কোনো সিন নেই। সিপিএম আছে। কী ভাবে আছে ? বলছি তোমাকে সেটা। আসছি।

কিন্তু, পলিটিকাল প্রোপাগান্ডা করতে হবে — আমাকে ফার্স্ট গিয়ে, আমি ফার্স্ট গিয়ে — যাওয়ার পর, ওখানে, দিন তিনেকের মধ্যে, ওখানে যে, দুটো তিনটে চারটে গ্রামের মধ্যে ওরা থাকা খাওয়া শুরু করেছিল, আমি যেবার গিয়ে দেখলাম, ওটা হচ্ছে যে সম্পূর্ণ রকমের সিপিএম শেল্টার। সিপিএম এই ফাইলটাকে শেল্টার দিচ্ছে। এদের হাতে কিছু অস্ত্র শস্ত্র আছে, এদেরকে ইউজ করার চেষ্টা করছে। আমি দেখলাম। আমি গিয়ে ওখানে, দুজন, গব্বর বলে, গব্বর না গফ্ফর, আমার নামগুলো এখন ভুলে গেছি, আর সনাতন, দুজনকে ডেকে বললাম, এই শুনুন, আপনাদের কালকে যেটা করতে হবে, আমাদের যে লিফলেটগুলো আছে, পাঁচশো লিফলেট ছাপা হয়েছে, একটাও ডিস্ট্রিবিউট হয়নি, এখন এগুলোকে ডিস্ট্রিবিউট করুন। তারপর আপনাদের জন্য আমি বন্দুক ধরব। আপনি যে আমার যে পক্ষের লোক, আমি কী করে বুঝব? আপনি তো এখনো আমার সঙ্গে পলিটিকালি ডিসকাশনই করেননি কোনো। আপনি আমাকে ক্রমাগত উত্সাহিত করছেন, আমার ছেলেদের উত্সাহিত করছেন, যে, তৃণমূলকে মেরে আপনাদের শান্তি ফিরিয়ে দিতে। শান্তিটা কী? আপনি তো করতেন সিপিএম। সেটা শান্তির সময় ছিল? সেটা শান্তি ছিল? তাহলে, এত দলে দলে লোক তৃণমূল বিজেপি হল কী করে?

চুপ করে যাচ্ছে। বুঝতে পারছ? তার মানে, গোটাগুটি ভাবে প্রথম দিকে সিপিএম, এবার, তার, ইসেকে, বাহিনীকে, কতটা রেজিমেন্টেড, কতটা হোল্ড তার ছিল, তুমি চিন্তা করো। পরবর্তীতেও সেটা প্রমাণিত হয়েছে। পরবর্তীতেও প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু, সে ওই কাজে ব্যবহার করেছে, যে এই ফোর্সটাকে লেলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করো। প্রথম থেকেই সিপিএমের এটা ছিল, এবং, সিপিএমের লিডারশিপ তোল্লাই দিত।

তাহলে, পলিটিকাল স্ট্রাগলটাই মেন জায়গা ছিল। ভীষণ ও ইন্টেন্সিভ পলিটিকাল প্রোপাগান্ডাটাই মেন ছিল। এর সঙ্গে এই মিলিটারি লাইনের যে কন্ট্রাডিকশনটা, এই কন্ট্রাডিকশনটা কিন্তু সামনে চলে এল, সিচুয়েশন সেটাকে সামনে এনে দিল। আমি… আমাকে অত রক্ষা করবার জন্য, বা, জনগণকে রক্ষা করবার জন্য অস্ত্র ধরব না, এই বিতর্কে যাইনি। কিন্তু, আমার মেন টাস্কটা হচ্ছে পলিটিকাল টাস্ক, সেটাকে বাদ দিয়ে এটা হয়না, হতে পারেনা। টাইম বিয়িং তুমি ছেড়ে দাও, তুমি যদি পলিটিকাল প্রোপাগান্ডাটা করতে পারছ না। বা, তুমি পলিটিকাল প্রোপাগান্ডা করতে পারছ না, এটা বলাটাও তো একটা পলিটিকাল প্রোপাগান্ডা। এটা বলা, লিফলেট ছাড়া। আশপাশ দিয়ে ঘেরো। তোমাকে গড়বেতার মাঝখানে এসেই করতে হবে, এরকমটা নয়… তাহলে তুমি বলো… তাহলে তুমি বেরিয়ে এসো, যেখানটায় তৃণমূল উইক, কিন্তু তৃণমূল পাশে আছে, সেইখান থেকে ফেস করতে করতে ঢোকো। ঠিক আছে? তো, সেই জায়গাটায়, হল না।

তা, এর মধ্যেই, একটা স্কোয়াড মত ফর্মেশন হয়েছিল। স্কোয়াডে ওরাই লিডার ছিল। স্কোয়াড লিডার ছিল একজন, আমি তখন, ওই পলিটিকাল টিচার হিসাবে ওদেরকে গাইড করতাম। স্কোয়াডের সঙ্গেই মুভ করতে শুরু করলাম।

ত্রিদিব।। স্কোয়াডের লিডাররা তখনো অন্ধ্র থেকেই…

তিমির।। না না না না না, অন্ধ্র না, সবই বাঙলার। অন্ধ্র থেকে কেউ আসেনি সেভাবে।

ত্রিদিব।। তাহলে? ‘ওদের’ বলতে কী মিন করলি?

তিমির।। মানে ওই যে দুজন বললাম না, ওই যে একজন ছিল, আর একজন ছিল। তা, ওদের সাথে মুভ করা শুরু করলাম। গ্রামে গ্রামে রাত্রে রাত্রে মিটিং করা শুরু করলাম। এবং বললাম যে, প্রকৃত যে জনগণ, তাদের কাছে গিয়ে মিটিং করো, কানেকশন বার করো। এই ভাবে কিন্তু, বেশ কিছু গ্রামে, খাওয়া দাওয়া থাকার বন্দোবস্ত ধীরে ধীরে গড়ে উঠতে শুরু করল। হচ্ছিল-ও। হচ্ছিল না, তা না। কিন্তু এটাকে ওরা… এবং প্রচণ্ড ভীতির জায়গা থেকে, রাত্তির বেলাটা… সেন্ট্রি দিয়ে থাকার মধ্যে দিয়ে ঘুমোয়… সমস্তকিছু… মানে, যতটা ভীতি পাওয়ার মত কোনো কারণই ছিলনা তৃণমূলকে। তারা ভীষণই সুপারফিশিয়াল একটা অর্গানাইজেশন, তারা গ্রাউন্ড-বেসে কিছু নজরই রাখত না। তারা মনে করত, গোটাটাই আমার হয়ে গেছে — ওরা ভেবেছিল আকাশের চাঁদ পেয়ে গেছে।

ত্রিদিব।। আর চারদিকে কিছু ক্রিমিনাল ছড়িয়ে আছে…

তিমির।। ছড়িয়ে আছে। সেই জায়গা থেকে… কিন্তু তাও, মাস সাপোর্টটা কিন্তু ইগনোর করার মত নয়। তা একটা পলিটিকাল মুভমেন্টের মধ্যে দিয়েই গড়ে উঠেছে। ওটা একটা পলিটিকাল মুভমেন্ট। ওটা কিন্তু বাদ দিলে চলবে না। সেটা কিন্তু মানুষের সঙ্গে থাকল। যে, চেঞ্জ করে দিল। কেননা, দীর্ঘ পঞ্চায়েতের করাপশন, এই করাপশনটা মূল বিষয় হয়েছিল, তার কারণটা, পরবর্তীকালে আমি য়্যানালিসিস করেছিলাম। সেইখানটাকে থেকে — ইসে — আমার মনে হয়েছিল, সেটা তো পুঁজির ডেভেলপমেন্টের জন্যই করাপশনটা মূল ব্যাপার হয়েছিল।

ত্রিদিব।। কী রকম?

তিমির।। টাকা আসছে, রাস্তা বানানো হচ্ছে না। জলের কল বলছে না, ইলেকট্রিসিটি হচ্ছে না, ডিপ টিউবওয়েল বসছে না। এইগুলোই তো মূল ইশু। জল সেচের ব্যবস্থা। আরো প্রোডাকশন বাড়ানো। কৃষিতে আলু উত্পাদন হচ্ছে, গড়বেতা কী হচ্ছে, ডেভেলপড কৃষি নেই… আলু, নাইন্টিসেভেন নাইন্টিএইটে, আমার ঠিক সালটা মনে পড়ছে না, আলুর কুইন্টাল পঁচিশ টাকা হয়ে গেল। অর্থাত, পঁচিশ পয়সা কেজি। আলু খরচ তখন এক টাকা সাঁইত্রিশ পয়সা। আমাদের স্ট্যাটিস্টিক্স অনুযায়ী। তার মানে, কত পয়সা কেজিতে লস খাচ্ছে? কী পরিমাণ লসের জায়গায় যাচ্ছে? এই লসটা এরা তো, এই লসটা, এই যে বিশাল লস, এই লসটাকে মেক আপ করতে, কী ভাবে, কমপেনসেশন, কৃষিঋণ — এই কৃষিঋণ এলে, কী ভাবে নেয়? একটা টিনের চাল হলে কী ভাবে টিনের চাল পাওয়া যায়? এগুলো তখন পরিষ্কার জলের কাছে, মত, জনগণের কাছে। যেখানে সমস্তটা থেকে কাটমানি খায় সিপিএমের লোকেরা। এবং, এইভাবে তাদের ক্যাডারদের মধ্যে কিছু ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে, কিছু দাও, কিছু খাও, এইরকম ভাবে তারা গোটা ব্যাপারটাকে স্টার্ট করছে। অর্থাত, দেওয়ার মত সিপিএমের কিন্তু আর তখন কিছু নেই। ইভেন আজকের পোজিশনে, তখনো নেই… তাই বুদ্ধ ভট্টাচার্যকে বলতে হয়, আমরা পুঁজিবাদ-ই করছি। পুঁজিবাদ-ই করছি, বরঞ্চ তুমি তো পুঁজিবাদ-ই করছ না। তুমি সাম্রাজ্যবাদের লেজুড়বৃত্তি করছ। কেননা, তুমি তো পুঁজিবাদ করতে পারো না আর। সেটা ঐতিহাসিক ভাবেই আর কোনো দেশই পারেনা, ক্যাপিটালিস্ট মুভমেন্টের জায়গায় যেতে। কেননা, ইম্পিরিয়ালিজম সেই জায়গাটা গোটাগুটি ভাবে নষ্ট করে দিয়েছে।

ত্রিদিব।। আগেই খেয়ে দিয়েছে…

তিমির।। খেয়ে দিয়েছে। ঠিক আছে? তোমার সেই বিকেলের প্রশ্নটার উত্তর এইখানে আছে (এখানে ও টেপ করার আগের একটা প্রসঙ্গ উল্লেখ করছে। যেখানে বিশুদ্ধ বর্গগুলো আর তার বিপরীতে অতিনিয়ন্ত্রিত বর্গগুলো, মানে, যেখানে সমস্ত বর্গই সমস্ত বর্গের মধ্যে মিশে থাকে, তাই নিয়ে আমরা কথা বলেছিলাম। ও এই অতিনিয়ন্ত্রণ বা ওভারডিটারমিনেশন ব্যাপারটাকেই একটা ইমপিরিয়ালিজমের প্রোজেক্ট বলে মনে করছিল, বাস্তবতা ঘেঁটে যাওয়ার চেয়েও। এবং, এখানে, একটা নিখাদ মার্ক্সবাদী জায়গা থেকে, অন্য কথার সূত্রে, আমায় পেড়ে ফেলল।)। যে, এই যে কোলাবোরেশন। অর্থাত, জাতি থাকবে, ধর্ম থাকবে, পুজো থাকবে, তার ঘিনঘিনে ফিউডালিজমের, সমস্ত ঘিনঘিনে কালচার থাকবে, তাতেই সাম্রাজ্যবাদের সুবিধা। অর্থাত, কনশাসনেসকে সাম্রাজ্যবাদ চায়না। পুঁজিবাদ চেয়েছিল কনশাসনেস। তার কারণ, সেখানে একটা বিজ্ঞানভিত্তিক বিষয় ছিল। বিজ্ঞানের ডেভেলপমেন্টই প্রোডাকশনের ডেভেলপমেন্ট ঘটিয়েছিল।

ত্রিদিব।। তার একটা লড়াইয়ের জায়গা ছিল। আর, এখন একদম পরিষ্কার ডিফারেন্ট।

তিমির।। হ্যাঁ, এটা তো ডিফারেন্ট। তাহলে, সাম্রাজ্যবাদ — তার গতি নিচের দিকে। পুঁজিবাদের গতি ছিল উপর দিকে। সেটা স্ট্যাগন্যান্ট হয়ে গেছিল। সেটা, রুট খুঁজে পেয়েছিল ইম্পিরিয়ালিজমের মধ্যে থেকে। ওটা হচ্ছে, একটা পাওয়ার স্ট্রাকচারের ডেভেলপমেন্ট হয়েছিল। অর্থাত, তারা অনেক বেশি ইউনিফায়েড হয়েছিল সোশালিজমের এগেনস্টে। হ্যাঁ? মার্কেটের প্রশ্নটা এক্সপ্যান্ড করে গেছিল। সেই জায়গা থেকে ফিউডালিজমের সঙ্গে য়্যাডজাস্টমেন্ট, ধর্মের সঙ্গে। আজকে নিজের দেশেও সে ধর্মের সঙ্গে য়্যাডজাস্ট করে। তাই না? তাই আজকে কাস্ট ইসেগুলো, জাতিদাঙ্গাগুলো, য়্যামেরিকা এমনকি ইংল্যান্ডেও…

ত্রিদিব।। এই, লাস্ট ইলেকশনেও, বুশের একটা বড় যুক্তি ছিল যে ওর প্রতিদ্বন্দ্বীরা বলছে, ডারউইন পড়াও। মানে, ওদের দেশের অবস্থা তো আরো কেলো। এবং সত্যিই সেটা একটা বড় ইশু হয়েছিল।

তিমির।। একদমই তাই। তা, সেইখানে দাঁড়িয়ে, আমরা, যখন ইসে হয়, একটা সিচুয়েশন তৈরি হয়, এরকম কন্টিনিউয়াস প্রোপাগান্ডার মধ্যে দিয়ে আস্তে আস্তে এক জন অর্গানাইজার চলে যায়। সেকেন্ড যে  অর্গানাইজার, সে, আর আমি, টিচার হিশেবে, কাজ করা শুরু করি। তখন, প্রায়, অর্গানাইজার হিশেবে কাজ করা শুরু করে দিয়েছি। নেমে এসে। তো, এই রকম করতে করতে, বেশ কিছু গ্রামে, আমরা বুঝতে পারছি সেখানে সিপিএমের গ্রাউন্ড লেভেলের কর্মীই তারা, তাতে কোনো আপত্তি নেই। তো, তো, আর তৃণমূল ক্রমাগত ইসে করতে শুরু করল। আক্রমণ বাড়াতেই শুরু করল। যেহেতু এক্সপোজার হতে শুরু করল, পোস্টার বেশি বেশি পড়ছে এবার, লিফলেট বেশি বেশি ছড়াচ্ছে, তা, ওরাও একটু নার্ভাস হচ্ছে। সেই জায়গা থেকে, ওরা আর, এক্সপ্যানশনের দিকে ওরা নজর বাড়াল এবার, হুগলির দিকে ওরা হাত বাড়াল।

এবার, ঠিক গড়বেতার পাশেই, একটা হুগলির গ্রামে আমাদের য়্যাকসেস ছিল। কিছু যুবক ছেলেকে অর্গানাইজ করা হয়েছিল ওখানে। মিটিং করা হত। তো, সেখানে দাঁড়িয়ে, যেটা হল, সেটা এক দিন, ওয়ান ফাইন ডে, আমরা, আমি ছিলাম বাইরে… তৃণমূল ওই গ্রাম য়্যাটাক করল।

ত্রিদিব।। হুগলির ওই গ্রামটা?

তিমির।। ওই গ্রামটা। প্রাইমারিলি গুলিগোলা চালিয়ে ফেরত চলে গেল। টেস্টিং -এর জন্য। তো, ওরা কোনো রকম সেরকম ভাবে রেজিস্টান্স দিতে পারল না, কিন্তু তখন আমাদের প্রয়োজন হয়ে গেল ভীষণ রকমের রেজিস্টান্স — অর্থাত, ওই গ্রামটাকে রক্ষা করাটা খুব বেশি প্রয়োজন হয়ে গেল। কারণ, ওই গ্রামটা আমাদের সাথে ছিল। খুবই, যেটা প্রশ্ন হয়েছে, খুবই সাহসের সঙ্গে, খুবই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে, ওই সময় কিছু সামান্য অস্ত্র শস্ত্র নিয়ে, রুখে দাঁড়ানোর একটা সিদ্ধান্তই নেওয়া হল, এবং, আমি, নিজে থেকে, সামনে দাঁড়িয়ে, লড়াইটা শুরু করলাম। দুটো গ্রাম। দুটো দিক থেকে আক্রমণ হচ্ছে। প্রথম দিন, এক দিক থেকে ছুটে ছুটে দৌড়ে দৌড়ে দৌড়ে দৌড়ে — ওই যে রাশকে ঠেকানোর চেষ্টা করা হবে। এবং, দীর্ঘক্ষণ ধরে ওটা চালানোর পর, ওরা ফেরত চলে গেল। হ্যাঁ?

এইবার, ওই রকম একটা সিচুয়েশনে আমরা দেখলাম, যে, আমি দেখলাম, আমি এক দিন রাত্রিবেলায় শুয়ে আছি, শুয়ে ভাবছি যে, আমার কালকে এটা হাতছাড়া হয়ে যাবে। মানে, গড়বেতা গোটালো। তাহলে, আমাকে কোন জায়গায় যেতে হবে এখন? অর্থাত, আমাকে তো পিছোতে হবে। সেই অনুযায়ী রুট ঠিক করছিলাম। আমি, আমাদের যে পার্টি মেম্বার যারা, তাদেরকে ডাকলাম, বললাম যে, হেরে যাওয়ার চান্সই বেশি, লাস্ট ট্রাই কালকেই হবে। তো, তোমরা… একটা রুট ঠিক করা যাক। আমরা পালাব কোথায়। পালাব কোথায়। মানে, পালাতে হবে, পিছন ফিরে। মরে গেলে তো আর কাজের প্রশ্ন নেই। যতদূর পর্যন্ত রেজিস্ট করে… পালানো, এবং, যতটা পারা যায় মানুষকে সেভ করে বাইরে বার করে দেওয়া। মানে, এটা হতেই হবে, কিছু দিনের জন্য…

ত্রিদিব।। এই যে তৃণমূল আক্রমণ করছে, তৃণমূলের হাতে কী? আধুনিক বন্দুক?

তিমির।। না না, সব আধুনিক বন্দুক নয়। কিছু কিছু আধুনিক বন্দুক যে ছিলনা এরকমটা নয়। মানে, রাইফেল কিছু ছিলই। তো, সেক্ষেত্রে যেটা হয়, যে, আমরা একটা রুট তৈরি করলাম। যে, এইখান থেকে ফায়ারিং করতে করতে আমরা পিছিয়ে যাব। ওরা যদি হাজারে হাজারে, একশোটা বন্দুক নিয়ে এক হাজার লোক আসে, তাহলে আমাদের সে রেজিস্টান্স দেওয়ার মত সেই ক্ষমতা নেই। তা, ওদেরকে বললাম। বাকিদের বলা হলনা। রুট ঠিক করে…

ত্রিদিব।। মোটামুটি একটা আন্দাজ দে, তোদের হাতে কটা বন্দুক?

তিমির।। পাঁচটা।

ত্রিদিব।। পাঁচটার মধ্যে একটাও রাইফেল?

তিমির।। হ্যাঁ, একটা রাইফেল। আর চারটে হল জেনেরাল বন্দুক। ইন-দি-মিন-টাইম, সেই রাতেই, যখন মিটিং করে নামছি, তখন সিপিএমের দুই লিডার এসে হাজির। আমি দেখলাম, এই চান্স। কে কাকে ইউটিলাইজ করতে পারে। কার ইন্টেলেক্ট কী বেশি? দেখা যাক এবার।

ত্রিদিব।। কী বজ্জাতি!

তিমির।। হ্যাঁ। এখানে, ওয়ারের কৌশল। অর্থাত, দুটোই কর্নার্ড সেকশন, এবার ইউনিফায়েড হতে হবে আমাকে। টাইম বিয়িং ইউনিফায়েড হতে হবে। বললাম। যে, আপনি, আপনাদের, আমাদের উপর, বিভিন্ন জায়গায় যে প্রোপাগান্ডা, আপনাদের বন্ধ করতে হবে, আর, ইসে করতে হবে, এই গ্রাম আপনাদের ছেড়ে দিতে হবে। এই গ্রাম থেকে আপনারা হাত তুলে নিন। এই গ্রামে ফ্রি য়্যাকসেস দিয়ে দিতে হবে আমাদের। ওই গ্রামটা বেশ বড় গ্রাম। তিনটে পার্ট। একটা অংশ কিন্তু তৃণমূল বিজেপি ছিল। একটা অংশ ছিল সিপিএম। আর একটা পার্ট, পাড়া সেটা

ত্রিদিব।। এই যে দুজন আঞ্চলিক নেতা বলছিস, এরা কি লোকাল কমিটির…

তিমির।। না না, আঞ্চলিক নেতা না। নেতা এল। বাইরে থেকে দুই নেতা এল।

ত্রিদিব।। মানে, রাজ্য লেভেলের?

তিমির।। না, রাজ্য লেভেলের না। রাজ্য লেভেলের নেতা পরে এসেছিল। জেলা নেতা। পরে অনেক। সে নেতা এসেছিল। বিধায়ক এসেছিল। তো, তাদেরকে দেখা হল, বলা হল। হ্যাঁ? হাত তুলে দিল একদম। কী লাগবে? আমি বললাম, আমার গুলি লাগবে, বন্দুক লাগবে। আমার তো নেই। যদি আমি সাত দিন, কালকে কোনো ক্রমে ইসে করা যায়, ওদের রেজিস্ট করে দেওয়া যায়, তাহলে দুদিন যদি ওদের রেজিস্ট করা যায়, তাহলে ওদেরও গুলি ঠুলি কিছু ক্ষয় হবে, ওরাও কিছুটা শ্বাস নেবে। কালকে, আপনি বেশ কিছু, ইমিডিয়েট, ইমিডিয়েট বন্দুক পাঠান। বলল, আমি বন্দুক নিয়েই এসেছি। সেই রাত্রিবেলায়, বেশ কিছু ছেলেপেলে ছিল তো, তাদেরকে শেখানো হল। আমি এ ব্যাপারে ভীষণই এফিশিয়েন্ট ছিলাম ব্যাপারটা এরকম নয়।

ত্রিদিব।। কী বন্দুক, কতগুলো দিল?

তিমির।। এমনি বন্দুক, সবই মাস্কেট। প্রায়… আঠেরো খানা। আঠেরোটা ছেলেকে ধরিয়ে দেওয়া হল। পোজিশন তৈরি করে দেওয়া হল। সেই রাত্রের মধ্যেই, সমস্ত কিছু। দু-চারবার ফায়ারিং করে দেওয়া হল। কারণ সেইগুলো… ফায়ার করো এ করো… ফায়ার করিয়ে টরিয়ে দেওয়া হল… রাত্তিরবেলা দুম দাম ফায়ারিং প্র্যাকটিস হচ্ছে, সেটাকে প্রোপাগান্ডাও করিয়ে দেওয়া হল। কারণ, ভিতরে ভিতরে তো সিপিএমের লোক আছে সর্বত্র। তাই সিপিএমের টেকনোলজি  — মানে, যে কাঠামোটাকে, সেটাকে ইউটিলাইজ করে প্রোপাগান্ডা করে দেওয়া হল এটা। এবং, এর ফলে যেটা হল, যে পরের দিন য়্যাটাকটাই হলনা। সাত দিন পুরো রিসেস পেয়ে গেলাম। মানে, সাত দিন পুরো এদেরকে তৈরি করার কাজে ব্যবহার করা গেল।

ঠিক আছে? সঙ্গে সঙ্গে, প্রতি দিন, পলিটিকাল ক্লাস নেওয়া। প্রতি দিন। এবং ওই একটা গ্রামের মধ্যেই কনসেন্ট্রেট করতে বাধ্য হলাম। শুধু একটা না। তিনটে চারটে গ্রাম। এবার যেটা হল, তৃণমূল এইখানটায় একটা বিরাট ভুল করে গেল।  এইটা যখন তৈরি হয়ে গেল, দুবার আমরা ওদেরকে পিছনে পাঠালাম। হুঁ? দুবার পিছনে পাঠালাম, এবং, ক্ষয় ক্ষতি হয়ে গেল ওদের। ভালো ক্ষয় ক্ষতি। বন্দুক ফন্দুক ফেলে দিয়ে পালানো আরকি, যেটা। কেননা, আমার হাতে যদি আঠেরোটা ছেলে থাকে, ওদের আটশো আঠেরোশো আসুক না, তখন আমার পোজিশন নিতে — যে পোজিশন পয়েন্টগুলো আছে, ওই পয়েন্টগুলো যদি আটকানো থাকে, তবে ও কী হবে? ও তো উড়ে যাবে। আমি জানতাম উড়ে যাবে। আমি কনফিডেন্স ওই জায়গায়… ওদের তো জীবনের ভয় আছে, আমি তো সেরকম অন্তত সাতটা ছেলে পাচ্ছি যার কোনো জীবনের সেরকম ভয় নেই। মিলিটারি ইকুইপড দুটো ছেলে পাচ্ছি, যাদেরকে দিয়ে আমি ট্রেনিং দিয়ে দিতে পারছি। মিলিটারিলি ইকুইপড। তারা ট্রেনিং… ট্রেনড। বেশ ভালো ভাবে। গাট্টাগোট্টা। ভয় পায়।

তা, সেই জায়গা থেকে ওরা তো পিছিয়ে গেল। আমি তখনি তৃণমূলকে একটা চিঠি পাঠালাম। কেন? খেলাটা পলিটিক্স। আমি কিন্তু, ওই ওইটুকু প্র্যাকটিসের মধ্যে দিয়েই, একটা পাওয়ার কী জিনিস, আমি কিন্তু বুঝে যাচ্ছি তখন। কেননা, আমি তখন পাওয়ার হোল্ড করতে শুরু করে দিয়েছি। ওই একটা দুবার হওয়ার পরেই, ওই গ্রামের, চারটে গ্রাম নিয়ে যে একটা জোট হল, সেখানে কিন্তু, ওয়ান য়্যান্ড অনলি আমি। কেননা, সেকেন্ড যে লিডারশিপ, সে কিন্তু তখন ওখানে নেই। তাকে অলরেডি শিফট করে দেওয়া হয়েছিল। সে ওই জায়গাটায় ব্রেক করে গিয়েছিল। তা, সেইখানে দাঁড়িয়ে, যেটা হল, যে, পাওয়ার জিনিসটা, এবার, পাওয়ার, পাওয়ারের খেলাটাও আমি খুব দ্রুত য়্যাবজর্ব করতে শুরু করলাম। তাই আমাকে, আমার এক্সিস্টেন্সের প্রশ্নগুলোকেও আমি হিশেব করে, হিশেব নিকেশ, এবার হিশেব নিকেশের খেলা। আমি তৃণমূলকে চিঠি পাঠালাম। যে, আমার বিরুদ্ধে তুমি আক্রমণটা বন্ধ করো। কেননা, এই চারটে গ্রাম, তোমাকেও আমায় ছাড়তে হবে। তুমি এই চারটে গ্রাম দখল করতে পারোনি।

ত্রিদিব।। হুগলির ওই গ্রামটাকে সেন্টার করে যে চারটে গ্রাম?

তিমির।। চারটে গ্রাম। এই সেন্টটা ওরা বুঝল না। তুমি ছেড়ে দাও। তোমাকে আমি য়্যাটাক করছি না। তুমি আমায় ফ্রি পলিটিকাল স্পেস দাও, আর যে রকম ভাবে বৈতলে সিপিএম রয়েছে, ওই ভাবেই থাকবে। সিপিএমকে আমি আর ঢুকতে দেবনা। বরাশোল আমি নিয়ে নেব। ওটা তুমি ছেড়ে দাও। ওটা তুমি পাবেনা। ওটা টাইম বিয়িংস, আমি আমার ঘাড়ের উপর অত বড় একটা গ্রাম রাখব না তৃণমূল বিজেপি হিশেবে। কারণ তোমাদের আমি…

ত্রিদিব।। ওই গ্রামটা কী বললি?

তিমির।। বৈতল। বৈতল বলে বাঁকুড়ার একটা গ্রাম ছিল। সেখানে গিয়ে সিপিএম সব ডেরা বেঁধেছিল। হ্যাঁ? পালিয়ে যাওয়া লোকজন, ওখানে নেতা ফেতা সব চলল… খিচুড়ি খেত আর থাকত। তো, আমি বরাশোল নিয়ে নেব। বরাশোল আমায় ছেড়ে দাও। এই বরাশোলটা ওরা ছাড়ল না। এবং, ওরা কী, ফারদার বড় ফোর্স নিয়ে গ্রহণ করার চেষ্টা করল। ওই দিন শেষ হয়ে গেল ওরা। ওরা ফুল স্ট্রেংথ দিয়ে নামল। সক্কাল আটটা নাগাদ ওরা আক্রমণ শুরু করল। আমার, ঠিক য়্যাসেসমেন্ট, আমি এক দুই তিন চার করে গুনছি, চিঠিটা পাঠাবার পর কোনো রিপ্লাই নেই। যেই রিপ্লাই নেই, এক দিন ওয়েট করেছি। সেকেন্ড ডে-র রাত্তিরে আমি প্রিপারেশন নিয়ে নিয়েছি। যে, ওরা আবার য়্যাটাক করবে। কেননা, ওরা রিপ্লাই দেয়নি। আমার সেই রিপ্লাইটা দেওয়া উচিত ছিল… এই সময় যদি ওরা বুদ্ধি করতে পারত, ওই রিপ্লাইটা দিত আমাকে। য়্যাট লিস্ট, রিপ্লাইটা দিত, আমি, আমি, আমি শহরের কোনো জায়গায় ওদের সঙ্গে একটা মিটিং করে নিতাম। এবং, একটা ভদ্রলোকের চুক্তি, আপাতত, দুবছরের জন্যে করে ফেললে, সিপিএম আজকে আর আসে না। গড়বেতাতেও আসে না।

তৃণমূল আক্রমণ করল। কী হল? পালাতে শুরু করল। এবার, মাস এসে গেছে আমাদের পিছনে। জনতা আমাদের পিছনে। কেননা, পাশাপাশি আরো দশটা গ্রাম আমরা ওরকম ফ্রি করে দিয়েছি। এবং, সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, যেখানেই আক্রমণটা হচ্ছে, যেখানেই লড়াইটা হচ্ছে, সেখানে একটি লঙ্কা কেউ ওখান থেকে তুলছে না। কী হল — এর মধ্যেই, লুঠের একটা কালচার তৈরি হয়ে গেছিল। একটা গ্রাম এরকম ভাবে য়্যাটাক করেছিল, সেটা হচ্ছে ওই — মমতা ব্যানার্জি গিয়ে মিটিং করেছিল, আমি এখন ভুলে যাচ্ছি, দেখেছ? আরে, প্রচুর নামটা ফেটে গেছিল, আরে বাবা, সেই নামটা আমি ভুলে যাচ্ছি। আমি অনেক কিছু ভুলে গেছি। রুটও ভুলে গেছি। জায়গায় আর মানুষকে চিনতে পারব না। আর, পাঁচ বছরের ব্যাপার তো। তো, সেই গ্রামটাতে, কী হল, সেই গ্রামটা থেকে ওদেরকে যখন তাড়িয়ে দিলাম, কিছু লুটপাট হল। আমাদের ছেলেরা, তখন কিন্তু আমাদের ছেলেও বাড়ছে দ্রুত, বাড়ছে, রেজিস্টান্সটা, ওখানেও তো একটা পলিটিকাল প্রশ্নই এসে গেছে, ওটা কিন্তু আর শুধু অস্ত্র দিয়ে মানুষকে মুক্তি করছি এরকম প্রশ্ন নেই। কারণ, ওরা আক্রমণ করছে, রেজিস্টান্স দিচ্ছি, ক্ষেত বাঁচাচ্ছি। কী করল — এটাও একটা ভীষণ ভাবে পলিটিকালি ইউজ করতে পারলাম, এক দল লোক লুঠ করে নিয়ে যাচ্ছিল, সিপিএমের লোক। দাঁড় করানো হল। রাস্তার মাঝখানে। সব হিশেব করা হল। সেই গ্রামে সঙ্গে সঙ্গে মিটিং করা হল। লুটের মাল, সবাই ফেরত পেয়ে গেল। আর মহিলারা এসে হাউ হাউ করে কাঁদছে। হাত ধরে আমার। বাবা, তুমি, তুমি কে? এ তো জীবনে দেখিনি আমরা। লুট হলে তো লুট হয়ে যায়। গরু বাছুর সহ টিনের চাল খুলে নিয়ে লুট হয়ে যায়। এ তো ফেরত পাচ্ছি মাল। লুট হয়েছিল, ফেরত পাচ্ছি। তাদেরকে কান ধরে উঠবোস করানো হল, যারা লুট করেছিল। মহিলাদের কান ধরে উঠবোস করানো হল, বা ভীষণ ভাবে ভর্ত্সনা করা হল। পুরো লুঠের ব্যাপারটাকে, লুঠের কালচারটা ওই একটা ইনসিডেন্টে বন্ধ করে দেওয়া হল। পুরুষদের কান ধরে উঠবোস করানো হল, মহিলাদের ভর্ত্সনা করা হল। আলাদা দুটো ট্রিটমেন্টের ব্যবস্থা করা হল।

ত্রিদিব।। ভর্ত্সনা মানে? ভদ্র?

তিমির।। ভদ্র তো হয় না। সেই সময়, একটা বন্দুক হাতে লোক করাচ্ছে, মানে তো পেচ্ছাপ করে দেওয়ার মতই অবস্থা। তো, সেইখানে, তো, যেটা হল, ব্যাপক জনতা আমার সঙ্গে এল। এবার যেই, ওই লাস্ট যেই লড়াইটা, যখন চারটে গ্রামে লড়াই হচ্ছে, একটা গ্রাম আমাদেরই ছিল, প্রথম থেকে, বাঁশদা, বেশ স্ট্রং গ্রাম, ওরা ওটাকেও য়্যাটাক করে দিল। বাঁশদা মানে আমাদের গ্রাম। আর ভীষণ সাহসী গ্রাম। চারিদিকে তৃণমূল বিজেপি গ্রাম, ওরা কিন্তু দাঁড়িয়েছিল। ভয় পেয়ে, খালি হাতে গিয়ে পেড়ে ফেলত। বাঁশদার লোক যেই হুহু করে বেরিয়ে গেল, তিন নম্বর থেকে টানা সিপিএম এক দিক দিয়ে, আর যেই ওরা হেরে পালাচ্ছে শুনছে, উল্টো, ওই পোজিশনে যে সিপিএম হাজারে হাজারে লোক জমায়েত করে রেখেছে, আমরা জানিও না কিন্তু, হুহু করে সিপিএম ঢুকিয়ে দিল। আর বাঁশদার লোকজন, আমি ওখানে নেই, ওখানে লালু লিডারশিপ, সিপিএম তো, ঠিক আছে, তৃণমূল বিজেপি হটে যাওয়া মানে — তৃণমূল বিজেপি তো টার্গেট, সিপিএম ঢুকছে তাতে কোনো খেয়াল নেই। ওখানে গিয়ে সঙ্গে সঙ্গে যে দরকষাকষি, ব্যাপারটাকে যে রেজিস্ট করা, ওটা আর সম্ভব হল না। সিপিএম তিন নম্বর দখল করে নিল। এক দিনের মধ্যে। জাস্ট ওয়ান ডে। ওই যে তিন নম্বর, যেখানে ব্রেকথ্রুটা করেছিল তৃণমূল। ওই তিন নম্বরটাকে কিন্তু সিপিএম দখল করে নিল।  যে তিন নম্বর তৃণমূলের হার্ট ছিল কিন্তু। তিন নম্বর দিয়েই, আমার তিন নম্বর…

ত্রিদিব।। তিন নম্বর মানে কী?

তিমির।। তিন নম্বর অঞ্চল। কতকগুলো গ্রাম নিয়ে এক একটা অঞ্চল হয় না, তিন নম্বর, চার নম্বর, বুথ নয়, ওরকম হয়। ওই যে বলে না, তার একটা নাম আছে, হ্যাঁ। ওমুক পঞ্চায়েত অঞ্চল, ওর একটা নাম্বারও আছে। তিন নম্বর পঞ্চায়েত অঞ্চল, দু নম্বর পঞ্চায়েত অঞ্চল। যেমন, ওর একটা ছিল সন্ধিপুর। পঞ্চায়েত। একটা ছিল শ্যামপুকুর পঞ্চায়েত। এরকম। চার নম্বর ছিল শ্যামপুকুর। তিন নম্বর তেমনি, শানবাড়ি পঞ্চায়েত ছিল। তিন নম্বর। একটা পঞ্চায়েত অঞ্চল। একটা গোটা অঞ্চল।

ত্রিদিব।। কতগুলো গ্রাম?

তিমির।। প্রত্যেকটা অঞ্চলই দশটা থেকে পনেরোটা গ্রাম নিয়ে আছে। হ্যাঁ। তো, সেইখানে দাঁড়িয়ে, ওইটা যেই গেল না, তৃণমূল পুরো চুরচুর হয়ে গেল। এইবার ওরা নিগোশিয়েশনে আসার চেষ্টা করল। কিন্তু সিপিএমের অর্গানাইজেশন তো বললাম। প্রথম, তৃণমূল যখন ভাবছে সিপিএমকে সব শেষ করে দিয়েছি, তখন কিন্তু তৃণমূল সব আছে, মানে, সিপিএম সব আছে। মানে, সিপিএম সবই আছে। দ্রুত গ্রাউন্ড অর্গানাইজেশনগুলো ও আবার মিটিং ফিটিং করে, ইসে টিসে করে, করল এবার, তৃণমূলের কন্ট্রাডিকশনে, বেশ কিছু আর্মড ফোর্স নিয়ে, তৃণমূলের লোকজন ভেঙ্গে ভেঙ্গে, পয়দার ভাগাভাগিতে সিপিএমে গিয়ে জয়েন করেছিল। অমুক করব, তমুক করব, পয়সার খেলা চলছিল ভিতরে ভিতরে। একে কিনে নেওয়া, ওকে কিনে নেওয়া। সিপিএমের মধ্যেও এই বিভ্রান্তি ছড়িয়েছিল, যে, আসলে তৃণমূলের হয়ে সিরাজুলই বেশি লড়ছে, সিরাজুলকে কিনে নিতে হবে। সিরাজুলের কাছে টোপ পৌঁছল। তোকে জমি দেব, বাড়ি দেব। আমার দিকে চলে আয়। সিরাজুল চলে এল। পয়সা, পয়সা খাচ্ছে। প্রতিদিন ফিল্টার উইলস খাচ্ছে।

মানে, পুরো, প্রোডাকশন রিলেশন থেকে বিচ্ছিন্ন একটা ফোর্স দুপক্ষে তৈরি হয়ে গেছে। হুঁ ? আমাদের ফোর্স কিন্তু সেই ফোর্স নয়। প্রোডাকশন রিলেশনের সঙ্গে যতটা সম্ভব, রিলেশনের সঙ্গে যুক্ত নয় এমন একটা ফোর্স, যাদেরকে প্রোডাকশন রিলেশনের সঙ্গে যুক্ত করা হল। সে লঙ্কা চাষ, আলু চাষের সঙ্গেই এটাকে করত। কিন্তু, সেটাকে করতে গিয়েও, আমাদেরকে প্রচুর বাধা পেতে হত। পলিটিকালি বাধা হত। মিলিটারি প্রশ্নটা কি, ভীষণ ভাবে চলে এল। কিন্তু করতে গিয়ে যেটা হল, পলিটিকালি সেরকম ভাবে ডেভেলপড নয় তো, তাই, মিলিটারি ডিপেন্ডান্সি তৈরি হল। যে, মিলিটারিলি আমরা এটাকে সাকসেসফুল করেছি, এটা প্রোপাগান্ডা শুরু হল। আমরা, বারবার, সেইটাকে ভিতর, এখনও বলা হচ্ছে, তখনো বলা হল, যে, এটাকে মিলিটারিলি তুমি দেখলে, তুমি খুব ভুল করবে। যে মুহূর্তে আমার, ওরা কখন হাওয়া হয়ে গেল, যে মুহূর্তে আমার পিছনে পাঁচ সাত হাজার লোক যোগাড় হয়ে গেছে। একটা মিটিং করা হয়েছিল, তার মধ্যে, হাজার হাজার লোক সেই মিটিং-এ জড় হয়েছিল।

ত্রিদিব।। কোথায় মিটিং হয়েছিল?

তিমির।। সন্ধিপুর অঞ্চলে। এবারে সন্ধিপুর অঞ্চলের কথা বলি। সন্ধিপুরেতে আমাদের সেই অর্গানাইজারের বাড়ি ছিল। এই অর্গানাইজারটি কখন চলে গেছিল? যখন এই পলিটিকালি ইন্সেন্টিভ ইসে হয়েছিল, সে কিন্তু এরিয়া কমিটিতে একটা পাশ করিয়ে দিয়েছিল, স্বরূপ সরকার বলে একটা ভদ্রলোক ছিল। একটা ছেলে ছিল বিজেপির। আরএসএস-এর ছেলে। সে আরএসএসের ছেলে। সে, তাকে খতম না করলে হবে না। তাকে খতম করলেই শেষ হয়ে যাবে। এটা কিন্তু ও এরিয়া কমিটিতে পাশ করিয়েছিল। মানে, ডিস্ট্রিক্ট কমিটিতে। ডিস্ট্রিক্ট কমিটিতে পাশ করিয়েছিল। পাশ করিয়ে সে কী করেছিল — সে তখন না কী করে একটা বন্দোবস্ত করিয়েছিল, এটা একটা ইন্টারেস্টিং গল্প আছে। সেটা তোমাকে বলে রাখি। সেটা আমি আসার আগেই। তখন আমি সদ্য এসেছি, গ্রামের দিকে, মানে, সদ্য মানে, তখন আমি নাইন্টিসেভেন নাইন্টিএইট কাজ করেছি, গোয়ালতোড়, গড়বেতা সম্পর্কে কিছু জানিনা। তো আমি ওখানে যেহেতু স্ট্রাগল বিল্ড আপ করেছি, তো করা হল, যে ওখানে বাইরের ফোর্স যেতে, বাইরের দুটো অঞ্চল, লালগড়, রামগড়, এবং গোয়ালতোড় থেকে যারা যাচ্ছে, তারা গিয়ে ওদেরকে হেল্প করবে। ঠিক আছে। টোটাল ডাইরেকশন কে ঠিক করবে? না, ওখানকার যে অর্গানাইজার আছে, সে-ই ডাইরেকশন ঠিক করবে। তাহলে, সেই সচেষ্ট হবে। তা, আমাদেরকে হাঁটতে হাঁটতে প্রায়, আশি কিলোমিটার পথ আমরা বোধহয় হেঁটেছিলাম, হেঁটে, আমরা গড়বেতায় পৌঁছলাম। পরের দিন আবার হাঁটতে শুরু করলাম। গড়বেতার একটা পয়েন্টে, পয়েন্টে পৌঁছলাম। দশ নম্বর। পুরোনো নকশালদের এলাকা ছিল, সেখানের সিপিএম মেরে শেষ করে দিয়েছে…

(এখানে প্রথম ক্যাসেটের দ্বিতীয় দিক শেষ হল।)

ত্রিদিব।। নিট দেড় ঘন্টা কথা বলা হয়ে গেল। এটা দ্বিতীয় ক্যাসেট। শুরু করে দে, যা বলছিলি।

তিমির।। দাঁড়াও, দাঁড়াও, মুখ শুকিয়ে গেছে।

ত্রিদিব।। ও, বিড়ি। আর জলটা এনে নে। হুঁ।

তিমির।। তো, সেই সময় ও এরিয়া কমিটিতে পাশ করিয়েছিল যে, স্বরূপ সরকার, আরো দুজন, এদেরকে য়্যানিহিলেট করতে হবে। বিশেষ করে স্বরূপ আর বিধান। মনে পড়েছে, বিধান। এদের দুজনকে য়্যানিহিলেট করতে হচ্ছে এভাবে, এবং, এটা করলে, হবে। এবং, এরকম একটা ধারণাকে চ্যাম্পিয়নই করে দেওয়া হয়েছিল এরিয়া কমিটিতে, যে, সিপিএম ভীষণ টেররিস্ট, মানে, ভীষণ টেরর তৈরি করছে, মানুষ ভয়ে কথা বলতে পারছে না, আমরা দু-চার জনকে মেরে দিলে মানুষের সাহস বাড়বে। মানে, চূড়ান্ত য়্যাপলিটিকাল কথা আরকি।

ত্রিদিব।। মুখ থেকে হাত সরিয়ে বল তুই — বিড়ি টানতে টানতে — বাজে রেকর্ড হবে, আমি লিখতে পারব না।

তিমির।। তো, সেখানে দাঁড়িয়ে, এটা চ্যাম্পিয়ন করানো হয়েছিল। যাই হোক। এটা একটু এক্সপেরিমেন্টাল জায়গা — তুমি যখন কোনো জবাব দিতে পারছ না, তখন, মন্ত্রীকে না-মেনে নিলেও তুমি দায়ী। তা ইম্প্লিমেন্টের জন্য নির্দেশ দেওয়া হল। আমি এবং আর এক জন ছিল, অন্য দিকের। তো, সে দুজনকে ঠিক করা হল, এরা যাবে। তিনটে গ্রুপে ভাগ করা হল। একটা ওই লোকাল অর্গানাইজারের দায়িত্বে, আমরা হচ্ছি সাপোর্টিং গ্রুপ। যেতে যেতে যেতে যেতে এক দিনে গড়বেতা পৌঁছনো হল, তার পরের দিন যখন রাত্তিরবেলায় আমরা বেরোলাম, একটা জঙ্গলের মধ্যে, স্ট্র্যাটেজি পয়েন্ট, স্ট্র্যাটেজি ঠিক করবার জন্য, ওখানেও কিছু, গড়বেতাতেও কিছু কিছু জঙ্গল আছে। গড়বেতার একটা সাইডে।

তো, ওখানে একটা জঙ্গলের মধ্যে, স্ট্র্যাটেজি ঠিক করতে গিয়ে, বলল, যে, আমাকেই য়্যাকশনটা করতে হবে। আমার খুব হাসি পেল। আমি বললাম, এলাকাটা কিন্তু আমি চিনিনা। ঠিক আছে, আমি করব। কেননা, ওরা প্রচণ্ড, মানে, মানে খুব, ভীষণ, মানে গ্রামীন, মানে একটা, একটা গ্রামীনই বলব আমি, একটা ভিলেজেরই কালচারই আরকি…

ত্রিদিব।। ‘পল্লীসমাজ’-এর পলিটিক্স…

তিমির।। হ্যাঁ। যে, প্রচণ্ড ভাবে অন্যকে দায়ী করবার একটা জায়গা। আমাকে ভিতু ঠিতু বলে, একটা যা-তা ব্যাপার করবে, কী রকম একটা, আর আমিও তখন, মিডলক্লাস ইগোর জায়গা থেকেই নিলাম। ঠিক আছে, আমি করব। আমি বললাম, আমি তো এদেরকে চিনিনা, তাহলে আমাকে এমন একজন লোক দেওয়া হোক, যে ওদের দুজনকে চেনে। একটা উইকেস্ট টিম তৈরি করে দেওয়া হল। এক জনকে দেওয়া হল, সে চেনে। ঠিক আছে? এক জনকে দেওয়া হল, সে চেনে, সে বলল চিনি, প্রথমে বলল সে, চিনি। স্বরূপকে চিনি। ও ঠিক আছে, ও স্বরূপকে চিনলেই, ও স্বরূপের সঙ্গেই বিধান থাকবে। মানে, স্বরূপের বাবা থাকলেও সে বিধান আমি। আমি অবাক হলাম ব্যাপারটাতে। দুজন তো সাইড হল। তখনো কিন্তু আমি লিডার নই, মানে, য়্যাকচুয়ালি, হ্যাঁ, তখন আমি কমিটির মেম্বার, কিন্তু সেক্রেটারি বোধহয় আমি নই। হ্যাঁ, আমি সেক্রেটারি নই। সেক্রেটারি আমি পরে হয়েছিলাম, গড়বেতায় আসার পর।

তো, ঠিক আছে। দেওয়া হল। আমাকে য়্যাকশন পয়েন্টে রাখা হল। দুজন, তিনটে গ্রুপ, পৌঁছে গেলাম আমরা, রাত্তিরবেলার মধ্যেই। হেঁটে হেঁটে। গোটা রাত হেঁটে। তিনটে পয়েন্টে। তো, যে মূল অর্গানাইজার ছিল, সে আমাকে বলল, যে, আমি খবর না-পাঠালে য়্যাকশন করবে না। তো, আমরা খেয়ে দেয়ে রেডি হয়ে বসে আছি। য়্যাকশন হবে, বুঝলে। আমার সঙ্গে আর পাঁচ জন আছে। তো, সেখানে দাঁড়িয়ে, খবর আর আসে না। এদিকে, যে বাড়িতে আছি, সে বাড়ির লোক বলছে, সে কী, তোমরা কখন বেরোবে? বেরোও। অন্ধকার হয়ে গেল। ওরা তো চলে যাবে এর পরে। যাও তোমরা। কী করা যায়। এর মধ্যে এক জন বার্তাবাহক এল। সে এসে গপ্প ফপ্প করে দিয়ে চলে গেল। তো, এ দেখছি, টেনশন নিচ্ছে, বেরোতে হবে। তো? কোনো খবর নেই ওদের কাছ থেকে। সময় পার হয়ে যাচ্ছে, সমানে। আমি ঠিক করলাম যে, এটা ওর উপর ডিপেন্ড করবে না। হল… চলো।

রাস্তার মাঝে, যে চিনিয়ে দেবে, সে পুরো, ব্রেক করে গেল। সে পুরো বন্দুক ফন্দুক দিয়ে, বসে গেল। মাথা গুঁজে, বসে গেল। আমি যাব না। কান্নাকাটি। আমি ভাবলাম, এ মহা মুশকিল। আর, এমন সময়, সন্ধের মুখে, সে টিমটিম বাতি নিয়ে লোক দেখছে, আমাদের দিকে অবাক হয়ে তাকাচ্ছে, এরকম একটা সিচুয়েশন। একদম ফুল ফেঁসে গেছি। ফুল ফেঁসে গেছি। কোনো রকম আর উপায় নেই। ওদের দিক দিয়ে কোনো সাইন নেই। কোনো রকম আওয়াজ নেই। কোনো খবর নেই। আমি, কী করলাম, এটা তো, এটাকে হ্যান্ডল করতে হবে, আর জনতা, হ্যান্ডল করতে হবে, এটা তো আমাকে বেরিয়ে যেতে হবে। মোদ্দা কথা, আমাকে বেরিয়ে যেতে হবে।

যেতে যেতে, হঠাৎ করে ওখানে, দেখলাম ওখানে, মোটামুটি তৃণমূল বিজেপির লোক ছিল, একটা অফিসের মত ছিল, ওখানে গিয়ে, একটা হামলাই মতই চালিয়ে দিলাম। আরকি। ভয় ফয় পাইয়ে দিলাম। আরকি। দুম দাম আকাশে কিছু ফায়ারিং ফুয়ারিং করিয়ে দিলাম। করার পর, দু-চারটে ছেলে কনফিডেন্স পেয়ে গেল। একদম রোগা পাতলা একজন, সে থরথর করে কাঁপছে, বকুলগাছে…

ত্রিদিব।। তোরা কত জন?

