গো-বিধি : একটি হিন্দু ফ্যাসিবাদী প্রকরণ

দেবাশিস আইচ

দেবাশিস সাংবাদিক ও সমাজকর্মী। এই লেখার সাথে নিউজক্লিক-এর ‘গৌ-কে নাম’ (Gau Ke Naam) ডকুমেন্টারি-র তিনটি পার্টের লিংক ব্যবহার করা হল।

“আমাদের হিন্দু-সমাজে গোহত্যা পাপ বলে গণ্য, অথচ সেই উপলক্ষ্যে মানুষ-হত্যা তত দূর পাপ বলে মনে করি না।”

                       –  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

অবশেষে আপাত স্বস্তি। স্বস্তি সুপ্রিম কোর্টের রায়ে। এক গো-বিধিতে  কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারিকা বেঁধে ফেলার চেষ্টা হয়েছিল। সুপ্রিম কোর্ট ১২ জুলাই এক রায়ে জানিয়েছে, কেন্দ্রের গো-নির্দেশিকা তিন মাসের জন্য স্থগিত করা হল। প্রথম থেকেই অবশ্য দক্ষিণের অধিকাংশ রাজ্য প্রতিবাদে সামিল হয়। প্রতিবাদ শোনা গিয়েছে উত্তর-পূর্ব থেকে।  পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী জানিয়ে দিয়েছিলেন, এই বিধি তিনি মানবেন না। তাঁর বার্তা, ‘এটা সম্পূর্ণ অসাংবিধানিক, অগণতান্ত্রিক ও অনৈতিক সিদ্ধান্ত। এটা মানছি না।’ এই একই সময়ে কেরালার মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন সব রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে চিঠি দিয়েছিলেন কেন্দ্রের বিরুদ্ধে সরব হতে।

সিপিএম পলিটব্যুরো এ বিধির বিরুদ্ধে মূলত চারটি বিষয় তুলে ধরে, তাদের বক্তব্য, (১) এই নির্দেশিকার মাধ্যমে মোদী সরকার গোটা দেশের উপরে খাবারে নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। (২) পশুপালনে যুক্ত কৃষকদের জীবিকা ধাক্কা খাবে। (৩) ক্ষতিগ্রস্ত হবে চর্মশিল্প ও মাংস রফতানিও। (৪) এই নির্দেশিকার মাধ্যমে রাজ্যের অধিকারেও হস্তক্ষেপ করা হয়েছে।

বিধিটি হল, প্রিভেনশন অব ক্রুয়েলটি টু আনিম্যালস (রেগুলেশন অব লাইভস্টক মার্কেটস) রুলস, ২০১৭ (পিসিএ)। ২৩ মে কেন্দ্রীয় পরিবেশ মন্ত্রক এক গেজেট বিজ্ঞপ্তিতে এই নির্দেশিকা জারি করেছে। কী আছে এই বিধিতে? ইতিমধ্যেই সংবাদপত্রে (এই সময়, ২৭ মে, ২০১৭) তা বিস্তারিত ভাবে প্রকাশিত হয়েছে। মোদ্দা বিষয়টি হল, (১) পশুবাজারে আর হত্যার উদ্দেশ্যে গবাদি পশু কেনাবেচা করা যাবে না। (২) শুধুমাত্র কৃষিতে ব্যবহার করা হবে  এমন গবাদি পশু বেচাকেনা করা যাবে। (৩)  খাদ্যের জন্য ব্যবহৃত গবাদি পশু বেচাকেনা করা যাবে সরকার অনুমোদিত পৃথক খামার থেকে। (৪) কোনও ধর্মীয় আচার বা বলির জন্য পশুবাজার বা মেলা থেকে গবাদি পশু কেনাবেচা করা যাবে না। (৫) রাজ্যের সীমানার ২৫ কিলোমিটার ও আন্তর্জাতিক সীমানার ৫০ কিলোমিটারের মধ্যে কোনও বাজার থাকবে না। এ ছাড়াও রয়েছে নানা বিধিনিষেধ। এই বিধিতে গবাদি পশু বলতে কিন্তু শুধু গরু বোঝাচ্ছে না। গরু, বলদ, ষাঁড়, বকনা ও এঁড়ে বাছুর, মহিষ এমনকী উটও বোঝাচ্ছে।

অভিযোগ উঠেছে, ছলেবলে কৌশলে কেন্দ্রীয় সরকার সারা দেশে খাদ্যের জন্য গো-হত্যা বন্ধ করতে চাইছে। কেন্দ্রীয় সরকার এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, খাদ্যের সঠিক মান রক্ষা করা, অসুস্থ ও ছোঁয়াচে রোগে আক্রান্ত গরুকে চিহ্নিত করা, কোনও গবাদি পশুর উপর জীবাণুনাশক ওষুধ প্রয়োগ করা হলে, সেই পশু যাতে নির্দিষ্ট সময়ের পর কেনাবেচা হয় সেদিকে নজর রাখার উদ্দেশ্যে, হত্যার জন্য গবাদি পশু কেনাবেচার পৃথক খামার জরুরি। নতুন নিয়মে কেবল কৃষিকাজের যোগ্য সুস্থ সবল পশুই বাজারে আসবে। অর্থাৎ, প্রশ্নটি খাদ্য সুরক্ষার। পাশাপাশি, গবাদি পশুর বেআইনি পাচার ও তার উপর অত্যাচার বন্ধ করা।

বিধি ও আদালত

এই বিধি বা ফরমান জারি হওয়ার পর অবশ্য এক সপ্তাহ কাটল না, ৩০ মে মাদ্রাজ হাইকোর্টের মাদুরাই বেঞ্চ, পশুবাজারে হত্যার জন্য গোরু-মোষ বিক্রিতে কেন্দ্র যে বিধিনিষেধ জারি করেছে তার উপর চার সপ্তাহের স্থগিতাদেশ জারি করে। আদালত কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে জানতে চায়, কেন তাদের এই নির্দেশ বাতিল করে দেওয়া হবে না। আবেদনকারীর মূল বক্তব্য ছিল, নিজের খাবার বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা মানুষের রয়েছে। কেন্দ্রের নির্দেশ সেই স্বাধীনতাকে খর্ব করছে। একই সঙ্গে হত্যার জন্য গবাদি পশু বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করে দেশবাসীর বাণিজ্যের স্বাধীনতাতেও হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে।

একমাসের অবশ্য প্রয়োজন হল না। ১৫ জুন খোলা বাজারে গোরু-মোষ কেনা বেচা নিয়ে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের বিস্তারিত ব্যাখ্যা চেয়ে বসল সুপ্রিম কোর্ট। শীর্ষ আদালতের পক্ষে বিচারপতি আর কে আগরওয়াল ও বিচারপতি সঞ্জয় কিষেন কওল এই নোটিশ জারি করে দু’সপ্তাহের মধ্যে বিস্তারিত ব্যাখ্যা চান। হায়দরাবাদের এক আইনজীবী ফাহিম কুরেশি (সারা ভারত জামিয়াতুল কুরেশ অ্যাকশন কমিটির সভাপতি)-র পক্ষ থেকে কেন্দ্রের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে এই মামলা করেন। এছাড়াও আরও কয়েকজন ব্যক্তি এই একই বিষয়ে মামলা করেছিলেন।

শুনানির শুরুতে কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে অতিরিক্ত সলিসিটার জেনারেল পি এস নরসিমহা বলেন, ‘সারা দেশে গবাদি পশু বিক্রির যে অবৈধ ব্যবসা চলে, তা নিয়ন্ত্রণ করতে এই নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল কেন্দ্রীয় সরকার। যে সমস্ত সৎ ব্যবসায়ীরা সততার সঙ্গে এই গরু-মোষ বিক্রির কারবার করেন, তাঁদের বিপদে ফেলার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে কোনও চেষ্টাই করা হয়নি। বৃথাই এই কেন্দ্রীয় নির্দেশের অপব্যাখ্যা হচ্ছে। মাদ্রাজ হাইকোর্টের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে যে স্থগিতাদেশ জারি করা হয়েছে তাও নজরে রাখছে কেন্দ্র।’ আইনজীবী ফাহিম কুরেশি এই যুক্তি খণ্ডন করে বলেন, দেশের মানুষ কী খাবে, কী পরবে, সেটা তাঁদের মৌলিক অধিকারের মধ্যে পড়ে। সেই অধিকারে হস্তক্ষেপ করার অধিকার কেন্দ্রের নেই। তাঁকে সমর্থন করেন মামলার অপর অংশীদার সাবু স্টিফেনের আইনজীবী কে বিজু।

কেন্দ্রের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সমাজকর্মী সাবু স্টিফেনের প্রশ্ন ছিল, গড়ে দেশের মোট জনসংখ্যার ৭০ শতাংশই যেখানে আমিষ ভোজী, সেখানে সরকার এই জাতীয় বিজ্ঞপ্তি জারি করে কী ভাবে? উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘২০১৪ সালে কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনস্থ সংস্থা রেজিস্ট্রার জেনারেল এবং সেন্সাস কমিশনের অফিস থেকে একটি সর্বভারতীয় সমীক্ষা করা হয়েছিল। ওই সমীক্ষায় দেখা যায় যে, ভারতের জনসংখ্যার ৭০ শতাংশ মানুষ মাছ-ডিম-মাংস খান। পশ্চিমবঙ্গে মোট ৯৮.৫৫ শতাংশ, অন্ধ্রপ্রদেশে ৯৮.২৫ শতাংশ, ওড়িশায় ৯৭.৩৫ শতাংশ ও কেরালার ৭৫ শতাংশ মানুষ আমিষভোজী। এ বিষয়ে হাফিংটন পোস্ট একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তার পরেও কেন্দ্রীয় সরকার কী ভাবে গো-হত্যা বন্ধ করতে গোরু-মোষের উপরে নিষেধাজ্ঞা জারি করার চেষ্টা করে?’

