দ্য ইয়েলো ওয়ালপেপার: একটি অনুবাদ

তৃষ্ণিকা ভৌমিক

তৃষ্ণিকা লিঙ্গবৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী। ‘চিত্রাঙ্গদা: একটি লিঙ্গবৈষম্য বিরোধী উদ্যোগ’-এর পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক স্তরে নারী আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি ছোটগল্পকে ভাষাগত বাধা অতিক্রম করে বৃহত্তর আলোচনার পরিধি বিস্তৃত করার উদ্দেশ্যেই এই অনুবাদ।

মূল গল্প: শার্ল‌ট পারকিন্স গিলম্যান-এর লেখা The Yellow Wallpaper

y

জন আর আমার মতো অতি সাধারণ মানুষ সাধারণত গরমের ছুটি কাটানোর জন্য এইরকম প্রাসাদের মতো বাড়ি ভাড়া করে না।

ঔপনিবেশিক আমলের সম্পত্তি, হয়ত ভূতুড়েও; রোমান্টিকতার চরমে পৌছাতে আর কি চাই – কিন্তু সেটা বোধহয় বেশি চাওয়া হয়ে যাবে।

তবু আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি বাড়িটার মধ্যে একটা অদ্ভুত ব্যাপার আছে। তাছাড়া এত সস্তায় ভাড়া দেবার কারণ আর কি হতে পারে? আর এতদিন ধরে বাড়িটা ভাড়াটেহীন অবস্থায় পড়েই বা থাকবে কেন?

জন অবশ্য আমার কথা শুনে হাসে। বৈবাহিক সম্পর্কে এটাই তো প্রত্যাশিত! জন ভীষণরকম বাস্তববাদী, কোনো অদ্ভুত বিশ্বাসকে ও প্রশ্রয় দেয় না আর যেকোনো অন্ধ বিশ্বাসকে সাংঘাতিকরকম ঘৃণা করে। দেখা বা ছোঁয়া যায় না এমন কিছুর প্রসঙ্গ উঠলে ও ব্যঙ্গ করতে ছাড়ে না।

জন ডাক্তার। আর হয়ত সেইজন্যই আমি তাড়াতাড়ি সুস্থ হতে পারছি না। একথাটা আমি কাউকে বলতে পারবো না কিন্তু লিখে মন হালকা করতে তো দোষ নেই!

আসলে ও বিশ্বাসই করে না যে আমি অসুস্থ! এরপর আমি আর কী করতে পারি! আমার বর এত নামী ডাক্তার, যদি সে-ই এটা বিশ্বাস না করে, সবাইকে বলে যে এটা আমার মনের রোগ! আমার আর কী করার থাকতে পারে!

আমার ভাইও খুব বড় ডাক্তার, আর ওরও একই মত।

তাই অগত্যা আমি ওরা যা বলে তাই করি – নিয়ম করে ওষুধ খাই, হাওয়া বদলাতে ঘুরতে যাই, ব্যায়াম করি. যতদিন না আমি সুস্থ হচ্ছি আমার কাজ করা একদম বারণ।

যদিও ওদের কথা আমার বিশ্বাস হয় না। আমার মনে হয়, আমার মনের মতো কাজের পরিবেশ থাকলে আমি ভালো থাকবো। কিন্তু আমার কিছু করার নেই।

ওদের লুকিয়ে আমি মাঝে লেখালিখির চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু ধরা পড়লে ঝামেলা হবার ভয় আর সর্বক্ষণ সতর্ক থাকার চাপ সামলাতে বড্ড ক্লান্ত লাগছিল।

মাঝে মাঝে মনে হয়, যদি আমার সবকিছুতে এত বাধা না দেওয়া হত, যদি আমি সবার মধ্যে থাকতে পারতাম, তাহলে হয়তো, হয়ত আমি অনেক তাড়াতাড়ি… কিন্তু জন বলে অসুস্থতার কথা আমার একদম ভাবা উচিত নয়, আর সত্যি বলতে কি ভাবলে মনটা বেশ খারাপও লাগে।

তাই আমি ঠিক করেছি ওসব না ভেবে শুধু এই বাড়িটাকে নিয়েই কথা বলবো।

ভীষণ সুন্দর এই জায়গাটা. রাস্তা থেকে বেশ খানিকটা ভেতরে, শহর থেকে প্রায় মাইল তিনেক দূরে। ফলে একদম ফাঁকা। গল্পে পড়া সাহেবী বাংলোর মতো এই বাড়িটা পাঁচিল দিয়ে ঘেরা, কাজের লোক আর মালিদের থাকার জন্য আলাদা করে কতগুলো ছোট ছোট ঘর।

মাঝে মাঝে মনে হয়,আমার এখন যা অবস্থা তাতে বিরোধিতার থেকে মেলামেশার করার জন্য মানুষ বা কর্মপ্রেরণা পেলে ভাল হত। কিন্তু জনের মতে নিজের সম্পর্কে এত বেশি ভাবনাচিন্তা করেই আমি নিজের বারোটা বাজাচ্ছি।

আমি নিজের সম্পর্কে না ভেবে বরং বাড়িটা সম্পর্কে বলি।

ভীষণ সুন্দর জায়গা! রাস্তা থেকে দূরে, গ্রামে প্রায় তিন মাইল ভেতরে নির্জন একটা জায়গা। ঠিক যেন ইংল্যান্ডের বসতিগুলোর মতো লাগে – বৃক্ষরাজি দিয়ে বেড়া দেওয়া, দেওয়াল আর মালিদের জন্য নির্ধারিত বাড়িগুলি একসাথে তালা দেওয়া।

এখানে চমৎকার একটা বাগান আছে! আমি এরকম বাগান আগে দেখিনি – সুবিস্তৃত, ছায়াময়, চৌকো বর্ডার দেওয়া পথ, সারিবদ্ধ আঙুরলতা দিয়ে ঢাকা বসার জায়গা। এখানে গ্রীন হাউস-ও ছিল। কিন্তু এখন খালি ভগ্নাবশেষ পড়ে আছে।

যতদূর শুনেছি, বাড়িটা নিয়ে নিশ্চয় কোনো আইনি জটিলতা আছে উত্তরাধিকারীদের মধ্যে। যেকোনো কারণেই হোক, বাড়িটা বছরের পর বছর ধরে খালি পড়ে আছে।

অবশ্য সেটাই যদি হয়ে থাকে তাহলে আমার ভৌতিক তত্ত্বটা আর দাঁড়ায় না। কিন্তু তা হোক। একটা অদ্ভুত ব্যপার ঠিকই আছে বাড়িটার মধ্যে – আমি অনুভব করতে পারি।

আমি এক জ্যোৎস্না মাখা সন্ধ্যাবেলায় জন-কে বলেছিলাম আমার অনুভূতিগুলোর কথা। জন এগুলোকে আমার আজগুবি কল্পনা বলে জানলা বন্ধ করে দিয়েছিল।

আমি মাঝে মাঝে জনের উপর অকারণে রেগে যাই। আমি কখনই এত মর্মান্তিকভাবে অনুভূতিপ্রবণ ছিলাম না। এসব-ই আমার স্নায়ুতাড়িত অবস্থার জন্য ঘটছে।

কিন্তু জন বলে, আমি ইচ্ছে করে আত্মনিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করিনা।তাই আমি অনেক কষ্টে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করি – আর এটাই আমাকে ক্লান্ত করে দেয়।

আমাদের ঘরটা আমার একটুও পছন্দ হয়না, আমি নীচের একটা ব্যলকনিওয়ালা ঘর চেয়েছিলাম, যেটার জানলার গা ভর্তি গোলাপ আর রঙ্গিন কাপড়ের পর্দা। কিন্তু জন তো সেটা শুনবেনা।

ও বলে, ওই ঘরটায় একটা মাত্র জানলা আর দুজন থাকার জন্য যথেষ্ট জায়গাও নেই। পাশে কোনো লাগোয়া ঘর-ও নেই যেখানে ও থাকতে পারবে।

স্বামী হিসেবে জন খুবই ভালবাসে আর যত্ন করে। কোনো কারণ ছাড়া আমাকে নড়াচড়াই করতে দেয় না। প্রত্যেক ঘন্টায় ঘন্টায় আমায় ওষুধ খেতে হয়, জন সে ব্যাপারে ভীষণ খেয়াল রাখে। জনের চেষ্টাগুলোর মর্যাদা দিতে পারিনা বলে আমার নিজেকে ভীষণ অকৃতজ্ঞ মনে হয়।

ও বলে আমরা এখানে এসেছি মূলত আমার কারণে, যাতে আমি ভাল ভাবে বিশ্রাম নিতে পারি, প্রাণ ভরে খোলা বাতাসে নিঃশ্বাস নিতে পারি। জন বলে – “তোমার অনুশীলন তোমার শক্তির উপর নির্ভর করে আর তোমার খাবার তোমার খিদের উপর। কিন্তু খোলা বাতাসে তুমি সবসময় প্রাণ ভরে নিঃশ্বাস নিতে পারো।”

পুরো উপরতলাটা জুড়েই ঘরটা। বেশ কয়েকটা জানলা দিয়ে দারুণ আলো বাতাস চলাচল করে আর বাড়ির চারপাশটা দেখা যায়। প্রথমে এটা বাচ্চাদের ঘর থাকলেও পরের দিকে খেলার ঘর বা জিম হিসেবে ব্যবহার হত বলেই আমার মনে হয়। জানলাগুলো বাচ্চাদের জন্য লোহার গরাদ দেওয়া, আবার দেওয়ালে জিমের সরঞ্জাম।

দেওয়ালের রঙ আর ওয়ালপেপারগুলোর অবস্থা দেখলে মনে হয় এখানে কোনো ছেলেদের স্কুল চলত। আমার বিছানার মাথার দিকের দেওয়ালের ওয়ালপেপার ফালি ফালি করে ছেঁড়া রয়েছে। ঘরের অন্য দিকের দেওয়ালের নীচটুকুর-ও ওই একই দশা। কোনো ওয়ালপেপারের এত দুরবস্থা আমি জীবনে দেখিনি।