তিমির।। আমরা পাঁচ জন। জাস্ট পাঁচ জন। করে দিয়ে তো, হামলা করেছি, চারিদিকে খোঁজাখুঁজি করছি, কিন্তু ও তো চিনিয়ে দেয়নি আর আমাদের। আমরা তো চিনতে পারিনি। তো, এক জনকে, অফিসে ধরেছে, এই, স্বরূপ কে, বল। এই খানটা ধরেছি (হাত দিয়ে নিজের কাঁধ দেখায়), আর সে দেখছি, দেখছি পেচ্ছাপ করছে। পেচ্ছাপ করতে শুরু করেছে, ভয়ে। আমি বললাম, সিচুয়েশন আন্ডার কন্ট্রোল। এরা ভয় পেয়ে গেছে। আমি বেরিয়ে যেতে পারব। কিন্তু আমার রাস্তা চেনানোর আর লোক নেই। ওদের সঙ্গে মিট না-করতে পারলে, আমি আবার ওদের সঙ্গে মিট করবার জন্য রাস্তাটুকুও আমি চিনি না।

ত্রিদিব।। স্বরূপ — এ হল বিজেপির লিডার?

তিমির।। হ্যাঁ, বিজেপির লিডার। বিজেপি। বিজেপি। আরএসএসের ছেলে ছিল। তো, আমি সেখান থেকে, ওটা করে ঠরে, একটা কী করলাম, এ তো, আর একটা কী হয়, একটা মিটিং করি। আমার মাথায় তো পলিটিক্সই। এই সিচুয়েশনটাকে, সব, এই এসো এসো, করে দিয়ে… দাঁড়িয়ে বললাম, আমরা কারা। কী করতে এসেছি। কেন এসেছি। কেন স্বরূপ বিধানকে… খতম করার পার্টি সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখানে অমুকে রেপ করেছে, সুকুমার প্রধান বলে এক জনের নাম শুনেছি — তার ঘটনাটা এরকম হয়েছে, তার কাছে পাঁচ হাজার টাকা চেয়েছে, বলেছে, ভাই, আমার ফসলটা বেচে দিই, তার পরে পাঁচ হাজার টাকা দেব। বলেছে, ঠিক আছে, তোর পাঁচ হাজার টাকা দিতে পারছিস না, তোর মেয়েটাকে দে। বলে, মেয়েটাকে টানতে টানতে নিয়ে গেছে, দু ঘন্টা বাদে মেয়েটা ধানক্ষেতের মধ্যে থেকে ফেরত আসছে। মানে, তার সাথে কী হয়েছে সেটা বোঝাই যায়। এই ধরনের, স্বরূপের এই ধরনের ব্রুটালিটির গল্প আমরা শুনেছি।

তো, সেই সমস্ত বলা হল। মানুষ হাঁ করে শুনল। শুনল কি শুনল না, জানিনা। করে, চলে এলাম। তার পরে তো, তখন আমি ডেপুট করা নেই, তা সেই ঘটনার পর তো, উনি, যে ভদ্রলোক, অর্গানাইজার, সেই ঘটনাটা মজার ঘটনা আছে। আমি গিয়ে একটা তাল, বলল, তালপুকুর বলল, আর একটি ছেলে ছিল, সে বলল, আমি কিছুটা বার করে দিতে পারব, তোমাকে হয়ত আমি বার করে নিয়ে যেতে পারব, একটু ভুলে যেতে, পারব, একটু পথ চিনতে পারবে তো, দাদা, আমি বার করে নিয়ে যাব। বলল, কত, বলেছে ওই তালপুকুরের ওইখানটায় নিয়ে মিট করি। ওখানটায় দাঁড়াই। ওখান থেকে দেখে নিই গোটা সিচুয়েশনটা। তারপর আস্তে আস্তে বেরিয়ে যাব। তালপুকুর থেকে বেরিয়ে যাব। ওই, চল তাহলে তালপুকুর। পুকুরের কাছে চল। তা, তালপুকুরের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে আছি।

তারপরে দেখি, দূর থেকে, কালো কালো অসংখ্য মাথা আসছে। অসংখ্য মানে, অন্ধকারে অসংখ্য লাগছে, আসলে অসংখ্য নয়। তো, আমি, বললাম… বলল, ওরা আসছে। দাদা, ওরা আসছে। ওরা আসছে বলতে? আমি বললাম, ওরা আসছে বলতে? বলল, না, তৃণমূল বিজেপি আসছে। ওরা কিন্তু গড়বেতারই ছেলে, ওই তিনটেই গড়বেতার ছেলে। ওরা এলে… বলছে… শেষ হয়ে যাব। বললাম, কিচ্ছু ভয় নেই তোর। কী ভয়? ওই তো সামনেই আছে লোকগুলো। তুই পোজিশন নে। তালগাছে তালগাছে পোজিশন নিয়ে নে তোরা সব। ততক্ষণে ওরা আমার প্রতি একটা কনফিডেন্স পেয়ে গেছে। কেননা, ওইটুকু তো ডিল করে দিয়ে চলে এসেছি। মানে, আমার প্রতি একটা, ভীষণ, মানে, আমার কথা শুনছে, মন্ত্রমুগ্ধের মত শুনছে। তার মানে, আমি বুঝে গিয়েছি, যে, এটা… একটা ফর্মে চলবে। আমার কথায়, ফর্মে — অর্থাত, আমার কমান্ড শুনবে। মানে, আমার কমান্ড শুনলে মানে, আর ও যদি রাস্তাটাকে ঠিকঠাক দেখায়, তাহলে আমি বার করে দেব।

পোজিশন নিচ্ছি। আর আমার মনের মধ্যে সন্দেহ হচ্ছে, ওরা নয় তো? সত্যি সত্যি, ওরা ফায়ারিং-এর আওয়াজ ফাওয়াজ শুনে, কোনোক্রমে, ওরা ঠিক করেছিল রান্নাবান্না করবে, রাত্রে খাওয়া দাওয়া সেরে বেরোবে আরকি। ঠিক আছে। তা আর হলনা। সেটা যে কী হল। সেই ভদ্রলোক, অর্গানাইজার ভদ্রলোক, বোধহয় আসছেন। আমি এরকম পোজিশন নিয়ে বলছি, য়্যাই, কে আছ ওখানে, সামনে? আর এক পা এগোলে আমি গুলি করে দেব। বললাম আরকি। জোরে গলায়। ভয়েসে, অন্যরকম আরকি, এখনের মত নয় নিশ্চয়ই, তুমি বুঝতে পারছ। কোনো আওয়াজ নেই। কে? আবার বলেছি। কোনো আওয়াজ নেই। এবার বলছে, আমি বলেছি — একটা সাইন আছে আরকি — গাছ ডাউন করতে বলেছি, এটা ওদের নক করে গেছে —  কেন করব? তখন একটা গলায়, আমার নামটা উচ্চারণ করে এক জন, সরু একটা গলায়, ওওও করে, ডেকেছে। আমি তো দেখলাম… ওরা আসছে। মানে, আমাদেরই লোকজন। বেরিয়ে গিয়ে বললাম, কী করেছেন? শালা। সব শেষ হয়ে গেছে — এবার আমার সব শেষ হয়ে যাবে — অমুক তমুক। হয়ে গেলে, সব নিয়ে ফিরে গেল, উনি মালটা, ছেড়ে দিয়ে, প্রায় গড়বেতা দেড়মাসের জন্য ছেড়ে দিয়ে ফিরে গেলেন।

অথচ, ওখানে এফেক্টটা কিন্তু খারাপ হয়নি। ওরা ভীষণ ভয় পেয়ে গেছিল। পালিয়ে গেছিল। এবং, ফ্রি হয়ে গেছিল জায়গাটা প্রায়। মানে, উনি যদি ওখানে থাকতেন, খুব দ্রুত ওটাকে, মানুষকে যদি পলিটিকাল ওয়ার্কটা করতেন, দ্রুত ওই সময়টাকে ইউটিলাইজ করতে পারতেন। কিন্তু উনি করলেন না। তার পরেও ওই, সেই ছেলেটি এসেছিল, ওই ছেলেটি এল। তারপরে তো ওদের সঙ্গে, কেন গেছিল… সে তো বললাম যে, এটা তো তোমায় বলা হয়েছিল, দুজনের মধ্যে অর্গানাইজেশন কন্ট্রাডিকশন শুরু হয়েছিল। এইখানেই ওনার একক ভাবে মুভ করাটার সমাপ্তি হয়েছিল। মানে, ওনার এই, মানে এরকম অদ্ভুত বিতিকিচ্ছিরি প্ল্যানিং। মানে, ওই প্ল্যানিংটাই তো প্রথমে সবার নিগেট হয়ে গেছে, কমিটিতে। তোমরা এরকম প্ল্যানিং, করল, যে জানেনা, চেনেনা, তাকে তুমি, সাপোর্টিং রোলে না মেন রোলে রাখলে কী করে। আমাকে বলল যে, আমিও ভর্তসিত হলাম, যে, তুমি কেন এটা মেনে নিলে? আমি বললাম, না, আমাকে তো ভিতু বলছে, আমার মেনে নেওয়া ছাড়া… বলল, এ তো মিডলক্লাস, মিডলক্লাস ইগো তোমার। আমি বললাম, মেনে নিলাম। মিডলক্লাস ইগো হতে পারে আমার। বলল ইসে, ওর ইগো দিয়ে হবে না, তোমার এটা থ্রাশ করা উচিত ছিল।

ত্রিদিব।। শুধু মেনে নিলি, না, ‘ঠিক’ মনেও করিস?

তিমির।। না, ঠিক মনে করি কী?

ত্রিদিব।। না, তুই ওদের গালটা মেনে নিলি, না, তুই নিজেও মনে করিস একটা মিডলক্লাস ইগোর প্রব্লেম ছিল তখন তোর?

তিমির।। না, তখন তো ছিলই। মিডলক্লাস ইগোর প্রব্লেমই ছিল আমার। আমার ইগোই ছিল। ইগোই কাজ করেছে। তুমি শালা এরকম বলছ। তো ওখানকার লোক প্রচুর পিছনে লেগেছে তার আগে। প্রচুর পিছনে লেগেছে। আমাকে, দু চক্ষের বিষ হয়ে যাচ্ছিলাম, আস্তে আস্তে। পুরোনো, মানে, গ্রামের লোকদের। শহরের একটা ছেলে, ওরকম গেল, শহরের একটা ছেলে এসে ফাটিয়ে দিয়ে যাচ্ছে, সে আবার নেতা হয়ে বসে যায় আস্তে আস্তে। একটা ভীষণ ইগো এসেছে। মানে, তাদের কথায় উঠি, বসি, তাদের কথা গলায় গামছা দিয়ে শুনি, এরকমটাই তো। আমার তো সার্চিং ওর থেকে অনেক বেশি ছিল। অনেক বেশি ছিল সার্চিং। তো, সেই জায়গা থেকে আমি তো কাজও করতাম। আমার তো কাজ না-করা ছাড়া, আমার বাড়ি ছিলনা, আলু চাষও ছিলনা তো? ঠিক আছে? আমার শিকড়-গাড়া, গ্রামে আমি শিকড় গাড়তে পারছি না…

ত্রিদিব।। এই লোকটি এখন আর সংগঠনে আছে?

তিমির।। না না, জেলে আছে। তো, সে, মনে হয়, সারেন্ডার টাইপ। তো, সে জায়গা থেকে, যেটা হয়েছে যে… আমি করেছিলাম… তারপর, যাই হোক, তবু আমি যে সাহসের পরিচয় দিয়েছি, সেটা আবার য়্যাপ্রিশিয়েটেড… মানে, যাই হোক, সেরকম কমিটিতে, প্রচুর ডিসকাশন হল, প্রচুর গালাগালি, খিস্তিখেউড় হল। আর, উনি তো… আর এক জনকে বলল, তুমি একটি ভিতুর ডিম। সে তো, আমি ঠিক… তুমি ভিতুর ডিম। তুমি ভিতুর ডিম। এই ভাবে খিস্তি খেউড়। আমি চুপ। তো, ওই, তার পরে, ওই আর এক জন, শহর থেকে এক জন কমরেডকে ওখানে, অর্গানাইজার, সেন্ট্রাল অর্গানাইজার হিসাবে ডেপুট করা হল। তার পরে, দু জনের মধ্যে, কোস্তাকুস্তি। আমি যখন গিয়েছি, ও ওই দিকে মুখ করে ফিরে আছে, এ এই দিকে মুখ ফিরিয়ে বসে আছে। হ্যাঁ? এ বলছে, আমার বিড়ির প্যাকেট ও চুরি করে। ও বলছে, আমার টুপি নিয়ে ও চলে গেছে। এই লেভেলে। সত্যি, এই লেভেলে।

ত্রিদিব।। এরা কারা? কেন?

তিমির।। এরকম। মানে, তুমি, মঙ্গলগ্রহের জীব নয় তো। বিভিন্ন লোক নিয়েই তো হয়। এর মধ্যে তো অনেক লোক… মানে, অনেক, ভীষণ ভালো লোক। এর মধ্যে। আছে। ডেডিকেটেডলি কাজ করছে। তো, সেইখানে দাঁড়িয়ে… এই বার, যখন ওরা মারামারি করছে, এবং ওদের দুজনের উপরে আমাকে পুট করে দেওয়া হয়েছে, যে, ওদের সমস্যাকে মেটাও, হ্যাঁ? এবং পলিটিকালি যাতে ওরা মুভ করতে পারে, সেটাকে সহায়তা করো। সেটা যখন প্রসিডিওর হচ্ছে, তখন, একটি ছেলেকে নিয়ে আমি একটা স্টুডেন্টদের মধ্যে, গড়বেতা কলেজের স্টুডেন্টদের মধ্যে কাজ করা উচিত বলে আমার মনে হয়েছিল। একটি ছেলেকে শহর থেকে গড়বেতা কলেজে ভর্তি করা হয়েছিল। এবং, সেখানেও, কিছু কানেকটেড বার করার কথা… ওই, স্টুডেন্ট মিটিং করবার জন্য আমি ওই ছেলেটিকে নিয়ে গেছিলাম। কারণ, ওকে তো লিডার হিশেবে ডেপুট করা, ওকে নিয়ে আমি… তো, স্টুডেন্ট মিটিং করার মধ্যে দিয়ে, কী হয়েছে — আর ওই মালটি কী করেছে, নিজের সাহস প্রমাণ করবার জন্য, নিজের বাড়িতে ছিল সেই দিন, নিজের বাড়িতে থেকে, লোকজন নিয়ে, স্বরূপ রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল, নেমে — য়্যানিহিলেট করতে হবে, বলে, গুলি চালিয়ে দিয়েছে। দিনের বেলায়, প্রায়, বিকেল বেলায়, দিনের বেলায়। গোপনে, এরকম ভাবে (বন্দুক হাতে গুঁড়ি মারার ভঙ্গী করে), লুকিয়ে, একটা গুলি চালিয়ে দিয়েছে, একটা ফায়ারিং করে দিয়েছে।

তবে, ওর সঙ্গে একটা এফিশিয়েন্ট, খুব সাহসী ছেলে ছিল। যে লাস্ট, টিল, মানে, লাস্ট আমার সঙ্গে ছিল, আমিও বেরিয়ে এসেছি, ও-ও ছেড়ে দিয়ে চলে গেছে। মানে, ও আমাকে ছাড়া আর পৃথিবীতে কাউকে বিশ্বাস করতে পারছিল না, ওইরকম একটা সিচুয়েশনে। পলিটিকালি অতটা ম্যাচিওর্ড নয়, কিন্তু, আমি নেই, মানে, ও-ও চলে যায়। কয়েক মাস বাদে, আমি শুনেছি, ও-ও কোথাও চলে গেছে। কোনো জায়গায়, শ্রমিকদের কাজ ফাজ করছে, এরকম। ও এখন, সিনেই নেই আরকি। কিন্তু, ওই ছেলেটাই ছিল হার্ট, মানে, মূল জায়গা, মানে, ভীষণ একটা, সাঙ্ঘাতিক একটা, ভীষণ এফিশিয়েন্ট, ভীষণ মিশুকে, ভীষণ ভালো অর্গানাইজার। থাকে না? গ্রামের কিছু সাধারণ ছেলে থাকে। কিন্তু ও গ্রামের ছেলে ছিল না, ও মেদিনীপুর শহরের ছেলে ছিল। ওর ব্যাকগ্রাউন্ডটা হচ্ছে, ওর বাবা হচ্ছে রেলওয়ে শ্রমিক ছিল। এবং, তাই, ওই ব্যাকগ্রাউন্ডের জায়গা থেকেই, ওর রিজিডিটিও অনেক বেশি ছিল (এখানে অবশ্যই ‘রিজিডিটি’ শব্দটা ব্যবহৃত হচ্ছে ‘দৃঢ়তা’ অর্থে)। তার কারণ, শ্রমিকদের যে রিজিডিটি, সেটা যে ডিফারেন্ট, অনেক বেশি বোল্ড, এটা বোঝা যায়, পিছুটান অনেক কম।

ও, এই ছেলেটা, কী করেছে, ও এইটা করে দিয়েছে যেহেতু, ও-ও, য়্যাকচুয়ালি একা, ও দৌড়ে দৌড়ে দৌড়ে দৌড়ে, ওই দিনের বেলায় গিয়ে, য়্যানিহিলেট করে। এবং, তার পরে ওর কান্না দেখেছিলাম। বলছে, তোমাকে এত দিন বলিনি দাদা, এটা হচ্ছে পারিবারিক গন্ডগোলের ফল। ও যে বলে না অত, অতটা দোষী স্বরূপ নয়। আমি যখন লাস্ট গুলিটা চালাচ্ছি, পার্টি ডিসিশন মেনে, তখন স্বরূপ আমায় হাত জোড় করে দাঁড়িয়েছিল। আমার না, গুলি করতে ইচ্ছে করেনি। তোমার গল্প লেখার সুবিধার জন্য, আমি বললাম এই রকম ঘটনা। স্বরূপ… ছেলেটা আমাকে ধরে কাঁদছে। দুম করে ওই ফায়ারিংটা করে দিল, আর আমরা বাধ্য হলাম। তো, হাউহাউ করে কাঁদছে। আমি দেখেছি। পরবর্তীতে। ওটা করে দিয়েছে। করে দিয়ে আর সামলাতে পারেনি। ঠিক আছে? গোটা গিয়ে, একটা বিরাট সিপিএমের গ্রাম ছিল, বিরাট, সিপিএমেরই গ্রাম ছিল, ওটা ছিল হুগলি পোজিশনে, ওখানে গিয়ে শেলটার নিয়ে নিয়েছে। তারা শেলটার দিয়ে দিয়েছে। দিয়ে ওটাকে রেজিস্ট করেছে। আর, ওদিক দিয়ে, বিজেপি এসে ওদের ঘর দোর ভেঙ্গে, ভাইকে স্কুল থেকে বার করে, ছেচে ছেচে মেরে ফেলেছে, ভাইকে।

ত্রিদিব।। কার ভাইকে? যে ওই প্রথম গুলিটা চালাল?

তিমির।। হ্যাঁ। ওই অর্গানাইজারের। তার ভাইকে ছেচে ছেচে মেরে দিল। ওই গ্রামেরই স্কুলে কাজ করত, নন-টিচিং স্টাফ ছিল। সেই নন-টিচিং স্টাফ ছেলেটাকে, সেই নিরীহ সরল সাধারণ ছেলেটাকে, ছেচে মেরে দিল। একদম। টুকরো টুকরো করে দিয়েছিল। ঘরদোর জ্বালিয়ে দিল। কোনো রেজিস্টান্স দেয়নি। উনি ওটা করে দিয়ে, ওই খবর শুনে, অজ্ঞান হয়ে পড়ে রইলেন। কোনো রেজিস্টান্সের জন্য উত্সাহিত করল না, সিপিএমের যারা উসকাচ্ছিল, তাদেরকে নিয়ে উনি যেতে পারতেন। কিছু করলেন না। অকওয়ার্ড সিচুয়েশনে, বাইরে থেকে খবর পেলাম আমরা। আমাদেরকেও খবর দিচ্ছে, আর একটা জায়গায় কিছু অর্গানাইজেশন তৈরি করবার চেষ্টা করছিলাম, মিটিং করছিলাম, তারা সিপিএমের লোকজনকে নিয়ে হাজির। আমাদেরই ছেলেরা সিপিএমের লোকজনকে নিয়ে হাজির। হল দাদা, আপনারা এইখানে বসে আছেন, ওখানে তো সব শেষ করে দিয়েছে, উনি স্বরূপ দত্তকে মেরে দিয়েছে, আর স্বরূপ দত্তর লোকজন গিয়ে ওনার বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে, সব মেরে দিয়েছে। ওনার পরিবারের সবাইকে মেরে দিয়েছে।

ত্রিদিব।। কিন্তু উনি তো মারেন নি। শেষ অব্দি মেরেছিল তো সেই ছেলেটি ?

তিমির।। না না, ওরা তো পালিয়ে গেছে। সেই ছেলেটি, সে আবার গোটা স্কোয়াডটাকে, ছেলেপুলেকে গুছিয়ে গাছিয়ে, নিয়ে, গিয়ে, বার করেছে। একটা ধানের তুষের মধ্যে ইসে ছিল। পুলিশ এসেছে। পুলিশ ইসে করেছে। তার মধ্যে ও, ও তখন লিডার হয়ে গেছিল, প্রায় একদম এটা এরকম শনগাছ, ঘাস, বড় বড় ঘাসের মধ্যে প্লেন শুইয়ে রেখে দিয়েছিল সাড়ে তিন ঘন্টা। করে, ওখান থেকে, আর একটা জায়গায়, সিপিএমের লোকজন এদের রেসকিউ করে নিয়ে যায়। তার মানে, তুমি অর্গানাইজেশনাল স্ট্যাটাস বোঝো। অর্গানাইজেশনের পোজিশনটা বোঝো। আমি বারবার বলে দিয়ে এসেছিলাম, যে, আমি না-থাকলে, কোনো য়্যানিহিলেশন একজিকিউট করা হবে না। আমি বলে দিয়ে এসেছিলাম, কোনো য়্যানিহিলেশন একজিকিউট হবে না। তার মানে মিলিটারি জানো, পলিটিক্স জানো না। এতে খুব ইগোতে লেগে গেছিল। এবং, এটাকে ভায়োলেট করবার জন্যেই উনি এটা করেছিলেন। ওনার সাহসের জায়গা থেকে করেছিলেন, এরকম ব্যাপারটা আমার এখনো পর্যন্ত মনে হয় না। এখনো পর্যন্ত মনে হয় না। পরবর্তী কালে, ওনাকেই সাহসী বলা হয়েছিল। আমাকে ভিতু বলা হয়েছে। সেটার তো গল্প অনেক।

যাই হোক, সেটা এরকম ঘটেছিল। এবং, ওইটা, ঘটনাটা, ঘটেছিল ওইটা, হ্যাঁ? তারপরে গিয়ে, ঢুকতে জান কয়লা হয়ে গেছিল, অন্য পোজিশন থেকে, বাইরে থেকে, আস্তে আস্তে আস্তে আস্তে, আবার ঢুকেছিলাম। এবং, ওই, ওই যে উইনওভারটা করেছিলাম, তৃণমূল বিজেপিকে হাটিয়ে দিয়েছিলাম, সেইটাকে পালন করবার জন্য, অর্থাত, সন্ধিপুরে যে কেসটা করা হয়েছিল, ঘটেছিল, তাই সন্ধিপুরেই ওই মিটিংটা ডাকা হয়েছিল। ঠিক আছে? ওই যে, তৃণমূল বিজেপি, ওইটাকে, বীভত্সতা, ওটাকে কাউন্টার করে, ওখানে মিটিংটা ডাকা হয়েছিল। ওই উইনওভারটার পরে। তারপর তো থ্রু আউট কাজ করা হল। কিছু দিনের জন্য প্রায় মুক্তাঞ্চল। ওই গোটা অঞ্চলে একটা, পাওয়ার কী, আমি বুঝে গেছি কিন্তু। আমার, এই পোজিশনটা সম্পর্কে, আমার নিজের, নিজের য়্যানালিসিস দরকার হয়ে পড়ল। যেখানে, যে কোনো লোক, মানে, এক জন মহিলা, সদ্য বিবাহিত, বাচ্চা মেয়ে, সতেরো বছর, সে প্রেগন্যান্ট হয়েছে, বাচ্চা হয়েছে, সে এসে বলছে, আপনার নামে নাম দিলাম আমার ছেলের। ওই যে নামটা তখন ছিল আরকি। তো, এই যে ব্যাপারগুলো, এই গুলোতে আমি, কনশাসনেসটা আমাকে, আমার যেন আরো বাড়িয়ে দিল, যে, খুব সাবধান। তুমি কিন্তু, পাওয়ার, পাওয়ার এনজয় করার জায়গায় চলে যাচ্ছি। পাওয়ার এনজয় করার জায়গায় যেন চলে আসছি। এনজয় করা টরা যাবে না।

ধীরে ধীরে পলিটিকাল টাস্ককে আরো গোছাও। গ্রামে গ্রামে, গ্রাম কমিটি তৈরি করবার জন্য, পার্টি ক্রমাগত প্রেশার তৈরি করল, গ্রামরক্ষী বাহিনী তৈরি করো। আমি ক্রমাগত জোর দিতে থাকলাম, পার্টি কমিটি তৈরি করবার জন্য। পার্টি কমিটি তৈরি করতে হবে, নট গ্রাম কমিটি। শুধু গ্রাম কমিটি দিয়ে হয় না। পলিটিকালি কনশাস পার্টি কমিটি দরকার। আর, যেই পার্টি কমিটি গঠন করবার দিকে নজর দিলাম, ইসে করলাম, সিপিএমের যে ফোর্সগুলো আমাদের সঙ্গে ছিল, এবার ছিটকা ছিটকি শুরু হতে শুরু করল। কারণ, পলিটিক্স তো এবার গোটা স্টেটের জন্য সিপিএমকে দায়ী করে শুরু হচ্ছে। যে, সিপিএম ইজ নট দি রাইট ফোর্স। তোমরা যদি এখন ভুল করো, আবার সিপিএমকে প্রশ্রয় দাও, তাহলে কিন্তু আবার, তোমরা সেই আগুনে, যেটাকে মুক্তি পেতে চেয়েছিলে, সেখানে যাবে। দলে দলে তৃণমূলের অংশটা কিন্তু আমাদের দিকে, সাধারণ যে তৃণমূলের সাপোর্টটা ছিল, সেই সাপোর্টটা আমাদের দিকে ঘুরে গেল। রিয়েলি ঘুরে গেল। রিয়েলি ঘুরে গেল, এই কারণটা, যে, তারা তো আর সিপিএম নয়। এর মধ্যে কৃষক, বড় কৃষক, মধ্য কৃষক…

ত্রিদিব।। এই পুরোটাই বলছিস, তিন নম্বরে ওই যে সিপিএম ফাটিয়ে ঢুকে গেল, তার পরের কথা?

তিমির।। তার পরবর্তীতে। হ্যাঁ। তার পরবর্তীতে। তিন নম্বরেও আমাদের পেনিট্রেশন শুরু হল, এবং, সিপিএম কিন্তু, আমাদেরকে, ডাইরেক্টলি য়্যাটাক করছে না। ভয় দেখাচ্ছে আমাদের লোকজনকে, শুরু হয়ে গেল এই কাজ। পাল্টা টেনশন আর একটা শুরু হয়ে যাচ্ছে। মাঝখানে। এবার আমাদের সাপোর্টে আসছে বেশ কিছু ক্ষেতমজুর, সঙ্গে বড় কৃষক, মধ্য কৃষক, ছোট কৃষক, টানা অংশের মানুষের সঙ্গে কিন্তু আমাদের যোগাযোগ তৈরি হচ্ছে। আমি দেখলাম, এইটাই একটা কনক্লুশনের, মানে, আমি এই যে যে করলাম, এটা যে ব্রেক থ্রু করে চালানো হল। যে, ব্রেক থ্রু। বেশ কিছু লোক বলতে চেষ্টা করল, এবং, সেই সময়, প্রচুর কন্ট্রাডিকশন শুরু হল, কেননা, সিপিএমের লোকজনকে যে আমি ইউটিলাইজ করেছিলাম, আমি তো ওদের সতেরোটা গুলি বিক্রি করেছিলাম, সতেরোটা গুলি না, সত্তরটা গুলি বিক্রি করেছিলাম সিপিএমকে, আমি কিন্তু বিক্রি করেছিলাম। ওরা আমায়, ওদের কাছ থেকে আমি আঠেরোটা বন্দুক, পেটি পেটি গুলি নিয়েছি। আর, সত্তরটা গুলি ওদেরকে বিক্রি করেছিলাম দশ হাজার টাকায়। ঠিক আছে ? এটাকে খুব ইসে করেছিল। আমি ওটাকে সমস্তটা ডিফেন্ড করে গেছিলাম। আল্টিমেটলি, ওখানে সেন্ট্রাল কমিটির লিডার…

ত্রিদিব।। তোদের পার্টির লোকেরাই এটা অপছন্দ করেছিল?

তিমির।। পুরো সবাই বলছে, যে, সিপিএমকে গুলি বিক্রি করা হয়েছিল, শত্রু র হাতে গুলি তোলা হয়েছে, অস্ত্র হয়েছে, এ কি ব্যবসা করতে ফেঁদেছে, নাকি? ঠিকঠাক আছে? এবং, এরিয়া কমিটিতে বসে, এক জন লিডার, নেতা, সে বাঙালি, ফর্মাল নেতা, সে ছিল স্টেট কমিটির মেম্বার তখন, স্টেট কমিটির মেম্বার এসে, এরিয়া কমিটির মধ্যে, আমার এগেনস্টে রেজলিউশন করিয়ে নিয়ে গেল। করিয়ে নিল। তার পর আমাকে বলতে দিচ্ছে। আমি প্রথমেই ধরলাম, এটা ডেমোক্রাসির প্রশ্নটা কোথায়? তুমি রেজলিউশন করছ, অন্যদের সাপোর্টে, অথচ আমার বক্তব্য নেই। তো, তাহলে বলো। রেজলিউশন উইথড্র করো। না, রেজলিউশন উইথড্র হবে না। বলল, আমি, এইটা পয়েন্টে থাকবে, রেজলিউশন থাকবে, উইদাউট মাই ভয়েস। মানে, আমার কোনো বক্তব্য নেই এখানে, আমার বক্তব্য শোনাও হয়নি, এইখান থেকে আমি শুরু করব। তার মানে, নিজের গড্ডলিকা নিজেই কাটে। কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে বিভিন্ন রুলস টুলস, পড়াশুনার জায়গাটা, যে, যে তুমি, যে জায়গাটা থেকে এগোল, ওখানে গিয়ে আমি বললাম, দেখুন — সমস্তটাই শুনছেন, রেজলিউশন এরিয়া কমিটিতে হয়েছে। এই, ও, সেই ছেলেটা, সেই যে শ্রমিক ঘরের, আমার সঙ্গে সঙ্গে, ও, সেও এর সাপোর্টে বলেছে, কিন্তু ও সাপোর্টে কথা বললে হবে না, ওকে আমি লাস্টে বললাম, তুই যে হ্যাঁ বলে দিলি, সেই সময়ে  সিপিএমের সঙ্গে যদি গাঁটছড়াটা বাধতাম-না সেলিমপুরে, মনে পড়ছে, তোমাকে আমি বললাম যে… যদি, না-বাঁধতাম, তাহলে তুই জিততে পারতি? না, আমরা পালাবার পথটাই বানিয়ে দিয়েছিলাম, যে, এই রাস্তা দিয়ে পালাব? আজকে যে হাজার হাজার মানুষ তোর পক্ষে আসছে, তোর কথা শুনছে, সেটা ওটার ফল, না, নয়? পলিটিক্স যে কৌশল, কোনদিন যদি নীতির উপর প্রভাব ফেলে, তাহলে কৌশলটা নীতি, নীতি হয়ে যায়। তখন সেটাকে নিয়ে চিন্তা করতে হয় অনেক বেশি। তার মানে, সেটাই ডেভিয়েশন। আমার কৌশলটা কি কোনো নীতির উপর প্রভাব ফেলেছে? আমি কি সিপিএমের সঙ্গে পাওয়ারে যাওয়ার গল্প বলছি? সেটা তো করছি না।

ত্রিদিব।। কী রেজলিউশন নিয়েছিল ওই সময়?

তিমির।। সেটা নিয়েছিল, যে, আমার সিপিএমের প্রতি, সিপিএমের সঙ্গে সম্পর্কিত, সম্পর্ক আছে। এবং, সিপিএমের সঙ্গে সম্পর্ক করে আমি যে জায়গায় নিজেকে নিয়ে যে চেষ্টা করছি, এবং…

ত্রিদিব।। তোকে গুলিটা বিক্রি করতে হল কেন? গুলিটা বিক্রি করার সিচুয়েশনটা কী ভাবে তৈরি হল?

তিমির।। য়্যাঁ? সেই সময়টা ছিল একদম শুরুর সময়। সেই সময় দরকার হয়েছিল, ওরা যখন চারদিক থেকে য়্যাটাক করছে, আমার দুটো সাইড, তিনটে সাইড ঠিক আছে, কিন্তু, ফোর্থ, চারটে দিককেই আমি রেজিস্ট করতে পারছি না। তখন, সিপিএমকে দিয়েই ওটাকে রেজিস্ট করানো হয়েছিল। ঠিক আছে?

ত্রিদিব।। এই কাজগুলো হয়ে যাওয়ার পর ওই আঠেরোটা বন্দুক কি ওরা ফেরত চায়?

তিমির।। না না, কোথায়? দেব নাকি? দিই নি তো আর। ওগুলো গ্রাম কমিটির হাতে চলে গেছে। কিছুই দেওয়া হয়নি। বলছি না? আমি তখন ব্যালান্স করে করলাম। তারপরে, এসব হয়ে গেল। তো, ওটা করবার পর, আমার বক্তব্য রাখা হয়নি, ডিস্ট্রিক্ট কমিটিতে বললাম আমি। আমার বক্তব্যই তো আমায় রাখতে দেওয়া হয়নি। রেজলিউশন হল কেন এরকম ভাবে? এটা আনডেমোক্রাটিক নয়? আমার অভিযোগ, আমি আমলাতান্ত্রিক, আমি পাওয়ারকে, পাওয়ার ওখানে রেলিশ করছি বসে বসে। খাচ্ছি, দাচ্ছি, ঘুমোচ্ছি, পাওয়ার রেলিশ করছি, এই পোজিশনে এসেছে। কোন অবস্থা থেকে এই পোজিশনে এসেছে? আজকে ওখানে হাজার হাজার মানুষ আমার সাপোর্টে কথা বলছে। তোমার সাপোর্টে কথা বলে না। তো, তুমি, এই রেজলিউশনটা এমন আনডেমোক্রাটিকালি নিলে কেন? পার্টি ডেমোক্রাসি কী? ইনার পার্টি ডেমোক্রাসি বলতে কী বোঝে? তুমি সংখ্যাগুরু সংখ্যালঘু বোঝো। সংখ্যাগুরু তোমার পক্ষে বলছে। তোমার দ্বারা ইনফ্লুয়েন্স হয়ে বলছে না, সেটা কী রকম… এক জন ডিস্ট্রিক্ট কমিটি মেম্বার, আর এক জন ডিস্ট্রিক্ট কমিটি মেম্বারের সঙ্গে কন্ট্রাডিকশন, ওপন হচ্ছে এরিয়া কমিটিতে। এই কনশাসনেস লেভেলে এরিয়া কমিটি এসেছে, তুমি কী ডিসিশন নিলে? ডিস্ট্রিক্ট কমিটিতে আগে রেজলিউশন করো, সেই রেজলিউশন তুমি এরিয়া কমিটিতে নিয়ে যাও। আমি তখন কোনো কথা বলব না। তুমি এরিয়া কমিটি থেকে রেজলিউশন করে নিয়ে আসছ, উইদাউট ডিস্ট্রিক্ট কমিটি কনসার্ন? কী করে হয়? রেজলিউশন ক্যানসেল করানো হল। ফার্স্ট, ডিস্ট্রিক্ট কমিটি মিটিং ক্যানসেল করিয়ে, আমার দুজনের বক্তব্য এরিয়া কমিটিতে যাবে, এবং, জেনারেল পার্টি মেম্বারদের কাছে যাবে, যাওয়ার পর এর ডিসিশন। আমি স্পিচ রাখলাম, বক্তব্য রাখলাম, গোটা এরিয়া কমিটি আমার পক্ষে চলে গেল। ডিস্ট্রিক্ট কমিটিতে গিয়ে বললাম, কী? কী হল? আমি বললাম, আমার পক্ষে চলে গেল যে? তার মানে, ইনফ্লুয়েন্সড হয়? তোমার দ্বারা ইনফ্লুয়েন্স হয়ে বলেছিল? তুমি ভালো বলতে পারো। তুমি বিভিন্ন তথ্য দিয়ে দিয়ে, সত্তরখানা গুলি বিক্রি দিয়ে, নানা রকম তথ্য তুমি দিতে পারো। কিন্তু, শুধু ওই তথ্যের জন্য যথেষ্ট নয়। পাল্টা তথ্যগুলোও তো ছিল। কেন ওগুলো করা হয়েছে? কী পোজিশনে করা হয়েছে? তখন তো তুমি যাওনি। তখন তো করোনি।

ত্রিদিব।। এই একটা ঘটনাই ব্যবহার করেছিল? না, আরো?

তিমির।। না, আরো আরো, ঘটনা আছে। সমস্ত ঘটনাগুলো আমার মনে নেই। আর একটা ঘটনা ছিল যে সিপিএমের সঙ্গে একটা মিটিং করেছিলাম আমি। বাইরে গিয়ে। সিপিএমের সঙ্গে মিটিং হয়েছিল। এবং, সেটা স্টেট লেভেলের লিডারদের সঙ্গে মিটিং করেছিলাম।

ত্রিদিব।। কী রকম ছিল?

তিমির।। যেমন, ডিস্ট্রিক্ট কমিটির সেক্রেটারি ছিল এক জন। ডিস্ট্রিক্ট সেক্রেটারিয়েট বডির, মিটিং, দুজন ছিল। তাদের মধ্যে এক জন আবার স্টেট কমিটি মেম্বার। আবার, বাইরের, আরো দুটো ডিস্ট্রিক্টের, নেতা ছিল আরকি। দুটোর জেলার নেতা, তাদের দুজন ছিল স্টেট কমিটি মেম্বার। এক জন বোধহয় স্টেট সেক্রেটারিয়েট বডির মেম্বার। এই রকম একটা হাইফাই সিপিএমের মিটিং-এ, আমি য়্যাটেন্ড করেছিলাম। একদম ক্রুশিয়াল স্টেজে এটা করতে হয়েছিল। তখন আমার পয়সার অভাব হচ্ছে, সাপ্লাই লাইন নেই। সমস্ত সাপ্লাইটাই এদিক থেকে হয়েছে। পার্টি সাপ্লাই লাইন তৈরি হয় দুমাস…

ত্রিদিব।। সাপ্লাই লাইন মানে, মূলত অস্ত্রের?

তিমির।। হ্যাঁ, টাকা পয়সা, খাওয়া দাওয়া, সমস্ত কিছু। একটা কমন কিচেন চালাতে হচ্ছে। কেননা, কোনো বাড়িতে রান্না করা নিষেধ করে দেওয়া হয়েছিল। যুদ্ধের প্রয়োজনেই। কখন আক্রমণ হবে, খাবার দাবার কে দেবে? আমি বন্দুক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি, এক বৃদ্ধা, প্রায় আশি বছর, সে ভাত মেখে, আমার মুখে মুখে, নে বাবা, খা। বলে, খাইয়েছে। সিচুয়েশনটা না-দেখলে, পরিষ্কার ভাবে বোঝানো মুশকিল। যে ওই জায়গাটাতে, কমন কিচেন, কমন কিচেন, কমন কিচেন তৈরি করতে হয়েছিল, যে কমন কিচেনে একটা গ্রুপ, গোটা গ্রামকে ডিস্ট্রিবিউট করে দেওয়া হয়েছিল কাজ। গোটা গ্রাম ঐক্যবদ্ধ তখন। মেয়েদের, এবং, দুজন ছেলেকে নিয়ে, চারজন মেয়েকে নিয়ে, কিচেন গ্রুপ তৈরি করা হয়েছিল। পাঁচসাতটা ইয়ং ছেলেকে দিয়ে, পিয়ন, কুরিয়ার গ্রুপ তৈরি করা হয়েছিল। ওই গ্রামের মধ্যেই। তারা বিভিন্ন জায়গায়, ব্যবসার খাতিরে, ঘুরে বেড়াবে, নকশালদের সম্পর্কে উজবুকের মত প্রচার করবে।

ত্রিদিব।। ‘উজবুকের মত প্রচার’ — মানে?

তিমির।। উজবুকের মত প্রচার — যা নয় তা। মানে, বিরাট শালা, ভীষণ লাফাতে পারে, ঝাপাতে পারে, বন্দুকের যা টিপ না, দুটো চোখের এইখানটায় লাগাতে চাইবে, লাগাতে পারবে। মানে, এই ধরনের প্রোপাগান্ডা। করতে হবে, আরকি। প্রোপাগান্ডার তো, মানে, গোয়েবলসিয় কায়দা আরকি। যা নয়, তাই বলো। কেননা, তুমি তো, যুদ্ধে জিততে হবে তোমাকে, তুমি যদি মরালি ওকে ভেঙ্গে দিতে পারো, তুমি তো অর্ধেক জিতে গেলে। আর, সেটা সম্ভবও হয়েছিল। দু-চার বার রেজিস্টান্সের পর, ওই প্রোপাগান্ডা, প্রোপাগান্ডা টিম, পলিটিকাল গ্রুপ তৈরি করা হয়েছিল, যারা কন্টিনিউয়াস পলিটিকাল মিটিং করবে, কী করতে হবে, কেন লুট নয়, একটা লঙ্কাও যাতে না-ছেড়া হয়, একটা আলুও যেন না-তোলা হয়, আলুর ক্ষেতকে যতটা বাঁচিয়ে লড়াই করতে হবে, ক্ষেত বাঁচাও, পোজিশন নিতে গেলে ক্ষেতের উপর পোজিশন নিতে হয় না, ক্ষেতের উপর দিয়ে দৌড়িও না…

ত্রিদিব।। আল দিয়ে…

তিমির।। হ্যাঁ, আল দিয়ে দৌড়ও, আলগুলোকে ভাগ ভাগ করে দৌড়ও, বা, যারা চাষ করতে বলা হয়েছে, তাদেরকে বলেছে, জমির আপাতত তুমি খণ্ড করে চাষ করো। চাষ বন্ধ যাতে না হয়, তার দিকে প্রোটেকশন দেওয়া। তার জন্যে একটা গ্রুপকে তৈরি করা। সঙ্গে সঙ্গে স্ট্যাটিস্টিক্স নেওয়াটাও আমি বন্ধ করিনি। কোনো সময়ের জন্যেও, আলুচাষী কতটা উত্পাদন আগে হত, এখন কত উত্‌পাদন হয়… আমার কাছে এখন বড় চাষী আছে, ছোট চাষী আছে, ক্ষুদ্র চাষী আছে, সবাই সমান ভাবে চাষ করেনি। ও অনেক বেশি ভালো ভাবে চাষ করেছে, বড় চাষী, তারও ডিক্রিজিং, মধ্য চাষী, তারও ডিক্রিজিং, সবাই ডিক্রিজিং।

ত্রিদিব।। কী ডিক্রিজিং?

তিমির।। প্রোডাকশন ডিক্রিজ করছে, আয় ঝাড় খাচ্ছে, কৃষির প্রতি ইন্টারেস্ট থাকছে না, সেটাও তো দেখছি। সেটাও তো দেখতে হচ্ছে। পাশাপাশি। তা, আমি বললাম, তা, সেই সময়ে, ওরকম একটা…

ত্রিদিব।। এই পয়েন্টটায় আমরা পরে, অনেক পরে, আলোচনায় ফেরত আসব।

তিমির।। হ্যাঁ, অবশ্যই, অবশ্যই। সেই জায়গাগুলোয়। তো, সেইখানে দাঁড়িয়ে, এই কমিটিতে, ইসে হল, প্রচণ্ড ঝগড়াঝাটি, প্রচণ্ড ঝগড়াঝাটি, বাইরে কোনো প্রোপাগান্ডা করা হলনা এটার। মানে, আমি, আমার প্রতি বিরক্তিতে নাকি, আমার সাপোর্টে কোনো কথা কিন্তু কলকাতায় পৌঁছল না, কলকাতার কমিটি মেম্বারদের মধ্যে এমনি প্রোপাগান্ডা করল যে, সিপিএমের সঙ্গে আমি যৌথ ভাবে, মানে, সিপিএমের সঙ্গে কোলাবরেশন হয়ে গেছে আমার, মানে… এই রকম প্রোপাগান্ডা বিভিন্ন জায়গায়, ভীষণ কনফিউশন তৈরি হল। সেটা, তার পরেই, কনফারেন্সের সময় এল, কনফারেন্সে…

ত্রিদিব।। এটা কত সাল?

