ফ্রন্টিয়ার-এর সম্পাদক তিমির বসুর সাথে কথোপকথন

ফ্রন্টিয়ারের পথ চলা শুরু হয়েছিল ১৯৬৮ সালের এপ্রিল মাসে। অর্থাৎ, ২০১৮ সাল হলো ফ্রন্টিয়ারের পঞ্চাশ বর্ষপূর্তির সময়। পত্রিকাটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন সমর সেন, ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত নিজেই ছিলেন সম্পাদনার দায়িত্বেও। বলা বাহুল্য, সেসময়ে পৃথিবী উত্তাল হয়ে আছে। ঘরের পাশেই নকশালবাড়ি, ভারতবর্ষের অন্যত্র শ্রীকাকুলাম ইত্যাদি, আমেরিকায় বর্ণবিরোধী, যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন। ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক, মধ্যবিত্ত পরিবর্তন চাইছে, পথ খুঁজছে নিজেদের মত করে। সময়ের দাবি রেখে, অনেকাংশেই, ফ্রন্টিয়ার হয়ে উঠেছিল এই পরিবর্তনের মুখপত্র। এই আমাদের শহর কলকাতায় বসে, ফ্রন্টিয়ার শপথ নিল, যে খোলা চোখে দেখবে, পর্যালোচনা করবে নিজেদের সময়টাকে ধরে। সেই তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণী শক্তির বহু নমুনা ছড়িয়ে আছে ফ্রন্টিয়ারের পাতায় পাতায়।

সমর সেনের পর পত্রিকাটির দায়িত্ব নিলেন তিমির বসু। ৬১, মট লেন, কলকাতা ১৩-র ভাঙাচোরা বাড়িতে অফিস। সেখান থেকেই বেরোয় বছরে বাহান্নটি সংখ্যা। বহু প্রতিকূলতার মধ্যে। কোনো স্পন্সর বা বড় ফান্ডিং-এর গল্প নেই। অর্থনৈতিকভাবে টেনেটুনে কাজ চলে। মূলত, গ্রাহক, আজীবন সদস্য ও গুণগ্রাহীদের টাকায়। ইদানীং কোনো বিজ্ঞাপনও আর পাওয়া যায় না।

তিমির বসুর বয়স বাহাত্তর পেরিয়েছে এই জানুয়ারিতে। কিন্তু যেকোনো যোদ্ধার মতোই তিনি হাল ছাড়তে নারাজ। মূলস্রোতের বাইরে দীর্ঘদিন কাজ চালিয়ে যাওয়ার কঠিন লড়াই, বাজারের কাছে মাথা নত না করার স্পর্ধা — এসবেরই প্রতীক ফ্রন্টিয়ার। খুঁড়িয়ে চললেও বন্ধ হয়নি তার কাজ।

বর্তমানে তিমির বসু অসুস্থ ও শয্যাশায়ী। আর কীভাবেই বা শুভকামনা ও শ্রদ্ধাঞ্জলি জানাতে পারি আমরা, এ প্রজন্মের পাঠকদের কাছে, ফ্রন্টিয়ারের নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামের কাহিনী তুলে ধরা ছাড়া?

এই সাক্ষাৎকারটির প্রথম প্রকাশ আমাদের বইমেলা ২০১৯ সংখ্যায়। ছবির সূত্র – বিভিন্ন অনলাইন ও মুদ্রিত পত্রপত্রিকা।

 

তিমির বসু

আয়নানগর : ফ্রন্টিয়ার ১৯৬৮তে শুরু। গত এপ্রিল মাসে পঞ্চাশ বছর হয়ে গেল। পঞ্চাশ বছর ধরে চলছে একটা পত্রিকা, উইকলি বেরোচ্ছে — তার চরিত্র রাজনৈতিক এবং আর্থ-সামাজিক, দুইই। এই পঞ্চাশ বছরটাকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

তিমির বসু : এটা তো আমাদের পরিচিত যাঁরাই আছেন দেশেবিদেশে, সবাই মোটামুটি একটা গ্রেট অ্যাচিভমেন্ট হিসেবেই দেখছেন। ফিফটি ইয়ার্স। উইদাউট এনি ফেইল, উইদাউট এনি ব্রেক। এভরি উইক। বছরে বাহান্নটা সপ্তাহে বাহান্নটা ইশ্যুই বেরোয়। এছাড়া চারটে উইক নিয়ে স্পেশাল একটা কম্বাইনড ইশ্যু। পঞ্চাশ বছরে কখনও বন্ধ হয়নি। এমনকি এমার্জেন্সির সময়েও না। সেসময় প্রথমদিকে সমরবাবু কিছু মেটিরিয়াল সেন্সরের জন্য পাঠাতেন রাইটার্স বিল্ডিং-এ। তারপর আর পাঠাতেন না, এমনিই ছেপে দিতেন। সেই হিসেবে লাস্ট ফিফটি ইয়ার্স ফ্রন্টিয়ার কন্টিন্যুয়াস চলেছে। এর পিছনে তো কেউ একা না, বিভিন্নজন বিভিন্নভাবে সাহায্য করেছেন — দেশে, বিদেশে। নয়তো এটা চলত না। ফ্রন্টিয়ার-এ আমরা বিজ্ঞাপন পাই না — এটা একটা বড় সমস্যা। তবু তার মধ্যেও কিন্তু, এমনকি বুর্জোয়া লিবারালদের মধ্যেও, এমন-এমন লোক আছেন, যাঁরা বিজ্ঞাপন দিয়ে গেছেন। যেহেতু সমর সেনের কাগজ, বা আমাদের কাগজ — আমি যখন পার্সোনালি অ্যাপ্রোচ করেছি, তখন তাঁরা বিজ্ঞাপন দিয়েছেন। যেমন এম জে আকবর, যাকে নিয়ে এখন এত কাণ্ড। আকবর ফ্রন্টিয়ারকে যেভাবে বিজ্ঞাপন দিয়ে হেল্প করেছে, কেউ করেনি। কোনো বিপ্লবী সোর্স এটা করেনি। ও তখন টেলিগ্রাফ-এ ছিল। ক্যাপিটাল বলে একটা কাগজ বেরোত। ওখান থেকেও ও কিছু বিজ্ঞাপন যোগাড় করে দেয়। আকবরের সাথে এপিজে গ্রুপের বেশ ভালো সম্পর্ক ছিল। ওদের মালিক ছিল সুরেন্দ্র পাল ইত্যাদি। পরে সুরেন্দ্রকে আলফারা আসামে খুন করে। যতদিন বেঁচে ছিল, আকবর রেগুলার ওদের থেকে একটা-দুটো করে বিজ্ঞাপন দিয়ে গেছে। আরও বিভিন্ন ভাবে হেল্প করেছে। এই জায়গাটা আজ আর নেই। বুর্জোয়া লিবারলরা তো বটেই, এমনকী প্রতিষ্ঠিত বাম লিবারালরাও ‘ফ্রন্টিয়ার’ বিপদে পড়েছে জেনেও এগিয়ে আসেন না।

বিজ্ঞাপন আমরা পাই না। অনেকে লাইফ মেম্বারশিপের জন্য চেষ্টা করেছে, যে কীভাবে আরও লাইফ মেম্বারশিপ করানো যায়। বিদেশেও। বিদেশীদের মধ্যে জন [Jan Myrdal] এখনও বেঁচে আছে। প্রায়ই আমাকে মেইল করে। গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক এখনও আছেন। আমি গায়ত্রীদিকে দিয়ে অনেক লিখিয়েছি। উনি কিন্তু যেখানেই যান, ফ্রন্টিয়ার-এর কথা বলেন। সবসময় হেল্প করার চেষ্টা করেন। তা এরকম লোকজন তো আছেন, যাঁরা মনে করেন, যে ফ্রন্টিয়ার চলুক শত অসুবিধা সত্ত্বেও। কিন্তু মাঝে মাঝে এতই প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে পড়তে হয়… এই তো দেখুন বাড়ি ভেঙ্গে পড়ছে। দুর্বারের অফিসের ওখানে একটা ছোট ঘরে আমরা শিফ্ট করছি।

তারপরেও যেটা হচ্ছে, আমার পার্সোনালি যেটা মনে হচ্ছে, যে সাহসী ছেলেরও অভাব আছে। সমরবাবু যখন আমায় ফ্রন্টিয়ার দিয়ে যান, তখন কিন্তু তার সাথে একটা কানাকড়িও ছিল না। উল্টে আমি এসে দেখলাম ওভারড্রাফ্টে চলছে। কেলেঙ্কারি অবস্থা। ১৯৬৮-তে ফ্রন্টিয়ার চালু হয়েছে তো? তার আগে থেকেই প্রসেসটা চলছে। সমরবাবুর কাজিন ছিলেন ইউবিআই-এর প্রাইভেট ওনারদের মধ্যে একজন। তাই কাজটা ওইভাবে হয়ে গেছিল। ম্যানেজার এসে সমরবাবুকে দিয়ে সই করিয়ে নিয়ে গিয়ে অ্যাকাউন্ট খুলে দিয়েছিল আর একটা ওভারড্রাফ্ট ফেসিলিটিও চালু করে দিয়েছিল। এসব ব্যাঙ্ক ন্যাশনালাইজেশন-এর আগের কথা। বহু কষ্টে সেই ওভারড্রাফ্টটা কাটিয়েছি।

আয়নানগর : আচ্ছা, পঞ্চাশ বছর আগে সমরবাবু ফ্রন্টিয়ার শুরু করলেন। তাঁর তো একটা রাজনৈতিক-সামাজিক অবজেক্টিভ ছিল। পঞ্চাশ বছর বাদে এসে আপনি সেই রেস্পেক্টে ফ্রন্টিয়ার-কে কীভাবে দেখছেন?