ওয়ালপেপারের গা জুড়ে এই হিজিবিজি অতিরঞ্জিত নকশাগুলোর মধ্যে কোনো শিল্পবোধ নেই। নকশাটা এতটাই বিশেষত্বহীন যে দেখতে গেলে চোখে ধাঁধাঁ লেগে যায়, এতটাই স্পষ্ট যে সমানে একটা অস্বস্তি হয়, আবার খুঁটিয়ে না দেখে থাকাও যায় না। আর ওর অদ্ভুত অকারণ বাঁকগুলোকে একটু দূর থেকে লক্ষ্য করার চেষ্টা করলে হঠাৎ করে পুরো ব্যাপারটাই গুলিয়ে যায়, সব আরও বিশ্রীভাবে তলিয়ে যেতে থাকে।

রঙটা ভীষণ একঘেয়ে, একদম জঘন্য। একটা ঘোলাটে হয়ে যাওয়া হলুদ রঙ, সূর্যের আলোয় ধীরে ধীরে অদ্ভুত রকম ভাবে বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছে। জায়গায় জায়গায় রঙটা মলিন অথচ অস্বাভাবিক একটা কমলা রং নিয়েছে, আবার কোথাও কোথাও বিকট কালচে হলুদ।

বলাই বাহুল্য বাচ্চাগুলো এটা পছন্দ করত না। যদি এখানে আমি অনেকদিন থাকি তাহলে এটা আমার কাছেও অসহ্য হয়ে যাবে।

জনের পায়ের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি বোধহয়। আমাকে এগুলো সরিয়ে রাখতে হবে – লেখার অভ্যাসটাকে জন একদম পছন্দ করেনা।

*

যদিও প্রায় সপ্তাহদুয়েক হল এই বাড়িতে এসেছি, সেই প্রথম দিনের পর আর লেখাই হয়ে ওঠেনি।

এই বিশ্রী ঘরটার জানলায় বসে আছি। ক্লান্তি ছাড়া আর কেউ নেই আমার লেখায় বাধা দেওয়ার মতো।

জন তো সারাদিনই বাড়ির বাইরে থাকে, এমনকি যদি কোনো রোগীর অবস্থা গুরুতর হয় তাহলে রাতেও অনেকসময় বাড়ি ফেরে না।

ভাগ্যিস, আমার রোগটা সেরকম গুরুতর নয়! কিন্তু আমার এই চিন্তা করার রোগটাও বড় বাজে।

জন জানেনা আমাকে সত্যিই কতটা কষ্ট সহ্য করতে হয়। ও শুধু ভাবে যে, আমার কষ্ট পাওয়ার কোনো কারণ নেই, আর এটা ভেবেই ও সন্তুষ্ট থাকে।

এই চিন্তা আর ভয়গুলো এমন ভাবে আমার উপর চেপে বসে থাকে যেকোনো কর্তব্যই আমি আর পালন করতে পারিনা।

আমি জনকে একটু শান্তি দিতে চেয়েছিলাম, একটু সাহায্য করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু এই একটানা বিশ্রাম নেওয়াটা আমাকে নিজের কাছেই একটা বোঝা করে তুলেছে।

কেউ এটা বিশ্বাসই করতে পারবেনা যে এই ভাল থাকার অভিনয়টা করতে আমায় কতটা কষ্ট করতে হয়। ভাগ্যিস মেরি ছিল। ও বাচ্চাটাকে কি সুন্দর সামলাচ্ছে। এই যে এত সুন্দর ফুটফুটে একটা বাচ্চা, তবুও আমি ওর সাথে থাকতে পারছিনা – এটা আমাকে আরও নার্ভাস করে তোলে।

জন মনে হয় জীবনে কোনোদিন নার্ভাস হয়নি। ও তো ওয়ালপেপার নিয়ে আমার ভাবনাচিন্তাগুলো শুনেও হাসে।

প্রথমে জন ঠিক করেছিল ঘরটাতে নতুন ওয়ালপেপার লাগাবে, কিন্তু পরে ওর মনে হল আমি এই ব্যপারটা নিয়ে একটু অযথাই বেশী চিন্তা করছি আর এত ভাবনাচিন্তা আমার মনে খারাপ প্রভাব ফেলছে।

ও বলল যে ওয়ালপেপার বদলালে আমার সমস্যাটা হয়ত খাট বা জানলার গরাদ কিংবা সিঁড়ির মাথার দরজাটা নিয়ে হবে আর এভাবে সমস্যাগুলো বাড়তেই থাকবে। জন বলে – “এই জায়গাটা তোমার জন্য ভালই, তিন মাসের জন্য নতুন করে বাড়িটা সাজানোর কোনো দরকার নেই।”

আমি বললাম – “তাহলে আমরা নীচের তলার কোনো একটা ঘরে গিয়ে থাকি, কত সুন্দর সুন্দর ঘর আছে ওখানে।”

জন তখন আমায় কাছে টেনে আদর করে বলল, আমি যেখানে চাই ও সেখানে গিয়েই থাকতে রাজি, কিন্তু এই ঘরটায় থাকার সিদ্ধান্তটাই ঠিক। এই ঘরটা ভীষণই খোলামেলা, আরামদায়ক – ঠিক যেমন লোকে চায়। আমার পাগলামির জন্য ওর আরামে ব্যাঘাত ঘটানো উচিৎ হবেনা।

বিকট ওয়ালপেপারটা বাদ দিলে ঘরটা আমারও বেশ ভালই লাগে। জানলা দিয়ে বাগান দেখা যায়। লতানো গাছগুলোর রহস্যময় ঘন ছায়া, এলোমেলো ভাবে ছড়িয়ে থাকা কিছু বুনো ফুল, ঝোপ আর একগুঁয়ে অবাধ্য কিছু গাছ। অন্য জানলা দিয়ে উপত্যকাটার অসাধারণ দৃশ্য আর এই এস্টেটের একটা প্রাইভেট জাহাজঘাটা দেখা জায়। এই বাড়িটা থেকে গাছের ছায়ায় ঢাকা একটা মনোরম পথ চলে গেছে বাইরের দিকে। আমি সবসময় কল্পনায় দেখি এই পথগুলো দিয়ে মানুষ হেঁটে যাচ্ছে। জন আমায় এই ধরণের অলীক কল্পনাগুলোকে প্রশ্রয় দিতে নিষেধ করে। ওর মতে আমার কল্পনাবিলাস আর গল্প বানানোর প্রবণতাই আমার খারাপ থাকার কারণ। আমি তাই চেষ্টা করি আমার এই আজগুবি ভাবনাগুলোকে প্রশ্রয় না দিতে।

আমার মাঝে মাঝে মনে হয় লেখার মাধ্যমে যদি আমার ভাবনাচিন্তাগুলোকে প্রকাশ করতে পারতাম তাহলে হয়ত একটু শান্তি পেতাম, কিন্তু যখনই লেখার চেষ্টা করি ব্যাপারটা খুব ক্লান্তিকর হয়ে দাঁড়ায়। আমাকে সঙ্গ দেওয়ার বা আমার কাজকে উৎসাহ দেওয়ার মতো কেউ নেই। এর থেকে খারাপ আর কি হতে পারে! জন বলেছে, যখন আমি ভাল হয়ে যাবো তখন হেনরি আর জুলিয়াকে আমাদের সাথে কিছুদিন এসে থাকতে বলবে, কিন্তু এখন ওদের মতো প্রাণচঞ্চল আর অদ্ভুত মানুষের কাছে যাওয়া মানে আমার নিজের ক্ষতি করা।

ইশ্! যদি আমি তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠতে পারতাম।

নাহ্‌! এসব নিয়ে আমার মাথা ঘামানো উচিত না এত। ওয়ালপেপারটা আমার দিকে এমনভাবে চেয়ে থাকে যেন আমার উপর ওর ভয়ঙ্কর প্রভাবটা ও বুঝতে পারে।

ওয়ালপেপারটায় একটা নকশা ঘুরে ফিরে আসে যেটা দেখে মনে হয় যেন একটা ভাঙা ঘাড়ের উপর থেকে দুটো ড্যাবড্যাবে চোখ উল্টো হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।

ব্যপারটা এতটাই অপ্রাসঙ্গিক যে আমার ভীষণ রাগ হয়। ওপরে-নীচে, এদিকে-ওদিকে ঐ অদ্ভুত চোখগুলো চারিদিক থেকে যেন আমার দিকে অপলকে তাকিয়ে থাকে। ওয়ালপেপার লাগানোর অসামঞ্জস্যতার জন্য একটা জায়গায় চোখগুলো পাশাপাশি থাকার বদলে উপরে-নীচে হয়ে গেছে।

একটা জড়বস্তুর মধ্যে এরকম অভিব্যক্তি আমি আগে কখনও দেখিনি। ছোটবেলায় আর পাঁচটা বাচ্চার মতো খেলনার বদলে খালি দেওয়াল আর সাদামাটা আসবাবপত্রে অনেক বেশী আনন্দ আর উদ্দীপনা খুঁজে পেতাম।

আমাদের লেখার ডেস্কের নবগুলো কেমন মিটমিট করে চেয়ে থাকত, চেয়ারটার সাথে আমার একটা অদ্ভুত রকমের গভীর সখ্যতা ছিল। আমার কেন জানিনা মনে হত যেকোনো ভয়ানক জিনিস বা ব্যাপার থেকে চেয়ারটা আমায় রক্ষা করবে।

এই ঘরের আসবাবপত্রগুলোর মধ্যে কেমন যেন একটা ছন্নছাড়া ভাব। মনে হয় এই ঘরটা যখন জিম হিসেবে ব্যবহার শুরু হয় তখন বাচ্চাদের জিনিসপত্র সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। বাচ্চারা এই ঘরটাকে যেভাবে বিধ্বস্ত করেছে, এমন আমি আগে কোথাও দেখিনি।

একটু আগে যা বলছিলাম, ওয়ালপেপারটা যেখানে সেখানে ছেঁড়া,আবার কোথাও জোড়া-তাপ্পি মারা। মেঝেটার দশাও খুব করুণ। আর এই শোবার ঘরের বিছানাটা দেখে মনে হবে যেন কয়েকটা বিশ্বযুদ্ধ ঘটে গেছে।

ওয়ালপেপারটা ছাড়া অন্য কিছু নিয়ে যদিও আমার বিশেষ মাথা ব্যথা নেই।

আমার ননদ আসছে বোধহয়। ও খুবই ভাল মেয়ে, আমার অসম্ভব খেয়াল রাখে। আমি যে লেখালেখি করি এটা ওকে কোনোমতেই জানতে দেওয়া যাবেনা।

