পাহাড়ে আন্দোলন

তথাগত সেনগুপ্ত

তথাগত হায়দ্রাবাদ সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটিতে অঙ্কের শিক্ষক; শিক্ষাক্ষেত্রে ও অন্যান্য ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সাথে যুক্ত। এই লেখাটির অংশবিশেষ ইতিপূর্বে অনীক পত্রিকার জুলাই ২০১৭ সংখ্যায় ছাপা হয়েছিল। এছাড়া লালী গুরাসে লেখাটির ইংরাজি অনুবাদ পূর্বপ্রকাশিত।

পাহাড়। দার্জিলিং। কালিম্পঙ। ঘুম। মধ্যবিত্ত ভদ্রলোক বাঙালির কাছে এই শব্দগুলো বিশেষ কিছু ছবি বয়ে আনে। হয় নিজের ক্যামেরায়, নাহলে পাশের বাড়ির নতুন বিয়ে হওয়া দাদা বৌদির ফোনের ফটো গ্যালারিতে, অথবা পাড়ার চা-এর দোকানের পুরোনো জং ধরে যাওয়া স্টিল-এর বাক্সের উপর পেইন্ট করা অক্ষরে, বা পাড়ার ট্রাভেল এজেন্ট-এর অফিসের ক্যালেন্ডার-ক্যাটালগে, আর নয়তো সত্যজিৎ রায়-এর ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’-র মতন বাংলা সিনেমায় এইসব ছবির বসবাস। ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ যে সত্যজিৎ-এর প্রথম কালার সিনেমা, ছবি বিশ্বাসের শেষ সিনেমাগুলির একটি, যার কিছু মাস পরেই তিনি গাড়ি অ্যাক্সিডেন্টে মারা যান, যার পরে সত্যজিৎ নাকি বলেছিলেন যে তিনি আর বয়স্ক মধ্যবিত্ত ভদ্রলোকের কোনও রোল লিখবেন না আর কোনও সিনেমায়—এসব গল্প যেকোনও বাঙালি মধ্যবিত্ত পরিবারে একটু কান পাতলেই শোনা যায়। যাই হোক, সে অন্য কথা। ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’-য় একটি বড়লোক বাঙালি পরিবার এবং তাদের সঙ্গে যুক্ত কিছু মানুষকে তাদের নিজেদের এবং পারিবারিক জীবনের বেশ কিছু জটিলতা, অভাব-অভিযোগ, চাওয়া-পাওয়া নিয়ে বোঝাপড়া করতে দেখা যায়। সিনেমার চরিত্রগুলির মতে, কলকাতার মত ব্যস্ত জটিল শহরে এমন সুযোগ বা সাহস, কোনওটাই পাওয়া যায় না, কিন্তু দার্জিলিং-এর বিরাট পাহাড়, মেঘ-বৃষ্টি-রোদ, বয়স্ক গম্ভীর গাছগাছালি শহর থেকে উঠে আসা এই লোকগুলিকে নতুন সাহস যোগায় নিজেদের জীবনের ধুলোময়লা সাফ করার। দিনের শুরুতে দার্জিলিং-এর মাথা থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যাবে কি যাবে না, মেঘ কাটবে কি কাটবে না, এই নিয়ে চিন্তা সংশয় থাকলেও, সন্ধ্যে নাগাদ যখন সত্যিই মেঘ কাটে এবং কাঞ্চনজঙ্ঘার সাদা বরফ ঢাকা চূড়া দেখা যায়, তখন এই লোকগুলি নিজেদের জীবনের হিসেবনিকেশ সেরে ফেলতে এতই ব্যস্ত যে তাদের সেদিকে খেয়ালই থাকে না। পরের দিন কলকাতায় ফেরার আগে তারা তাদের জমে থাকা বিভিন্ন জটিলতা ঝেড়ে ফেলতে চায়, এবং দেখে মনে হয় শহরে ফিরে তারা যেন নতুন করে জীবন শুরু করার কথা ভাবছে। ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’-র কথা এইজন্য জরুরি, কারণ এই সিনেমার চরিত্রগুলিকে দেখে মনে হয় তারা যেন পাহাড়ে ঘুরতে যাওয়া বাঙালি টুরিস্টের ব্লু-প্রিন্ট।

মধ্যবিত্ত, হাঁপিয়ে যাওয়া কলকাতার বাঙালিরা সাধারণত পাহাড়ে যায় নিজেদের ফিরে পেতে, সাহস-প্রেম ফিরে পেতে, শহরের জীবনের জটিলতায় মনের মধ্যে জমে ওঠা আবর্জনা পাহাড়ের মাথা থেকে ছুঁড়ে ফেলতে, পরিবার-সমাজ-অফিস-ব্যবসা-র বিভিন্ন নিয়ম-আইন-দায়িত্ব থেকে পালিয়ে কিছুদিনের নিষিদ্ধ আনন্দ চেখে দেখতে। পাহাড়ের গা পেঁচিয়ে ওঠা রাস্তার কোনও একলা বাঁকে দাঁড়িয়ে সে মনে করতে চায় সে-ই এই সমস্ত পাহাড় জঙ্গলের মালিক, ঠিক যেমনটা মনে হয় ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’-য় ছবি বিশ্বাসের হাঁটাচলা ভাবভঙ্গি দেখে। এর কোনওটাই ভীড়ে ঠাসা ব্যস্ত, যানজটে বিরক্ত, ঘামে-ভেজা কলকাতায় সম্ভব নয়। সেখানে ভীড় লক্ষ্মীকান্তপুর লোকালে পাশের লোকটির পা ভুল করে মাড়িয়ে দিলে সে যখন পাঁচটা খিস্তি দেয় সবার সামনে, তখন আর বাঙালি ভদ্দরলোকের মনে হয় না যে সে রবীন্দ্রনাথের নাতি, সত্যজিৎ-এর ভাইপো। এসব তাই তোলা থাকে পাহাড়ের জন্য। দার্জিলিংকে তাই বাঙালি ভালোবাসে, নিজের স্ত্রী-প্রেমিকার মতোই! পাহাড়কে নিয়ে বাঙালি তাই কবিতা লিখতে পারে, গান লিখতে পারে, সিনেমা তৈরী করতে পারে। দরকার পড়লে দার্জিলিং-এর নাম লিখে দিতে পারে শহরের ট্রামে, বাসে, পুরোনো বাড়ির রং চটে যাওয়া দেওয়ালে। সারা বছর ঘুন ধরা ডেস্কে পুরোনো ফাইলের স্তুপের মধ্যে অল্প জায়গা করে নিয়ে লেখা উঠে যাওয়া কম্পিউটার কীবোর্ড-এ ঘাড় গুঁজে দিনের পর দিন ব্যালান্স শিট টাইপ করতে থাকা ব্যাঙ্ক-কর্পোরেশনের মধ্যবিত্ত মুকুটহীন বাঙালি কর্মচারীর ‘মুকুট’ হয়ে দাঁড়ায় গরমের ছুটিতে দার্জিলিং। সারাদিন ধরে বয়সে ছোট কিন্তু পোস্টে বড় ডিগ্রীধারী অফিসারের ধমক-ধাতানি খেয়ে, রোজকার দশটা-পাঁচটার শিফটে পুরোনো ঘষে যাওয়া করাতমিলের দাঁতভাঙা করাতের মতন কাজ ক’রে বা না ক’রে, নামহীন-পরিচয়হীন মধ্যবিত্ত বাঙালি চাকুরীজীবি লোকটি দিনের শেষে বাড়ি ফিরে, তার শোওয়ার ঘরে, যেমন হয়ে উঠতে চায় হত্তা-কত্তা-বিধাতা, ঠিক তেমনভাবে বছরের শেষে পাহাড়ে গিয়ে সে হয়ে উঠতে চায় পাহাড়ের সম্রাট।