এ প্রসঙ্গে আমরা ২০১১-১২ সালের এনএসএএসও-র সমীক্ষা রিপোর্টে চোখ বুলিয়ে নিতে পারি। রিপোর্টে বলা হচ্ছে,  মেঘালয় রাজ্যে যে মাংস খাওয়া হয় তার ৮০.৭ শতাংশ গোমাংস। নাগাল্যান্ডে ৫৭.২ শতাংশ, জম্মু-কাশ্মীরে ৩০.৪ শতাংশ, কেরালায় ২৫.৩ শতাংশ, অসমে ২১.৭ শতাংশ, পশ্চিমবঙ্গে ১৮.৭ শতাংশ, গোয়ায় ১১.১ শতাংশ, উত্তরাঞ্চলে ১১ শতাংশ, উত্তরপ্রদেশে ৯.২ শতাংশ, অন্ধ্রপ্রদেশে ৮.৯ শতাংশ, মহারাষ্ট্রে ৫.৫ শতাংশ, গুজরাটে ৩.৯ শতাংশ। মোট জাতীয় গড় ৭.৫ শতাংশ। আবার ওই একই সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, ধর্ম বিশেষে ১ কোটি ২৬ লক্ষ হিন্দু, ৬ কোটি ৩৫ লক্ষ মুসলমান, ৬৫ লক্ষ খ্রিস্টান ও ৯ লক্ষ অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষ গোমাংস খাচ্ছেন।

অন্যদিকে, সরকারের অবস্থানকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছেন গৌরী মৌলেখি। একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার কর্ণধার ও ‘অ্যানিম্যাল ওয়েলফেয়ার বোর্ড অব ইন্ডিয়া’র সদস্য গৌরী এই মামলায় ক্যাভিয়েট দাখিল করে জানান, ‘কেন্দ্রীয় সরকার যে উদ্দেশ নিয়ে এই বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে তার ভুল ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। সরকার চাইছে যে, হত্যাযোগ্য গৃহপালিত পশুদের যেন কোনওভাবে কৃষিকেন্দ্রিক পশুমেলায় নিয়ে না আসা হয়। তাদের নিয়ে যাওয়া হোক বৈধ কসাইখানায়। সারা দেশে প্রতিবছর প্রায় দু’কোটি পশুর চোরাচালান হয়ে থাকে। এটা বন্ধ করতে হলে সরকারকে এই পদক্ষেপ নিতে হত। হুজি জঙ্গিরা এই পশু চোরাচালান থেকে পাওয়া অর্থ দিয়ে দেশে জঙ্গি নাশকতা চালায়, এটা বন্ধ হওয়া দরকার। গৌরী অভিযোগ করেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের গাফিলতিতে রাজ্যের সীমান্ত দিয়ে প্রতিদিন বহু সংখ্যক গৃহপালিত পশু বাংলাদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে।

১১ জুলাই প্রধান বিচারপতি জে এস কেহরের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ জানিয়ে দেয়, কেন্দ্রের নির্দেশিকা তিন মাসের জন্য স্থগিত করা হল। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় সরকারকে নির্দেশ দেওয়া হয়, ভবিষ্যতে এ সংক্রান্ত কোনও বিজ্ঞপ্তি জারি করলে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে পর্যাপ্ত সময় দিতে হবে। প্রসঙ্গত বলা যায়, কেন্দ্র এই নির্দেশিকা জারি করলেও অন্ধকারে রাখা হয় সংশ্লিষ্ট সমস্ত ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলিকে, যেমন, চর্মশিল্প, মাংস প্রক্রিয়া ও রফতানি বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠান, ডেয়ারি শিল্প। এমনকী কেন্দ্রীয় শিল্প ও বাণিজ্য দফতর ও কৃষি দফতরও ছিল অন্ধকারে, অথবা, তারা এই মামলার অংশ ছিল না। এই প্রতিষ্ঠানগুলিই এ বিষয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক স্বত্বাধিকারী। অথচ, অদ্ভুত ভাবে  কেন্দ্রীয় পরিবেশ মন্ত্রককে যুক্ত করা হয়েছে।

কেন্দ্রের অবস্থান ছিল কিছুটা নরম। অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল পি এস নরসিমহা জানান, দেশের নানা প্রান্তের মানুষ কেন্দ্রীয় নির্দেশিকা নিয়ে সমস্যার কথা জানিয়েছেন। সরকার সেগুলি খতিয়ে দেখছে। বাস্তব পরিস্থিতিতে নয়া নিয়মের প্রয়োগ কী ভাবে সম্ভব তা দেখতে দেশের পশুবাজারগুলিতে সমীক্ষাও চালানো হচ্ছে। এর পর সরকার এই নির্দেশ কার্যকর করবে এবং প্রাথমিক ভাবে জারি করা নিয়মের পরিবর্তন আনা হতে পারে। এর জন্য সরকারের সময় লাগবে। এর পরই স্থগিতাদেশ জারি করে সর্বোচ্চ আদালত।

প্রেক্ষাপট

এ বার গবাদি পশু বেচাকেনার এই নয়া নির্দেশিকাটির প্রেক্ষাপট জেনে নেওয়া যাক। ২০১৪ সালে প্রাণী অধিকার রক্ষা সংস্থা এইচএসআই/ইন্ডিয়ার এক অধিকর্তা গৌরী মৌলেখি সুপ্রিম কোর্টে একটি মামলা দায়ের করে আবেদন করেন যে, ভারত থেকে নেপালে যেন গবাদি পশু পাচার ও পাঠানো বন্ধ করা হয়। এই আবেদনে তিনি দাবি করেন,  নেপালে গাধিমাই উৎসবে বিপুল পরিমাণ গবাদি পশু বলি দেওয়ার রেওয়াজ রয়েছে। পাঁচ বছর অন্তর এই উৎসব হয়। ২০০৯ সালে এই উৎসবে পাঁচ লক্ষ মোষ বলি দেওয়া হয়েছিল। দেখা গেছে, এই গবাদি পশুর ৭০-৮০ শতাংশ যায় ভারত থেকে। সীমান্ত এলাকায় কড়া নজরদারি এবং সচেতনতা বাড়ানোর পরও ২০১৪ সালে ৩৫ হাজার মোষ বলি দেওয়া হয়েছিল। এর সঙ্গে অবশ্য পরবর্তীকালে একটি হিন্দু ধর্মীয় সংগঠনের আবেদন ক্রমে ভারত-বাংলাদেশ গবাদি পশু পাচার সমস্যাও যুক্ত হয়।

সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশে সশস্ত্র সীমা বলের ডিআইজি বংশীধর শর্মার নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠিত হয়। কমিটি একটি রিপোর্ট জমা দেয় এবং আদালত তা গ্রহণ   করে। পাশাপাশি, আদালত দেশের ন’টি রাজ্যকে  (বিহার, পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা, উত্তরপ্রদেশ, হরিয়ানা, রাজস্থান,   ত্রিপুরা, অরুণাচল প্রদেশ ও অন্ধ্রপ্রদেশ) কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে সমস্যা সমাধানের নির্দেশ দেয়। রাজ্যভিত্তিক আদালতের আদেশ কী ভাবে পালিত হয়েছে, সেই রিপোর্ট পাওয়ার পর আদালত কেন্দ্রীয় সরকারকে পিসিএ, ১৯৬০ এর ৩৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিধি বা নির্দেশিকা প্রস্তুত করতে বলে। ১২ জুলাই, ২০১৬ মামলার নিষ্পত্তি ঘোষিত হয়। কেন্দ্রীয় সরকার আদালতকে জানায়, খসড়া প্রস্তুত, সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলির সঙ্গে আলোচনা করে বিধিবদ্ধ করা হবে। ২৩ মে, ২০১৭ গেজেট বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়।

গবাদিপশু পাচার

পশুপাচার, গবাদি পশুদের উপর নৃশংস অত্যাচার এবং পশুবাজারের বিভিন্ন অব্যবস্থার বিরুদ্ধেই ছিল মূল মামলা।  অব্যবস্থা বিষয়ে আবেদনকারীদের বক্তব্য ছিল, (১) পশুবাজারে কোনও পশুচিকিৎসক থাকেন না, (২) পশুদের জাবনা ও জলের জন্য ডাবা ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হয় না, (৩) গাড়িতে ওঠানো-নামানোর জন্য থাকে না কোনও র‍্যাম্প, (৪) বাজারে গাদাগাদি ভীড়, (৫) অমানবিক ভাবে ঠাসাঠাসি করে পরিবহন।

এ প্রসঙ্গে যে রাজ্যগুলির কথা উঠে এসেছিল, তার মধ্যে অন্যতম পশ্চিমবঙ্গ। নিষেধাজ্ঞা জারি হওয়ার পর পরই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রসঙ্গ তুলে কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশিকাকে এক কথায় খারিজ করে দিয়েছিলেন। সে কথা আমরা প্রথমেই উল্লেখ করেছি। পাশাপাশি তিনি রাজ্য পুলিশকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছিলেন, ‘গরুপাচার বা স্মাগলিং পুরোপুরিভাবে বন্ধ করতে হবে। এ ব্যাপারে পুলিশকে সক্রিয় হতে হবে। তাতে যদি আমাদের দলের কেউ যুক্ত থাকেন, অথবা অন্য কোনও দলের নেতা হোন না কেন, রেয়াত করা হবে না।’

কেন্দ্রীয় ফরমান, প্রতিবাদ, মামলা এইসব বিতর্কের আবহের মধ্যে ২২ জুন সংবাদপত্রে প্রকাশিত হল ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে গো-পাচার বিষয়ক একটি সংসদীয় রিপোর্ট। প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদম্বরমের নেতৃত্বাধীন স্বরাষ্ট্র বিষয়ক সংসদীয় স্ট্যান্ডিং কমিটির রিপোর্ট জানাল, বাংলাদেশ সীমান্তে বিএসএফ-এর হাতে বাজেয়াপ্ত চোরাচালানের গবাদি পশু ঘুরপথে পৌঁছে যাচ্ছে ফের চোরাকারবারিদের হাতেই। বাজেয়াপ্ত পশুর নিলামে গিয়ে সেগুলি কিনে নিচ্ছে পাচারকারীদের এজেন্টরা। এই অভিযোগ অবশ্য আগেই জানিয়েছিলেন মূল মামলাকারীরা। উল্লেখযোগ্য, এই কমিটিতে ছিলেন, তৃণমূল সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েন, কাকলি ঘোষ দস্তিদার, রাজ্যসভার প্রাক্তন সিপিএম সাংসদ সীতারাম ইয়েচুরি ও কংগ্রেস সাংসদ অধীর চৌধুরী।

