অর্থনৈতিক উন্নয়নের ফাঁদ

শিরীষা নাইডু (অ্যাসোসিয়েট প্রোফেসর, অর্থনীতি বিভাগ, রাইট স্টেট ইউনিভার্সিটি)

সঙ্গের কার্টুন – রেবেল পলিটিক (https://rebelpolitikblog.com/)

To read this article in English, click here.

এই লেখাটি, অর্থনীতির উপর আমরা যে একটি লেখার সিরিজ প্রকাশ করতে চলেছি, তার মধ্যে প্রথম। আপাতত আমাদের উদ্দেশ্য হল অর্থনীতির কিছু খুব সাধারণ ধারণা ও সংজ্ঞা, যা আমরা সর্বদাই খবরের কাগজে পড়ি, নিউজ চ্যানেলে – এমনকি রোজকার কথাবার্তাতেও শুনি, তাদের সহজ ভাবে বোঝানো। এই সাধারণ ধারণাগুলি যত কম মানুষ পরিষ্কার ভাবে জানেন, বা বুঝতে পারেন, যেকোনো সরকারি স্তরে বা কর্পোরেট সেক্টরগুলির পক্ষে তাঁদের বোকা বানানো ততই সহজ হয়ে ওঠে। সহজ হয়ে ওঠে উন্নয়ন সম্পর্কে ভুল তথ্য দিয়ে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার মিথ্যা কাহিনী নির্মাণ, আমাদের কিসে ভালো হবে, হচ্ছে, তাই নিয়ে যথেচ্ছ মিথ্যাচার। প্রিয় পাঠক, এই সিরিজটি বিষয়ে আপনি নির্দ্বিধায় আপনার মতামত জানান। তাতে বিষয় নির্বাচন এবং লেখার ভঙ্গি বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে আমাদের সুবিধা হবে।

মোদী সরকার অর্থনৈতিক উন্নয়নের আশা দেখিয়ে বাহ্যত দেশের একটা বড় অংশের জনতার সমর্থন পাচ্ছে। এই আশা অবশ্য এই সরকারই প্রথম দেখিয়েছে এমন নয়। ১৯৯০ থেকে যে সরকারই আসুক না কেন, তার প্রতিনিধিরা এই বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেবার কথা সর্বদাই বলে এসেছেন। কিন্তু অর্থনৈতিক উন্নয়ন বলতে আমরা সত্যি কি বুঝি?

অর্থনৈতিক উন্নয়ন কাকে বলে? কীভাবে তাকে মাপা যায়?

অর্থনৈতিক উন্নয়নকে বুঝতে গেলে প্রথমেই ‘জিডিপি’ (গ্রস ন্যাশনাল প্রোডাক্ট) কি তা বুঝতে হবে। জিডিপি যেকোনো দেশের অর্থনৈতিক কার্য‌কলাপের মানদণ্ড হিসেবে কাজ করে। ভারতে সেন্ট্রাল স্ট্যাটিস্টিক্যাল অরগ্যানাইজেশন (সিএসও) এই জিডিপি মাপার কাজ করে। এক কথায় বলতে গেলে, এ হল প্রতি বছর কেনাবেচার ‘চেইন’-এ যে অন্তিম ক্রেতা, তার জন্য যে ‘গুডস অ্যান্ড সার্ভিসেস’ (পণ্য ও সেবা) উৎপন্ন হয়, তারই নিরিখে মোট অর্থনৈতিক কার্যকলাপের (টাকায়) মূল্য। আরেকটু সরল করে অঙ্কের ভাষায় বললে, একটি বিশেষ বছরে প্রতিটি অন্তিম গুড অ্যান্ড সার্ভিস-এর দামকে ঐ বছরে তার সংখ্যা দিয়ে গুণ করে, শেষে তাদের যোগ করলে যা পাই, তাকে আমরা বলি ‘নমিনাল জিডিপি’। শুধুমাত্র ‘অন্তিম ক্রেতা’র জন্য হিসেবটি করা হয়, অতএব একই দাম দুবার করে হিসেব করা হবে, তার ভয় থাকে না।