তিমির বসু : হ্যাঁ অবজেক্টিভ ছিল। ফ্রন্টিয়ার কোনো কমিটেড জার্নাল বা পলিটিকাল পার্টির মুখপত্র নয়। পার্টিজান নয়। সমরবাবু একটাই যেটা করেছিলেন, যে পুলিশের রিপ্রেশন হচ্ছে নকশাল ছেলেদের উপর। তারা একটা বিদ্রোহ করেছে। উনি বিদ্রোহীদের সেই সাপোর্ট করেছিলেন। তার মানে এই নয়, যে তিনি তাদের সমস্ত কাজকর্মকে সাপোর্ট করতেন। সমালোচনা করার জন্য তাঁকে অন্যরকম অনেক বিরূপ সমালোচনা ফেস করতে হয়েছিল। ধরো অসীমরা যখন গোপীবল্লভপুরে খতম লাইন শুরু করল, সমরবাবু তাদের ‘হেড হান্টার্স অফ মিদনাপোর’ বলে চিহ্নিত করলেন। সরোজ দত্ত তো বেজায় খাপ্পা। বলল, সাম্রাজ্যবাদীদের তিন ফ্রন্ট — ইউনাইটেড ফ্রন্ট গভর্নমেন্ট, ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার রাইফেলস আর ফ্রন্টিয়ার উইকলি। শুধু তাই না, সমস্ত ক্যাডারকে বলে দেওয়া হল, কেউ যেন ফ্রন্টিয়ার না পড়ে। আমি অনেকবার অনেক জায়গায় বলেছি, সরোজ দত্ত ফ্রন্টিয়ার-এর যা ক্ষতি করেছে, কোনো রিঅ্যাকশনারি তত ক্ষতি করতে পারেনি। এসব সত্ত্বেও অনেকে ছিল, যারা এমএল পার্টির সক্রিয় কর্মী — তারা কিন্তু লুকিয়ে ফ্রন্টিয়ার পড়েছে এবং তাতে লিখেছে। এদেরই একজন অনির্বাণ বিশ্বাস, যে এখন ফ্রন্টিয়ারের সহ-সম্পাদক।

আয়নানগর : আপনি কি তখন ফ্রন্টিয়ার-এ চলে এসেছেন?

তিমির বসু: হ্যাঁ, আমি তখন আসছি। রেগুলার যোগ দিয়েছি ১৯৭৯ থেকে। যদিও আমার প্রথম লেখা বেরোয় ১৯৭৫ সালে। আমি তখন ট্রেড ইউনিয়ন করতাম। আসলে তার আগে থেকেই রাজনীতিতে আমি মোটামুটি হোল-টাইমার বলতে পারো। এমএসসি বালিগঞ্জ সায়েন্স কলেজে, তার আগে বিএসসি প্রেসিডেন্সিতে। এমএসসি করার পর থেকে আমি রাজনীতিই করছি পুরোদমে। ওখানে যে ছাত্র-ইউনিয়নটা ছিল, তার নাম ছিল পিজিএসএফ। এর ব্রেক হয় এসএফআই থেকে, সিপিএম-এর সময়। পিজিএসএফ-টা ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসেই ছিল। অসীম চ্যাটার্জি, সঞ্জয় ক্ষেত্রী, দীপাঞ্জন রায়চৌধুরী — এরা সবাই ওতে ছিল। পরে এটা তিন টুকরো হয়ে যায়। মানে তিনটে বেস হয়ে যায়। দ্বারভাঙ্গা বিল্ডিং-এ একটা বেস হয়। আপার সার্কুলার রোড অর্থাৎ রাজাবাজার সায়েন্স কলেজেও একটা বেস হয়। কিন্তু ওখানে ওরা খুব একটা কিছু করে উঠতে পারেনি। বালিগঞ্জ সায়েন্স কলেজে আমরা এক্সক্লুসিভলি পিজিএসএফ-এর প্রভাব বজায় রাখতে পেরেছিলাম। এসএফআই বা ছাত্র পরিষদের নাম-নিশানাও ছিল না। ছাত্রাবস্থা থেকে বেরোবার পর আমি ঐ পিজিএসএফ-এর সঙ্গে সমন্বয় রেখে ট্রেড ইউনিয়নের সাথে কাজ শুরু করলাম। হোস্টেলেই থাকতাম। হোস্টেলের ৩৬ নম্বর ঘরটা আমাদের হেড কোয়ার্টারস ছিল। ওখানে একজনের মিল তিনজনে ভাগ করে খেতাম। তখন ফ্রন্টিয়ার করতাম না। ইন ফ্যাক্ট আমার লিখবার বা জার্নালিস্ট হবার কোনো বাসনাই ছিল না। যখন ট্রেড ইউনিয়ন করতাম, সিইএসসি-র কনট্র্যাক্ট লেবারদের নিয়ে কাজ করতাম। ওটা এখন গোয়েঙ্কাদের কোম্পানি। তখন একটা রিপাবলিক মতো ছিল। তার পরিচালন ব্যবস্থায় বঙ্গসন্তানদের বেশ ভালো মতো একটা প্রতিপত্তি ছিল। পরে জ্যোতি বোস ওটা গোয়েঙ্কাদের দিয়ে দেয়। আমরা কনট্র্যাক্ট লেবারদের পার্মানেন্ট করাতে চেষ্টা করছিলাম। তো কনট্র্যাক্ট লেবারদের নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দরকার হল কনট্র্যাক্ট লেবার অ্যাক্ট ১৯৭০ জানার। সেটার মধ্যে অনেক ভালো কথা আছে, কিন্তু বাস্তবে সেগুলো প্রয়োগ করা যায় না। প্রয়োগ করতে গেলে নানান মুশকিল হয়ে যায়। সুরাই বলে একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট লেবার কমিশনার ছিল। সে আমাকে একটা ইন্সট্যান্স দিল — বামার অ্যান্ড লরিতে কনট্র্যাক্ট লেবার ছিল। আমরা তো কনট্র্যাক্ট লেবার অ্যাবলিশ করে দিলাম। এবার এই কনট্র্যাক্ট ওয়র্কারগুলো যাবে কোথায়? কনট্র্যাক্ট লেবার অ্যাক্টে এরকম কোনো প্রভিশন নেই যে অ্যাবলিশ করে দেওয়ার পর তাকে পার্মানেন্ট করে দেওয়া হবে!

ওই সময় আমি একটা ছোট্ট লেখা পাঠিয়েছিলাম ইপিডব্লিউতে। ফ্রন্টিয়ারের কাউকে তখনও চিনি না। তারপর আমি আর খোঁজ করিনি লেখা বেরোল কি বেরোল না। এক বন্ধু আমায় বলল, তোর লেখা বেরিয়েছে ইপিডব্লিউতে। তো ইপিডব্লিউ তখন পাওয়াই যায় না। সম্পাদক কৃষ্ণরাজকে একটা চিঠি লিখলাম, যে আমাকে একটা কপি যদি পাঠিয়ে দাও, আমার লেখা বেরিয়েছে। কৃষ্ণরাজ কপি তো পাঠালই। তার সাথে লিখল, তুমি লেবার নিয়ে মাঝেমাঝে লেখো। সেইখান থেকেই লেখা শুরু। পরে সেই লেখাটা আরএসপি-র একটা কাগজে বেরোয়। দিল্লি থেকে। ওরা রিপ্রিন্ট করেছিল। যেহেতু ওটা বিগ বুর্জোয়াদের একটা ব্যাপার, হয়তো সেজন্য করেছিল। তো সেই লেখাটা আমি সমরবাবুকে পাঠিয়েছিলাম। উনি একটা পোস্টকার্ডে আমায় উত্তর দিয়েছিলেন, যে লেখাটা পেয়েছি। দু’এক সপ্তাহ বাদে ছাপব। ছাপেনও। সেটা ১৯৭৫। এরপর অল্পস্বল্প কিছু লিখেছি। কিন্তু সমর সেনকে ব্যক্তিগত ভাবে চিনতাম না, ফ্রন্টিয়ারের অফিসও চিনতাম না, অর্থাৎ ৬১, মট লেন কোথায় জানতাম না।