বাড়ির কাজকর্ম করার ব্যপারে ও খুবই যোগ্য আর ভীষণই উৎসাহী। এর থেকে ভাল কোনো পেশা সম্বন্ধে ও ভাবতেও পারেনা।

আমার ধারণা, ও মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে আমার এই লেখালেখি করার অভ্যাসটাই আমার অসুস্থতার মূল কারণ।

ও যখন বাড়ির বাইরে থাকে তখন আমি নিশ্চিন্তে লেখালেখি করতে পারি,জানলা দিয়ে ওকে ফিরতে দেখলেই লেখালেখি বন্ধ করে দিই, পাছে দেখে ফেলে আবার।

জানলাগুলোর একটা দিয়ে বাইরে গাছের ছায়াঘেরা সুন্দর প্যাঁচানো রাস্তাটা পুরো দেখা যায়, অন্যটা দিয়ে গ্রামের অন্য দিকটা। গ্রামটাও কম সুন্দর নয়, চারিদিকে বড় বড় এল্ম গাছ আর মখমলি ঘাসের গালিচায় ছাওয়া।

ওয়ালপেপারের নকশাগুলো জায়গায় জায়গায় ভীষণ অদ্ভুতরকম লাগে, নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় আলো পড়লেই বোঝা যায়, নয়তো নয়।

যে জায়গাগুলো এখন ভাল অবস্থায় আছে এবং সূর্যের আলো বেশ ভাল পরিমাণে পৌঁছয় সেইসব জায়গায় আমি অদ্ভুতরকমের আকারবিহীন অথচ উদ্দীপনা সৃষ্টিকারী এক অবয়ব দেখতে পাই। অবয়বটা যেন সামনে নকশাগুলোর পেছনে আত্মগোপন করে রয়েছে।

সিঁড়িতে আমার ননদের পায়ের আওয়াজ পাচ্ছি!

*

জুলাই-এর ৪ তারিখ কেটে গেল চোখের নিমেষে।সবাই চলে গেছে,আমিও বেশ ক্লান্ত-বিধ্বস্ত। জনের মনে হয়েছিল একটু সঙ্গ পেলে আমার ভাল লাগবে। তাই মা, নেইল আর বাচ্চারা এসেছিল এক সপ্তাহের জন্য।

আমি কোনো কাজই করিনি। জেনিই এখন সবকিছু দেখভাল করছে।

কিছু না করাটাও বিরক্তি উদ্রেক করছে, ক্লান্ত হয়ে পড়ছি একইরকম ভাবে।

জন আমায় ভয় দেখায় যে যদি আমি তাড়াতাড়ি সুস্থ না হয়ে উঠি তবে ও আমায় শরৎকালে উয়ের মিচেলের কাছে পাঠিয়ে দেবে।

কিন্তু আমি ওখানে একদমই যেতে চাইনা। আমার এক বান্ধবী ওর কাছে চিকিৎসার জন্য গেছিল, ও বলেছে মিচেল একদম জন আর আমার ভাইয়ের মতো।

তাছাড়া অত দূরে যাওয়াটাও যথেষ্ট সমস্যার। আমার কোনো কিছু করতেই ভাল লাগেনা। দিন-দিন কেমন খিটখিটে হয়ে যাচ্ছি, কোনো কিছুতেই সন্তুষ্ট হতে পারছিনা। যখন জন বা অন্য কেউ থাকেনা তখন কোনো কারণ ছাড়াই আমি সারাদিন কান্নাকাটি করি। জন তো বেশিরভাগ সময়েই কাজের খাতিরে শহরে যায় আর জেনি আমি চাইলেই আমাকে একা থাকতে দেয়। অনেকটা সময় আমি নিজের মতো কাটাতে পারি।

মাঝে মাঝে আমি বাগানে ঘোরাঘুরি করি, বারান্দায় গোলাপ গাছগুলোর নীচে বসে সময় কাটাই।

ওয়ালপেপারটার বিকট বিরক্তিকর উপস্থিতি সত্ত্বেও কেন জানিনা ঘরটা আমার বেশ ভাল লেগে গেছে, হয়ত ওয়ালপেপারটার জন্যই।

আমি সারাক্ষণ ওয়ালপেপারটার কথাই ভাবি।

আমি এই বিশাল নিশ্চল বিছানায় চুপচাপ শুয়ে-বসে থাকি- ওয়ালপেপারটা ঘন্টায় ঘন্টায় তার নকশাটা পাল্টাতে থাকে। ঠিক জিমন্যাস্টিকসের মতোই সুন্দর লাগে দেখতে। আমি বসে বসে নকশাগুলোকেই লক্ষ্য করতে থাকি।

নকশা সম্বন্ধে আমি একটু আধটু জানি। আমি এটুকু নিশ্চিত যে এর সাথে আমার জানা কোনো কিছুরই কোনো সম্পর্ক নেই – তা সেটা বিকিরণ সূত্র বা পুনরাবৃত্তি, পর্যায়ানুবৃত্তি, প্রতিসাম্য যে সূত্রই হোক না কেন।

তবে এটা ঠিক যে অন্তত চওড়ার দিকে নকশাটার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে।

যেকোনো দিক থেকে দেখলেই মনে হবে যেন একা দাঁড়িয়ে রয়েছে, স্ফীত অংশগুলো বাঁক নিয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে – খানিকটা যেন নষ্ট হয়ে যাওয়া মধ্যযুগীয় রোমান স্থাপত্যের মতো, আর খানিকটা মাতালের প্রলাপের মতো, হেলেদুলে কখন রেখাগুলো উপরে উঠেছে আবার কখন নীচে নেমে সীমানার সাথে মিশে গেছে।

রেখাগুলো আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে কোণাকুণি সংযুক্ত হয়েছে, এঁকেবেঁকে তরঙ্গ হয়ে মিশেছে অদ্ভুত সেইসব ভীতি উদ্রেককারী লেখাগুলোর সঙ্গে।

পুরো নকশাটা অনুভূমিকভাবে আঁকা হয়েছে – দেখে অন্তত তাই মনে হচ্ছে। আমি নকশাটার দিক-ক্রম বোঝার চেষ্টা করতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি।

ছাদে একটা কারুকার্য করার জন্য প্রস্থটিকে অনুভূমিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে – যেটা সুন্দরভাবে বিভ্রান্তিটাকে বাড়িয়ে দিয়েছে।

ঘরের একটা কোণে যেখানে ওয়ালপেপারটা প্রায় অক্ষত অবস্থায় আছে সেখানে সূর্যের নিস্তেজ আলো সরাসরিভাবে পড়ে। আমি বেশ কল্পনা করতে পারি কেন্দ্র থেকে বিকিরিত হয়ে আলোকরশ্মি কেমন অসীমে মিশে যাচ্ছে।

নকশাগুলো অনুধাবন করতে করতে আমি ক্লান্ত। আপাতত একটু ঘুমোবো।

*

আমি জানি না, কেন আমি এগুলো লিখছি।

চাইছি না লিখতে।

লিখতে পারছিও না সেভাবে।

আমি জানি জনের কাছে এটা অযৌক্তিক ঠেকবে। কিন্তু আমার যা মনে হচ্ছে তা বলতে না পারলে আমি তো স্বস্তি পাবো না। তাছাড়া লেখার চেষ্টাটা স্বস্তির থেকে আমায় আরও বেশি কিছু দিচ্ছে।

কিন্তু এইটুকু পেতে আমায় অনেক বেশি চেষ্টা করে যেতে হচ্ছে।

অর্ধেক সময় আমি কুঁড়েমি করে কাটাই। আগে কখনও আমি এরকম শুয়ে-বসে সময় কাটাইনি।

জন বলে, কোনো মতেই আমার সামর্থ্য হারানো উচিত নয়। ও আমার জন্য কড লিভার অয়েল আর আরো কতগুলো টনিক নিয়ে এসেছে, ওয়াইন আর মাংস তো আসতেই থাকে।

জন ভীষণই ভালো। আমায় খুব ভালবাসে। আমায় অসুস্থ দেখতে একদমই পছন্দ করে না। এর মধ্যে একদিন আমি একান্তে জন এর সাথে যুক্তি দিয়ে কথা বলার চেষ্টা করেছিলাম। বলেছিলাম যে ও যাতে আমায় হেনরি আর জুলিয়ার সাথে দেখা করতে যেতে দেয়।

কিন্তু জন বলল, আমি এখনো নাকি যাবার মতো সক্ষম নই শারীরিকভাবে। এবং এই যাওয়াটা আমার শরীরের পক্ষে ভালোও হবে না। আমি অবশ্য ওকে যথেষ্ট সাজিয়ে গুছিয়ে বলেও উঠতে পারিনি যাওয়ার কথাটা। কথা শেষ হওয়ার আগেই কেঁদে ফেলেছিলাম।

আমি কিছুতেই সোজাভাবে ভাবতে পারছি না। আমার স্নায়ুতন্ত্রের দুর্বলতার জন্যই বোধহয়!

জন আমায় আদর করে কোলে তুলে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে এলো, আমায় বিছানায় শুইয়ে দিলো এবং তারপর আমায় গল্প পড়ে শোনাতে থাকলো যতক্ষণ না আমি ক্লান্ত হয়ে পড়লাম।

ও বলছিলো ও আমাকে কতটা ভালবাসে, আমি ওর কতটা জুড়ে। আমাকে নিজের খেয়াল রাখতে বলছিলো, অন্তত ওর জন্য।

ওর মতে একমাত্র আমিই আমাকে ভালো রাখতে পারি। আমি যদি আমার এই অদ্ভূতুড়ে আজগুবি কল্পনাগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পারি, তাহলেই আমি ভালো থাকবো।

আমার বাচ্চাটা ভালো আছে এবং এই অদ্ভুত ওয়ালপেপারওয়ালা ঘরটায় থাকছে না। এটা আমার কাছে যে কি স্বস্তির!