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত দেশের সর্বদীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমান্ত। পশ্চিমবঙ্গ, অসম, ত্রিপুরা, মেঘালয়, মিজোরাম, মিলিয়ে প্রায় ৪০৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সীমান্ত। মোট সীমান্ত-চৌকি ১০১১। মূলত পশ্চিমবঙ্গ ও অসমেই পাচারকারী চক্র সক্রিয়। শুধু ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্তই বাজেয়াপ্ত হয়েছিল, এক লক্ষ ৪৬ হাজার ৯৬৭টি গবাদি পশু। রিপোর্ট বলছে, ‘বাজেয়াপ্ত হওয়া গবাদি পশু শুল্ক আধিকারিকরা নিলাম করলেও এর সুযোগ নিয়ে স্মাগলাররা বার বার পশু কিনে নিচ্ছে।’ এ বিষয়ে কিছু সুপারিশ করে সংসদীয় কমিটি। সে প্রসঙ্গে পরে আসব।

কেন্দ্র বনাম রাজ্য

এ কথা ঠিক, সংবিধানের ৪৮ ধারায়, অর্থাৎ নির্দেশমূলক নীতিতে দুধেল গরু, অন্যান্য দুগ্ধবতী প্রাণী, বাছুর ও ভারবাহী পশু হত্যা রোধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু, কোনও রাজ্য এই পরামর্শ না মানলে আদালতের দ্বারস্থ হওয়া যায় না। পাশাপাশি, গবাদি পশু সংরক্ষণ, রক্ষা ও তার উৎকর্ষসাধন করার জন্য আইন প্রণয়নের অধিকার রাজ্য সরকারের (বিধিবদ্ধ তালিকা ১৫ (২), সপ্তম তফসিল)। খাদ্যের জন্য পশু হত্যা, নিয়ন্ত্রণ ও নিষেধাজ্ঞা বিষয়ে নানা আইন রাজ্য সরকারই প্রণয়ন করে।

পশুর সঙ্গে নিষ্ঠুর আচরণ, অত্যাচার রোধ বিষয়ে আইন প্রণয়নের অধিকার রয়েছে যৌথ তালিকায়। এ বিষয়ে কোনও দ্বন্দ্ব দেখা দিলে, কেন্দ্রীয় আইন প্রযোজ্য হবে। যদিও, সাধারণ ভাবে পশুপালন এবং বিশেষভাবে পশুহত্যা সম্পর্কিত রাজ্য আইন কেন্দ্রীয় আইনের দ্বারা প্রভাবিত হবে না। অন্যদিকে, নিষ্ঠুরতা বিষয়ক কোনও আইন যদি রাজ্যে নাও থাকে, তবেও কেন্দ্র পিসিএ, ১৯৬০ মোতাবেক রাজ্যে পশুহত্যা নিয়ন্ত্রণ বা নিষিদ্ধ করতে পারে না। সংবিধান বিশেষজ্ঞদের অভিমত এমনই।

দেশের অধিকাংশ রাজ্যেই গো-হত্যা নিষিদ্ধ। সাজার মেয়াদ একেক রকম।অসমে পাঁচমাসের জেল ও হাজার টাকা জরিমানা বা দুটোই। এটাই রাজ্যগুলির মধ্যে সর্বনিম্ন শাস্তি। কিন্তু, ওই রাজ্যে গো-হত্যা নিষিদ্ধ হলেও ‘হত্যার জন্য উপযুক্ত’ মর্মে ছাড়পত্র থাকলে তবেই তা নির্দিষ্ট স্থানে হত্যা করা যায়। সবচেয়ে বেশি জেলের মেয়াদ হরিয়ানা, জম্মু ও কাশ্মীর, পাঞ্জাব ও ঝাড়খণ্ডে, দশ বছর। তবে, রপ্তানির জন্য পাঞ্জাবে গো-হত্যা করা যায়। কর্নাটক ও তামিলনাড়ুতে হত্যা নিষিদ্ধ হলেও খাওয়া নিষিদ্ধ নয়। মোষ-হত্যায় কোথাও কোনও নিষেধাজ্ঞা নেই। তবে, কিছু কিছু রাজ্যে ষাঁড় ও বলদ হত্যার বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। মণিপুরে ১৯৩৬ সালে রাজকীয় ঘোষণার দ্বারা গো-হত্যা নিষিদ্ধ করলেও খাওয়ার প্রচলন রয়েছে। যে সব রাজ্যে হত্যা নিষিদ্ধ নয় তার মধ্যে রয়েছে, কেরালা, গোয়া, অরুণাচল প্রদেশ, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড, ত্রিপুরা, সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গ। পশ্চিমবঙ্গে  কিছু ক্ষেত্রে পাঁচ মাসের জেল ও হাজার টাকা জরিমানার ব্যবস্থা রয়েছে।

আইনজ্ঞদের প্রশ্ন, এ কথা যখন জানা যে, বহু রাজ্যে গবাদি পশু হত্যা বিষয়ক কোনও আইন নেই, তখন কোন অধিকারে বাজারে বা মেলায় হত্যার জন্য পশু বেচাকেনার উপর কেন্দ্র নিষেধাজ্ঞা জারি করতে পারে? সেখানে নয়া বিধিটিকে রাজ্যের পশু রক্ষা বা সংরক্ষণ আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। অর্থাৎ, ধরে নিতে হবে যে, রাজ্যে আইন বলবৎ রয়েছে এবং নয়া বিধি অনুযায়ী সংশোধিত হবে না।

পাশাপাশি, সংবিধান বা  আইনগত ভাবে পশুবাজার নিয়ন্ত্রণ করার কোনও ক্ষমতাই কেন্দ্রের নেই। এই অধিকার সংবিধান সম্মতভাবে একমাত্র রাজ্যেরই রয়েছে। এই বিধি শুধু সেই অধিকারে হস্তক্ষেপ করছে না, ব্যবসা-বাণিজ্য করার মৌলিক অধিকারেও হস্তক্ষেপ করছে। পিসিএ, ১৯৬০ -এ কিন্তু মানুষের ভোগের জন্য গবাদি পশু হত্যায় কোনও নিষেধাজ্ঞা নেই। তবে, প্রায় ‘বিনা যন্ত্রণা’য় হত্যা করতে হবে। প্রিভেনশন অব ক্রুয়েলটি টু আনিম্যালস (স্লটারহাউস) রুলস, ২০০১ – এ বিস্তারিত ভাবে সে নির্দেশ রয়েছে।

নয়া নির্দেশিকা নিয়ে সন্দেহের আরও কারণ যে, সরকারের উদ্দেশ্য যদি পশুহিত হয়, তবে শুধু গবাদি পশু কেন? পিসিএ-তে তো প্রাণী বোঝাতে মানুষ ছাড়া সব প্রাণীর কথা বলা হয়েছে। সেখানে শুয়োর, ভেড়া,ছাগল, পাঁঠা, পোল্ট্রিজাত প্রাণী বাদ যাবে কেন? অভিমত, এই বাছ-বাছাইয়ের দৃষ্টিভঙ্গি প্রমাণ করে, সরকার পিছনের দরজা দিয়ে হিন্দুত্বের অ্যাজেন্ডাকে ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। যা, বহুত্ববাদ, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার পরিপন্থী। যুক্তরাষ্ট্রীয়তার তো বটেই। পাশাপাশি, যদি সংসদীয় কমিটির সুপারিশগুলির দিকে চোখ বুলাই তবে দেখব, পাচার রুখতে কমিটির নিদান (১) সীমান্ত এলাকার ১৫ কিলোমিটারের মধ্যে সমস্ত গোহাট তুলে দেওয়া (বিধিতে বলা হচ্ছে ৫০ কিলোমিটার), (২) বাজেয়াপ্ত পশু সীমান্তবর্তী রাজ্যে নিলাম বন্ধ করা, (৩) ন্যূনতম দাম বেঁধে দেওয়ার জন্য শুল্ক বিভাগকে নির্দেশ দেওয়া, (৪) নিলামে অংশগ্রহণকারীদের প্যান ও আধারকার্ড দেখানো বাধ্যতামূলক করা। এ বিষয়ে, অর্থাৎ পশুপাচার বন্ধ করার এই নিদানে নিশ্চয় কারও আপত্তি থাকার কথা নয়। এই পরিমাণ গবাদি পশু যদি নিয়মিত আইনি বাণিজ্যের অংশ হতে পারে তবে দেশেরই আর্থিক লাভ। সেখানে রফতানি বাণিজ্য যেমন লাভবান হবে তেমনি লাভবান হবে চর্মশিল্প। সীমান্তে আইন-শৃঙখলার প্রশ্নও রয়েছে। লক্ষ্যণীয় যে, সংসদীয় কমিটি পশুবাজার গুলিতে হত্যার জন্য পশু বিক্রি বন্ধের সুপারিশ করেনি। যা কেন্দ্রীয় বিধিতে আরোপ করা হয়েছে। এখানে আরও কিছু তথ্যের দিকে আমরা চোখ বুলিয়ে নিতে পারি। কেন্দ্রীয় কৃষি ও কৃষি কল্যাণ মন্ত্রকের অধীন পশুপালন দপ্তরের সর্বশেষ বার্ষিক রিপোর্টের (২০১৬-১৭) পরিসংখ্যান হল, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দেশে মোট ৭০.২০ লক্ষ টন মাংস উৎপাদিত হয়েছিল এবং এর মাত্র পাঁচ শতাংশ হল গো-মাংস। ২৩ শতাংশ মোষের মাংস এবং ৪৬ শতাংশ পোলট্রির মাংস। আবার, চর্মশিল্পের জন্য যে পরিমাণ চামড়ার ব্যবহার হয় তার অর্ধেকই মোষের চামড়া। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, চামড়া বা মাংস কোনও ক্ষেত্রেই গো-হত্যা বন্ধ করার মতো বিশেষ কোনও উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।

মতলবটা পরিষ্কার হবে যদি আমরা বুঝে নিতে পারি মামলাকারী ও সরকার আসলে একই গোয়ালের গরু। আগেই বলেছি শ্রীমতী মৌলাখি একটি প্রাণী অধিকার রক্ষা সংস্থার কর্ণধার আবার সরকার পোষিত অ্যানিম্যাল ওয়েলফেয়ার বোর্ড অব ইন্ডিয়ার সদস্য। তাঁর আরও একটি পরিচয় তিনি বিজেপি নেত্রী ও কেন্দ্রীয় নারী ও শিশু কল্যাণ মন্ত্রী মানেকা গান্ধীর সংস্থা ‘পিপলস ফর অ্যানিম্যাল’-এর ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য ও তাঁর উপদেষ্টাদের একজন। এখানেই শেষ নয়, বোর্ডের নয়া আট সদস্যের মধ্যে না কি ছ’জন ‘গো-বিশেষজ্ঞ’। আছেন গিরিশ শাহ। যাঁর এনজিও গুজরাত, মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশের গোশালাকে অর্থ সাহায্য করে। অধ্যাপক আর এস চৌহান গো-মূত্রের উপর গবেষণা করেন। আরএসএস সদস্য হিতেশ জৈন গো-বিজ্ঞান অধ্যয়ন কেন্দ্রের চেয়ারম্যান।