এই দুবার করে যোগ হয়ে যাওয়া এবং অন্তিম ক্রেতা – এই বিষয়দুটিকে উদাহরণ দিয়ে বোঝা যাক। ধরি, স্টিল অথরিটি অফ ইন্ডিয়া (এসএআইএল বা ‘সেইল’) ২০১৬ সালে এক বিশেষ পরিমাণ স্টিল তৈরি করল এবং হিরো হোন্ডাকে বেচে দিল, যারা আবার ঐ বছরেই তার থেকে এক বিশেষ সংখ্যক মোটর সাইকেল তৈরি করল। এখন আমরা যদি  ২০১৬-র সমস্ত বিক্রয়মূল্য (টাকায়) যোগ করতে যাই, তাহলে এই স্টিলের বিক্রয়মূল্য দুবার যোগ হবে (একবার সেইল-এর তৈরি স্টিল-এর বিক্রয়মূল্য হিসেবে এবং আরেকবার হিরো হোন্ডার তৈরি মোটর সাইকেল-এর বাজার দামের মধ্যে স্টিলের যে মূল্য যোগ আছে, তার হিসেবে)। এই  দুবার করে গণনা আটকাতে জিডিপি মাপার সময় স্টিলের দাম হিসেব করা হয় শুধুমাত্র ঐ মোটর সাইকেল বিক্রির ক্ষেত্রে, অর্থাৎ অন্তিম গুড অ্যান্ড সার্ভিস হিসেবে একদম শেষবার বিক্রয়ের ক্ষেত্রে। অন্তিম বিক্রয় হিসেবে গণ্য হতে গেলে সেই ক্রেতাকে হতে হবে আপনার-আমার মতো কাউকে। কোনো রেস্টুরেন্ট যদি এই মোটর সাইকেল কেনে তাদের হোম-ডেলিভারির কাজে লাগানোর জন্য, তাহলে সেই রেস্টুরেন্ট অন্তিম ক্রেতা হিসেবে গণ্য হবে না (কারণ তার খাবারের দাম নির্ধারণের মধ্যে ঐ মোটর সাইকেলের, অতএব ঐ স্টিলের মূল্য যোগ করা আছে)। অর্থাৎ, জিডিপি গণনা করা হয় ‘ভ্যালু অ্যাডেড’ বা ‘মূল্য যোগ’-এর নিরিখে।

জিডিপি, বা অর্থনীতিবিদরা যাকে নমিনাল জিডিপি বলেন, তা কিন্তু খানিকটা বেশি সময় ধরে হিসেব করলে তখন আর যথেষ্ট সঠিক অর্থনৈতিক তথ্য দিতে পারে না। নিশ্চয় মনে আছে, যে নমিনাল জিডিপি একটি বিশেষ বছরে প্রতিটি অন্তিম গুড অ্যান্ড সার্ভিস-এর দামকে ঐ বছরে তার সংখ্যা দিয়ে গুণ করে, শেষে তাদের যোগ দিয়ে হিসেব করা হয়। অতএব গুডস অ্যান্ড সার্ভিসেস-এর পরিমাণ না বদলালেও দাম বাড়লে নমিনাল জিডিপি বাড়বে। এই ক্ষেত্রে নমিনাল জিডিপি দেশের অর্থনীতি সম্পর্কে একটি ভুল ছবি দেয়, যেন অর্থনীতির অবস্থা আসলে উন্নতির দিকে। অথচ কয়েক বছরের নমিনাল জিডিপি তুলনা করার সময় এটা বলা সম্ভবই নয়, যে তাদের তফাৎ দাম বাড়ার কারণে ঘটেছে নাকি পরিমাণগত কারণে। অন্যদিকে কিন্তু ‘রিয়েল’ বা প্রকৃত জিডিপি (বা ‘জিডিপি অ্যাট কন্সট্যান্ট প্রাইসেস’) সময়ের সাথে জিনিসপত্রের মোট দাম বৃদ্ধি বা হ্রাস, অর্থাৎ যথাক্রমে ‘ইনফ্লেশন’ (মুদ্রাস্ফীতি ) ও  ‘ডিফ্লেশন’ (স্ফীতিহ্রাস)-কে  সূচিত করে।