তিমির।। হ্যাঁ? এটা এল, নাইন্টিনাইন। নাইন্টিনাইন থেকে, কনফারেন্স প্রসিডিওর শুরু হল। দুহাজার সাল, কনফারেন্স, প্লেনাম, আমি পার্টি ছাড়ছি আরকি। তো, সেইখানে, এইটায়, তোমাকে খুব ধরে ধরে আমার বলতে হবে। একদম স্টেপ বাই স্টেপ বলতে হবে, প্রত্যেকটা মিটিং-এর খবর তোমাকে দিতে হবে।

আমি স্ট্যাটিস্টিক্স নেওয়া শুরু করলাম, পলিটিকাল টিচিং শুরু করলাম, পাশাপাশি তিন নম্বরে তবু মিলিটারি লাইনকে চালিয়ে যাওয়ার জন্য চেষ্টা করা হল। গড়বেতায় শার্প দুটো পোজিশন তৈরি হয়ে গেল। গড়বেতার সিচুয়েশনকে দুরকম ভাবে ব্যাখ্যায় চলে এল। আমরা বললাম, যে, এটা পলিটিকাল উইনওভার করতে হবে। এখনো পলিটিকালি উইনওভার হয়নি। এটা একটা সিচুয়েশনে ব্রেক থ্রু হচ্ছে। এটা একটা পলিটিকাল স্ট্রাগল। আর এক দল বলল, মিলিটারিলি এটাকে আমরা একমাত্র পারি। সিপিএম কিছু দিনের মধ্যেই আমাদের আক্রমণ করবে। এটাকে ইসে করলে চলবে না। তাই, গড়বেতা থেকে ফোর্স তৈরি করো, মিলিটারি ক্যাম্প তৈরি করো। মিলিটারি ক্যাম্প থেকে মিলিটারি ট্রেনিং দেওয়া হোক। মিলিটারি ট্রেনিং দেওয়া শুরু করল, তাও করতে হবে। পাশাপাশি পলিটিকাল স্ট্রাগলটাকে কেউ অস্বীকার করছে না… তাহলে, ওটা, এরকম ভাবে, দুটো প্র্যাকটিসের মধ্যে, একটা জায়গায় ফুললি স্ট্রেস, অর্থাত, একটা, প্রিন্সিপল কোশ্চেন কোনটা? এটাকে নিয়ে একটা দ্বন্দ্ব শুরু হল। ইতিমধ্যে, সিপএমও য়্যাটাক তৈরি করতে থাকল, আর, ছোটো ছোটো রেজিস্টান্স শুরু হয়েছে। আমি, কখনোই, সিপিএম, ডাইরেক্টলি য়্যাটাক করছে না, ইতিমধ্যে স্টেট নেমে যাচ্ছে।

ত্রিদিব।। পুলিশ।

তিমির।। স্টেট নেমে যাচ্ছে।

ত্রিদিব।। তখনো কি প্যারামিলিটারি নামেনি? শুধু পুলিশ?

তিমির।। না, না, পুলিশ দিয়ে তো হয়না, ওখানে। ওখানে প্রথম থেকেই ইএফআর ছিল। ইএফআর ছিল, স্টেট আর্মড পুলিশ ছিল, স্টেট আর্মড পুলিশ ছিল, সঙ্গে যেত এমনি পুলিশ। স্টেট আর্মড পুলিশ ছিল ওখানে, ক্যাম্প ছিল বিভিন্ন জায়গায়, প্রচুর, পুলিশ ক্যাম্প তৈরি করে ফেলা হল। তৃণমূলকে ভয় দেখানোর জন্য। পুরোপুরি, পলিটিক্স, সিপিএম পুলিশকে ইনফ্লুয়েন্স করে ফেলল। একদম বেছে বেছে বেছে বেছে, সিপিএমের লোকজনকে পুলিশের সমস্ত জায়গায় বসিয়ে দেওয়া হল। হ্যাঁ? এই গড়বেতার রেজাল্টকে কেশপুরে নিয়ে গিয়ে, কেশপুর থেকেও, মানে, গড়বেতা থেকে, সিপিএমের… শিক্ষাগ্রহণ করে, কেশপুরেও, ধীরে ধীরে ধীরে ধীরে, কেশপুরটাকেও তো, মানে গড়বেতাতে মরালি ভেঙ্গে গেল… দেখো, এইখানে রক্ত খাচ্ছে আর (আমার বাঁ-হাতে একটা মশা মেরে)… তো…

ত্রিদিব।। তুই মশা মারা বন্ধ করে, যা বলছিস সেটা বল।

তিমির।। তো, সেখানে দাঁড়িয়ে, যেটা হল যে, কেশপুরও হাওয়া হয়ে গেল আস্ত আস্তে, ধীরে ধীরে কেশপুর হাওয়া হয়ে যাচ্ছে, সিপিএম মাঝে… প্রচণ্ড স্ট্রাগল চলছে ওখানে, শেষ পুরো… কেশপুরের পরেই, আমাদের উপর হাত দেবে, সিপিএম, এটা তো শিওর, তার মধ্যেই গুছিয়ে নিতে হবে, গোটা ব্যাপারটাকে। তো, সেখানে, কী ভাবে গোছানো যায়? হ্যাঁ? কী ভাবে গোছানো যায়। দুটোকে ব্যালান্স করার প্রশ্নটা কেউ আনছে না। শহুরে লোকেরা, পলিটিক্স, ওখানে কেউ, মানুষের মধ্যে পলিটিক্স নেই, সেটার উপর জোর দিতে হবে এসে, চারটি ক্লাস য়্যারেঞ্জ করে দিল। আবার, সেন্ট্রাল কমিটির এক জন লোক ছিল, সে মিলিটারিলি ভীষণ, মিলিটারিলি ইকুইপড লোক, সে কতগুলো, তিনটে ক্যাম্প, মিলিটারি ক্যাম্প…

ত্রিদিব।। শুধু গ্রাম সুরক্ষা কমিটি…

তিমির।। কমিটি করল। এটাকে ব্যালান্স করার প্রশ্নটা এলই না। আমি দেখলাম, এটা একটা সুযোগ, এই অভিজ্ঞতাটাকে পরিষ্কার লিপিবদ্ধ করতে হবে, আমাকে, আমার কাছে এখন বড় কৃষক, ছোট কৃষক, মধ্য কৃষক থেকে শুরু করে, গ্রামীন যে স্ট্রাকচারের, পুরো, গোটা পাওয়ার কম্পোজিশনের জায়গাটা ওপেন, কারণ, প্রত্যেকের সাথে আমি কাজ করেছি। সিপিএমের ভিতরের ব্যাপারটাও ওপেন, তৃণমূলের ভিতরের ব্যাপারটাও ওপেন। তাই, আমার, পড়াশুনোর জন্যে সময় চাই। শুধু তো, নিজেকে ডেভেলপ করবার প্রশ্ন আছে, আদারওয়াইজ আমি এটাকে ডেভেলপ করতে পারব না। আমি রুটটা জানিনা। এবার, নেক্সট কী? কিন্তু, আমার মাথায় রয়েছে, পঞ্চায়েত ইলেকশনে অংশগ্রহণ করতে হবে।

ঠিক সেই সময়, সেই লাইনটাকে নিয়ে আমি, ইসে করলাম, যে, মাস মুভমেন্টের সময় আছে, মাসকে অর্গানাইজ করার দাবি আছে… এখানের জনগণের মধ্যেও একটা পোরশন থেকে, আমরা কেন পঞ্চায়েত ইলেকশনে দাঁড়াব না — আমরা পঞ্চায়েত ইলেকশনে দাঁড়াই চলুন। সিপিএমকে ফাইট দেওয়ার লিগাল পোজিশন ছিল এটাই। তাহলে, সিপিএম স্টেটকে এভাবে আমাদের বিরুদ্ধে ইউজ করতে পারত না। কারণ, আমি যখন জানি, চারিদিকে কেশপুর এবং… আচ্ছা, সম্ভব ছিল? যারা বলল, আমি তাদেরকে বলার চেষ্টা করলাম, বহুবার বোঝানোর চেষ্টা করলাম, তোমরা বলছ, মিলিটারিলি, তুমি, ফেস করবে, হ্যাঁ? মিলিটারিলি ফেস করবে। আর এক দল বলছে, পলিটিকালি ফেস করো… কোনো রকম ইসে নয়… এক দল যখন একটা গ্রাম, চড়া-য়, নাকি চড়াই বলে, নাকি চড়াট, কী একটা গ্রাম, চাড়ালে, চাড়ালে, চাড়ালে বলে একটা গ্রাম ছিল, চাড়ালে গ্রাম সিপিএম আক্রমণ করছে। বলছে, এর এগেনস্টে, তুমি মাইক প্রচার করছ না কেন? মাইক নিয়ে প্রোপাগান্ডা করছ না কেন, জনগণের মধ্যে? এক জন বলছে এটা। এক জন বলছে, তুমি মিলিটারি ক্যাম্প করো, ট্রেনিং দাও, এবং এই যে এসে আছে, পাল্টা য়্যাটাক করে একে শেষ করে দাও। ঠিক আছে? দুটোরই কী রকম অবাস্তব — সিচুয়েশন অনুযায়ী কথা নয়, অর্থাত, না-থাকার কথা, আমি বললাম, না-জেনে বলছেন। একথাটা। ওখানে, বন্দুক নিয়ে, পাঁচশো লোক আমাকে আক্রমণ করেছে, সেই সময় আমি রেজিস্টান্স না-দিয়ে, আমি বলছি, যে, তার এগেনস্টে মাইকে, জনগণকে বলব মাইকে প্রচার করতে, ক্যাম্পেন করতে, মানে, পথসভা করতে? পলিটিকাল পথসভা করতে? এটা যেমন অবাস্তব পরিকল্পনা, তেমনি, তুমি যে একটা মিলিটারি ক্যাম্প করবে, ট্রেনিং দিয়ে, গড়বেতার ওইটুকু অংশের মধ্যে থেকে সিপিএমকে রেজিস্ট করার কথা বলছ, তারা স্টেটের কথাটা ভাবছ-ই না, যে সিপিএম, এখানে পরিষ্কার বললাম, সিপিএম য়্যান্ড স্টেট ইজ দি সেম। যারা মনে করবে, স্টেট আর সিপিএম, অর্থাত, পলিটিকাল পার্টি এবং স্টেট, দুটো আলাদা, পশ্চিম বাংলার জন্য কোনোটাই সত্যি নয়। তাই, মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, আর এ-র, স্টেট সেক্রেটারির, বিমান বসুর মধ্যে, বিমান বসু তো হাতের পুতুল, আসলে, এ-ই স্টেট সেক্রেটারি, এ-ই পার্টি, এবং এ-ই গভমেন্ট, স্টেট। হ্যাঁ, বুদ্ধদেব। তাহলে? ওই জায়গাটা আরো ক্লিয়ার আজকে। তোমাকে যেটা বলার চেষ্টা করছিলাম। ওটার সঙ্গে ওটার সম্পর্ক ছিল গভীর, নিবিড়, আগেও ছিল, এখন সেটা প্রায় সেম জায়গায় চলে গেছে। কোনো সেক্রেটারির এখন আর ভার্শন থাকছে না, তোমার ভাষায়। আমি কিন্তু এখনো সেটাকে ধরছি, কেননা তোমার কাছ থেকে যে তথ্যগুলো ক্রমাগত আমি পেলাম, গত কিছু দিনের, তাতে আমার মনে হচ্ছে, যে, বিমান বসুর সত্যি সত্যিই কোনো আর সে নেই। আর, লোকটার সেই কেপেবিলিটিও নেই বলে আমার ধারণা… বিমান বসু কিন্তু একটা সময় খুব পাওয়ারফুল লিডার ছিল…

ত্রিদিব।। অবভিয়াসলি। অন্তত বুদ্ধর চেয়ে অনেক বেশি পেডিগ্রির নেতা…

তিমির।। তো, এই দুটোই একটা অবাস্তব জায়গা। তা, কী কাজ? আমি বললাম, যে, আমাদের গোটা সিচুয়েশনটাকে লিপিবদ্ধ করে, এটাকে একটা ফর্মেশনে আনতে হবে যে, পরবর্তী রূপটা কী। কী — বলল। আমি বললাম, পঞ্চায়েত ইলেকশনে দাঁড়াতে হবে। কেন পঞ্চায়েত ইলেকশনে দাঁড়ানো? যে, ও যে আক্রমণ করছে, তার রেজিস্টান্সটা আমাকে দিতেই হবে। পঞ্চায়েত ইলেকশনে আমি প্রার্থী দাঁড় করাচ্ছি। তার পিছনে আমার পার্টি আছে। পার্টি রেজিস্টান্সটা দিচ্ছে, ঠিক আছে? মানুষকে, এই যে সময়টার মধ্যে, ভোটের মধ্যে দিয়ে, ভোটটাকে আমি বলব যে, এটা একটা ক্ষমতা দখলের আধার হিশেবে দেখা। আমার হাতে পঞ্চায়েত আসছে মানে তো, আমার হাতে স্টেট চলে যাচ্ছে না। পঞ্চায়েতের মধ্যে যে টাকাটাকা আসছে, ওইটাকে প্রপারলি ইউটিলাইজ করব, এবং, বলব, যে, এইটুকু টাকা দিয়ে কিছু হয়না। আসলে, পঞ্চায়েতের ক্ষমতা দখল করা মানেই তো ক্ষমতা দখল নয়। স্টেট পাওয়ারকে নিতে হবে। তখন, সবাই হাসতে শুরু করল। বলল, এ তো পুরোপুরি, এ তো সিপিএমের লাইনে চলে গেছে। তার মানে, সিপিএমের কোলাবরেশনের লাইনেই যাচ্ছে। তার মানে, ঠিক। মানে, তারা আবার চীত্কার শুরু করে দিল। আমি বললাম, না। সিপিএমের সঙ্গে আমার কোনো রকম নেই। তাহলে সিপিএম আজকে আমায় য়্যাটাক করছে কেন? সিপিএম, আমি ওখানে পরিষ্কার ব্যাখ্যায় রাখলাম, যে তৃণমূল ক্ষমতা দখল করেছে কোন জায়গা থেকে? তৃণমূলকে দাঁড়াতেই দিত না ওরা, বিরোধীপক্ষই ছিল না ওখানে। বিরোধীপক্ষকে দাঁড়াতেই দিত না। শুধু তাই না, ওখানে ইলেকশনে দাঁড়ানোটাই তো একটা রাজনৈতিক লড়াই। পলিটিকাল লড়াই। এই পলিটিকাল লড়াইটাকে বাদ দিয়ে, তুমি, বিপ্লবটাকে করছ কেন, কোন, কোন জায়গায়, এই জায়গাটাকে তুমি ইউটিলাইজ করছ না কেন? একটা ফ্যাসিস্ট শক্তির বিরুদ্ধে তো ডেমোক্রাসির লড়াইটা এইখানে নেই-ই। ডেমোক্রাসির লড়াইটা নেই। তোমার কাজ কী? তোমার ভোটারকে দিয়ে ভোট দেওয়ানো। এবং, আমি ওখানে নির্বাচনে দাঁড়াব, এবং, নির্বাচনী প্রোপাগান্ডা করব।

ত্রিদিব।। যদি ফ্যাসিস্ট টেরর থাকে, ভোট দেওয়ানোটাই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ।

তিমির।। তখন আমার ওখানে খুব সামনেই ভোট আছে, পঞ্চায়েত ইলেকশন, আমি সেটাকে ইউটিলাইজ করি। সেইটা পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাই, এবং, লিগাল প্রোপাগান্ডা, লিগাল অর্গানাইজেশন বানাও।

ত্রিদিব।। লিগাল বলতে…

তিমির।। লিগাল অর্গানাইজেশন — মাস অর্গানাইজেশন, বিভিন্ন মাস অর্গানাইজেশন বানাব…

ত্রিদিব।। মানে, প্রকাশ্য…

তিমির।। মানে, প্রকাশ্যে, মানে, সংগঠনে, মানে, ইসে হবে — তাতে, পুলিশ য়্যারেস্ট করুক। আমরা শহর অঞ্চলে সেটার এগেনস্টে প্রোপাগান্ডা করি। যে, ওখানে, আমাদের অত্যাচার চালাচ্ছে সিপিএম, এটাকে এক্সপোজার দেওয়া হোক। আবার, পাশাপাশি একটা রেজিস্টান্সও দিয়ে যাব আমরা। পাশাপাশি, কিন্তু রেজিস্টান্সও আমরা দেব। রেজিস্টান্সও দেব। রেজিস্টান্স দেবনা, এরকমটা না। আমরা লড়ব, আমরা মরব-ও। কিন্তু, আমরা শেষ হবনা আর — আর শেষ হওয়ার পোজিশন নেই — সেই সাহসটা নিয়ে আমাদের লড়ে যেতে হবে। কিন্তু, মাস অর্গানাইজেশন, মাস মুভমেন্ট এবং ইলেকশনকে টার্গেট রেখে। ওইটা একটা পলিটিকাল প্রোগ্রাম, যেটা মানুষকে সহজে ইনফ্লুয়েন্স করা সম্ভব হবে। পঞ্চায়েত দখল করা, তার মানে, মানুষ আমাকে বিশ্বাস করছে যে, এরা… তার একটা আলু, একটা লঙ্কা, মানে, মুখে মুখে প্রোপাগান্ডা, যে দেখেছ, এরা যখন লড়াইটা শুরু করল, আমাদের তো বোধহয় কোনো ফসলের ক্ষতি হয়নি। খুব ইম্পর্টান্ট জায়গা, ইম্পর্টান্ট রোল প্লে করল এই জায়গাটা। যে, প্রথম থেকেই যে, প্রোডাকশনের সঙ্গে যুক্ত করার, গোটা ব্যাপারটা, ওটা ভীষণ ইম্পর্টান্ট রোল তৈরি করল। আমি বারবার বোঝানোর চেষ্টা করলাম, প্রচুর কন্ট্রাডিকশন হল। এর মধ্যে দিয়ে, পার্টির কোনো ভুল হচ্ছে এই জায়গা থেকে, অন্য একটা রুট বেরিয়ে এল, তাহলে পুরোপুরি একটা রিভিশনিস্ট লাইন নিয়ে চলে এল — শ্রমিক শ্রেণীর, মানে, কী বলে, বাস্তব নেতৃত্ব।

ত্রিদিব।। মানে?

তিমির।। শ্রমিক শ্রেণীর বাস্তব নেতৃত্ব, হচ্ছে যে, পলিটিকাল, আমাদের পার্টি হচ্ছে মেইনলি পেটি বুর্জোয়াসি পার্টি, পেটি বুর্জোয়া, যে অংশ থেকে আসা লোকেরাই, যে, লিডারশিপে দিচ্ছে। শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্বকে স্বীকৃতি করবার জন্য, শ্রমিকদের মধ্যে কাজের গুরুত্ব বাড়াতে হবে, শ্রমিক…

ত্রিদিব।। থিওরেটিকাল জার্গন থেকে বেরিয়ে, তার প্র্যাক্টিকাল ইয়েটা কী দাঁড়াচ্ছে?

তিমির।। শ্রমিকদের, কারখানায় কারখানায়, কারখানা কমিউন তৈরি করতে হবে, কমিটি তৈরি করতে হবে, এবং শ্রমিকদের মধ্যে থেকে প্রচুর পরিমাণ হোলটাইমার তৈরি করতে হবে, যাদেরকে গ্রামে পাঠাতে হবে।

ত্রিদিব।। কিন্তু, গড়বেতা কেশপুরে তো কারখানা নেই।

তিমির।। গড়বেতায় নেই, শহরে, শহরে কনসেন্ট্রেশনের কথা হচ্ছে। সমান গুরুত্ব দিয়ে শহরে কনসেন্ট্রেশন, এবং, শ্রমিকদেরকে উত্সাহিত করা, গ্রামে যাওয়ার জন্য। কৃষিবিপ্লবকে সহায়তা করবার জন্য। এখানে একটা বড়… ও তো হাজারে হাজারে, লাখে লাখে, মানুষের জমায়েত দিয়েই একমাত্র বিপ্লবকে — এটা কিন্তু ওরা ঠিকই বলেছিল। হাজারে হাজারে মানুষকে জমায়েত করার মধ্যে দিয়েই, তোমার, রাজনৈতিক সারবস্তুতা প্রমাণিত হয়। আবার, সব সময় যে প্রমাণিত হয়, এরকমটা নয়।

ত্রিদিব।। লাখে লাখে হলে বোধহয় প্রমাণিত হয়।

তিমির।। হাজারে হাজারে, লাখে লাখে, করতে হবে। একটা ইশু, ছোট্ট ইশুতে, একটা ছোট জায়গায়, শ, একশো মানুষও প্রমাণ করে তার বাস্তবতাকে। যে ভাবে, গড়বেতায়, হাজার হাজার মানুষ, কিছুটা হলেও প্রমাণিত করেছিল, যে, আমাদের রেজিস্টান্সটা সত্যি।

ত্রিদিব।। কিন্তু, অনেক সময়, কোনো ভুল সিগনালে, কয়েক শো, হাজার, কয়েক হাজার অব্দি হয়ে যেতে পারে… কিন্তু, লাখ লাখ মানুষ, বোধহয়, ভুল সিগনালে, হয় না। অন্তত… কোনো উদাহরণ কি মনে করতে পারছিস?

তিমির।। তা, তা তো আছেই। আজো হয়। তৃণমূল কংগ্রেস লাখো মানুষকে জমায়েত করতে পারে।

ত্রিদিব।। ওই জমায়েতগুলো, ফরমুলেটেড জমায়েত।

তিমির।। না, না, ফরমুলেটেড নয়। ভীষণ ইমোশনে, ইমোশনাল লড়াই হয়েছিল। ওই যে বাইশটা ছেলে মারা গেছিল…

ত্রিদিব।। ছোট-আঙারিয়ায়?

তিমির।। না না, ওই যে, শ্যামবাজারে গুলি চলল, পুলিশের। হ্যাঁ? ছোট-আঙারিয়া তো আমাদের। তো, ইন-দি-মিন-টাইম, সেই মিলিটারি লাইনটাই চ্যাম্পিয়ন হল, মিলিটারি লাইনটাই আল্টিমেটলি চ্যাম্পিয়ন হল। গড়বেতাকে ধরে, প্রচুর একটা সাবজেক্টিভ ফোর্স ছিল। তাদেরকে ডিস্ট্রিবিউটেড করা হল, বিভিন্ন জায়গায়, কমিটিতে, বা, এই, স্কোয়াড বানিয়ে ফেলা হল। স্কোয়াডগুলো দ্রুত ফর্মেশন করতে সুবিধাও হল, রেজিস্টান্স। এবং, পাশাপাশি, গড়বেতার মত জায়গায়, বেশি দিন, প্লেন ল্যান্ডে… ‘পারস্পেক্টিভ জোন’ বলে একটা ব্যাপার আছে। পারস্পেক্টিভ জোন কাকে বলে? পারস্পেক্টিভ জোন তাকে বলে, অর্থাত, তুমি প্লেন ল্যান্ডে কাজ করছ, মিলিটারি য়্যাকশন করছ, মিলিটারি য়্যাকশন করছ, এবার, প্লেন ল্যান্ডের স্ট্রাগলটা, অর্থাত, লড়াইটা বেশি দিন, চালানো সম্ভব হবে না। তার জন্যে তোমাকে, লুকিয়ে রাখার, অর্থাত, যেখানে দাঁড়িয়ে তুমি লড়াইটাকে দীর্ঘদিন চালাতে পারো, সেরকম একটা জঙ্গল পাহাড় এলাকা। এটা ঠিক করা হল — পারস্পেক্টিভ জোনকে — মানে, এইটার সঙ্গে না, যখন ঠিক হয়েছে না, তখন আমি মেন্টালি আর ইনভলভড নই। আমার মনে হল, ভীষণ একটা অসম্পূর্ণ অবস্থায়, পারস্পেক্টিভ জোনকে তো প্রথম থেকেই ঠিক করা আছে। পারস্পেক্টিভ জোন হবে, সুসংগঠিত করবার জন্য, বিভিন্ন কমরেডদেরকে, ওখানে, ভালো ভালো ছেলে যারা…

ত্রিদিব।। পারস্পেক্টিভ জোন হিশেবে ঠিক হল কোনটা?

তিমির।। এই যে, আজকের বেলপাহাড়ি থেকে শুরু করে, টানা রাণীবাঁধে, সিংভূমের অঞ্চলে, উড়িষ্যার কাজকে রিভাইভ করা —  শুরু থেকেই, পারস্পেক্টিভ জোনের ধারণা আছে, এবং, পারস্পেক্টিভ জোনে কাজও হচ্ছিল। সেটাকে ডেভেলপ করা, এবং, পারস্পেক্টিভ জোনকে তৈরি করা, এবং, গড়বেতার স্ট্রাগলকে ধরতে হবে, ইসে করতে হবে — এরকম করার একটা ডিসিশন হচ্ছে, কনফারেন্স প্রক্রিয়া চলছে, আমি ফিরে এলাম, দশ দিনের ইসে চাইলাম, যে, আমার দশ দিন সময় লাগবে, আমার কিছু পড়াশুনার আছে। দশ দিন ধরে, একটা জায়গায়, বসে, আমি পড়াশুনো করলাম, গ্রামেরই, একটা শেল্টারে। তো, সে আবার ফিরে এলাম, আবার গড়বেতার কাজটা করছি, তার মধ্যে একটা মিলিটারি ক্যাম্প, আয়োজন করা হয়েছে। একটা স্কোয়াডকে রেখে, বাকি সব স্কোয়াডকে তুলে নেওয়া হয়েছিল। ইন দি, এর মধ্যে, গড়বেতায় তিনটে স্কোয়াড ফর্ম হয়ে গেছে। দুটো হয়েছে, পলিটিকাল স্কোয়াড, বলা হচ্ছে। সেখানে আমার প্রেশারই, তার, পলিটিকাল প্রোপাগান্ডাই তার মেইন জায়গা হবে, তার উপরে একটা চাপিয়ে দেওয়া হল, স্পেশাল স্কোয়াড। যারা মিলিটারিলি ইকুইপড। তারা দ্রুত একটা জায়গা থেকে আর একটা জায়গায় পৌঁছবে, এবং, য়্যাকশনগুলো সংগঠিত করবে, রেজিস্টান্স করবে। যাই হোক, একটা, অন্তত এইটুকু জায়গা এসেছিল, যে, রেজিস্টান্স প্রোগ্রামটাই মূল জায়গা, য়্যাটাকের জায়গাটা মূল নয়। তার পরে, যদিও, প্রচুর য়্যানিহিলেশনের ডিসিশন নেওয়া হল, এবং, গড়বেতার বাইরেও। গোয়ালতোড়ে, ওই মাল, ওই যে স্বরূপ সরকারকে যে ইসে করেছিল (এর আগে, এই নামটা, ‘স্বরূপ দত্ত’ ছিল, কিন্তু কথা চলার সময়ে এটা আমার মনে পড়েনি), শিবনাথ বলে সারেঙ্গাতে এক জনকে য়্যানিহিলেট করল — কেন করল? কেন করল, অবাক হয়ে গেলাম। এত বিরক্ত লাগল, এত মরালি ভেঙ্গে গেলাম…

ত্রিদিব।। সে কোন পার্টির?

তিমির।। সিপিএম-এর। কেন য়্যানিহিলেট করা হল, আমি কিচ্ছু জানিনা। এবং, য়্যানিহিলেট করার পর, তুমি তো বলছ, যে, তুমি আক্রমণ করছ এক জনকে, সিপিএম-এর এক জনকে, মেরে দিলে পরে, এত টেরর, মেরে দিলে পরে, হাজার হাজার মানুষ — তোমার ক’টা মানুষ এসেছিল? একটা মানুষও আসেনি, তবুও ওটাকে আর, কোনো রকম ভাবে, হাইলাইটেড হল না। এমন য়্যাটাক আসছে, এমন য়্যাটাক, তার পরে সিপিএমের তরফে, গড়বেতায় য়্যাটাক তো, তীব্রতর হতে চলল — কারো হাত কেটে দেয়, চোখ উপড়ে নেয়, কান কেটে দেয়…

ত্রিদিব।। এগুলো কি একদম লোকালি হয়েছে, না, উপরের লেভেল, ডিস্ট্রিক্ট স্টেট  নেতারাও…

তিমির।। এক দম। সব, মানে, সিপিএম ইনভল্ভড থাকে একদম স্টেট থেকে। সিপিএমের লোকাল ডিসিশন, লোকাল ডিসিশন, এরকম ভাবে দেখো না, কোনো রকম ভাবে, আমি পরিষ্কার জানি। একদম স্টেট লিডাররা এসে, একদম প্রতিটা প্ল্যানিং করে ওরা, একদম, ছকে। গড়বেতা ওদের, স্টেট কমিটি মিটিং-এর প্রধান ইশু ছিল, সেই সময়, গড়বেতাতে, ইশু। প্রধান ইশু ছিল ওদের ওটা। সেন্ট্রালি ওরা ভেবেছিল সমস্ত কিছু। পলিটবুরো পর্যন্ত, ওদের, এই রকম ভাবেই, কমুনিস্ট পার্টিতে এটাই হয়। কিন্তু, আমাদের সেন্ট্রাল কমিটি কিন্তু বসে ছিল।

ত্রিদিব।। মানে, সেন্ট্রাল কমিটি এই ডিসিশনগুলোয়…

তিমির।। আরে, তারা তো কনফিউশন ছড়িয়েছে। এইখান থেকে, ডিস্ট্রিক্ট কমিটি তো কনফিউশন ছড়িয়েছে, স্টেটে গিয়ে। আমার তো সেন্ট্রালের সঙ্গে কোনো আর যোগাযোগ, লিংক ছিন্ন, গড়বেতায় যখন লড়াই চলছে, লিংক-ই নেই। ডিসকাশন করার সময় নেই আমার, আমি মাটি ছেড়ে যেতে পারছি না। আসতে হলে, তাকে এসে এখানে লিংক রাখতে হত, আর এক জন কমিউনিকেশনের জন্য দরকার ছিল। আমি যে ভাবে গ্রাম সাজিয়েছিলাম, সেই ভাবে যদি সেন্ট্রাল কমিটি সেই সময় সাজাত, অর্থাত, ওই সেন্ট্রাল কমিটির সঙ্গে ডাইরেক্ট রিপোর্ট, প্রতি দিনের রিপোর্ট নিচ্ছি, প্রতি দিন য়্যানালিসিস করছি, প্রতি দিন আমাকে গাইডলাইন পাঠাচ্ছে, সেই গাইডলাইনের সঙ্গে জাজমেন্ট হচ্ছে — এইরকম যদি একটা কানেকশন তৈরি করত, একটা সেট আপ, হলে হত। তবে না সিপিএমের সঙ্গে তুমি ফাইট করবে। তোমার সেই সেট আপ-ই নেই। তুমি মিলিটারি য়্যাকশনের কথা বলছ। মিলিটারি ডিসিপ্লিন মানে কী? আরো তো চূড়ান্ত ডিসিপ্লিন। তোমার ডিস্ট্রিক্ট কমিটির মধ্যে সেই ডিসিপ্লিন আসেনি, তুমি কী করে মিলিটারিলি ডিসিপ্লিনড, আনবে নিচুতলায়? নিচুতলায় ডিসিপ্লিন আনা সহজ, যদি ডিস্ট্রিক্ট কমিটির মধ্যে ডিসিপ্লিন থাকে, স্টেট কমিটিতে ডিসিপ্লিন থাকে।

তো, সেইখানে দাঁড়িয়ে, যেটা হল, ওটা, প্রচুর য়্যানিহিলেশনের প্রোগ্রাম হল, একটাও য়্যানিহিলেশন আমি করলাম না। ডিসিশন আর আমি, যে, দেখাচ্ছি, ডিসিশন আর ইমপ্লিমেন্ট করছি না। এক ধরনের, ব্যাক করছি। পিছন দিকে হাঁটছি যেন। খারাপ লাগছে নিজেকেও। হুঁ? ইন-দি-মিন-টাইম, কী হল, মিলিটারি ক্যাম্পে আমাকে যেতে বলা হল, মিলিটারি ক্যাম্প নেওয়ার জন্য বাইরে থেকে দুজন ছেলেকে নিয়ে আসা হল, তারা ফিজিকাল ট্রেনিং দিত, আর, সন্ধেবেলায়, যখন ক্লান্ত হয়ে ছেলেগুলো আসত, তখন আমি দর্শনের ক্লাস নিতাম। সব ঘুমোত। তখন আমি ফিলোজফি ক্লাস নিতাম, সবাই ঘুমোত। ঠিক আছে? সেটা, স্টেট কমিটির সেক্রেটারি এসেছিল, সে-ও ক্লাস নিত, সে-ও ঘুমোত। মানে, ওরা ঘুমোচ্ছে, সে-ই বা কী করবে? হার্ড লেবার দেওয়ার পর, গ্রামের ছেলেপুলে, সক্কাল বেলায় ঘুম থেকে তুলে নিয়ে এসে, মার্চ করানো হয়েছে। খুব স্বাভাবিক ভাবেই, ওটা ইগনোরড হল, এবং, এটা চ্যাম্পিয়নড হল। মানুষের মধ্যে এই সেন্টটাই, তুমি যেমন ভাবে, তুমি, শিক্ষা, যে লার্নিং তুমি, টিচিং, যে ভাবে তুমি টিচ করবে, সেটাই তার কাছে পৌঁছল। ওরা ওই ভাবে তৈরি হল। ইন-দি-মিন-টাইম, খবর এল, সিপিএম…

ত্রিদিব।। এইটা, দর্শন, এমন একটা জিনিস যখন ঘুমোতে হয়, আর, ওইটাই মূল কাজ। তাই তো?

তিমির।। তা, সেইখানে, যা দেখা গেল, যে, যে, আমরা খবর পেলাম, যে, ওই যে স্কোয়াডটাকে পুরো ঘিরে ফেলেছে। দ্রুত আমাদের যতটুকু ছিল, সেটাকে বিল্ড আপ করে, আমরা, ওদেরকে নিয়ে, কী করে জানো? বন্দুক ফন্দুক বেঁধে, গাড়িতে বেরিয়ে গেলাম। গাড়ি করে। গাড়ি করে নিয়ে ঢুকে গেলাম।

ত্রিদিব।। কোথায়?

তিমির।। গড়বেতায়। এক দিনে, গাড়ি করে, একটা জায়গায় পয়েন্টে বলল, তার পরে, বাকিটা হেঁটে, ঢুকে গেলাম। ঢুকে গিয়ে দেখলাম যে, তেমন কিছু নয়, ঘিরে ফেলেছে এরকমটা নয়, তবে, য়্যাটাক করেছিল। একটা জায়গা থেকে, কিছুই য়্যাটাকও করেনি, ভয় দেখিয়েছিল, টেরর তৈরি করেছিল। সত্তর আশি জনের একটা মোটরসাইকেল বাহিনী, বন্দুক ফন্দুক নিয়ে, আমার নামে খিস্তি করে, আরো একজন দুজন ছেলে ছিল, একটা শহরের ছেলে ছিল, স্টুডেন্ট, এদের নামে খিস্তি করে ফরে, গেছে। ভীষণ টেররাইজড, একটা অংশ। ভয়ে কাঁপছে। আমাদের সেকশনটাও ভীষণ ভয় পাচ্ছে। রেজিস্টান্স দরকার। এই মুহূর্তে, তখন, দরকার ছিল য়্যাটাক একটা। বড় ধরনের একটা, কনফিডেন্স দেওয়ার জন্য। কেননা, তখন তো আমার, রিসোর্স আছে। তো, প্রয়োজনে, প্ল্যাটুন ফর্মেশন করতে পারো তুমি, অমুক করতে পারো, তমুক করতে পারো, এরকম বলেছি। পুরো, যে অংশটা উচ্ছেদ হয়ে চলে এসেছিল, তাদের আমি রাখব কোথায়? আমার তো নির্দিষ্ট কোনো গ্রাম নেই সেখানে, যে আমি…

(এইখানে দ্বিতীয় ক্যাসেটের প্রথম দিক শেষ হল)

ত্রিদিব।। বল এবারে।

তিমির।। তো, সেখানে, কী হল, তো, উচ্ছেদ হয়ে গেল। উচ্ছেদ হয়ে, মানে, যেমন তৃণমূলের সময়, সিপিএমকে উচ্ছেদ করেছিল, সিপিএমও, আমাদেরকে, অনেককে বাড়িঘরছাড়া করে দিল। তারা ভয়ে পালিয়ে এল কেউ কেউ, কেউ কেউ সত্যি সত্যিই উচ্ছেদ হয়ে চলে এল। অনেক সংখ্যায়। তা, টোটাল এরকম দাঁড়াল, বাইশজন, আমরা আছি সতেরোজন, এরকম একটা বিশাল বাহিনী, আমরা কী করি? আমি বললাম, তো, এর মধ্যে কী হয়েছে, কমিটি থেকে, স্টেট… যখন, সেন্ট্রাল কমিটি থেকে, ইয়ে, কমিটিতে ডিসকাশন হয়ে গেছে গোটা ব্যাপারটা, পশ্চিম বাংলার এই সিচুয়েশন, পাতায় পাতায় চলে এসেছে, আমাদের নামে। আমার সাক্ষাত্কার বেরিয়েছে। তো, সেখানে দাঁড়িয়ে, তারপরে যেটা হল…

ত্রিদিব।। মানে, মিডিয়ায়?

তিমির।। হ্যাঁ, মিডিয়ায়। সব পেপারে, সব পেপারে চলে এসেছে নকশালদের কথা। কে রেজিস্ট করল তৃণমূল বিজেপিকে? এই নিয়ে একটা কনফিউশন, মিডিয়াও কনফিউশন তৈরি করল। খুব স্ট্র্যাটেজিকালি-ই করল। তো, সেইখানে দাঁড়িয়ে, আমাকে, আমি একটা, ওই, সাক্ষাত্কার দিয়েছিলাম। সেই সাক্ষাত্কারটা ছাপানো হল। সেই সাক্ষাত্কারটা, অনেকটাই, সেই সাক্ষাত্কারটার মাধ্যমে, শহরের অনেক কমরেডের মধ্যে, কনফিউশন অনেকটা দূর হয়ে গেছিল। বড় সাক্ষাত্কার ছাপিয়েছিল আমার। বিরাট। ফ্রন্টপেজে এসেছিল। দু-খানা করে, একটা আমার বিবরণ, মানে আমি কে ব্যক্তিটি, কী রকম দেখতে ঠেকতে, সেই, গ্লিটারিং আইজ ফাইজ, এই সমস্ত, লিখেছিল আরকি। যা নয় তাই লেখে মিডিয়া যেরকমভাবে হয় টয় আরকি। তো, সেইখানে দাঁড়িয়ে, সেটা… হচ্ছিল, আরকি… তারপরে যেটা হল, হ্যাঁ, ওই, উচ্ছেদ হওয়া অংশ। উচ্ছেদ হওয়াটা তো ক্লিয়ার হল তোমার, ওই উচ্ছেদ হওয়া অংশটাকে নিয়ে, আমি ঠিক করলাম, এই তিন নম্বরেই ব্রেক-টা করতে হবে। গোটা চক আউট করলাম। হ্যাঁ, এবার, সেটার আগের কিছু ঘটনা তোমায় বলে নিই।

এর মধ্যে, তৃণমূলের প্রচুর উচ্ছেদ হয়ে গেছে। তৃণমূলের বেশ কিছু সেকশন মরীয়া হয়ে কন্টাক্ট করার চেষ্টা করছে আমাদের, তাদের ঘরে ফেরাই উদ্দেশ্য। উচ্ছেদ হয়ে যাওয়া এই ইয়ং একটা ব্যাচকে, এইবার… তার মধ্যে সেন্ট্রাল কমিটির সেক্রেটারি য়্যাপ্রুভ করে দিয়েছে — ভুল তো কিছু করেনি, সময়ের সিচুয়েশন মোতাবেক এই ধরনের ট্যাকটিক্স তো নেওয়াই যেতে পারে,  ও তো ঠিকই করেছে ওই ট্যাকটিক্সটা, তার মধ্যে দিয়ে আমাদের লাভ হয়েছে, না, ক্ষতি হয়েছে, তোমরা বিচার করো, এবং, সেইখান থেকে শিক্ষা নাও —  স্টেট জেনারেল সেক্রেটারি য়্যাপ্রুভাল দেয়, সেন্ট্রাল কমিটি য়্যাপ্রুভাল দেয়, য়্যাপ্রুভাল দেওয়ার তো, এটা য়্যাপ্রুভাল পেয়ে যায়। (এই ‘য়্যাপ্রুভাল’ হল সিপিএমের সঙ্গে তিমিরের সমঝোতার ব্যাপারটায়, এটা একটু বাদেই আমিও প্রশ্ন করেছি, কথা চলার সময়ে আমি নিশ্চিত ভাবে বুঝতে পারিনি। তৃণমূলের আশ্রয় চাওয়া নিয়ে বলতে বলতে আকস্মিক ভাবে আবার ও এই প্রসঙ্গটায় ফেরত চলে গেছিল। এবার, ও এখনি চলে যাচ্চে আবার সেই অর্গানাইজারের প্রসঙ্গে, যার প্রতি ওর মন্দ লাগাটা আগেও বেশ কয়েক বার এসেছে। সে কী ভাবে উচ্ছিন্ন তৃণমূলকে আশ্রয় দিল। এবং একটু পরেই বোঝা যাবে, এটা পুরো আকস্মিক না, একটা সম্পর্ক আছে: অন্য রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে কোনো সমঝোতার য়্যাপ্রুভালের প্রসঙ্গটায়।) ব্যাপারটা যে, এবার, এই কায়দায়, মালটা কী করেছে, ওই তৃণমূলের সমস্ত ছেলেগুলোকে নিয়ে, অন্য আর একটা জায়গায়, অন্য আর একটা সেন্টারে, এরকম কতকগুলো সেন্টার তো, সেন্ট্রাল অর্গানাইজার মানে একটা গোটা এলাকার, তাহলে, এক একটা এরকম সেন্টার গড়ে উঠেছিল, অন্য আর একজন সেন্ট্রাল অর্গানাইজারের বিরুদ্ধে, ওই যে স্টেট কমিটির মেম্বার, সে ওদেরকে নিয়ে গিয়ে, নিয়ে গিয়ে, একজন মহিলা কমরেডকে দিয়ে, তাদেরকে দুদিন ধরে ক্লাস নেওয়াচ্ছে। পলিটিকাল টিচিং দিচ্ছে।

ত্রিদিব।। স্টেট এবং সেন্ট্রাল কমিটি এটাকে এভাবে য়্যাপ্রুভ করল কেন?

তিমির।। এটা নিয়ে প্রচুর পলিটিকাল স্ট্রাগল হল। এর মধ্যে প্লেনামের ডিস্ট্রিক্ট কনফারেন্স হয়ে গেছে। কনফারেন্সের প্রক্রিয়া চলছে।

ত্রিদিব।। কোন ডিসিশনটার পক্ষে বলল স্টেট এবং সেন্ট্রাল কমিটি?

তিমির।। ওই যে, সিপিএমের সঙ্গে যে আমি…

ত্রিদিব।। ও, সমঝোতা…

তিমির।।  সমঝোতার জায়গাটা।

ত্রিদিব।। মানে, একটা কনডিশনাল সমঝোতা?

তিমির।। কনডিশনাল সমঝোতা। কনডিশনাল সমঝোতার জায়গায় যে গিয়েছিলাম, সেটাকে য়্যাপ্রুভাল দিয়েছিল। য়্যাপ্রুভাল দিয়েছিল, আরকি। তো, সেইখানে দাঁড়িয়ে, সেটা ভীষণ ক্রিয়েটিভ বলেছিল। যে এটা ক্রিয়েটিভলি ভীষণ করতে পেরেছে, প্রত্যেক সেন্ট্রাল অর্গানাইজারকে পুরো সার্কুলার দিয়ে, এটাকে ফলো করতে বলেছে যে, নিজের জায়গায় খুব ক্রিয়েটিভলি নিজেরা ফাংকশনিং করো, আদারওয়াইজ, তোমরা পারবে না। এটা একটা রাস্তা। এরকম ভাবে করা যেতে পারে বিভিন্ন জায়গায়। তো, কোনো কোনো জায়গায়, তৃণমূলের সঙ্গেও কোলাবরেশন হতে পারে। হতে পারে, এইটাকে, কী রকম ভাবে, ব্যাডলি, ইউটিলাইজ হল — ওই ছেলেগুলিকে নিয়ে গিয়ে, দু-দিনে, কী হয়েছে, তার মধ্যে প্রচুর একটা বড় সেকশন লুম্পেন ছিল। একটা বড় সেকশনকে আমাদের ঘাড়ে ঝুলিয়ে দেওয়া হল। তা, আমি ওদেরকে, কী ভাবে ইউটিলাইজ করি? আমি ভাবলাম, ওদের, তৃণমূল, ওরা তিন নম্বরের ছেলে, তিন নম্বরে যাবে না, ওদের শেল্টারের থেকে, হঠাৎ ভোরবেলায় য়্যাটাক করে, সিপিএমের যে মেন ঘাঁটি, অস্ত্র মজুতের জায়গাটা, সেটাকে ব্রেক করে দিই। ব্রেক করে দিয়ে, ওরা তো ঢুকে যাবে, কিন্তু আমার যে, তখন ধান্দা ছিল যে, তাতে তৃণমূল আবার গ্রিপ বাড়তে পারে, কিন্তু, বিষয়টা হচ্ছে যে, ওরা আমাদেরকে আর য়্যাটাক করার জায়গা, অর্থাত, একটা নেগোশিয়েশন হতে পারে, কেন, একবার নেগোশিয়েশনের আমরা চেষ্টা করেছিলাম, ওরা করেনি, তাতে ফল কী হয়েছে দেখেছে। তা, নেগোশিয়েশনের জায়গাগুলো ওপেন-ই রয়েছে, ওরা জানে। সেটাকে ওদের বারবার বললাম। ওদের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করতে হল। এবং, ওই যে ডিস্ট্রিক্ট কমিটির মেম্বারটি, ও পুরো, তৃণমূলের জন্য যেন ওর নিবেদিতপ্রাণ হয়ে গেল। তৃণমূলের সঙ্গে সব সময় যোগাযোগ রাখছে, এবেলায় আর দোষ নাই। কিন্তু, আমি, এই ফোর্সটাকে, ভীষণ, মানে, সেই সময়ে, ওই, খুব সফটলি হ্যান্ডল, এদিকে, খুব ডেলিবারেটলি, তুমি যদি ওকে বলতে, যে, ইসে করো, ওর সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে শুরু করো, ও তোমাকে ইউজ করবার জায়গাটা তো রয়েছে, সেই জায়গাটা তোমায় বন্ধ করে দিতে হবে। তুমি কোন জায়গাটা বন্ধ করবে? তুমি ওকে শেল্টার দিচ্ছ। ডিসিশন হচ্ছে, কেশপুর ঢোকার। ওদেরকে নিয়ে। যেখানে আমার দুটি লোক নেই। আমি, গড়বেতায়, তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে, নিজে দাঁড়িয়ে রেজিস্ট করছি। ওখানের মানুষ আমাকে চেনে না, জানে তৃণমূলের নেতাটিকে, তৃণমূলের লোকজনকে চেনে। এরকম সিদ্ধান্ত নিচ্ছিল, ওরা ওখানে।

এখানে একটু বিচ্ছিন্ন ভাবে বলা হয়ে গেল। মানে, তৃণমূলের উচ্ছেদ হওয়া অংশ, আমার উচ্ছেদ হওয়া অংশ, আলাদা করতে হবে তোমাকে। তৃণমূলের উচ্ছেদ হওয়া অংশটা, ডেলিবারেটলি আমাদের সঙ্গে, যোগাযোগ করার চেষ্টা করছে। এটাকে সাবজেক্টিভ ফোর্স ধরে নিয়ে, কেউ কেউ, কৌশল ঠিক করছে। সেইখানে, ঠিক করছে, যে, কেশপুরেও ঢোকা হবে। কারণ, কেশপুর তখন, সেটা অবশ্য, পরে, সেটা এই মুহূর্তেই না। তার আগে যেটা ঘটছে, তাদেরকে ইউটিলাইজ করার জন্য, তারা গড়বেতায় ঢুকতে চাইছে,গড়বেতায় দখল করবার চেষ্টা করছে, তৃণমূল ফুললি সাপোর্ট করছে আমাদেরকে, বাইরে থেকে। নিজেরা কেউ নেতারা ঢুকছে না — যেমন হয়। কী হল — আমি ওই তিন নম্বরে ঢুকলাম। যা হওয়ার তাই হল, জানো তো? খুব আন্ডারগ্রাউন্ডে ঢোকা হল। মেইন স্পেশাল ফোর্সটাকে রেখে। যত হাবিজাবি ফোর্স নিয়ে আমি, একটা জায়গায়, আমি তাদের গাইডেন্সে নিয়ে, আমি যেখানে আছি, যেখানে, ব্যক্তিটা একটা বড় ভূমিকা পালন করে দিতে পারবে, এই বিশৃঙ্খলাকে শৃঙ্খলার মত, আমার আগে ট্যাঁফোঁ করার চেষ্টা করবে না। এবার, একটা শৃঙ্খলা অংশ, কিন্তু, ওদের দুজন ছেলেকে দিয়ে, একটা শেল্টারে ও অন্য একটা ঘরে ঢোকানো — যেটা হচ্ছে ছোট-আঙারিয়া। ছোট-আঙারিয়ায় ওরা গেল, আমরা ঠিক তার পাশে, একটা গ্রাম, গ্রামটার নামটা আমি এখন মনে করতে পারছি না, ‘হ’ দিয়ে নাম, ওটাও ‘হ’ দিয়ে, এটাও ‘হ’ দিয়ে। হাতিশোল ফাতিশোল, এরকম একটা ছিল, না?