আমরা যদি এই ঘরটায় না থাকতাম তাহলে ঐ ফুটফুটে বাচ্চাটাকে এখানে থাকতে হত! ভাগ্যিস তা হয়নি। আমার এত ছোটো আর কোমল মনের সন্তানকে আমি কিছুতেই এমন একটা ভয়াবহ ঘরে থাকতে দিতে পারিনা।

ব্যাপারটা আমি আগে ভেবে দেখিনি, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে যে জন আমাকে এখানে রেখে ভালোই করেছে। একটা বাচ্চার উপর এই প্রভাব পড়ার থেকে আমার একার পক্ষে এটা সামলানো সহজ হবে।

এসব কথা ওদেরকে বলার বোকামো আর না করলেও ব্যাপারটার উপর নজর আমি ঠিকই রাখি।

ওয়ালপেপারটার মধ্যে অদ্ভুত কিছু ব্যাপার আছে। কেউই লক্ষ্য করে না, কোনোদিন করবেও না; কিন্তু আমি লক্ষ্য করেছি। বাইরের নকশাগুলোর পিছনে অস্পষ্ট রেখাগুলো প্রতিদিন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। রেখাগুলো একইরকম কিন্তু সংখ্যায় বাড়ছে।

যেন একটা মহিলা নীচে ঝুঁকে হামাগুড়ি দিয়ে হাঁটছে। আমার কিরকম অস্ব‌স্তি হয়.. আমার মনে হতে থাকে, জন যদি আমাকে এখান থেকে অন্য কোথাও নিয়ে যায়, ভালো হয়।

*

জনের সাথে আমার এই বিষয় নিয়ে কথা বলা খুবই মুশকিলের ব্যাপার। প্রথমত, ও যথেষ্ট জ্ঞানী এবং আমায় বড্ড বেশি ভালোবাসে।

আমি কাল রাতে চেষ্টাও করলাম কথা বলার। কাল পূর্ণিমা ছিলো। দিনেরবেলায় সূর্যের আলোতে যেমন সবকিছু আলোকিত হয়, কাল রাতে চাঁদের আলোতেও ঠিক তেমনটি হচ্ছিল।

আমার মাঝে মাঝে চাঁদের আলোর এরকম জানলা দিয়ে প্রবেশ করে ধীরে ধীরে গোটা ঘরটায় ছড়িয়ে পড়া একদম ভালো লাগে না।

জন ঘুমিয়ে পড়েছিল, তাই আর ওকে ডাকিনি। আমি একা জেগে দেখছিলাম চাঁদের আলো ওয়ালপেপারটার উপর ঢেউ খেলাচ্ছে। আমার কেমন গা ছমছম করছিল।

অস্পষ্ট অবয়বটা যেন নকশাগুলোকে সরিয়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে বাইরে. আমি বিছানা থেকে উঠে ছুঁয়ে দেখে বোঝার চেষ্টা করলাম ওয়ালপেপারের নকশাগুলো সত্যি নড়ছে কিনা! আমি যখন ফিরলাম জন তখন জেগে।

“কি হয়েছে সোনা?” – জন বলল – “এভাবে হেঁটে চলে বেড়িও না – ঠান্ডা লেগে যাবে।”

আমর মনে হয়েছিল, এটাই ওর সাথে কথা বলার আদর্শ সময়। আমি ওকে বললাম যে, এখানে থেকে আমার কোনো লাভ হচ্ছে না, এখান থেকে আমাকে অন্য কোথাও নিয়ে গেলে ভালো হয়।

ও বলল, “আমাদের চুক্তি তো আর তিন সপ্তাহের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে, তার আগে কি করে যাবো? তাছাড়া বাড়ি মেরামতের কাজ এখনো শেষ হয়নি, আমি এই মুহূর্তে শহর ছেড়ে যেতেও পারবো না – তুমি যদি সত্যি বিপদে থাকতে তাহলে আমি ব্যবস্থা নিতাম। কিন্তু এই জায়গা তোমার শরীর মনের ভালই উন্নতি করছে, সে তুমি বোঝো আর না বোঝো – আমি তো ডাক্তার, আমি বুঝতে পারছি। তোমাকে আগের থেকে অনেক বেশি সতেজ আর প্রাণচঞ্চল দেখাচ্ছে।”

“আমার এখানে আর একমুহূর্তও থাকতে ইচ্ছে করছে না।” – আমি বললাম – “তুমি যখন থাকো তখন হয়ত ভালো থাকি, কিন্তু দিনের বেলা যখন তুমি বাইরে থাকো, প্রতিটা মুহূর্ত দুর্বিষহ হয়ে ওঠে।”

“শান্ত হও সোনা” – আমাকে জড়িয়ে ধরে জন বলল – “তুমি অসুস্থ ভাবলেই অসুস্থ থাকবে। এখন ঘুমিয়ে পড়ো, সকালে আবার কথা বলা যাবে।”

“তাহলে তুমি যাবে না এখান থেকে?” – আমি বিষন্ন স্বরে জিজ্ঞেস করি।

“কী করে যাবো বল? আর মাত্র তিন সপ্তাহ, তারপরেই আমরা কয়েকদিনের জন্য কোথাও ঘুরতে যাবো, সেই ফাঁকে জেনি বাড়িটা গুছিয়ে ফেলবে। বিশ্বাস করো, তুমি সত্যি ভালো আছ -”

“হয়তো শারীরিকভাবে ভালো আছি” – আমি বলি। শুনে জন উঠে বসলো এবং এমন একটা ভর্ত্সনার দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাল যে আমি আর কিছু বলতে পারলাম না।

“দয়া করে আমার আর আমাদের সন্তানের এবং নিজের জন্য এইসব চিন্তা আর মাথাতেও এনো না। তোমার এই আজগুবি কল্পনাগুলোর চেয়ে ভয়ঙ্কর আর কিছু নেই! যতসব আজেবাজে চিন্তাভাবনা। ডাক্তার হিসাবে তুমি আমাকে ভরসা করো তো?

এরপরে আমি আর কোনো কথা বলিনি, জন ঘুমিয়ে পড়েছিলো। ও হয়তো ভেবেছিলো আমিও ঘুমিয়ে পড়েছি, কিন্তু আমি জেগে ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে বোঝার চেষ্টা করছিলাম সামনের এবং পিছনের নকশাগুলো কি একসাথে আন্দোলিত হয় না আলাদাভাবে।

*

দিনের আলোয় দেখলে নকশাটার মধ্যে ধারাবাহিকতার অভাব পাওয়া যাবে, একটা অপরিবর্তনীয় এবং বিরক্তিকর ব্যাপার।

রঙটা অবিশ্বাস্যভাবে অসহনীয় ও তীব্র বিরক্তিকর। নকশাটা ভীষণরকম যন্ত্রণাদায়ক।

তুমি যেই ভাববে যে নকশাটার এঁকেবেঁকে চলার ধরণটা বুঝতে পেরেছ অমনি রেখাগুলো উল্টে ডিগবাজি খেয়ে সব গুলিয়ে দেবে। একটা দুঃস্বপ্নের মতো এটা তোমাকে মেরে, পিষে বিলুপ্ত করে দিতে চাইবে।

বাইরের নকশাটা একধরনের ব্যাঙের ছাতার আকার ধারণ করেছে – যেন একগুচ্ছ ব্যাঙের ছাতা একটা সুতোয় একসাথে কুন্ডলী পাকিয়ে রয়েছে, কোনোটা সবে অঙ্কুরিত হচ্ছে, কোনোটা সদ্য ফুটেছে – এটা আমার ভালো লাগে মাঝেমাঝে।

ওয়ালপেপারটার মধ্যে একটা অদ্ভুত ব্যাপার আছে, যেটা আমি বাদে কেউই খেয়াল করেনি. আলোর পরিবর্তনের সাথে সাথে এটাও পরিবর্তিত হয়।

যখন পুবের জানলা দিয়ে সূর্যের আলো এসে পড়ে – প্রথম আলোক রশ্মি – এত তাড়াতাড়ি ওয়ালপেপারটার পরিবর্তন দেখা যায় যে আমিই বিশ্বাস করে উঠতে পারি না মাঝে মাঝে! তাই আমি সবসময় মনোযোগ সহকারে এটাকেই লক্ষ্য করতে থাকি।

জ্যোৎস্না রাতে, সারারাত ঘরে যখন অবিরাম চাঁদের আলো খেলা করে, মনে হয় যেন এটা সম্পূর্ণ একটা অন্য ওয়ালপেপার। রাতের বেলা যেকোনো ধরণের আলোতেই বাইরের নকশার আঁকাবাঁকা রেখাগুলো হঠাৎ সোজা হয়ে যায়। আর পিছনে মহিলার অবয়বটা বেশি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

আমার বুঝতে অনেকদিন সময় লেগেছে যে বাইরের নকশার পিছনে অস্পষ্ট অবয়বটা আসলে একটা মেয়ের।

দিনের আলোয় তার অস্তিত্ব টের পাওয়া যায় না। আমি কল্পনা করি যে এই নকশাগুলো মেয়েটিকে আটকে রেখেছে। ব্যাপারগুলো এতটাই বিভ্রান্তিকর যে আমি ঘন্টার পর ঘন্টা চুপচাপ বসে বোঝার চেষ্টা করি।

আমি আজকাল আগের থেকে বেশি শুয়ে-বসে কাটাই। জন বলে এটা আমর শরীরের জন্য ভালো। আমি যত ঘুমোবো, তত তাড়াতাড়ি নাকি আমি সুস্থ হয়ে উঠব।

প্রত্যেকবার খাবার পর অন্তত এক ঘন্টা করে জন আমাকে ঘুমোনোর জন্য বলতো। কিন্তু আমি ঘুমোতাম না, চুপচাপ শুয়ে ঘুমোবার ভান করতাম।

আজকাল জনকে আমার ভয় লাগে – ও উদ্ভট ব্যবহার করে মাঝেমাঝেই, জেনিও কেমন অদ্ভুতভাবে তাকায়!