অন্‌রুধ সিং বলে আমাদের সঙ্গে একজন ট্রেড ইউনিয়ন করত — উত্তর প্রদেশের লোক। পুরনো কম্যুনিস্ট পার্টির হোল-টাইমার ছিল একসময়ে। কলকাতা ময়দানে টেন্টে যে মালিরা কাজ করে, ওদের নিয়ে কম্যুনিস্ট পার্টি একবার একটা ইউনিয়ন করেছিল। অন্‌রুধ তার দায়িত্বে ছিল। অন্‌রুধ কফি হাউজে আড্ডা মারত। মানে মরে গেলেও রোজ সে সেন্ট্রাল এভিনিউ কফি হাউজে আসবেই একবার। ও বলল, তুই যদি ফ্রন্টিয়ারে লেখা দিতে চাস তো কোনো অসুবিধা নেই। সমর সেন তো প্রায়ই কফি হাউজে আসেন। আমি ওনাকে তোর লেখা দিয়ে দেব। তখন আমি ওর হাত দিয়ে লেখা পাঠাতে শুরু করলাম। অনেকগুলো লেখা ছাপা হয়ে গেল। তখনও আমি ফ্রন্টিয়ার চিনি না, সমরবাবুকেও চিনি না।

তারপরে একদিন সাহস করে চলে গেলাম। দেখি সমরবাবু একা বসে আছেন। তো ঢুকব কি ঢুকব না এই করতে করতে উনি ডাকলেন আমাকে। বললাম, আমি তিমির বসু। উনি বললেন, হ্যাঁ আপনার লেখা তো দেখি ইপিডব্লিউতে মাঝেমাঝে। অনেক একথা-সেকথার পর বললেন যে, একটু ‘কমেন্ট’ জাতীয় লেখা লিখুন না। আমাদের এখানে ‘কমেন্ট’ জাতীয় লেখার লোকের খুব অভাব। ভবানী চৌধুরী তখন ফ্রন্টিয়ার অফিসে কিছুক্ষণের জন্য বসতেন। কিছুটা প্রুফ দেখা, কিছুটা এডিটোরিয়ালে হেল্প করা — এইসব করতেন। এটা অফকোর্স ওঁর জেল থেকে বেরোবার পর। ১৯৭৮ নাগাদ। জেলে যাবার আগে তো স্টেটসম্যানে চাকরি করতেন। তো আমিও তখন রেগুলার আসতে শুরু করলাম। তবে রোজ নয়। তখন ওই এটাসেটা দেখি। আজ ইনকাম ট্যাক্স থেকে চিঠি আসছে, কাল বাঙ্ক থেকে চিঠি আসছে — সমরবাবু প্রায় নাস্তানাবুদ। তো আমি ভলান্টারিলি সমরবাবুকে নানা ব্যাপারে হেল্প করতে শুরু করলাম। ভবানীবাবু আসলে অফিশিয়াল ব্যাপারটায় তো হেল্প করতেন না, লেখার ব্যাপারে করতেন।

আয়নানগর : বিজ্ঞাপন আনার ব্যাপারেও আপনিই হেল্প করতেন?

তিমির বসু : বিজ্ঞাপন আনার ব্যাপারটা কিরকম হয় বলি। ধরুন, অমিয় বাগচী। ইউনাইটেড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ব্যাঙ্ক বলে একটা ব্যাঙ্ক ছিল, পরে সেটা এলাহাবাদ ব্যাঙ্কের সাথে মার্জ করে। উনি তখন সেখানকার বোর্ড অফ ডিরেক্টর্সে আছেন। আমি তখন এঁদের অনেকের সাথেই যোগাযোগ করার চেষ্টা করছিলাম। অমিয় বাগচীকেও বললাম। উনি বললেন, আপনারা কেউ একজন একটা চিঠি করে নিয়ে আসুন, আমি দেখছি। গেলাম, ডালহৌসিতে কিশোর ভবনে। ওখানকার ম্যানেজার সেটা নিয়ে পাঠিয়ে দিলেন ওদের বিজ্ঞাপন এজেন্সির কাছে। অল্প কয়েকটা অ্যাড দিয়েছিল ওখান থেকে। এরকম চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম – যতভাবে পারা যায় আর কি। তার সাথে সমরবাবুর সাথে ইনকাম ট্যাক্স অফিসে যাওয়া বা ব্যাঙ্কে যাওয়া – এইগুলো করতে শুরু করলাম, ইনভল্ভড হতে শুরু করলাম। আমাকে তো পয়সাকড়ি দিতে পারতেন না। ভবানীবাবুকে দিতেন সামান্য। শুনলে লোকে হাসবে – পঞ্চাশ টাকার মত একটা অ্যালাওয়েন্স উনি পেতেন। আমাকে সেটাও নয়। কোত্থেকে দেবেন! সমরবাবু নিজেই সেসময় অনেক মাসের মাইনে নিতে পারেন না, অসুবিধা হয়। তবু এইভাবেই কাজ করে যাচ্ছিলাম।

আমার তখন প্র্যাকটিকালি ফুটলুজ অবস্থা। ট্রেড ইউনিয়ন করি, টিউশনি করি। ইপিডব্লিউতে মাঝেমাঝে লিখি। বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের সম্পাদক রড্‌নেকার আমার লেখা খুব পড়ত। তা একদিন আমায় ডেকে বলল, তুমি লেখো আমাদের এখানে। তখন সেখানে লিখতে শুরু করলাম। আর লিখতাম ফ্রন্টিয়ারের ক্যালকাটা নোটবুকে। তার একটা ইতিহাস আছে। আমি তো নোট লিখছিলাম – পাগলের মত – যা পারছি লিখে যাচ্ছি, অনেক লেখাই ছাপা হচ্ছে না। ক্যালকাটা ডাইরি একসময় ফ্রন্টিয়ারে খুব পপুলার হয়েছিল। সমরবাবুর খুব ইচ্ছে ছিল কেউ লেখে এরকম। পাচ্ছিলেন না। একদম শুরুতে অশোক মিত্র সামান্য কিছু লিখেছিলেন। তারপর জ্ঞান কাপুর লিখেছিলেন – অল্টারনেট উইকে লিখতেন। একদিন এসে দেখি, আমার তিনটে ছোট ছোট লেখা সমরবাবু ক্যালকাটা নোটবুকে ছাপার জন্য প্রেসে পাঠিয়ে দিয়েছেন। ছাপা হয়ে বেরিয়ে যাবার পরে ভবানীবাবু বললেন, এবার তো আপনি বিপদে পড়ে গেলেন, আপনাকে তো এবার প্রতি সপ্তাহে লিখতে হবে। সেই থেকে প্রতি সপ্তাহতেই লিখে গেছি, থামিনি কখনো। সমরবাবুই এটা কায়দা করে করেছিলেন।

সমরবাবুর নিজের লেখার ফ্রিকোয়েন্সিও কমে যাচ্ছিল। আমরা তখন লিখতে পারে, এমন কয়েকজনকে যোগাড় করলাম। তার মধ্যে পার্থ চ্যাটার্জি, সুশীল খান্না, অঞ্জন ঘোষ (মারা গেছেন) – এদেরকে দিয়ে লেখানোর কাজ শুরু হল। কেউ হয়তো একটা কমেন্ট দিত, কেউ এডিটোরিয়ালে কিছু দিত। ওটা নিয়ে সমরবাবুর বাড়িতে একবার দেখিয়ে নিতে যেতাম। আবার সোমবার সকালবেলা গিয়ে ওটা নিয়ে প্রেসে দিয়ে দিতাম। মোটামুটি নিয়মটা ঐরকম দাঁড়িয়ে গেছিল। সমরবাবু আর কিছু করতেই পারছিলেন না। খালি এডিটোরিয়ালটা আমি ওনাকে সকালে দেখিয়ে নিতাম – সে আমি লিখি আর যেই লিখুন। উনি দেখে দিলে তবে প্রেসে পাঠাতাম। তারপর তো অসুস্থ হয়ে পড়লেন। সেসময় আরও সমস্যায় পড়ে গেলাম, কারণ আর কেউ ছিল না। সবটা দায়িত্ব আমাকে সামলাতে হয়। এটা ১৯৮৫ নাগাদ।

রং ট্রিটমেন্টের জন্য ওনাকে অনেকটা ভুগতে হয়েছিল। লিভার সিউরোসিস বলে লিভার খুঁচিয়ে দিয়েছিল, যদিও ওরকম কিছু ছিল না। তারপরে সেরে উঠে আবার অফিসে আসতে শুরু করলেন। তারপরে ভবানীবাবু একদিন সমরবাবুকে বললেন, আপনি প্রতি সপ্তাহে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন, এইভাবে চালাবেন কিকরে? তিমিরের নামটা তো কোথাও রেজিস্টার হওয়া উচিত। দুম করে কিছু একটা হয়ে গেলে কি হবে? সমরবাবু খুব কম কথা বলতেন। আমি তো কোনো কথাই বলতাম না। কিন্তু পরের সপ্তাহে দেখি অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর তিমির বসু। ঐ ভবানীবাবুর কথায় অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর করে দিলেন।

আসলে সমরবাবুর যত বয়েস বাড়ছিল, উনি চেষ্টা করছিলেন আমাকে যত বেশি ব্যাপারে পারা যায়, ইনভল্ভ করে দিতে। একসময় দেখি, আমায় ওঁর যাবতীয় আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব – সবার সাথে আলাপ করিয়ে দিচ্ছেন। ব্যাপারটা প্রথমে বুঝতাম না। পরে বুঝলাম, উনি আস্তে আস্তে আমায় তৈরি করছিলেন, যাতে পুরো দায়িত্বটা বুঝে নিতে পারি।