বেডরুমের প্রসঙ্গ যখন এসেই পড়লো, তখন বলি। প্রত্যেক রাতে তার বেডরুমের আনাচে কানাচে একজন সাধারণ মধ্যবিত্ত বাঙালি পুরুষ যেন ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’-র ছবি বিশ্বাস। তার স্ত্রীকে সে ভালোবাসে, কিন্তু সেই ভালোবাসার ভাষা, নিয়ম-কানুন-আইন মূলতঃ সে-ই তৈরী করে, সে-ই ভাঙে। তার বেডরুমে সে-ই এম.পি, এম.এল.এ, সে-ই রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি, সে-ই মমতা ব্যানার্জী, নরেন্দ্র মোদী! একা নিজেই সে পুলিশ প্রশাসন, বিচারপতি, মিডিয়া এবং সেন্সর বোর্ড। সে-ই ঠিক করে কোনটা ঠিক, কোনটা বেঠিক, কোন খবরটা বেডরুম-এর বাইরে বেরোবে এবং কোনটা সেন্সর হবে। বাড়ির চৌহদ্দির মধ্যে আই.পি.সি-সি.আর.পি.সি-সংবিধান, সব বাতিল। সেখানে সবসময়ের জন্য ১৪৪ ধারা, সারা বছরব্যাপী ‘৭৫-এর এমার্জেন্সি, বছরের পর বছর। তার বাড়ি কী সত্যিই বাড়ি, তার পরিবারের সদস্যদের স্বপ্ন-আকাঙ্খা-স্বাধীনতার আশ্রয়ের জায়গা, নাকি জেলখানা, সেটা ঠিক করে সে-ই। সেখানে কতটা ‘স্বাধীনতা’ চলতে পারে, আর কতটা পারে না, তার হিসেব, মাপজোক করে দেয় সে নিজে, অনেকটা খাবারে নুন-এর পরিমাণ ঠিক করে দেওয়ার মতন। সেখানে কোন বই পড়া যাবে, কোন গান গাওয়া যাবে, কোন পোশাক পড়া যাবে, কোন ভাষায় কথা বলা হবে, কাদের মধ্যে সম্পর্ক কী ধরণের হবে, সেখানে বাড়ির বাইরের লোকেদের সঙ্গেই বা কী ধরণের সম্পর্ক চলতে পারে, এর সবটাই ঠিক করে দেয় বাড়ির এই মুকুটহীন কর্তা। এর সব কিছুই অবশ্যই হয় নিয়মশৃঙ্খলার যুক্তি দেখিয়ে। কিন্তু সব নিয়মের মধ্যে প্রধান নিয়ম হলো যে এই ঠিক করে দেওয়া নিয়মগুলিকে প্রশ্ন করা যাবে না, তাহলেই বাড়ি নামক ‘নেশন’-এর মধ্যে সেই প্রশ্নকর্তাটি ‘এন্টি-ন্যাশনাল’। তাহলেই তার উপর লাগু হবে সেডিশন, ইউ.এ.পি.এ.-র মতন ব্রহ্মাস্ত্র। তার বাড়ির মধ্যের এই অলিখিত আইন-কানুন কিন্তু সবার জন্য সমান নয়। কার উপর কী ধরণের নিয়ম চলবে, সেটা ঠিক হয় মূলতঃ তার লিঙ্গ এবং আর্থিক ক্ষমতার ভিত্তিতে। তার স্ত্রী-র জন্য মধ্যবিত্ত বাড়ির কর্তার ঠিক করে দেওয়া কর্মক্ষেত্র হলো প্রধানত বাড়ির রান্নাঘর এবং বাড়ি-ঘর, পোশাক-আষাক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার কাজ, ছেলে-মেয়েদের বাধ্য, নিয়ম-মেনে-চলা নাগরিক তৈরী করার কাজ। এই কাজের জন্য সেই মহিলাটিকে কোনও মাস মাইনে দেওয়া হয় না। টাকা পয়সার জন্য তাকে সম্পূর্ণভাবে তার মালিকটির উপর নির্ভর করে থাকতে হয়। কিছুটা হাতখরচ সে পায় বটে, এবং সেই খুচরো টাকা সে কিভাবে ব্যয় করবে সেটা এক অংশে সে-ই ঠিক করে। কিন্তু সেখানেও তার ‘স্বাধীনতা’র বিভিন্ন গণ্ডি আঁকা আছে, যা মেনে চলার শিক্ষা তাকে তার বাপের বাড়ি থেকে দেওয়া হয়েছে তার বড় হয়ে ওঠার প্রত্যেক মুহূর্তে। অথচ, হিসেব করলে হয়তো দেখা যাবে যে একটি গোটা পরিবারের সদস্যদের খাইয়ে, পরিয়ে, অসুখের সময় ওষুধ খাওয়ানো থেকে শুরু করে পায়খানা পরিষ্কার করে, সন্তানের জন্ম দিয়ে এবং সেই সন্তানকে বড় করে, এই মহিলাটির ঝরানো ঘাম এবং রক্তের পরিমাণ তার স্বামী ব্যক্তিটির থেকে কম তো নয়ই, অনেক সময় হয়তো অনেকটাই বেশি। কিন্তু রবিবার সন্ধ্যেবেলায় ‘বিগ বাজার’ এবং অন্যান্য শপিং মল-এ গিয়ে ফ্রি টি-শার্টের খোঁজ করতে থাকা বাড়ির কত্তাব্যক্তিটি বেশ অনায়াসে ভুলে যান যে ‘বাড়ি’ নামক তার সাম্রাজ্যে প্রতি মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি ‘ফ্রি’ জিনিসপত্র ও সেবার অফুরন্ত যোগান দিয়ে যাচ্ছেন ‘স্ত্রী’ নামক তার প্রজাটি।