যুক্তি দিয়ে ভাবতে গেলে মনে হয়, এসবই ওই ওয়ালপেপারটার জন্য।

আমি লক্ষ্য করে দেখেছি জন মাঝে মাঝে এই ঘরে ঢুকে ওয়ালপেপারটার দিকে তাকিয়ে থাকে – জেনিও! কয়েকবার আমার কাছে ধরাও পড়ে গেছে।

আমি ঘরে নেই ভেবে জেনি ওয়ালপেপারটার দিকে তাকিয়েছে, আমি খুব শান্ত স্থির গলায় জিজ্ঞেস করে উঠেছি যে ও কি দেখছে। জেনি ভীষণ ঘাবড়ে গেছে প্রতিবারই। রেগেও গেছে, আমি ওকে চমকে দিয়েছি বলে। তারপরে বলেছে, ও আমার আর জনের জামাকাপড়ে ওয়ালপেপারের হলুদ রঙ পেয়েছে।

জেনি কথা ঘোরানোর চেষ্টা করলেও আমি জানি ও ওই নকশাগুলো বোঝার চেষ্টা করছিল। কিন্তু আমি নিশ্চিত আমি ছাড়া ওটা আর কেউ বুঝতে পারবে না।

*

জীবন এখন আগের থেকে আরো বেশি রোমাঞ্চকর। এখন আমার জীবনে ভাবনাচিন্তা করার জন্য যথেষ্ট উপাদান মজুত। এখন আগের থেকে অনেক ভালোভাবে খাওয়াদাওয়া করতে পারছি।

আমাকে ভালো হতে দেখে জনও ভীষণ খুশি। ও হেসে বলছিল যে আমি কেমন ওই ওয়ালপেপারটার উপস্থিতি সত্তেও ভালো আছি। আমিও হেসেছিলাম। কিন্তু আমি ওকে বলিনি যে, ওয়ালপেপারটার জন্যই আমি ভালো আছি! বললে আমি নিশ্চিত ও আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করতো। হয়ত আমাকে এখান থেকে অন্য কোথাও সরিয়ে নিয়ে যেতো!

যতক্ষণ না আমি এই ওয়ালপেপার রহস্যটার সমাধান করছি ততক্ষণ আমি এখান থেকে যেতে চাই না, হাতে আর একটা সপ্তাহ – এটুকুই যথেষ্ট।

*

অনেকদিন বাদে খুব ভালো লাগছে সবকিছু! আমি রাতে বেশি ঘুমোই না, নকশাগুলো দেখতে ভারী ভালো লাগে. দিনেরবেলা ঘুমিয়ে পুষিয়ে নিই।

দিনেরবেলা ব্যাপারটা বড্ড জটিল আর ক্লান্তিকর হয়ে যায়।

নকশাগুলো সবসময়ই পরিবর্তিত হচ্ছে, সঙ্গে হলুদ রংটাও। আমি খুব মনোযোগ সহকারে পরিবর্তনটা লক্ষ্য করার চেষ্টা করছি।

ওয়ালপেপারের হলুদ রঙটা ভীষণ অদ্ভুত! এটা আমাকে আমার দেখা সমস্ত বিচ্ছিরি রকমের হলদে জিনিসের কথা মনে করিয়ে দেয়।

ওয়ালপেপারটায় একটা অদ্ভুত গন্ধ আছে। এই ঘরটায় প্রথমবার ঢুকেই আমি পেয়েছিলাম গন্ধটা। আলো-বাতাসের প্রাচুর্য্যে খারাপ লাগছিল না। কিন্তু গত এক সপ্তাহ ধরে বৃষ্টি হওয়ায় গন্ধটা ধীরে ধীরে সারা বাড়িতে ছড়িয়ে পড়েছে – এমনকি আমার চুলেও! যেখানে যাচ্ছি, সেখানেই গন্ধটা পাচ্ছি। আজব একটা গন্ধ! ঠিক যেন কিসের মতো – ঠিক মাথায় আসছে না।

গন্ধটা খারাপ নয়, কিন্তু এত অস্পষ্ট অথচ স্থায়ী গন্ধ আমি আগে কোনোদিন পাইনি।

এই স্যাঁতস্যাঁতে আবহাওয়ায় গন্ধটা বীভৎস লাগছে। রাত্রিবেলা হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে যায় এই গন্ধে।

গন্ধটা প্রথম প্রথম আমায় খুব বিরক্ত করত। বিরক্তি এতটাই বেড়ে গেছিল যে আমি পুরো বাড়িটা জ্বালিয়ে দিতে চেয়েছিলাম।

এখন গন্ধটার সাথে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। আমার খালি মনে হয় যে গন্ধটা ওয়ালপেপারটার বিচ্ছিরি হলুদ রঙের মতো – একটা হলদে গন্ধ!

দেওয়ালের নীচের দিকে যেখানে ঝাঁটা রাখা থাকে, সেখানে একটা বিদঘুটে দাগ আছে। আঁকাবাঁকা, যেটা সারা দেওয়াল জুড়ে ছড়িয়ে গেছে – গোল গোল গোল গোল দাগ।

আমি ভাবি, এটা কে বা কারা করেছে, কেমনভাবে করেছে আর কিসের জন্য? দাগগুলো এমনভাবে ছড়িয়েছে যে একদৃষ্টিতে কিছুক্ষণ দেখলে মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করতে শুরু করে।

*

এতদিন বাদে আমি একটা জিনিস আবিস্কার করেছি। রাতের বেলা যখন ওয়ালপেপারটা পরিবর্তিত হয়, তখন লক্ষ্য করতে গিয়েই ব্যাপারটা খেয়াল করি প্রথম।

ওয়ালপেপারের সামনের নকশাগুলো নড়াচড়া করে না, পেছনে থাকা মেয়েটা নকশাগুলোকে ঝাঁকায়। যেন গরাদের ভেতর আটকে থাকা কোনো মানুষ গরাদ ভেঙ্গে মুক্তি পেতে চাইছে।

মাঝে মাঝে মনে হয় নকশাগুলোর পিছনে একজন নয়, অসংখ্য মেয়ে আটকে আছে. মেয়েগুলো তাড়াতাড়ি হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে আর সেজন্যই সামনের নকশাগুলোতে ঝাঁকুনি লাগছে। আলোতে ওরা স্থির হয়ে থাকে, আর সামান্যতম অন্ধকারে সর্বশক্তি দিয়ে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করে, কিন্তু পারে না। কারণ নকশাগুলো পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করার চেষ্টা করে।

মেয়েগুলো চেষ্টা করে – নকশাটা পেঁচিয়ে, টেনে নীচে নামিয়ে আনে – নকশার প্যাঁচে আটকে মেয়েগুলোর চোখ তখন প্রায় সাদা হয়ে আসে।

*

আমার মনে হয় মেয়েটা দিনের বেলা বাইরে বেরোয়।

আমি জানলাম কিভাবে? কারণ আমি দেখেছি।

এই ঘরটার সবকটা জানলা দিয়ে আমি ওকে দেখতে পাই।

আমি জানি ওটা ওই মেয়েটাই, কারণ ও সবসময়েই হামাগুড়ি দেয়। দিনের বেলা আর কাউকে এমন করতে দেখা যায়না।

লম্বা রাস্তাটায়, গাছের ছায়ায়, আঙুর ক্ষেতে, বাগানে, সারাদিন মেয়েটা এভাবে হামাগুড়ি দিয়ে বেড়ায়, আর যখনই রাস্তায় কোনো গাড়ি আসে, ও পাশের কালো আঙুরের ক্ষেতটাতে লুকিয়ে পড়ে।

আমি যদিও এতে কোনো দোষ দেখিনা। দিনের বেলা হামাগুড়ি দিতে ধরা পড়লে সেটা সত্যিই খুব লজ্জাকর।

আমি দিনের বেলা হামাগুড়ি দেবার সময় দরজা বন্ধ করে রাখি। রাতে এমন করতে পারিনা। জন নিশ্চয়ই কিছু সন্দেহ করবে।

জন আজকাল এমন হয়ে থাকে যে আমি ওকে বিরক্ত করতে ভয় পাই। কেন যে ও নিজের জন্য অন্য একটা ঘর নেয়না! তাছাড়া আমি চাই না অন্য কেউ মেয়েটাকে বাইরে আসতে দেখুক।

কখনও কখনও ভাবি, ওকে কি সব জানালাগুলো দিয়েই একসাথে দেখা যায়? যত তাড়াতাড়িই ঘুরি না কেন, একবারে একটার বেশি জানালা দিয়ে আমি দেখতে পারিনা।

ও নিশ্চয়ই বুকে হেঁটেও আমার থেকে বেশি তাড়াতাড়ি চলে।

এই ফাঁকা, খোলা গ্রামটায় ও ঘুরে ঘুরে বেড়ায়, দমকা হাওয়ায় মেঘের ছায়ার থেকেও তাড়াতাড়ি চলে ও বুকে হেঁটে।

*

যদি উপরের নকশাটা সরিয়ে নীচের নকশাটা বের করে আনা যায় – আমি একটু একটু করে চেষ্টা করি।

আমি আরেকটা মজার জিনিস খুঁজে পেয়েছি, কিন্তু সেটা কেউই বিশ্বাস করবে না। আর দু’দিনবাদেই ওয়ালপেপারটা থেকে মুক্তি। আমার বিশ্বাস জন কিছু একটা আন্দাজ করেছে। ওর তাকানোটা আমার একদম ভালো লাগছে না।

জন আমার সম্পর্কে জেনিকে প্রশ্ন করছিল -আমি আড়াল থেকে শুনেছি। জেনি যদিও ভালো ভালো কথাই বলেছে। ও বলেছে, দিনেরবেলা আমি যথেষ্ট পরিমাণে ঘুমোই।

জন জানে আমি রাতে ভাল করে ঘুমোই না – জন আমাকেও ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নানা রকম প্রশ্ন করেছে – আদর করার ছলে।

আমি যেন জানি না, কেন!