গবাদি পশু বাণিজ্য

ভারতে পশু মাংসের বাৎসরিক লেনদেনের পরিমাণ এক লাখ কোটি টাকা। ২০০৭-‘০৮ সালে পশু মাংসের (মহিষ) রফতানির পরিমাণ ছিল ৩,৫৩৩ কোটি টাকা। ২০১৬-‘১৭ আর্থিক বর্ষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৬,৬৮২ কোটি টাকায়। রফতানিকারী ও ক্রেডিট রেটিং সংস্থা আইসিআরএ-র অনুমান, আগামী পাঁচ বছরে মাংস রফতানির আর্থিক পরিমাণ গিয়ে দাঁড়াবে ৪০ হাজার কোটি টাকা। প্রসঙ্গত, ভারতে গো-মাংস রফতানি নিষিদ্ধ বলে, রফতানিকৃত মাংসে মহিষ ছাপটি মারতে হয়।

নয়া ফরমান এই শিল্প ও বাণিজ্যকে চরম অনিয়শ্চতার মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।  আইসিআরএ- হিসাব গত ২০১৬ আর্থিক বছরে রফতানি মার খেয়েছে। গত একযুগে এই প্রথম এ ঘটনা ঘটল। সংবাদপত্রে (এই সময়, ২৭ মে, ২০১৭) প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৪ আর্থিক বছরে রফতানির আর্থিক পরিমাণ ছিল ২৯,২৮৯ কোটি টাকা। ২০১৫ সালে তা গিয়ে দাঁড়ায় ২৭,০০০ কোটি টাকায় এবং ২০১৬-তে আরও কমে দাঁড়িয়েছে ২৬,৬৮২ কোটি টাকায়। ২০১৭ সালে এই প্রবণতার কোনও হেরফের ঘটবে না বলেই মনে করে শিল্পমহল। রফতানি বাণিজ্যে এই অবনতির পিছনে একাধিক কারণ রয়েছে বলে মনে করে ক্রেডিট রেটিং সংস্থাটি। তার অন্যতম একটি হল ধর্মীয় ভাবাবেগ। এ বিষয়ে তাদের ব্যাখ্যা, এই শিল্পের প্রকৃতিটি স্পর্শকাতর ও সামাজিক ঝুঁকিপূর্ণ। গবাদি পশু হত্যা নিয়ে ধর্মীয় ভাবাবেগের কাছে অসহায় ও নিরাপত্তাহীন। অভিযোগ, বহু সময়ে এই শিল্পকে তীব্র রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়তে হয়েছে।

একই হাল চর্মজ শিল্পে। ২০১৫-১৬ আর্থিক বছরে চর্মশিল্প উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ৭৯,৩৯২ কোটি টাকা। প্রধানমন্ত্রীর ‘মেক-ইন-ইন্ডিয়া প্রকল্পে যে ২৫টি শিল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে সেই তালিকায় দ্বাদশ স্থানে রয়েছে চর্ম ও চর্মজাত পণ্য। লক্ষ্য, ২০২০ সাল নাগাদ চর্মশিল্প উৎপাদনের পরিমাণ ২৭০০ মার্কিন ডলারে নিয়ে যাওয়া। চর্মজ পণ্য উৎপাদনে ভারত বিশ্বে দ্বিতীয়। মোট বিশ্ব উৎপাদনের ১২.৯৩ শতাংশ তৈরি হয় ভারতে। যার ৮০ শতাংশ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প। কসাই ও চর্মশিল্প মিলিয়ে দুই ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে নিযুক্ত কর্মীসংখ্যা  প্রায় ৬০ লক্ষ।

গো-রক্ষা ও নরেন্দ্র মোদী

একদিকে সরকারের লক্ষ্য চর্মজ শিল্পের উন্নতি অন্যদিকে জারি হল নয়া ফরমান। এ কি নেহাতই স্ববিরোধ না কি মূল লক্ষ্য হিন্দু ভারত? আমরা নিশ্চয়ই খেয়াল করব, ২০১৪ লোকসভা নির্বাচনে প্রায় প্রতিটি সভায় নরেন্দ্র মোদী ও বিজেপি নেতৃত্ব গো-রক্ষাকে অন্যতম প্রধান ইস্যু করে তুলেছিল। গবাদি পশুর মাংস রফতানিতে ভারত প্রথম, এ তথ্যে তাঁর ‘হৃদয় ভেঙে’ যেতে দেখেছি। আমরা এখানে দেখে নেব গো-রক্ষা প্রসঙ্গে মোদীর বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বক্তব্যের অংশবিশেষ ( এই সময়, ৩০ জুন ২০১৭)।

গো-রক্ষার কাজে নিজেকে সমর্পণ করেছিলেন মহারাণা প্রতাপ। গো-রক্ষার জন্য যুদ্ধ পর্যন্ত করেছিলেন তিনি। আর দেখুন আজ কী হচ্ছে। সুপ্রিম কোর্ট তো বলছে, গো-রক্ষার জন্য দেশে আইন থাকা উচিত। কিন্তু, ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতির জন্য কেন্দ্র তা করছে না। (২০১২, গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী।)

গোটা পৃথিবীতে মাংস রপ্তানি করে ‘গোলাপি বিপ্লব’ আনতে চায় কেন্দ্র। কেন্দ্রীয় সরকার জানিয়েছে, এ বছর গোমাংস রপ্তানিতে বিশ্বে প্রথম হয়েছে ভারত। এটা কি কোনও গর্ব করার মতো বিষয়? আমি জানি না আপনারা এতে দু:খি হয়েছেন কি না, আমার হৃদয় ভেঙে গিয়েছে। ( ২০১৩, গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী)।

আমি দ্বারকার ছেলে। এই দ্বারকার সঙ্গে যদুবংশের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক।… এই যাদবরা শ্রীকৃষ্ণের পুজো করেন, জীবিকার জন্য গোরু প্রতিপালন করেন, গোরুর সেবা করেন। আমার ভাবতে অবাক লাগে, এই যাদবরাই এখন সেই সব রাজনীতিকের পাশে রয়েছেন, যাঁরা গর্বের সঙ্গে গো-হত্যা করেন। ( ২০১৪, প্রধানন্ত্রী)।

গো-রক্ষার নামে যারা ঝামেলা করছে, তারা সমাজবিরোধী। কিছু লোক রাতে চুরি-ডাকাতি করে বেড়ায়, দিনে নিজেদের গো-রক্ষক বলে দাবি করে। ( ২০১৬, প্রধানমন্ত্রী)।

গো-ভক্তির নামে মানুষ খুন করাকে মেনে নেওয়া যায় না। মহাত্মা গান্ধী এটা মানতেন না। ( ২০১৭, প্রধানমন্ত্রী)।

চাপের মুখে, দেশ জুড়ে #নটইনমাইনেম আন্দোলনের চাপে মোদী যেদিন মহাত্মাকে সাক্ষী মানছেন, সেই ২৯ জুন ২০১৭, ঝাড়খণ্ডের রামগড় জেলার বাজারতন্দ গ্রামের কাছে গাড়িতে গো-মাংস নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এই সন্দেহে পিটিয়ে খুন করা হয় আলিমুদ্দিন ওরফে আসগর আনসারি নামে এক ব্যক্তিকে।

অর্থাৎ, ক্ষমতায় আসার জন্য মোদি বার বার যে ভাবাবেগ উসকে দিয়ে গিয়েছেন,  ক্ষমতায় আসার পর কী কেন্দ্র কী বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে এই ভাবাবেগ আরও তীব্র আকার ধারণ করে। গো-হত্যা আইন কঠোরতম রূপ নেয়। দলিত, আদিবাসী, সংখ্যালঘুদের উপর চরম আঘাত নেমে আসে। একটি হিসাব বলছে, গত সাত বছরে, ২০১০-২০১৭ সালের ২৫ জুন পর্যন্ত গরু সম্পর্কিত আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে ৬৩টি।(২৮ জুলাই ধরলে সংখ্যাটি ৭০)। আর ২০১৪-২০১৭-র ২৫ জুনের মধ্যে এই জাতীয় ঘটনার সংখ্যা ৬১টি। অর্থাৎ,  প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর রাজত্বকালে।২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে জুনের মধ্যেই ঘটেছে ২০টি হিংসার ঘটনা। (২৮ জুলাই অবধি ২৭টি)। অর্থাৎ, গত সাত বছরে গোরু চুরি এবং গো-মাংস ঘিরে যত হামলা হয়েছে, তার ৯৭ শতাংশ ঘটেছে নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর। এই ২০টি ঘটনায় ২৮ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার, ৮৬ শতাংশ, অর্থাৎ, ২৪ জন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের। আহত ১২৪ জন।২০১৬ সালে এ জাতীয় ২৫টি ঘটনা ঘটেছিল। অর্ধেক হামলার ঘটনাই ঘটেছে বিজেপি শাসিত রাজ্যে । একটি ঘটনা পশ্চিমবঙ্গে, মৃত্যু হয়েছে তিন জনের। অ-বিজেপি রাজ্য গুলির মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটেছে কর্নাটকে। এখনও তার বিরাম নেই। আমরা এও লক্ষ্য করেছি, এই আক্রমণের ঘটনায় মাত্র পাঁচ শতাংশ ক্ষেত্রে অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ২১ শতাংশ ক্ষেত্রে আক্রান্তদের বিরুদ্ধেই অভিযোগ দায়ের করা হয়। (ইন্ডিয়া স্পেন্ড, ২৮ জুন ও ২৮ জুলাই ২০১৭)। পাশাপাশি,  উত্তরপ্রদেশে যোগী সরকার আসীন হওয়ার পর পরই একের পর এক আইনি-বেআইনি কসাইখানা বন্ধ করে দেওয়া হল। আরও বেশি বাড়বাড়ন্ত হল বিশ্বহিন্দু পরিষদ, বজরং দল আর যোগী বাহিনীর।