যাই হোক, মূল বক্তব্য হচ্ছে, যতক্ষণ বাড়ির এই মহিলা এই সমস্ত নিয়ম-কানুন হাসিমুখে একজন দায়িত্বশীল প্রজা-র মতন মেনে নিচ্ছেন, যতক্ষণ রাতে বেডরুমে তিনি তাঁর সারাদিনের ঘামের গন্ধ সেন্ট-পাউডারের কুয়াশায় ঢেকে দার্জিলিং-এর মতন সুন্দরী হয়ে উঠছেন, যতক্ষণ সমস্ত দিনের পরিশ্রম, সমস্ত দিনের অসম্মান, অপমান মেনে নিয়েও দিনের শেষে ‘পাহাড় হাসছে’, ততক্ষণ তাঁর মতন প্রেমিকা হয় না। যতদিন রাতের পর রাত স্বামী নামক তাঁর মুকুটহীন মালিকটির মনের, শরীরের, পোশাক-আষাকের সমস্ত ময়লা আবর্জনা বিনাবাক্যে পরিষ্কার করে তিনি তাকে ফের পরেরদিন শহরের রাস্তায়-ট্রামে-বাসে-অফিসে খরচ করার মতন ‘আত্মসম্মান’-এর যোগান দিয়ে যাচ্ছেন ফ্রি-তে, প্রত্যেক দিন নিজের আত্মসম্মানের ছোট্ট ফিক্সড ডিপোজিট একটু একটু করে খুইয়ে, ততদিন তিনি সত্যজিৎ-এর ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’-র মতোই ‘অসামান্য’। যতদিন দার্জিলিং কলকাতা থেকে আসা ট্যুরিস্টদের জীবনের ওয়াশিং মেশিন-এর কাজ করছে বিনা বাক্যে, যতদিন পাহাড় এদের ঠুনকো আত্মসম্মান রিচার্জ করে চলেছে নিজের মানসম্মান ভাঙিয়ে, ততদিন সে সবার সেরা। যতদিন সেই স্ত্রী মুখ বুজে তার তেলে-ঝুলে স্যাঁতস্যাঁতে রান্নাঘরের মধ্যে থেকে দিনের পর দিন গোটা পরিবারের ভাত-সবজির যোগান দিয়ে যায়, যতদিন সে চা-বাগানের ঠিকা শ্রমিক হিসেবে মুখ বুজে বাঙালি ভদ্দরলোক ম্যানেজারবাবুর তীব্র অপমান সহ্য করে পিঠ-ভাঙা পরিশ্রম নিংড়ে ‘ওয়ার্ল্ড ক্লাস’ চা-পাতা সাপ্লাই করতে থাকে, যতদিন সেই ট্যুরিস্ট লজের গোর্খা সাফাইকর্মী হাসিমুখে কলকাতার বাঙালি ট্যুরিস্টের বিভিন্ন নোংরামো মেনে নিয়ে তার ফাইফরমাশ খাটছে, ততদিন তার কোনও তুলনা নেই। যতদিন সে তার মাসিক হাতখরচের টাকা তার স্বামীর এঁকে দেওয়া গণ্ডির মধ্যে থেকে ব্যয় করে, যতদিন বাংলা সরকারের তৈরি করে দেওয়া জি.টি.এ. আর বিভিন্ন বোর্ডগুলির মাধ্যমে বিলোনো দানছত্র হাত পেতে নিয়ে সে খুশি থাকে, ততদিন সে ‘নির্ভরযোগ্য’। যতদিন বাংলা বা হিন্দি সিনেমায়, কবিতায় বা গানে পাহাড়ের মানুষের কাজ হচ্ছে ব্যাকগ্রাউন্ড-এ লোকাল ‘ফোক টিউন’ এবং পর্দায় কখনো কখনো পথচলতি মানুষজন, চা-বাগান-এর কুলি, অথবা ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’য় দেখানো ভিক্ষা করতে থাকা নোংরা জামা পরা করুণ মুখ করা নেপালি ছেলে, যাকে দয়াদাক্ষিণ্য দেখাতে আনন্দ হয়, যার সাথে ‘সেলফি’ নিয়ে ফেসবুকে পোস্ট করা যায়, কিন্তু যাকে ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’র মতন সিনেমার মূল চরিত্র হিসেবে ভাবতে গেলে হাত পা ঠান্ডা হয়ে যায়, ততদিন এই পাহাড়ের মতন প্রেমিকা হয় না। আর তাছাড়া, কে-ই বা জানে সত্যিই দার্জিলিং পাহাড়ে ঘুরতে গেলে কতজন নেপালি ভিক্ষারত ছেলেকে দেখা যায়? এই লেখকের চোখে তো পড়েনি। ঠিক যেমন কলকাতার যেকোনো সাধারণ মধ্যবিত্ত বাড়িতে সেভাবে চোখে পড়েনা বাংলা সিনেমায় দেখানো প্রত্যেক সিন-এ চোখের জলের উদ্রেককারিণী অসহায়, নিঃসম্বল, শক্তিহীন, বন্ধুহীন নারী। তাঁরা নির্যাতিত বা শাসিত অবশ্যই, কিন্তু সেই শাসন এবং নির্যাতনের উঁচু পাঁচিল ধ্বংস করা, অথবা তার কিছু জর্জর ইঁট খসিয়ে ওপারের সুরক্ষিত ক্ষমতার রাজধানীর সঙ্গে পারস্পরিক সহাবস্থান, লেনদেনের ছোট্ট জানলা তৈরী করা, অথবা কোনো উপায়ে সেই পাঁচিল বেয়ে উঠে ওপারে অনুপ্রবেশ করা এবং রাজধানীর ক্ষমতাযন্ত্রের কপিকল হয়ে ওঠা – এই সমস্ত রণনীতির মাঝে জীবনের মধ্যগগনের সূর্যের দাবদাহ থেকে বাঁচতে সেই পাঁচিলের একফালি ছায়ার নিচে বসে চোখের জল ফেলার সময় বা বাস্তব যৌক্তিকতা সিনেমার পর্দার বাইরে অনেকেরই থাকেনা। তাই এই ধরনের চরিত্রায়নের বাস্তবতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে এমনিতেই বড় প্রশ্ন থেকে যায়। কিন্তু সে যাই হোক, যতদিন দার্জিলিং সত্যজিৎ রায়ের মতন কলকাতা-দিল্লী-বোম্বে থেকে প্লেনে-হেলিকপ্টারে উড়ে আসা ডিরেক্টরদের জন্য শুধুই একটা স্টেজ, একটা প্রপ, যতদিন বাঙলা-হিন্দী সিনেমায় পাহাড়ের জন্য ঠিক করে দেওয়া রোল হলো শুধুই তার গাছ-পাথর-মেঘ-কুয়াশা-বরফ-টয়ট্রেন, যতদিন সেই প্রেমিকা তাকে নিয়ে লেখা তার স্বামীর কবিতা গান নির্বাক হয়ে শোনে এবং হুবহু মুখস্থ করে গায়, ততদিন সে ‘আদর্শ’।

কিন্তু যেদিন সে এই সমস্ত কিছু নিয়ে প্রশ্ন তোলে, সেইদিন রাতারাতি প্রেমিকা থেকে সে বিশ্বাসঘাতক! যেদিন সে তার নিজের গান, নিজের ভাষায় গাইতে চেষ্টা করে কোনও ‘ব্যাকগ্রাউন্ড টিউন’ হিসেবে নয়, কিন্তু মূল বক্তব্য হিসেবে, অন্য সমস্ত কিছুকে ব্যাকগ্রাউন্ডে ঠেলে দিয়ে, সেদিন থেকে সে ‘উগ্রবাদী’, ‘আতঙ্কবাদী’, ‘ অ্যান্টি-ন্যাশনাল’। তার ‘প্রেমিক’ স্বামী তখন তার টুঁটি চেপে ধরে শ্বাসরোধ করে তাকে খুন করতে উদ্যত হয়। তার চরিত্র সম্বন্ধে কুৎসা রটাতে শুরু করে। দার্জিলিং-কালিম্পঙ-সোনাদায় তখন বুলেট, টিয়ার গ্যাস চলে, একের পর এক খেটে খাওয়া মানুষ, বেকার যুবক মারা যান পুলিশের গুলিতে। পাহাড়ে আগুন জ্বলে, যেন তার অগ্নিপরীক্ষার চিতার আগুন। আধপেটা খাওয়া, মিনিমাম ওয়েজ-টুকুও না পেয়ে কোনওভাবে বেঁচে থাকা চা বাগান, অনিশ্চিত ভবিষ্যত নিয়ে সিঙ্কোনা বাগানের শ্রমিকরা যখন পাহাড়ের গভীর খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে প্রায় তলানিতে ঠেকে আসা তাঁদের আত্মসম্মানের ফিক্সড ডিপোজিট বাঁচাবার জন্য,  কেড়ে নেওয়া আত্মসম্মান ফিরে পাওয়ার জন্য দিনের পর দিন লাগাতার ধর্মঘট করেন, তখন তাদের একেবারে শেষ করে দেওয়ার জন্য, শ্বাসরোধ করে মারার জন্য রাজ্যের পুলিশ-প্রশাসন সমস্ত রাস্তা আটকে সমতল-ডুয়ার্স থেকে পাহাড়ে চাল নিয়ে যাওয়া অসম্ভব করে তোলে। বন্ধ করতে থাকে ওষুধ সরবরাহ পর্যন্ত। রাজপথের বিভিন্ন জায়গায় চেকপোস্ট বসিয়ে, খানাতল্লাশি করে পুলিশ পাহাড়ের বেঁচে থাকার জন্য ন্যূনতম রসদের সাপ্লাই বন্ধ করে দেয় বন্দুকের নলের জোরে। ডুয়ার্স থেকে চাল নিয়ে পাহাড়ে ফেরার সময় পুলিশের অপমান অত্যাচার এড়াতে জঙ্গলের ভিতরকার লুকোনো পায়ে চলা রাস্তা (যার স্থানীয় নাম “চোর বাটা” – চোরেদের রাস্তা) দিয়ে নিজের বাড়ি পৌঁছনোর সময় একজন চা বাগান শ্রমিকের চোখের উপর অসম্মান, ভয়, রাগ, ঘৃণা, দুশ্চিন্তা এবং দীর্ঘশ্বাস-এর যে একের পর এক পরত এই লেখক পড়তে দেখেছে, সে ছবি আঁকার ক্ষমতা তার কলকাতা থেকে ধার করে আনা কলমের নেই।