তিনমাস ধরে এই ওয়ালপেপারওয়ালা ঘরটায় থাকার ফলেই ও হয়ত এরকম ব্যবহার করছে। আমি তাই অবাক হই না।

আমি নিশ্চিত জন ও জেনি দু’জনেই ভিতরে ভিতরে এই ওয়ালপেপারটার দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে।

*

যাক! আজ এই বাড়িতে আমাদের শেষ দিন। যদিও একদিনই যথেষ্ট। জন কাল সারারাত শহরে ছিলো, আজ সন্ধ্যের আগে ফিরবে না। জেনি কাল রাতে আমার সাথে শুতে চেয়েছিলো – চালাকি করে! আমি বলেছিলাম যে, একা শুলেই আমি নিঃসন্দেহে ভালো ঘুমাতে পারবো।

যদিও আমি একমুহুর্তের জন্যও একা ছিলাম না। জ্যোৎস্না এসে পড়তেই নকশার পিছনে থাকা মেয়েগুলো হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে আসার জন্য নকশাটা ঝাঁকাছিল, আমিও উঠে দৌড়ে গেছিলাম ওদেরকে সাহায্য করতে।

কখনও আমি টানছিলাম, ওরা ঝাঁকাচ্ছিলো, আবার কখনো ওরা টানছিলো, আমি ঝাঁকাচ্ছিলাম। এভাবে সকাল হবার আগেই আমরা অনেকটা ওয়ালপেপার ছিঁড়ে ফেলেছি।

সূর্য উঠতে যখন নকশাগুলো আমার উপর হাসতে শুরু করলো – আমি তখনই ঠিক করে নিয়েছি আজকেই পুরো ওয়ালপেপারটা ছিঁড়ে শেষ করতে হবে।

আমরা কালকেই চলে যাবো। এবং চাকরবাকররা আমার সমস্ত আসবাবপত্রগুলোকে নীচে নিয়ে যাচ্ছে, যেখানে আগে ওগুলো ছিলো।

জেনি অবাক হয়ে ওয়ালপেপারটার অবস্থা দেখছিলো। আমি আনন্দের সাথেই ওকে বললাম যে, আমি ওটার উপর আমার আক্রোশ মিটিয়েছি ঐভাবে ছিঁড়ে। ও হেসে বলল যে ও নিজেও এরকমটা করতে চেয়েছিল। এইসব করতে গিয়ে আমি যেন নিজেকে অহেতুক ক্লান্ত করে না ফেলি।

এটা বলতে গিয়ে ও আসলে ওর ভিতরের সত্যিকারের ইচ্ছেটা আমার সামনে প্রকাশ করে ফেললো।

কিন্তু আমি ছাড়া দ্বিতীয় কোনো জীবন্ত মানুষকে এই ওয়ালপেপারটাকে ছুঁয়ে দেখতে দেবো না।

জেনি আমাকে কৌশলে এই ঘর থেকে বের করার চেষ্টা করছিল। আমি ওকে বললাম যে আমি এখন আবার ঘুমোবো, রাতের খাবারের জন্যও যেন আমাকে না ডাকে। আমি যদি জেগে যাই, তো আমি নিজেই ওকে ডেকে নেবো।

জেনি চলে গেছে, চাকর-বাকররাও। আমরা আজ রাতে নীচের ঘরে সব সরিয়ে, কালকে বাড়ি চলে যাবো। ঘরটা আবার প্রথম দিনের মতো ফাঁকা – খালি মস্ত খাটটা রয়ে গেছে। খুব স্বস্তি লাগছে।

বাচ্চাগুলোর দস্যিপনার ছাপটা এখনও স্পষ্ট – বিছানার তোষকটাকে চিবিয়ে একাকার করেছিলো ওরা।

আমাকে আমার কাজটা আবার শুরু করতে হবে।

আমি দরজাটা বন্ধ করে জানলা দিয়ে চাবিটা নীচে ফেলে দিয়েছি – সামনের রাস্তায়। আমি চাই না জন আসার আগে আর কেউ এই ঘরে আসুক।

আমি জনকে চমকে দিতে চাই। জেনির অলক্ষ্যে আমি একটা দড়ি জোগার করে নিয়ে এসেছি। যদি মেয়েটা বেরিয়ে আসে, এবং চলে যেতে চায় তাহলে আমি ওকে বেঁধে ফেলবো।

আমি বেশি দূর অব্দি ওয়ালপেপারটা ছিঁড়তে পারবো না, যদি না আমি উপরে ওঠার জন্য কিছু পাই। খাটটাও সরানো যাবে না। সরানোর চেষ্টা করলাম, কিন্তু একচুল নড়লো না। মাথাটা গরম হয়ে যাচ্ছে। নকশাগুলো আমার অসহায়তা উপভোগ করছে! উপহাস করে চিৎকার করছে!

আমি এতটাই রেগে আছি যে, বেপরোয়াভাবে কিছু করে বসবো হয়তো। জানলার গরাদগুলো না থাকলে হয়তো জানলা দিয়ে লাফই মেরে বসতাম এতক্ষনে!

মাথাটা ঠান্ডা রাখতে হবে। এরকম কিছু করে বসলে চলবে না।

আমি জানলা দিয়ে বাইরে তাকাতেও চাইছি না। বাইরে অনেক মেয়ে জোরে জোরে হামাগুড়ি দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমার মতো ওরা সবাই ওয়ালপেপারের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছে।

কিন্তু আমি আমার যোগাড় করা দড়িটা দিয়ে ভালোমতোই বাঁধা। আমাকে ওই রাস্তায় নিয়ে ফেলতে পারবে না কেউ।

রাতের বেলা আমাকে আবার হয়ত নকশাগুলোর পিছনে চলে যেতে হবে! সেটা ভেবে ভালো লাগছে না।

ওয়ালপেপারের ভেতর থেকে বেরিয়ে এই ঘরটা জুড়ে হামাগুড়ি দিয়ে বেড়াতে কী ভালোই না লাগে!

আমি বাইরে যেতে চাইনা। জেনি বললেও না। বাইরে মাটিতে হামাগুড়ি দিতে হবে, আর মাটিতে সব সবুজ। ভেতরে এই হলদে মেঝেতে কত আরামে হামা দেওয়া যায়।

জন দরজা ধাক্কাচ্ছে।

কিন্তু তুমি তো দরজা খুলতে পারবে না জন।

জন আমার নাম ধরে ডাকছে আর দরজা খুলে দিতে বলছে ধাক্কা দিয়ে। তারপর কাউকে একটা কুড়ুল এনে দিতে বলল চিৎকার করে।

এত সুন্দর কাঠের দরজাটা ভেঙ্গে ফেললে খুব বাজে ব্যাপার হবে। তাই আমি শান্ত গলায় বললাম – “জন, চাবিটা নীচে পথের সামনে একটা কলাপাতার তলায় পড়ে আছে।”

কয়েক মিনিট চুপ থেকে জন খুব আস্তে আস্তে বলল – “সোনা, দয়া করে দরজাটা খুলে দাও।” আমি বললাম – “আমি তো খুলতে পারবো না, চাবিটা কোথায় তোমাকে বললাম যে!”

তারপর আমি বেশ কয়েকবার ওই একই কথা বলতে ও নীচে গিয়ে চাবিটা নিয়ে এলো। দরজা খুলেই চীৎকার করে জিজ্ঞেস করলো – “ কী হয়েছে? করছো-টা কী তুমি?”

আমি ঘাড় বেঁকিয়ে জনকে দেখলাম হামাগুড়ি দিতে দিতে। বললাম – “তোমার আর জেনির কড়া নজরদারি সত্ত্বেও আমি নিজেকে মুক্ত করতে পেরেছি। ওয়ালপেপারটার যা অবস্থা করেছি, তাতে তোমরা চাইলেও আমাকে আর ওর আড়ালে পাঠাতে পারবে না।”

এ কী! জন জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গেল কেন? তাও এক্কেবারে আমার পথের সামনে!

প্রতিবার এখন ওর উপর দিয়েই আমাকে হামাগুড়ি দিয়ে যেতে হচ্ছে!

***

শার্লট পার্কিনস গিলম্যান

শার্ল‌ট পারকিন্স গিলম্যানশার্লট পার্কিনস গিলম্যান (১৮৬০-১৯৩৫)। প্রখ্যাত আমেরিকান সমাজতত্ত্ববিদ, সাহিত্যিক এবং নারীবাদী। শৈশবেই বাবার দ্বারা পরিত্যক্ত শার্লটের জীবনের একটা অংশ কেটেছে মা মেরি পার্কিনস এবং ভাই থমাস অ্যাডিকে নিয়ে অত্যন্ত দারিদ্র্য এবং অনিশ্চয়তার মধ্যে। মায়ের সাথেও শার্লটের সম্পর্কের সমীকরণটা ছিলো বেশ জটিল। ফলত একাকীত্ব, দারিদ্র্য এবং অনিশ্চয়তা শার্লটের জীবনের প্রতিমুহূর্তের সঙ্গী হয়ে থেকেছে। অনিশ্চয়তা ছাপ ফেলেছে তাঁর শিক্ষাজীবনেও, চার বছর সময়কালের মধ্যে সাতবার স্কুল পালটেছে শার্লটের। আশৈশব অনুপস্থিত বাবার অর্থ সাহায্যেই  রোড আইল্যান্ড স্কুল অফ ডিজাইন-এ ভর্তি হন ১৮৭৮ সালে, এবং এইসময়েই আর্থিকভাবে স্বনির্ভর হবার প্রচেষ্টা শুরু হয়। ১৮৮৪ সালে শিল্পী চার্লস ওয়াল্টার স্টেটসনের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন, সেই বছরই জন্ম হয় তাঁদের একমাত্র মেয়ে ক্যাথরিনের। কিন্তু এই বিবাহিত জীবনও খুব সুখের হয়নি। পরিণাম বিবাহবিচ্ছেদ। ক্যাথরিনের জন্মের ঠিক পরেই মানসিকভাবে অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়েন  শার্লট – পোস্ট পার্টা‌ম ডিপ্রেশন। মনোবিদ তাঁকে সম্পূর্ণ বিশ্রাম এবং সৃজনশীল ভাবনাচিন্তা থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেন, চার দেওয়ালের মধ্যেকার বন্দী জীবনে শার্লট সুস্থ হবার বদলে আরও বেশি করে বিষাদগ্রস্ত হয়ে পড়েন। শার্লট-চার্লসের বিবাহিত জীবনের টানাপোড়েন, ক্যাথরিনের জন্মপরবর্তী শার্লটের মানসিক অবসাদ… এই সবকিছুই প্রতিফলিত হয়েছে শার্লটের বিখ্যাত ছোটগল্প “দ্য ইয়েলো ওয়ালপেপার”-এ।