আয়নানগর : আচ্ছা, আমরা আবার একটু ব্যাকে যাই। আপনি তো ট্রেড ইউনিয়ন করতে শুরু করলেন। জেল থেকে ছাড়া পেলেন ১৯৭১-এর গোড়ার দিকে। জেলে কেন গেলেন? আপনার সরাসরি রাজনীতিতে আসা, তারপরে জেল থেকে বেরিয়ে এসে সিপিআইএমএল না করে আলাদা করে ট্রেড ইউনিয়ন করা – এই সময়ের পুরো পলিটিকাল জার্নিটা নিয়ে যদি একটু কথা বলেন।

তিমির বসু : আমরা অবশ্যই নকশালবাড়ি থেকে ইন্সপায়ার্ড। তখন নানান কথা হচ্ছে, লেখাপত্র আসছে, যে গ্রামে যেতে হবে। শুনছি যে অনেক ছেলে, অনেক স্কলাররা গ্রামে যাচ্ছেন। আমরাও ঠিক করলাম গ্রামে যাব। কিকরে যাব? পার্টির তখন কোঅর্ডিনেশন কমিটি ছিল — সেখানে জানাতে হবে। অসীমদের সাথে আমাদের একটা যোগাযোগ ছিল। আমরা তখন না কোঅর্ডিনেশন কমিটি জয়েন করেছি, না সিপিআইএমএল জয়েন করেছি। সিপিআইএমএল তো তখনও হয়ইনি। অসীম একদিন বালিগঞ্জ সায়েন্স কলেজে এল। এসে আমাদের মধ্যে যারা একটু লিডার ধরনের ছিলাম, তাদের সাথে বসল। বলল, দ্যাখ, কোঅর্ডিনেশন কমিটি থাকছে না, আমরা সব সিপিআইএমএল হয়ে যাচ্ছি। তখনও লোকে জানে না যে পার্টিটা হতে যাচ্ছে। তো বলল, আমরা পার্টি জয়েন করছি, তোরাও চলে আয়। কন্ডিশন দিল। চারু মজুমদারের অথরিটিকে চ্যালেঞ্জ করা যাবে না, কারণ চারু মজুমদারের অথরিটিকে চ্যালেঞ্জ করা মানে চীনের অথরিটি চ্যালেঞ্জ করা, তার মানে মাও-এর অথরিটি চ্যালেঞ্জ করা। অসীম অনেকক্ষণ ধরে আলোচনা করে আমাদের বোঝাবার চেষ্টা করল। কিন্তু আমরা বললাম, না। আমার প্রায় জেদই চেপে গেল, যে স্টুডেন্ট ইউনিয়নকে কেন্দ্র করেই আমরা গ্রামে যেতে পারি কি না দেখা যাক। গেলাম কিন্তু – একাই গিয়েছিলাম।

প্রথমে মিদনাপুরে গিয়েছিলাম। কিন্তু সেখানে থাকতে পারলাম না। আমাদের এক কমন ফ্রেন্ড ছিল জিয়োলজির। তার থ্রুতে অসীম খবর পাঠাল, তিমির যদি এলাকা ছেড়ে চলে না যায়, তাহলে ওকে জোতদার হিসেবেই ট্রিট করা হবে। তো সে করলে আর কি করা যাবে, করুক! কিন্তু মিদনাপুরে কাজ করার অসুবিধা হচ্ছিল। পারলাম না শেষ অব্দি। খড়গপুর আইআইটিতে আমার এক বন্ধু কাজ করছিল — ঐ জিয়োলজিতেই গবেষণা করছিল পিএইচডি-র জন্য। ওর ওখানে কিছুদিন থাকার চেষ্টা করলাম, যদি যোগাযোগগুলো রেস্টোর করা যায়, সে-ও সম্ভব হল না। তারপর কলকাতা চলে এলাম। তখন ‘ভিত্তি’ বলে একটা গ্রুপ ছিল। ওরা দক্ষিণ দেশ-এর সাথে কোঅর্ডিনেট করে সাউথ ২৪ পরগনাতে, সুন্দরবন এলাকায় কাজ করত। আমি ওদের সাথে কথা বললাম, যে আমি গ্রামে কাজ করতে চাই, কৃষকদের মধ্যে কাজ করে কৃষক আন্দোলনের সাথে যুক্ত থাকতে চাই। ওদের মধ্যে ভেটারেন কিছু কম্যুনিস্ট পার্টির লোকজন ছিলেন, তাঁরা বললেন, কোনো অসুবিধা নেই। আমাদের এক হোল-টাইমার কাজ করেন বসিরহাট, সন্দেশখালি, হাড়োয়া — এইসব অঞ্চলে, তার কাছে চলে যান। ওখানে দেখুন যদি কাজ করতে পারেন। কোনও রাজনৈতিক শর্ত ওঁরা আরোপ করেননি।

চলে গেলাম। ওখানে গিয়ে দেখলাম, সুরেন, বা রতিকান্ত হাজরা (আসল নাম) একটা আদিবাসী গ্রামে শেল্টার নিয়ে থাকে। ওখানে বড় জোতদার কেউ ছিল না। সবই ছোট-ছোট। তাদের মধ্যে একটা প্রচার জাতীয় জিনিস করছিল ও, তাতে সংগঠন খুব কিছু দানা বাঁধছিল না, কিন্তু মোটামুটি ওর একটা রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি হয়েছিল। রাতবিরেতে গেলেও চট করে ওকে কেউ কিছু করবে না। তখন ঐ অঞ্চলে ডাকাতির খুব নাম ছিল। তো ডাকাতরা আমাদের খুব সমীহ করত। একটা কারণ হয়তো, ওরা ভাবত, এরা যেহেতু নকশাল, এদের হাতে অনেক আর্মস টার্মস আছে। রাত্তির একটা-দুটোর সময় হয়তো পাস করছি। দেখি ওরা বসে তাড়ি বা বিড়ি খাচ্ছে। বলল, “কে যায়?” দেখলাম, ঐ অঞ্চলের ডাকাতরা। বলল, “ও মাস্টার? এসো, বোসো, বিড়ি খেয়ে যাও।” বললাম, “না বিড়ি খাব না।” তো বলল, “আচ্ছা যাও।” তো এই অঞ্চলে ও ঘোরাঘুরি করছিল, কিন্তু সংগঠন ঠিক দানা বাঁধছিল না। আমিও চেষ্টা করছিলাম। ওখানে মুসলিম কৃষক প্রচুর। আমরা বেশিরভাগ সময়েই মুসলিম বাড়িতে রাতে শেল্টার নিয়েছি, কোনো অসুবিধা হয়নি। যেহেতু ওখানে তেভাগা হয়েছে, কম্যুনিস্ট ব্যাপারটা জানা ছিল মানুষের। বাড়ির মহিলারা পর্দানশীন হলেও কোনো অসুবিধা ছিল না। আমরা যেকোনো সময় গেছি, থেকেছি। এটা ১৯৬৯।

তারপর একদিন আমরা কলকাতা এলাম একটা জরুরি মিটিং করার জন্য। বেনেপুকুরে আমাদের কিছু বিড়ি ওয়র্কার আর কিছু চপ্পল ওয়র্কার ছিল। ওদের বললাম, রাতের বেলা থাকার একটা জায়গা ঠিক করে দাও, কিছু খাবারদাবার ব্যবস্থা করে দাও, যাতে রাতে মিটিংটা করতে পারি। সঞ্জয় ক্ষেত্রী আমার সাথে ছিল। জুবের বলে একজন বিড়ি ওয়র্কার ছিল। জুবেরের বাবা ছিল বেনেপুকুর মসজিদের ইমাম। এক ভাই ছিল — মসজিদের একটা পাশের ঘরে থাকত। অসুস্থ, বোধহয় টিবি হয়েছিল। জুবের বলল, “কোই বাত নহি, আপনাদের মসজিদের একটা কামরাতেই থাকার ব্যবস্থা করে দেব।” ওর ধারণা ছিল না, মসজিদের উল্টোদিকেই সিপিএমের একটা কমিউন আছে। আমরাও জানতাম না। জুবের তো আমাদের ভালো করে বসিয়ে দিয়ে চলে গেল। বলল, “হাম গোশত রোটি লা রহে হ্যায়।” গোশত রুটি আর কি খাব! একটু বাদেই দেখি কয়েকজন “খাঁ সাহেব হ্যায়?” বলে ঘরে ঢুকল। তারপরেই পিস্তল দেখাচ্ছে — সব সিপিএম-এর ক্যাডার। সঙ্গে সঙ্গে বেঁধে ফেলল। থানাতে ফোন করল, যে একটা বিশাল নকশাল গ্যাং-কে পাওয়া গেছে। ওরা এসে আমাদেরই জামা খুলে আমাদের বেঁধে নিয়ে গেল। ঐ মসজিদ থেকে আমরা সাত-আট জন ধরা পড়লাম। স্টেটসম্যানে বেরিয়েছিল খবরটা। জুবেরও পালিয়েছে তখন। ইমামও পালিয়ে গেছেন। তিনি অনেকদিন বাদে ফেরেন। যেহেতু মসজিদ, ওরা বাড়াবাড়ি করেনি, নয়তো একটা রায়ট-টায়ট হয়ে যেতে পারত।

তো আমাদের ওই যা-যা কেস দেয়, দিল। আর্মস কেস, বম্ব কেস। সে এক মজার ব্যাপার। যখন বেনেপুকুর থানায় নিয়ে গেল, ওসির ফেয়ারওয়েল ছিল। নতুন ওসি আসছে। অনেক বড়-বড় উচ্চপদস্থ অফিসার এসেছে। আমাদের সাইডে লাইন করে দাঁড় করিয়ে রেখেছে — জন্তুজানোয়ারের মত এক্সিবিট করে রেখেছে ওদের সামনে। ওরা বসে আছে। দূরে দুজন কনস্টেবল একটা বড় বস্তা ধরে আছে দুদিক থেকে। বলছে, “স্যার, ওদের কাছ থেকে এইসব বোম, অস্ত্র টস্ত্র পাওয়া গেছে।” আমি একটু উঁকি মেরে দেখি, কতকগুলো থান ইঁট তার মধ্যে। তো এই করে ওরা ফলস কেস দিয়ে দিল।

আয়নানগর : তখন মুখ্যমন্ত্রী কে?