রিয়েল জিডিপি মাপতে গেলে, আমাদের একটি ‘বেস ইয়ার’ বা বাৎসরিক ভিত্তি ঠিক করতে হবে, অর্থাৎ কোন বছরের ভিত্তিতে আমরা গণনা করব, তা ঠিক করে নিতে হবে। ধরা যাক ২০০৯-১০-কে আমরা বেস ইয়ার ধরলাম। ২০১০-১১-র রিয়েল জিডিপি মাপতে গেলে প্রথমে আমাদের বেস ইয়ারের একটি নির্ধারিত ‘প্রাইস ইনডেক্স’-এর নিরিখে প্রতিটি বছরের জন্য নমিনাল জিডিপিকে নতুন ভাবে ভাবে হিসেব করতে হবে। এক্ষেত্রে প্রাইস ইনডেক্স হল ঐ বেস ইয়ার-এ বিশেষ ভাবে বেছে নেওয়া কিছু গুডস অ্যান্ড সার্ভিসেস-এর মোট দামের পরিমাপ। এই নতুন হিসেবটি দামকে স্থায়ী রেখে উৎপাদনের পরিমাণের পরিবর্তনকে সূচিত করতে সাহায্য করবে। ২০১০-১১-এ রিয়েল জিডিপি যদি ২০০৯-১০-এর রিয়েল জিডিপি-র চাইতে বেশি হয়, আমরা বলতে পারবো, যে ২০১০-১১-য় আসলে ২০০৯-১০-এর চাইতে মূল্য বৃদ্ধি ঘটেনি, বরং বেশি পরিমাণ অন্তিম পণ্য ও সেবা উৎপাদিত হয়েছে। যদি তা ২০০৯-১০-র চাইতে কমে যায়, তার কারণ হবে অর্থনৈতিক আদান-প্রদানের হ্রাস, দামের স্তরের পরিবর্তন নয়। একই বেস ইয়ার বা বাৎসরিক ভিত্তি ধরে নিলে তবেই তার উপর বিভিন্ন বছরের রিয়েল জিডিপি গণনা করার মানে দাঁড়ায়।

খুব সহজ করে বলতে গেলে অর্থনৈতিক উন্নয়নের হার হল রিয়েল জিডিপি-এর শতাংশ পরিবর্তন। অর্থনীতির স্বাস্থ্যের হালহকিকত বুঝতে হলে এটাকেই মূল সূচক হিসেবে দেখা হয়, এবং দেশের ও দেশের জনগণের কল্যাণ এর দ্বারাই প্রতিফলিত হয় বলে ধরে নেওয়া হয়। অর্থনৈতিক হিসাবপত্র, তত্ত্ব, রিপোর্ট এবং বিতর্ক একেই ঘিরে হয়ে থাকে। কিন্তু বহু দাবি সত্ত্বেও এর গণনার বিষয়টি জনসমক্ষে পরিষ্কার ভাবে নিয়ে আসা হয় না, ফলে এর গণনার সময় সরকারের তরফে নানা কারসাজি করে অর্থনৈতিক বাস্তবকে রঙচঙে করে দেখাবার সুযোগও থেকে যায়। এর একটি উদাহরণ হল – অনেকে বিশ্বাস করেন, চাকরির সংখ্যা বৃদ্ধি এবং জীবনযাপনের মানের উন্নতি অর্থনৈতিক উন্নয়নের সূচক। আমরা এর পরের অংশে এই ধারণাটিকে খতিয়ে দেখব। তার আগে জিডিপি মাপার বিষয়টি নিয়ে আরেকটু গভীরে আলোচনা করে নেওয়া যাক।

জিডিপি পরিমাপের সমস্যা

প্রথমত রিয়েল জিডিপি, ফলত জিডিপি বৃদ্ধির হার বেস ইয়ার-এর উপর নির্ভরশীল এবং এই বেস ইয়ার বেছে নেবার পদ্ধতিটি বেশ নড়বড়ে। এর সাথে বেস ইয়ার-এর প্রাইস লেভেল পরিমাপের পদ্ধতিটিও গুরুত্বপূর্ণ। বেশি জটিলতায় না গিয়ে আপাতত এইটুকু বলছি, যে কোনো কোনো প্রাইস ইনডেক্স (প্রাইস লেভেলের মোট মাপ) অন্যান্য প্রাইস ইনডেক্স-এর চাইতে রিয়েল জিডিপি-কে বেশি করে দেখায়। প্রতিটি সরকারই তাদের সুবিধা ও অ্যাজেন্ডা-মতো বেস ইয়ার বেছে নিয়ে রিয়েল জিডিপি ও উন্নয়নের হার বেশি-বেশি করে দেখাবার চেষ্টা করেছে। সাধারণত এইসব কারসাজি জিডিপি-র সূক্ষ্ম বিষয়ীগত (সাবজেক্টিভ) এবং পরিবর্তনশীল বৈশিষ্ট্য অগ্রাহ্য করে করা হয়, যেমন ভারত সরকার ২০১৩-১৪-র উন্নয়নের মান নির্ধারণ করার নামে ২০১৫-র জানুয়ারিতে করেছিল। ২০০৪-০৫-কে বেস ইয়ার ধরে যে বৃদ্ধি হবার কথা ৪.৭%, ২০১১-১২-কে বেস ইয়ার ধরে নিয়ে সেই বৃদ্ধির হারকে ৬.৯% বলে দাবি করা হয়। অর্থাৎ সত্যি-সত্যি বৃদ্ধির হারটিকে সূচিত না করে পরিমাপের পদ্ধতিটিকেই বদলে দেওয়া হল!