নারী আন্দোলনের সাথে ওতোপ্রোতভাবে জড়িত গিলম্যানের লেখায় বারবার উঠে এসেছে পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় আমেরিকার শোষিত-নিপীড়িত নারীর সামাজিক-পারিবারিক-অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক অবস্থান। “দ্য ইয়েলো ওয়ালপেপার”-এর প্রধান নারী চরিত্র এবং তার মানসিক অবসাদের বর্ণনার মাধ্যমে আসলে শার্লট প্রতিবাদ করেছেন নারীদের উপর  চিকিৎসাশাস্ত্র এবং তার পেশাগত শোষণের বিরুদ্ধে। ‘সম্পূর্ণ বিশ্রামে’র নিদান ঘরবন্দী যেকোনো মানুষকে খুব সহজেই মানসিক অবসাদের দিকে ঠেলে দিতে পারে। পিতৃতান্ত্রিক সমাজে ভালোবাসা, যত্ন, সুরক্ষা ইত্যাদি তথাকথিত ‘ইতিবাচক’ ব্যাপারগুলোও কতটা নিপীড়নমূলক হতে পারে, এগুলোর ভিতরেও কত তীব্র পিতৃতান্ত্রিক শোষণ লুকিয়ে থাকতে পারে, তা এই ছোটগল্পটিতে শার্লট সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। গল্পটির মাধ্যমে লেখিকা অত্যন্ত দক্ষতার সাথে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সাথে ওতোপ্রোতভাবে মিশে থাকা নিতান্ত স্বাভাবিক ঘটনাক্রম বা ব্যবহারের তথাকথিত স্বাভাবিকত্ব নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন।গল্পটিতে গথিক সাহিত্যের সমস্ত রসদই মজুত। গল্পের শুরু থেকে শেষ অব্দি পিতৃতন্ত্র কীভাবে তার হিংস্র নখ-দাঁত অদৃশ্য রেখেও কত ভয়াবহভাবে এবং সূক্ষ্মতার সাথে নারীজাতির জীবনে আঘাত হানতে পারে, তার এক অনন্য দলিল হয়ে থেকে গেছে। উনিশ শতকের শেষ দিকে লেখা এই গল্প সমকালীন নারী আন্দোলনে তেমন গুরুত্ব লাভ না করলেও ১৯৬০-এর দশকে নারী আন্দোলনের ২য় পর্যায়ের এক গুরুত্বপূর্ণ পাঠ্য হিসাবে স্বীকৃত হয়।

“দ্য ইয়েলো ওয়ালপেপার” প্রকাশিত হয় ১৮৯২ সালে। আর ১৮৮৪ সালে প্রকাশিত ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস এর বিখ্যাত বই The Origin of the Family, Private Property, and the State, যার বিষয়বস্তু বর্তমান পরিবারব্যবস্থার গড়ে ওঠার সুদীর্ঘ নৃতাত্ত্বিক ইতিহাস এবং তার সাথে সম্পত্তির মালিকানা, রাষ্ট্র তথা অর্থনীতির সম্পর্ক। এঙ্গেলসের বইতে নৃতাত্ত্বিক ইতিহাসের হাত ধরে উঠে এসেছে পরিবারব্যবস্থার গড়ে ওঠার সাথে ব্যাক্তিগত সম্পত্তির মালিকানার গভীর সম্পর্ক, কীভাবে ব্যক্তিগত সম্পত্তির উত্তরাধিকারী নির্বাচনের জন্য গোটা নারীজাতির জীবন নিয়ন্ত্রিত হয়ে যায়, গড়ে ওঠে পিতৃকেন্দ্রিক সভ্যতা। আর সম্পত্তির মালিকানাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই পিতৃকেন্দ্রিক ব্যবস্থায় নারীই ধীরে ধীরে পুরুষের সম্পত্তি বলে বিবেচিত হতে থাকে দেশ, কাল, জাতি, ধর্মভেদে।নারী যেহেতু পুরুষের (পরিবারের কর্তার) ব্যক্তিগত সম্পত্তি, তাই তার ভালো মন্দ প্রতিটা পদক্ষেপ নির্ধারিত হয় সেই পুরুষটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নিজের জীবনের উপর নারীর কোনও অধিকার নেই। এই পিতৃকেন্দ্রিক সভ্যতাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সমাজব্যবস্থায় ব্যক্তিগত ইতিবাচক মানবিক বন্ধনগুলোর মধ্যেও এই মানসিকতা প্রকাশ হতে থাকে এবং ধীরে ধীরে স্বাভাবিকত্বের রূপ নেয়, সমাজে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। তথাকথিত দৃশ্যমান হিংস্রতার থেকেও ভয়াবহভাবে এই ‘স্বাভাবিক সম্পর্ক’ই নারীজীবনের বিকাশের ক্ষেত্রে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়, নারীজীবনকে নির্দিষ্ট গণ্ডীর মধ্যে বেঁধে ফেলে, তার প্রতিটা শ্বাসপ্রশ্বাসকে নিয়ন্ত্রণ করতে উদ্যত থাকে। এঙ্গেলসের বইটিতে পরিবার নিয়ে যে তাত্ত্বিক আলোচনা রয়েছে, শার্লট সেই তত্ত্বের বাস্তবতা এবং প্রাসঙ্গিকতাকে তাঁর ছোটো গল্পে সাবলীল ভাষায় প্রতিফলিত করেছেন। এই বইটিতেই এঙ্গেলস বর্তমান পরিবার প্রথার সূচনাকে “the world historical defeat of the female sex” বলে চিহ্নিত করেছেন। আর “দ্য ইয়েলো ওয়ালপেপারে”র কথকের জীবনের ঘটনাসমূহ এঙ্গেলসের সেই বক্তব্যকেই প্রতিষ্ঠিত করেছে। কীভাবে পরিবার আর তার ভালবাসার নিয়মের ঘেরাটোপে এক সম্ভাবনাময় লেখিকার অস্তিত্ব সঙ্কটাপন্ন হয়ে ওঠে, কীভাবে তার স্বাভাবিক স্বতঃস্ফূর্ত সক্রিয়তাকে অবদমিত করে রাখার প্রচেষ্টা চলে দাম্পত্য প্রেমের আড়ালে।

উনিশ শতকের প্রেক্ষাপটে নারী জীবনের এক অতীব গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় প্রতিফলিত হয়েছে শার্লটের এই গল্পে। অন্দরমহলের ঘেরাটোপ পেরিয়ে বহির্বি‌শ্বের দ্বার মেয়েদের জন্য তখনও তেমন ভাবে উন্মুক্ত হয়নি। প্রথম পর্যায়ের নারী আন্দোলন প্রবহমান হলেও সমান মজুরি, ভোটাধিকার ছাড়িয়ে তার স্রোত ব্যাক্তিজীবনে নারীর উপর হওয়া শোষণকে চিহ্নিত করে উঠতে পারেনি তখনও। চিহ্নিত হয়নি নারীর শোষণ বঞ্চনার পিছনে সহস্রাব্দ প্রাচীন পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার অবদান। এইরকম এক সামাজিক পটভূমিকায় মেয়েদের জ্ঞানচর্চা, লেখালিখি তার অবাধ্যতা হিসাবে পরিগণিত হত। স্বাভাবিকভাবেই এই গল্পের কথক খানিক উপলব্ধি করেও চিহ্নিত করে উঠতে পারেনি তার চারপাশের প্রেম, ভালবাসা, স্নেহ, সুরক্ষা এবং যত্নের আড়ালে লুকিয়ে থাকা শোষণের বেড়াজালকে। তবে স্বতঃস্ফূর্তভাবেই তার মধ্যে পিতৃতান্ত্রিক সমাজের বিরুদ্ধে অদম্য অবাধ্যতার রসদ মজুত ছিল, যা প্রকাশ পেয়েছে তার কল্পনার বন্দিনী নারীকে মুক্ত করার প্রচেষ্টায়। গল্পটিতে খুব সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে কীভাবে ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’ এই দাবিতে যেকোনো নারীর জীবনের সব কিছু নিয়ন্ত্রিত হয়ে যায়, অবদমিত করে রাখা যায় তার প্রতিভার বিকাশ। গল্পটি প্রশ্ন তুলেছে আমাদের প্রতিদিনের জীবনের গভীরে প্রোথিত ‘যত্ন’, ‘সুরক্ষা’ ইত্যাদি ধারণার ন্যায্যতার উপর। আদৌ কি এগুলো একজন মানুষকে স্বস্তি দিতে পারে? নাকি তাকে আরও আরও অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সম্মুখীন করায়। স্ত্রীর প্রতি স্বামীর ভালোবাসা, আদরযত্ন,দায়িত্ববোধের মিশ্রণে যে ঘেরাটোপ তৈরি হয়েছে তা গল্পের কথকের স্বতন্ত্র ব্যক্তিস্বত্তাকে অবদমিত করে রাখে।জীবনের থেকে অনেক দূরে চারদেওয়ালের মধ্যে বন্দি মেয়ে তা সম্পূর্ণরূপে চিহ্নিত করতে না পারলেও সে নিজের চিন্তাশীল মন, লেখিকা সত্বাকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা জারি রাখে। কিন্তু সেই প্রয়াসে ক্রমাগত বাধা তাকে মানসিকভাবে আরও বিপর্যস্ত করে তোলে। মানসিক ভারসাম্য হারিয়েও তার ভেতরে এই অদৃশ্য খাঁচা ভেঙে ফেলার তাগিদ মুছে যায় না, তাই তো তার কল্পনার জগতে হলদে ওয়ালপেপারের নকশার আড়ালে বন্দি মেয়েটিকে মুক্ত করতে চায় সে।

সম্পূর্ণ অচেনা এক পটভূমিতে লেখা এই গল্পটার শুরুতে আমার পরিচিত জগতের সাথে মেলাতে একটু অসুবিধা হলেও, গল্প যত এগোয়, কথকের ভালো-খারাপ লাগার কথা, অনুভুতির বহিঃপ্রকাশ যত তার সামাজিক, পারিবারিক অবস্থানকে স্পষ্ট করে তোলে, ততই দেশ-কাল-কাঁটাতারের সীমানা পেরিয়ে সে মিশে যায় আমার আর আমার চেনাজানা মানুষগুলোর জীবনের সাথে। ছত্রে ছত্রে অনুভূত হয় কথকের জীবনে প্রবহমান তীব্র অবসাদ। কথকের সাথে তার স্বামীর সম্পর্কটা খানিকটা এইরকম – সময়মত ওষুধ-খাবার-যত্নই কথক কে সুস্থ করে তুলবে বলে তার স্বামীর ধারণা। কিন্তু জীবনের কোলাহল থেকে এত দূরে এই বন্দী দশাই যে তার অস্তিত্বকে সংকটের মুখে ফেলে দিচ্ছে আর এই সংকট তাকে শারীরিক-মানসিকভাবে ভেঙ্গে ফেলছে সেটা যুক্তিবোধসম্পন্ন ডাক্তার স্বামী বুঝতে চায় না, ভালো থাকার একটাই উপায় তার জানা, সেটা সকালবিকেল ওষুধ খাওয়া এবং ঘুমোনো – এর বাইরে গিয়ে তার স্ত্রীর অন্য যেকোনো পদক্ষেপ বা ভাবনাচিন্তা জন আর পাঁচটা স্বামীর মতই নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়। বুঝতে চায় না, তার স্ত্রীরও একটা নিজস্বতা আছে, ভাবনাচিন্তা করার ক্ষমতা আছে, সে লিখতে ভালবাসে, ভাবতে ভালবাসে। এগুলো করতে না পারলেই সে বেশি খারাপ থাকবে। পেটে দানাপানি পড়ার থেকেও বেশি জরুরি তার ভাবনাচিন্তার জন্য প্রয়োজনীয় খোরাক, যা চার দেওয়ালের মধ্যে সম্ভবপর নয়। কিন্তু সেই অসম্ভব ব্যাপারটাকেও সম্ভব করে তোলে কথক। ওয়ালপেপারের মধ্যেই খুঁজে নেয় তার খোরাক। নিজেরই প্রতিচ্ছবি দেখতে পায় নকশার আড়ালে বন্দী মেয়ের অবয়বের মধ্যে।