এদিকে রাজ্যের সমস্ত সংবাদপত্র, নিউজ চ্যানেল, যাদের কাছে এতদিন ‘দার্জিলিং’ কথাটার অর্থ-ই ছিল হয় শনিবার-এর সাপ্লিমেন্টারি খবরের পাতায় পাহাড়ের ‘সৌন্দর্য্যের’ রঙ্গীন ছবি, টলিউডের বিভিন্ন সুন্দর সুন্দর মুখের ছবির পাশাপাশি, অথবা বিভিন্ন ট্রাভেল এজেন্টের এডভার্টাইজমেন্ট, বা এবার দার্জিলিং-এ কোথায় বেড়াতে গেলে ভালো হয় এবং পাহাড়ের কোন নাম-না-জানা গ্রামেও ভালো বাঙালি খাওয়ার পাওয়া যায় তার অবান্তর বৃত্তান্ত, সেই বিক্রি হয়ে যাওয়া মিডিয়ারা সকলে মিলে একসঙ্গে মাঠে নেমে পড়ে এটা প্রমাণ করতে যে পাহাড় ‘বিশ্বাসঘাতক’, পাহাড় ‘দুশ্চরিত্র’, পাহাড় এতদিন তার ‘সৌন্দর্য্য’ বেচে খেয়েছে, এইবার তাকে বাটি হাতে কলকাতায় ভিক্ষে করতে আসতে হবে। শুনে চেনা চেনা লাগছে? ঠিক এই ধরণের কথা-ই বলা হয় পরিবারের মধ্যে নিজের অধিকার নিয়ে আপোষহীন লড়াই করা মহিলাদের সম্পর্কে। দার্জিলিং নিয়ে কুৎসা রটাতে ব্যস্ত এতগুলি বাংলা দৈনিক বা বাংলা চ্যানেল-এর একটাতেও, একদিনের জন্যেও, গোর্খাল্যান্ড-এর যে শতাধিক বছরের ঐতিহাসিক দাবির লড়াই, তার ব্যাপারে একটিও নিরপেক্ষ তথ্যমূলক খবর পড়া বা শোনা যায়নি। এটা কোথাও বলা হয়নি যে পাহাড়ের অধিকাংশ রাজ্য সরকারি স্কুলগুলোতে মূলত ইংরেজিতে সমস্ত বিষয় পড়ানো হয়, নেপালি ভাষায় শুধু একটি পেপার। এই এত বছরে রাজ্য সরকারের তরফ থেকে প্রকৃতঅর্থে কোনও গুরুত্ব দেওয়া হয়নি নেপালি ভাষায় পাঠ্যক্রম তৈরী করার ক্ষেত্রে। আরো ভাষাগুলোর কথা তো ছেড়ে দিন। নেপালি লেখা-পড়ার অভ্যেস হারিয়ে ফেলছে সরকারি স্কুলে পড়া আজকের পাহাড়ের ছাত্রছাত্রীরা। এই অবস্থায়, বা এমনিতেও পাহাড় অঞ্চলে বাংলাভাষা ও বাঙালি জাতিসত্তার সামগ্রিক কর্তৃত্বের পরিপ্রেক্ষিতে, বাংলাকে তৃতীয় (বা চতুর্থ বা পঞ্চম, যাই হোক) ভাষা হিসেবে বাধ্যতামূলক করে দেওয়া যে রোজকার জীবনে এবং গোটা পাহাড়ের ও ডুয়ার্সের বিভিন্ন জনজাতির সমাজ-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে কী পরিণাম নিয়ে আসতে পারে, তা’ পশ্চিমবঙ্গের মানুষ না বুঝলেও ভাষা-আন্দোলনের স্মৃতি মনে এখনো ধিকি ধিকি করে জ্বলছে, পূর্ববঙ্গের এমন কিছু বাঙালি নিশ্চয়ই বুঝবেন।

যাই হোক, দিনের পর দিন পাহাড় নিয়ে নির্লজ্জ মিথ্যা প্রচার চলতে থাকে। ‘হাতিয়ার’ পাওয়া নিয়ে মিথ্যা প্রচার, পুলিশবাহিনীর পাহাড়ে মহিলাদের অপমান করার খবর সেন্সর করা, এবং প্রতিদিন প্রতি মুহূর্ত এই মিথ্যা প্রচার করতে থাকা যে, পাহাড়ের সাধারণ মানুষের গোর্খাল্যান্ড নিয়ে কোনও মাথাব্যথা নেই, এটা গোটাটাই কিছু রাজনৈতিক নেতার বা দলের উস্কানি। ঠিক যেমন পরিবারের ক্ষেত্রে নিজের চুরি যাওয়া মানসম্মান ফিরে পাওয়ার জন্য লড়তে থাকা বাড়ির মহিলা সদস্যের ক্ষেত্রে রটানো হয় যে এরা নিজেরা জানে না এরা কী চায়, গোটাটাই কিছু ‘উগ্র নারীবাদী’র ‘মগজ ধোলাই’-এর ফল। এই কুৎসাকে জায়গা করে দিতে সবার প্রথমে পাহাড়ে ইন্টারনেট পরিষেবা, ফোন পরিষেবা, লোকাল কেবল নেটওয়ার্ক বন্ধ করে তার মুখ বেঁধে কণ্ঠরোধ করে দেওয়া হয়। ঠিক যেমন ভাবে বেডরুমে সেন্সরশিপ চলে যেকোনও মধ্যবিত্ত পরিবারে। যেকোনও সংঘাতের পরিস্থিতিতে গোর্খা পুলিশকে এগিয়ে দিয়ে পিছনের সারিতে থাকছে বাঙালি পুলিশের অফিসাররা। ঠিক যেমনভাবে পরিবারের মধ্যে কোনও মহিলা সদস্য নারীমুক্তির প্রশ্ন তুললে বাড়ির পুরুষকর্তা সবার আগে ঠেলে দেন পিতৃতন্ত্রে বিশ্বাসী বাড়ির অন্যান্য মহিলা সদস্যদের। অথচ গোটা আগ্রাসনের সেনাপতি পর্দার পিছনে থাকা সেই পুরুষকর্তাটিই। যেকোনও ‘ভালো সম্রাট’-এর মতন বাড়ির কত্তা এ-ও বলার চেষ্টা করেন যে আসলে চিন্তা হয় ‘বেশি স্বাধীনতা’ পেয়ে গেলে বাড়ির মহিলাদের নিরাপত্তার কী হবে। পরিবারের অন্যান্য মহিলা সদস্যদের সঙ্গে এই মুক্তিকামী মহিলা সদস্যটির সম্পর্ক-ই বা কিরকম দাঁড়াবে। যে চা-বাগানের শ্রমিকদের দীর্ঘদিন অনাহারে একের পর এক মৃত্যুর খবর নিয়ে শহরের বাঙালির এতদিন কোনও মাথাব্যথা ছিল না, যে লেপচা বা অন্যান্য জনজাতির অধিকারের প্রশ্ন এই দু’দিন আগেও কোনও বাঙালি বুদ্ধিজীবীর চিন্তার বিষয় আদৌ ছিল না, হঠাৎ ধর্মঘটের ফলে পাহাড়ের সেই মানুষগুলির রোজকার জীবনের অসুবিধায় তাঁরা এখন চোখের জল ফেলার কম্পিটিশনে কুমীরকেও লজ্জায় ফেলছেন! গোর্খাল্যান্ড হলে ‘লেপচাদের কী হবে, লেপচারাই তো আসলে ওখানকার ভূমিপুত্র’— এইসব নিয়ে হঠাৎ বাঙালি বুদ্ধিজীবীরা ভীষণ চিন্তিত। নারীস্বাধীনতার লড়াইয়ের মধ্যে নিশ্চয়ই বহু প্রশ্ন, মতবিরোধ বা দ্বন্দ্ব আছে, যার মূল কারণ এই যে ‘নারী’ নামক সত্ত্বার বাইরেও একজন মানুষের অন্যান্য বহু সত্ত্বা থাকে, যার ফলে সকল নারীর জন্য “নারীস্বাধীনতা”র মানে এক নয়, সকল নারীর জন্য নারীমুক্তির সংগ্রাম একইরকম দেখতে নয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও নারীমুক্তির সংগ্রাম হলে সেখানে বাড়ির বৌ-মেয়ে-শাশুড়িরা কিভাবে তাঁদের ভিতরকার বিভিন্ন সমস্যা মেটাবেন, সেটা তাঁদের ব্যাপার। সেখানে বাড়ির পুরুষের মাথাব্যথার খুব একটা কারণ নেই। একইভাবে যেকোনও স্বনিয়ন্ত্রণের লড়াইয়ে বিভিন্ন আভ্যন্তরীণ প্রশ্ন থাকে, সেগুলো একান্তই তাদের নিজেদের ঘরের সমস্যা। সেই সব সমস্যা সেখানকার মানুষদের-ই নিষ্পত্তি করতে হবে। এই দায়িত্ব বা মাথাব্যথা সেখানকার বিভিন্ন গণতান্ত্রিক মানুষ এবং সংগঠনের। সেই সব গণতান্ত্রিক প্রচেষ্টার সাথে বাইরে থেকে বন্ধুত্ব এবং সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া যায় এবং দেওয়া উচিত, পারস্পরিক বিভিন্ন রাজনৈতিক মতবিরোধকে কবর না দিয়েই, কিন্তু এই সব সমস্যার দোহাই দিয়ে একটি স্বনিয়ন্ত্রণের সংগ্রামকে বেলাইন করার কুৎসিত চেষ্টাকে ‘গণতন্ত্র’-এর পারফিউম দিয়ে কিছু সময়ের জন্য চালানো যায় হয়তো, কিন্তু সময়ের সঙ্গে তার দুর্গন্ধ ছড়াবেই।