ত্রিদিব।। আচ্ছা, কী বললি? ওই শৃঙ্খলাপূর্ণ অংশটা গেল ছোট-আঙারিয়ায়?

তিমির।। হ্যাঁ, শৃঙ্খলাপূর্ণ, হ্যাঁ, স্পেশাল টিম যেটা গেছিল, স্পেশাল টিমটার সঙ্গে দুজন, তার সঙ্গে, বেশ শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং বেছে বেছে কয়েকটা টিমকে নিয়ে, ওখানে পাঠানো হল। এইবার যেটা হল, সিপিএমের কাছে, আমাদের কাছে, খুব গোপনীয় তো, একদম, সারা দিন কী রকম ভাবে থাকা হত জানো — ধরো, একটা ঘরের মধ্যে সারাদিন চুপচাপ, রান্নাবান্নাও বেশি হবে না। হঠাৎ করে, বেশি রান্না হচ্ছে, কেউ বাইরে থেকে এসে, এত রান্না হচ্ছে কেন? হবে না। শুকনো খাবার। সঙ্গে থাকবে। উপরে, দিনের বেলায়। সন্ধের পরে, রান্না করে খাওয়া হবে। খাওয়া দাওয়া সব রাত্রি বেলায়। তখন তো, গ্রাম, শুনশান হয়ে যায়, রান্না করলে কিছু অসুবিধা হয় না। তাও, এক তরকারি, ভাত। কখনোই বেশি নয়। বেশি খাওয়ানোর চেষ্টা করা মানেই, বিপজ্জনক। টের পেয়ে যায়। কোনো সেন্ট থাকবে না। আমার ওখানে, কিন্তু, আমি এটাকে ইমপ্লিমেন্ট করিয়ে দিলাম। ওখানে কী করল — গরুর মাংস খেতে হবে, ছোট-আঙারিয়ায়, শুক্রবার, হ্যাঁ, বলে এক দল গরুর মাংস আনতে গেল।

ত্রিদিব।। কেন, ওখানে মুসলিম ছিল?

তিমির।। হ্যাঁ, মুসলিম। সবই মুসলিম, দুটোই মুসলিম গ্রাম, মুসলিম ডমিনেটেড গ্রাম। গরুর মাংস আনতে গেল, কোথায় — না, সবচেয়ে সিপিএমের একটা খোদ জায়গায়, সেখানে, গরুর মাংস, দুটো ছেলেকে বলল, কী রে, এত গরুর মাংস কিনে যাচ্ছিস, কী, ভোজ নাকি? বলল, না, আমাদের বাড়িতে আত্মীয়স্বজন এসেছে। তা, আত্মীয়স্বজন এসেছে মানে তো খোঁজ খবর নেওয়ার একটা ব্যাপার থাকছে…

ত্রিদিব।। ওরকম একটা টেনশন, এলাকায়…

তিমির।। হ্যাঁ, যে কেউ, বাইরে থেকে, কোনো আত্মীয় এলেও, সঙ্গে সঙ্গে চেজ করবে এসে। সিপিএম হোক, তৃণমূল হোক, সব চেজ করবে, য়্যায়, শালা, আগে পার্টি অফিসে এসো, গোটা ইসে দাও, হ্যাঁ? পেটের ভিতর যে বাচ্চাটি আছে, সেটাও বিশ্বাসঘাতক কিনা, কে বলতে পারে? হ্যাঁ? সন্দেহপ্রবণ এলাকা। তা, আত্মীয়স্বজন এসেছে, আচ্ছা, কে আত্মীয়স্বজন রে, মোটামুটি বল তো? বলছে, নিয়ে এসেছে, গ্রামে ঢুকেছে। ঠিক আছে? বেশি রান্না হচ্ছে, কোন বাড়িটায় রান্না হচ্ছে? কোন বাড়িটায় মাংস গেছে, সব জেনে গেছে। ওদের গন্ধ ভালো লাগেনি। সন্দেহ করেছে। ওখানে বসে ছিল। তার মধ্যে, দু-এক বার, এরা নিচে নেমেছে, পেচ্ছাপ টেচ্ছাপ করতে। ওরা শিওর হয়ে গেছে। যে, এখানে আছে। দিনের বেলায়, ওরা কোনো রিস্ক নেয়নি। কারণ, ওরা জানে যে, এদের, এরা আমাদের থেকে ইকুইপড। বরঞ্চ, আমাদের কায়দাটা ওরা য়্যাডপ্ট করে, কী করেছে — রাত্রি বেলায়, আমরা যখন প্রিপারেশন নিচ্ছি, আমরা তো ওদিকে রেডি হচ্ছি, যে, মিটিং পয়েন্ট ঠিক হয়ে গেছে, সমস্ত কিছু, কোন জায়গাটায় আমরা মিট করব, কোন গ্রামটায় আমরা ঢুকব, আমাদের কিন্তু সিপিএমের কাউকে মারার কোনো উদ্দেশ্য ছিল না। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল, ওদের সমস্ত, যেখানে ডাম্প আরকি… এক একটা জায়গায় ডাম্প হয়, খবর হয়েছিল, সেই ডাম্প করা যে অস্ত্রশস্ত্রগুলো আছে, সেই অস্ত্রশস্ত্রগুলোকে আমরা বার করে নিয়ে, ওদের কানা করে দেব। আর দু-চার জনকে তুলে নিয়ে চলে যাব। তুলে নিয়ে চলে যাব। তুলে নিয়ে, বলব, যে, হাত ওঠাও। তৃণমূলের, এবার ওদেরকে ওইটাকে করে দিতে পারলেই, হুহু করে তৃণমূলের একটা পোরশন ওইদিকে ঢুকে যাবে, আমরাও এই পর্যন্ত পোজিশন, একটা পোজিশন নিয়ে নেব, দিনের বেলায়। আর ওদেরকে এইটা, এইটা, ঘটনা হয়ে গেলে, সহজেই, সাধারণ মানুষের মধ্যেও একটা কনফিডেন্স, আবার একটা, ফিরে আসবে। বা, ভয়ের জায়গাটা কাটবে। গোটা প্ল্যানটা চক আউট হল যে, আমাদের গ্রামটাও কিন্তু ওরা খবর পেয়ে গেল। হেতাশোল, নাকি, হাতিশোল ছিল। ওটাতেও কিন্তু খবর হয়ে গেছে, কিন্তু ওরা গ্রামটায়, এবং, প্রপারলি ওরা খবর নিয়ে নিল, যে, কোন জায়গাটায় আমি আছি। যে জায়গাটায় আমি আছি, ওরা কিন্তু এগোল না। ওরা কিন্তু সফট টার্গেট ওটাকেই করল। কিন্তু, ওটা কিন্তু সফট টার্গেট হওয়ার কথা ছিল না। সফট টার্গেট এটা হওয়ার কথা ছিল। কেননা, এখানেই সব, আনইকুইপড ছেলেপুলে ছিল, না। দুটো টিম যখন আমাকে করতে হয়েছে, দুটো টিমে তো দুটো ভাগ হতে হবে, একটায় আমি, আরেকটায় তো আরেকটা, এফিশিয়েন্ট ছেলেরা। কী হয়েছে, সাড়ে সাতটার সময়, খবর শুনবার জন্য, মূল যে দুটো ছেলে, ওই যে একটা ছেলের কথা বললাম, শ্রমিক ব্যাকগ্রাউন্ড, সে, আর আর এক জন, যারা যে কোনো মুহূর্তে, যে কোনো চ্যালেঞ্জকে, বার করতে পারার মত, ক্ষমতা ছিল, সে দুজন কী করল? আর একটি ছেলের হাতে দায়িত্ব দিয়ে, খবর শুনতে পাশের ঘরে চলে গেছে। ঠিক ওই সময়টাতে। ওরা ঘিরে ধরে, আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে। ঘরে। সবচেয়ে বড় কথা, ওরা সারেন্ডার করতেও বলেছিল, চীৎকার চেঁচামেচি করেছিল। সেই সময় যদি এরা, ফায়ারিং করে, এলোপাথাড়ি ফায়ারিং করে, ছাদের উপর থেকে, ওরা ডিসপার্সড হয়ে যায়। এত বড় ম্যাসাকার হয় না। ঠিক আছে? এবার, এরা কনফিউজড হয়ে, কোনো কমান্ড — দেখো, কমান্ড নেই, কমান্ড নেই মানে, তার, কী বলব…

ত্রিদিব।। পাশের ঘরে, মানে, পাশের বাড়িতে?

তিমির।। হ্যাঁ, পাশের ঘরটায়। ফায়ারিং যখন স্টার্ট হয়েছে, ওরা, ওদিক থেকে, বেরিয়ে এসে যখন ফায়ারিং করতে… কনফিউজড হয়ে গেছে। অন্ধকারের মধ্যে, কোন দিকে ফায়ারিং করবে, আমার ইসেতে লাগবে, না, ও, দুটো ফায়ারিং করে আর ফায়ারিং করতে পারেনা। কারণ, আমার লোক মরবে, না, ওদের লোক মরবে, ওরা বুঝতে পারেনি। তখন ওটা, জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে, ওরা, ওরা দুজন কিন্তু বেঁচে বেরিয়ে এসেছে। আর এক দল, আর এক ছোট্ট, পাঁচ ছ জনকে নিয়ে, তারা কিন্তু, যে, ফায়ারিং করেছিল, আরকি। ফায়ারিং করে, বেরিয়ে চলে গেছে। যে অংশটা মরল, তারা ফায়ারিং-ও করেনি, তারা কনফিউজড, তারা, সব, কমান্ড পায়নি, স্রেফ কমান্ডের অভাবের জন্য। তার মানে তুমি যদি মিলিটারিলি, পলিটিকালি তাকে ডেভেলপ করো, যে, কমান্ড যদি না-থাকে, তাকে অস্বীকার করে, কমান্ড যদি প্রপার না-হয়, তাকে অস্বীকার না-করে, নিজেই তোমার, নিজের কমান্ড, এই জায়গাটা তার নেই। ওই যে ছেলেটির কথা বললাম, ওর শুধু কমান্ডের দরকার ছিল, ‘ফায়ার’, এই শব্দটা শুধু দরকার ছিল। যদি, ফায়ারিং-টা ওখানে ওরা করত, তাহলে, ওদেরই মরত। কারণ, ওরা নিচে ছিল, এরা উপরে ছিল। চার দিক দিয়ে ঘিরলেও, কিছু করতে পারত না। কেননা, দশ জনের একটা টিম ছিল, দশ জনে যদি উপরে, জানলাগুলো, খড় ফাঁক করে, নিচের দিকে ফায়ারিং করত, তাতে, দু-এক জন সাধারণ মানুষ মরলে কিছু যায় আসত না, হয়তো, কারণ, এই ফোর্সটার তো বাঁচার একটা জায়গা ছিল। কিন্তু, এই ফোর্সটার ক্ষতি হওয়ার ফলে তো প্রচুর সাধারণ মানুষের ক্ষতি হয়ে গেল। প্রচুর ঘর জ্বালিয়ে দিল, প্রচুর লোক মেরে দিল, কোনো অপোজ নেই। ফায়ারিং যখন হচ্ছে, তখন, আমরা খবর পাচ্ছি। এবার, ফায়ারিং যখন স্টার্ট হয়ে যায়, আমরা খবর পেয়েছি। এবার, ওই গ্রামটা থেকে ওই গ্রামটা যেতে গিয়ে, একটা টাইমের দরকার। ওরা কিন্তু মিনিট পনেরোর মধ্যে কাজটা সেরে ফেলল। আমরা যখন পৌঁছেছি, ওরাও বেরিয়ে গেছে। গ্রাম শুনশান হয়ে গেছে।

ত্রিদিব।। আর গোটা বাড়িটা পুড়ে পড়ে আছে — কী দিয়ে পুড়িয়েছিল?

তিমির।। পুরো, পুড়ে ধুরে, পড়ে আছে। হ্যাঁ? প্রথমে ভাবলাম, বাজির আওয়াজ। কিছুক্ষণ ওয়েট করা হচ্ছে। একটা প্রপার খবর তো, কোন দিক দিয়ে য়্যাটাক হচ্ছে, আমরা তো দুমদাম ছুটে যেতে পারিনা। আমরা ধীরে ধীরে এগিয়েছি প্রথমে, তার পরে, যখন, পুরো ব্যাপারটা বুঝতে, প্রায় যে, একটা ইসের মধ্যে, এসে যখন রাশ করে ছুটেই গেছি, ততক্ষণে কিন্তু, চল্লিশ মিনিট পার হয়ে গেছে। ফরটি মিনিটস ইজ ওভার।

ত্রিদিব।। ওই বাড়িতে তো তখন অনেক অস্ত্রশস্ত্রও আছে। আগুন ধরলে তো একটা ব্যাপক বিস্ফোরণ হওয়ার কথা…

তিমির।। হ্যাঁ, বিস্ফোরণই তো হয়েছে। বিস্ফোরণই হয়েছিল। গ্রেনেডগুলো বার্স্ট ফার্স্ট করে গেছিল। এটাতেই উড়ে গেছিল চাল ফাল। চাল ফাল উড়ে গেছিল। এবার, ওই আওয়াজটা যখন, বিস্ফোরণটা, ওইটা তো, প্রপারলি, আমাদের কাছে সিগনিফাই করল না। আমরা তো রাশ করে দৌড়লাম, চারিদিক দিয়ে গ্রামটাকে ঘিরলাম, গিয়ে যখন… একটা ছোট টিম বানিয়ে নিলাম তখন আমি… কয়েক জনকে পোজিশনে রেখে, ছোট টিম নিয়ে আমি ঢুকলাম যখন, তখন দেখলাম যে, শেষ। কেউ দরজা খুলছে না, গোটা গ্রাম বোধহয় পালিয়ে গেছে, লাশ, পোড়া পোড়া লাশের গন্ধ, জ্বলছে তখনো, সব আগুন ফাগুন জ্বলছে, কিছু নেভানোর চেষ্টা করা হল, দেখলাম, সার্চ করলাম, জঙ্গলের মধ্যে ওরা কোথায় চলে গেছে, তার কোনো ঠিকানা নেই। এবার যেটা হল, ওই লাশগুলো দেখে, গোটা… আমি তো গোটা ইনডিসিপ্লিনড, আমি তো ওখানে ইনডিসিপ্লিনড ফোর্সটা নিয়ে আছি, তারা হাউহাউ করে কাঁদছে, বন্দুক ফেলে দিয়ে বসে আছে। আমি বললাম যে, লাশগুলো তুলে নাও, তুলে নিয়ে চলো, একটা বিশাল প্রুফ হত, তখন যদি ওটা… এক জন কেউ আসত, আমি একটা কাঁধে নিয়েছি, আর বাকিদের বলছি, কেউ তুলছে না, কাঁদছে, মানে, আমাদের পলিটিকাল যে ফোর্সটুকু-ও ছিল, যারা পুরোনো আমলের, তারাও, মানে, মানে, বীভৎস এই অবস্থাটা দেখে না, তারা — এরকম, মুখ চেঁছে দিয়েছে, প্যান্ট খুলে দিয়েছে, দেখে, দেখেছে, যে, পুরুষাঙ্গটা নেই, কেটে দিয়েছে, কেটে দিয়ে আবার হাতে ধরিয়ে দিয়েছে…

ত্রিদিব।। মরে যাওয়ার পর?

তিমির।। হ্যাঁ, হ্যাঁ। বা, জ্যান্ত অবস্থাতেই কেটেছে, আমরা তো সেটা দেখিনি। হাতে ধরা ছিল। বা, ওটা, করেছে আরকি। দুটো। মানে, বেশি সময় পায়নি। কেননা, আমাদের উপস্থিতি ওরা টের পেয়ে, ওরা পালিয়ে গেছিল। আমরা যখন রাশ করছি, ওরা তখন পালিয়ে গেছে। বোধহয়, আরো দু-চারটে ঘর পোড়ানোর ইচ্ছে ছিল। পরবর্তী কালে, গেছে। কিন্তু সেটা ওরা পারেনি। এই বীভত্সতার কারণে, কী হল, ওই ফোর্সটাকে নিয়ে যখন আমি ব্যাক করলাম, ব্যাক করল আল্টিমেটলি, ভয়ানক আঘাত করে, ওই ছেলেদুটো যেহেতু বেঁচেছে, তিনটে ফোর্সেস বলে, বাঁশদা যেতে হবে, ঠিক করলাম, বাঁশদা ঢুকব। কালকে, যে করে হোক, এটাকে যদি য়্যাটাক না-করি আমরা, কোনো দিনই রিভাইভ করতে পারব না। তো, ওই ফোর্সকে নিয়ে, আর কোনো ভাবেই, ওটা, ডিমরালাইজড একটা ফোর্সকে নিয়ে, আমি আর কোনো ভাবেই, য়্যাটাক করার জায়গায়… কিন্তু, য়্যাটাকটা করলে, আমরা কিন্তু জিতে যেতাম। যদি এরা… এর থেকে, রাগ থাকত, মানে, রাগে ফুটতে ফুটতেই কয়েকটা মানুষ যদি ওটা করত, আমরা এটা পেরে যেতাম। রিকভার করে যেতাম। কারণ, সিপিএম, ওই ঘটনাটা ঘটিয়ে দিয়ে, কনফিউজড হয়ে, ভয়ে পালিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু, উইদিন ফরটিফাইভ মিনিটস, সিপিএম কিন্তু গোটা এলাকা পুলিশ দিয়ে ঘিরে দিয়েছিল। আমাদের য়্যাটাকের পরে। উইদিন ফরটি… মানে, ওই রাতের মধ্যে, গোটা স্টেট আর্মড পুলিশ দিয়ে ঘিরে দিয়েছিল। শ-য়ে শ-য়ে পুলিশ ছিল। আমরা পুলিশের মধ্যে, আমরা যখন ব্যাক করছি তখন, প্রায় ভোরে গিয়ে, একটা জায়গায়, সেফ গিয়ে, জায়গায় গিয়ে পৌঁছচ্ছি। তৃণমূলের ছেলেগুলো — সব — বেরিয়ে চলে গেল। একজন না, এবং, আমাদের বন্দুকগুলো নিয়ে। আমরা দুটো দুটো করে বন্দুক বইছি, তারপরে যা, মানে অনেক হল তো, তার পরেও তো কিছু বন্দুক বাকি থাকে, সে বন্দুকগুলো নিয়ে তৃণমূলে চলে গেল। যা। এই অবস্থায়, মিলিটারিলি ডিপেন্ড করতে গিয়ে, যেটা হল, একটা নয়-ছয় কাণ্ড শুরু হল।

ত্রিদিব।। মমতা সেসময়, দীর্ঘদিন ধরে, একজন দুজনকে নিয়ে, কলকাতায় সে প্রায় একটা নাটক…

তিমির।। হ্যাঁ, সুযোগ পেয়েছিল। কেন, ওই যে ছেলেটি ছিল, যে ছেলেটিকে নিয়ে, মূলত, যার ঘরটা পুড়েছিল, কী, ভুলে গেছি আমি, নামটা, ও তো তৃণমূলেরই ছেলে ছিল, ও-র জন্যেই তো হয়েছে, ও-ই তো মাংস কিনে, ওইটা করে, গন্ডগোলটা করেছিল। গোটা তৃণমূল ফোর্সটাই, একটা ক্যাওটিক না, সিপিএম ফোর্স থেকে একটা, আমার একটা, সিপিএমকে, সেন্ট্রাল কমিটি থেকে ডিসিশন ছিল, যে, এই লোকটা যা বলবে, এখন, তাই শুনবে। আর, এরা তো বিশৃঙ্খল। এ তো ভীষণ রকমের বিশৃঙ্খল। সিপিএমের রেজিমেন্টেশন, সেখানে আমার আবার প্রুভ হল, যে, আবার আমি ট্যালি করে দেখলাম, যে, রেজিমেন্টেড ফোর্স সিপিএম। এখনো, স্টিল নাউ, দে আর ভেরি রেজিমেন্টেড। আর, এই রেজিমেন্টেশনের জোরে, সিপিএম, এবার যদি ভোটে জেতে, কী প্রসেসে জিতল — আমাদের কিন্তু অজানা, কিন্তু এইটাকে ও রিকভার করে নিল, এই কন্ডিশনটা। এটা ও করবে?

ত্রিদিব।। কী প্রসেসে জিতল এবার?

তিমির।। এবার — সেটা জানা নেই। জানতে জানতে আবার দশ বছর সময় লাগবে। তখন ও আবার নতুন প্রসেস বার করবে। এটা হতেই পারে। একটাই জায়গা, এবার, যেটা ঘটতে পারে, যে, সিপিএম কিন্তু, আমার দেখে মনে হয়েছিল, যে, দুম করে, এতটা, য়্যাসেসমেন্টর মধ্যে আসেনি। যে, একেবারেই কন্ট্রোল থাকবে না, এরকম ভাবে, য়্যাসেসমেন্টের জায়গায়, আসেনি। কিন্তু, ধীরে ধীরে তো, সে যখন য়্যাডজাস্টমেন্টে গেল, ইলেকশন কমিশনের সঙ্গে, আমার তখন থেকেই সন্দেহ, যে, নিশ্চয়ই কোনো রুট বার করেছে…

ত্রিদিব।। কোনো একটা কিছু আছে — আমারও মনে হয়েছে, সিপিআইএম এতটা, বিনা লড়াইয়ে নির্বাচন কমিশনকে ছেড়ে দিল, আমি এটা বিশ্বাস করি না…

তিমির।। ছেড়ে দিল… রুট বার করেছে — সেই জায়গা থেকেই, আমার মনে হয়, যে, এলে, সিপিএম-ই, আসার চান্সই এখনো, আমি, সেই জায়গাটা, এই যে জায়গাটা, এই যে, গোটা দেখার মধ্যে দিয়ে আমি দেখেছি, সিক্সটি পারসেন্ট চান্স, সিপিএমই জিতবে…

ত্রিদিব।। হ্যাঁ, কিন্তু, সিট কত হবে…

তিমির।। সিট হয়তো কিছু কম হবে… কিন্তু, প্রশ্নটা হচ্ছে, সেই জায়গাতেই… তো, এই জায়গাটা থেকে, ছোট-আঙারিয়া ঘটল। এর পরই, ছোট-আঙারিয়া ঘটে যাওয়ার পর তো, মানে, যারাই আমাকে তুলেছিল, তারাই আমাকে নিচে ফেলল, একদম সেই, কিন্তু, আমি পলিটিকাল স্ট্রাগল, আমি…

ত্রিদিব।। কেন, ছোট-আঙারিয়ার দোষ কি তোর ঘাড়েই পড়ল?

তিমির।। হ্যাঁ। নিশ্চিত ভাবে। গোটা ঘাড়টা আমার দরুন  — আমি তো লিডার ছিলাম সেইখানে। বিভিন্ন প্রশ্ন এল, কেন, সঙ্গে সঙ্গে আমরা দৌড়ে গেলাম না — চল্লিশ মিনিট দৌড়ে যেতে হয়, সেটা আর কারো খেয়াল নেই, যে, আমি গেছি, আমি বললাম যে, আমি গেছি… আমি পরিষ্কার য়্যানালিসিস করলাম, আগর আপকো কোই য়্যাটাক…

ত্রিদিব।। কত জন মারা গেছিল?

তিমির।। উঁ?

ত্রিদিব।। কত জন মারা গেছিল, ছোট-আঙারিয়ায়?

তিমির।। পাঁচ জন মারা গেছিল। ছয় জন গ্রুপটা বেরিয়ে গেছিল। যে এগারো জন বলা হয়েছিল, সেই এগারো জন না, ছ জনের, দুদিন বাদে, আমাদের সঙ্গে মিট হয়ে যায়। তারপর তৃণমূলের অস্ত্রশস্ত্রগুলোও আমরা উদ্ধার করে নিয়েছিলাম। এতে কোনো প্রবলেম হয়নি। তো, সেটা কী — স্ক্যাটারড হয়ে গেল। বহু ছেলে ঘরে ফিরে গেল। ওই স্কোয়াডের মধ্যে থেকে কেউ কেউ সিপিএমের কাছে সারেন্ডার করে গেল। এটাকে সিপিএম খুব ভালো ভাবে ইউটিলাইজ করেছিল — ওরা মিলিটারি ট্রেনিং নিয়ে গিয়ে, সিপিএমের হয়ে কাজ করেছে

ত্রিদিব।। কোন কথাটা তুই বলতে গিয়ে থমকে গেলি, হিন্দিতে একটা কথা…

তিমির।। হ্যাঁ, আমি এক জনকে বললাম, আমি বললাম, সে চেজ করছে, তুমি দৌড়ও-নি কেন? আমি বললাম, ওটা মূল কথা নয়… আপনি য়্যাটাকড, আপনার হাতে অস্ত্র আছে, আপনি চালাননি, সেটার দায় আমার নয়… চুপ। সে সময়, আপারহ্যান্ডে ছিলাম, তখন পলিটিকালি আমি খুব সাউন্ড ছিলাম। সেই মুহূর্তে। খুব রিচ ছিলাম, প্র্যাক্টিকাল অভিজ্ঞতার জায়গা থেকে। তো, সেইখানে দাঁড়িয়ে, তুমি যখন মিলিটারিলি-ই বলছ, প্রপারলি মিলিটারিলি বলো। তুমি একটা মিলিটারি ফোর্স তৈরিতে, স্পেশাল ফোর্স বলছ সেটাকে, আমি তো সেরকম ভাবে কোনো রেকগনাইজ করিনি, আমি তো পলিটিকাল স্ট্রাগলটাকেই, প্রথম থেকেই, মেইন বলে আসছি, আমি পলিটিকাল ফোর্সকে স্ট্রং, স্ট্রেংদেন করার কথা বলছি। মিলিটারি য়্যাকশনের সুবিধাই, তা, করে দিত অনেক। মিলিটারি য়্যাকশন-ও তো, ইটসেল্ফ, একটা পলিটিকাল টাস্ক। সেই পলিটিকাল টাস্কটাকে তুমি কী ভাবে করছ? পুরন করেছ? ফাঁকগুলো? তো, তুমি স্পেশাল ফোর্স বানিয়েছ, আমি তো স্পেশাল ফোর্সকে দেখে, আমি বাকিগুলো তো, ঝরচাপড়চা নিয়ে তো আমি ছিলাম, তাকে নিয়ে তো আমি কন্ট্রোল করে বেরোলাম। তাকে নিয়ে তো…

ত্রিদিব।। কী চাপড় নিয়ে — কী বললি?

তিমির।। ঝরতিপড়তি যারা আরকি, ঝরতিপড়তি যারা আছে, ঝরতিপড়তি, ওখানে ঝরচাপড়চা বলে, যা, ওই ভাষা চলে আসছে… ঝরতিপড়তি যে মাল নিয়ে ছিলাম, সেই মাল নিয়ে তো আমরা, আমি, বেরিয়ে এলাম। তাদের তো রেসকিউ করে নিয়ে এসেছি। পুলিশ তো ঘিরে দিয়েছিল, রাস্তা তো ব্লক হয়ে গেছিল। যাই হোক, আমি, খুবই, আমিও ডিমরালাইজড, আমারও খুব খারাপ লাগছিল, আমি আর যেন পারছিলাম না টানতে, আর এর পর, একের পর এক য়্যানিহিলেশনের ডিসিশন হচ্ছে, একটা য়্যানিহিলেশনও আমি করছি না, অনেক বার, তার, তার আগে তিন মাস ধরে কিন্তু। এবার, সেইগুলো য়্যাটাকড হতে শুরু করল — আমি ভয় পাচ্ছি। ভয় পাচ্ছি। এই ভয় পাওয়ার জায়গাটা, পাচ্ছি। এবার আমার কিন্তু, ভয় পাচ্ছি এটাকে, কিছু যায় আসে না। কারণ, আমি, অতটা, ডিক্লাসড হয়ে গেছি, আমি জানি, আমাকে পলিটিকাল স্ট্রাগল… এবার, ফাইনাল কনফারেন্স এসেছে, স্টেট কনফারেন্স, ফাইনাল কনফারেন্সটা হয়ে — না, স্টেট কনফারেন্স ততদিনে হয়ে গেছে। স্টেট কনফারেন্সেই ওইটা, ওই, সেন্ট্রাল কমিটির সার্কুলার, ওইটাকে য়্যাকসেপ্ট করে হয়েছিল। সেখানে তো আমার, মোটামুটি, ঠিকই আছে… তো, সেইখানে দাঁড়িয়ে, এবার এই বিশেষ অবস্থার উপরে দাঁড়িয়ে, প্রচুর প্রশ্ন এবং তর্কবিতর্ক — তা নিয়ে — একটা প্লেনাম তৈরি হল। এবং, আমি, আবার একটা, পড়াশোনার জন্যে, ছুটি চাইলাম। এবং, আমি বললাম, আমি কলকাতায় থেকে করব। ইন-দি-মিন, ওই হয়েছে, ওই লড়াই করার সময়ে, আমার পাইলস-এর প্রচণ্ড যন্ত্রণা হচ্ছিল। রক্তে ভেসে যেত, প্রতিদিন, রক্তে ভেসে যেত। কষ্ট হত। আমি ভাবলাম, অপারেশনটা করিয়ে নিই। এই সেন্সেই গেছিলাম। ওরা বলল, পালিয়ে গেছে। আমি, যখন ফিরে এসেছি, তখন, গড়বেতায় আর আমরা, গড়বেতা থেকে, ব্যাক করে, তার পার্সপেক্টিভ জোন, মানে, তার পিছনের একটা অংশে আমরা আছি। মানে, গড়বেতায়, ঢুকছি, আবার, বেরিয়ে চলে আসা হচ্ছে। কিন্তু, মেইন যে, যে জায়গায় ঘটনা ঘটেছে, সেখানে কিন্তু আমরা, ঢুকছি কম, সেখানে, ঢুকলেই য়্যাটাকড হবে, প্রিপেয়ারড — তারপর, যখন ঢুকলাম, যেদিন ঢুকলাম, তার পরের দিনই, ঝাপুরের ঘটনা ঘটল, ইনসিডেন্টালি-ই ঘটল।

ত্রিদিব।। ঝাপুরের মানে?

তিমির।। তারপরে পেপারে বেরোল না, বদলা নেওয়া হল। রমজান বলে এক জন সিপিএমের লোক মারা গেল। সিপিএম য়্যাকচুয়ালি য়্যাটাক করল, হ্যাঁ? ওটা, পুরো, ওই যে সেই, পুরোনো লোকটা আমার সঙ্গে ছিল (সেই অর্গানাইজারের কথা বলছে), তার কৃতিত্বে গেল। য়্যাকচুয়ালি, ঘটনা যদি, প্র্যাক্টিকাল ফিল্ডে না-থাকলে তো দেখা যায়না, ভদ্রলোক, যখন সিপিএমরা য়্যাটাকটা শুরু করল, চারিদিক দিয়ে, তখন ভদ্রলোক একটা, ওই, আবার এই এক কেস, সেই শ্রমিক ব্যাকগ্রাউন্ডের ছেলেটার, স্বরূপ দত্তের, সেই ছেলেটা গিয়ে ছুটে করেছিল, উনি একটা ঘরের মধ্যে এরকম ভাবে দাঁড়িয়ে আছেন (ঘাপটি মেরে থাকার ভঙ্গী করে), আমি বললাম, আপনি এখানে দাঁড়িয়ে কী করবেন? রেজিস্ট করবেন? সামনে চলুন। তো, ওনাকে একটা, গাছের একটা, পিছনের আড়ালে দাঁড় করিয়ে, বসিয়ে, আমরা প্রত্যেকে পোজিশন নিলাম। প্রত্যেকে নিলাম। সিপিএমের সঙ্গে এনকাউন্টার হল। সিপিএমের সঙ্গে এনকাউন্টার নয়, সিপিএম আসলে চেয়েছিল, দূর থেকে আমাদেরকে আটকে রেখে, ঘিরে রেখে, পুলিশকে দিয়ে য়্যারেস্ট করাবে। এটা ওরা সাকসেসফুল হলনা। আমরাও চাইছিলাম, যে, যে করে করে ভাবে হোক, সন্ধেটা হতে দিতে হবে, চারিদিক উন্মুক্ত, কোনো না কোনো দিক দিয়ে আমরা বেরিয়ে যাব।

তো, সেখানে দাঁড়িয়ে, মানে, ওই ছোট-আঙারিয়ার পর ব্যাক করে গেছি, বেশ কয়েকটা মাস চলে গেছে, প্রচুর মিটিং হয়েছে, প্রচুর আমাকে গালাগালি করা হয়েছে, ভিতু বলা হয়েছে, ঠিক আছে। বলার জায়গা না, আমরা… স্ট্রাগলটা চালিয়ে যাচ্ছি, পলিটিকাল স্ট্রাগলটা চালিয়ে যাচ্ছি। আমি বললাম, অন্য জায়গায় ইনসিডেন্ট, এইখান থেকে শিক্ষিত, নিতে হবে, গড়বেতা, ক্ষেত্রে, আমি বললাম, গোয়ালতোড়, বা, তার পিছনের জায়গায় স্ট্রেস দিয়ে, আবার, টেকানো সম্ভব, তিন মাসে, চার মাস, কোনো ব্যাপার না, এইখানে পলিটিকাল অর্গানাইজেশন… তো, সেটাকেও ভয়ের হিসাবে দেখা হল, যে, আমি গড়বেতায় ঢুকতে চাইছি না। যাই হোক, সেই সমস্ত ব্যাপারটা চলছে, এবং, মানে, এই যে, ইগোইস্টিক, একটা জেলাসনেস, এইগুলো কিন্তু রয়ে যায়। বিপ্লবের পরেও, এইগুলো দেখা গেছে। বিভিন্ন, বিতর্ক জন্ম হয়েছে। কারো উন্নতি, বা কারো প্রচেষ্টা, কারো সাকসেস, এটাকে ছোট নজরে দেখানো, এইগুলো কিন্তু রয়ে গেছে। এইগুলো মানুষের প্রবৃত্তিগত দিক। এই প্রবৃত্তিকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করা, প্রশ্ন নেই। নিশ্চয়ই, খিদে আগে। তারপরে চ্যাট। মানে, বাঙাল ভাষায় বলে না, একটা প্যাটের চিন্তা, আর একটা চ্যাটের চিন্তা? প্যাট আগে। ধরে নিলেও, চ্যাটের চিন্তাও আছে। এটা প্রবৃত্তি। তো, সেখানে দাঁড়িয়ে, যেটা হল, যেটা, আমার খুব একটা, উত্সাহ লাগত না আর। আচ্ছা? ওই, ধরে ধরে, ছোট ছোট মিটিং করতাম ওদেরকে দিয়ে, মিটিং-গুলো আমি চালিয়ে যাচ্ছি তখন। এবং, কখন, আমার ওই পোজিশন কী জানো তো, আমি আর্মস-ও আর কাঁধে নিয়ে ঘুরি না। আর্মস-ও আর কাঁধে নিয়ে ঘুরি না। মানে, একদম, প্রথমে, খুব রেলিশ করছিলাম ব্যাপারটাকে। যে, এইটাই, নেগেট করে দিতে পারে, গোটা ব্যাপারটাকে নেগেট করে দিতে পেরে, ভীষণ রেলিশ করছিলাম।

ত্রিদিব।। আমি ভয়ের চেয়েও বড়।

তিমির।। হ্যাঁ, ভয়ের চেয়েও বড়, ওটা রেলিশ করছিলাম। মানে, আবার একটা প্রবৃত্তিগত… মানে, মিডলক্লাস ভ্যালুজ…

ত্রিদিব।। না, এটাও, তোর কথায়, সেই চ্যাট (‘চ্যাট’ এই অপভ্রংশটা কোথা থেকে আসতে পারে, খুব নিশ্চিত নই, ‘চিত্ত’ বা ‘চেতনা’ হতে পারে, বোধহয় এটা বরিশালের প্রবচন, আমি আগেও শুনেছি।)…

তিমির।। হ্যাঁ, সেই প্রবৃত্তি, হ্যাঁ, সেটাও একটা প্রবৃত্তি। মানে, সেটা কেমন, উসকে গেল। সেটাকে, কেমন, উসকে দেওয়া হল যেন। তো, ব্যাপারটা যেন, তারপরে আমরা… গড়বেতা যাই। যাই, সেফ জায়গাগুলোতে। যাই, ওটাকে একটা, মানে, মিলিটারি য়্যাকশনগুলোর জায়গা, খালি

ত্রিদিব।। এর পরে ওই ঝাপুরের ঘটনাটা ঘটল?

তিমির।। এর পরে, খুবই ইসে হয়ে, ঢুকতেই হবে — তা, আমি ঢুকছি না, সেই পুরোনো অর্গানাইজারকে দিয়ে, আমাকে বলল, যাও, আমি ওকে নিয়ে গেলাম। ঢোকা হল তার পরে। খুব অমায়িক, আমার মৃত্যুভয় বলে তখন কিছু নেই, কেননা, অনেকবার, তার মধ্যে, মৃত্যুভয় পেরিয়ে গেছি। বললাম না, বেশ কিছু তখন পুলিশ য়্যাকশন হয়েছে, আমরা থাকার মধ্যে পুলিশ য়্যাটাক করেছে, দু-চারবার পুলিশ য়্যাটাক করেছে। গুলি চালিয়েছে আমাদের দিকে। রেসকিউ করে গেছি। সেই ভয় আর তো কেটে গেছে। গুলি ব্যাপারটা আর ভয় লাগেনা। তো, সেখানে দাঁড়িয়ে… ঢুকলাম ঝাপুরে। রাত্তিরবেলায়, ঢাকা আলো, রেজিস্ট করা হবে, মারবে, অমুক তমুক, সেই লোকটাকে দিয়েই মিটিং করানো হল। একটা ছেলে, বিজেপির ছেলেকে, বলা হল… তো, ঝাপুর গ্রামটা কিন্তু খুবই ভালো ভাবে আমাদের সাথে ছিল, আসলে। সিপিএম প্রচুর টেরর চালিয়েছে, ওই গ্রামটার উপর। তো, সেইখানে দাঁড়িয়ে, ভীষণ টেরর চালিয়েছে, ওই গ্রামটা, ঘরে ঘরে গিয়ে টেরর চালিয়েছে, ঘরে ঘরে লোকজনকে মেরেছে। পিটিয়েছে, ছাল চামড়া তুলে দিয়েছে, বৌ ঠৌ-কে টেনে নিয়ে, বাচ্চাদের, রেপ করেছে। সাত বছরের একটা মেয়েকে রেপ করেছে। আমাদের এক, কর্মী, সমর্থক, য়্যাকটিভিস্ট না, পার্টি মেম্বার হয়ে গেছিল, সেই, তার, বাচ্চা মেয়েটাকে, রেপ করেছিল।

ত্রিদিব।। তার পরে সেই মেয়েটির কী হল? আর বেঁচেছিল?

তিমির।। না, গ্রামের মেয়ে, তার রেজিস্টান্স পাওয়ার, তোমার কি শহরের মত? সে বেঁচে যায়। বেঁচে যায়, তার আবার বিয়েও হয়। সেটাও কোনো কথা না। তো, সেইখানে দাঁড়িয়ে, আমরা, আমি চাইছিলাম, দেখো, সন্ধেবেলা পর্যন্ত। তার মানে, আমাকে আবার বেরিয়েই যেতে হচ্ছে কিন্তু, ঝাপুর ঘটিয়ে বেরিয়ে যেতে হচ্ছে, শিওর হয়ে গেছে। কে থাকবে, কোথায় থাকব, তারপরে? যখন রেজিস্টান্সটা হচ্ছে, আস্তে আস্তে, ওই, আমি দেখছি, অন্যদিক দিয়ে, একটা সাপোর্ট আসছে। প্রচুর লোক চারিদিকে দাঁড়িয়ে দেখছে। দেখছে, আমরা বাঁচলাম, না মরে যাচ্ছি। এবার যখন যত সময় গড়াচ্ছে, তত, দেখছি, একটা রাশ যেন, ওটা কখনোই সিপিএম মনে হচ্ছে না। তারা, উল্লাসে ফেটে পড়ছে আরকি, মানে, আমরা এগিয়ে যাচ্ছি, কখনো কখনো তাড়া করছি, সিপিএম দৌড়ে পালাচ্ছে, আবার একটু করে, চেপে। এবার, সিপিএম, এর পর একটা সময় দেখলাম, সিপিএম এবং পুলিশ এক সঙ্গে লড়াই করছে, মানে, তার পিছনে আছে আরো বড় ফোর্স। মানে, আরো বড় ফোর্স। ওরা, ওই পুলিশ-ও ভরসা পাচ্ছে না, আমাদেরকে… ঠিক আছে? পুলিশ-ও ফায়ার করছে, ইসে করছে, আমাদের কিন্তু, ফায়ারিং চালিয়ে যেতে হচ্ছে। খুব স্লোলি, কারণ, আমাদের হাতে, রিসোর্স খুব কম, সন্ধে পর্যন্ত… সন্ধে নেমে আসছে, আমি দেখলাম, রেসকিউ করার জায়গা আসছে, ঠিক আছে? ইতিমধ্যে, একটা সাইড, সিপিএম ফাঁকা করে দিয়ে বেরিয়ে চলে গেল। ধৈর্য হারিয়ে। ধৈর্য হারিয়ে, মানে, র‌্যান্ডম, র‌্যান্ডম তখন গুলিগালা চলছে। বাঁচার জন্যে, আমাদের ছেলেরা গাছে, আকাশে, মাথার উপর দিয়ে ফায়ারিং করছে, পুলিশ, সিপিএম ফায়ারিং করছে।  এর মধ্যে, র‌্যান্ডম, র‌্যান্ডম এই এলোপাথাড়ি গুলিতে, সিপিএমের এক জন মরে গেল, রমজান বলে এক জন। কার গুলি খেয়ে, কে জানে, ওদের নিজেদের বা পুলিশেরও হতে পারে। এই দিকে, হঠাৎ করে, সন্ধে যখন নেমে এসেছে, ওরা একটু ভয় পাচ্ছে, আমরা কিন্তু তখন এগোচ্ছি। দু-পা, দু-পা করে, এগিয়ে গেছি। এবার, টিপগুলোও আর, আর বেশি দেরি করার সময় নেই আমাদের, আমরা, আর গাছে মারছি না, বা, কানের পাশ দিয়ে মারছি না। আমরা কিন্তু এবার, খুব ভালো করে লক্ষ্য করে, পায়ের দিকে — দেখলাম, ধুপ ধাপ পড়ছে দু-চারটে। আমি কমান্ড করছি। ধুপ ধাপ দুটো পড়ার পর কিন্তু, ওখান থেকে, ফরাত করে, পালাতে শুরু করলাম। আমরা কিছু দূর দৌড়বার পরে পরে, ওর মধ্যেই, ইএফআর ফোর্স, গাঁ গাঁ গাঁ গাঁ করে, চারদিকে ঢুকে এল। এবং, ওই দিকের ফোর্সটাকে, আমি দেখলাম, আমি কিন্তু ওই দিকে নজর রাখছিলাম, ফোর্সটা কিন্তু ক্রমাগত এগিয়ে আসছিল, অর্থাত, আমাদের সঙ্গে জয়েন করতে চাইছিল। বুঝতে পারছ? ওই জয়েনিং-টা আটকে দিল স্টেট এসে। মানে, পুলিশ ওখান থেকে, বেধড়ক্কা লাঠিপেটা করেছিল। ওখান থেকে, লাঠিপেটা… ওই ফোর্সটাকে ডেসপার্স করে দাও, ওটার সঙ্গে হত, আমাদের সমর্থক, ওই যে হাজার হাজার মানুষকে আমরা জমায়েত করেছিলাম, ওই মানুষ। ওরা ওই, আস্তে আস্তে, যত সিপিএম দখল করতে পারছে না, ঢুকতে পারছে না, ওরা কনফিডেন্স পাচ্ছে, ওরা আমাদের সঙ্গে জয়েন করার চেষ্টা করছে, কিন্তু কনফিডেন্সও পাচ্ছে না, মাঝখান দিয়ে যে যাবে, মাঝখানে সিপিএম আছে, কে দেখে, সিপিএম যখন দৌড়ে পালাচ্ছে, তখন কিন্তু ওরাও দৌড়ে আমাদের কাছে আসার চেষ্টা করছে — ওরা তো সিপিএম হতে পারেনা যে দৌড়ে আমাদের কাছে আসছে। বিনা অস্ত্রে, অনেক মহিলা আছে ওদের মধ্যে, দেখা যাচ্ছে। ওইটার সঙ্গে ইউনিটিটা দরকার ছিল। ওইটা যদি লিংক হয়ে যেত, তাহলে, একবার যদি ওদের কাছে আমরা পৌঁছে যেতে পারি, তাহলে, পুলিশকেও ঘিরিয়ে দেওয়া হত, আরকি, কনফিডেন্সে। এইটা হলনা। পুলিশ কিন্তু, স্টেট কিন্তু, ওখান থেকে, চারিদিক দিয়ে এসে, শ-য়ে শ-য়ে পুলিশ, চারিদিকে ঘিরে রইল। এবার, আমরা তো, এবার তো আমাদের পালাতে হবে, আর তো উপায় নেই। ঝাপুরে পুলিশ ঢুকছে, নদীর পাড়ে। হালকা অন্ধকার। এইখানে আমরা, ধরো, পনেরো ফুট দূরে পুলিশ যাচ্ছে। নদীর পাড় ধরে পুলিশ ঢুকছে, ঝুপ ঝাপ মারছে একদম, পুরো, একেফরটিসেভেন, এসএলআর ফেসএলআর ফিট করে, এরকম ভাবেই ঢুকছে। আর আমরা চুপ করে…

ত্রিদিব।। মারছে মানে, তখন গুলি করছে?

তিমির।। না না, ঢুকছে। মানে, চুপ করে, কভারে, আড়ালে, বসে আছি। আমি বলেছি, একটা গুলি চলবে না, একটা শব্দ হবে না। কোনো আওয়াজ চলবে না, চুপচাপ বসে রইলাম। পুলিশ ঢুকছে। পুলিশ কিছুটা ঢোকার পর, আমরা কিছুটা…

ত্রিদিব।। তোরা ক-জন?

তিমির।। আমরা আট জন ছিলাম। আট জন নিয়ে বেরিয়ে এলাম। বেরিয়ে আসার পর, এক জন, একটা ছেলের কথা বলি। ওই অর্গানাইজারের নাম করে বলছে, অমুকের সঙ্গে কেন আসতে চাইনি, জানো? উনি ঢোকাতে পারবেন, বার করতে পারবেন না। এই যে আমরা বেরিয়ে এলাম — মানে, বেরিয়ে আসাটাই চাইছিল সবাই। এবং, বেরিয়ে আসা ছাড়া অন্য কোনো উপায়ও ছিল না। ওই যে বেরিয়ে এলাম, ওটা, আরো কাল হয়ে গেল। কেননা, তখন গিয়ে, আর সিপিএম কিছু করল না। পুলিশকে চাবকে করাল। তিরিশ জনকে এক দিনে য়্যারেস্ট করাল, দুম দাড়াক্কা, এবার স্টেট নেমে এল। গোটাতে স্টেট, আর কিন্তু সিপিএম, সিপিএম আর ফেস করার জন্য জায়গায় নেই, রমজান মরে গেছে। ঢুকে এসে মেরে দিয়েছে পিপলস ওয়ার, মানে, লোক ভাবল আরকি, মানে, ওরা আর কিন্তু আমাদের গায়ে হাত তুলতে… অন্য জায়গায় বরঞ্চ অনেক ভালো এফেক্ট পড়ল। ঠিক আছে? ভয় পাওয়া শুরু করল। গোয়ালতোড় টোয়ালতোরে গুটিয়ে গেল সিপিএম। হম্বি তম্বি তো — এখান থেকে নকশালদের মেরে তাড়িয়েছি, হম্বি তম্বি, আবার — ঢুকে গিয়ে মেরে দিয়েছে, যেমন প্রচার হল আরকি, আবার কখন মেরে দেবে, আমার তো আর সেই ফোর্স নেই। গোয়ালতোড়ের হম্বি তম্বি, লালগড়ের হম্বি তম্বি, বেড়ে গেল আমাদের অর্গানাইজেশনে। এটা যে গড়বেতার রেজাল্ট, এটার য়্যানালিসিসে কিন্তু গিয়ে পৌঁছল না। পৌঁছল যে, আমি, আবার, সেই ইসেটায়, মানে, য়্যানালিটিকাল পাওয়ার এত কম…

ত্রিদিব।। কী বলল?