দ্বিতীয়ত, জিডিপি গণনার ক্ষেত্রে দামের ও বাজারের প্রভাব ব্যাপক। ধরুন মালতী দুই বাচ্চার মা। তিনি যদি তাঁর বন্ধু অজয়কে অনুরোধ করেন, বিনা পয়সায় দিনে কয়েক ঘণ্টার জন্য তাদের দেখাশুনো করতে, তাতে জিডিপি-র কোনো তরিতফাৎ ঘটে না। কিন্তু মালতী যদি অজয়কে এই কাজের জন্য কিছু টাকা দিতে চান, এবং অজয় সেই উপার্জন তাঁর ট্যাক্স-এর হিসেবে দেখান, তাহলে জিডিপি বেড়ে যায়। লক্ষ্য করুন, মালতী ও তাঁর পরিবারের প্রতি অজয়ের শ্রম-এর মূল্য ঠিক এই গণনায় স্থান পেল না। যা স্থান পেল, তা হল এই বিশেষ অর্থনৈতিক কার্যকলাপটির পণ্যায়িত (‘কমোডিফায়েড’) এবং মুদ্রায়িত (‘মনিটাইজড’) একটি রূপ। এদিকে জিডিপি বেড়ে গেল, যদিও দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বা উৎপাদিত গুডস অ্যান্ড সার্ভিসেস-এর মূল্যে কোনো প্রকৃত পরিবর্তন ঘটল না। এই একই ঘটনা ঘটে থাকে বহু ভারতীয় পরিবারে গৃহশ্রমের ক্ষেত্রে, এমনকি ডে কেয়ার সেন্টার-এ বা রেস্টুরেন্ট-এ বা ক্লিনিং সার্ভিসেস জাতীয় ক্ষেত্রে।

অতএব, এ দেশের জিডিপি গণনার পদ্ধতি নানা কারণেই সন্দেহজনক হয়ে থেকে গেছে। উত্তর অ্যামেরিকা ও ইউরোপ-এর ক্ষেত্রেও এটা সত্যি। একটি গণনা অনুযায়ী, ২০১০ সালে অ্যামেরিকায় বিনা মজুরির গৃহশ্রমের মূল্য তার জিডিপি-তে ২৬% স্থান নিতে পারত। তবে অ্যামেরিকায় সরকারি ভাবে এই জাতীয় কাজের মূল্য না দেওয়া হলেও অন্য নানা দেশে জিডিপি-র পরিবর্তে অন্যান্য পদ্ধতিতে অবৈতনিক গৃহশ্রম ও নানান শ্রম যা জিডিপি গণনায় স্থান পায় না, তাদের সূচিত করা হয়।

আরেক ভাবে বললে, জিডিপি অর্থনীতির সেই অংশটিকেই তুলে ধরে, যা জাতীয় কল্যাণের সূচক। যা মুদ্রায়িত নয়, তার জিডিপি-র কাছে কোনো মূল্য নেই। জিডিপি-র আওতা থেকে বাদ পড়ে যায় পরিবার, গোষ্ঠী, পরিবেশের নানা ক্ষেত্র, যাদের পণ্যায়িত করা যায় না, অথচ যার প্রতিটিরই উন্নয়ন অর্থনৈতিক মঙ্গলের জন্য অবশ্যপ্রয়োজনীয়। এর ফলে নিয়মিত জমি ও প্রকৃতির নানা উপাদানকে জোর করে হাতিয়ে নিয়ে ইন্ডাস্ট্রি বানিয়ে তার অপব্যবহার করা সহজেই আমাদের অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য হয়ে উঠতে থাকে।মানুষ ও অন্যান্য জীবের প্রাণ, জীবনযাপন হয়ে ওঠে অপ্রয়োজনীয়, বিশেষত যে মানুষেরা সমাজে প্রত্যন্ত, মূলস্রোতে যাঁদের মূল্যহীন বলে মনে করা হয়। এইসব নিয়ে আমরা পরের প্রবন্ধে আলোচনা করব।

2 thoughts on “অর্থনৈতিক উন্নয়নের ফাঁদ

  1. Pingback: The Travails Of Economic Growth | aainanagar

  2. Pingback: পকোড়া বিক্রি নয় কেন? (প্রথম কিস্তি – জিডিপি ও চাকরি) | aainanagar

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

w

Connecting to %s