বাংলার পার্টিশন-এর পরে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি জাতি যখন এখানকার ‘ভূমিপুত্র’ এবং পূর্ববঙ্গ থেকে উচ্ছেদ হয়ে আসা বাঙালিদের মধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক টানাপোড়েন সমাধান করার চেষ্টা করছে সঠিক বা ভুল উপায়ে, তখন কই গোর্খাল্যান্ডের মানুষ এসে তো বাড়ির কর্তাসুলভ হাবভাব দেখাননি!  গোর্খাল্যান্ড-এর ক্ষেত্রে শুধু লেপচা বা ভুটিয়া বা অন্যান্য জনজাতির প্রশ্ন কেন, অন্যান্য বিভিন্ন গণতান্ত্রিক প্রশ্ন-ও রয়েছে। যেমন চা বাগান, সিঙ্কোনা বাগান-এর শ্রমিকদের মিনিমাম ওয়েজ-এর প্রশ্ন, শিক্ষা ও চিকিৎসা-র পরিকাঠামোর প্রশ্ন, নারীমুক্তি-র প্রশ্ন, অন্যান্য লিঙ্গের মানুষদের অধিকারের প্রশ্ন, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রশ্ন, বর্ণপ্রথার প্রশ্ন, আর্থিক সমানতার প্রশ্ন— যেকোনও সমাজের যা যা প্রশ্ন থাকে, সেখানেও সে সব-ই কমবেশি কোনও না কোনওভাবে আছে এবং থাকারই কথা। কিন্তু সেই সব প্রশ্ন নিয়ে লড়াই-এর দিশা নির্দেশ করার, সেই সব লড়াই-এ নেতৃত্ব দেওয়ার, এবং একটি ‘গণতান্ত্রিক গোর্খাল্যান্ড’ গড়ে তোলার মূল দায়িত্ব সেখানকার বিভিন্ন গণতান্ত্রিক শক্তির। এবং কথা হলো, সে লড়াই ইতিমধ্যেই চলছে। কলকাতার বাঙালি ‘বুদ্ধিজীবী’ সে লড়াই-এর খবর রাখে না, বা রাখতে চায় না। কারণ তাদের কাছে তো তিস্তা-র পাড়ে গণতন্ত্রের লড়াই-এর প্রতীক হচ্ছে সমরেশ মজুমদারের “কালবেলা”-র বাঙালি বিপ্লবী নায়ক অনিমেষ! গোর্খারা, বা ভুটিয়ারা, বা লেপচারা, যে গণতান্ত্রিক লড়াই-এর নেতা-নেত্রী হতে পারেন, এই ধারণাটাই তো তাদের সমরেশ মজুমদার পড়া মন আর ইলিশ মাছ খাওয়া মুখের কাছে নুন-চা বা গুন্দ্রুক-এর ঝোলের মতোই গা ঘিনঘিনে, অবাস্তব, দূরের। গুন্দ্রুক কাকে বলে? স্মার্টফোন আছে তো! দেখে নিন। কারণ কলকাতায় তো ইন্টারনেট চলছে এখনো। এখানে বলে রাখা ভালো যে সমরেশ মজুমদার পড়া বা ইলিশ মাছ খাওয়া নিয়ে সমস্যা নেই, কিন্তু তার ভিত্তিতে অন্যের স্বাদ ঠিক করে দেওয়া সমস্যাজনক। যাই হোক, আমরা জানিই না যে বাংলা-দিল্লী সরকারের বুলেট-এর আওয়াজ ছাপিয়ে পাহাড়ের গায়ে গায়ে, চেল নদীর স্রোতের তালে তালে, তিস্তার পাড়ে পাড়ে ধাক্কা খাচ্ছে পাহাড়ের গণতন্ত্রে বিশ্বাসী কবি-লেখক-সংগীতকারদের কবিতা-গান-নাটকের গর্জন। কলকাতার বাঙালি ‘বামপন্থী’ ভদ্রলোক পড়েননি বা শোনেননি পাহাড়ের মিছিলে প্রদীপ লোহাগুন-এর কবিতার লাইন “ভুখা পেট সংবিধান-এর অক্ষর পড়তে পারে না/ নগ্ন শরীর গণতন্ত্রের ভার বইতে পারে না/ উদ্বাস্তুর খালি পা সংসদ যাত্রা করতে পারে না/ খিদের ধর্ম হলো কেড়ে নিয়ে হলেও পেট ভরানো। খিদের কোনও ধর্মকথা হয় না।” শুধু যে পড়েননি তাই নয়, সে হয়তো অনেকেই পড়েননি। এই লেখক-ও দু-দিন আগে অবধি পড়েনি। কিন্তু সমস্যা হলো, ঐতিহাসিকভাবে, বাঙালি ‘বামপন্থী’, গণতান্ত্রিক বুদ্ধিজীবীরা (দক্ষিণপন্থীদের কথা ছেড়েই দিলাম) প্রদীপ লোহাগুন-দের লেখা পড়ার দরকারও মনে করেননি। ঠিক যেমন তাঁরা শোনেননি ছেওয়াঙ ইয়নজন-এর কবিতার প্রত্যয় ও সাহস— “গলা কেটে দিলে আওয়াজ বন্ধ হওয়ার/ চোখ গেলে দিলে স্বপ্ন মরে যাওয়ার/ আঙুল কেটে দিলে অক্ষরগুলোর বিপ্লব রচনা ছেড়ে দেওয়ার ইতিহাস/ কোথায় আর আছে?” তাঁরা শোনেননি চা-বাগান থেকে উঠে আসা গায়ক প্রসিদ রাই-এর লেখা গান ‘মুক্তমন’-এর বুলেট-এর মতন শব্দ। প্রদীপ, ছেওয়াঙ, প্রসিদরা তো আজ হঠাৎ করে কবিতা-গান সৃষ্টি করছেন না, এঁরা এক দীর্ঘ সাংস্কৃতিক বৈপ্লবিক ইতিহাসের উত্তরসূরি, যে ইতিহাসের কারিগরদের মধ্যে আছেন অগম সিং গিরি, পারিজাত, বা বিকাশ গোতামে-র মতন লেখক-লেখিকারা। প্রসিদ-এর নিজের কথায়, “যত মারবি ততই দেখবি নতুন কেউ জন্মাবে, একজনকে মারলে আরও হাজার জন জন্মাবে, মেরে কী করে খতম করবি বেঁচে থাকার আশা!”। দিল্লী-বোম্বে-আমেরিকার ঔদ্ধত্য নিয়ে রেগে যাওয়া বাঙালি বুদ্ধিজীবীর কাছে সাংস্কৃতিক কর্মী বা রাজনৈতিক গানের দল বা ব্যান্ড মানেই হচ্ছে বব ডিলান, জন লেনন, পীট সিগার, ইন্ডিয়ান ওশান, দিল্লী সালতানাত, বা খুব বেশি হলে কবীর সুমন, বা মৌসুমী ভৌমিক, বা মহীনের ঘোড়াগুলি। ‘সংস্কৃতি’ ও ‘রাজনীতি’-প্রেমী বাঙালির পছন্দের এই ফর্দে নাম নেই পারিজাতদের। কোনওদিন থাকবেও না। অন্ততঃ পাহাড়ের ইতিহাস তো তাই বলছে। প্রেমিকা আবার সহযোদ্ধা হয় নাকি? প্রেমিকার কাজ হলো মিষ্টি করে হাসা, প্রেমিক যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে এলে তার ক্ষতে মলম লাগিয়ে দেওয়া।