তিমির।। মানে, আমি সেই ভিতরেই রইলাম, মানে, সেই অর্গানাইজার ভদ্রলোক, সে ঢুকিয়ে নিয়ে গেছিল বলেই যাওয়া হয়েছিল, সে ফাইটটা দিয়েছিল বলেই দেওয়া হয়েছিল। আর ওদিকে, গোয়ালতোড়ের, লালগড়ের, বা বেলপাহাড়ির সবাই বীর হয়ে গেল, বীর হতে শুরু করল আস্তে আস্তে। সিচুয়েশনটা, প্রচুর প্রোপাগান্ডা হল, চুঁইয়ে গেল সারা জায়গায়, গোটা পশ্চিম বাংলা জুড়ে। একটা বিরাট উত্সাহের জায়গাও তৈরি হল। সেইটাকে কনক্লুড করল স্রেফ মিলিটারি য়্যাকশনের মধ্যে, যেটা এখন বেলপাহাড়িতে গিয়ে ঠেকেছে। এখন শালবনিতেও নেই, গোয়ালতোড়েও নেই, হ্যাঁ? সমস্ত জায়গায় স্টেট দিয়ে ফেস করল, স্টেটকে ফেস করার মত ইকুইপডনেস পার্টির ছিলনা। গোটা স্টেট দিয়ে ফেস করল, ফেস করার পর, সেখান থেকে যখন দুম দাম ধুম ধাম কিছু মারধোর, য়্যানিহিলেশন কিছু চালানো হল, গড়বেতায় এসেও একদিন তপনকে মারা হল। একজন তপনকে মারা হল, গড়বেতায় ঢুকে একটা। ঠিক অন্য সাইডে, অন্য দিকে, গড়বেতার অন্য দিকে।

ত্রিদিব।। সেই তপন কোন, সিপিএমের?

তিমির।। সেটা, সেই তপন ঘোষ এই তপন ঘোষ এক নয় (ও এমন একটা ভঙ্গীতে বলেছিল, যেন, আর একটা কোনো তপন ঘোষকে ভয়ানক ভাবেই চেনার কথা, কিন্তু তখন বা এখন, কখনোই আমি মনে করতে পারিনি)। যাকে মারা, তাকে মারার কোনো অর্থ নেই। যাকে মারা হল, কোনো অর্থ… এটা কী হল? স্টেট রিপ্রেশন নামার, একটা পলিটিকাল ভূমি তৈরি করে দিল, যাতে স্টেট ফুললি নেমে গেল। আমাদের এগেনস্টে। সেই দিন থেকে, আজ পর্যন্ত, স্টেট ভার্সেস পার্টি চলছে। তাই, পার্টিকে স্টেটের সঙ্গে লড়াই করবার জন্য যে জায়গায় পৌঁছনো, অর্থাত, একদম স্ট্র্যাটেজিক পয়েন্ট, পারস্পেক্টিভ জোনে, সেই পারস্পেক্টিভ জোনে থেকে সে লড়াই করছে। অর্থাত, পশ্চিম বাংলার ঘোমটাটা, যেইটা, আড়ালটা, সেই আড়ালটা উদ্ঘাটনের জায়গাটা থেকে সরে যাওয়া, সরে গিয়ে, আমরা একদম একটা, অন্য আরেকটা এন্ডে গিয়ে, পৌঁছে গেলাম। এটা নিয়ে যখন ডিসকাশন হচ্ছিল, প্লেনামে, আমি পরিষ্কার একটা, পেপারস রাখলাম। পেপারস-টা নেগেট হয়ে গেল। প্রথম কথা হচ্ছে, তুমি, কন্ডিশন দেখো। প্লেনামে যখন আমার পেপারস, আমি আমার বক্তব্য রাখলাম, আর এক জন রাখল, তার বক্তব্যের সাপোর্টের অংশটা ধরে, ওইখানে সাপোর্ট করা হয়েছিল। এবং, যখন, হাত তুলল অনেকে, যখন প্লেনাম শেষ হল, ডমিনেট করল অন্য আর এক জন। ডমিনেট করল সেন্ট্রাল কমিটি, তার পর থেকে। সেন্ট্রাল কমিটির নেতা এসে যখন দেড় ঘন্টা বক্তব্য রেখে দিল, সবাই কনফিউজড হয়ে গেল, এবং, কেউ আমাদের সাপোর্টে রইল না। পরে, যখন, বেরিয়ে এসে, আমি যখন সিদ্ধান্ত নিলাম, যে, আমি পার্টি ছেড়ে দেব — দুটো কারণে — এক, পার্টির সঙ্গে একটা পলিটিকাল কন্ট্রাডিকশন আছে, দুই, আমি এই মুহূর্তে পার্টির সিদ্ধান্ত মেনে চলছি না। তার মানে, পার্টিরই ক্ষতি করছি। এই ক্ষতিটা করবারও আমার কোনো অধিকার নেই। কেননা, যেই কটা ডিসিশন হয়েছে, একটাও আমি ফলো আপ করিনি। সেখানে আমাকে, ভিতু বলেছে, কিছু বলেছে, কিছু যায় আসেনি আমার। আমি কিন্তু, নিজে, কাউকে জিজ্ঞাসা না-করে, পাইলস অপারেশন করতে চলে গেছি। পাইলস অপারেশন করেছি, এক মাস রেস্ট নিয়েছি, নিয়ে, আবার গেছি। গিয়েছি, কাজ করিনি। কাজ করিনি। প্লেনামের পরে, ফিরে গেছি, ফিরে গিয়ে আমি শুধু তিন জন লোককে বলেছিলাম, আমি ফিরে যাচ্ছি। বলে, কাউকে না-জানিয়ে, আমি ফিরে চলে এসেছি। এবার, তোমরা তোমাদের সিদ্ধান্ত নাও। আমি কাউকে ইনফ্লুয়েন্স করবার জায়গায় নেই। কেননা, আমার ফরমুলেশন কমপ্লিট হয়নি। এটার জন্যে, আমার কিছু টাইম দরকার ছিল।

ত্রিদিব।। ফিরে আসবার পর, তখন তো তুই ভয়ংকর রকমের ওয়ানটেড?

তিমির।। হ্যাঁ, আমি ভয়ংকর রকমের ওয়ানটেড। মানে, আমাকে পেলে গুলি করে দেবে, এরকম।

ত্রিদিব।। তাহলে, তখন কী হল?

তিমির।। সেটা তো আর একটা জীবন। ঠিক আছে। আমি ফিরে এলাম। ফিরে এলাম, আমি বাড়িতে এসে উঠলাম। বাড়িতে এসে উঠলাম।

ত্রিদিব।। বাড়িতে? মিনিমাম খবর গেলেই তো…

তিমির।। হ্যাঁ, কিন্তু, আমি খুব ট্যাক্টিকাল, খুব বুদ্ধিমান লোক ছিলাম। আমি ভীষণ-ই বুদ্ধিমান। আমাকে যারা প্র্যাক্টিকাল মনে করেনা, তারা খুবই ভুল করে…

ত্রিদিব।। যেমন, আমি?

তিমির।। উপর থেকে এলেবেলে মনে হয়, কিন্তু, আমি ম্যানিপুলেটিং খুব ভালো বুঝি। খুবই ভালো বুঝি। আমি কোন জায়গা থেকে কোন জায়গায় ঢুকব, তাহলে আমার এতটা কভার হবে, কতটা রিস্ক রয়েছে, কতটা রিস্ক নেই, এইগুলো য়্যানালিসিস আমি করতে পারি। ঠিক আছে। তো, সেই জায়গা থেকে, আমার তো, আমার পাড়া, যেটা আমার পাড়া, আমি প্রথম আমার পাড়াটাকে য়্যানালিসিস করলাম, ওখানে কি আমি তিন দিন থাকতে পারিনা? আমি দেখলাম, আমি পারি। ওখানে যেকটা সিপিএমের লোক আছে, কেউ পুলিশকে খবর দেবে না। অন্তত, আমি বলেই দেবেনা। আমি খুন করেছি, এই কথা আমার এলাকার একটা লোকও বিশ্বাস করবে না। কেননা, আমি তো কাউকে, একটা পিঁপড়েও মারিনি। কোনো দিন কাউকে টোকাও মারিনি। একটা শান্ত ছেলে, হ্যাঁ? এলাকার স্কুলে পড়াশুনো করত, মোটামুটি ভালো ছিল পড়াশুনোয়, এইটুকুই। হ্যাঁ? তো, সেই জায়গাটা দাঁড়িয়েই, এই তো এই, এই… তবে, সাহস আছে ছেলেটার, এইটুকু বলতে পারে। কেননা, কংগ্রেসি ছেলে, গুন্ডাগুলো, সেই, মারতে এসেছিল…

ত্রিদিব।। তোর পরিচিতিটা তাহলে এদের কাছে ক্লিয়ার ছিল না?

তিমির।। না, খুব ক্লিয়ার পলিটিকাল পোজিশন ছিল না। যে, আমি কী করি। অনেক কভার ছিল। বাড়িতে এসে, আমি কখনোই, ওটাকে বলতাম না। অনেক কভারে ছিল। কিন্তু, যে চেহারার বর্ণনা দিয়েছিল, এত সুন্দর ভাবে একটা চেহারার বর্ণনা দিয়েছিল টাইমস অফ ইন্ডিয়া, প্রতিদিনে, তো, সেইটা কী হয়েছিল, আমাদের পাশের বাড়ির লোক, য়্যাকচুয়ালি — আরে, যে চেহারা দিয়েছে যা, দেখেছ, চেহারাটা, যেমন বলছে, একদম আমাদের ইসের মত, তাই না, রোগা ছিপছিপে, অত্যন্ত সাধারণ চেহারার মধ্যে, শুধু দেখার মধ্যে চোখদুটো — এরকম যে, হালকা দাড়ি, হালকা চুল, হুঁ, এত, পাঁচ ফুট পাঁচ ইঞ্চি মত লম্বা হবে, মধ্যে মাঝারি, রোগাটে চেহারা, কথার আগে এবং পরে হেসে কথা বলে। এইটা কিন্তু মার্কিং পয়েন্ট। এইটা দেখে ওরা ধরেছিল। আমি সব সময়ই, কেউ কথা বলার পরে, প্রথমে একটু হেসে নিয়ে, একটু কথা বলে পরে, এটা আমি পেপার থেকেই মার্ক করলাম আমার জন্য। কথা শুরু করে একটু হেসে, এবং কথার শেষে গিয়ে আবার একটু হাসে।

ত্রিদিব।। এবার, ফিরে যাই, ফিরে আয়, রাজনৈতিক প্লেনে কী দাঁড়াচ্ছে…

তিমির।। তো, সেখানে দাঁড়িয়ে, আমি দেখলাম যে, এইটা আমায় খুব, আমি নিজেও কনফিউজড, আমি কনফিউশন ছড়াতেও পারিনা — এরা একটা ফার্ম জায়গায় আছে, এবং, স্ট্রাগলটা চালাতে চাইছে। বেসিকালি, এরা খুব বাজে লোক নয়, অনেক কিছু ছেড়ে দিয়ে, এদের জীবনের, অনেকেই, এর মধ্যে এসেছে। এবং, এরা এই লড়াইটাকে চালিয়ে নিয়ে যেতে — সেখানে, কনফিউশন ছড়ানোর জন্য, আমার শুধু থেকে যাওয়া, এটা নয়, কেননা, আমি সেই পোজিশনে নেই। কেননা, আমার এই কনফিউশনটা, আমি নিজেকে রিবিল্ড করবার জায়গায় রাখতে পারি, সেটা আমার মত করে হতে পারে। প্র্যাকটিস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে, হয়না। পুরোপুরি হওয়া সম্ভব নয়। প্র্যাকটিসে ফিরে যাওয়ার আগে, আমার এই জায়গাটায় কনফিডেন্স — অন্তত, ওরা কিছু করে না-দেখাক, বা, আমার ফরমুলেশনটাকে আমি কমপ্লিট করি। আমার এত দিনের প্র্যাকটিসের কাজটাকে আমি একটা কনক্লুডিং — আমি, বাড়ি ফিরে এসে, সমস্ত স্ট্যাটিস্টিক্স, গোয়ালতোড়ের সব কটা গ্রাম, লালগড়ের সব কটা গ্রাম, শালবনির সব কটা গ্রাম, তার ম্যাপ, গড়বেতা, তার প্রত্যেক কটার আলাদা আলাদা ইকনমিক কন্ডিশন, সমস্ত কিছু লিপিবদ্ধ করা — আলাদা আলাদা করে — এবার, সেগুলোকে মেলানোর কাজ শুরু করব, তার মধ্যে, পাশাপাশি বেশ কয়েকটা জায়গায়, ভুল ভাবে রেইড হয়ে গেল। মানে, আমাকে খুঁজতে এসে, পুলিশ রেইড করে দিল। আমি ওখান থেকে শিফট করলাম। একটা এনজিও-তে, সঙ্গে, ঢুকে গেলাম, কিছু পয়সাকড়িও পাওয়া যাবে, খাওয়াদাওয়া যাবে — তা, ওরা আমাকে অন্য একটা জায়গায়, সুন্দরবনের একটা জায়গায়, শিফট করে দিল। ও, ওটা, উত্তর, এটা তো আমার মিটে যাওয়ার পর। ঝামেলা যখন অনেক মিটে গেছে, তখন, এটা, এই জায়গাটা না, সেই জায়গাটা হচ্ছে তোমার, সেই জায়গাটার নামটা… হিঙ্গলগঞ্জের দিকে… যোগেশচন্দ্র বলে একটা জায়গায়…

ত্রিদিব।। অতটা ডিটেইলস না, তুই মূল বিষয়টা বল…

তিমির।। না, এগুলো বলাই যেতে পারে, এইগুলো খুব লিগাল জায়গা ছিল। ওটা একটা এনজিও-র সঙ্গে কাজ করতে গিয়েছিলাম, ওখানে একটা বুক ব্যাংক তৈরি করলাম। এরকম করতে করতে, ওরা পরবর্তী কালে এরকম, বেশ কিছু, এরকম প্রচণ্ড টালমাটাল শুরু হল, তখন, পিপলস ওয়ার একদম হেডলাইনে চলে এল, এবং, আমি ভীষণ ওয়ান্টেড, ওরা উপর থেকে, নিচ থেকে…

ত্রিদিব।। মানে, তখনো পুলিশের কাছে খবর নেই যে, তুই বসে গেছিস?

তিমিরা।। না, সেটা, বসে গেছি কিনা, আমি একা বসলাম না তো, স্টেট সেক্রেটারি বসল, সে আবার কয়েকজনকে নিয়ে বসল, তারা মিলে আবার, গ্রুপ ফর্ম করল। ফর্ম করে, তারা আবার পেপার বিবৃতি দিল। ঠিক হল? তাতে, আমাদের, সেখানেও সে বলেছিল, যে, আমার নাম করে, ও-ও পার্টি ছেড়ে বেরিয়ে গেছে। পার্টি ছেড়ে বেরিয়ে গেছে। ওদের সাপোর্টেই তথ্যটাকে ব্যবহার করেছিল। খুব, এক লাইনে, এসেছিল ব্যাপারটা। তো, সেটা, পুলিশ বিশ্বাসও করেনি, আবার, বিশ্বাসের — ইনফর্মেশনটা তো একটা নিশ্চয়ই তার কাছে পৌঁছেছিল। তো, সেই জায়গাটা একটা ছিল। সেটা একটা দিক ছিল। তার পরে, বোধহয়, বেশ কয়েকদিন বাদে, পার্টি আমার এগেনস্টে একটা, সার্কুলার বার করেছিল। সেটাও, নিশ্চয়ই, পুলিশের হাতে গেছিল। পার্টি, আমার এগেনস্টে, মানে, আমার সঙ্গে যাতে কেউ দেখা না-করে, বা, ইসে, পার্টি লাইনকে ইসে দিয়েছে। তার পরে, ইন-দি-মিন-টাইম, বেশ কিছু দিন বাদে, আমার পাড়ায়, ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলে, আমার নাম করে, এর সঙ্গে কেউ… জনগণের থেকে বিচ্ছিন্ন করুন। কেননা, আমি, ওই এলাকায় যেতাম, বন্ধুবান্ধব ছিল, ওই জায়গাটায়, একটা যেখানটায়, যেতাম, যেতাম — বাড়ি থেকে যাব কোথায়, সেটা তো ঠিক করতে পারছি না। ওই কাজটা করছি, মাঝে মধ্যে আবার বাড়িতে ফিরে আসতে হচ্ছে। দু-তিন দিন থাকি, তার বেশি দিন থাকি না। আমি দেখেছি, এক মাস গ্যাপে যদি আমি তিন দিন করে থাকি, তাহলে আমাকে কেউ ধরিয়ে দেওয়ার নেই। ওর মধ্যেই, এবার, ভুলভাল হয়ে যাওয়ার পর, আমি তারপর, একটা স্টেজে গিয়ে দেখলাম, এইবার রিস্কি হয়ে যাচ্ছে ব্যাপারটা। এক বছর মত, আমি, বাড়িতেই ছিলাম, য়্যাকচুয়ালি। হয়ে যাচ্ছিল তো। এই ভাবে, ঘুরে ফিরে। এখানে, ওখানে, ঘুরছি, কখনো এই বাড়িতে থাকছি, কখনো ওই বাড়িতে থাকছি। বাড়িতে থাকলেও, পাশের বাড়িতে। বা, অন্য কোনো মাঠে গিয়ে একটু শুয়ে পড়লাম, এই রকমও করছি, পাঁচিলের ধারে গিয়ে, পুকুরের পাড়ে শুয়ে গেলাম। বা, আমি শুয়ে আছি, বাবা বাইরে বসে পাহারা দিচ্ছে, এরকমও হয়েছে। ওয়ানটেড তো, আমি তো কিছুই করছি না, প্রেস কনফারেন্স ফনফারেন্স তো করতে পারতাম তখন আমি, প্রেসকে ডেকে বলতে পারতাম, প্রেস আমাকে খুবই খুঁজেছিল। সেই সময়। বিভিন্ন মারফত আমাকে, ইসে, বলছিল যে, আমার সাক্ষাত্কার চায়, অমুক চায়, তমুক চায়, আমি কি সত্যিই পার্টি ছেড়ে দিয়েছি কিনা, আমার ভার্শন চাইছিল প্রেস। ভীষণ ভাবে, প্রত্যেক কটা লিডিং প্রেস চাইছিল। বিভিন্ন ভাবে খবরও আসছিল। আমি কিন্তু প্রেসকে দিতে যাইনি। কেন দিতে যাব, ফালতু, কী দরকার? ওটা, ওসব, বেশি, করার দরকার নেই। ওসব কিছু করার দরকার নেই। তা, আমি, করতে করতে করতে করতে, ওই একটা জায়গায়, ওই, একটা ইসে পেলাম, একটা সোর্স পেলাম, যে, ওই, কাপড় বেচা, কাপড়ের কারবারী হয় এরা, এরা কী রকম করে, এরা ডাইরেক্ট দোকান নেই, এরকম পাঁচটা ছটা লোক রাখে, তাদের একটা দরে, ওই, গাঠরি বেঁধে দেয়, গাঠরি নিয়ে ঘুরে ঘুরে বাড়ি বাড়ি বিক্রি করে, আবার সন্ধ্যাবেলায় এসে ফেরত দেয়, যেকটা শাড়ি বিক্রি হয়, ওকে একটা টাকা দিয়ে দিতে হয়, তার পরে বেশি, যত বেশি দামে তুমি বিক্রি করতে পারো, তুমি, সেই দামটা তোমার। আমি ভাবলাম, ভাল-ই আছে। আমি সেলসম্যান হিশেবে দেখি এক বার নিজেকে পরীক্ষা করে। কাপড়ের গাঠরি নিয়ে, ফেরিওলা হিশেবে বেরিয়ে গেলাম। চলে গেলাম আসাম। এর পর থেকে, একটা নতুন জীবন, ওটা একটা নতুন পার্ট। এটা বলার আগে, আমি একটা বিড়ি খেয়ে নিই।

ত্রিদিব।। এবার, বরং তুই শুরু কর, যেমনটা বলছিলি, রাজনৈতিক যে প্রশ্নগুলো, অনেকগুলো, অনেকগুলো ইশু, অনেকগুলো প্রসঙ্গ তোর না-বলা রয়ে গেল, সেগুলো বলা শুরু কর এবার।

তিমির।। মানে, না-বলা, এর মধ্যে তো, প্রধান বিষয়গুলো, রাজনৈতিক প্রসঙ্গে যে বিতর্ক, বা, যে জায়গা থেকে শুরু হয়েছিল, তা, বেশ কিছুটা চলে এসেছে। আর, মূলত, পার্টির কী থিওরেটিকাল লাইন ছিল, সেই নিয়ে তো আমরা এইখানে ডিসকাস করছি না, সেটা আবার একটা বিচ্ছিরি ব্যাপার হবে আরকি। তো, সেটাকে বলার উদ্দেশ্য-ও তো এখানে নেই। কিন্তু…

ত্রিদিব।। এই ‘বিচ্ছিরি’ ভাবা-টা কি খুব জরুরি? মানে, এখন তো তুই…

তিমির।। বা, সেটাকে, বা আমি, কতটা এখন, ভালো ভাবে বলতে পারব, সেটার প্রশ্নটা আছে। বেসিক আউটলাইনটা চলে এসেছে। মানে, আমার বলার জায়গা থেকে, চলে এসেছে। এবার, যদি আমি এখন, স্ট্র্যাটেজি ট্যাকটিক্স…

ত্রিদিব।। তোকে একটু চা দিই?

তিমির।। হ্যাঁ। স্ট্র্যাটেজি ট্যাকটিক্স, বা, পারস্পেক্টিভ জোন নিয়ে, গেরিলা জোন নিয়ে ডকুমেন্ট, এগুলো যদি ডিসকাশন করতে হয়, তাহলে বড় বড় ডিসকাশন, যেটা, তুমি, আজকে তো কমপ্লিট করা সম্ভবই হয় না। মানে, এর মধ্যে তোমার প্রচুর কোশ্চেনও য়্যারাইজ করে যাবে, মাঝে মধ্যে। তো, যেটা আমি বলছিলাম তোমাকে, যেটা, এগুলো আছে আরকি, মানে, পলিটিকাল লাইফ, এই দিক, আরো কতকগুলো দিক আরকি। যেমন ধরো, পার্টি কতকগুলো স্টেপিং। তার এক্সপিরিয়েন্সের জায়গা থেকে… প্রথম যখন সেন্ট্রাল অর্গানাইজারদেরকে তারা পাঠিয়েছিল, গ্রামে, অর্গানাইজ করতে, কৃষিবিপ্লবের পক্ষে মানুষকে, পলিটিকালি, তাদেরকে, বাড়তে — তখন এইরকম ভাবে, তো, একটা, তোমার মনে হচ্ছিল না, যে, একটা জায়গা, ম্যাপ দেখে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল, যে, ম্যাপ দেখে, এইরকম জায়গাটা তুমি, এইরকম তো আমিও গেছিলাম, সেখানে কিছু একজন লোক কিছুদিন কাজ করেছিল, কিন্তু, সেভাবে কিছুই কাজ ডেভেলপ করতে পারেনি। তো, শুরু থেকে কাজ করতে হবে, শূন্য থেকে। এরকম বহু লোককে পাঠানো হয়েছিল, যাদেরকে আমার থেকেও প্রচুর কষ্ট হয়েছিল। যেন, আমার কষ্টটা থেকেই বুঝতে পারি, যে, তাদের কত কষ্ট হয়েছিল। মানে, সেইখানে, আরো ইন্টিরিয়র, আরো গরিব, আরো শুকনো জায়গা, যে আমরা, আমিই মাঝেমধ্যে এরকম হয়েছে যে, তিন দিন খেতে পাচ্ছিনা। অর্গানাইজেশনটা গড়ে তুলতে হচ্ছে ঠিক এই পোজিশন থেকে, যেখানে কোনো কানেকশন নেই, খেতে হলে মানুষকে সংগঠন বানিয়েই তোমাকে খেতে হবে, বুঝতে পারছ তো? মানে, পার্টি, জনগণের সঙ্গে একাত্ম হওয়ার অন্যতম একটা দিক, ঠিক করা হয়েছিল, যে, কী ভাবে মানুষ একাত্ম, মানুষের সঙ্গে আমি একাত্ম হব, মানুষের কাজ করব, মানুষের উপর নির্ভর করেই বাঁচব, তো, খাওয়াটা তো তারই শর্ত। খেতে পাওয়া, থাকতে পাওয়া, এটা তারই শর্ত। যদি খেতে পাও না, তুমি, যতদিন না তুমি মানুষকে ইনফ্লুয়েন্স করতে পারছ, পলিটিকালি ইনফ্লুয়েন্স করতে পারছ, মিটিং করে তাকে বোঝাতে পারছ, ততদিন তুমি ভালো করে খেতে পাবে না। মাঝেমধ্যে পেলেও, সেটা ঠিক পাওয়ার মত নয়। এরকম, মাঝেমধ্যে এরকম হয়েছে, কনটিনিউয়াস তিন দিন আমিই খেতে পাইনি। এরকম প্রচুর জায়গা আছে, যে, মাসে পনেরো দিন খেতে পায় না, পনেরো দিন খেতে পায়, এরকম জায়গাগুলোও আছে, তারা এখনো কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। অনেকে হয়ত এরকম আছেন, আছেন অনেকে য়্যারেস্ট হয়ে গেছে, অনেকেও পার্টিও ছেড়ে দিয়েছে, এরকম ঘটনাও আছে। তা, এইগুলো যা আছে, তা, এর মধ্যে চলতে চলতে, জীবনের অন্যান্য দিকগুলোও বেড়ে উঠেছে। প্রেম, হ্যাঁ? তো, সেটা নিয়েও জটিলতা। তার পরে, সবচেয়ে বড় একটা, নকিং ছিল আমার কাছে, পার্টির একটা জায়গা, যেগুলো, আমি, নেগেটিভ পজিটিভ, পজিটিভ জায়গা তো আমি কী ভাবে সেরকম ভাবে কিছু বলিনি, কিন্তু, যে নেগেটিভ জায়গা, অর্থাত, আমার, জীবনের যে কন্ট্রাডিক্টরি যে জায়গাগুলো হয়েছিল, সেই জায়গাগুলোই এখানে মূলত এসেছে। সেখানে, আর একটা কন্ট্রাডিকশনের জায়গাটা বলে দেওয়া যায়, তার পরে, কিছু ইউনিটির জায়গাও তো ছিল, নাহলে গেলাম কেন? চিন্তার জায়গায় কিছু তো ঐক্যের জায়গাও ছিল, নাহলে, গেলাম কেন? তো, সেই ঐক্যের জায়গার মধ্যে, কিছু কিছু জায়গা তো এখনো আমি মনে করি যেগুলো পজিটিভ জায়গাই ছিল। মানে, এখনো আছে, স্টিল নাউ। তার ডেডিকেশনের জায়গা, তার একাত্ম হওয়ার জায়গা, যে প্রসেস, সে যে ভাবে পড়াশুনা, নিবিড় যে প্র্যাকটিস, যেটা আমি অন্য কোনো পলিটিকাল, নকশালপন্থী অন্তত, অর্গানাইজেশনের মধ্যে, এই নিষ্ঠা দেখিনি যে, জনগণের সঙ্গে একাত্ম হওয়ার, বা, জনগণের মধ্যে, জনগণের জন্য কাজ করবার জন্য, নিজেকে পুরোপুরি ডেপুট করা, সেখানে, এমন ভাবেই কাজটা করতে হবে, যে, তুমি, টিকে থাকাটাই তোমার নির্ভর করছে মানুষের উপরে। প্রথম শর্তটাই হচ্ছে সেখানে। সেটা তুমি না-করতে পারলে, তুমি থাকতে পারো না টিকে। তা, এই জায়গাটায়, তো এই প্রথম শর্তেই অনেকে ফেইল করে গেছে। এরকম বহু, সেই সময় পার্টি মেম্বার বা পার্টিতে যারা জয়েন করেছিল, তাদেরকে এরকম গ্রামের দিকে পাঠানো হয়েছিল, তারা টিকতে পারেনি। সাত দিন, দশ দিন, এক মাস…

(এইখানে দ্বিতীয় ক্যাসেটের দ্বিতীয় দিক শেষ হল)

ত্রিদিব।। যা বলছিলি তুই — প্রথম দিকে যাদের পাঠানো হয়েছিল, তাদের অনেকেই আর টিকতে পারেনি…

তিমির।। হ্যাঁ, তো সেইখানে দাঁড়িয়ে যেটা, হ্যাঁ, টিকতে পারেনি। মানে, ওই পোজিশনটাকে, অর্থাত, যে ভীষণ কালচারাল গ্যাপ, খেতে পেলেও, তা, কী পাচ্ছে? মানে, আদিবাসীরা এক ধরনের ভাত রান্না করে, তাকে বলে ‘দামান্ডি’। ‘মান্ডি’, ‘মান্ডি’ মানে জল, ‘দা’ মানে ভাত। ‘দা’ মানে জল, ‘মান্ডি’ মানে ভাত। উল্টোটা বলে ফেলেছিলাম আরকি। ‘দা’, ‘দা’ দিন, ‘দা’ মানে জল দিন, ‘দামান্ডি’ আরকি, ‘দামাঁড়ি’, পশ্চিম বাংলার দিকে, এটা কী হয়েছে, সিংভূমের দিকে তুমি যদি সাঁওতালদের সাথে কথা বলো, ‘দামান্ডি’ বলবে, পশ্চিম বাংলায় সেটা ‘দামাঁড়ি’ বলবে। ‘দামাঁড়ি’-ই বলবে পশ্চিমবঙ্গে। তো, দামাঁড়ি আর, ‘আরাভাজি’ বলে, ‘আরাভাজি’ মানে কিছু সজনের শাক সেদ্ধ করা। ‘ভাজি’, মানে, হিন্দি শব্দের সঙ্গে একটা মিল আছে, ‘ভাজি’, ভাজা আরকি। তবে, ভাজা নয়, ওটা একটা সেদ্ধ ব্যাপার, একটু নুন দেওয়া, লঙ্কাও থাকে না কখনো কখনো। তা, কালচারাল ডিফারেন্স, ওরা তো ওটা সাপ্টে খাচ্ছে। নুন দিয়ে খাচ্ছে। ইঁদুরের মাংস খাচ্ছে। তোমাকে দিচ্ছে। এবং, তোমাকে তা খেতে হচ্ছে, একাত্মতার জন্যেই। যে, তুমি যদি ওটাকে ফেলে দাও, ওরা মনে করছে, যে, পছন্দ করছ না তুমি অনেক। ভীষণ কালচারাল ড্যাম্প, ভীষণ, ওই ট্রাইবালদের সঙ্গে বিশেষ করে। বাঙালি যারা আছে, বা, একটু, মিডলক্লাস ফ্যামিলি হলে একটু তরকারি, অন্য ধরনের বাঙালি খাবার থাকে, সেই ধরনের ঘিনঘিনে ব্যাপারটা এতটা থাকে না। কিন্তু, আবার, দুলে, মাল, এরা, অনেকটা, সেমিট্রাইব ধরনের, কালচারালি, এরা, এদের রান্নাবান্না এবং এদের কালচারাল পরিবেশটা অনেকটাই আবার সাঁওতাল, এরা সাঁওতালদের সঙ্গে যেমন মিশে যেতে পারে, এরা মূলত খেতমজুর অংশ। তফশিলি। তো, সেই জায়গা থেকে, এই প্রথম ধাক্কাটাও অনেকে সামলাতে পারে না, এই প্রথম যারা ধাক্কাটা সামলাতে পারে, এরা অনেক দিন পর্যন্ত টেকে। যারা এই, এদের, এই জায়গাটাকে, এই প্রথম শর্তটাকে, প্রথম জায়গাটাকে মেনে নিতে পারে, এবং, এই পলিটিকাল চ্যালেঞ্জটাকে গ্রহণ নিতে পারে, গ্রহণ করতে পারে। এই যে প্রসিডিওরস-টা, এই যে প্রসিডিংস-টা, এই প্রসিডিংস-টার মধ্যে অত্যন্ত শিক্ষার ব্যাপার ছিল, মানে, কমিউনিস্ট মুভমেন্ট গড়ে তুলবার জন্যে যে ডেডিকেশনটা দরকার আছে, সেইখান থেকে ক্রিম একটা অংশকে বেছে নেওয়া, প্রথম দিকেই, টিকে যাওয়া অংশটা হচ্ছে, এটা ক্রিম অংশটা, যারা পরবর্তীকালে যে… যে রিপ্রেশনটা নামবে, সেটা ফেস করতে — এর মধ্যে, সেটা কিন্তু একটা সেকেন্ড ফেজ। মানে, যখন, স্টেট রিপ্রেশন নামে, তুমি লোকাল যে পার্টিতে পার্টিতে লড়াই, ভিলেজারস ভিলেজারে লড়াই, এ লড়াইগুলো চেনা লড়াই, যে লোকটা আসছে, সিপিএমের ধরা যাক অধীর ঘোষ আসছে, বা, অজিত ঘোষ আসছে, তাকে চিনি, তাকে দীর্ঘদিন দেখি, তার শক্তিসামর্থ সম্পর্কে আমার বেশ কিছুটা য়্যাসেসমেন্ট আছে। যখন স্টেট আসে, তখন তো অনেক ঝড়ের মত আসে, এবং, অনেক হঠাৎ করে আসে। এবং, সেই যে রিপ্রেশনের ধাক্কাটা আসে, সেটা আমার অনেকটা অচেনা থাকে, আর, স্টেট সম্পর্কে, অচেনা এই জায়গাটা সম্পর্কে, অনেক বেশি ভয় থাকে। তো, সেই জায়গাটাকেও, অনেক সময় সেই জায়গাটা, এই ফেজটা পার হবার পর ওই ফেজটা তো। আমি থেকে এসেছি এটা, আমি যখন ছেড়ে দিয়ে এসেছি, তখন ঠিক স্টেট রিপ্রেশন নেমেছে এরকমটা নয়, কিন্তু, স্টেট রিপ্রেশন নামার মুখে। নেমেছে। কিন্তু, সেই মাত্রায় নয়। যেখান থেকে, বেরিয়ে আসে লোকে। তো, ফেজ আছে। তা, এরকমটা, ধরো, আমার তো মনে হয়েছিল যে, আমি, স্টেট রিপ্রেশনের কারণে কি ভয় পেয়েছি? বা, সেইখান থেকে বেরিয়ে এসেছি? নিজেকে, এই, প্রচুর, য়্যানালিসিস করতে হয়েছে। কারণ, একটা জিনিস দেখার আছে, যে, এপি-র মুভমেন্টের ক্ষেত্রে আমরা যখন দেখি, এপি-র মুভমেন্ট কিন্তু পুরোপুরি, এরকম ভাবে হয়নি। মিলিটারিলি, মিলিটারিলি এপি-র মুভমেন্ট গড়ে উঠেছিল, তা নয়। বরঞ্চ, এই সেন্ট্রাল অর্গানাইজাররা গিয়ে, অনেক বড় বড় মাস মুভমেন্ট তৈরি করেছিল। ঠিক আছে? বিশাল বিশাল।

ত্রিদিব।। সাংস্কৃতিক জায়গাটার, একটা, বেশ বড় ভূমিকা ছিল।

তিমির।। হ্যাঁ, সাংস্কৃতিক জায়গাটা একটা বিশাল বড় জায়গা — ইন্টেলেকচুয়ালদের একটা বিশাল ভূমিকা ছিল। সব কিছু মিলিয়ে, এপি-র মুভমেন্টের মডেলটার সঙ্গে কিন্তু এইখানের যে মুভমেন্টটা, বা, যে জায়গায় বেড়ে ওঠা, তার সঙ্গে কিন্তু খুব একটা বেশি মিল নেই। এখানে, বিরাট কোনো মাস মুভমেন্টের মধ্যে দিয়ে, যে, আর্মড স্ট্রাগলটা ডেভেলপ করল, সেটা কিন্তু হলনা।

ত্রিদিব।। যেমন, বাইরে থেকে আর কতটা জানা যায়, যেমন এপিসিএলসি একটা বিশাল ভূমিকা পালন করে চলছিল — যখন গ্রামে অত্যাচারটা নামছে, শহরে ওরা সেটা রেগুলার পৌঁছে দিচ্ছে।

তিমির।। পৌছে দিচ্ছে, অর্থাত, ভালো মত কানেকশন ছিল।

ত্রিদিব।। কলকাতায় কিন্তু এটা প্রায় হয়ই-নি। পৌঁছনো মানে আনন্দবাজার পৌঁছেছে, টাইমস অফ ইন্ডিয়া পৌঁছেছে। যে পৌঁছনো-টা তো য়্যাকচুয়ালি তোদের কাঙ্খিত কোনো পৌঁছনো নয়ও।

তিমির।। নয়। শহরে কাজটাকে ধারণ করবার মত সেই ফোর্স, বা, সেই কেপেবিলিটি-ও ছিলনা। সেই ইন্টেলেকচুয়াল কেপেবিলিটিও ছিলনা এখানে, ফোর্সের। সেই মোবিলাইজ করবার মত সেই দক্ষতা ছিলনা। প্রথম দিকে, তুমি দেখো, প্রথম দিকে, যে, একজন, একজনকে পাঠানো হয়েছিল, পার্টি একটা য়্যাসেস করে, যে লেভেলে পশ্চিম বাংলাকে ওরা, পশ্চিম বাংলার বিশেষ পরিস্থিতিকে ধরবার জন্য, যে ধরনের ইন্টেলেক্টটা দরকার আছে, আর পশ্চিম বাংলার যে হিস্টোরিকাল পোজিশন, মুভমেন্টের — প্লেনামে আমি তিনটে প্রশ্ন করেছিলাম — এটা খুব ভাইটাল দিক, তোমাকে সেটা বলতে ভুলে গেছি। তিনটে জায়গায়, য়্যানালিসিস করবার জন্য, আমি দেখাতে পেরেছিলাম। এক, যে, তুমি তেভাগা মুভমেন্টকে কী ভাবে ডিফাইন করো। দুই, সিক্সটিজ-এর পরবর্তী কালে, জমি দখলের লড়াই দু-ধরনের: এক, সিপিএমের দ্বারা, বর্ধমান হুগলি জমি দখল, দুই, নকশালবাড়িতে জমি দখল। দুটোর ক্যারেকটারিস্টিক্সে, একটা পলিটিকাল পাওয়ার সিজ করবার জন্য, আর একটা জমি দখল করে জমি ডিস্ট্রিবিউশন, অর্থাত, ইকনমিক স্ট্রাগল। একটা ইকনমিক স্ট্রাগল, একটা… দুটোকে কী ভাবে ডিফাইন করো?

ত্রিদিব।। মানে, তুই মিন করছিস, সাঁইবাড়িটা হল ইকনমিক স্ট্রাগল, আর, নকশালবাড়িটা…

তিমির।। হ্যাঁ, ইকনমিক স্ট্রাগল। কিন্তু, এই যে জমি বিলিবণ্টন হল, তার মধ্যে দিয়ে পাওয়ার স্ট্রাকচারের বদল হয়ে গেল কী রকম। অর্থাত, ইকনমিক স্ট্রাগলের মধ্যে পাওয়ার স্ট্রাকচার। বলছে, পাওয়ার স্ট্রাকচারের বদলটা কী রকম? যদি… আমি বলি, জমিদারতন্ত্র এখনো আছে, ফিউডাল আছে, ফিউড নেই, কিন্তু ফিউডালিজম আছে। এইটা যদি ধরে নিয়েও বলি, ফিউডালিজম একটা অবস্থা, একটা সোশিওইকনমিক কন্ডিশন, এটা যদি ধরেও নি, জমিদার যে চলে গেল, সেখানে কী রিপ্লেসড হল? জমিদারের বদলে, রিপ্লেসড-টা কী হল? জমি দখলের মধ্য দিয়ে, জমি দখলের মধ্যে, জমি যে বিলিবণ্টন হল, তার যে পাওয়ার ব্যালান্সটা হল, সেটা কী রকম ছিল? এটার পলিটিকাল এফেক্টটাই বা কী?

ত্রিদিব।। এই প্রশ্নগুলো তুই তুললি?

তিমির।। এই প্রশ্নগুলো তুললাম, যেগুলোর কোনো য়্যানসার ছিলনা, আরকি। পঞ্চায়েত, পঞ্চায়েতকে তুমি কী ভাবে ডিফাইন করবে? পঞ্চায়েত তো একটা পলিটিকাল পাওয়ার। ইফ ইট ইজ পার্ট অফ দি স্টেট, তাহলে, স্টেট গ্রাম পর্যন্ত পঞ্চায়েতের মাধ্যমে আছে, স্টেট তো কোনো লোকাল পাওয়ার নয়, তাহলে, লোকাল পাওয়ার সিজারের প্রশ্নটা পঞ্চায়েত দখলের মধ্যে দিয়ে, তো, আসতে পারেনা? পঞ্চায়েত দখলের মধ্যে দিয়েও আসতে পারেনা তোমার, এবং, পঞ্চায়েতকে মেরে দিয়ে তুমি একটা পাওয়ার কেন্দ্র তৈরি করলে, সেটাও সম্ভব নয়। কেননা, স্টেট তো কোনো লোকাল না, ওটা একটা সেন্ট্রালাইজড পাওয়ার সিস্টেম। তাহলে, তাকে কেন্দ্রীভূত করতে গেলে, এটা কী দরকার? এবং, থার্ডলি আমার কাছে যে স্ট্যাটিস্টিক্সগুলো ছিল, সেটা হচ্ছে ইকনমিক, সোশিও-ইকনমিক কন্ডিশনের, যে, বর্তমান অবস্থা, বর্তমান পরিস্থিতি। কত পরিমাণ জমি কার হাতে রয়েছে, কী ভাবে জমির কনসেনট্রেশন রয়েছে — জমি ডিস্ট্রিবিউট হওয়ার ফলে প্রোডাকশন ঝাড় খেয়েছে, এবং, সেখানে, প্রোডাকশনের অন্যান্য দিকগুলো, সেগুলো নিয়ে আমি, ওদেরকে পর পর সেই তথ্যগুলো দিলাম, এগুলোকে তুমি কী ভাবে ডিফাইন করো? যেগুলোর কিন্তু য়্যানসার নেই — কেউ য়্যানসার দেওয়ার চেষ্টাও করেনি। এবং বলেছে, এটার সার্চিং-ই দরকার আগে। ঠিক আছে? তবে, অর্থাত, একটা অংশ প্লেনামে আমরা গিয়ে দেখেছিলাম, যাদের মধ্যে একটা সার্চিং এখনো আছে…

ত্রিদিব।। এবার দেখ, এবার, আমার মনে হচ্ছে, একটু একটু করে আমার অংশ নেওয়া জরুরি হয়ে পড়ছে অনেক জায়গায়। তুই যে জায়গাটায় এনে, প্লেনামে এসে যে অভিজ্ঞতাটার কথা বললি, যে জায়গাটায় দাঁড়ালো। ধর, কয়েকটা বছরের একটা নিবিড়, অত্যন্ত কমিটেড একটা অভিজ্ঞতা তোর। সেই অভিজ্ঞতাটায় দাঁড়িয়ে, তুই এই গোটাটাকে কী ভাবে প্লেস করবি, যে, কেন — তুই যেখানটায় গিয়েছিলি, অন্তত তোর অভিজ্ঞতাটুকুর ভিত্তিতে, আমি তোকে জেনেরালাইজ করতে বলছি না, কারণ, কোনো জেনেরালাইজেশনই, আদৌ, সম্ভব কিনা, আমি জানিনা — তার ভিত্তিতে, তোর কী মনে হয়েছে, যে, কেন, কেন এই গোটা পিডব্লুজির এই যে জায়গাটা, মানে, তোর অভিজ্ঞতার সীমার মধ্যে, সেটা কেন ঘেঁটে গেল এইভাবে?

তিমির।। ঘেঁটে গেল বলতে — আমি যে জায়গাটায় ছিলাম, সেটায় তো সিপিএম পিপলস ওয়ারের আন্ডারস্ট্যান্ডিং ছিল না, সিপিএম আর পিপলস ওয়ার যেটা এখন করছে, সেটাই সিপিএম পিপলস ওয়ারের আন্ডারস্ট্যান্ডিং।

ত্রিদিব।। বুঝলাম না আমি তোর কথাটা…

তিমির।। ঘেঁটে যাওয়ার প্রশ্নটাই আমি বলছি। ঘেঁটে যাওয়ার প্রশ্নটা এখানে নেই। সিপিআইএমএল পিপলস ওয়ার, যে আন্ডারস্ট্যান্ডিং নিয়ে…

ত্রিদিব।। না, না। আমি ‘ঘেঁটে যাওয়া’ বলতে সেটা মিন-ই করিনি। আমি বলছি, যে, যে অভিজ্ঞতাটা ধর গত সাড়ে তিন ঘন্টা জুড়ে তুই আমার সামনে রাখছিস, সেই অভিজ্ঞতাটা শুনতে শুনতেই আমার বারবার এটা মনে হয়েছে, যে, একাধিক জায়গায় যা ঘটা উচিত ছিল সেটা ঘটল না, যা ঘটা উচিত ছিলনা সেটাই ঘটল — আমি এটাকেই ঘেঁটে যাওয়া বলছি। এবার, এইটার তোর মূল্যায়নটা কী? এই যে তোর অভিজ্ঞতাটা, তুই এটাকে কী বলবি? ধর, বাইরে থেকে দাঁড়িয়ে, একজন লোক তো বোঝবার চেষ্টা করছে, একটা কথা যেটা খুব কমপ্রিহেন্সিভলি সব সময় বলা হয়, যে, এই ছেলেপেলেগুলো সত। ঠিক আছে, আমি বুঝলাম। এটুকু আমি মানলাম। যে, এই আন্দোলনে, এই রাজনীতিতে, যে ছেলেপেলেগুলো থাকে, তারা সত। তা ঠিক আছে, তারপর কী? কেন? এই যে জায়গাটা।

তিমির।। সেটাই তো ভীষণ দরকার। যে, তারপর কী? শুধু একটা সত মানুষ হলেই তো সে কিছু করতে পারবে না।

ত্রিদিব।। একজ্যাক্টলি। আমি ঘেঁটে যাওয়া বলতে এটুকুই মিন করছি। রাজনৈতিক আন্দোলনটা ঘেঁটে যাওয়া। কারণ, কী — কোন জায়গা দাঁড়াল? শেষ অব্দি? কী ঘটল? শেষ অব্দি, তৃণমূল টোটালটা য়্যানিহিলেটেড হয়ে গেল ওই জায়গাটা থেকে, সিপিএম ঢুকল। এবং, সিপিএম, রৈ রৈ করে ঢুকল। সুশান্ত ঘোষ আজকে ওখানকার মহারাজা। বুদ্ধ কতটুকু পাওয়ার এনজয় করে পশ্চিমবঙ্গে? তার হাজারগুণ পাওয়ার সুশান্ত ঘোষ পশ্চিম মেদিনীপুরে এনজয় করে। এবার, এই যে জায়গাটা। এবং, যদ্দূর আমি শুনেছি, যে, এরা বোধহয়, ওই যে লোকগুলোকে মারা হয়েছে তোদের পক্ষ থেকে, তার থেকে খুব একটা পৃথক লোক-ও না। তাহলে, কেন এটা ঘটল? এটা তো ঘটার কথা ছিলনা। তোর মূল্যায়নটা কী?

তিমির।। মানে, আমার, যতটুকু পলিটিকাল জ্ঞান থেকে, যা আমি জানি, যে, এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলেও দেখার তো কোনো কারণ নেই…

ত্রিদিব।। গুড — দ্যাট ইজ দি পয়েন্ট — এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।

তিমির।। কেননা, এটা ঘটার ছিলই।

ত্রিদিব।। কেন ঘটার ছিল?