আমরা আগেই লক্ষ্য করেছি ২০১৪-১৫ আর্থিক বছর থেকেই গবাদি পশুর মাংস রফতানির আর্থিক পরিমাণ কমছে। এবার দেখব চর্মজ শিল্পে গো-রাজনীতির প্রভাব। চর্মজশিল্পের সূত্রে (ডিজিসিআই এন্ড এস) খবর, ২০১৫-১৬ আর্থিক বছরের তুলনায় ২০১৬-১৭ আর্থিক বছরে চামড়াশিল্পে প্রায় ১৯০ কোটি মার্কিন ডলার ঘাটতির মুখে পড়তে হয়েছে। এর মধ্যে ফিনিশড লেদার ১৫.৬ শতাংশ, লেদার গুডসে ৩.৫৪ শতাংশ, লেদার গারমেন্টসে ২.৯৯ শতাংশ, লেদার ফুটওয়্যারে ০.৫৬ শতাংশ ব্যবসার ঘাটতি হয়েছে। একমাত্র নন-লেদার ফুটওয়্যারের ক্ষেত্রে ১০.৭৮ শতাংশ বৃদ্ধি হয়েছে।

এই সংখ্যাতত্ত্ব থেকেই অনেকটাই স্পষ্ট বিজেপি ও হিন্দু ধর্মীয় সংগঠনগুলির গো-রাজনীতি লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন ও জীবিকার সাংবিধানিক ও মৌলিক  অধিকার কেড়ে নিয়েছে। সংবিধানের নামে শপথ নেওয়া প্রধানমন্ত্রী অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রা কাড়লেন না। এই ধর্মীয় উন্মাদনাই কি গবাদি পশু ব্যবসা ও বাণিজ্যে প্রভাব ফেলল? উত্তরটি অবশ্যই, হ্যাঁ।

গো-হিংসা ও সুপ্রিম কোর্ট

এখন এক ফাঁকে আমরা দেখে নিই, গো-রক্ষকদের লাগাতার হিংসাত্মক কার্যকলাপের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিকতম রায়টি। তার পর ফের মূল প্রসঙ্গ, অর্থাৎ, গো-ফরমান এবং তার অভিঘাত প্রসঙ্গে ফিরে যাব।

৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭, সুপ্রিম কোর্ট একটি জনস্বার্থ মামলার প্রেক্ষিতে এক নির্দেশে   স্পষ্ট ভাবে জানিয়ে দেয়, গো-রক্ষকদের তাণ্ডব রুখতে কেন্দ্র ও রাজ্যকে সক্রিয় হতে হবে। রাজ্য সরকারগুলিকে সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশ, রাজ্যের প্রতিটি জেলায় এক জন পুলিশ আধিকারিককে নোডাল অফিসার হিসেবে নিয়োগ করতে হবে। রাজ্যেগুলির মুখ্যসচিবদের কোর্টের নির্দেশ, রাজ্য পুলিশের মহানির্দেশকের সঙ্গে আলোচনা করে সব জাতীয় সড়ক গো-রক্ষক-মুক্ত করতে হবে। প্রয়োজনে টাস্ক ফোর্স গঠন করা যেতে পারে।

পাশাপাশি, কেন্দ্রকে নোটিশ পাঠিয়ে প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্রের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ জানতে চেয়েছে, গো-রক্ষার নামে হিংসা বন্ধ করতে তারা কী ব্যবস্থা নিয়েছে? এক সপ্তাহের মধ্যে এ বিষয়ে কেন্দ্রকে জবাব দিতে হবে। একই বিষয়ে স্ট্যাটাস রিপোর্ট দিতে হবে সব রাজ্যকে, যার মধ্যে কেবল ৬টি রাজ্য তা দিয়েছে। মামলাটি এখন বিচারাধীন, পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য হয়েছে ৩১ অক্টোবর। জনস্বার্থ মামলাটি করেছেন মহাত্মা গান্ধীর প্রপৌত্র তুষার গান্ধী। আদালতে তাঁর হয়ে সওয়াল করেন প্রাক্তন অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল ইন্দিরা জয়সিং।

কৃষি অর্থনীতি ও নয়া ফরমান

কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ফরমানের জেরে সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের কৃষি অর্থনীতি। গবাদি পশুর অর্থনৈতিক মূল্য তিন লাখ কোটি টাকা। এই অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত দেশের কোটি কোটি ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও ভূমিহীন চাষি। এ তো নতুন কথা নয় যে,পশুপালন গ্রামীণ জীবিকা। পাশাপাশি, কৃষকরাই অধিকাংশ ক্ষেত্রে গবাদি পশু লালন-পালন করে চলেছে। আজ যন্ত্রের যুগে ভারবাহী পশুরা প্রায় অচল। লাঙলের ব্যবহার ব্যাপক হারে কমতে শুরু করেছে।  রাসায়নিক সারের দৌলতে গোবর পিছু হটেছে। তবুও, ২০১২ সালের গৃহপালিত পশু শুমারি অনু্যায়ী, দেশে মোট গবাদি পশুর সংখ্যা প্রায় ২০ কোটি। মহিষের সংখ্যা ১০ কোটি ৮৭ লক্ষ। কী প্রয়োজনে লাগে এত প্রাণী? মনে রাখতে হবে, এর মধ্যে প্রায় দু’কোটি গবাদি পশু এবং এক কোটি ৬০ লক্ষ মহিষ খাদ্যের জন্য জবাই করা হয়। এ ছাড়াও দুধ, ডিম, ঘি, মাখন উৎপন্ন হয়। দুধ উৎপাদনের বিচারেও ভারত বিশ্বে প্রথম। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ভারতে মোট ১৫.৫৫ কোটি টন বা মাথা পিছু দৈনিক ৩৩৭ গ্রাম দুধ উৎপাদন হয়েছিল।

আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনা, চাষের ক্রমবর্ধমান খরচ, ফসলের ন্যায্য দাম না মেলার ফলে ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও ভূমিহীন চাষিরা ক্রমে ক্রমে গবাদি পশু ভিত্তিক অর্থনীতির দিকে সরে আসছেন। গ্রামীণ অর্থনীতিতে গবাদি পশুর আর্থিক অবদান এখন খাদ্যশস্যের তুলনায় বেশি। ২০০২-‘০৩ সাল থেকেই এই ঝোঁক দেখা দিচ্ছিল বলে বিশেষজ্ঞদের মত। এর পর থেকে এই অবদান বেড়েছে বই কমেনি। অর্থনীতিবিদরা একমত, কৃষির বিকাশে গবাদি পশু মূল চালিকা শক্তি। কৃষি জিডিপিতে অংশ ২৮ শতাংশ। সামগ্রিক ভাবে মোট জিডিপি’র পাঁচ শতাংশ।

আরও উল্লেখযোগ্য, দেশের ৭০ শতাংশ পশু বাজার দখল করে রেখেছে ৬৭ শতাংশ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিরা। নয়া ফরমান ও তার নানা লালফিতের ফাঁস, গভীর অনিশ্চয়তা, ক্রমবর্ধমান ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা এই কৃষি অর্থনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলবে বলেই মনে করছেন
অর্থনীতিবিদরা।

গো-ফরমান ও পশ্চিমঙ্গ

গো-রাজনীতির প্রভাব এ রাজ্যের অর্থনীতিতে ঠিক কতটা প্রভাব ফেলেছে তার সামগ্রিক কোনও সরকারি বা বেসরকারি সমীক্ষা এখনও চোখে পড়েনি। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা রিপোর্ট থেকে অবশ্য বোঝা যায় পরিস্থিতি উদ্বেগজনক।

এশিয়ার বৃহত্তম চর্মনগরী কলকাতার উপকণ্ঠের বানতলা। ফি বছর ভারত থেকে রফতানিকৃত চামড়ার ২০ শতাংশ বানতলার। চামড়াজাত দ্রব্যের ৫৮ শতাংশ রফতানি হয় এই শিল্পনগরী থেকে। এখানে মোট কারখানার সংখ্যা ৩৬০। এ ছাড়াও আরও শ’খানেক ছোট-বড় কারখানা তিলজলা, তপসিয়ায় রয়েছে। আমরা আগেই দেখিয়েছি ২০১৬-১৭ অর্থবছরে রফতানি কমেছে। স্বাভাবিক ভাবেই প্রভাব পড়েছে বানতলাতেও।

রাজ্যে মোট ১৩ হাজার কোটি টাকার চর্মজাত পণ্য, যেমন ব্যাগ, দস্তানা, জুতো, জ্যাকেট উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে রফতানির পরিমাণ ৬,৫০০ থেকে ৭০০০ কোটি টাকা। প্রয়োজনীয় কাঁচামালের মধ্যে গরুর ক্ষেত্রে ১৫-২০ শতাংশ এবং মোষের ক্ষেত্রে ৫-৭ শতাংশ স্থানীয়ভাবে পাওয়া যায়। ছাগল-ভেড়ার ক্ষেত্রে ৯০ শতাংশই মেলে রাজ্য থেকে। এবার দেখা যাক রাজ্যে চর্মশিল্পে পশুচামড়ার ব্যবহারের দিকটি। শিল্পে ৫০ শতাংশ ব্যবহার হয় মোষের চামড়া, গরুর চামড়া ১৩ শতাংশ, বাছুরের ২ শতাংশ, ছাগলের ২৭ শতাংশ, ভেড়ার ৬ শতাংশ, উট ও অন্যান্য ২ শতাংশ। একদিকে গো-রক্ষাকারীদের তাণ্ডব অন্যদিকে নয়া ফরমানে নাভিশ্বাস উঠেছে বানতলার। ভিন রাজ্য থেকে চামড়া আসা প্রায় বন্ধ। চর্মনগরী সূত্রে জানা গিয়েছে, বানতলার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে যুক্ত পাঁচ লক্ষ শ্রমিক ও ১৩০০ ব্যবসায়ী। ( এই সময়, ৬ ও ১১ জুন ২০১৭)।

রাজ্যের পশু বাজারগুলির হাল ঠিক কী তার কোনও সঠিক চিত্র পাওয়া দুষ্কর। নোট সঙ্কট গো-হাট বা বাজারগুলিতে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। অসংগঠিত এই বাজারে তার আর্থিক পরিমাণ স্থির বলা মুশকিল। যেমন, বলা যায় বিমুদ্রাকরণ বা নোট সঙ্কটের ফলে, চুক্তি অনুযায়ী এ রাজ্যের চর্ম ব্যবসায়ীরা সময়ে চর্মজ দ্রব্য সরবরাহ করতে না পারায়, ইউরোপ ও আমেরিকার ক্রেতারা ৫০০ কোটি টাকার বরাত বাতিল করে দিয়েছিল।