সে যাক। মূল বক্তব্য হলো, ইন্টারনেট বন্ধ করে পাহাড়কে বোবা করে দেওয়ার যে পরিকল্পনা ছিল সরকারের, তাকে রঙ্গো পাহাড়ের চূড়া থেকে জলঢাকা নদীতে ছুড়ে ফেলে দিয়ে মানুষের দুঃখ-যন্ত্রণা-প্রেম-লড়াই-এর এইসব সুর ও কথা অট্টহাসি হাসছে কলকাতা-দিল্লীর দিকে তাকিয়ে। এই হাসি দিনের শেষে প্রেমিকার হাসি নয়, এই হাসি প্রেমের ‘মালিক’ হতে চাওয়া পুরুষ কর্তাব্যক্তিটিকে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়ার, তার মালিকানা থেকে মুক্তি পাওয়ার হাসি। এই হাসি আর ‘পাহাড় হাসছে’ নামের হেডলাইন তৈরী করে না খবরের কাগজে। এই হাসিতে পুরুষ মালিকটির গায়ে কাঁটা দেয়, জীবনে প্রথমবার তার ভয় হয়। তার ‘প্রেম’-এর ধারণার অনেকটাই যে একটা কঙ্কাল-এর উপর যত্ন করে পরিয়ে রাখা খোলস, সেই বীভৎস সত্যিটা বেরিয়ে পড়ে। এক্ষেত্রে মধ্যবিত্ত বাঙালির ‘বঙ্গপ্রেম’-এর পাতলা খোলসটা ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলেছে পাহাড়ের অট্টহাসির আঘাত। যে বঙ্গপ্রেম-এর দোহাই দিয়ে বাঙালি মধ্যবিত্ত পাহাড়ে গুলি চালানো সমর্থন করে, বলে ‘বঙ্গভঙ্গ’ হবে না, সেই বঙ্গভঙ্গ হওয়ার পরে যে পূর্ববঙ্গ তৈরী হয়, তার সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির সামাজিক-সাংস্কৃতিক সম্পর্ক কিরকম আমরা সকলে জানি। আজকের বাংলাদেশ-এর কজন লেখক-কবি-গীতিকারদের কথা, নাম, আমাদের মনে পড়ে, যখন আমরা ‘বাংলা সাহিত্যের’ কথা ফলাও করে বলি? দিল্লীর হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে হুঙ্কার দিতে গিয়ে এরাজ্যের যে মুখ্যমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী পাহাড়ে বাংলা চাপাতে চাইলেন, তাঁদের দলে ক’জন আছেন যাঁদের কাছে ঢাকা-চট্টগ্রাম-বরিশাল কাছাকাছি মনে হয়, দিল্লী-বোম্বে-গুড়গাঁও-এর থেকে? বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির এই ‘রক্ষক’দের মধ্যে ক’জন আছেন যাঁরা ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস জানেন? জানলে তাঁরা গোর্খাল্যান্ডকে হয়তো খানিকটা বুঝতে পারতেন। এও বুঝতেন যে শুধু মেট্রো স্টেশনের আজগুবি নাম দিয়ে বা ফেসবুকে জীবনানন্দ-নজরুল ইসলাম-এর জন্মদিনে রজনীগন্ধার ছবি পোস্ট করে বাংলা-কে বাঁচানো বা হিন্দির চোখরাঙানি আটকানো, কোনওটাই করা যায় না। তা না হলে রামকে আটকাতে গিয়ে এঁদের জনগণের পয়সায় হনুমান মন্দির তৈরী করতে হতো না কলকাতা শহরের কোনায় কোনায়। শেষ কবে কলকাতায় মানুষ হনুমান পূজা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল? অবশ্য শুধু শাসক দল কেন, কলকাতার বাঙালি ‘বুদ্ধিজীবী’ ক’জন আছেন যাঁরা তসলিমা নাসরিন ছাড়া আর যেকোনও দু’জন বা তার বেশি বাংলাদেশী লেখকের লেখা পড়েছেন বা তাঁদের নাম শুনেছেন? আর তাছাড়া বিবাহিত স্ত্রীকে সংসারের গণ্ডির মধ্যে ধরে রাখতে গিয়ে সাধারণ মধ্যবিত্ত পুরুষ যেমন ভুলে যান যে বিবাহের আগে মহিলাটির একটি পরিচয়, একটি অন্য জীবন ছিল, অন্য বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে বিভিন্ন সম্পর্ক ছিল, ঠিক সেভাবেই কলকাতার মধ্যবিত্ত বাঙালি মনে করেন যে দার্জিলিং ইতিহাসের জন্মলগ্ন থেকেই ‘বঙ্গের’ অংশ। একটু ইতিহাস ঘাঁটলেই তাঁরা বুঝতে পারবেন যে দার্জিলিং-এর ‘বঙ্গ’ হয়ে ওঠা সেখানকার জনজাতিদের দীর্ঘ ঘটনাবহুল ইতিহাসের তুলনায় অত্যন্ত সাম্প্রতিক একটা ঘটনা। নেপাল, তিব্বত, সিকিম, ভুটানের সঙ্গে ওই অঞ্চলের মানুষের নাড়ীর টান বহুদিনকার, এবং প্রবল। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ এবং বর্ণহিন্দু আধিপত্যের জমিতে লালিত পালিত বাঙালি জাতীয়তাবাদের উগ্র আস্ফালনের মঞ্চ থেকে দাঁড়িয়ে সে নাড়ীর দপদপানি শোনা যায় না, যেমন শোনা যায়না কলকাতার বুকের কোনো সভা-সমিতি-মঞ্চ থেকে প্রসিদদের গান, কবিতা, তা সে সভা যদি দার্জিলিং নিয়েও হয়। “বাটি হাতে কলকাতায় ভিক্ষে করতে আসার” সাদাকালো সিপিয়া ছবিগুলোর পিছনের বঙ্গ-ইতিহাসের সারা শরীরে যে একের পর এক দুর্ভিক্ষের দগদগে লাল সব ক্ষতচিহ্ন, সেই ইতিহাসের শববাহক ভূমিহীন চাষি, বন্ধ জুটমিলের কর্মী বা ওপারবাংলা থেকে উঠে আসা উদ্বাস্তু, ‘অনুপ্রবেশকারী’ পরিবার, যাঁরা আজকের কলকাতায় বাটি হাতে ভিক্ষে করছেন, তাঁদের জীবনের গলিতে গলিতে, তাঁদের পূর্বপুরুষদের পায়ে চলা পথের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে থাকা স্মৃতির ধুলোয় আঁকা হয়ে আছে যে বাঙালি চরিত্র বা বঙ্গসমাজের ইতিহাস – সে সব ক্ষতচিহ্ন, সে সব ইতিহাস, ঘাম, রক্ত, আজকের বাঙালি জাতীয়তাবাদের কাছে দার্জিলিং-এর ইতিহাসের মতোই অস্পৃশ্য, অকথ্য। এই অবস্থায় সুদূর গোর্খাল্যান্ড-এর দাবীর উত্তরে “বঙ্গভঙ্গ হবে না!” শুনলে ভাঙ্গরবাসীর কথা ধার করে বলতে ইচ্ছে করে, “আস্তে ক’ন কত্তা, নইলে ঘোড়ায় হাসব!”। ‘বঙ্গভঙ্গ’ এখনো প্রত্যেকদিন হয়ে চলেছে, এবং তা করছে বাঙালি-ই, ব্রিটিশরাও নয়, দিল্লিও নয়, গোর্খারা তো নয়ই।