তিমির বসু : যুক্তফ্রন্ট — একটা শর্ট পিরিয়ডের জন্য। সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় তখন শিক্ষামন্ত্রী। অজয় মুখার্জি চিফ মিনিস্টার, জ্যোতি বসু ডেপুটি চিফ মিনিস্টার আর হোম মিনিস্টার। উনিই অর্ডার দেন নকশালদের অ্যারেস্ট-এর।

আয়নানগর : তারপর আপনি তো জেল থেকে এক বছর বাদে বেরোলেন?

তিমির বসু : তখন আমরা ফুটলুজ। মুভমেন্টই ভেঙ্গে যাচ্ছে… অনেকে সেটা বুঝতেও চাইছে না।

আয়নানগর : আপনারা বুঝতে পারছিলেন?

তিমির বসু : হ্যাঁ। সংগঠন করতে গিয়েও তো দেখলাম, দাঁড়াচ্ছে না। সাধারণ মানুষ এই রাজনীতিতে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে না। কলকাতায় এসে অনেকের সাথে আলোচনা করলাম। পজিটিভ কিছু হচ্ছিল না। মাঝামাঝি তো ব্যাপারটা হয় না। করলে টোটাল আন্ডারগ্রাউন্ড করতে হবে, নাহলে ওপেন কাজ করতে হবে। তখন সবাই বলল, ট্রেড ইউনিয়ন করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। অ্যাটলিস্ট মাস-এর সাথে তো থাকা যাবে। এখন সিপিআই, সিপিআইএম, বা অন্য যাদের ট্রেড ইউনিয়ন আছে, তারা কেউ এন্ট্রি দেবে না। হরেনদা, মানে হরেন মুখার্জি নকশালবাড়ির পরে সিপিআইএম-এর ট্রেড ইউনিয়ন করা অনেকে যাঁরা পার্টি থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন, তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন। হরেনদা একসময় হোল-টাইমার ছিলেন, পার্টির ডিসিএম ছিলেন, ঐসময় ইন্ডিপেন্ডেন্টলি ক্যালকাটা ইলেকট্রিক সাপ্লাইতে ইউনিয়ন করতেন — মানে, পার্মানেন্ট ওয়র্কারদের ইউনিয়নটা করতেন। প্রিন্সেপ স্ট্রিটে ওয়র্কারদের একটা কোয়ার্টার আছে, সেখানে বসতেন। সেখানে দেখা করলাম। বললাম, “হরেনদা, আমি ট্রেড ইউনিয়নের কাজ করতে চাই।” বললেন, “হ্যাঁ, চলে এসো, কোনো অসুবিধা নেই।” এই করে ঢুকলাম। হরেনদা প্রথমে বললেন, “তুমি ট্রেড ইউনিয়ন অ্যাক্টটা ভালো করে পড়ো।” পড়লাম। পড়লেই তো হবে না। দু আনা দামের বইটা। কিন্তু ঐ নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট অব্দি কেস হয়ে যায়। তা সেই করে কিছু-কিছু জিনিস বুঝলাম — চার্জ শীটের উত্তর লেখা, ওদের ইন্ডাস্ট্রিটা বোঝা — এইসব। সেসময় কনট্র্যাক্ট লেবার অ্যাক্টটা পাশ হয়ে যাওয়াতে সংগঠন বলল এবার কনট্র্যাক্ট লেবার ইউনিয়নটা খাড়া করে দেওয়া যায়। সেটাই করছিলাম আমরা।

এরপরেও ইউনিয়ন করেছি। পরিমল দাশগুপ্তের একটা ইউনিয়ন ছিল ওয়েস্ট বেঙ্গল স্টেট ইলেক্ট্রিসিটি বোর্ডে। খুব পাওয়ারফুল ইউনিয়ন। সিপিআই, সিপিআইএম, সিপিআইএমএল — সবাইকেই মোটামুটি ইডিওলজিকাল পলিটিকাল চ্যালেঞ্জ করতে পারত — এত তাদের স্ট্রেংথ। স্টেট ইলেক্ট্রিসিটি বোর্ড তখনও এরকম ভাগাভাগি হয়নি। সমস্ত ডিস্ট্রিক্টে ওদের ইউনিয়ন ছিল। আমার পরিমল দাশগুপ্তের সাথে আলাপ হয়েছিল আমাদের কনট্র্যাক্ট লেবার ইউনিয়নের একটা বোনাস কেস ট্রাইব্যুনালের থেকে হয়েছিল, সেটা করতে গিয়ে। হরেনদাই আলাপ করিয়ে দিলেন, যে ইনিই পরিমল দাশগুপ্ত, বিপ্লবী, নকশালবাড়ির পরে পার্টি ছেড়ে দিয়েছেন। ইনি আমাদের কেসটা করবেন — এই বলে। আমরা তো আর পয়সাকড়ি দিতে পারতাম না। যাই হোক পরে ওদের ইউনিয়নের সাথে আমি অনেক মুভমেন্ট করেছি। বিশেষত সাঁওতালডিহিতে একটা মুভমেন্ট হয়েছিল। কমল ঘোষ নামে ওদের একজন ওয়র্কার ছিল — খুব এফিশিয়েন্ট একজন অর্গ্যানাইজার। তাকে সিটু করল কি, কায়দা করে স্যাক করিয়ে দিল ম্যানেজমেন্টকে দিয়ে। কারণ এঁকে যদি আউট করে দেওয়া যায়, তা হলে সিটু ইউনিয়নটা জোরদার হবে আর এদের ইউনিয়নটা ভেঙ্গে যাবে। এই কমল ঘোষের রি-ইনস্টেটমেন্ট নিয়ে প্রচণ্ড মুভমেন্ট হয়েছিল। একটা বিশাল মিটিং হয়েছিল সাঁওতালডিহিতে। সমস্ত গ্রুপরা যোগ দিয়েছিল।

আয়নানগর : আপনি ট্রেড ইউনিয়ন অ্যাক্টিভিটি কতদিন চালালেন?

তিমির বসু : ট্রেড ইউনিয়ন করেছি আরও কিছু দিন। হরেনদা মারা গেলেন আরও বছর চারেক বাদে। তখনও করছি। প্রায় ১৯৮০ পর্যন্ত।

আয়নানগর : নিজে যে সময়টা একদিকে ট্রেড ইউনিয়ন করছেন, আর অন্যদিকে সমর সেনের সাথে কাজ করছেন, তখন সেদুটো কাজের মধ্যে সম্পর্ক কেমন ছিল? ট্রেড ইউনিয়ন স্পেসে পলিসি মেকিং লেভেলে যে লেখা লিখছেন, বা ছাপছেন, ইউনিয়নের কাজে তার সরাসরি ভূমিকা থেকেছে কি?

তিমির বসু : থেকেছে। ইপিডব্লিউ-তে লেখার শুরুটাই হচ্ছে এরকম। বিশেষ করে আইনের অ্যানোমালিটাকে ধরা — আইন আছে, কিন্তু প্র্যাকটিস করা যাচ্ছে না — এটাকে ধরা। লেবার নিয়ে এত লিখেছি ইপিডব্লিউ-তে… তাই নিয়ে অনেক বিতর্কও হয়েছে। সিটুর প্রেসিডেন্ট-এর লাইন নিয়ে কথা তুলেছি। তার কিছুটা ফলও হয়েছিল। যেমন ওরা রিজয়েন্ডার দিতে বাধ্য হয়েছিল। সাঁওতালডিহিতে কংগ্রেসি ম্যানিপুলেশন নিয়ে ইপিডব্লিউ-তে প্রচণ্ড ভাবে লিখেছিলাম। সেটা নিয়ে কেস হয়ে গেল কলকাতা হাইকোর্টে। কন্টেম্পট অফ কোর্ট। এইগুলো হয়েছে।

আয়নানগর : ফ্রন্টিয়ারকে বেস করে কোনো সেমিনার বা ঐধরনের কিছু কি কখনও ভেবেছিলেন?