বীরভূমের শুখবাজার গো-হাট রাজ্যের এক অন্যতম বৃহৎ পশুবাজার। স্ক্রোল ডট ইন তাদের ৬ জুন ২০১৭-র এক প্রতিবেদনে বলছে, ক্রেতা-বিক্রেতা নেই। যতটুকু এসেছে তা সাধারণ সময়ের ২৫ শতাংশ মাত্র। ওইদিন মাত্র ৫০০ পশু বাজারে এসেছিল। কেউ তবু গরু এনেছে, দাম পাওয়া যাচ্ছে অর্ধেক। চাষের বয়স্ক বলদ এনেছে কেউ একজোড়া, ইচ্ছে বিক্রি করে চাষের জন্য তাগড়া দুটো বলদ কিনবে। কেনা বা বেচার কাউকে পাওয়া যায়নি। নিয়মটি সহজ। যে গরু দুধ দিতে পারবে না বা যে বলদ কমজোরি হয়ে পড়েছে তাকে বিক্রি করে দুগ্ধবতী গরু বা জোয়ান বলদ কেনো। অথচ, সেই বাজার মৃতপ্রায়। একবছর ধরেই এমন চলছে কমবেশি। গো-রক্ষকদের তাণ্ডবে উত্তরপ্রদেশ থেকে গরু বা মোষ বিহার বা ঝাড়খণ্ড পেরিয়ে আসছে না। ২০১৭ সালে পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়। কেন্দ্রীয় ফরমান আর গুজব হাঁড়ির হাল করে ছেড়েছে। বাজারের উপর নির্ভর করে বেড়ে ওঠা অন্যান্য ব্যবসার হালও একই। বোলপুর রেগুলেটেড মার্কেট কমিটি ছোট-বড় ট্রাক-লরি থেকে যে লেভি আদায় করত তাও তলানিতে ঠেকেছে। আয় কমেছে ৭৫ শতাংশ। ( ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ৬ জুন ২০১৭)। এ প্রসঙ্গে, মহারাষ্ট্রের একটি উদাহরণ দেওয়ার লোভ সংবরণ করা গেল না।

বছর দেড়েক আগে ঠিক এমনটাই শুরু হয়েছিল মহারাষ্ট্রে। ২০১৬ সালে জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে সাগর বোরহার্দে পুনের মাঞ্চরের পশুবাজারে যায় তার তিন বছর বয়সী গরুটি বিক্রি করতে। উঁচু জাতের হোলস্টেইন ক্রসবিড গরুটি তখনও দিনে ২০ লিটার দুধ দেয়। মেয়ের বিয়ে, টাকার খুব দরকার তাই হাটে এসেছিল। কিন্তু, গরুর দাম শুনে চক্ষু তার চড়কগাছ। তিন বছরের হোলস্টেইনের দাম নাকি ৩০ হাজার টাকা। অথচ, এক বছর হয়নি এক ব্যবসায়ী ৭৫ হাজার টাকায় গরুটি কিনতে চেয়েছিলেন।

এই সময় আন্তর্জাতিক বাজারে দুধের দাম পড়ে গিয়েছিল। তার প্রভাব পড়েছিল এ দেশেও। মহারাষ্ট্রে দুধ উৎপাদকরা বেশ কম দামে (ফার্ম-গেট প্রাইস)  দুধ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছিলেন। গরুর দাম কমার জন্য সাগর অবশ্য দুধের দামের তারতম্যকে দায়ী করতে রাজি নন। তাঁর অভিযোগ, এর জন্য মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিস দায়ী। কেন? ক্ষমতায় এসেই অ্যানিম্যাল প্রিজারভেশন এক্ট, ১৯৭৬-এর ব্যাপক সংশোধন আনলেন তিনি। গরু, বলদ, ষাঁড়, বকনা কিংবা এঁড়ে বাছুর জবাই নিষিদ্ধ হল। শাস্তি ১০ বছর জেল। ২০১৫ সালের মার্চ মাসে রাষ্ট্রপতি অনুমোদন দিলেন। ব্যস, আইন লাগু করতে নেমে পড়ল শিবসেনার গো-রক্ষা বাহিনী। ২০১৬’র জানুয়ারি পর্যন্ত ২০৭টি মামলা রুজু হয়ে গেল। আর হইহই করে পড়তে লাগল গবাদি পশুর দাম। রাহাতের মত বৃহৎ কৃষিবাজারে যেখানে দিনে তিন থেকে চার কোটি টাকার ব্যবসা হত সেখানে তা অর্ধেক হয়ে গেল। এক বছর পর ২০১৭ সালে, পরিস্থিতি আরও সঙ্গিন। লোনি পশুবাজারে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৯৯.৩৬ কোটি টাকার ব্যবসা হয়েছিল। ২০১৬-১৭-তে তা কমে দাঁড়ায় ৭৯.৩৬ কোটি টাকায়। একে দাম নেই তার উপর গরু নিয়ে আসার নিরাপত্তা নেই। খরা-বন্যা-মেয়ের বিয়ে যে কোনও আপৎকালীন সময়ে গবাদি পশু আসলে চাষির জীবনবিমা।হিন্দুত্ববাদীদের ‘গো-প্রেম’ চাষি, গো-পালক, গোয়ালাদের সেই রসদটুকু কেড়ে নিল। ( ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ৪ ফ্রেব্রুয়ারি, ২০১৬ ও ১৭ অগাস্ট ২০১৭)।

ফেরা যাক রাজ্যে। কলকাতার গণেশ টকিজ এলাকায় ৭৫ বছর ধরে চলেছে সদ্য দোয়া গরু-মোষের দুধের বাজার। প্রায় ১৫০ জন ব্যবসায়ী এই বাজারের সঙ্গে যুক্ত। রোজ বিক্রিবাটা দেড় লাখ লিটার দুধ। উৎসবের সময় তা গিয়ে দাঁড়ায় তিন লাখ লিটারে। বর্তমানে বিক্রির পরিমাণ গিয়ে দাঁড়িয়েছে দৈনিক ৫৫ হাজার লিটারে। দাম ৫০-৫৫ টাকা লিটার থেকে বেড়ে ৭০-৮০ টাকা লিটার হয়েছে। এই ব্যবসার রকমটি হচ্ছে, ব্যবসায়ীদের কলকাতা সংলগ্ন হাওড়া, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনায় গোশালা রয়েছে। উত্তরপ্রদেশ থেকে প্রতিমাসে নিয়ে আসা হয় দুগ্ধবতী গরু-মোষ। ভাল জাতের পশু হলে সাত-আট মাস সেই প্রাণীর দুধ বাজারে বিক্রি করা হয়। অপেক্ষাকৃত নিম্নমানের হলে তিন থেকে চার মাস। এর পর বিক্রি করে দেওয়া হয় স্থানীয় বাজারে। কিছু যায় কসাইখানায়, কিছু হয় পাচার। স্বাভাবিক ভাবেই নিয়মিত দুধেলা পশু আনতে হয়। কিন্তু, প্রথমে গো-রক্ষকদের তাণ্ডব পরে ফরমান ব্যবসা লাটে ওঠার জোগাড়। যে ব্যবসায়ী দৈনিক তিন হাজার লিটার দুধ বিক্রি করতেন, তাঁর বিক্রি ঠেকেছে হাজার লিটারে। (ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ৩ জুন ২০১৭)।

কলকাতা শহরে ট্যাংরা সরকারি কসাইখানার হালও তথৈবচ। বিফ ডিলার্স এসোসিয়েশনের মহম্মদ আলির মতে, যেখানে রোজ তিনশো গরু- মোষ জবাই হত, সেখানে সংখ্যা নেমে দাঁড়িয়েছে ১০০-১২০-তে। সপ্তাহে শ’খানেক মোষ জবাই হত। বর্তমানে মেরেকেটে সপ্তাহে চার-পাঁচটি হয়। এর বাইরেও রয়েছে রাজাবাজার, মেহেদিবাগান, নারকেলডাঙা, আলিমুদ্দিন ও অন্যান্য কসাইখানার গল্প। পরিস্থিতি সর্বত্রই অস্বাভাবিক।

এ চিত্র আংশিক। আমরা এখনও জানি না, বিভিন্ন ডায়েরি ফার্মগুলির প্রকৃত সমস্যা। জানি না রাজ্যের অসংখ্য গোপালক ও চাষিদের কথা। ডেয়ারি ফার্মগুলির কথাও।

এক গভীর ষড়যন্ত্র

২৩ মে ২০১৭, জারি হয়েছিল কেন্দ্রীয় নির্দেশিকা। আর ৯ এপ্রিল ২০১৭ মহাবীর জয়ন্তীতে গো-রক্ষা নিয়ে সরব হয়েছিলেন আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত। দেশ জুড়ে গো-হত্যা নিষিদ্ধ করতে দেশজুড়ে একটিই আইন আনার পক্ষে সওয়াল করেন তিনি। পাশাপাশি অবশ্য বলেন, হিংসা গো-রক্ষার উদ্দেশ্যকে কলঙ্কিত করে দেয়। ভাগবতের স্পষ্ট বক্তব্য, ‘গো-রক্ষার নামে এমন কিছু করা উচিত নয়, যা মানুষের বিশ্বাসকে আঘাত করে। হিংসাত্মক কিছুই করা উচিত নয়। এটা গো-রক্ষকদের উদ্দেশ্যকে কলঙ্কিত করে দেয়। গো-সংরক্ষণের বিষয়টি আইন ও সংবিধান মেনেই হওয়া উচিত।’ ভাগবত মনে করেন, সমস্ত রাজ্যেই গো-হত্যা বন্ধে আইন প্রণয়ন হবে। এমন কী উত্তর-পূর্বে। তাঁর দাবি, ‘রাজনৈতিক জটিলতার কারণে সর্বত্র এই আইন চালু করতে সময় লাগবে। তবে, আইন যদি থাকে, সেটা অহিংসকেই তুলে ধরবে, হিংসাকে নয়। এমন কোনও আইন থাকতে পারে না, যা কাউকে হিংসায় উদ্বুদ্ধ করবে, এটা অসম্ভব। আমার বিশ্বাস আরএসএস কর্মীরা ক্ষমতায় থাকবেন, তাঁরা সব স্থানীয় জটিলতা কাটিয়ে আইন আনার পথে এগোবেন।’