দিল্লীর শাসকশ্রেণী ও তার হাতিয়ার রাজভাষা হিন্দির আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো নিশ্চয়ই দরকার, এবং সে দরকার যতটা বাংলার, ততটাই গোর্খাল্যান্ড-এরও। কিন্তু তার নামে যে সন্ত্রাস এবং নির্লজ্জ গা-জোয়ারি বাংলার শাসকশ্রেণী, তার পুলিশ প্রশাসন ও তার বুদ্ধিজীবী মহল পাহাড়ে চালাচ্ছেন, এবং উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদের যে আগুন তারা পাহাড়ের জঙ্গলে জঙ্গলে লাগাচ্ছেন, তাতে আখেরে লাভ হচ্ছে দিল্লীর-ই, এবং বিজেপি-র। ভুলে গেলে চলবে না যে পাহাড়ের নিজস্ব একটি শাসকশ্রেণী আছে, এবং তারা বারবার প্রমাণ করেছে যে তারা সুবিধাবাদী। অর্থের লোভে, বাড়তি হাতখরচার লোভে, তাঁরা বারবার তাঁদের নিজেদের সমাজের আশা আকাঙ্খা-কে বন্ধক রেখেছেন বড়কত্তার কাছে, সে বিজেপি হোক, বা তৃণমূল হোক, বা তার আগে সিপিএম, বা কংগ্রেস। এবং পাহাড়ে পয়সা আছে। পাহাড়ের পাথর, গাছ, নদী, মানুষ, চা-বাগান, সিঙ্কোনা বাগানকে বিক্রি করে দেওয়ার বিরাট প্রকল্পকে ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’র ভিজে অর্থহীন নস্টালজিয়া দিয়ে ঠেকিয়ে রাখা যাবে না। বাঙালির পাহাড়ের প্রতি মেকি প্রেম এমনিতেই নিলাম হওয়ার জন্য বহুদিন ধরে প্রস্তুত। ফলে এরকম চলতে থাকলে পাহাড়ের শাসকশ্রেণীর অন্ততঃ কিছু অংশ এবং দিল্লীর শাসকশ্রেণীর আঁতাত ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না রাজ্য সরকার। ঠিক যেমন করে হনুমান মন্দির তৈরী করে বা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির ছবি ফেসবুকে পোস্ট করে বা পাল্টা দাঙ্গা-র রাজনীতি করে ঠেকানো যাচ্ছেনা বা যাবেনা এরাজ্যে ক্যান্সার-এর মতো বাড়তে থাকা আরএসএস-কে। কিন্তু পাহাড়ের ক্ষেত্রে এর ফলে দিন দিন সবচেয়ে কোনঠাসা হয়ে পড়ছে পাহাড়ের আত্মসম্মানের লড়াইয়ে সামিল বিভিন্ন গণতান্ত্রিক শক্তি, এবং সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ। তাঁদের যে কঠিন দ্বিমুখী লড়াই লড়তে হচ্ছে, ভিতরে এবং বাইরে, এর ফলে দিন দিন সে লড়াই কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে উঠছে।

এক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের প্রত্যেকটি গণতান্ত্রিক মানুষের নৈতিক ও রাজনৈতিক কর্তব্য পাহাড়ের গণতান্ত্রিক ও খেটে খাওয়া মানুষের পাশে দাঁড়ানো, পাহাড়ের সুরে সুর মিলিয়ে গান গাওয়া, পাহাড়কে, তার ভাষাকে, তার হাহাকারকে হয়তো প্রথমবারের জন্য বুঝতে শেখা। এর প্রয়োজন যতটা গোর্খাল্যান্ডের জন্য, ঠিক ততটাই বা হয়তো তার থেকেও বেশি প্রয়োজন বাংলার নিজের জন্য। এই কলকাতার-ই বহু বুদ্ধিজীবীর রাতে ঘুম হয়না প্যালেস্তাইন-এর কথা ভেবে। যখন কাশ্মীর-এর প্রশ্ন আসে তখন তাদের মধ্যে মুষ্টিমেয় কয়েকজন হয়তো পথে নামেন, আর সঠিক কারণেই নামেন, বারবার নামা উচিত। কিন্তু যখন পাহাড়ের প্রশ্ন আসে, গোর্খাল্যান্ড-এর প্রশ্ন আসে, তখন হঠাৎ করে লেনিন-মার্কস-রবীন্দ্রনাথদেরকে বই-এর তাক থেকে নামিয়ে ধুলোটুলো ঝেড়ে বাঙালি বুদ্ধিজীবীরা ফেসবুক-এ লগ-ইন করেন। তারপর পাহাড়ে চলতে থাকা গুলিবৃষ্টির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলতে থাকে অবান্তর সমস্ত তর্কের ও কমেন্টস-এর বৃষ্টি। বাড়তে থাকে ফেসবুক নামক কোম্পানিটির কদর আর ব্যবসা, কমতে থাকে মানুষের জীবন আর সম্মানের দাম, দমবন্ধ হয়ে পুনর্বার মৃত্যুকামনা করতে থাকেন লেনিন, মার্কস, রবীন্দ্রনাথ, আর কে বলতে পারে, সবার অলক্ষ্যে হয়তো হাসতে থাকেন মার্ক জুকারবার্গ! এদিকে দার্জিলিং নামক ‘বিশ্বাসঘাতক প্রেমিকা’র-র উপর বাংলা-দিল্লীর সরকারের সন্ত্রাস চলতে থাকে প্রতিদিন প্রতিমুহূর্ত, মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্ত বাঙালি ও তার ‘বুদ্ধিজীবী’ মহলের সোচ্চার এবং নীরব সমর্থন নিয়ে। বর্ষাকালের পাহাড়ের গর্জন করে নেমে আসা ঝর্ণার রং হয়ে উঠতে থাকে লাল, জায়গায় জায়গায় ধ্বস নামতে থাকে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের আশা-আকাঙ্খার, তাদের স্বপ্নের।