তিমির।। এবার, এটা থেকে কতটা এফেক্ট আমরা নিতে পেরেছি, কতটা…

ত্রিদিব।। ওটা পরের প্রশ্ন। কেন ঘটার ছিল, এই জায়গাটায় তোর রিডিং-টা তুই বল।

তিমির।। ঘটার ছিল-ই বলতে, কোনো মুভমেন্টই, যখন ইনিশিয়াল স্টেজে গড়ে ওঠে, সে তার সম্পূর্ণতা নিয়ে গড়ে উঠতে পারে না। এক নম্বর। দু নম্বর হচ্ছে, আমি যে সিচুয়েশন, যে পরিস্থিতির উপরে দাঁড়িয়ে লড়াইটা করছিলাম, মানে, যে ক্ষমতা আমার আছে, তার থেকে হাজার গুণ বেশি ক্ষমতা নিয়ে, স্টেট সেখানে প্রেজেন্ট আছে। তো, এই স্টেটের সঙ্গে প্রাইমারি ফেজের যে লড়াই, তাতে আমারই লস বেশি হবে, এবং, স্টেটের লস… এই লসটাকে স্ট্র্যাটেজিকালি আমাকে ঠিক করতে হবে, সেই লড়াই থেকে শিক্ষা নিয়ে, যে, আমার লসটাকে কমিয়ে, স্টেট বা ক্লাস এনিমি যে, তার লসটা বাড়ানো।

ত্রিদিব।। দাঁড়া। এইখানটায় একটা গ্যাপ রয়ে গেল। তুই যখন বললি, আমি ওই বাক্যটার মধ্যেই একটা গড়বড় পেলাম। কোনো আন্দোলনই যখন গড়ে ওঠে, তখন সেই আন্দোলন তার সম্পূর্ণতা নিয়ে গড়ে ওঠে না। ঠিক আছে?

তিমির।। আন্দোলন চলতে চলতে তার সম্পূর্ণতা পায়।

ত্রিদিব।। ঠিক। সেটা তো আমরা সবাই-ই জানি। এবার তাহলে, কোনো কোনো আন্দোলনকে আমরা অসফল আন্দোলন বলি, অসম্পূর্ণ আন্দোলন বলি, আর কোনো কোনো আন্দোলনকে আমরা সফল, সফলতাই এক অর্থে সম্পূর্ণতা, যে, যা অন্তত মানুষের, সাধারণ মানুষের, গরিব মেহনতি মানুষের, স্বার্থের পক্ষে, একটু হলেও, রাজনীতিটাকে স্পষ্টতর করল। এইরকম একটা জায়গাকেই আমি ‘সফল’ বলছি। তাহলে, এবার, সেই জায়গাটুকু এই আন্দোলনটায়, তোর এই গড়বেতার, তিন নম্বরের অভিজ্ঞতায়, ছিল কি ছিল-না?

তিমির।। গড়বেতার অভিজ্ঞতায়। তিন নম্বরের অভিজ্ঞতা তো হাইটের পয়েন্ট। ওটা হার্ট অফ দি গড়বেতা। বলা যায়।

ত্রিদিব।। ওই, একই। যেহেতু, তিন নম্বরের প্রসঙ্গটা এত বার এসেছে

তিমির।। এফেক্টিভলি এসেছে, এফেক্টিভলি আছে ওইখানে। একটা অদ্ভুত, এইরকম একটা এলাকা, বুঝলে, আমি বহু জায়গায়, আমি কাজ করেছি, গ্রামের বিভিন্ন জায়গায়, বিভিন্ন এলাকায়, মানে, বিভিন্ন ডিস্ট্রিক্টে, আমি দেখেছি, বিভিন্ন একটা জায়গা, একটা নির্দিষ্ট জায়গা, ডিফাইন করে দেয়, সেই জায়গার অবস্থা, সিচুয়েশনটা কী রকম থাকবে, কোন পলিটিকাল কম্পোজিশনে যাবে। পালপাড়া কোন দিকে আছে, সেটা দিয়ে, ঘোষপাড়া মিত্রপাড়া সব ঠিক হয়ে যাবে।

ত্রিদিব।। তুই গাল দিবি তো, ‘উত্তরাধুনিক’ বলে, ঠিক এটাই হল — ওই একটা ‘নোডাল সিগনিফায়ার’, একটা ‘নোডাল চিহ্ন’, গোটাটার একটা সিম্বলিক উপস্থিতি হয়ে দাঁড়ায়… হ্যাঁ, এবার বল।

তিমির।। হ্যাঁ, এটা তো ঘটেই। মেইন রোল পালন করে।

ত্রিদিব।। হ্যাঁ, যা বলছিলি, এবার তুই আমায় বল, তুই কী মনে করছিস? যে, ওই আন্দোলনটা এখনো একটা চলমানতার অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে, তাই, এটা বলা সম্ভব-ই না, যে, গড়বেতার অভিজ্ঞতাটা শেষ অব্দি একটা সফল আন্দোলন, না, অসফল আন্দোলন?

তিমির।। এটা কি তুমি এখনই বলে দিতে পারো নাকি? প্রথম কথা, সেটাকে ইউটিলাইজ করার…

ত্রিদিব।। তাহলে, তুই সেটাকে ছেড়ে এলি কেন?

তিমির।। আমি দেখলাম, ওটাকে ইউটিলাইজ করার জায়গাটা বোধহয় বন্ধ হয়ে গেল। সেটা ভুল হতে পারি, ঠিক হতে পারি, আমার য়্যানালিসিসের জায়গাটা এইরকম…

ত্রিদিব।। আমি তো তোকে ইউনিভার্সের পক্ষে দাঁড়িয়ে, মহান মানবতা, মহান সভ্যতার পক্ষে দাঁড়িয়ে, বলতে বলছি না। আমি তোর জায়গাটায় দাঁড়িয়ে, বলতে বলছি।

তিমির।। আমি তো আমার জায়গা, আমি তো আমার জায়গাটুকুই বলতে পারি…

ত্রিদিব।। একজ্যাক্টলি। তুই তাহলে, তোর জায়গাটায় দাঁড়িয়ে বল, তুই এটাকে যদি অসফল-ই না মনে করলি, তাহলে ছেড়ে বেরিয়ে এলি কেন?

তিমির।। আমি গড়বেতার যে স্ট্রাগলটা, সেটার মধ্যে যে কোনো রেজাল্ট ছিল না, বা, গড়বেতায়, প্রথমত, তৃণমূল কংগ্রেসকে যে পলিটিকালি, যে ভাবে থ্রাশ করা গিয়েছিল, সেটার মধ্যে কোনো সিগনিফিকান্ট দিক ছিল না, এটাও ঠিক মনে করিনা। আমার মনে হয়, ওখান থেকে, যথেষ্ট ভালো ভালো শিক্ষা নেওয়ার একটা, কতগুলো উপাদান ছিল। আমি যে ভাবে ঠিক করেছিলাম, যে পলিটিকাল টাস্কটা, যে ভাবে করলে, তার আউটপুটটা যতটা বেশি পাওয়া যেত… এরকমটা হতেই পারত, ধরা যাক, ইন ফ্যাক্ট, ধরো, যে ব্যাপারটা হয়েছে, যে, এই যে ছোট-আঙারিয়ায় আমি একটা মিলিটারি য়্যাকশন ঘটাতে গিয়ে, মানে একটা, য়্যানিহিলেশন, না, একটা য়্যাটাক করতে যাওয়া হয়েছিল, মিলিটারি য়্যাকশন ছেড়ে দাও, একটা য়্যাটাক করতে গেছিলাম, একটা আক্রমণ করে সিপিএমের কোনো একটা এলসি অফিসকে আক্রমণ করতে যাওয়া হয়েছিল, সেই এলসি অফিসটাকে আক্রমণ করতে গিয়ে, উল্টো রেজাল্ট বেরোলো। ঠিক আছে? পঞ্চায়েতে ভোটে দাঁড়িয়ে, সিমিলার ম্যাসাকার ঘটতে পারত। সিপিএম ভোটের প্রচারের সময় ঘিরে ধরে, গ্রুপ মিটিং-এর সময় গ্রুপ-এর যতগুলো লোক আছে তাদেরকে পেটাতে পারত, এবং, যারা মিটিং করছে, তাদেরকে য়্যানিহিলেট করতে পারত। এটা ঘটেই, ঘটতেই পারত। আমি বলছি, একটা মাস মুভমেন্টের মধ্যে দিয়ে আসা, আর একটা মাস-বিচ্ছিন্ন হয়ে একটা মিলিটারি য়্যাকশনের মধ্যে দিয়ে আসা…

ত্রিদিব।। একজ্যাক্টলি, আমার পয়েন্ট এইটাই।

তিমির।। এই দুটোর মধ্যেকার ডিফারেন্সে আমি মাস মুভমেন্টের মধ্যে দিয়ে আসা যে ম্যাসাকার, সেই ম্যাসাকারের অর্থটাকে, আরো মানুষের মধ্যে…

ত্রিদিব।। আমি সেটাকে বরং বলব — ফর্মেটিভ ম্যাসাকার।

তিমির।। যাতে, অনেক ডেফিনেশন, ডিফাইন্ড হতে পারে, ডিফাইন্ড হতে পারে, অর্থাত, আমি একটা সাহসের সঙ্গে লড়াইটা কর… যেটাকে, ওইখানে, মানুষের মধ্যে গেড়ে দেওয়া যায়।

ত্রিদিব।। আমি জানিনা, আমার প্রশ্নটাকে তুই ইচ্ছে করে য়্যাভয়েড করছিস কিনা…

তিমির।। না, না।

ত্রিদিব।। সেটা হল এই জায়গাটা, যে, ওখানটায় দাঁড়িয়ে, এই দুটো পসিবিলিটি-ই ছিল। তোর মাথায় এসেছিল, এবং, তোর মত নিশ্চয়ই, আরো কিছু লোকের মাথায় এসেছিল, যে, এইটা বেটার অলটারনেটিভ, এবং, আরো অন্য অনেক লোকের মাথায় এসেছিল, যে, না, মিলিটারিজম-টাই বেটার অলটারনেটিভ। তাহলে, এই জায়গাটা কেন গড়ে উঠল না? কেন, মিলিটারিজম-টাই শেষ অব্দি, প্রায় একমাত্র অপশান হয়ে দাঁড়াল? তুই কেন বোঝাতে পারলি না, ত্রু টিটা কোথায় ঘটল?

তিমির।। এইখানে তো, আমার প্রাইমারিলি মনে হয়েছিল, তার পরে আমার মনে হয়নি সেটাতে একমাত্র ঠিকটাই, মানে, আমার মনে হয়েছিল, যে, যে… য়্যাকচুয়ালি, সাকসেসটা যখন ছিল, তখন, যখন আমি ওই নামটা হয়ে উঠছি আরকি, তো, সেই জায়গাটায়, যে সময় আমি তৃণমূলকে হটিয়ে দিলাম আরকি, সেই সময় যত সহজে আমার পলিটিকাল যে য়্যানালিসিসটা, যে, সিপিএমের সঙ্গে কেন, সমঝোতা করতে হয়েছিল, ফর দি টাইম বিয়িং… মানে, প্রায়, সাকসেসের মধ্যে দিয়ে। ছোট-আঙারিয়া একটা গোটা আঘাত, যেটাকে ব্যর্থতা বলে দেখানো হল, প্রথম থেকে, কিন্তু, সেটাকে ব্যর্থতা হিশেবে দেখানো, এটা ঠিক হয়নি। মানে, গড়বেতার স্ট্রাগল, এবং, তার পরবর্তীকালে, ঝাপুরকে, হাইলাইট করা হয়েছিল। মানে, ঝাপুর, পাল্টা বদলা আরকি। বদলা নেওয়া হয়েছিল ছোট-আঙারিয়ার, বদলা হিশেবে দেখানো হয়েছিল। এই গোটাটার মধ্যেই কিছু একটা গরমিল রয়ে গেছে। ছোট-আঙারিয়া, ঘটতেই পারে, ছোট-আঙারিয়ার যে য়্যাকশনটা নেওয়া হয়েছিল, সে য়্যাকশনটা ঘটতেই পারে, বা, এইরকম, সে, হয়েই থাকে, তার ত্রু টিগুলো, যে ভাবে দেখা হয়েছিল, যে জায়গা থেকে তার রিকভারির জায়গাটাকে ভাবা হয়েছিল, সেখানে, হয়তো, আমার কনট্রিবিউশন খুব কম ছিল, কনট্রিবিউশন কম ছিল বলতে, আমি হয়তো সেই সময় প্রপারলি নিজেকে এক্সপ্রেস করতে পারিনি। একটা দিক তো, সেটাই। আমার তো সেটা মনেই হয়। আমার দিকটা একটা… আমিই ওই জায়গাটাকে য়্যানালিসিস করতে পারিনি, যেটা মাসের উপর ডিপেন্ডেন্ট স্টেজে, একটা প্রকৃত ছবি দেওয়া। আর একটা হয়েছে, আমাদের পার্টির মধ্যেকার, অর্থাত, যারা আর্মড স্ট্রাগল করছে, এই অংশের যে, অংশটা, তাদের মধ্যে একটা ডগম্যাটিজম থাকে। আর একটা দিক হয়েছে, তখন কিন্তু এপি-র স্ট্রাগল একটা বিরাট ক্রাইসিসের মধ্যে গিয়ে পড়েছিল। একটা… সিচুয়েশন আছে, ইন্ডিয়ান সিচুয়েশন, শুধু নয় যে নট অনলি ইন ওয়েস্ট বেঙ্গল…

ত্রিদিব।। সে তো বটেই, ভীষণ ওভারডিটারমিন্ড এগুলো সবই…

তিমির।। তোমাকে যে আমি পলিটিকাল দিকটার কথা, আমি এই মুহূর্তে বলব, ভীষণ ইম্পর্টান্ট যেটা — যে, করিমনগর, বা ওয়ারাঙ্গলের হিস্ট্রি এখন মুখে মুখে, মানে, ইন্টেলকচুয়ালি, ওয়েস্ট বেঙ্গলের ইন্টেলেক্টরা জানে, কী ভাবে সীতারামাইয়া এই মুভমেন্টকে, বা, রেভেলিউশনারি রাইটার্স ইন্টেলেকচুয়ালস ফোরাম কী ভাবে কাজ করেছিল, শহর অঞ্চলে কনসেনট্রেট করে, ইন্টেলেকচুয়ালদের মধ্যে জড় করে, নইলে কিন্তু এটা, শুরু কিন্তু এই। দুটো অর্গানাইজেশন, সেটা হচ্ছে, আরএসএ, রেভলিউশনারি স্টুডেন্টস য়্যাসোসিয়েশন, আর, রেভলিউশনারি রাইটারস য়্যান্ড ইনটেলেকচুয়ালস য়্যাসোসিয়েশন, আরডব্লুআইএ। এই দুটো অর্গানাইজেশনকে, যারা, সামিং আপ করল, ‘সামিং আপ অফ দি পাস্ট’ বলে একটা ভীষণ সুন্দর, ভীষণ সুন্দর ডকুমেন্ট, যার মধ্যে, চারু মজুমদারের, বলেছিলাম, বুরোক্র্যাটিক, সেইখানটাকে একটু চেঞ্জ করতে হয়েছিল, করতে বলা হয়েছিল। সেই, ‘সামিং আপ অফ দি পাস্ট’-টা তৈরি হয়েছিল…

ত্রিদিব।। চেঞ্জ করা হয়েছিল?

তিমির।। হুঁ? হ্যাঁ, চেঞ্জ করেছিল। তো, সেই ‘সামিং আপ অফ দি পাস্ট’ এই ডকুমেন্টটার উপরে বেস করে, কাজ গড়ে উঠল প্রথম। এবং, এটা অত্যন্ত অসাধারণ। সামিং আপ করা হল, গোটা সিক্সটিসেভেন থেকে সেভেন্টিটু-এর যে ইসেটা। এবং, সেখানের ভুলগুলো চিহ্নিত করে, সেগুলোকে রিকভার করার জন্যে, সেখানে পরিষ্কার ভাবে বলা হল, গণসংগ্রাম গণআন্দোলনকে, আমরা, ইগনোর করেছি। যেটা, ভীষণ রকম মারাত্মক হলে, জনগণের থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়াতেই আমাদের সমস্যা হয়েছে। আমরা বিভিন্ন কভার অর্গানাইজেশনকে ব্যবহার করতে পারিনি, আমরা আর্মড স্ট্রাগলের সঙ্গে গণআন্দোলনকে মেশাতে পারিনি, এগুলোকে খুব প্রপারলি চিহ্নিত করা হয়েছিল। এবং, ইলেকশন সম্পর্কে পরিষ্কার স্ট্যান্ড ছিল। ছিল যে, আমরা ভোট বয়কট, কী করব? ভারতবর্ষের জন্য, স্ট্র্যাটেজিকরা — চিরকালের জন্যই বয়কট হবে, কিন্তু, এটা একদম স্ট্র্যাটেজির পয়েন্ট। এরকম যদি কখনো সিচুয়েশন আসে, ফ্যাসিস্ট রাজত্ব কায়েম হয়ে যায়, যদি, ভারতবর্ষে, দেখা যায় যে, গোটাগুটি ভাবে ফ্যাসিস্ট রাজত্ব কায়েম হয় — যেটা য়্যানালিসিস হচ্ছে যে, ভারতবর্ষে গোটাগুটি কখনোই ফ্যাসিস্ট, গোটা ফ্যাসিস্ট রাজত্ব কায়েম হওয়া সম্ভব না…

ত্রিদিব।। ভৌগোলিক কারণেই সম্ভব না…

তিমির।। সভব নয়, কিন্তু, এটাই য়্যানালিসিস ছিল পার্টির। তাই, এখানে, কোনোদিনই আর ভোটে অংশগ্রহণ দরকার হবে না। কিন্তু, নির্দিষ্ট একটা প্রভিন্সে, এইটাকে ট্যালি করে দেখানো যায়, যে, নির্দিষ্ট একটা প্রভিন্সে, নির্দিষ্ট একটা, যেহেতু যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো…

ত্রিদিব।। ঠিক। তুই যখন ডকুমেন্টের কথা তুলছিলি, আমার ঠিক এইটা মনে হচ্ছে, যে, তাহলে, সিপিআইএমের সন্ত্রাসে, একটা জায়গায় তার একটা, ধরে নে কন্ডিশনাল ফ্যাসিজম, গ্রো করতেই পারে। আজকে পশ্চিমবঙ্গে যে আবহটা…

তিমির।। গুজরাটেও, একই। গুজরাটেও ফ্যাসিজম চলে, ধর্মীয় ফ্যাসিজম, এখানে পলিটিকাল ফ্যাসিজম, সোশাল ফ্যাসিজম। অর্থাত, সোসাইটির একটা পার্ট-কে, ফ্যাসিজম সোশাল ফ্যাসিজমের মধ্যে যে ডেফিনেশন, সোশাল ফ্যাসিজম, পিপলস ওয়ারের মধ্যে এই টার্মটা এসেছিল, আসলে সোসাইটি, একটা বড় পোর্শনের হেল্প ছাড়া, ফ্যাসিজম তো গড়েই উঠতে পারেনা। তাহলে, ফ্যাসিজমের প্রথম শর্ত হচ্ছে, সোসাইটির একটা বড় অংশের…

ত্রিদিব।। একটা বড় অংশের কনসেন্ট…

তিমির।। একটা কনসেন্ট আছে, একটা সাপোর্ট আছে। তো, সেইখানে দাঁড়িয়ে, যেটা বলার, সেটা হচ্ছে যে, হয়তো আমি এটাকে য়্যানালিসিস করতে পারিনি, কিন্তু, ওই যে জায়গাটা, অর্থাত, এপি-র মুভমেন্টটা, এবার যখন, সশস্ত্র সংগ্রামের রূপ নিচ্ছে, এবং, সশস্ত্র সংগ্রামের উপর ডিপেন্ড হয়ে পড়ছে, গণআন্দোলন, গণসংগ্রাম, এই যে তার আপলিফটমেন্টটা ঘটানো, এখানে একটা বড় ফ্যাক্টর হল, সেখানে দুটো মতামত এসেছিল, এই যে এই যে বিরাট সংখ্যক মাসের আমরা সমর্থন পাচ্ছি, এখানে, প্রথমে আমরা মিলিশিয়া তৈরি করব কিনা। তখন কিন্তু, একটা স্তর-তত্ত্বের জন্ম কিন্তু এখানে এসে যায়, যে, প্রথমেই মিলিশিয়া তৈরি করে আমরা টিকতে পারব না। আমরা ছোট ছোট স্কোয়াডে ভাগ করে, জনগণের কনশাসনেসকে আরো বাড়িয়ে তুলব। দেখা যাচ্ছে, যে, হিস্ট্রি প্রুভ করছে এখানে, যে, ছোট ছোট স্কোয়াড, তাপাঞ্চা নিয়ে মুভ করা শুরু হল, প্রচুর অর্গানাইজার লস হয়েছে এরকম, প্রচুর মারা গেছে, জমিদারদের হাতে মারা গেছে, জমিদারদের লেঠেলের হাতে, স্টেটের হাতে মারা গেছে, কিন্তু, কনটিনিউয়াস স্ট্রাগলটা চালিয়ে গেছে, এপি-র জন্য। কারণ, এপি-র মাস মুভমেন্টের বেসটা ছিল অত্যন্ত স্ট্রং। শহরাঞ্চলে ছাত্র সংগঠন, শিক্ষকদের সংগঠন, কর্মচারীদের সংগঠন, সবই স্ট্রং। বহু কর্মচারী, তারা চাকরি ছেড়ে দিয়ে বেরিয়ে এসেছিল। অর্থাত, সমস্ত জায়গা, মাস অর্গানাইজেশনের জায়গাটা কিন্তু খুব শক্তিশালী ছিল। যে, মাস অর্গানাইজেশন, দীর্ঘদিন যাবত, ওই অর্গানাইজেশনকে লড়াই দিতে সহায়তা করতে পেরেছে। এবং, কিন্তু, কী হয়েছিল, গ্রাম কমিটি তৈরি হয়েছিল, গ্রাম রাষ্ট্রীয় কমিটি, অর্থাত, গ্রাম রাষ্ট্রীয় কমিটি হচ্ছে যে পাওয়ার, সরকার, গভমেন্ট, তৈরি করা হয়েছিল। এরা স্ট্রাগল করতে, মাস, এর পরে যে রিপ্রেশনটা নামল, যে সশস্ত্র সংগ্রামটা শুরু হল, গোলাগুলির লড়াইটা, সেখানে কিন্তু মাস, আর্মস নিয়ে পারটিসিপেট করল না, বা রেজিস্টান্স প্রোগ্রামে আর্মস-এর ভূমিকা কী হল, সেটা কিন্তু ডিফাইন্ড রইল-না আর, কিছু পরিষ্কার হল না। দেখা গেল, ওইখান থেকে একটা য়্যাডভান্স সেকশন, যারা আর্মস-টা ধরল, স্কোয়াড বানাল, বড় স্কোয়াড হল, প্ল্যাটুন-ও হল, লড়াইটা হচ্ছে, একটা স্টেজে গিয়ে, জানো, ঘটনাটা যেটা ঘটছে, যে, জমিদার আর নেই, জমি ডিসট্রিবিউটেড হয়ে গেছে, এমনকি, নরসিমা রাওয়ের জমিও ডিসট্রিবিউটেড হয়ে গেছে। কংগ্রেস গভমেন্টের সময় নরসিমা রাওয়ের পাঁচশো বিঘা জমি দখল হয়েছে, এবং ডিসট্রিবিউটেড হয়েছে। ঠিক আছে? নরসিমা রাও তখন প্রধানমন্ত্রী। নরসিমা রাওয়ের জামাইয়ের নামে ছিল, ওটা নরসিমা রাওয়েরই জমি। নরসিমা রাও ওখানে হেলিকপ্টার করে নেমেছিল, তার জমি দখল হওয়ার পর। এবং, সেইখানে, সেই সময়ে, পিপলস ওয়ারের উপরে যে রিপ্রেশন, অর্থাত, ব্যান ঘোষণা করা, ও কংগ্রেস গভমেন্টটা উল্টে গেল আসলে, এনটি রামারাও ফিরে এল। এটা একটা, এটা… পলিটিকাল, অর্থাত, এপি-র পলিটিকাল, গোটা পলিটিকাল যে কর্মকাণ্ড, গোটা, মানে, পারলামেন্টারিয়ান হোক, অপারলামেন্টারিয়ান হোক, গোটাটাতেই একটা ভূমিকা আছে। অর্থাত, এদের একটা ক্ষমতা আছে, সে আছে। তার মানে, গোটাগুটি, সমাজের বিভিন্ন অঞ্চলে তার পেনিট্রেশন আছে…

ত্রিদিব।। চন্দ্রবাবুর উত্থানেও সেটা খুব স্পষ্ট। বা, এনটি রামারাও-এর উত্থান কখনো ওভাবে ঘটতেই পারে না, রিজিওনাল ক্যাপিটাল প্রথম তার আত্মঘোষণা করেছিল…

তিমির।। সে ঘোষণা করল, এবং, বলল যে, আমি ব্যান তুলে নেব। তেলেঙ্গানা রিজিয়নে, তুমি ভাবো, একটার পর একটা সিট এনটি রামারাও পেয়ে গেল। তেলেঙ্গানা রিজিয়ন দিয়ে এনটি রামারাও বেরিয়ে গেল। আর, হায়দ্রাবাদে তো এনটি রামারাওয়ের কিছু বেস ছিল-ই। তো, সেইখানে দাঁড়িয়ে, যেটা হল… একটা সময়ে গিয়ে দেখা যাচ্ছে, স্টেট-ও নেই, মানে, জমিদারের পাওয়ার নেই, আমাদের পাওয়ার-ও নেই। একটা এম্পটি স্পেস, কে আছে? কে আছে? যাকে আমি হটাতে পারছি না? যার জন্যে আমি ওখানে আমার পাওয়ার এস্টাবলিশ করতে পারছি না? লোকাল পাওয়ার সিজ হচ্ছে না। লোকাল পাওয়ার সিজ বলতে, অর্থাত, আমার গভমেন্ট, প্যারালাল গভমেন্ট যে রান করবে, আমার নতুন প্রোডাকশন সিস্টেমও যেখানে চালু হয়ে যাবে, যেখান থেকে গঠনটা শুরু হবে, তুমি যে স্টেপ করে নিয়েছ। যেখানে, আমার, পরবর্তী কালে, তখন আমার কিন্তু… এগুলো কিন্তু আমার পরবর্তী কালের রিয়ালাইজেশনে এসেছিল। এই রিয়ালাইজেশন ছিল, যে, এই প্রশ্নটা পার্টির মধ্যেই তুলেছিলেন, পলিটব্যুরোর মেম্বার এক জন, শ্যাম বলে, শ্যাম মহেশ মূরলী, যাকে কর্ণাটক থেকে তুলে নিয়ে, গুলি করে পুলিশ মেরে দিল, শ্যাম কিন্তু তখন য়্যারাইজ করছে। এই কোশ্চেন তুলেছে। মিলিটান্ট ইকনমিজম আমাদের ডমিনেট করছে, আমাদের পলিটিক্সকে। অর্থাত, আমি বন্দুক ধরেছি…

ত্রিদিব।। উত্তর গোদাবরী সম্পর্কে আমার অনেকবারই এই কথাটা, বাইরে থেকে, আমি তো সব সময়েই খবরের কাগজ পড়ে যা দেখছি, সেখান থেকেই… মানে, এর শেষ কোথায়?

তিমির।। অর্থাত, পলিটিকাল পাওয়ার সিজ হয়নি।

ত্রিদিব।। ঠিক।

তিমির।। এবং, হচ্ছে-ও না। আমি জমিদার হটিয়ে দেওয়ার পরেও হচ্ছে না। তার মানে, এইখানে আমাদের য়্যানালিসিস পরিষ্কার ভাবে তার পরে এল, তার মানে… এখানে, স্টেট। দিস ইজ দি স্টেট, তার স্ট্রং প্রেজেন্স রয়েছে সমস্ত কিছুর ক্ষেত্রে। এবং, সে হচ্ছে পিতার মত, সেন্ট্রালি, সে ছায়ার মত এদেরকে…

ত্রিদিব।। এবং, সে একটা পকেটকে য়্যালাউ করতেই পারে, সেই পিতা, একটা অন্যরকমত্বকে।

তিমির।। একটা পকেটকেও য়্যালাউ করবে না, মাওয়িস্টদের। নট এ সিঙ্গল পকেট। বিহারের কোনো একটা পকেট য়্যালাউ করতে পারে, যার কোনো এফেক্ট নেই। কিন্তু, সেন্ট্রাল অন্ধ্রের, মানে, কোস্টাল রিজিয়ন, ওয়েস্ট বেঙ্গল, উত্তর প্রদেশের উত্তর পূর্ব দিক, না, উত্তর পশ্চিম দিক, হ্যাঁ, বা, নর্থ ইস্ট সেকশন, যেটা গোটা, গোটাগুটি ভাবে ভারতবর্ষের সামাজিক অর্থনৈতিক অবস্থার উপর প্রভাব ফেলতে পারে, এরকম একটা জায়গাতেও, একটা জায়গাতেও, স্টেট য়্যালাউ করবে না। নট এ সিঙ্গল স্পেস। পাবে। তুমি অবুঝমারে পেতে পারো, অবুঝমারেও দিচ্ছে না এখন স্পেস। অবুঝমার মধ্যপ্রদেশের সবচেয়ে অন্ধকারাচ্ছন্ন জায়গা, যেখানে, প্রায়, বহু গ্রাম আছে, যেখানে… এত জঙ্গল, জঙ্গলের জন্য, ঠান্ডার জন্য না, মানে উচ্চতার কারণে নয়, হিমালয়ের কাছাকাছি এরকম যেন নয়, চার থেকে পাঁচ ঘন্টা রোদ দেখা যায়। সকাল দশটা থেকে বিকেল তিনটে পর্যন্ত। তার পরে, বাকি সময়, অন্ধকার। এত গভীর অন্ধকার। জঙ্গলটা। শোনা, আমি দেখিনি, কিন্তু, শুনেছি। সেইখানে গিয়ে তুমি গেরিলা জোন বানাতে পারো, তা, এটাকে ভাঙা হল, জাস্ট মিলিটারি কোশ্চেনে, গেরিলা এরিয়া, নট গেরিলা জোন। সে হয়ত খুব ছোট্ট একটা এরিয়া, তিন মাসের জন্য সেটা গেরিলাদের এরিয়া থাকবে, তিন মাস বাদে সেটা শিফট হয়ে যাবে। অর্থাত, ওইখানে কিছু ট্রেনিং প্রোগ্রাম, ক্লাস ফ্লাস, এরকম করে, পুরো পাহাড়টাকে ঘিরে দিয়ে, ওই গ্রামগুলোর দিকে, খাদ্য টাদ্য সংগ্রহ করে, আবার শিফট করে যাবে। এবং, ক্রমাগত এটাকে রেজিস্টান্সটার জন্য, অর্থাত, নাইন্টিটুয়ে মিলিশিয়া ফর্ম করা উচিত ছিল, এটা ভুল হয়েছে, বলে, নাইন্টিসিক্সে, প্ল্যাটুন ফর্মেশনের জায়গায় গেল। প্ল্যাটুন ফর্মেশনের জায়গা তো, মিলিশিয়া, অর্থাত, মিলিটারিলি আমরা আরো য়্যাডভান্সড স্টেজে যাওয়ার দরকার ছিল, এটার পলিটিকাল ফেজ কী, সেটাকে য়্যানালিসিস না-করে, আমি এই ভাবে য়্যানালিসিসটা করতে শুরু করলাম যখন, তখন আমার পলিটব্যুরো থেকে সেন্ট্রাল কমিটি, সবাই একটু মিলিটারি কোশ্চেনে বগড হয়ে গেল। হ্যাঁ?

ত্রিদিব।। কী হয়ে গেল?

তিমির।। মিলিটারি কোশ্চেনে বগড হয়ে গেল। মিলিটারিলি ফেস করার জায়গাটায় চলে এল। অর্থাত, উন্নত অস্ত্র — এগুলোর দরকার নেই তা না, উন্নত অস্ত্র ছাড়া লস কমানো খুব মুশকিল। মানে, আজকের স্টেট যে ভাবে ইকুইপড, তার টেকনোলজিকাল য়্যাডভান্সমেন্টকে তুমি তো অস্বীকার করতে পারো না, সেইখানে তো, তুমি যদি কিছুটা মাত্রায়-ও ইকুইপড না হও, হ্যাঁ? তুমি আর আমি মিলে যুদ্ধ করছি, তুমি যদি আমার শক্তিশালী, তুমি যদি আমার থেকে শক্তি, তুমি-ই জিতবে। আমি যদি তোমার থেকে শক্তিশালী হই, তুমি, আমিই জিতব। তা, আমার শক্তিশালী হয়ে ওঠার প্রশ্নটা তো রয়েছে। তো, সেটাকে অস্বীকার করা যায়না। কিন্তু, এটাকে য়্যানালাইজড হল না, স্টেটকে ফেস করবার আর কোন কোন দিক আছে? জনগণকে, জনযুদ্ধে অংশগ্রহণ করানো, আর কী কী ভূমিকা আছে, সেটা কিন্তু পরিষ্কার হবে না। ইকনমিজম দিয়ে, মানে, বলছি ইকনমিজম, অর্থাত, জমি পাইয়ে দেওয়ার লড়াইটা কিন্তু ইকনমিজম। জমি পাইয়ে দেওয়ার লড়াইটা, তাই বলে করব না, তা নয়। কিন্তু, সেটাকে পলিটিকাল স্ট্রাগলের জায়গায় নিতে গেলে, কী কী স্টেপ যাওয়ার দরকার ছিল আর, সেইটা কিন্তু ডিফাইন্ড রইল না। আর একটা ব্যাপার একটু মাথায় রাখা দরকার, সমস্ত বিপ্লবীদের, তুমি জনযুদ্ধ করো আর যাই করো, বিপ্লবী সিচুয়েশন থাকতেই পারে। কিন্তু, কোনো একটা জায়গার, যদি, ক্রাইসিসটা চূড়ান্ত জায়গায় না-পৌঁছয়, অর্থাত, ভাঙ্গার জন্যেও তো একটা কন্ডিশন লাগে। আমি চাইলেই তো এই বোতলটাকে ভেঙ্গে ফেলতে পারিনা। তো, সেইখানে, বোতলটা ভাঙ্গার মত জায়গাটায় পৌঁছলেই তো আমি ভেঙ্গে ফেলতে পারি। হ্যাঁ? একটা শক্তপোক্ত জিনিস আছে, সেটা ভাঙ্গার মত অবস্থায় নেই, তুমি বাইরে থেকে যদি মনে করো, যে… তুমি অনুঘটকের কাজ করতে পারো, ভাঙ্গার প্রসেসটাকে চালু করতে পারো, কিন্তু, তার জন্যে তোমাকে সময় দিতে হবে। সে যখন শেষ অবস্থায় ভেঙ্গে পড়ছে, সেটাই হচ্ছে ক্রাইসিস। সেই সময়টা তোমাকে দিতে হবে। সেই সময়টা তুমি তৈরি করতে পারো না। ঠিক আছে? তাই, বিপ্লবের জন্ম তো হয়, পুরোনো সমাজব্যবস্থার মধ্যেই। সেই সমাজব্যবস্থাটার মধ্যেই সেটা তৈরি হয়, সেই সম্ভাবনাগুলো সব থেকে যায়। এবং, সম্ভাবনাগুলো বাড়তে থাকে। সম্ভাবনাগুলোকে বিপ্লবীদের ধরতে হয়, এবং, তাকে প্রপারলি য়্যানালিসিস করতে হয়, এবং, সঠিক জায়গায়, সঠিক জায়গার বিষয়টা, ট্যাকটিক্সটাকে ইমপ্লিমেন্ট করতে হয়। এইটা যতক্ষণ পর্যন্ত না-হয়, ততদিন বিপ্লব অধরাই থেকে যাবে।

ত্রিদিব।। আচ্ছা, একদম ভিন্ন ভাবে ভাবা যাক। বোধহয় এর আগে এই কথাটা তোর কাছে একাধিক বার আমি উল্লেখও করেছি, যে, ধর, একটা নির্দিষ্ট দূরত্ব অব্দি, স্টেট জানে যে সব জায়গায় সে ডেভেলপমেন্ট পৌঁছতে পারছে না, এবং, পারবে-ও না। ওই যে রকম, ঠিক যে যুক্তিতে আমরা বললাম, যে, ভারতবর্ষের ভূগোল-ই বলে দেয়, গোটা রাষ্ট্র জুড়ে তার পক্ষে কখনো ফ্যাসিস্ট হওয়া সম্ভব না। সেরকম, স্টেট যদি একটা জায়গায় জানে, যে, অনেকগুলো পকেটে সে ডেভেলপমেন্ট পৌঁছে দিতে পারছে না, এবং, দৃশ্যমান ভবিষ্যতে সে পারবে না, তখন, সেখানে তৈরি হওয়া নিজস্ব ভ্যারিয়েবলগুলোকে, কেন সে য়্যালাউ করবে না? কখনোই তো মিলিটান্ট পলিটিক্সগুলো তৈরি হতে পারে না সেখানের নিজস্ব ভ্যারিয়েবলকে ছাড়া। জঙ্গলকে ছাড়া, পাহাড়কে ছাড়া, ওই যে অর্থে তুই ওই সেগুলোকে পারস্পেক্টিভ জোন বলছিস, গেরিলা জোন বলছিস, গেরিলা এরিয়া হিশেবে শিফট করে যাওয়ার কথা বলছিস, ওরকম কিছু জোন ছাড়া, একটা ভয়ঙ্কর অত্যাচার এবং নিপীড়নের বাতাবরণ ছাড়া, এই পলিটিক্সগুলো তৈরি হতে পারে না। তাহলে, সেখানে, স্টেট, বরং কেন য়্যালাউ করবে না? ওই বোকা ইগো মধ্যযুগের স্টেটের হত, যে, কেন তাকে মানবে না। এখন সে জানে, দু-একটা পকেটে তাকে না-মানলেও তার মান্যতার ক্ষতি হয়না। তার পক্ষে অনেক ইকুয়েশন সলভ করা বরং অনেক সহজ হবে। সে জানে, এই পকেটগুলো ভৌগোলিক ভাবে নির্দিষ্ট কতকগুলো জায়গায়। বরং, খুব বেশি বেড়ে যেতে চাইলে, তখন তাকে একটু সমঝে দেবে। যেমন, পশ্চিমবঙ্গে দিল। খুব বেশি কোথাও বেড়ে গেলে, দরকার হলে সে স্টেট টেরর নামাবে। নয়তো, অনেকটা দূর অব্দি সে রাখবে, কারণ, তার বহু কিছুকে সলভ করতে সুবিধা হবে। একটা পারস্পেক্টিভ ভেবে দেখ, সোভিয়েত রাশিয়া বাতাস থেকে অন্তর্হিত হয়ে গিয়ে, মানে আর সোভিয়েত না-থেকে, আমেরিকাকে একটা প্রচণ্ড দুঃস্বপ্ন দিয়েছে। আমেরিকা আজকে কোনো কিছুকে র‌্যাশনালাইজ করতে পারছে না। তার ইকুয়েশন সলভ করার ওই নিগেটিভ এন্টিটি-টা নেই। ঠিক সেই রকম যদি জায়গা হয়, স্টেট তো অনেক দূর অব্দি রাখতে চাইবে পিপলস ওয়ার গ্রুপকে, এই ধরনের মিলিটান্ট গ্রুপকে। কিছুদিন একটা জিনিসকে বাড়তে দেবে, তারপর লোকের সামনে দেখিয়ে দেবে, দেখো, এইটা থেকে এই হয়। আবার ফেরত এসো, জিরো স্টেট-এ। অনেক কিছু করার যুক্তি দেখাতে পারবে সে, সফটওয়ার বা অস্ত্র কেনা বেচা, সেখান থেকে মন্ত্রীদের কাট মানি। কোন কোন পকেটে এসব হচ্ছে, সেখান থেকে সে সবচেয়ে বেশি ভালো করে জানতে পারবে, কোথায় ডেভেলপমেন্টটা সবচেয়ে জরুরি। মাঝে মধ্যে কোনো পকেটকে শাসন করে নিজের মাহাত্ম প্রমাণ করবে, বুদ্ধর পালে তো মাওয়িস্ট শায়েস্তা একটা ভাল হাওয়া। তোদের আন্দোলনগুলোকে, ওই ধরনের আন্দোলনগুলোকে, কেন তুই এই জাতের ফ্লাকচুয়েশন বলবি না? শেষ অব্দি এই আন্দোলন অন্ধ্রকে কী কনট্রিবিউট করছে? শেষ অব্দি ভারতবর্ষের স্টেটকে এই মিলিটান্ট লেফট পলিটিক্সগুলো কী কনট্রিবিউট করছে?

তিমির।। মানে, আমার যতদূর মনে হয়, সেটা হচ্ছে যে, এই কনক্লুশনে পৌঁছনোর আগেও, আমাদের কিছুটা সময় দেওয়া উচিত। কী রকম ব্যাপারটা, আমি তোমায় বলি। শুধুমাত্র ভারতবর্ষ তো ব্যাপারটা নয়। পৃথিবীর ইতিহাস বলেও তো একটা ব্যাপার আছে। এবং, তার সঙ্গে তো, আমরা পৃথিবীর ইতিহাস, আমরা যদি দেখি, তার সঙ্গে তো, বিভিন্ন ভৌগোলিক কাঠামো নির্বিশেষেই আরকি, বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন ভাবে মুভমেন্টগুলো গড়ে উঠেছে। এবং, তা, অনেক সফলতাও অর্জন করেছে। চিনে বিপ্লব হয়েছে, সোভিয়েত ইউনিয়নে বিপ্লব হয়েছে। দুটোর জায়গা তো, দুটোর দুরকম ছিল। এরকমটা নয়, যে, সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপ্লব ধার করে চিনে বিপ্লব সম্ভব হয়েছিল। তো, সেটাও, সেখানেও স্টেট ছিল। ইভেন, স্টেট পাওয়ারে, কখনো কখনো, এরাও অংশগ্রহণ করেছিল। এরকমটা নয় যে… লেনিন তো অংশগ্রহণ করেই ছিল পারলামেন্টে। তো, সেখানে, বিপ্লব সফল হতে পেরেছিল, তাই, বিপ্লব যে হবে না, এটা তো বলা যায় না। বিপ্লব হয়েছে। আর বিপ্লব হবে না, এরকমটা তো, বলে দেওয়া যায় কি? এরকম ভাবে বলে দেওয়া যায় না। তো, আমার সেরকমটা মনে হয়না। বিপ্লব… হতেই… আমার যতদূর বিশ্বাস, সেটাতে, মনে হয়, বিপ্লবকে, বিপ্লব হতেই হবে। পরিবর্তন আসতেই হবে। পৃথিবী জুড়েই পরিবর্তন আসতে হবে। আদারওয়াইজ, যদি পরিবর্তন, সময়ের সাথে সাথে তুমি যদি সমাজব্যবস্থা সহ তোমাকে, আমাকে, নিজেকে, পরিবর্তন না-করি, তাহলে তো, আমার অস্তিত্বেরই সঙ্কট হবে, পৃথিবীটাতেই একটা আইডেন্টিটি ক্রাইসিসের জায়গায় এসে পৌঁছবে। এই আইডেন্টিটি ক্রাইসিসের… আমার তত্ত্বায়ন তো কোনো রকম ভাবেই, পৃথিবী, বা জনজাতি, আমাদের যে ভবিষ্যত, তাকে তো আইডেন্টিটি ক্রাইসিসের মধ্যে ফেলতে পারে, এরকমটা তো না। তাহলে তো আমাকে বার করতেই হবে, যে, এই পরিবর্তনের পক্ষে, আমি কী ভাবে কাজ করতে পারি।

ত্রিদিব।। একটু আগে যে কথাগুলো বলছিলি, ওইখানে, পশ্চিম মেদিনীপুরে দাঁড়িয়ে, তোর মনে হয়েছিল, ভোটে দাঁড়ানোটাই একটা লড়াই। আমি এই জায়গাটাকে খুব স্পষ্ট ফিল করতে পারছিলাম। যেমন আমি নিজে এ বছরে ফিল করেছি, আমি এই যে সিপিএমকে এবার ভোট দিইনি, ভোটটা নষ্ট করে এসেছি, এই কথাটা বলতে গিয়ে, আমার, কলকাতায় দাঁড়িয়ে, একটা ভয় লাগছে। অতয়েব, ওখানে, ওই সিপিএমী সন্ত্রাস কী হতে পারে, আমি ফিল করতে পারি। যেখানে দাঁড়িয়ে, ইভেন, ভোটে দাঁড়ানোটাই একটা লড়াই। এই লড়াইটাকে আমি বুঝতে পারছি। এই লড়াইটা করতে গিয়েই, লড়াইটাকে আরো বাড়াতে গিয়ে, পাল্টা পাওয়ার জন্ম দিতে গিয়ে, তুমি যাদের যাদের তৈরি করছ, পুরো ইতিহাসে তার কি প্রত্যেকটাই ফ্রাংকেনস্টাইন হয়নি? যতটা সফল ভাবে করতে পেরেছ, ততটা সফল ফ্রাংকেনস্টাইন?