কি কোথাও কী মনে হচ্ছে না এই গো-উন্মাদনার পিছনে, মৌলেখির মামলা ও গো-বিধির পিছনে, আসলে কোথাও একটা সুনির্দিষ্ট কর্মপদ্ধতি রয়েছে? কোথাও নেকড়ের বাচ্চারা দাঁত-নখ খিঁচিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। আর কোথাও ভেড়ার চামড়া জড়িয়ে নেকড়ে প্রধান আইন ও অহিংসার দোহাই পাড়ছেন। উদ্দেশ্য নিয়ে তাঁদের মধ্যে বিবাদ নেই। মনে হচ্ছে না কেন্দ্রীয় গো-বিধি আসলে হিন্দুত্ববাদীদের অ্যাজেন্ডা? আরএসএস-এর অ্যাজেন্ডা। গো-রক্ষা, গো-হাট, বেচাকেনা এ সমস্তই যেহেতু রাজ্য বা যৌথ তালিকার অন্তর্ভুক্ত, তাই সংবিধান সংশোধন না করে তা রাজ্যের হাত থেকে কেড়ে নেওয়া যায় না, অতএব খিড়কির রাস্তা দেখ।

গো-সংরক্ষণের হাল

রাজ্যে রাজ্যে গো-রক্ষার আইন তো কঠোর হল। খুন-খারাপি-তাণ্ডবও কিছু কম হল না। গ্রামীণ কৃষি অর্থনীতিও সর্বনাশের পথে। কিন্তু, গো-মাতা তিনি রক্ষা পেলেন তো? মাতৃভক্ত হনুমানেরা মাকে দুধে-ভাতে না হোক, অন্তত খড়ে-জলে রেখেছে তো? কেন করছি এই প্রশ্ন? করছি এই কারণে যে, এই লেখা যখন লিখছি, তখন সংবাদমাধ্যম জানাচ্ছে, ছত্তিসগড়ের এক বিজেপি নেতা গরুর প্রতি অবহেলা ও নিষ্ঠুরতার জন্য গ্রেফতার হয়েছেন। নাম হরিশ ভার্মা। জেলা দুর্গ। তিনি বিজেপি’র জামুলনগর পঞ্চায়েতের সহ সভাপতি।

খবরে প্রকাশ, হরিশবাবু তিনটি গোশালার মালিক। রাজপুর গ্রামের শাগুন গোশালা, রানো গ্রামের ময়ূরী গোশালা ও গোদমাররা গ্রামের ফুলচাঁদ গোশালা। ব্যবসাটি ভালই। তা মোদি যুগে এমন ব্যবসা তো রাজ্যে রাজ্যে। কিন্তু, হরিষে বিষাদ ঘটল। খবর, জল আর খাবারের অভাবে না কি শাগুনে ২০০ গরু মরেছে। হাড়-পাঁজরা সর্বস্ব বাকিরা ধুঁকছে। মানুষের গলার আওয়াজ পেলে অসহায় করুণ চোখে একটু জল, একটু খাবারের জন্য কোনওরকমে মুখটুকু তুলছে। তিরিশটি লাশ নিজেই গুনেছেন সাংবাদিক। ময়ুরী ও ফুলচাঁদে গিয়ে দেখা গেল একই অবস্থা। সেখানে দুই গোশালা মিলিয়ে ৩৫টি মৃত গরু পড়ে রয়েছে। বাকিরা তথৈবচ। গোবর, গো-মূত্র, কাদামাটির তালের মধ্যে মৃতপ্রায় আরও শ’চারেক পশু।

কী বলছে ছত্তিসগড় গো-সেবা আয়োগ? যাদের দায়িত্বে রয়েছে এই গোশালা। সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকায় গো-সেবার পরম দায়িত্ব। তারা বলছে, গরুদের রক্ষণাবেক্ষণ, খাবার-জল-চিকিৎসার জন্য ২০১১ সাল থেকে শাগুন গোশালাকে ৯৩ লক্ষ টাকা দেওয়া হয়েছে। ২০১৪ সাল থেকে ফুলচাঁদ পেয়েছে ৫০ লক্ষ টাকা। আর ২০১৫ সাল থেকে ময়ূরী পেয়েছে ২২.৬৪ লক্ষ টাকা সরকারি অনুদান। ২০১৬ সালে আয়োগ তদন্ত করে দেখল, গোশালাগুলিতে চূড়ান্ত অব্যবস্থা। যা যা সুযোগ-সুবিধা থাকা উচিৎ তা তো নেই উল্টে প্রচণ্ড ভাবে অতিরিক্ত পশুর ভিড়। জুলাই ২০১৬ সালে বন্ধ করে দেওয়া হল অনুদান। খালি পেটে ধর্ম হয় না, ঠাকুর বলে গিয়েছিলেন। গো কেন মানব প্রেমও না। অত:পর খাবার-জল-চিকিৎসার অভাবে মরতে শুরু করল অবলা জীবগুলি। গ্রেফতার তো হল বিজেপি নেতা। দায় এড়াতে পারবে কি সরকারি আয়োগ?

রাজনীতিবিদ ও সমাজ বিশ্লেষক সন্তোষ রাণা এই প্রশ্নটিই করেছিলেন প্রায় এক বছর আগে। একটু দীর্ঘ উদ্ধৃতি তবু এ সময়ে যা খুবই জরুরি।

“সংঘপরিবারের মদতপুষ্ট গো-রক্ষকরা দাবি করছে যে গরু বুড়ো হয়ে গেলে তাদের গোশালায় রাখতে হবে। হরিয়ানায় গো-সেবা আয়োগ নামক এক হিন্দুত্ববাদী সংগঠন দাবি করেছে যে সরকারকে সিনেমা টিকিটের উপর ৫ শতাংশ গো-সেস বসাতে হবে, ব্যাংকোয়েট হল ভাড়া করলে ২১০০ টাকা গো-রক্ষা সেস বসাতে হবে এবং প্রতি বস্তা গম,ধান ও অন্যান্য শস্যের উপর ১ টাকা সেস বসাতে হবে। এভাবে বছরে ১০০ কোটি টাকা সংগ্রহ হবে যা তাদের হাতে দিলে তারা গরুর সেবা করবে। এইসব অবাস্তব প্রস্তাব রাখা হচ্ছে শুধু সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের উদ্দেশ্যে। ভারতে যদি ২০ কোটি গরু থাকে তাহলে তার মধ্যে প্রাপ্তবয়স্ক গাই-এর সংখ্যা ৭.৫ কোটি। বাকি ১২.৫ কোটি গরুকে যদি পশুশালায় রেখে খাওয়াতে হয়, দিনে গড়ে ২৫ টাকা খরচ করলে বছরে খরচ হবে ১ লক্ষ ১৪ হাজার কোটি টাকা। ভারত রাষ্ট্রের পক্ষে এই ব্যয়ভার বহন সম্ভব?” (গো-রক্ষা না গ্রামীণ অর্থব্যবস্থার সর্বনাশ, সন্তোষ রাণা, আরেক রকম, অক্টোবর ২০১৬)।

সেস অবশ্য বসানো হয়েছে। বসিয়েছে রাজস্থান সরকার। স্ট্যাম্প ডিউটির উপর ১০ শতাংশ গো-সেস বসিয়ে ২০১৬-১৭ সালে ১৫১.৫০ কোটি টাকা তুলেছে রাজস্থান। সরকারি হিসাব, এর মধ্যে ১৩৮.৬৭ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে গবাদি পশুর দেখভাল আর গোশালাগুলি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য। ১২৮.৬৯ কোটি টাকা খরচ হয়েছে ১০৩৬টি গোশালায় ৪ লক্ষ ৭১ হাজার গবাদি পশুর খাদ্য-জল-চিকিৎসার জন্য। ১১.৭৯ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে আরও ১৫৫টি গোশালার পিছনে। অভিযোগ, এর পরও জালোর ও সিরোহী জেলায় অতিবৃষ্টির কারণে ৮০০ গরুর মৃত্যু হয়েছে।

২০০৪ সালে মধ্যপ্রদেশে ক্ষমতায় আসে বিজেপি। এর পরই গো-হত্যা বন্ধে শুরু হয় চরম কড়াকড়ি। আইন সংশোধিত হয়। নজরদারি বাড়ে। ১৩ বছর পর দেখা যাচ্ছে, চড়ে বেড়ানো গরুর জ্বালায় সাধারণ মানুষ অতিষ্ঠ, কৃষকরা অতিষ্ঠ, অতিষ্ঠ বিজেপি বিধায়করাও। পরিস্থিতি এমনই সম্প্রতি টিকমগড়ের দাম্বার গ্রামে খেতের ফসল খেয়ে নেওয়ার জন্য জনৈক মোহন তিওয়ারি গ্রামবাসী শঙ্কর আহিরওয়ারের গরুকে পিটিয়ে মেরে দেয়। মোহনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ব্রাহ্মণের হাতে দলিতের গরু মরেছে, উল্টোটি হলে যে কী সর্বনাশ হত সে ভেবেই আতঙ্কে অস্থির শঙ্কর। শোক চুলোয় যাক। ২১ জুলাই বিধানসভার আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছিল গরু। হাজার হাজার পরিত্যক্ত গরু রাস্তায় চড়ে বেড়াচ্ছে । চান্ডালার বিজেপি বিধায়কের দাবি, তাঁর বিধানসভা এলাকায় ২০ হাজার গরু লাগামছাড়া ভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাঁর আবেদন, ‘আমার বিধানসভা এলাকার কোনও উন্নয়নের কাজ না করলেও চলবে। গরু সামলান।’ ভারতীয় কিষান সংঘের নেতা শিবকান্ত দীক্ষিতের দাবি, রাজ্যের ৫১টি জেলার ৩৫-৪০টিতেই এই সমস্যা।