তিমির বসু : এটা সেইসময় অনেকেই বলেছেন আমাকে। আমরা করিনি। আসলে সমরবাবু খুব একটা এইসব আলোচনায় উৎসাহ পেতেন না। তার একটা কারণ ওঁর কিছু ব্যক্তিগত তিক্ত অভিজ্ঞতা ছিল। যেমন বলি, উৎপল দত্ত তখন ‘দুঃস্বপ্নের নগরী’ করেছিলেন স্টার থিয়েটারে। কংগ্রেসি মাস্তানরা এটা বন্ধ করে দেয়। তাই নিয়ে বুদ্ধিজীবীদের একটা সম্মেলন হয়েছিল অ্যাকাডেমিতে, মৃণাল সেন তার সভাপতি ছিলেন। সমরবাবু আমাকে বললেন, “আমি কখনওই এই ধরনের মিটিং-মিছিলে যাই না। কিন্তু দেখলাম উৎপল দত্তের নাটকটা বন্ধ করে দিয়েছে এইভাবে! তাই মিটিং-এ গেলাম। অনেক উৎসাহ নিয়ে গেলাম এই ভেবে, যে দেখি সবাই কি বলে-টলে। উৎপল তো মেইন বক্তা। ওরই ব্যাপার। এখন উৎপল মাইক ধরে আবেগমথিত কণ্ঠে বলতে শুরু করল, এই কংগ্রেস কি সেই কংগ্রেস! এই কংগ্রেস এই কাজ করতে পারে বলে আমি বিশ্বাস করি না। এ সেই কংগ্রেস নয়… ইত্যাদি।” সমরবাবু বললেন, “আমার তো রাগে গা শিরশির করতে শুরু করে দিয়েছে। প্রায় দাঁড়িয়ে পড়েছিলাম। কংগ্রেসের বিরুদ্ধে মিটিং করে আবার তাদের তোয়াজ করার চেষ্টা! আমি কোনোদিন কিছু বলি না, সেদিন প্রায় বলে ফেলেছিলাম।” তো এইসব কারণে সমরবাবু খুব মিটিং-সেমিনার পছন্দ করতেন না, আর তাই আমিও কখনও ওসব করে উঠিনি। সেমিনার অন্যত্র করে দেখেছি। নানা ধরনের মতামত আসে, কিন্তু কংক্রিট অ্যাকশন কিছু হয় না।

মাঝে ‘ফ্রন্টিয়ার বাঁচাও’ বলে একটা মিটিং হল, তাতেও অনেক লোক উপস্থিত ছিল। তারপরে আর কাউকে পাওয়া গেল না। পাওয়া যায় না। সাঁওতালডিহিতে যে মিটিং-টা হয়েছিল, সেটা একটা হিস্টোরিক মিটিং ছিল। তাতে সমস্ত গ্রুপগুলো হাজির ছিল। প্রো-লিং পিয়াও, অ্যান্টি লিং-পিয়াও থেকে আরম্ভ করে খতম লাইন, আন্ডারগ্রাউন্ড, ওভারগ্রাউন্ড — সমস্ত গ্রুপ। বিশাল ব্যাপার। একটা অ্যাকশনের প্রোপোজালও নেওয়া হল। কিন্তু কেউ কিচ্ছু করেনি তারপরে। এটা একটা বড় প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠতে পারত। তখন সিপিএম-এর বেশ পাওয়ারফুল অবস্থা। কিন্তু করা গেল না। সেজন্য আমাকে অনেকে বলে বটে অনেকসময়, যে একটা সেমিনার করলে হয়। কিন্তু আমার খুব উৎসাহ হয় না।

আয়নানগর : আপনি যে-যে মাত্রায় ফ্রন্টিয়ারে যুক্ত হয়ে যাচ্ছেন, সেই-সেই মাত্রায় কি ট্রেড ইউনিয়নের কাজ কমে যেতে থাকে?

তিমির বসু : না দুটোই করেছি একসাথে। তখন এই সিইএসসি-র কাজটা কমে যায়, আর আমি পরিমল দাশগুপ্তের কাজটাতে বেশি জড়িয়ে পড়ি। এটার মেজর একটা কারণ হচ্ছে, হরেনদা যে পার্মানেন্ট ওয়র্কারদের সাথে কাজ করত, ও মারা যাওয়ার পর তারা সিপিআই-এর সাথে একটা রফা করে ফেলল। ফলে সিপিআই ওটাকে ওদের এআইটিইউসি-র সাথে নিয়ে যায়। কনট্র্যাক্ট লেবার মুভমেন্টটা যেহেতু পার্মানেন্ট ওয়র্কারদের উপর কিছুটা ডিপেন্ডেন্ট ছিল, আস্তে আস্তে ওখানে একটা ডিজলিউশন হয়ে গেল।

আয়নানগর : ঐসময়ে, অশোক রুদ্র, রফিকুল — এঁদের যে লেখা বেরোচ্ছে ফ্রন্টিয়ারে — এগুলোকে কেন্দ্র করেই তো সরোজ দত্তর সাথে আরও গণ্ডগোল? উনি বোধহয় দেশব্রতীতে কাউন্টার করে লিখছেন। তো কি ধরনের লেখা ছিল, যাতে উনি রেগে গেলেন ?

তিমির বসু : ফ্রন্টিয়ার এমএল পার্টির পলিসির কিছু কিছু সমালোচনা করছিল। খতম লাইন, মূর্তি ভাঙা। সেটা ওনারা পছন্দ করেননি। বিশেষ করে সরোজ দত্ত পছন্দ করতে পারেননি। উনি চাইছিলেন, ফ্রন্টিয়ার পার্টির মুখপত্র হয়ে লিখবে।

আয়নানগর : ১৯৭৪-৭৫ নাগাদ যদি ঐসময় ওয়েস্ট বেঙ্গলের দিকে তাকাই, ঐসময়ে বন্দীমুক্তি আন্দোলন শুরু হয়ে যাচ্ছে এবং ফ্রন্টিয়ার একটা মেজর রোল প্লে করছে। এর মধ্যে ১৯৭৫-এ এমার্জেন্সি হল। সেসময়ও অনেককে ধরা হয়েছিল, যদিও ১৯৭৭-এ বামফ্রন্ট আসার পরে তাঁদের অনেককে ছেড়েও দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু তার আগে তাঁদেরকে নিয়েও কি ফ্রন্টিয়ারে লেখা হয়েছিল? ধরুন গৌরকিশোর ঘোষ।

তিমির বসু : ওঁদের সবাইকে নিয়েই ফ্রন্টিয়ারে লেখা বেরিয়েছে সেসময়ে। সেইভাবে নাম করে করে আর মনে নেই যদিও।

আয়নানগর : ফ্রন্টিয়ারে ঐসময় গোটা স্ট্রেসটাই হচ্ছে বন্দীমুক্তি। লেখার পর লেখা ছাপা হচ্ছে। আপনি সেসময়ে ফ্রন্টিয়ার পড়ছেন। তারপর আপনি যখন নিজে ফ্রন্টিয়ারে ১৯৮৭-তে আসছেন, তখনও তো এর রেশ চলছে। আজ আবার একটা বন্দীমুক্তি আন্দোলন চলছে। বিশেষ করে ‘মাওয়িস্ট’ বলে লোকজন ধরা পড়ার পর। এই দুটো সময়কে আপনি কীভাবে রিলেট করবেন?

তিমির বসু : তখন একটা ব্রড ইউনিটি তৈরি হয়েছিল। অনেকেই যারা সেইভাবে রাজনীতির সমর্থক না, তারাও কিন্তু বন্দীমুক্তি ব্যাপারটা সাপোর্ট করছিল। যেমন সৌমিত্র [চট্টোপাধ্যায়] নিজে মিছিলে হেঁটেছে কলেজ স্ট্রিটে। সৌমিত্র তো এই অর্থে কমিটার্ন বা পার্টিজান না। কিন্তু এইজাতীয় লোক তখন বন্দীমুক্তিটা সাপোর্ট করছিল। চাইছিল, এই ছেলেমেয়েরা বেরিয়ে আসুক, একটা নর্মাল লাইফে ফিরে আসুক। আজকের মুভমেন্টটা তো এই মানুষদের মধ্যে আর সেভাবে সাড়া জাগাচ্ছে না।

আয়নানগর : আপনার কাছে এর রাজনৈতিক ব্যাখ্যাটা কি?