তিমির।। এরকম ভাবে দেখলে হবে না, পৃথিবীর ইতিহাস যদি ধরা যায়, তাহলে, বলা যায়, গোটা পৃথিবী জুড়ে যে আন্দোলন বা সংগ্রামের প্রশ্নটা এসেছে, আজকে, একটা জিনিস দেখতে হবে, ক্যাপিটালিজম এসেছিল ফিউডালিজম-কে কনট্রাডিক্ট করে। ফিউডালিজমকে তাকে ধ্বংস করতে হয়েছিল। একটা সময় পর্যন্ত, তার পরে ক্যাপিটালিজমের উদ্দেশ্য কখনোই, জনগণের মুক্তি ছিল না। কিন্তু, এটা ঘটনা, যে, ক্যাপিটালিজম, বা, পুঁজিবাদের যে উত্থান, সেই উত্থানের ভিত্তি ছিল প্রোগ্রেসিভ। সায়েন্স। কিন্তু, তার যে শক্তি, সেই শক্তি সামন্ততন্ত্রের ছিল না। যে থিওরেটিকাল বেস বা যে তত্ত্বায়নের উপরে দাঁড়িয়ে সে এগিয়েছিল, তার সঙ্গে যে সংগ্রামটা, সেই সংগ্রামটা সামন্ততন্ত্রের সঙ্গে সংগ্রামের থেকে অনেক বেশি তীব্র, অনেক বেশি সময়সাপেক্ষ, এবং, তার জন্য, ধৈর্য ধরতে হয়।

ত্রিদিব।। তার মানে, আর এক ভাবে বলতে গেলে, বদলটা হয়েছিল, সময়ের সাথে মিলে গেছিল বলে। কিন্তু, কে বেশি বড় মনস্টার ছিল, কে বেশি বড় দানব ছিল, সামন্ত না পুঁজি, সেটা…

তিমির।। সেটা, সেটার কথা বলছি না কিন্তু… আমি বলছি, সেই সময়ের, সেই সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে, যে স্ট্রং ভিত্তির ব্যাপার, যে একটা বিপ্লব করে, যে একটা বিপ্লব করে ক্ষমতা দখলের মধ্যে দিয়ে আসে, তার বিপ্লব সম্পর্কে অভিজ্ঞতা থাকবেই। তার সেই য়্যানালিসিস থাকবেই। তাই, নতুন আর একটা বিপ্লবকে ঠেকাবার জন্য তার চিন্তা ভাবনা কৌশল অনেক বেশি দক্ষ হবে। দেখো, সাম্রাজ্যবাদী শক্তি বলতে যদি এরকম ভাবা হয়, দেশ দখল, যদি অর্থনৈতিক প্রশ্নটাকে বাদ দিয়ে ভাবো, শুধু রাজনৈতিক প্রশ্নে নাও, তাহলে, ব্রিটিশরা যখন বাজার দখলের জন্য একটার পর একটা দেশ দখল করছিল, তখন, তার রাজা —  এই জায়গাটাকে রেখে দিয়েছে। সেটা কিন্তু একটা পুঁজিবাদী রাষ্ট্র। তার সঙ্গে, পুরোনো ফিউডাল সোসাইটির সঙ্গে কোনো ডিফারেন্স পাওয়া যায় না। তো, পার্থক্যটা এইখানে হয়, সাম্রাজ্যবাদের যখন তার অর্থনৈতিক জায়গাটাকে, জায়গাটা আসে, সে, এই জায়গা কিন্তু, এই থাকার জায়গা থেকে কিন্তু, রুট খুঁজে পেয়েছিল। তার ওয়েল-ইকুইপড জায়গাটাকে দিয়ে, সে তার বাজারটাকে দখল করবার জন্য বিভিন্ন দেশকে খোলা ময়দান পেয়ে গেছিল। কিন্তু, এটা বলতেই হবে, যে, মার্ক্সের মত লোকও এই বিভ্রান্তির মধ্যে পৌঁছেছিল, যে, ব্রিটিশ শাসন ভারতবর্ষের ক্ষেত্রে এক ধরনের আশীর্বাদ। কেননা, ওটা পুঁজির ডেভেলপমেন্ট ঘটাতে সাহায্য করেছে…

ত্রিদিব।। আমরা ক্রমে জটিল একটা জায়গায় চলে যাচ্ছি। আমি বলছিলাম যে, সাম্রাজ্যবাদ নিজেই একটা বায়োডাইভার্সিটি চাইবে কিনা। একটা পুঁজির সাম্রাজ্যের মধ্যে আমরা বসবাস করছি। তার নিজস্ব চরিত্র, সে কখন একটা স্টেটের চরিত্রকে কতটা পরিমাণ বদলাতে চাইবে এবং চাইবে-না, সেটাও বদলাচ্ছে। সে নিজেই কি একটা বায়োডাইভার্সিটি চাইতে পারে? জিনের ক্ষেত্রে যেটা সত্যি, মানুষের জিনের ক্ষেত্রে যত ডাইভার্সিটি থাকবে, বিভিন্ন ধরনের রোগের বিরুদ্ধে লড়ার ক্ষমতা এবং সম্ভাবনা তত বেঁচে থাকবে। প্রজাতির যত ডাইভার্সিটি থাকবে, তত, য়্যাজ এ হোল প্রাণীকুলের, প্রাণের, বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়বে। সেরকম, সামাজিক ভাবেও, পুঁজি ও সাম্রাজ্যবাদ কি একটা সামাজিক বায়োডাইভার্সিটি চাইতে পারে? অর্থাত, একটু একটু মিলিটান্ট লেফট পলিটিক্স থাকুক, কোথাও কোথাও একটু না-মিলিটান্ট সিপিএম গোছের চামচাবাজি থাকুক, এরকম সবটাই? তাতে তার ব্যবস্থা হিশেবে টিকে থাকার সম্ভাবনাটাই বাড়বে? এটাই — ঠিক আছে? এবার, বরং, আমার মনে হয়, তার চেয়ে অনেক ইম্পর্টান্ট একটা জায়গা, যেটা না-হলে, যেরকম আমাদের প্ল্যান আছে, যে, এই বারের এই বসার থেকে যে মেটেরিয়ালগুলো তৈরি হবে, সেগুলো নিয়ে আমরা পরে আবার বসব, সেই কাজটা খুব অসুবিধাজনক হয়ে দাঁড়াবে, সেটা হল, বদলাতে থাকা কৃষি। তোর রাজনীতির কারণে, তোর একটা অদ্ভুত রেয়ার অভিজ্ঞতা তৈরি হয়েছে, যে অভিজ্ঞতা আমার পরিচিত পরিজনদের মধ্যে, যাদের আমি চিনি, আর কারোরই নেই, সেটা হল, জ্যান্ত রকমে, একটা গ্রামে, বেশ নিপীড়িত, বেশ দরিদ্র একটা গ্রামাঞ্চলে, একদম অর্থনৈতিক কিছু বদলে সরাসরি অংশগ্রহণ। তুই ওই অভিজ্ঞতাগুলো বল। ধর, কৃষির যে বদলটা তুই দেখছিলি চোখের সামনে। কৃষির মধ্যে সারপ্লাস তৈরি হওয়ার এবং সারপ্লাস বণ্টনের প্রক্রিয়াগুলোর যে বদল। তার সঙ্গে, একদম সরাসরি, মার্কিনী বা অন্য সাম্রাজ্যবাদী যে টেকনোলজিগুলো আসছে, যেমন বীজ, রাসায়নিক সার, যেমন পেস্টিসাইড, এগুলোর ভিত্তিতে জমি, জমির চরিত্র, এবং তার সঙ্গে সঙ্গে জমি থেকে উৎপাদিত উদ্বৃত্তের বণ্টনের চরিত্র কী ভাবে বদলাচ্ছিল, সেটা যতটা পারিস বল। যতটা ডিটেইলস-এ পারিস।

তিমির।। হ্যাঁ, সেটা তো বলছি। সেই জায়গাটা বলছি, কিন্তু, তোমার ওই জায়গার কথাটা না, এবার আমি বলে নিতে চাইছি। আমার মাথায় এটা এল বলে, প্রশ্নটা, প্রশ্নটা বলছিলে না তুমি, যে, স্টেটই কিছুটা রেলিশ করছে এদেরকে, মানে, কিছুটা বাড়তে দিচ্ছে, স্টেটের স্বার্থেই, যাতে ওটাকে দেখিয়ে সে অন্য ক্রাইসিসগুলো থামাতে — তার মানে, ক্রাইসিসটা তো চিরন্তন। ক্রাইসিসটা আছে স্টেটে, এবং, স্টেট সেই ক্রাইসিসটাকে ভয় পায়। এবং, কিসের জন্য ভয় পায়? সে জানে, ওটাকে আমি সলভ করতে পারব না, যে কোনো মুহূর্তে সেটা গণবিদ্রোহের জায়গা নেবে।

ত্রিদিব।। এই অব্দি কিন্তু তোর আর আমার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। এই ক্রাইসিসটা চলবেই…

তিমির।। আমি সেটা বলছিলাম তোমাকে, এই ক্রাইসিসটা সেই জায়গাটায় পৌঁছতে হবে, ক্রাইসিসটা রয়েছেই। ক্রাইসিসটা যে জায়গাটায় পৌঁছনোর কথা আরকি, যেটা রেভলিউশনারি ক্রাইসিস বলা হচ্ছে, যেখান থেকে বিপ্লবটা, একটা, জন্ম নেয়…

ত্রিদিব।। এবার, আমার কী মনে হচ্ছে বল তো? কোনো দিনই ওই টারমিনাল জায়গাটায় আর পৌঁছবেই না হয়তো। কেন, দেখ। হেগেল এক ভাবে, ক্যাপিটালিজমের মধ্যেই দেখেছিল মানবসভ্যতার চূড়ান্ত মুক্তি। একটা এলডোরাডো। সেই সোনার দেশ, যা কোনো দিন খুঁজে পাওয়া যায় না। মার্ক্স দেখাল, যে, ওটা একটা বাজে স্বপ্ন, বাজে সাম্য, ওর মধ্যে কী করে অসাম্য লুকিয়ে আছে। মার্ক্স আবার দেখল, আর একটা স্বপ্ন, আর একটা ফ্যান্টাসি। মাতৃগর্ভের আরামে ফিরে যাওয়ার ফ্যান্টাসি — সমাজতন্ত্র হয়ে সাম্যবাদ। সেখানটায় পৌঁছলে সব শেষ, সব কনট্রাডিকশন শেষ — টারমিনাস। হেগেলের টারমিনাসকে মার্ক্স আর একটু দূরে পৌঁছে দিলেন। তার চেয়ে, টারমিনাস নেই এটা মেনে নিতে ক্ষতি কী? যদি এমনকি এটা হয়ও, যে, শেষ অব্দি কোনো একটা নিবিড় ভবিতব্য আছে, পৃথিবী শেষ অব্দি খুব সাম্যমান হবে, অন্তত আশু ভবিষ্যতে, দৃশ্যমান ভবিষ্যতে সেরকম কোনো সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছি না। তার চেয়ে, এটা মেনে নিতে অসুবিধা কী, যে, এই পরিস্থিতিটাই চলবে, এই টানাপোড়েনটা। স্টেট এই টানাপোড়েনকে এক ভাবে ফেস করছে, লড়াই-ও এক ভাবে ফেস করছে। ক্রাইসিসটা যে আছে, এটা নিয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই। ক্রাইসিস আছে, তাকে, আমি কী ভাবে ফেস করব? এবং, এটা তো আমি সত্যিই মনে করি, যে, প্রত্যেকটা ভায়োলেন্স যা আমি ঘটাব, সেটা আমাকেও বদলে দিতে থাকবে, নিজের উপরে ফিরে আসবে। তুই যখন বলেছিলি, হাজার হাজার লাখ লাখ মানুষ, আমি বলেছিলাম, লাখ লাখ মানুষ যদি জড় হয়, তাহলে, তার মধ্যে একটা ট্রুথ থাকে, নইলে হয় না। এবং, এই লাখ লাখ মানুষ, বেশির ভাগ মানুষ, যেখানটায় গিয়ে মিলবে, সেখানটার মধ্যে একটা জায়গা থাকবে। সেই ডেমোক্র্যাটিক ট্রুথটাকে যতটুকু পারো তুমি তুলে আনো। সেটাকে জায়গা করে দেওয়ার চেষ্টা করো। কোনো শেষ নেই, খুঁজে এবং লড়াই করে চলো, ক্রাইসিসটাই বোধহয় চিরন্তন।

তিমির।। কোয়ালিটি, কোয়ালিটির প্রশ্নটাও এখানটায় থাকে। তুমি একশো মানুষের মধ্যে সেই ভায়েবিলিটিটা পেতে পারো, অর্থাত, সেই স্ট্রাগলটা, একশো মানুষ যেটা শুরু করছে, প্রথম জমায়েতের মধ্যে দিয়ে, তার সেই ভায়েবিলিটিটা আছে, লাখো মানুষকে জমায়েত করার। এবার, এরকমটা হতে পারে, একটা পাওয়ার স্ট্রাকচারে, একটা পাওয়ার গেমে, লাখ মানুষ এসে জমায়েত হতে পারে, সেটার ভবিষ্যত হচ্ছে অন্ধকার, সেটা গিয়ে একটা মানুষকেও কোনো দিন সার্ভ করবে না। এটা একটা…

ত্রিদিব।। কিন্তু, এটা কি অস্বীকার করা যায়, যে, ওই মুহূর্তে, ওই লাখ মানুষের বেদনাটা একটা ট্যানজিবল জায়গা পেয়েছিল বলেই ওই লাখ মানুষ একত্রিত হয়েছিল?

তিমির।। হয়েছিল। হয়েছিল, কিন্তু, সেটাকে দিয়ে তুমি ফিউচারের কোশ্চেনটাকে তো ডিফাইন করতে পারো না? তাহলে, তাহলে তুমি একটা তাৎক্ষনিকতাকে তুমি ধরছ, সেটা কিন্তু তাৎক্ষনিকতা।

ত্রিদিব।। তার মানে — ফিউচারের একটা একমুখিনতাকে তুই ধরে নিচ্ছিস।

তিমির।। কেন, ফিউচারের একমুখিনতা কেন? আমি যদি ফিউচারটাকেই যদি, ফিউচারটাকেই যদি প্রধান জায়গায় না-নিয়ে আসি, তাহলে, আমি কিসের জন্য লড়ছি? আমার লড়াটা কিসের জন্য?

ত্রিদিব।। আমি লড়ছি — আমার জীবন তুমি সুস্থ ভাবে আমায় বাঁচতে দিচ্ছ না। ক্রাইসিসটা কোথায়? বেশির ভাগ মানুষকে সুস্থ ভাবে বাঁচতে দিচ্ছে না এই স্টেট…

তিমির।। তার মানে তো, আমি বাঁচতে চাইছি। এবং, সেটাই তো আমার ভবিষ্যত যে, আমি বাঁচতে চাইছি এবং বাঁচব-ও। এই বাঁচার জায়গাটাকেই প্রথমে তো, ডিফাইন করতে হবে তাহলে। তুমি সোশালিজম ধরলে না, তুমি কমিউনিজম ধরলে না, তুমি আজকে রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে নেপালের লড়াইকে দেখলে, যে, রাজতন্ত্র তারা চাইছে না। তারা ডেমোক্র্যাসি চাইছে। তারা তো কমিউনিজম চায়নি, তারা ডেমোক্র্যাসি চাইছে। দিস ইজ দা — মানে, এটাই তো কমিউনিজমের দিকে যাওয়ার একটা ধাপ হতে পারে, বা, কমিউনিজমটাকে বাদ দিয়ে ধরলে, এটা তো মানুষের মুক্তির জন্য একটা রাস্তা বেছে নিচ্ছে — তুমি দেখো, লড়াইয়ের ধরনের কতগুলো গুণগত জায়গা তুমি যদি দেখো, যে, পুরোনো জায়গায় ফিরে আসছে, আজকের ন্যাশনালিটির যে স্ট্রাগলগুলো আছে, জাতিসত্তার যে সংগ্রাম, এই সংগ্রামে তো গুণগত… বস্তুগত ভাবে এটা তো বুর্জোয়া সংগ্রাম, বুর্জোয়া সংগ্রাম। কিন্তু সেই সংগ্রামেও মানুষকে ফিরে আসতে হয়েছে। তার মানে, সেই সংগ্রামও আজকে, গোটা পৃথিবী জুড়ে, কমপ্লিট হয়নি। হয়নি। এই সংগ্রামের যে…

ত্রিদিব।। এই যে কমপ্লিট হবেই কোনো এক দিন, এইটা মনে করছিস। আমি বলছি, তা যদি কোনোদিন না-ই হয়, সম্পূর্ণ অন্য কোনো একটা পথে এগোলো — কী পথ আমরা আগে থেকে জানিনা, অন্তত এইটুকু জানি, যে, আমার বাঁচতে গেলে, এগোতে হবে। নেপালের রাজতন্ত্র আমাকে, এই মুহূর্তে, আমি যে ভাবে ভাবি, যে ভাবে বাঁচতে চাই, সেখানে কিছু পেইনকে জেনারেট করছে। এসো, আমরা পেইনটাকে য়্যানিহিলেট করার চেষ্টা করি। যখনি বলছিস, সামনে — এই যে একটা একমুখিনতা, যেই তুই কমিউনিজমকে পোজিট করবি, কমিউনিজম হয়ে দাঁড়াচ্ছে একটা একমাত্র গোল। ফিউচারের ইনফাইনাইট পসিবিলিটিস, সেটাকে একটা জায়গায় নামিয়ে আনা। অন্তত একটা জিনিস দেখ, এই নামিয়ে আনার ফলগুলো কী ফলেছে তো দেখেছি আমরা। পৃথিবী জুড়ে। ওই মূর্তিগুলো, সমাজতান্ত্রিক দেশের নায়কদের, যার অনেকগুলো লোক আমাদের কাছে একটা ভয়ঙ্কর শ্রদ্ধার জায়গা বহন করে, লেনিনের মূর্তিটা ফেলে, তার উপরে মানুষ উঠে পেচ্ছাপ করছে। এই যে সিচুয়েশনটা আমরা দেখেছি, এই সিচুয়েশনটা কোন কারণ থেকে এল? কোনো একটা জায়গাকে পোজিট করা। যেই তুমি সামনে একটা গোলকে পোজিট করবে, সবকিছু ওটার রেস্পেক্টে ডিফাইন করবে। তার চেয়ে এসো না, এইটুকু বলো, যে, আমার পেইন আছে, পেইনটাকে আমি সরানোর চেষ্টা করছি। কারণ, এটা মানুষের প্রাকৃতিক প্রবণতা। যেখানটায় তার ব্যথা লাগে, সেখান থেকে সে হাত সরিয়ে নেয়। এই ভাবে সে ডিফাইন করে…

তিমির।। কী ভাবে করবে?

ত্রিদিব।। যে ভাবে করলে সবচেয়ে ফলপ্রসূ হয়।

তিমির।। সেটাই তো তোমাকে বার করতে হবে  — যেভাবে করলে সেটা সবচেয়ে ফলপ্রসূ হবে।

ত্রিদিব।। না। এটা তুই দেখ, আবার সেই একটা প্রেসক্রিপশন, একটা ফরমুলা খোঁজার চেষ্টা করছিস।

তিমির।। না, আমি করছি না। আমি যদি বলি, আমি ধরেই নিচ্ছি-না, ধরেই নিচ্ছি-না যে এটা কমিউনিজম, বা, এটা সোশালিজম, বা, এটা সোশালিস্ট পার্টি, এটা কমিউনিস্ট পার্টি, হ্যাঁ, যে, তারা ঠিকা নিয়ে বসে আছে পেইন রিলিফ করার। হতেই পারে, সেটা অন্য একটা কিছু। হতেই পারে সেটা অন্য একটা কিছু। হ্যাঁ? মানুষ তার নিজের পথকে দেখে নেয় কিন্তু। মানে, অনিন্দ্য-র সেই লেখাটায়, আনন্দবাজারে অনিন্দ্য-র সেই লেখাটায়, অনিন্দ্য একটা, কিছু লাইন লিখেছিল। যে, আজকে, নেপালের মানুষ ঠিক করে দিয়েছে, নেপালের পলিটিকাল পার্টিগুলো তাদের সাথে থাকবে, কি, থাকবে-না। তাহলে, মানুষ তাকে দেখিয়ে দেয়, মানুষ মুভমেন্টে অংশগ্রহণ করে। কিন্তু, কিন্তু, এইখানেই বার বার ইতিহাসে, মানুষের আন্দোলনগুলো অনেক জায়গাতেই, শেষ হয়ে গেছে, বা, সেইখান থেকে আর উঠে দাঁড়ায়-নি, যখন সেটা নির্দিষ্ট কোনো একটা গোলে পৌঁছতে পারেনি। প্রচণ্ড বিক্ষোভ তৈরি হয়েছে, ধরা যাক, য়্যামেরিকায় কম বিক্ষোভ হয়নি। মাস মুভমেন্ট যদি দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি মানুষের পারটিসিপেশন, সেটা য়্যামেরিকাতেই বেশি হয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়নে, এত মাস মুভমেন্টে পারটিসিপেশন ঘটেছিল, এরকম হয়নি।

ত্রিদিব।। আচ্ছা, সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপ্লবটাকে কি তুই সার্থক আন্দোলন বলবি, না, অসফল আন্দোলন বলবি?

তিমির।। বিপ্লবটা তো সার্থক-ই। বিপ্লবটা তো সার্থক-ই। তার থেকে অনেক কিছু শিক্ষা নেওয়া যায়।

ত্রিদিব।। তাহলে, একটা সার্থক আন্দোলন কেন ওই রকম একটা ভুল দিকে কমিউনিস্ট পার্টিকে নিয়ে গেল, যে, কয়েক বছরের মধ্যেই, লেনিনকে অব্দি নিহত হতে হল? ট্রটস্কিকে পালাতে হল? ওই রকম টেরর নামিয়ে আনল স্তালিন?

(এইখানে তৃতীয় ক্যাসেটের প্রথম দিক শেষ হল)

তিমির।। যেটা আমি বলছিলাম সেটা হচ্ছে, লেনিনকে স্ট্যালিন হত্যা করেছিল, সেটা তো, সেটার অথেনটিসিটি…

ত্রিদিব।। না, না, আর, সেটা আমি বলিও-নি…

তিমির।। সেন্ট তো এরকম ভাবেই পেয়ে যাবে মানুষ ? কিন্তু। মানুষ একেবারে… যেটা আমি বলতে চাইছিলাম, যে, স্ট্যালিনের ব্রুটালিটির প্রশ্নটা, ইতিহাসে বারবার এসেছে, এবং সেক্ষেত্রে তুমি একটা জিনিস দেখো, সেই সময়ে, গঠনে, একটা জিনিস, শুধু মাত্র ওয়ার্লড-ওয়ার দিয়ে না, স্ট্যালিনের আভ্যন্তরীণ যে, মানে, পপুলারিটি আরকি, জনগণের মধ্যে যে জনপ্রিয়তা, সেটা ছিল, টুয়েন্টিনাইনে, মানে, একটা, আফটার সেভেন্টিন আরকি, একটা বিরাট দুর্ভিক্ষের সম্মুখীন হয়েছিল…

ত্রিদিব।। শোন, এই প্রসঙ্গটাতে, আবার আমি বলছি, আমরা আবার অনেকটা দূরে চলে যাচ্ছি। নিজেদের মধ্যে আলোচনাটা তো আমরা করতেই পারব, যেটা জরুরি জায়গা, যে, অনেকগুলো অবজারভেশন, ওই সময়ে তুই সুযোগ পেয়েছিলি একদম সত্যি গ্রামাঞ্চলে একটা জ্যান্ত ল্যাবরেটরির মধ্যে ব্যাপারটাকে দেখতে পাওয়ার। সেখানে, ঠিক কী ধরনের বদল তুই দেখছিলি? ধর, গ্রামের প্রপার্টি রিলেশনস, সেখান থেকে উদ্বৃত্ত তৈরি হওয়া, তার ডিসট্রিবিউশন, এই গোটাটা। যেমন, ওই যে, তৃণমূল যখন ঢুকল, বা, পরে, সিপিএম যখন ফিরে এল, এই গোটা সময়টা জুড়ে, কৃষি কী ভাবে বদলাচ্ছিল? এইগুলো নিয়ে, যতটা পারিস, বলতো।

তিমির।। কৃষি তখন বদলে গেছে আসলে। আমি যখন দেখছি, তখন কৃষির অবস্থাটা বদলে গেছে। কী রকম বদলে গেছে? তাহলে, আমার কাছে তো, সমস্তটাই তো আমি চোখে দেখেছিলাম, এইটিটু থেকে আমি দেখে আসছি, এরকমটা নয়। আমার কাছে যে স্ট্যাটিস্টিক্সটা ছিল, আমি ধরো এক জন বড় কৃষকের কাছ থেকে, এরকম পর পর বেশ কিছু বড় কৃষকের কাছ থেকে, তার উত্পা‌দনের যে ইতিহাস নিয়েছি। তাতে দেখা গেছে, প্রথম কথা হচ্ছে, তেভাগার পরবর্তী কালে, তিন ভাগের যে প্রশ্নটা, অনেক জায়গাতেই ইমপ্লিমেন্ট হচ্ছিল। জমি দখলের প্রশ্নটা বর্তমান। পশ্চিম মেদিনীপুরের যে গোটা অংশ, সেখানে কোনো তেভাগা হয়নি। কোনো জমি দখল সেরকম ভাবে, অর্গানাইজড ওয়েতে হয়নি। সিপিআই রাজত্ব করত প্রথম দিকে। সিপিআই বাধ্য হয়েছিল ওখানে জমি দখল করতে, সিপিএমের ধাক্কায়। প্রথম শুরু করেছিল কিন্তু সিপিআই। কিন্তু, সিপিআই যখন, সেভেন্টিটু-এ, সেভেন্টিটু-এর আগে, সেভেন্টিটু-এ যে কংগ্রেসের সঙ্গে যাচ্ছে, ঠিক আছে, কংগ্রেসের সঙ্গে যাচ্ছে, সেই কংগ্রেসের সঙ্গেই আছে জমিদাররা, এই হাওয়ায়, সিপিএমকে, সিপিএম তখন খুব হাতে গোনা যায়, সিপিএম মাইক নিয়ে প্রচার করতে এলে, গ্রাম থেকে লোকজন এসে পিটিয়ে তাড়িয়ে দিয়েছে, এরকম ঘটনাও ঘটেছে, কিন্তু ওই ধাক্কায়, ওই বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায়রা ঢুকে গেল, হাওয়া হয়ে গেল আরকি। সিপিআই হাওয়া হয়ে গেল। সরোজ রায় হাওয়া হয়ে গেল। সিপিএম ঢুকতে শুরু করল, এবং জমি দখল। এবং, সেভেন্টিটু-এর পর, সেভেন্টিসেভেনে যখন আসছে, আসলে সেই সময়ে, জমি দখলটা সেভেন্টিসেভেনের পরবর্তীতে হয়, স্বতস্ফূর্ত ভাবে, কী রকম — সেভেন্টিসেভেনে যখন বামফ্রন্ট আসছে, এর মধ্যে সাঁইবাড়ির ঘটনা ঘটে গেছে, বর্ধমানে প্রচুর জমি দখল হয়ে গেছে, হুগলিতে জমি দখল হয়েছে, জমি ডিসট্রিবিউশন হয়েছে। তা, এই ইকনমিক লড়াইটা, পলিটিকাল রূপ না-দিয়েই, অর্থনৈতিক লড়াইটা কিন্তু, সংগ্রামটা কিন্তু সিপিএম চালিয়েছে। এবং, এই ধাক্কায় কিন্তু, বহু জায়গায়, এমনিতেই জমি দখল হয়ে গেল। এবং, বহু জমিদার কিন্তু পালিয়ে গেছিল সেই সময়ে, পশ্চিম মেদিনীপুরের ইতিহাসে… তার মানে, জমি পেয়েছিল মানুষ, ডিসট্রিবিউশন হয়েছিল। এই ধাক্কায়, যারা সিপিএম করত, তারা বেশ কিছু জমি দখল করেছে, বা, কোনো ভালো লিডারও ছিল, সেই সময়ে, বিজয় মাল বলে এক জন ছিলেন, মাল সম্প্রদায়ের। সে এই সময়ে জমি দখলের নেতৃত্ব দিয়েছিল সেরকম… জমিদাররাও গুলিগালা চালায়, তারাই। তবে, সেই ধরনের রেজিস্টান্স-ই আর, সেভেন্টিসেভেনের পরে, জমিদাররা কখনো গড়ে তুলতে পারেনি। হ্যাঁ? কিন্তু, সেটা অন্য ভাবে কমপেনসেট হয়ে গেছে। ধীরে ধীরে জমি দখল হয়েছে, দ্রুত হয়নি, কিছুটা জমি রেখে দেওয়া হয়েছে, পুরো জমি দখল করা হয়নি, স্বতস্ফূর্ততাকে কিন্তু কনট্রোল করে দিয়েছিল সিপিএম। স্পনটেনিয়াসলি যদি এগোত, সমস্ত স্টেটকেই, সমস্ত সেন্ট্রাল পাওয়ারকেই, এই স্পনটেনিটিকে কনট্রোল করতে হয়। হুঁ? তেমনি, তুমি দেখো, যে, এইটা কনট্রোল করে দিয়েছিল পাওয়ার দিয়েই, একটা জায়গায় গিয়ে, এটাকে স্টপ করেও ছিল। জমিগুলো রাষ্ট্র রাষ্ট্রের হাতে নিয়ে এসেছিল। খুব ধীরে ধীরে, খাসজমি বিলিবণ্টন শুরু হয়েছিল। এবং, খাসজমি বিলিবণ্টন হওয়ার মধ্যে থেকে তাকে অর্গানাইজড শেপ দেওয়া হয়, এই দেখো, তোমাকে দিলাম, এই দেখো, আমি করছি, এইটা একটা প্রোপাগান্ডা, একটা পলিটিকাল, অর্থাত, ভোটের যে পলিটিকাল ইশু, ইলেকশন তো একটা পলিটিকাল কোশ্চেন, সেই ইলেকশন কোশ্চেন, এটা কিন্তু পলিটিকাল গোল, ওটা হচ্ছে তার পলিটিকাল দিক। অর্থাত, এই ইকনমিক স্ট্রাগলটাকে সে একটা পলিটিকাল শেপ দিতে পারল, নিয়ে গেল কিন্তু। কোথায়? না, ভোটে। নির্বাচনে জেতার মধ্যে দিয়ে। এবং, এইটিটু-য়ে সে আরো বেশি করে এল। মনে আছে, এইটিটু-য়ে সবচেয়ে বড় জয়? তো, এইখানে দাঁড়িয়ে, তুমি এইগুলো দেখো, চেঞ্জেস গুলো — তুমি জমি দখল ছাড়া, চেঞ্জেস তুমি দেখতে পারবে না।

ত্রিদিব।। কিন্তু, যেখানটায় আমি আনতে চাইছি তোকে, সেটা হল, ওই যে নতুন ধাঁচে ক্যাপিটাল — নতুন ধরনের টেকনিক, নতুন টেকনোলজি, তার সঙ্গে একটা নতুন রকমে, আন্তর্জাতিক ভাবেই একটা নতুন ধরনের পোস্টকোলোনিয়াল কোলোনিয়ালিজম তৈরি হচ্ছে, একদম আধুনিক যুগের আর এক রকমের উপনিবেশ, সেই জায়গাটায়।

তিমির।। আসছি, দেখো। তুমি যে টেকনোলজি, এই যে টেকনোলজির, ক্যাপিটালের — এইখানে, এক ধরনের বিরোধিতা করে এক দল, যে, ক্যাপিটালিজম ওখানে আছে, তো, ওখানে টেকনোলজিকাল ডেভেলপমেন্ট কোথায় ঘটেছে? এখনো তো হাল-বলদ দিয়েই চাষ করে? এখনো তো লেবার ইন্টেন্সিভ। আসলে, ব্যাপারটা তা না। ক্যাপিটাল কী ভাবে ঢুকেছে, দেখো। হাল-বলদ দিয়ে চাষ করল, সেইখানে, ধরো তোমার তিন বিঘা জমি আছে। তুমি হাল-বলদ দিয়ে চাষ করছো তো, তুমি, তিন বিঘা জমি আছে। তুমি জমিতে চাষ করছ, সেইখানে, পাওয়ার টিলার ইউজ করতে পারো বড় জোর। তাও দরকার হয়না তো। পাওয়ার টিলার, বা, ওখানে ট্র্যাক্টর, একটা জমি যখন খণ্ড খণ্ড…

ত্রিদিব।। পাওয়ার টিলার মানে?

তিমির।। পাওয়ার টিলার বলতে, পাওয়ার মানে তেল দিয়ে, পাওয়ার স্টার্ট করে, জেনারেট করে, পাওয়ার এসে, সেটাকে ঘ্যারঘ্যার ঘ্যারঘ্যার করে, হাতে, হাত দিয়ে…

ত্রিদিব।। টেনে নিয়ে যায়, ও। তাড়াতাড়ি হয়। সেদিনই একটি ছেলের কথা শুনলাম, ক্ষেতে এটা চালাতে গিয়ে, য়্যাকসিডেন্ট হয়েছে, নিজে ওটার উপর পড়ে গেছিল… ঠিক আছে, তুই বল।

তিমির।। তা, পাওয়ার টিলার, পাওয়ার টিলার, বা, ট্র্যাক্টর তো ইউজ করার কোনো প্রশ্নই নেই। পশ্চিম বাংলায় জমি যে ভাবে ডিসট্রিবিউটেড হয়ে গেছে, তার রেজাল্টে প্রোডাকশন সিস্টেম কমেছে, বলছে, প্রোডাক্টিভিটি কমে গেছে। মানে, অনেকেই এই তত্ত্বের ধারক ও বাহক। মানে, বিদেশী সংস্থাগুলোর তত্ত্ব অনুযায়ী। মানে, ওরা যা বলছে…

ত্রিদিব।। ছোট ছোট জোতে ভাগ হয়ে গেছে — ট্র্যাক্টর ব্যবহার…

তিমির।। ছোট ছোট জোতে ভাগ হয়ে যাওয়ার ফলে উত্পাদন কম হয়ে গেছে। হ্যাঁ, ব্যবহার করা যাচ্ছেনা, বা, ওটা ইসে করা যাচ্ছে না, তার জন্য… এটা একটা স্টেপ। ভারতবর্ষের মত দেশে ডাইরেক্টলি পুঁজিবাদ সেই ভাবে ইমপ্লিমেন্ট কৃষিতে হয়েছিল পাঞ্জাব ফাঞ্জাবের কিছু ক্ষেত্রে হয়েছিল, সব জায়গাতে এটা হয়নি। পশ্চিম বাংলায় একটা নতুন রূপে ক্যাপিটালিজম আসছে। ওটা একটা স্টেপ। স্টেপটা কী রকম? ডিসট্রিবিউটেড জমি, এই দিকটাকে কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। যে, আমি, অমুক, তোমার মানে তমুকের জমিতে খাটতে যাই, খেটে কুড়ি টাকা মজুরি পাই, আর, এক কাহন চাল পাই। বা, পাঁচ টাকা মজুরি পাই, এক কাহন চাল পাই। আমি সকাল আটটার সময় জয়েন করি, চারটি বিড়ি খাই, এবং, যতক্ষণ ইচ্ছে করে না, অনিচ্ছা সত্ত্বেও কাজ করি। আমাকে কাজ করিয়ে নেওয়া হয়। এবার, আমি যখন জমিটা পেলাম, ওই সম্পদটা আমার, আমি ফসল ফলাব, সেখানে যে আমি এফর্টটা দিলাম, দুটোর মধ্যে ডিফারেন্স হল। কৃষিকাজ — ক্ষেতমজুর জানে না এরকমটা তো নয়, সে-ই তো করে কাজটা। এতে, প্রাথমিক ভাবে, প্রাথমিক ভাবে যেটা হয়েছিল, সেটা কিন্তু, উত্পা‌দনের পরিমাণ বেড়েই ছিল। প্রোডাক্টিভিটি বেড়েই ছিল, কমেনি কিন্তু। জমি ভাগ হওয়ার মধ্যে দিয়ে প্রোডাকশন কমে গেছিল, এরকমটা নয়। তার কারণটা হচ্ছে, তোমাকে আমি বলি, যে, ধরো, একটা জমিদার, তার পাঁচশো বিঘা জমি আছে। অথচ, সেখানে কৃষিকাজ হতে পারে, এরকম দেড়শো থেকে দুশো বিঘা জমি, স্রেফ অনাবাদি ফেলে রাখত জমিদাররা। অনাবাদি ফেলে রাখত। যে ভাবে আমি গম জ্বালিয়ে দিই, অতি উত্পা‌দন হলে গম পুড়িয়ে দিই। ঠিক এই সিস্টেমটা কিন্তু জমিদারদেরও ছিল। এরকমটা নয়, অনাবাদি পড়ে থাকে, হেলাফেলায়। তো, সেইখানে দাঁড়িয়ে, সেইটা যখন ডিসট্রিবিউটেড হয়ে গেল, তাহলে, আমার গোটা জমিটাই কিন্তু আমার আবাদের মধ্যে চলে এসেছে। এমনকি, অনেক জমি, মানে, জমিদাররা যেটা করেছিল, যেগুলো অনাবাদি, যেগুলো ভালো জমি না, সেগুলো প্রথম ডিসট্রিবিউট করেছিল, এরকমও হয়েছিল, তাড়াতাড়ি ডিসট্রিবিউট করে, নিজের দোষস্খালন করে, যে, আমি এই জমি দিয়ে দিলাম, ওই জমি দিয়ে দিলাম, করে রেজিস্ট করার চেষ্টা করেছিল। সেই মুসোলিনির কথা, যখন তোমার হান্ড্রেড পারসেন্ট-ই চলে যাচ্ছে, তখন তুমি ফরটি পারসেন্ট ছেড়ে দাও, সিক্সটি পারসেন্ট রইল।

ত্রিদিব।। মুসোলিনি কেন বাবা? সর্বনাশে সমুত্পন্নে অর্ধং ত্যজতি পণ্ডিতঃ।

তিমির।। গীতা, না?

ত্রিদিব।। গীতা না। কোথার শ্লোক কে জানে? পঞ্চতণ্ত্র বা চাণক্য হতে পারে।

তিমির।। তা, সেইরকম থিওরিও নিয়েছিল। বিভিন্ন জমিদার বিভিন্ন থিওরি নিয়েছিল। তা, বিভিন্ন থিওরি অনুযায়ী আবার সেই ধরনের য়্যাডজাস্টমেন্ট-ও এসেছিল। দর-কষাকষিও এসেছিল। বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন ভাবে দর-কষাকষি এসেছিল। তা, সব জায়গাতে না হলেও, জেনারেলি যেটা হয়েছিল, যে, জমি ডিসট্রিবিউশন কিছুটা পর্যন্ত হয়েছিল। ফরটি পারসেন্ট হলেও হয়েছিল। তারপরেও যে পপুলেশন ছিল, সেটাতে, সমস্ত জমি বিলিবণ্টন করেও, ক্ষেতমজুর কমিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। কেননা, উদ্বৃত্ত মজুর থাকবেই। এটা ফিউডালিজম দিয়ে শর্ত ঠিক হয়না, ইমপিরিয়ালিজম এই শর্ত সারা দেশের জন্য তৈরি করে দিয়েছিল, যে, উদ্বৃত্ত শ্রম থাকবেই। উদ্বৃত্ত শ্রমকে তুমি বাদ দিতে পারো না। তো, উদ্বৃত্ত শ্রম রয়ে গেল। সেটাই তো ক্ষেতমজুর। জমি যদি আরো বণ্টন — ভাঙ্গি, তাহলে যে উত্পাদন বাড়বে, আর কোনো গ্যারান্টি নেই। এখন যতটুকু উত্পাদন হয়ে গেছে… এখন হার্ডলি আমি, আমার দেখা, আশি বিঘা জমির মালিক দেখেছি। এবার, সেই আশি বিঘা জমির মালিকের কিন্তু চার জন মালিকানা আছে। ঘটনা। রাধাগোবিন্দ গড়াই। ঠিক আছে? গোয়ালতোড়ের পাথরপাড়ায় রাধাগোবিন্দ গড়াই। তার নিকটবর্তী অঞ্চলে সবচেয়ে বড় জমির মালিক, তার হচ্ছে আশি বিঘা জমি।

ত্রিদিব।। কী ভাবে রেখেছে, আশি বিঘা?

তিমির।। তার খাস জমি আছে বলছে পঁচিশ বিঘা। এবার শোনো, আমি ওটাকে বলছি, ওটা আশি বিঘা জমি নয়। আমি বলছি, তার খাস জমি পঁচিশ বিঘা মানে, জমি বণ্টন হয়নি, সিপিএমকে পয়সা দিয়ে সে এটা রাখতে পেরেছে। আমি বলছি, তার জেনারেশনে, যে আশি বিঘা জমির যে মূল্য, আজকের জেনারেশনে, সেই আশি বিঘা জমি সেই মূল্য রাখেনা। সে বেচে দিয়ে, কিছু টাকা করে নিতে চায়। সে ক্যাপিটালে ট্রান্সফর্ম করতে চায়, অর্থাত, ক্যাশ, লিকুইড ক্যাশে। সেটা কোথায় সে ইনভেস্ট করে? কেন করে? বা, সেটা রমরমা হয় কোথা থেকে? কোনটায় — বলছি আমি। বলছি, সার, কীটনাশকের ব্যবসায়। সার আর কীটনাশকের ব্যবসা তো রমরমা করে বেড়ে উঠল। এটা ক্যাপিটাল পেনিট্রেশন নয়?

ত্রিদিব।। অবভিয়াসলি, আমি তো এই জায়গাগুলোই চাইছিলাম।

তিমির।। তো, সেই জায়গাটাতে সার আর কীটনাশকের পরিমাণ বাড়ল। সে জমি বিক্রি করল। বহু জমিদার জমি বিক্রি করে দিল। তো, এই যে লোকটি, আশি বিঘা জমির মালিক, এর চারটে ছেলে আছে। তুমি যদি চারটে ছেলে বলো, তাহলে, কুড়ি বিঘা করে মাথাপিছু পড়ে। তার মানে, সেটা নেমে আসে। নেমে আসছে, মানে, তোমার সিলিং যে লেভেল, পয়ত্রিশ বিঘা, তার থেকেও পনেরো বিঘা কম। তার থেকে বেশি জমি, পঁচিশ বিঘা, তিরিশ বিঘা, এখন, লোকাল কমিটির মেম্বারের আছে। সে খাসজমির বেশির ভাগটা নিজের ঘরে ঢোকাতে সমর্থ হয়েছে, তার পাওয়ারকে কাজে লাগিয়ে। কিন্তু, তিন বিঘা সে দিয়েছে, তার পিছনে ওই তিন বিঘার লোকটাকে সে রাখতে পারে। পঁচিশ বিঘার ইসে করা আছে, তার সেই নেতৃত্ব দেওয়া, তার মধ্যে দিয়ে সেই তিন বিঘার লোকটা ডমিনেটেড আছে। কেননা, দীর্ঘ সোশাল মুভমেন্টের একটা রেজাল্ট আছে, আর স্টেট পাওয়ারে তার পার্টিসিপেট আছে। তা, সেই জায়গা থেকে, সবটা মিলিয়ে, সে পারে। মানুষের মধ্যে প্রশ্ন থাকলেও, সেটা করে না। প্রশ্নটাকে খুঁচিয়েও দেওয়া যায়। সেটা একটা পলিটিকাল স্ট্রাগলই হয়, পলিটিকাল পার্টির একজন লোকের সঙ্গে। কিন্তু, এর সঙ্গে সেরকম লোকাল পাওয়ারের কোনো সম্পর্ক নেই। এবার, সে যখন চাষ করে, দাঁড়াও, আমি বলছি, তুমি অকৃষক জমির মালিক বলছ, ওই টিচার, সিপিএমের লোক, পাওয়ার টিলার আছে…

ত্রিদিব।। এক সেকেন্ড। তুই আবার বলিস। তৃণমূল যে সময়টায় ওখানে সিপিএমকে প্রায় ঘরছাড়া করে দিয়েছিল…

তিমির।। আমি গোয়ালতোড় থেকে সেরে আমি গড়বেতায় পরে যাচ্ছি, গড়বেতার সিচুয়েশনটা অন্যরকম।

ত্রিদিব।। না, জাস্ট একটা কৌতূহল, তখন কি এই লোকাল কমিটির মেম্বার টেম্বার, যাদের বেশি জমি ছিল, তাদের জমিগুলো ডিসট্রিবিউট করবার চেষ্টা করেনি কোনো?

তিমির।। না, না। আর, ডিসট্রিবিউট করার প্রশ্ন-ই নেই। ডিসট্রিবিউট করলে, আর কাকে কী দেবে? কতটুকু করে দিতে পারবে? সেটার কোনো প্রশ্ন নেই। ওখানে স্টপ করে দিয়ে সিপিএম ভালোই করেছে।

ত্রিদিব।। না, সিপিএম না, তৃণমূল তখন চেষ্টা করেনি, সিপিএমের ওই নেতাগুলোর?

তিমির।। না, না, না। না, ওগুলোয় কোনো হাতই দেয়নি। হাত দেওয়ার মত, আর কোনো হবে না। যাদেরকে খাস জমি বিলি-বণ্টন করেছে, লিগাল হয়ে গেছে, সেগুলো যদি এসে কেড়ে নিতে থাকে, তাহলে তো তার হয়ে গেল, উল্টো। এখন তো তুমি, ওই, ওই লোকটার উপরে, ওই যে আশি বিঘা জমির লোকটার উপরে ডিপেন্ড করে পলিটিক্সটা তুমি করতে পারো না। এখন তুমি, ছোট কৃষকের সংখ্যাই বেশি। ক্ষেতমজুরের সংখ্যাই বেশি। এবং, সে কিন্তু তার মজুরি বাড়িয়েছে, কিছুটা হলেও। ক্ষেতমজুর তার মজুরি বাড়িয়েছে, কিছুটা হলেও। ছোট কৃষক, তার জমি আছে, সেই জমিগুলো সে হারাবে কেন? তাকে যদি তুমি কেড়েই নিতে চাও, সেটা তো তুমি পারবে না। আর, তুমি গড়বেতা কেশপুরে গিয়ে, যদি, পশ্চিম বাংলায়, এই কাজটা করতে শুরু করো, তাহলে, স্টেট-ই তো, তোমার বিরুদ্ধে, আইনি ব্যবস্থা নেবে। স্ট্রেট, অনেক সহজ হয়ে যাবে। হতে পারে, তুমি টোটালি স্টেট পাওয়ারকে ক্যাপচার করে, আবার জমিদারদের পক্ষে কাজ করলে।

ত্রিদিব।। না, আমি সেটাও বলিনি। ধর, কোনো কোনো জায়গায়, সিপিএম নেতারা…

তিমির।। হ্যাঁ, এটা করবেই বা কেন? ওরা তো ক্যাপিটালিজমের জন্যেই খাটবে এখন।

ত্রিদিব।। না, আমি বলছি, কিছু কিছু সিপিএম নেতা তো কিছুটা করে জমি কুক্ষিগত করে রেখেছে, যেরকম তুই বলছিলি, কোনো কোনো লোকাল কমিটির নেতা, তাদের সেই জমিগুলো কেড়ে নেয়নি?