কিন্তু আজকাল সময়, আলো, বাতাস, প্রেম, এইসব খানিকটা উল্টো দিকে বইছে। এখন দার্জিলিং-কালিম্পঙ-এর সময় নেই কাঞ্চনজঙ্ঘার দিকে চেয়ে থাকার। তাদের পথে পথে এখন সাধারণ মানুষের ভীড়, প্রতিদিন একের পর এক হাজার হাজার মানুষের ৱ্যালি চলেছে এঁকেবেঁকে পাহাড়গুলোকে পেঁচিয়ে, তাদের ঘন জঙ্গল-এর আনাচে কানাচে সমস্ত গ্রাম-শহর-বাজারে প্রতিদিন শয়ে শয়ে মানুষ মিটিং করছেন। চা-পাতা তোলা হয়নি বহুদিন, শ্রমিকরা মিনিমাম ওয়েজ-এরও দাবি করছেন গোর্খাল্যান্ড-এর সাথে সাথে। চা-গাছ গুলোর উচ্চতা যেন স্লোগানের ডেসিবেল-এর সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলেছে রোজ। গান-কবিতা-স্ট্রিট থিয়েটার-ব্যান্ড মিউজিক-এ মুখর পাহাড়ের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত। পাহাড়ের ঝর্ণাগুলো, ছোট ছোট পাহাড়ি নদীগুলো যেন তাতে উৎসাহ পেয়ে বাড়তি রোষের সঙ্গে বইছে। বৃষ্টির সঙ্গে তাল মিলিয়ে ঝরছে প্যামফ্লেট-পোস্টার। সই সংগ্রহ চলছে। হাজার হাজার মহিলা প্রতিদিন রাস্তায় মিছিল করছেন গোর্খাল্যান্ড-এর সঙ্গে নারীমুক্তির স্লোগান চেঁচিয়ে।  হাতে হাতে বিলি হচ্ছে ‘লালি গুরাস’-এর মতন ছোট পত্রিকা। অজস্র কবিতা-গান লেখা হচ্ছে, লেখা হচ্ছে পথনাটিকা। লিখছেন সাধারণ মানুষ, তাঁদের রোজকার জীবনের ব্যথা, ভালোবাসা আর রাগ নিংড়ে দিয়ে। সেই নিংড়ানো রং দিয়ে স্লোগান, ছবি আঁকা হচ্ছে দেওয়ালে দেওয়ালে, রাস্তার উপরে। “পহল” নামের সাংস্কৃতিক অভিযান-এর অঙ্গ হিসেবে সাংস্কৃতিক কর্মীরা পদযাত্রা করছেন কয়েকশো মাইল, কালিম্পঙ থেকে দার্জিলিং, তারপর আবার জোড়বাংলো থেকে সুকনা, তারপর কিছুদিন পরে আবার কালিম্পঙ থেকে লাভা হয়ে গরুবাথান। সেখান থেকে রঙ্গো। পরের ধাপে আবার বিজনবাড়ি থেকে সুখিয়াপোখরি হয়ে মিরিক। আধপেটা খাওয়া মানুষজন ঘরে একটু আধটু যা আছে তাই নিয়ে রাস্তায় দঁড়িয়ে থাকছেন মিছিল করে হেঁটে যাওয়া লোকেদের শক্তি জোগানোর জন্য। যার কাছে শুধু জল আছে, সে শুধু জল নিয়েই দাঁড়িয়ে আছে। রাস্তার ধরে সবজি বেচতে বসা জ্যেঠিমা, প্লাস্টিক শিট বিক্রি করে ঘর চালানো দিদিটা বিলিয়ে দিচ্ছেন তাঁদের আয়ের উৎস। যার কাছে তাও নেই, সে শুধু দু’চোখ ভরা স্বপ্ন আর গলায় দেহের সবটুকু শক্তি দিয়ে ঠেলে বেরোনো স্লোগান নিয়েই দাঁড়িয়ে আছে। এই মিছিলগুলোতে কান পাতলে কিন্তু শুধু নেপালি বা হিন্দি বা ইংরেজি গান নয়, বাংলা গানও শোনা যায় কখনো কখনো, শোনা যায় ‘এক ঝাঁক ইচ্ছেডানা’ বা ‘আমরা করবো জয়’। পথচলতি লোক-এর মুখে শুধু যে মমতা ব্যানার্জী বা নরেন্দ্র মোদীর ‘সর্বনাশ হোক’ শোনা যাচ্ছে তাই নয়, তার থেকে বরং বেশিই হয়তো শোনা যাচ্ছে তাঁদের নিজেদের নেতাদের প্রতি অবিশ্বাস, আশঙ্কা— “যদি এবারেও এরা লড়াইয়ের পিঠে ছুরি মারে?”। শোনা যাচ্ছে “এইবার আর ছাড়বো না। ওদেরকেও না, আর আমাদের নেতারা দিল্লী-কলকাতার সঙ্গে আপোষ করলে এদেরকেও না”। এ সবের মাঝেই শোনা যাচ্ছে মাউথ অর্গান-এ বিপ্লবী গানের সুর, শোনা যাচ্ছে মেলোডিকা, গিটার, জেম্বে, ভেসে আসছে “বাটো দেউ, বাটো দেউ, নউলো য়ুগলাই বাটো দেও, সুনউলো য়ুগলাই বাটো দেও, হামি আঁধি কা সন্তান” (রাস্তা দাও, রাস্তা দাও, নতুন দিনকে রাস্তা দাও, সোনালি দিনকে রাস্তা দাও, আমরা ঝড়ের সন্তান”)। পুলিশ-এর গুলি চলার পরে প্রতিবাদ জানাতে হাজার হাজার তরুণ-তরুণী এবং স্কুল-এর বাচ্চারা যখন পথে নামছে স্লোগান কাঁধে করে, আর রুটি-সবজি টিফিন বাটিতে করে, তাদের মা-বাবার চোখে পরিষ্কার সম্মতি, ও আশংকা-চিন্তা মিশ্রিত এক কঠিন গর্ববোধ। ভিন্ন ভিন্ন ৱ্যালি-র পাহাড়ের রাস্তা বেয়ে চলতে চলতে মুখোমুখি দেখা হয়ে যাচ্ছে, মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে গান আর স্লোগান। হাজার হাজার মুঠো করা হাত উপরের দিকে উঠছে, যেন তারাদের পেড়ে ফেলতে চায় আকাশ থেকে। বিভিন্ন কমিউনিটি হল-এ ডাল-ভাত রান্না হচ্ছে শ’য়ে শ’য়ে মানুষের, মিটিং শেষ হলে খাবেন বলে। মাঝে রাতের কয়েকটা ঘন্টা সব চুপ। পাহাড় তখন শান্ত চুপচাপ, পাহাড় তখন তার ক্লান্ত উত্তাল ঘুমন্ত সন্তানদের সজাগ প্রহরী। পরের দিন সকাল হতেই আবার মিছিল, আবার গান, আবার গিটার আর স্লোগান, বা হয়তো আবার গুলি, আবার আগুন, আবার মৃত্যু, আবার রক্ত, আরও একজন শহীদ। এবারের আন্দোলনে এখনো অবধি পাহাড়ে ৯ জন মানুষ পুলিশ-এর গুলিতে শহীদ হয়েছেন। এর আগে ২০০৭ থেকে শুরু করে বিগত পর্বে আরো তিনজন-এর মৃত্যু হয়েছিল। তারও আগে ‘৮৬-র আন্দোলন-এ মারা গিয়েছিলেন প্রায় ১২০০ মানুষ।

গোর্খাল্যান্ড হোক বা না হোক, পাহাড় কিন্তু জিতে গেছে। তার প্রেম-কে সে তার বাঙালি প্রভুর খাঁচা থেকে, তার বেডরুম থেকে, ছিনিয়ে নিয়ে খোলা আকাশে উড়িয়ে দিয়েছে। তার নিজের প্রেম-এর কবিতা, প্রেম-এর গান, সে এখন নিজেই নিজের রক্ত দিয়ে লিখছে। তার আর সত্যজিতের ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’র দরকার নেই। বরং আজকাল কাঞ্চনজঙ্ঘা প্রাণপণ চেষ্টা করে মেঘ-কুয়াশার পর্দা সরিয়ে দার্জিলিং-খরসাং-কালেবুং কে উঁকি মেরে দেখার, এবং মাঝে মধ্যে তাদের দেখতে পেলে বলে, “সাবাস কমরেড!”

2 thoughts on “পাহাড়ে আন্দোলন

  1. Pingback: Content & Contributors – September 2017 | aainanagar

  2. Pingback: Editorial & Content : September 2017 | aainanagar

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s