গবাদি পশু কেনাবেচা বন্ধ। অর্থনৈতিক কাজে লাগে না এমন পশুকে বসিয়ে বসিয়ে খাওয়ানোর ক্ষমতাই নেই অধিকাংশের। অতএব ছেড়ে দাও, চড়ে খাক। কৃষক নেতা বলছেন, অন্তত ১০ শতাংশ গোচারণ ভূমি প্রয়োজন, রয়েছে ২ শতাংশ। সমাজকর্মী অনুরাগ মোদীর দাবি, গ্রামীণ কৃষি অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। আদিবাসীদের চরম ক্ষতি হয়েছে। গোশালগুলো উপচে পড়ছে। মধ্যপ্রদেশ গো-রক্ষা বোর্ড গোশালা সামলাতে বাজেট বাড়িয়ে ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকা করেছে। গরু প্রতি প্রতিদিন ব্যয় ধরা হয়েছে ২.৯০ টাকা। বোর্ডই বলছে, অন্তত ১০০ কোটি টাকা চাই। যাতে গোশালায় দিন প্রতি প্রতিটি গরুর পিছনে ১০ টাকা খরচ করা যায়। এদিকে কৃষিঋণ মকুবের জন্য কৃষকরা আন্দোলন করলে গুলি করে মারা হচ্ছে। অন্যদিকে, গরুর অভয়ারণ্য গড়ার আহ্লাদে ভাসছে গেরুয়া বাহিনী। আচ্ছে দিনই বটে।

রাজধানী দিল্লিতেও ত্রাহি ত্রাহি রব। গত বছর উত্তর ও দক্ষিণ দিল্লি মিউনিসিপ্যালিটি প্রায় ৯০০০ গরু আটক করেছিল। এ বছর জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত নিউ দিল্লি মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন ১২৩৬টি পরিত্যক্ত গরু আটক করেছে। আর তাদের পিছনে করপোরেশন ও সরকারের পশু দফতরের  যৌথভাবে দিনপ্রতি প্রতিটি গরু পিছু খরচ  ২০ টাকা।

মোদির গুজরাটে অবশ্য অবস্থা পাকা। সরকার-এনজিও’র পাশাপাশি কর্পোটীয় বন্দোবস্ত। আম্বানি-আদানির রাজ্য বলে কথা। গো-রক্ষায় সিএসআর-এর (কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি)  গুরুত্ব বাড়ছে। ২০১৩-র কোম্পানি আইন অনুযায়ী, যে সংস্থার বার্ষিক টার্নওভার ১ হাজার কোটি টাকা অথবা মুনাফা ৫ কোটি টাকা, তাদের মুনাফার ২ শতাশং সামাজিক দায়বদ্ধতা রক্ষায় খরচ করতে হবে। আমেদাবাদের ফার্মাসিটিউক্যাল সংস্থা ডেলউইস হেলথকেয়ার তাদের সিএসআর বাজেটের ২ শতাংশের এক চতুর্থাংশ ঢালছে তাদের আনন্দবন গোশালা রক্ষণাবেক্ষণে। টাটা পাওয়ার কচ্ছ এলাকায় গোশালা গড়ে তুলেছে। ভাদোদরায় আলেমবিক ফার্মাসিটিউক্যাল গরু-মোষের দেখভালের দায়িত্ব নিয়েছে। ফুলারটন ইন্ডিয়া ক্রেডিট কোম্পানি তাদের সিএসআর বাজেটের ৮ শতাংশ খরচ করছে গো-রক্ষায়। (ইন্ডিয়া এক্সপ্রেস, ২০ অগাস্ট ২০১৭, ৩১ জুলাই ২০১৭, ৬ অগাস্ট ২০১৭, ২২ জুন ২০১৭, ও ইকোনমিক টাইমস, ১৫ জুন ২০১৭)।

কিন্তু, শেষ রক্ষা হবে তো? দক্ষিণ ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চল ফি বছর খরায় আক্রান্ত। পরিবেশ সংক্রান্ত একট সমীক্ষা জানাচ্ছে, ৯০ শতাংশ রাজ্যের জমি বা ভূমিতে উষরতা (ডেজার্টিফিকেশন) বৃদ্ধি পাচ্ছে। ৩০ শতাংশ হয় অনাবাদী বা পতিত হয়ে পড়েছে বা তার মুখোমুখি। দেশের মোট ভৌগোলিক এলাকা ৩২৮.৭২ মিলিয়ন হেক্টার, এর মধ্যে ৯৬.৪ মিলিয়ন হেক্টার অঞ্চল উষরতার প্রভাবে প্রভাবান্বিত। রাজস্থান, দিল্লি, গোয়া, মহারাষ্ট্র, ঝাড়খণ্ড, নাগাল্যান্ড, ত্রিপুরা, হিমাচলপ্রদেশের ৪০ থেকে ৭০ শতাংশ ভূমি এই পরিবেশগত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ২৯টি রাজ্যের মধ্যে ২৬টি রাজ্যেই গত ১০ বছরে এই প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। উষরতা বা ডেজার্টিফিকেশন বলতে সমীক্ষকরা বোঝাচ্ছেন, ‘ভূমির এমনই এক জাতীয় অধঃপতিত অবস্থা, যেখানে অপেক্ষাকৃত নীরস অঞ্চলের ভূমি ক্রমে ক্রমে অনুর্বর ও অনাবাদী হয়ে ওঠে। হারিয়ে যায় জলাভূমি, গাছপালা, বন্য জীবজন্তু।’ ( ডাউন টু আর্থ, ৭ জুন ২০১৭)

এই পরিবেশগত পরিস্থিতি গভীর খাদ্যসঙ্কটেরই ইঙ্গিতবাহী। স্বাভাবিক ভাবেই মনে হয়, কোটি কোটি গবাদি পশুর খড়-ঘাসটুকু মিলবে তো?

আমরা কোন পথে?

লেখার শুরুতেই বলছিলাম ‘আপাত স্বস্তি’-র কথা। শেষ প্রান্তে এসে সেটুকুও জোর দিয়ে বলব, নিজের প্রতি এমন আস্থা।

শেষ প্রান্তে এসে সেটুকুও জোর দিয়ে বলব, নিজের প্রতি এমন আস্থা খুঁজে পাই না। কথায় আছে, না আঁচিয়ে বিশ্বাস নেই। এ রাজ্যে বিজেপি’র রাজনৈতিক ক্ষমতা ক্রমে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সাম্প্রতিক উপ নির্বাচন ও পুরসভা নির্বাচনের ফলাফলের নিরিখে বিজেপি এখন রাজ্যে অন্যতম প্রধান শক্তি। বিজেপি ও হিন্দু সংগঠনগুলির চাপে নদিয়া জেলার নবদ্বীপে অত্যাধুনিক কসাইখানা গড়ার প্রস্তাব বাতিল করেছে সংশ্লিষ্ট তৃণমূল পুরসভা। হিন্দুত্ববাদীরা জানিয়ে দিয়েছে এ রাজ্যে কোথাও কোনও কসাইখানা গড়তে দেওয়া হবে না। বিগত এক বছরে ১১টি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও দাঙ্গা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ২২ জুন ২০১৭, উত্তর দিনাজপুরের চোপড়া থানা এলাকায় গোরু চুরির অভিযোগ তুলে তিনজন মুসলমান যুবককে পিটিয়ে খুন করা হয়েছে। ২৭ আগস্ট ২০১৭, জলপাইগুড়ি জেলার ধুপগুড়ি থানা এলাকায় পিটিয়ে খুন করা হয় আরও দুই গবাদি পশু ব্যবসায়ী মুসলমান যুবককে। এই দুই ঘটনায় মোট ছ’জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

এক বছর হতে চলল বিজেপি বা সংঘ পরিবার এ রাজ্যের গ্রামে গ্রামে ‘গো-গণনা’ বা ‘গো-শুমারি’ শুরু করেছে। কেন্দ্রীয় প্রকল্পের সুফল পাইয়ে দেওয়ার লোভ দেখিয়ে স্থানীয় মানুষদের জড়ো করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের আইন অনুযায়ী একমাত্র ভারত সরকার এ জাতীয় ‘সেনসাস’ করার অধিকারী। তাঁদের মতে, সংঘ পরিবারের এই উদ্যোগ শুধুমাত্র বেআইনি নয়, সাম্প্রদায়িক ভাবে প্ররোচনামূলক। অভিযোগ, রাজ্য সরকার সব জেনে বুঝে এই বেআইনি কাজ বন্ধ করতে কোনও উদ্যোগ নেয়নি। শুধু, এই কর্মকাণ্ডই নয় বিজেপি ও সংঘ পরিবার এবং নানা কিসিমের হিন্দুত্ববাদীরা সমাজের সর্বস্তরে নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে তাদের জাল বিছিয়ে চলেছে। এই সামাজিক করণকৌশলের প্রতিস্পর্ধী কোনও সংগঠিত আন্দোলন বা করণকৌশল আজও অনুপস্থিত।

এ রাজ্যে সাম্প্রদায়িকতা, জাতপাতের মতো রোগ চিরকালই ছিল। কিন্তু, যুগ যুগ ধরে নানা সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক আন্দোলনের জেরে এই রোগের বিরুদ্ধে, আমাদের সমাজ-শরীরে, একটা স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে উঠেছে। যা বাঙালির মজ্জাগত বলা যায়। একমাত্র দেশভাগের সময় ছাড়া যা কখনও মহামারীর আকার নেয়নি। সেই মজ্জাগত প্রতিরোধ ব্যবস্থা আজ চ্যালেঞ্জের মুখে। এই চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে হলে সর্বস্তরে বহুমুখী লড়াইয়ে নামতে হবে। সে সামাজিক মাধ্যম থেকে গো-চারণ ভূমি হতে পারে, গোয়াল থেকে গো-হাট বা কসাইখানা থেকে বানতলা। সূচ্যগ্র মেদিনী ছাড়া যাবে না। নো পাসারন।

এ কথা বলেই শেষ করা যাক যে, মূল মামলাটি ছিল, নেপাল ও বাংলাদেশে বেআইনি ভাবে গবাদি পশু পাচার, পাচারকালীন পশুদের উপর নৃশংস অত্যাচার, পরিবহনের সময় বা বাজার / হাটগুলিতে  মানবিক আচরণের প্রশ্নে। তা আসলে ছিল একটি মুখোশ, একটি ফ্যাসিস্ত ক্রীড়া-পরিকল্পনার আইনি মুখ।  দেশের বর্তমান আইনেই যে সমস্যার সমাধান সম্ভব। সেখানে, সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের দোহাই দিয়ে পরিবেশ মন্ত্রক সংঘ পরিবারের ফ্যাসিস্ত অ্যাজেন্ডা রূপায়নের পথ নিল। এই ফরমানই হল হিন্দু ফ্যাসিজমের শ্রীমুখ।

3 thoughts on “গো-বিধি : একটি হিন্দু ফ্যাসিবাদী প্রকরণ

  1. Pingback: Content & Contributors – September 2017 | aainanagar

  2. Pingback: মুসলমানের কথা, মুসলমানির কথা | aainanagar

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

w

Connecting to %s