প্রথম বিশ্বের এক নারীর জীবনের সাথে ভারতবর্ষের নারীর জীবন অনায়াসে এক হয়ে যায়।আমাদের প্রতিদিনের জীবনের অভিজ্ঞতা খুব সহজেই মিলে যায় আলোচ্য গল্পের কথকের সাথে। তাই গল্পটি পড়ার এবং অনুবাদ করার মুহূর্তে তীব্রভাবে কথকের চার দেওয়ালের মধ্যে বন্দী জীবনের বিষাদ অনুভব করতে পারি গভীরভাবে। এই বিষাদ শুধু উনিশ শতকের এক পরিচয়হীনা নারীর নয়। এ তো ভীষণ চেনা এক অনুভুতি, আমাদের নিত্যদিনের জীবনের সাথে যার নিবিড় সংযোগ। একশো বছরেরও বেশি অতিক্রান্ত হয়েছে, একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে আজও আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় কারো ‘মেয়ে’, ‘স্ত্রী’, ‘মা’ তেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে।পরিবারের চার দেওয়ালের মধ্যেকার জীবন ব্যক্তিগত বলে কখনো রাজনীতির আলোচনায় আসে না, কিন্তু বহিঃজগতের যাবতীয় বিষয় কীভাবে প্রতিফলিত হয় গোটা পরিবারব্যবস্থার মধ্যে, কীভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়ে যায় বিশেষভাবে নারীর জীবন, তা স্পষ্ট। আলোচ্য ছোট গল্পটি নির্দিষ্টভাবে বললে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর নারীদের জীবনের গল্প। শ্রেণীভিত্তিক সমাজের স্বাভাবিক নিয়মেই পরিবারের কাঠামোটা একটা নিম্নবিত্ত পরিবারের থেকে অনেকটাই আলাদা। তাই মূল লিঙ্গভিত্তিক ভূমিকা এক থাকলেও শ্রেণীবিভেদে নারীজীবনের গল্পটা মোটেই একরকম নয়। এই গল্পের কথকের জীবনে অবসাদ যেমন বাস্তব তেমন নেতিবাচক হলেও অবসাদযাপন করার সুযোগও রয়েছে। পড়তে এবং অনুবাদ করতে গিয়ে বারবার মনে হয়েছে, এটা যদি এক নিম্নবিত্ত পরিবারের কোন নারীর গল্প হতো! কেমন হতো তার মানসিক টানাপড়েন, বিপন্নতার কাহিনী? এক নিম্নবিত্ত পরিবারের শ্রমিক নারীর জীবনে অনির্দিষ্ট এক অতীত থেকে আজ অব্দি ঘরেবাইরে শ্রেণী এবং লিঙ্গভিত্তিক শোষণের ঠেলায় দুদণ্ড বিষণ্ণ হবার ফুরসত কি এসেছে? সে কাহিনী আমারও অজানা। আবার মধ্যবিত্ত নারীজীবন পরিবর্তিত হয়ে এই একবিংশ শতাব্দীতে যেখানে এসে দাঁড়িয়েছে, চার দেওয়ালের সীমানা পেরিয়ে তাদের জীবন অনেকটা এগিয়ে গেলেও বিপন্নতা বোধ কি একটু হলেও কমেছে! নাকি অপর কোনো বিষাদ তার জায়গা নিয়েছে? আসলে প্রগতির নামে তাদের জীবনে শোষণের পরিমাণ দ্বিগুণ হয়েছে। ঘরেবাইরে সমান তালে তাকে নিজের নির্দিষ্ট ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হয় রোজ। বাইরের দুনিয়ায় তথাকথিত স্বাধীনতা পেলেও বন্ধ দরজার ভেতরে সে তো আজও বন্দিনী। অর্থনৈতিক স্বাধীনতা তাকে তার প্রাপ্য স্বাধীনতা কিম্বা সমানাধিকার কোনটাই দিতে পারেনি। আর সেজন্যই হয়ত শতাব্দী পেরিয়েও এই গল্পটা ভীষণভাবে প্রাসঙ্গিক রয়ে গেছে।

তুলনামূলকভাবে নারীর গতিবিধি অনেক প্রসারিত হয়েছে। নারী আন্দোলনের মধ্যে নারীর ব্যাক্তিজীবন এবং তার রাজনীতি আলোচ্য হয়ে উঠেছে। কিন্তু কতটা বদলেছে পরিস্থিতি? কিছুদিন আগে স্থানীয় এক গয়নার দোকানের বিজ্ঞাপনে দেখেছিলাম “সকাল থেকে সন্ধ্যে/ হরতালে আছি বন্ধেও” – এই লাইন লিখে এক মেয়ের বিভিন্ন সত্বাকে প্রমাণ করার চেষ্টা, বলা ভালো আধুনিকতার মোড়কে সেই প্রচলিত ক্লিশে হয়ে যাওয়া সর্বাবস্থায় ‘নারীর গয়নার প্রতি চিরন্তন দুর্বলতা’কে প্রমাণ করার অপচেষ্টা। ব্যাপারখানা এমন যে তুমি যতই নিয়ম ভাঙ্গো, যতই আন্দোলনে সামিল হও না কেন, যেহেতু তুমি মেয়ে, তোমার গয়নার প্রতি দুর্বলতা থাকবেই। তুমি চাইলেও তোমার জন্য সামাজিকভাবে নির্দিষ্ট ভূমিকাটা বদলাতে দিচ্ছি না, দেবো না। লিঙ্গবৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সাথে যুক্ত থেকেও, লিঙ্গরাজনীতি নিয়ে নিয়মিত চর্চায় থেকেও মাঝে মাঝে তথাকথিত ‘ভালবাসা’, ‘প্রেম’, ‘সুরক্ষা’র গোলকধাঁধায় হারিয়ে যাই, আটকে পড়ি চার দেওয়ালের বিষাদগ্রস্ত জীবনে। জনপরিসরে খানিকদূর পর্যন্ত অগ্রসর হতে পারলেও, অনেক সময় লড়াইটা শুরুই করে উঠতে পারি না ব্যক্তিগত জীবনে। আবার খুব অল্প হলেও রোজই চেষ্টা জারি রাখি চেনা গতে বাঁধা ‘স্বাভাবিক’ সম্পর্কের সমীকরণগুলো বদলে ফেলার, স্বাভাবিকত্বটাকেই প্রশ্ন ছুঁড়ে দিই রোজ। ভারতবর্ষের গণআন্দোলনের নিরিখে দেখলে দেখা যাবে নিম্নবিত্ত বা দলিত নারীর উপস্থিতি বরাবরই ভীষণ প্রকট থাকলেও মধ্যবিত্ত নারী সমাজের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ অনেক পরে ঘটেছে। কিন্তু এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে মধ্যবিত্ত নারীর ‘পরিবার’ নামক প্রতিষ্ঠানের ঘেরাটোপ ভেঙে, জীবনের ‘স্বাভাবিক’ গতে বাঁধা পথ পালটে গণআন্দোলনে সামিল হবার, নেতৃত্ব দেবার বা দৃষ্টান্ত স্থাপন করার ঘটনাগুলি যথেষ্ট ইতিবাচক। আবার প্রত্যক্ষ আন্দোলনের বাইরে থেকেও যারা লড়াইটা বিশেষভাবে ভাবে ব্যাক্তিগত জীবনে জারি রাখছে তাদের কথাও উল্লেখ্য।যেমন এই মুহূর্তে বাইক দুর্ঘটনায় মারা যাবার কারণে শিরোনামে থাকা ভিনু পালিওয়াল। ভারতবর্ষের খুব অল্পসংখ্যক মেয়ে যারা বাইক চালায়, ভিনু তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন। আশৈশব বাইক তার ‘প্যাশন’ হলেও এই শখের জন্য তাকে প্রচুর লড়াই করতে হয়েছে। যে সমাজে মেয়েরা আজও বিয়ে, পরিবার টিকিয়ে রাখার খাতিরে নিজের পরিচয়টা পর্যন্ত ছেড়ে দেয় (আত্মত্যাগ আর কী!), ভিনু তার স্বপ্নে, তার লক্ষ্যে পৌঁছাবার জন্য ‘পরিবার’ নামক নিরাপত্তার বেড়াজাল (যাকে মেয়েদের একমাত্র নিরাপদ আশ্রয় বলে মনে করা হয়) ভেঙে বেরিয়ে এসেছিলেন একদিন, আলাদা করে নিজের পরিচয় গড়ে তুলেছিলেন। “দ্য ইয়েলো ওয়ালপেপারে”র কথক যে লড়াইটা করে উঠতে পারে না, ভিনু তার জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সেই লড়াইটাই জারি রাখেন। ব্যাক্তিগত জীবনে নারীর স্বতন্ত্র অস্তিত্ব যতক্ষণ না প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, যতক্ষণ না তার সহস্রাব্দ প্রাচীন ‘পরিচয়হীনতা’ এবং ‘ভূমিকা’ পালটে ফেলা সম্ভবপর হচ্ছে, ততক্ষন জনপরিসরেও লড়াইটা দৃঢ়ভাবে করা যাবে না।

***

ছবি : সৌম্যদীপ সেন

***

One thought on “দ্য ইয়েলো ওয়ালপেপার: একটি অনুবাদ

  1. Pingback: Content & Contributors – May 2016 | aainanagar

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s