তিমির বসু : কিছু ইয়াং ছেলে এতটা রিপ্রেসড হচ্ছে, এটা সমাজের একটা অংশের মানুষ মেনে নিতে পারছিলেন না। এঁরা নিজেরা বেশি কিছু করতে পারছিলেন না ঠিকই, কিন্তু এরা যে এইভাবে পুলিশের অত্যাচারের শিকার হচ্ছে, এটাও মেনে নিতে পারছিলেন না। তখনও, পলিটিকালি বলতে গেলে, নকশালাইট মুভমেন্ট মাস থেকে এতটা আইসোলেট হয়ে যায়নি। আজকে যতটা হয়েছে – মাওবাদী নাম করলেই কাউকে একটা বিভীষিকার মত আইসোলেট করাটা ইজি হয়ে যাচ্ছে। ছত্তিসগড়ে বা অন্যত্র এখন যেটা করা যাচ্ছে, সেই জিনিসটা তখন ছিল না। আমাকেই তো যারা ওষুধ দিয়েছে, শেল্টার দিয়েছে, তারা পলিটিক্সের লোক না। আমার মাস্টারমশাই, যাঁর কাছে আমি থিসিস করেছি, তিনিই তো কোত্থেকে সব ওষুধপত্র যোগাড় করে আমাকে এনে দিয়েছিলেন আমি গ্রামে যাবার আগে। তাঁর ভাই অবশ্য পরে জেলে গেছিল। কিন্তু তিনি পলিটিক্সের লোক না একেবারেই। তো এঁদের মত মানুষরা বন্দীমুক্তিকে সাপোর্ট করেছে। সিপিআই-এর অনেকে সেসময় নকশালদের সাহায্য করেছেন। কিন্তু পরে সিপিআইএম আর সেটা করেনি। আর এখন আরোই খারাপ অবস্থা। তখন কিছুটা সামাজিক ভিত্তি ছিল বিষয়টার, আজকে যেটা আর নেই। আজ রাষ্ট্র এদের নিয়ে যা-কিছু করতে পারে। নকশাল নাম দিলেই প্রশ্ন না করে অ্যারেস্ট, তার উপর হামলা, অত্যাচার করা যাবে। তাকে মেরে ফেলা যাবে।

আয়নানগর : বামফ্রন্ট যেসময় আসছে, আপনিও তার পরে-পরেই ফ্রন্টিয়ার জয়েন করছেন। ঐসময়কার কথা একটু বলুন।

তিমির বসু : ক্যালকাটা নোটবুক হবার পর থেকে আমি তো প্রায়ই বামফ্রন্টকে এক্সপোজ করছি। লেখা প্রচণ্ডই অ্যাপ্রিশিয়েটেড হচ্ছিল। বাইরেও অনেকে লেখা পড়ছিলেন। ভেমুরি বলে একজন সাউথ ইন্ডিয়ান ভদ্রলোক বলেন, যে লেখাগুলো খুবই এফেক্টিভলি ওদের এক্সপোজ করার কাজটা করছে – সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক অ্যাপ্রোচ নিয়ে। আসলে আমার একটা সুবিধা ছিল, ওরা ট্রেড ইউনিয়নের ক্ষেত্রে যে যে গণ্ডগোলগুলো করছিল, আমার তাই নিয়ে অনেকটা ফার্স্ট হ্যান্ড নলেজ ছিল। তো আমি সেইগুলো নিয়ে লিখছিলাম।

আয়নানগর : সে বিষয়ে সমরবাবুর সাথে আপনার কোনো ডিফারেন্স হয়নি?

তিমির বসু : না। ওনার সাথে একটাই ডিফারেন্স হয়, উনি ছিলেন কট্টর চীনপন্থী। অন্য কোনো কিছু নিয়ে আমার কখনও বিরোধ হয়নি। আমি যা লিখছি বা ছাপছি, উনি কখনওই আপত্তি করেননি। কিন্তু একবার একটা লেখা ছাপলাম, খুবই অ্যান্টি-চাইনিজ। সমরবাবু তো খেয়াল করেননি। লেখাটা বেরিয়ে যাবার পর ওনার কোনো এক গুণগ্রাহী সন্ধেবেলায় গুটিগুটি ওনার বাড়ি গিয়ে বলল — “সমরদা এটা কি হল? তিমির এরকম একটা অ্যান্টি-চায়না লেখা ছেপে দিল ফ্রন্টিয়ারের পাতায়!” তা উনি তখন বললেন — “তাই নাকি?” তারপর দেখলেন সত্যি তাই। বিদেশী লেখা। তার পরদিনই আমায় ফোন করলেন। তখন আমি ওনার সাথে প্রচণ্ড তর্ক করলাম। আমি বললাম, “চীনারা প্রচণ্ড ভাবে ন্যাশনালিস্ট। ও আমি অনেকদিন আগেই বলে এসেছি।” তখন সমরবাবু এটাসেটা অনেক কিছু বললেন। কোনোভাবেই যখন তর্কটা আর এগোচ্ছে না, তখন বলেই দিলেন — “ও একটু ন্যাশনালিস্ট হওয়া ভালো!” ব্যাপারটা ওখানেই চেপে গেল।

আয়নানগর : আচ্ছা যখন সিপিএম-এর বিরুদ্ধে লিখছেন, তখন সিপিএম-এর কেউ কি ফ্রন্টিয়ারকে কোনোভাবে প্রেশার দেওয়ার চেষ্টা করেছ?

তিমির বসু : না তেমন কিছু না। বুদ্ধবাবু তখন কালচারাল মিনিস্টার। তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগ বছরে দুটো করে বিজ্ঞাপন দিত। একদিন সমরবাবুকে বললাম, আপনি একবার লিখুন না। সকলেই এতগুলো করে বিজ্ঞাপন পাচ্ছে। আমাদের দেয় না। সমরবাবু একটা চিঠি লিখলেন। একটা এক লাইনের উত্তর এল বাংলায় — “খবর নিয়ে দেখলাম, ফ্রন্টিয়ারে বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে।” এমনিতে বামফ্রন্টের প্রেশার দেওয়ার কোনো জায়গাও ছিল না। তবে ওরা নানা জায়গায় প্রচার করত ফ্রন্টিয়ার নকশালদের কাগজ বলে। সে তো ইপিডব্লিউকেও ওরা নকশালদের কাগজ বলত। আর সিপিআই তো এককাঠি উপরে। সিপিআই কিন্তু পার্টি থেকে কখনও কিছু বলেনি। অন্ধ্র সিপিআই পার্টি ইউনিট ফ্রন্টিয়ারের দীর্ঘদিনের সাবস্ক্রাইবার। কিন্তু সিপিআই-ঘেঁষা কিছু কিছু বুদ্ধিজীবী — তারা ফ্রন্টিয়ারকে সিআইএ-র দালাল-টালাল বলেছে। একজন তো লিখেই বসল, সমর সেন সিআইএ থেকে টাকা পায়। তখন আমি ছিলাম ফ্রন্টিয়ার অফিসে। একজন এসে বলল, “শুনেছেন, আপনাদের সম্পর্কে এরকম বলেছে?” তা কি বলেছে? না সমর সেন সিআইএ থেকে টাকা পায়। তো সমরবাবু জিজ্ঞেস করলেন, “কত টাকা পাই কিছু বলেছে? শুনে অন্তত একটু আনন্দ পাই!” এটা লিখেছিল আসলে শমীক ব্যানার্জি। ওর ভাই সুমন্ত ব্যানার্জি আবার তার প্রোটেস্ট করে একটা রিজয়েন্ডার দিয়ে দিয়েছিল। যাই হোক, পরে একবার সমরবাবুর সাথে শমীক ব্যানার্জির কোথাও একটা দেখা হয়েছিল, কোনো মিটিং-এ বা অবস্থানে। সমরবাবু ওঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন — “আচ্ছা আপনি যে এটা লিখলেন, আপনি সত্যি এটা বিশ্বাস করেন?” উনি আর কোনো উত্তর দেননি।

আয়নানগর : আচ্ছা, এই পারসেপশনটা লোকের কেন হল, যে এটা নকশালদের কাগজ? সরোজ দত্তর অ্যাটাকের পরেও, বা কাগজটাকে পার্টিতে প্রায় নিষিদ্ধ করে দেওয়ার পরেও?

তিমির বসু : আসলে সিপিএম-এর কারণে অনেকটা। প্রথমত অশোক মিত্র আর সমরবাবুর পলিটিকাল ডিফারেন্স-এর কারণে। অশোক মিত্র তো প্রচণ্ড পার্টিজান। ওর মত একজন ইন্টেলেকচুয়াল কেন জ্যোতিবাবুকে অত গুরুত্ব দিত জানি না। এদের একটা মোটামুটি প্রচার ছিল যে, শুরু থেকেই, যে ফ্রন্টিয়ার নকশালদের ব্যাক করে। সিপিআই-রা কিন্তু কখনও এইভাবে বলেনি। অথচ নকশালরাও ফ্রন্টিয়ারকে নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করতে ছাড়েনি। সমরবাবুকে তো প্রায় মেরে দেবার মত অবস্থা। সরোজ দত্তের তো মাঝেমাঝে প্রায় পাগলের কাণ্ডকারখানা। বিশেষ করে ঐ লেখাটার পরে। তখন তো শ্রেণীশত্রু বলে খতম করতে হবে — এইসব কথাও উঠেছিল।

আয়নানগর : আচ্ছা, আপনি যখন আসছেন, কলকাতায় সমর সেন তখন একটা নাম — একটা ইন্টেলেকচুয়াল ফিগার — সে যতই ছোট পত্রিকা বার করুন। তা উনি এই কাগজের এডিটর হিসেবে স্পেসটাকে কতটা ডেমোক্রেটিক স্পেস বলে মনে করতেন?