তিমির।। সেগুলো তো লিগাল, রাইটস আছে তার। সে তো কাগজপত্র করে নিয়েছে ওটা।

ত্রিদিব।। ও, আচ্ছা। এবার বল।

তিমির।। তো সেই জায়গা থেকে, সেই জায়গা থেকে, সে, কিছু কিছু হয়েছে। যেমন, মুকুন্দ পাত্র-র জমিতে তারা চাষ করতে দেয়নি, দখল হয়নি। দু-বছর ধরে অনাবাদি পড়ে রয়েছে। এরকম হয়েছে।

ত্রিদিব।। ঠিক আছে, এবার যেটা তুই বলছিলি, সেটা বল।

তিমির।। তো, সেইখানে দাঁড়িয়ে, ধরো, এইটাকে ওরা বুঝতে চেষ্টা করল না, প্রথম কথা হচ্ছে, পাওয়ার টিলার, বা ট্র্যাক্টর, বা এই ধরনের ক্যাপিটাল… এটা যখন নেই, সেখানে ক্যাপিটালিজম কী আছে? ওই সেই পুরোনো পদ্ধতি, হাল-বলদ দিয়ে চায হয় তো, অনেকে বলার চেষ্টা করে। আমার প্রথম কথা হচ্ছে, যে, ক্যাপিটালিজম এটার উপর নির্ভর করেনা। ক্যাপিটালিজমের অন্য অনেকগুলো দিক আছে। প্রথম কথা হচ্ছে, তুমি পণ্য কিনা। তুমি সেটাকে রিডিফাইন করো। আর, তারপরে যেটা হচ্ছে, যে, ছোট্ট একটা জমির মালিক আমি। আমার যেটা হয়, সেটা বেশির ভাগটা আমার ক্ষেতে যায়। খুব সামান্য হয় যা আমি বাজারে নিয়ে যাই। এবার, সংখ্যায় তারা কত? আমি ধরে নিচ্ছি, থারটিফাইভ পারসেন্ট, কি ফরটি পারসেন্ট, যারা জমি পেয়েছে। সংখ্যায় তারা কত? কৃষিভিত্তিক, এই পশ্চিম বাংলাটাও কৃষিভিত্তিক দেশ, তো তারা সংখ্যায় কত? এবার, তাদের যদি, দু-বস্তা করে চাল বিক্রি হয়, সেটা কী পরিমাণ পণ্য গ্রামাঞ্চল থেকে, সেটার তো একটা পারসেন্টেজ হবে, প্রোডাকশনের সঙ্গে সেটাকে মিলিয়ে দেখা উচিত। এক। দু-নম্বর হচ্ছে, মধ্য কৃষক। সে ধান উত্পা‌দন করে, নিজের জন্যে বেশির ভাগটা, অর্ধেকটা, অর্ধেকটা বিক্রি করার জন্য। এবং, তার পরে সে করে কী? ক্যাশ ক্রপ করে কিনা। যার হাতে, হ্যাঁ, যার হাতে, ক্যাপিটাল আছে, অর্থাত, কিছু উদ্বৃত্ত আছে, সে সব সময়ই ক্যাশ ক্রপ করে। ঠিক আছে? অর্থাত, আলু ওখানকার ক্যাশ ক্রপ ছিল। আলু উত্পাদন, ঢেলে উত্পাদন হয়। ছোট কৃষক পর্যন্ত আলু চাষ করে। অর্থাত, আমার হাতে, এ বছর, ধান ভালো হওয়ার ফলে, কিছু পরিমাণ বেশি উদ্বৃত্ত টাকা এসেছে। অবশ্যই, কৃষকের মন ক্যাশ ক্রপের দিকে যাবে, এবং, আলু চাষ করবে, বা, সর্ষে চাষ করবে। বা, ঝিঙে চাষ করবে। বা, ইসে করবে, উচ্ছে করবে, উচ্ছেটা করবে। হ্যাঁ? ইভেন, ট্রাইবালরা পর্যন্ত। ইভেন, ট্রাইবালরা পর্যন্ত, ট্রাইবালদের, ট্রাইবালরা, ওদের নেচার হচ্ছে, ওখানে কারোর কোনো ট্রাইবালের জমি নেই এরকমটা নেই। জমি নেই বলাটা — খুব কমেরই হতে পারে, যারা পৈতৃক সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হয়েছে হয়ত, কোনো মেয়েকে বিবাহ করায় যা সমাজ মানেনি সেই জায়গা থেকে, সে হয়তো ক্ষেতমজুর আছে। মানে, ভূমিহীন আছে। এরকম ছাড়া ভূমিহীন তুমি ট্রাইবালদের মধ্যে পাবে না। ট্রাইবালরা যেটা ছিল, প্রিমিটিভ, প্রিমিটিভ প্রসিডিওরে ছিল। তা ক্ল্যান তো, এখনো অনেকটা ক্ল্যান সোসাইটির মত আছে। তা, চাষের ডেভেলপমেন্ট, এগ্রিকালচারাল ডেভেলপমেন্ট, ঘটায়-নি। কিন্তু, সেই ক্ষেত্রে, গোয়ালতোড়, হুমগড়, গড়বেতার যে ট্রাইবালরা, তারা আলু চাষ করে, তারা উচ্ছে চাষ করে। উচ্ছে আর আলু কি খাওয়ার জন্য করে নাকি? উচ্ছে আর আলু তো বিক্রি করবার জন্য করে। মানে, বিক্রির জন্য করে। আমি খুব সহজ ভাবে বুঝি গোটা ব্যাপারগুলোকে। ও বিক্রি করার জন্যে করা, তার মানে, ওটা একটা মার্কেটে যাওয়ার প্রশ্ন আছে। তাহলে, এটার সঙ্গে, মার্কেট একটা যুক্ত।

এই মার্কেটটাকে ডমিনেট করে কে? মার্কেটটাকে ডমিনেট করে কে? ডাইরেক্টলি আমি যদি দেখি, তাহলে, এইখানে — শোনো, ইমপিরিয়ালিজমের তো এখানে ইনডাস্ট্রি গড়ার দরকার নেই, ইমপিরিয়ালিজমের ইনডাস্ট্রি আছে, সে উত্পাদন হচ্ছে, বেশ বেশিই উত্পাদন হচ্ছে। তার দরকার মার্কেট, সেটা বিক্রি করবার। তাহলে, মার্কেট দু-ধরনের হল, এক, আমার মার্কেট দরকার, এক, আমি নিজেও একটা মার্কেট। তা, আমি কিসের মার্কেট? আমি হচ্ছি সার আর পেস্টিসাইডের মার্কেট। সার আর পেস্টিসাইডের দরকার কী, ওই ইন্ডাস্ট্রিটার দরকার কী? তার দরকার ট্রেডার্স। ফড়ে। ট্রেডার্স কে আছে? পুরোনো জমিদারদের একটা অংশ… ট্রেডার্স অংশটা হচ্ছে সেই অংশটা, যারা জমি বিক্রি করে দিল। জমিদারদের একটা অংশ। এবং, নিউ-লি গড়ে ওঠা, নিউ-লি গড়ে ওঠা, যারা পাওয়ারকে ইউটিলাইজ করে, বেশ কিছু পয়সা করতে পারল। তাদের খাটানোর জায়গাটাই… সার আর পেস্টিসাইডস। এবং, কৃষির ডেভেলপমেন্ট হয়েছিল বলেই, এত পরিমাণ সার আর পেস্টিসাইডস-টা ওই জমিতে খাওয়ানো গিয়েছিল। এইবার, মজার ঘটনাটা হচ্ছে, সাম্রাজ্যবাদ যেখানে নিজের মাটির অপেক্ষা করছে। সে খুব ওঁছা মালটা আমাদের দেশে সাপ্লাই দিয়েছে। আমাদের দেশে দুর্ভিক্ষ হতে বাধ্য, সোমালিয়া হতে বাধ্য। হ্যাঁ? বর্ধমানের সিচুয়েশন, আমি, একটা রিজিয়নে, বর্ধমানে আমি কাজ করিনি, কিন্তু, বর্ধমানে আমার প্রচুর যোগাযোগের কারণে, গ্রামে, মানে, বন্ধুবান্ধব থাকার কারণে, আমি গ্রামে গিয়ে, পড়ে কিছুদিন চাষ করে দেখেছি। এবং, আমি, কিছু লোকজন আছে, তাদের সঙ্গে দেখেছি, বর্ধমানে এখন তিন হাত করে মাটি খুঁড়েও ধান চাষ করলে, সেই ধান উত্পাদন দেয় না। এবছর কী হয়েছে, জানো? ধানগাছ লাগিয়েছে, অর্ধেক ধানে, মানে, অর্ধেক গাছে শীষ বেরিয়েছে, অর্ধেক গাছে শীষই বেরোয়নি। অথচ, গাছগুলো হয়েছে বিরাট বিরাট, ঝোপড়ার মত।

ত্রিদিব।। জেনেটিক — উল্টোপাল্টা ঘটছে, এনজিনিয়ার করছে তো।

তিমির।। কী উল্টোপাল্টা সব। মানে, পরিষ্কার, অদ্ভুত অদ্ভুত। মানে, বিভিন্ন জায়গায়, সব জায়গায় না। এখনো চোখে পড়ছে না। কিছুদিন বাদে, এটাই চোখে পড়বে। ঘাস গজিয়ে গেল। ধানগাছ লাগাল, মনে হল ঘাস হয়ে গেছে সব। ঠিক আছে? গোয়ালতোড়ের জন্য, গড়বেতার জন্য — অন্যরা একটা ইসে আছে, এখানে ছোট কৃষকের সংখ্যাই বেশি। অনুর্বর ছিল মাটি। কংসাবতী ক্যানেলটা, আসলে উর্বর, জমি উর্বর, কিন্তু, জলের অভাব ছিল। সেচের অভাব ছিল। যার জন্যে, আজকের চাষীর ডিমান্ড, গড়বেতায় ছিল — সেটা হচ্ছে, ডেভেলপমেন্ট। ডেভেলপমেন্টটা প্রপারলি হচ্ছিল না বলেই, তৃণমূল এসেছিল, ডেভেলপমেন্টকে হাতিয়ার করে। যে, আমি রাস্তা বানাব, এখানে ইসে করতে হবে। অর্থাত, কৃষকরা তো কোনো দিনই কমিউনিস্ট না, কমিউনিস্ট পার্টির…

ত্রিদিব।। আচ্ছা এবার ধর, একটু আগে, যেটা শুনে তুই ওরকম চটে যাচ্ছিলি — ডেভেলপমেন্টস কতকগুলো পকেটে হয়নি। এবার, তার ডেভেলপমেন্টের সবচেয়ে ভালো এজেন্ট কারা হতে পারে, খুব দ্রুত কতকগুলো ডেভেলপমেন্ট, ওই এলাকায় ঘটিয়ে দিতে পারে…

তিমির।। ঘটছেও তো তাই।

ত্রিদিব।। তাহলে কেন স্টেট চাইতে পারেনা, এরকম কোনো সংগঠনকে?

তিমির।। তাহলে, তার স্বার্থে তো যাচ্ছে ব্যাপারটা। সে আমার মিত্রশক্তি। বড় কৃষক তো ওদের শত্রু  মনে করছে।

ত্রিদিব।। তুই ভেবে দেখ না, ক্যাপিটাল তার স্বার্থেই, একটা জায়গায়, কিছুটা সময় ও দূরত্ব অব্দি, উগ্রপন্থী লেফটিজম চাইতেই পারে…

তিমির।। চাইতেই পারে। চাইতেই পারে। আমরা তো সেই ক্যাপিটালিজমটাই চাইছি। কেননা, ওই যে ধনী কৃষক, যে সাম্রাজ্যবাদী বাঁধনে পরাধীন, তার মুক্তি তো আমি চাইছি। তার সঙ্গে তো কোলাবরেশন করতেই হবে, নাহলে, আমি করতে পারব না, কিন্তু আমার অংশটা তো খুবই ছোট অংশ। কারণ, একশো কোটির দেশে শ্রমিকশ্রেণী মাত্র হচ্ছে বিশ কোটি।

ত্রিদিব।। বড় টাইম পারস্পেক্টিভে তাকিয়ে দেখ, পঞ্চাশ ষাট বছরের একটা টাইম-স্প্যানে যদি তাকিয়ে দেখিস, তাহলে, শেষ অব্দি, অন্য নানা ধরনের, ওই যে এনজিও, ডিএফআইডি, এরকমই আর একটা কিছু নয় তো পিপলস ওয়ার গ্রুপ?

তিমির।। না, এটা ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন নয়। এটা পলিটিকাল অর্গানাইজেশন। এবং, ডেভেলপমেন্ট, উইদাউট পলিটিক্স, ডেভেলপমেন্ট, এটা তো কোনো মিনিং রাখে না। কোনো মিনিং রাখে না।

ত্রিদিব।। পলিটিক্সটা জেনারেটেড হয়ে যায় রে, পলিটিক্সটা জেনারেটেড হয়ে যায়।

তিমির।। পলিটিক্স উইদাউট পলিটিক্স, ডেভেলপমেন্টের, ডেভেলপমেন্ট — এরকম ভাবে তো কোনো — মিনিংলেস, ব্যাপারটা তো, মিনিংলেস…

ত্রিদিব।। শেষ অব্দি, মোটের উপর, তাকে একটা নিয়ন্ত্রণ রাখতেই হবে। যেমন, তুই যখন বলছিলি সোমালিয়া, আমার মনে হচ্ছিল, এখুনি একটা উল্টো প্রবণতাও আসবে, কারণ, খুব বেশি যদি সোমালিয়া হয়ে যায়, সে তার প্রোডাক্ট বিক্রি করবে কাকে? তাহলে তো, আবার তার প্রফিট পড়ে যাবে। তাহলে, সে, কোনো একটা জায়গায়, সোমালিয়া হওয়াটা আটকাতেই চাইবে?

তিমির।। সেটাই তো, তার য়্যাডাপ্টেবিলিটি, মানে, তার রিসিভিং পাওয়ার তো অনেক বেশি, সে প্রচুর কিছুকে য়্যাবজর্ব করে নিতে পারে, ক্যাপিটালিজম…

ত্রিদিব।। এবং, প্রচুর আনএক্সপেক্টেড কিছুকে সে তার অস্ত্র হিশেবে ব্যবহার করতে পারে।

তিমির।। কিন্তু, তাকে আবার কবর খুড়তেই হবে, এবং, তাকে সোমালিয়াও বানাতে হবে দু-চারটে।

ত্রিদিব।। এবার আমি ঘাঁটলাম আলোচনাটাকে, তুই যেটা বলছিলি, চালিয়ে যা, কারণ, ওটা খুবই ইন্টারেস্টিং। মানে, ওই সার, সারের ব্যবহার, এবং, তাতে, জমির চরিত্র বদলে যাওয়া। আলুর হিশেব নিয়ে যেটা তুই বলতে শুরু করেছিলি…

তিমির।। হুঁ। এবার থেকে, যেখানে যেখানে এটা হল… উনিশশো বিরাশি সালে, চন্দ্রকোনা রোড, চন্দ্রকোনা রোডে আলুর একটা বিরাট ফলন হয়, ভালো ফলন হতে থাকে। ওইখানে আলু চাষ শুরু হয় এরকম আশির দশকের শেষের দিকেই, ওটা বেশি পপুলার হয়। সত্তরের দিকেও, কেউ কেউ আলু চাষ করত, কিন্তু আলু চাষের ভীষণ প্রচলন হল, আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে। এবং, সেই সময়ে, আলু, প্রায় নব্বইয়ের দশকের প্রথম দিকেও দেখা গেছে, যে, আলু পার কাঠা সাড়ে তিন কুইন্টাল আলু পাওয়া যায়। তিন কুইন্টাল পাওয়া যায়। ভালো ভাবে চাষ করতে পারলে, মানে, ঠিকঠাক ডিএপি, ঠিকঠাক দিতে পারলে, কেননা, গরিব মানুষ তো বেশির ভাগ সময়ই সারটার প্রোপোরশন ঠিক করতে পারেনা। ধরা যাক, যে পরিমাণ পটাশিয়াম দরকার, টু ইজ টু টু অনুযায়ী, দিতে হবে হয়ত, কোনো কিছু। সেটাকে, ও দিয়ে দিল, ফোর ইজ টু ওয়ান, এরকম হল, কম দিল, পটাশের পরিমাণ কম হয়ে গেল। তো, এরকম হতে পারে, সারের পরিমাণ যতটা দেওয়ার কথা, ততটা, ডিএপি যতটা দেওয়ার কথা ততটা দিতে পারল না, ইউরিয়া যতটা দেওয়ার কথা দিতে পারল না। কিন্তু, এটা যদি ঠিকঠাক দেওয়া যায়, তাহলে, তিন থেকে সাড়ে তিন কুইন্টাল হয়। আজকে সেটা, মানে, নাইন্টিএইটে আমি তোমাকে সেটা বলছি, যে, অত্যন্ত উন্নত জায়গায়, সেটা এসে কমেছে, বড় জোর, খুব ভালো ভাবে, অর্থাত, যে সার সে ব্যবহার করত, তার থেকে বেশি, মানে, তিন গুণ বেশি সার ব্যবহার করেও, আড়াই কুইন্টালের বেশি পাওয়া যায় না।

ত্রিদিব।। এই ভাবে উত্পা‌দন কমছে?

তিমির।। কিন্তু, গড়ে, গড়ে যেটা কমেছে, গড়ে যদি তুমি ধরো, যদি কমার পরিমাণ ধরো, যখন এলেবেলে করে চাষ করেও তিন কুইন্টাল পাওয়া যেত, আজকে এলেবেলে চাষ করে করলে, এক থেকে দেড় কুইন্টাল পার কাঠায় আলু পাওয়া যাচ্ছে। ঠিক আছে?

ত্রিদিব।। এতটা?

তিমির।। এই বার, এর মধ্যেও অতিফলন আছে। প্রতি মুহূর্তে, তুমি জানো, ক্যাশ ক্রপ, তুমি দেড় কুইন্টাল আলুটা, যখন হচ্ছে, তখন, খরচাটা অনুপাতে, বাড়ছে। প্রোডাকশন করছে, খরচা বাড়ছে। এটা আসছে। এর পরেও, আলু, আমি নাইন্টিএইটে দেখেছিলাম, যে, এক টাকা পঁচিশ পয়সা পার কেজিতে দরকার। অর্থাত, একশো পঁচিশ টাকা পার কুইন্টাল হলে, মাথায় মাথায় বেঁচে যায়। এবার, সেটাও অতিফলনের জায়গায় গিয়ে পৌঁছে যায়, কখনো কখনো। অর্থাত, সেটা বিক্রি করবার, অর্থাত, মার্কেট-ই পায়না। মার্কেট স্টেটাস, মার্কেট সব সময় ঠিক করে রেখেছে, আমি দুশো কুইন্টালের বেশি, মানে, ধরা যাক, দু-লাখ কুইন্টালের বেশি, আমি, মার্কেট-এ, নেবে না, মার্কেট-এ সেটাকে য়্যালাউ করা হবে না। কেননা, ক্রাইসিস তোমাকে মার্কেট-এ রাখতেই হবে। সেটা তো, ওই ট্রেডারসদের জন্য। এবার, ইমপিরিয়ালিজমের সঙ্গে ট্রেডারসদের সম্পর্ক। ইমপিরিয়ালিজম তার ওটাকে বিক্রি করার চেষ্টা করে, সেটা তো তার পেয়েই যায়, প্রোডাকশন কমার মধ্যে দিয়েই সেটা বাড়বে। টু সাম এক্সটেন্ট, প্রোডাকশন কমার মধ্য দিয়ে, এবং, আরো বেশি সার দেওয়ার মধ্য থেকে, সার এবং পেস্টিসাইডের ব্যবসা ফুলে ফেঁপে ওঠে, এবং উদ্বৃত্ত-ও বেড়ে ওঠে। মানে, একটা স্টেজে গিয়ে, ধরো একটা তুমি কিছু প্রোডাকশন করছ, একটা মাটিতে পাঁচ বছর ধরে তুমি একটা, মানে, কিছু সার এবং কিছু সার দেওয়ার পর, পাঁচ বছর টানা যদি পাও, লাস্ট ইয়ারে গিয়ে তো তোমার আর কোনো প্রোডাকশন কস্ট থাকে না। তেমনি, সারের উত্পাদন, তুমি পেস্টিসাইডের উত্পাদন যদি তুমি ইন্ডাস্ট্রিতে খোঁজ নাও, তাহলে, দেখবে, যে, দশ বছর বাদে, সেটায় আর প্রোডাকশন মূল্য থাকেনা। যেটুকু আসে, গোটাটাই সুপারপ্রফিট। ঠিক আছে? আজকে যেটা হচ্ছে, সাম্রাজ্যবাদের সেটা সুপারপ্রফিট। সে সেইখান থেকে, অন্য জায়গায় শিফট করে যাবে। ঠিক আছে? আর, ক্রাইসিসে আমি পড়লে, ওর কিছু যায় আসে না। কিন্তু, প্রশ্নটা হচ্ছে, যে, সাম্রাজ্যবাদ এটাকে করতে বাধ্য করেছে, গোটা সবুজ বিপ্লব যেমন করতে বাধ্য করেছে, তেমনি বিভিন্ন বিভিন্ন জায়গায়, ফিউডালিজমকে বাধ্য হয়েছে, তাকে… মাধবরাও সিন্ধিয়ার মত লোকজনও, নুনের ব্যবসায় ট্রান্সফার করে যায়। সিন্ধিয়া পরিবার, বা, রাজস্থান, মহারাষ্ট্রের সমস্ত জায়গায়, এটা… শালা বিজনেসের, ট্রেডারসদের… কারণ, ফিউডাল ক্যারেকটারের সঙ্গে, তার ফিউডাল ক্যারেকটারিস্টিক্সের সঙ্গে, ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্টকে কী করতে হয়, ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্টকে সব জায়গায় ঘুরতে হয়, সব কিছু খেতে হয়, তার মোটিভেশনটাই আলাদা, তার মোবিলিটি-ই আলাদা। কিন্তু, ট্রেডার্স? ট্রেডার্স বড়বাজারের গদির মালিক, ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে, ওখানে এরকম ভাবে বসে থাকলেই হয়, পাঁচটা লোককে সে খাটায়। ঠিক তার জমিদারি কায়দা। অর্থাত, কালচারালি ট্রেডার্সরা ভারতবর্ষের জমিদারদের সঙ্গে… তার মানে, আজকের জমিদার যারা, তুমি দেখছ, তার ম্যাক্সিমাম পোর্শনটাই হচ্ছে, কালকের জমিদাররা, যারা ছিল, তারা হচ্ছে সেই দালাল অংশটা, যারা তার জমিদারি হালটাকে রেখে দিয়ে, সাম্রাজ্যবাদী জিনিসপত্তর বিক্রি করার দায়দায়িত্ব নিয়েছে। ঠিকা নিয়ে আছে।

এবারে, ক্লাস ডেফিনেশনে, ক্লাসের কতগুলো, অপ্রেসড ক্লাসের সেকশন কতগুলো? এক, কোল্ড স্টোরেজের মালিক। মাথায় দেখো, থ্রি লেয়ার, থ্রি লেয়ারে, আমি দেখেছি। কোল্ড স্টোরেজের মালিক, সার পেস্টিসাইডের ডিলার, হ্যাঁ? অপ্রেসড ক্লাস হচ্ছে ছোট, সার, সার পেস্টিসাইডের ছোট মালিক। সে কিন্তু অপ্রেসড। কী রকম? যখনি, সে কিন্তু সাম্রাজ্যবাদীর, সে কিন্তু তা না, সে ছোট একটা ব্যবসা ফেঁদেছিল, হয়ত, দেখা গেল, কোনো মাস্টারমশাইয়ের ছেলে, তার কোনো জমি নেই, সে জমি চাষ করতে পারেও না, সে বেকার, পড়াশুনা করে। তাকে একটা, তার পিএফের টাকাপয়সা তুলে, তাকে একটা সারের দোকান করে দিয়েছে। মানে, এই ক্যারেকটারিস্টিক্স, তার মানে, শহরাঞ্চলের সঙ্গে একটা মিল, ইউনিটির জায়গায় যাচ্ছে। বেকারিত্ব, বেকারিত্ব বাড়ছে, বিভিন্ন ধরনের বেকারিত্ব। অর্থাত, শিক্ষিত বেকারের পরিমাণ বাড়ছে, ছদ্ম বেকারের সংখ্যাও বাড়ছে। পপুলেশন বাড়ছে, জমি তো আর বাড়ছে না। ডিসট্রিবিউশন যা হওয়ার হয়ে গেছে, ওটা বগ্ড‌ হয়ে গেছে, আর ডিসট্রিবিউশনের কথা কল্পনা করে, কেউ যদি বলে, জমি দখল করে জমি দেব, এই স্লোগান বিভ্রান্তিকর স্লোগান। ভুল স্লোগান। মিথ্যে স্লোগান। হ্যাঁ, মানুষ ঠকানো স্লোগান। তো, সেইখানে দাঁড়িয়ে, তুমি দেখ…

ত্রিদিব।। এইবার কি জমি বানাবে?

তিমির।। এইবার কি জমি বানাবে? সেইখানে দাঁড়িয়ে, তুমি দেখো, গোটা ক্যাপিটালই তো কন্ট্রোল করছে। সেটা ইমপিরিয়ালিস্ট ক্যাপিটাল। সেইখানে, আমার যে ক্যাপিটাল, অর্থাত, আমার যে ক্যাপিটালিস্ট ডেভেলপমেন্ট, সেটা তো অনেকদিন আগে রুদ্ধ হয়ে গেছিল। তুমি সেটাকে আর কোথায় খুঁজে পাবে? সেটার ডেভেলপমেন্ট নতুন ভাবে ঘটাতে হবে। তার পুরোটাই। জাতিসত্ত্বার আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে তার মুক্তি খোঁজে। তুমি ইউনিটি খুঁজে নাও, বিভিন্ন স্ট্রাগলের মধ্যে দিয়ে তুমি ইউনিটিটা, তুমি, আমি বলছি না যে, তোমাকে কমিউনিস্ট পার্টি করতে হবে, কাউকে। কিন্তু, কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যেও, আজকে, কমিউনিস্ট পার্টিরই স্ট্রাগলগুলো যেগুলো আছে, সেই স্ট্রাগলগুলোর মধ্যেও মানুষের যে সংগ্রাম, সেই সংগ্রাম কিন্তু ইউনিটি খুঁজে পাবে।

ত্রিদিব।। সিপিএমের মধ্যে যেমন? কমিউনিস্ট পার্টি বললি তো? তার মানে, কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া, মার্ক্সিস্ট-এর মধ্যেও?

তিমির।। হতেই পারে। হতেই পারে, যে, একটা ক্রাইসিসে গিয়ে ওকে ডেমোক্র্যাটিক রোল পালন করতে হচ্ছে। তুমি দেখো না, এই বছরটা দেখো, ইলেকশন করে, যদি বুরোক্র্যাটের সঙ্গে এই যে দ্বন্দ্ব, পলিটিকাল পাওয়ারের যে দ্বন্দ্ব…

ত্রিদিব।। যাক, তুই, কৃষির ডিটেইলসগুলো বল।

তিমির।। হ্যাঁ। যা হচ্ছে গিয়ে , একটা ইন্টারেস্টিং… এটা গড়বেতার সিচুয়েশন, গড়বেতা হুগলি বর্ডার। পরেশ, পাল। শ্রীনগরে বাড়ি। আগে বাড়ি ছিল, সন্ধিপুরে। সে, তার ছিল প্রায়, আড়াইশো বিঘা জমি। পালরা ছিল ছোট দরের জমিদার। ওখানে চৌধুরীরাই মূলত জমিদার ছিল, পালরা ছিল ছোট। পলিটিকাল ইকুয়েশন চেঞ্জের সঙ্গে সঙ্গেই, ওরা দ্রুত নিজেদেরকে য়্যাডজাস্ট করে, বামপন্থী পলিটিক্সের সঙ্গে। ঠিক আছে? দ্রুত নিজেদেরকে য়্যাডজাস্ট করে। সেটা, করার পর, দুশো বিঘা জমির মধ্যে, বেশ কিছুটা তার দখল হয়ে গেছিল, স্বতস্ফূর্ততার দখলে, কিন্তু, সে, তার পরেও, দেড়শো বিঘা, প্রায়, একশো পঁচিশ বিঘা জমির মালিক ছিল। এর মধ্যে সে পঁচাত্তর বিঘা দ্রুত বিক্রি করতে পেরেছিল, যে কোনো মূল্যে বিক্রি করে দিয়েছিল। এটার টাইম-স্প্যানটা হচ্ছে, দেখো, সেভেন্টিসেভেন থেকে এইটিফাইভের মধ্যে। এই, সেভেন্টিসেভেন থেকে এইটিফাইভের মধ্যে, ওই জমির ডিসট্রিবিউশনের জন্য, অর্থাত, এই সময় যে প্রোডাকশনটা হল, ঠিক আছে, যারা ক্যাশক্রপ গড়ল, তাদের হাতে কিন্তু, বেশ কিছু পয়সা এসেছিল। তারা বড়লোক হয়ে গিয়েছিল, মোটরসাইকেল কিনে, বাড়িঘর বানিয়েছিল। তাদের অবস্থা, মোটরসাইকেল বেচে, এখন, আত্মহত্যাও করছে। আলুচাষ করে আত্মহত্যাও করেছে, এরকম উদাহরণ-ও আছে।

তো, তো, সেইখানে দেখিয়ে, তাহলে, এই যে পরেশ ধর, আমি যে থ্রি-টায়ারের কথা বলছিলাম, তিনটে টায়ার তৈরি হয়েছে, তো, এই পরেশ ধর, জমি বিক্রি করে, গোটা পুঁজিটাকে নিয়ে গিয়ে, সার এবং ফার্টিলাইজার, শুধু সার-ফার্টিলাইজার না, পাওয়ার টিলারের ব্যবসা। পাওয়ার টিলার কিন্তু প্রতিটি আলু, আলু চাষ কিন্তু পাওয়ার টিলার ছাড়া হয়ই-না, খুব দ্রুত ওকে টিলিং করতে হয়। ক্যাপিটাল… তো এখান থেকে ঘটে, কেননা, দ্রুত চাষটাকে তো তোমায় তুলতেই হবে, পনেরো দিনের মধ্যে তোমায় চাষটা, ওই, মানে, মাটি তৈরি করে ফেলতে হবে। তা, পাওয়ার টিলার ছাড়া করবে কী করে? হাজার হাজার পাওয়ার টিলার, নিজস্ব নয়, কী রকম পাওয়ার টিলার, পাওয়ার টিলার ঘন্টায় আশি টাকা করে ভাড়া নেওয়া হয়। হ্যাঁ, ঘন্টায় আশি টাকা করে, তিন ঘন্টা, চার ঘন্টা, পাঁচ ঘন্টা, যার যেরকম জমির পরিমাণ, পাওয়ার টিলার দিয়ে করে দেয়। এবং, এর জন্য, লোক রাখা হয়। বিভিন্ন জায়গা থেকে, এইসময় কাজ করবার জন্য, ছেলেরা আসে, তারা পাওয়ার টিলার চালায়। রাত জেগে জেগে পাওয়ার টিলার চালায়, সারা দিন রাত পাওয়ার টিলার চালায়। ঠিক আছে? সারা রাত — গড়বেতার মাঠে, তখন, ঢির ঢির ঢির ঢির, ঢির ঢির ঢির ঢির, আওয়াজ শোনা যায়। অদ্ভুত। পাওয়ার টিলারের আওয়াজ। হ্যাঁ? কী ভাবে? তোমার ক্যাপিটাল, তুমি ক্যাপিটালিস্ট, আমি ক্যাপিটালিস্ট নই, আমি মধ্য কৃষক, আমি ক্যাপিটালিস্ট কায়দায় চাষ করি। কিন্তু, আমার মুক্তি ঘটে না। আমার নিজের ইকুইপমেন্টস তৈরি হয়না। সেটা কী করে? ট্রেডিং হয়। অর্থাত, এই ভাবে, আমাকে, ভাড়া নিতে হয়। অর্থাত, এই যে ট্রেডার্স অংশটা, তার আছে সার-পেস্টিসাইডের কারখানা, তার আছে পাওয়ার টিলার, সে ক্যাপিটাল সাপ্লাই করে। তার জন্য সে রেন্ট নেয়। তো, রেন্টের সিস্টেমটাও তোমার রয়ে গেল।

ত্রিদিব।। এই যে তিনটে টায়ার বললি, কী কী দাঁড়াল তাহলে?

তিমির।। তাহলে, এই যে সেকশনটা, ইম্পিরিয়ালিজমের পরে, যাদেরকে আমি দেখতে পাচ্ছি সবচেয়ে পাওয়ার হোল্ড করছে, সেই বিজনেস ক্লাস, সে হচ্ছে, সার, পেস্টিসাইড, এসবের ডিলার। হ্যাঁ? ছোট ছোট ব্যবসায়ীরা আরো আছে, তারা অনেক সময় চাষীদেরকে, ধারে, সার, সে দিয়ে, তারপরে যেই লস খায়, আর শোধ হয়না। ওরা গিয়ে যখন ডিলারের কাছে যায়, ডিলার এক পয়সার-ও ধার দেয়না। মানে, এইখানে বিক্রি হবে না, অন্য জায়গায় বিক্রি হবে। ঠিক আছে? ক্রাইসিস, সেই জায়গায়, ডিলারের এখনো গড়েনি। জেনারেট, সেই দিকে জেনারেট করার দিকে যাচ্ছে। তো, এটা একটা, ওই একটা সেকশন আছে। একটা ধনী কৃষক শ্রেণী, যারা জমির, কৃষির, থেকে ট্রান্সফার করে, চাকরি বাকরি হেন-র দিকে, শহরমুখী হয়েছে। গ্রামের, প্রচুর পরিমাণ, ভূমি থেকে উচ্ছেদ হয়ে মানুষ, আস্তে আস্তে আস্তে মাইগ্রেট হচ্ছে। হ্যাঁ? সেটা পরের প্রশ্ন। কিন্তু, প্রশ্নটা হচ্ছে, যে, এর পরে যেটা আছে, লোয়ার, ছোট কৃষক। হ্যাঁ? এবং, ক্ষেতমজুর। ছোট কৃষকের অবস্থা ক্ষেতমজুর ও ভূমিহীনদের থেকেও খারাপ।

ত্রিদিব।। তুই স্পষ্ট করে ভাগটা কর। এক হল, তাহলে, যে লোকগুলো ডিলার। এবং, যাদের পাওয়ার টিলার আছে। এইটা হল একটা…

তিমির।। ডিলার, পাওয়ার টিলার সহ বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা করছে। বিভিন্ন ধরনের, বহুমুখী ব্যবসা। আলু স্টোরের মালিক, স্টোরেজ, স্টোরেজ, আলু স্টোরেজ…

ত্রিদিব।। এটা হল, গ্রামের লেভেলে, উচ্চতম অবস্থা?

তিমির।। আলু স্টোরেজের মালিক, কোল্ড স্টোরেজের মালিক। এরা, বেশির ভাগই, মারোয়াড়ি কিন্তু, অনেকে মারোয়াড়িও আছে, বুঝতে পারছ, মারোয়াড়িও আছে, মারোয়াড়ি বানিয়ারা-ও রয়েছে, আলু স্টোরেজ, কোল্ড স্টোরেজের মালিক, বেশির ভাগই মারোয়াড়ি বানিয়া…

ত্রিদিব।। আচ্ছা। দ্বিতীয় স্তর?

তিমির।। দ্বিতীয় স্তর হচ্ছে, এর পরের যে, পরের, পরের ধাপটা হচ্ছে, ধনী কৃষক এবং গ্রামের বড় ব্যবসায়ী হিশেবে যাদেরকে ধরা যায়। হ্যাঁ? যারা কিন্তু অপ্রেসড। যাদেরকে তুমি শোষক হিশেবে ধরতে পারো না এখন। হ্যাঁ ? জাস্ট মুদি দোকানের মালিকও যেমন, ওই দোকানের মালিকও তেমন। ধনী কৃষকরা, তারা কৃষির উপর নির্ভরশীল। কৃষির উপরই নির্ভরশীল। তার হয়ত পঁচিশ বিঘা, তিরিশ বিঘা জমি আছে। সে সিপিএম পাওয়ার কি পার্টি হোল্ড করে, এরকমটা নয়। এবার, এইখানে একটা, দুটো, এই, এই ত্রিভুজের মধ্যে, একটা অংশ হচ্ছে, যাদের পঁচিশ তিরিশ বিঘা জমি আছে, এবং, সে, পলিটিকালি, সিপিএম পার্টির…

ত্রিদিব।। আর তিন নম্বরটা হল, একদম…

তিমির।। একদম তার পরের স্তরটা। মধ্য কৃষকের পর থেকে, অবশিষ্ট অবশিষ্টটা, যারা ডাইরেক্টলি, অপ্রেসড যারা হচ্ছে। যারা, এই বিক্ষোভ বিদ্রোহের সমস্ত ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিচ্ছে। ঠিক আছে? তৃণমূলের মেইন বেস ছিল মিডল কৃষক, মিডল পেজান্ট। যাদের প্রধান দাবি হচ্ছে, ন্যায্য মূল্য, কৃষিপণ্যের ন্যায্য মূল্য। অর্থাত, একশো পঁচিশ টাকা কুইন্টালের নিচে গেলে, গভমেন্ট একশো পঁচিশ টাকায় সেটা টেক-ওভার করুক, এই সাবসিডাইজড করুক। এই সাবসিডিটা দিক, এইটা তাদের মেইন ডিমান্ড হওয়া উচিত। এইটা, এই, এই ইশুর উপরে দাঁড়িয়ে, বিভিন্ন জায়গায় — বিরাট বড় — অঞ্চল জুড়ে, কেন, কৃষিজ পণ্য মূল্যের প্রশ্নটা, মধ্য কৃষকের জন্য যেমন, ছোট কৃষকের জন্য-ও তেমন, আবার ক্ষেতমজুরের জন্য-ও তেমনি সত্যি। সত্যি, কারণ, মধ্য কৃষককে এবার গুলি করে মারলেও, ষাট টাকা মজুরি সে দিতে পারবেনা। সে গুলি খেতেই পারে, দাঁড়িয়ে। কিছুতেই, মজুরি বৃদ্ধির ভায়েবিলিটি, আন্দোলনকে এই ভাবে ভায়েবল করা সম্ভব না। তুমি, ও কৃষিজ পণ্যের ন্যায্য দাম পাবেনা, কৃষি থেকেই তো সে মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছে। তার ছেলেকে তো, সে, চাইছে না সে, চাষী হোক। সে পড়াশুনা করিয়ে, চাকরি দেওয়ার চেষ্টা করছে।  চাকরির কথা ভাবছে, পাশাপাশি, চাকরির জায়গাটা কোলাপসড। ক্রাইসিস বাড়ছে। তুমি প্রপার জায়গাটায়, প্রপার জায়গাটায়, পেনিট্রেট করতে পারছ কিনা, নইল, ডেভেলপড… আমি যেটা বলছিলাম, আমার যেই খানে মতামত ছিল, যে, তুমি, কখনোই, পারস্পেক্টিভ জোনে জোর দিয়ে, গোটা ভারতবর্ষ জোড়া বিপ্লব করবে কিনা… একটা টেকনোলজিকালি সাউন্ড, হাইলি পাওয়ারফুল স্ট্যান্ডিং আর্মি যেখানে রয়েছে, এবং, একটা সত্যিকারের ভালো বুরোক্র্যাটিক সিস্টেম যেখানে রয়েছে, সেখানে ওই পশ্চাত্পদ পোরশনে গিয়ে, তুমি, ওই যুদ্ধ তুমি পরিচালনা করবে কী করে? তোমার, য়্যাডভান্সড সেকশনের মধ্যে পেনিট্রেশন দরকার আছে, তাহলে, য়্যাডভান্সড সেকশনটা…

ত্রিদিব।। বরং, স্টেট এখনো, তার সব অস্ত্র প্রয়োগ করছে-ই না। তার এখন এত জিওস্টেশনারি স্যাটেলাইট আছে, সমস্ত আমেরিকান স্যাটেলাইটগুলো তাকে তার প্রয়োজনীয় তথ্য দেবে, বিপ্লবীরা কোথা থেকে একটা চিরুনি অব্দি অন্য কোথায় সরাচ্ছে, তার প্রত্যেকটা তথ্য তার হাতে থাকবে, যদি সে চায়। এটা হয় না। সিচুয়েশন আরো খারাপ হলে, স্টেট একসময় এই ইনস্ট্রুমেন্টগুলোও কাজে লাগাবে।

তিমির।। তার জন্য, আমরা বলেছিলাম, আমি বলেছিলাম, পঞ্চায়েত ইলেকশনের থেকেও, সবচেয়ে বেশি জোর চেয়েছিল, যে, প্রভিন্সিয়াল ইনসারেকশন। ভৌগোলিক স্ট্রাকচার অনুযায়ী, একটা স্টেট, অর্থাত, পশ্চিম বাংলাকে তুমি যদি প্রভিন্স ধরো, তাহলে, সেই ভাবে আমি প্রভিন্সের ভাগের কথা বলিনি। ওরা পশ্চিম বাংলার কথা উড়িয়ে দিতে চেয়েছিল। আমি, প্রভিন্সিয়াল ইনসারেকশন বলেছিলাম, একই অর্থনৈতিক পরিকাঠামো, একই ভৌগোলিক স্ট্রাকচারকে ধরে, একটা গোটা প্রভিন্সকে চিহ্নিত করা উচিত।

ত্রিদিব।। তুই যখন বলছিলি, আমি তখনই ভাবছিলাম, পশ্চিম মেদিনীপুর, উত্তর উড়িষ্যার একটা অংশ, এবং ঝাড়খণ্ডের একটা অংশ…

তিমির।। একটা বড় অংশ…

ত্রিদিব।। একদম একই ভাবে, একই রকম অর্থনৈতিক চরিত্র।

তিমির।। চরিত্র আছে, এবং, সেইখান থেকে নয়, আসলে একটা ডেভেলপড ইকনমিক সিচুয়েশন… যেখানে ক্যাপিটালিজম তার, ক্যাপিটাল যেখানে পেনিট্রেশন করতে চাইছে, ইমপিরিয়ালিজম যেখানে ডাইরেক্টলি ক্যাপিটালিজমকে সার্ভ করছে, ক্যাপিটালিজমের ডেভেলপমেন্ট ঘটছে, বা, ক্যাপিটালের, ক্যাপিটালই সেখানে মূল রোল প্লে করছে, ইমপিরিয়ালিজমের দ্বারা, সেটা হচ্ছে, সেই সমস্ত জায়গা, অর্থাত, ডেভেলপড কৃষি জোন। যেখানে মানুষের আকাঙ্খা, চাহিদা বেড়েছে। যেখানে মানুষকে সহজেই বিক্ষুব্ধ হয়, তার জানা বোঝা আছে, সে টিভি দেখে, টেকনোলজি সম্পর্কে আইডিয়া আছে। সেরকম একটা বড় জোন, কৃষিভিত্তিক জোনে, একই সঙ্গে, একই ইশুতে, ব্যাপক মাস প্রোপাগান্ডার মধ্যে দিয়ে, মাস ইনসারেকশনের জায়গায় নিয়ে যাওয়া। ক্রাইসিস আসবেই, ক্রাইসিসটার সময়েই তোমার ইনসারেকশনের জন্ম দিতে হবে। ইনসারেকশনটা এমনি এমনি আসবে না। লাগাতার প্রচার আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে আসবে। তো, তোমার আর্মস, তুমি সশস্ত্র সংগ্রামকে বাদ দিচ্ছ না। তুমি, তার মধ্যেই প্রিপারেশন নেবে। পার্টি তো একটা গোপন স্ট্রাকচার। পার্টি পার্টির মত প্রিপারেশন রাখবে। সেটাকে এক্সপোজার দেওয়ার, প্রথম থেকেই, কী দরকার আছে? এক্সপোজার দেওয়ার দরকার নেই। তাই, প্রভিন্সিয়াল ইনসারেকশন-ই ব্যাপক পরিমাণ জনগণের মধ্যে সাড়া ফেলতে পারে। একটা ছোট জায়গায়, কয়েকটা সিপিএম লিডারকে মারলে, ওপাশে মহারাষ্ট্রের মানুষ লোম দিয়ে পোছে না। তাই না? ওপাশে, পাঞ্জাবের মানুষ বলে, মার দিয়া — ও লোগ গুন্ডা হ্যায়। এরকম বার্তাই পৌঁছয়।

ত্রিদিব।। বরং, বুদ্ধ ইত্যাদির আরো স্টেট ভায়োলেন্স তৈরি করার লাইসেন্স…

তিমির।। আরো, সেই মৃত্তিকা তৈরি করে দেয়।

ত্রিদিব।। এবং, আমি তো এটা সত্যিই মনে করি, এই ভায়োলেন্স, এই ভায়োলেন্স আরো নষ্ট করে দেয়…

তিমির।। তুমি অপ্রেসড ক্লাসকে প্রপারলি চিহ্নিত করো, ক্ষেতমজুর ভূমিহীন দিয়ে তুমি অপ্রেসড ক্লাস তৈরি কোরো না। তোমার ইউনিটি যাদের সঙ্গে আছে, বন্ধুশক্তি যেটা আছে, তাদের প্রত্যেকের মধ্যে তুমি ঐক্যকে খোঁজো, এবং, সেই জায়গাটাকে তুমি মেইনলি ধরো, আঁকড়াও। সেটাই তোমার পলিটিকাল জায়গা। সেটা পঞ্চায়েতের ইলেকশনে দাঁড়ানোর মধ্যে দিয়ে তুমি সেই প্রোপাগান্ডার সুযোগ পাও, বিধানসভা ইলেকশনে যাওয়ার তো কোনো দরকার নেই। পার্লামেন্টে যাওয়ার তো দরকার নেই। লিগাল পার্টিসিপেশন তোমার রয়েছে, সেইখানে তোমার স্টেট ভায়োলেন্স ঘটানোর মত মাটিটাও তার থাকে না। হ্যাঁ? তোমাকে এখন শর্ত দিতে হয়, তোমাকে রিলিফ চাই তো? এখন মনে হয় তোমার রিলিফ চাই, কখনো কখনো যুদ্ধে রিলিফ চাই। কেননা, কোণঠাসা প্রয়োজনে কখনো কখনো নেগোশিয়েশন করতে হয়, সেই নেগোশিয়েশনটা কার স্বার্থে হবে? এখন তো সিপিএম আপারহ্যান্ডে চলে গেছে, অস্ত্র ফেলো, তারপর নেগোশিয়েশনে এসো, কথা বলো। তুমি এই আপারহ্যান্ডে যেতে দিলে কেন?

ত্রিদিব।। পঞ্চায়েত নির্বাচনে, তুই, অংশগ্রহণের পক্ষে বলছিস। এবার, সেটাই আর একটু বাড়ালে, তখন বিধানসভা নির্বাচনেও অংশগ্রহণের প্রশ্নটা আসে…

তিমির।। না, আসে না। সেটা আসে না। যদি কৃষি, কৃষি যদি তোমার বিপ্লবের প্রশ্নে মূল, প্রথম হয় — যদি কৃষিবিপ্লব আসে। এবং, ঘটনাও তাই। ঘটনাও তাই। আমি ওটাকে ভীষণই একটা কৌশলগত দিক হিসাবে করছি। অর্থাত, পশ্চিম বাংলায়। আমি বিহারের জন্য এটা বলছি-ও না। আমি পশ্চিম বাংলার বিশেষ অবস্থাতেই এই বিশেষ অবস্থাটাকে প্রয়োগ করতে বলছি। যেখানে, ফ্যাসিজম তৈরি হওয়া সম্ভব হয়েছে। যেখানে আমি এইটুকু বুঝতে পারছি, যে, এখানে একটা ফ্যাসিস্ট শক্তি রাজ করছে। সেখানে, ডেমোক্রাসির লড়াইটা প্রধান। যেখানে, মানুষ ভোটে দাঁড়ানোর অধিকার, ভোট দেওয়ার অধিকারটুকু, তার ইচ্ছে মত করে পায়না। এবার, প্রশ্নটার, আর একটা দিক, নতুন একটা দিক। ইলেকশন কমিশন তো সেই অধিকার দিয়েছে, তাহলে কি এটাকে আমি সাপোর্ট করব? আমার মনে হয়, দুটো লড়াই ভিন্ন। দুটো দিক ভিন্ন। বরঞ্চ এটা সত্যি, যে, এই যে ইলেকশন কমিশনের সঙ্গে যদি সত্যিকারের কোনো রফা না থাকে ব্যাপার ভিতরের, যদি সেটা সত্যিকারের, কী বলে, প্রশাসনিক আমলাতন্ত্রের সঙ্গে রাজনৈতিক আমলাতন্ত্রের কনট্রাডিকশন হয়…

ত্রিদিব।। এমনও হতে পারে, কেন্দ্রীয় পুঁজি এবং আঞ্চলিক পুঁজির মধ্যে একটা বিরোধের জায়গা, কংগ্রেসের পিছনকার ক্যাপিটালের সঙ্গে সিপিএমের পিছনকার ক্যাপিটালের দ্বন্দ্ব…

তিমির।। ক্যাপিটালের লড়াই, দ্বন্দ্ব। সেটা হতে পারে। সেই দ্বন্দ্বের জায়গা থেকে এটা হচ্ছে। সেটা তো আমার পক্ষেই আসবে। আর, আমি যদি ঠিক ওই প্রসিডিওরে যেতাম, এই যে সময়টা আসছে, এই যে কন্ট্রাডিকশন, এটাকে তো আমি আরো টোটালি ইউটিলাইজ করতে পারতাম। আমি কেন করব না?

ত্রিদিব।। মমতার এই অপ্রশ্নেয় অপদার্থতা সত্ত্বেও, তৃণমূল এবার যতটুকু যা পাবে, সেটা তো গোটাটাই এই দ্বন্দ্বের ফলশ্রুতি।

তিমির।। আবার দেখো, আজকে যদি একটা, পশ্চিম বাংলার জন্যে আমি একটা উইকেস্ট গভমেন্টকে, হওয়ার, আমার যখন এই রেভলিউশন করবার ক্ষমতা নেই, বা, আমার সেই সাবজেক্টিভ ফোর্স… তাহলে, য়্যাট লিস্ট, এটা করে দিই — একটা দুর্বল সরকার গড়ে দিই — আমার উপর রিপ্রেশন, হ্যাঁ, আমার উপর রিপ্রেশনটাও ওকে অনেক ভাবনাচিন্তা করে নামাতে হবে। তাহলে, এই ট্যাকটিক্সগুলোকে নিতে কী অসুবিধা আছে? ওই সময়, আমার মাটি নেই, আমাকে, আমি সশস্ত্র সংগ্রামটা চালিয়ে নিতে — স্টেট নামবে, আমি জানি, সিপিএমের সঙ্গে স্টেটকে আমি ডিফার করতে পারছি না, এইটুকু আমি ঐক্যমত, ঠিক আছে?

ত্রিদিব।। এই জায়গাটায় আমি তোর সঙ্গে একমত। আমি মনে করি, রাজনীতির অবয়ব ক্রমশ হওয়া উচিত, পশ্চিমবঙ্গের লেভেলে বলছি, দরকষাকষিটাকে বাড়িয়ে তোলা। এই স্পেসটাকে, মানে, দরকষাকষির স্পেসটাকে, সিপিএমের বাম-সরকারের সঙ্গে দরকষাকষির ভূমিটাকে, সবচেয়ে বেশি বাড়িয়ে তোলার চেষ্টা করা। সেই জায়গাটায়, আপাতদৃষ্টিতে, তোর আর আমার মতের কোনো প্রভেদ পাচ্ছি না।

তিমির।। এইটাই তো, তৃণমূল বিজেপির মধ্যে যে অভ্যুত্থানের, ওই যে আপসার্জটা তৃণমূল বিজেপির মধ্যে দিয়ে হয়েছিল, এবং, সিপিএম কোণঠাসা হয়ে গেছিল, এবং, আমি দরকষাকষি করছিলাম। এটা আমার চেক — আমি দেখেছি, যে, পাওয়ার উইকেস্ট পোজিশনে গেলে, কী রকম ভাবে, পলিটিকাল পাওয়ারকে ইউটিলাইজ করা যায়, বিপ্লবের পক্ষে। জনগণের পক্ষে। যদি ওটাকে স্বীকৃতি দেওয়া যায়, তাহলে, এইগুলোকেও স্বীকৃতি দেওয়া যায়।

ত্রিদিব।। তাহলে, আপাতত আমাদের, প্রথম দফা এখানেই শেষ। আজ ছয়ই মে, দু হাজার ছয়, রবিবার, রাত তিনটে।

***

One thought on “জনযুদ্ধ: প্রাক্তন কর্মীর কথোপকথন

  1. Pingback: Content & Contributors – May 2016 | aainanagar

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s