তিমির বসু : কিছুটা ছিল। তবে সমরবাবু কিছু কিছু কাজ একদম করতে চাইতেন না। যেমন অশোক রুদ্রের সাথে একটা লেখা নিয়ে মতবিরোধ হল। বামফ্রন্টকে আঘাত করেই লেখা — সে তো আমরা অনেক ছেপেছি — কিন্তু এটা যাচ্ছেতাই করে লেখা হয়েছিল। সমরবাবু সেটা ছাপতে রাজি হলেন না। অশোক রুদ্র হচ্ছেন দুর্বাসা মুনি। তাঁকে চটানো মানে, ফ্রন্টিয়ারের একজন হিতৈষীকে চটানো। নিজে পোস্টকার্ড কিনে বন্ধুবান্ধবকে চিঠি লিখতেন, যে ফ্রন্টিয়ারের গ্রাহক হও, ফ্রন্টিয়ারকে সাহায্য করো। আমি বরং একটু কিন্তু-কিন্তু করছিলাম, যে কি দরকার। কিন্তু সমরবাবু রাজি হলেন না। অশোক রুদ্র কোঅপারেশন করবেন না জেনেও ছাপেননি। এরকম ব্যাপারটা ছিল ওঁর। তারপরে বেশ কিছুদিন অশোক রুদ্র লেখেননি ফ্রন্টিয়ারের জন্য।

আয়নানগর : ফ্রন্টিয়ারের মাইনে কি কাগজ বিক্রির টাকা থেকে উঠত, নাকি সাহায্য থেকে?

তিমির বসু : না ঐভাবে তো ফ্রন্টিয়ার সাহায্য নিতে পারে না। লাইফ মেম্বার, কাগজ বিক্রি, বিজ্ঞাপন — এসবের থেকেই চালাতে হত।

আয়নানগর : তখন সার্কুলেশন কত ছিল?

তিমির বসু : সার্কুলেশন কোনোদিনই বেশি ছিল না। তিন হাজারের বেশি কোনোদিনই প্রিন্ট অর্ডার হয়নি। সমরবাবুর যখন হাই পিরিয়ড, তখনও হয়নি। তখন হয়তো সমরবাবু বলেছেন, “ইপিডব্লিউ কত ছাপে?” বেশি না। কিন্তু সেটা কথা না। আসলে বিজ্ঞাপন না পেলে এইধরনের কাগজ — যতই ছাপা হোক না কেন — শুধু কাগজ বিক্রি করে চালানো যায় না। কোনো এজেন্ট টাকা দেয় না। আমাদের ক্ষেত্রেই কত এরকম হয়েছে, কাশ্মিরে, আসামে, সাউথ ইন্ডিয়ার অনেক জায়গায়। বাংলাদেশেও নানা জায়গায় আমরা টাকা পাইনি। দীর্ঘদিন কাগজ পাঠিয়েছি। পোস্টাল খরচাতেই তো লস।

আয়নানগর : আচ্ছা, ফ্রন্টিয়ার ইংরিজিতে বেরোত। ফ্রন্টিয়ার যে পলেমিক্সটা সোসাইটিতে হাজির করতে চাইছে, ভারতবর্ষে ইংরিজি ল্যাঙ্গোয়েজের কারণেই বহু পলিটিকাল অ্যাক্টিভিস্ট — ট্রেড ইউনিয়ন বা কৃষক নেতারাও — সেটা পড়ে উঠতে পারবে না। কখনো কি ফ্রন্টিয়ারের তরফে এরকম কোনো ভাবনাচিন্তা হয়েছে, যে প্রচুর মানুষের কাছে আমরা পৌঁছতে পারছি না, যদিও পলেমিক্সটা নিয়ে যাওয়াটাই ইম্পর্ট্যান্ট টাস্ক?

তিমির বসু : না সেইভাবে এটা ভাবা হয়নি। উদ্দেশ্যটা ছিল একটা অ্যাডভান্স সেকশনের কাছে পৌঁছনো। এটা মাস পেপার হবে, এই ব্যাপারটা কোনোদিনই ছিল না। পলিসি মেকার, ডিসিশন মেকার, অ্যাক্টিভিস্ট — এদের কথাই মাথায় ছিল।

আয়নানগর : কিন্তু অ্যাক্টিভিস্টদের মধ্যে একটা বড় অংশ যেহেতু ইংরিজি পড়তে পারে না, বা পড়তে অসুবিধা হয়, অর্থাৎ ইংরিজি জানা একটা এলিট সেকশনের বাইরে যে অ্যাক্টিভিস্ট গোষ্ঠী, তাদের কাছে পৌঁছনোর পথ তাহলে কি? এটা করা গেলে সার্কুলেশনও তো বাড়ত।

তিমির বসু : আসলে ইংরিজিতে হলে সারা ভারতবর্ষের কাছে পৌঁছনো যায়। লোকাল বা ভার্নাকুলার হলে সেটা করা যাবে না। বিদেশেও পৌঁছনো যায়। বিদেশের কথায় একটা কথা বলছি, অশোক রুদ্র আমাকে একবার বলেছিলেন, বিদেশের এই কাগজগুলো কিকরে চলে। সোশ্যালিজম নিয়ে পলেমিক সেখানেও লেখা হচ্ছে। কিন্তু ওখানেও এগুলোকে কারা সাপোর্ট করে? ঐ একটা অ্যাডভান্স সেকশনই করে। ওরা কি করে? সাসটেইনার যোগাড় করে — যে এবছর  আমার এতগুলো সাসটেইনার লাগবে। ধরো বিশটা নাম ঠিক করে রাখা হল। তো বিদেশে শুনি এইভাবেই চলছে। তাদের আর্থিক অবস্থাও খুব ভালো নয়।

আয়নানগর : আপনি এডিটর হলেন ১৯৮৭-তে। কি সারকামস্ট্যান্সে দাঁড়িয়ে আপনাকে এই দায়িত্বটা নিতে হয়েছিল? এবং ফ্রন্টিয়ার আন্ডার সমর সেন আর ফ্রন্টিয়ার আন্ডার তিমির বোস — এ দুটোর মধ্যে কি কোনো পার্থক্য আছে?

তিমির বসু : ১৯৮৭-র ২৩ অগাস্ট আমি কাজ শুরু করি এডিটর হিসেবে। খুব একটা অসুবিধা হয়নি, কারণ সমরবাবু বেঁচে থাকতেই আমি সব কিছু করছিলাম। মারা যাবার পর নতুন করে তেমন কোনো দায়িত্ব এসে চাপেনি। নর্মাল কোর্সেই হয়েছিল ব্যাপারটা।

আমি এডিটর হবার পরেও ফ্রন্টিয়ারে খুব একটা পার্থক্য ঘটেনি। পলিসিগত দিক থেকে তো যা ছিল তা-ই আছে। আমি হয়তো একটু লিবারাল করেছি। আগে একটা ধারণা ছিল, যে বিশেষ ধরনের লেখাই ছাপা হবে। আমি বলেছি, “প্রো পীপল হলেই হবে। ইফ ইট সার্ভস দ্য পারপাস অফ দি পীপল, তাতেই হবে। লেখো। তোমাকে সেখানে মার্ক্স-লেনিন কোট করতে হবে না।” অনেককে বলেছি, “অমিত ভাদুড়ির লেখা পড়ে দ্যাখো। অমিত ভাদুড়ি কখনও ঐ জারগনগুলো ইউজ করে না। পারলে সেভাবে লেখো।” আমরা তো ছেপেছি অন্যধরনের পলিটিকাল অ্যাফিলিয়েশনের লোকের লেখা। সিপিআই-এর লোকের লেখা ছাপা হয়েছে। সোশ্যালিস্ট পার্টির লোকের লেখা ছাপা হয়েছে। সমরবাবুরও মোটামুটি তাই মত ছিল। খালি ঐ যেটা বললাম। অ্যান্টি-চায়না লেখা ছাপতেন না।

আয়নানগর : ১৯৮০ থেকে তো ভারতবর্ষে রাজনীতির ধরনটাও বদলে যাচ্ছে। তার রিফ্লেকশন ফ্রন্টিয়ারে কীভাবে দেখা যাচ্ছে?

তিমির বসু : প্রভাব পড়েছে। বিদেশের পাঠকদের মধ্যেও পড়েছে। তখন বাংলাদেশ ওয়ার হচ্ছে। বাইরে যারা বাংলাদেশ নিয়ে বুঝতে চাইত, তারা এখানে প্রথমে আসত। বোঝার চেষ্টা করত কি হচ্ছে। এমনকি লেফ্ট গভর্নমেন্ট যখন হচ্ছে, অনেকে বাইরে থেকে এসে আমাকে জিজ্ঞেস করত — “আচ্ছা এখানে সো-কলড কম্যুনিস্টরা কি করে ক্ষমতায় থাকছে? ইন্ডিয়ার মধ্যে একটা প্রভিন্সে — এটা তো একটা এক্সপেরিমেন্ট…” ইত্যাদি। এই সময়ে অনেকে ফ্রন্টিয়ারের কি ওপিনিয়ন, তার উপর ভিত্তি করে বিদেশেও রিপোর্ট পাঠিয়েছে। ফ্রেঞ্চ কন্স্যুলার — কন্সাল জেনারাল — বয়স্ক মানুষ, জাপানে ছিলেন আগে। আমাদের অফিসে একদিন এলেন। আমরা তাকে ভাঙা কাপে করে চা খেতে দিলাম। তারপর একদিন ডাকলেন, “কন্স্যুলেটে এসো, একটু ভালো করে আলোচনা করতে চাই বেঙ্গলের পলিটিক্স-এর ব্যাপারটা বোঝার জন্য।” গেলাম। আমাকে বললেন — “বরুণ সেনগুপ্ত বর্তমান-এ কি একটা লিখেছে, দেখেছেন?” কেউ হয়ত ওঁকে বলেছে, বরুণ সেনগুপ্ত বড় পলিটিকাল ক্রিটিক। তো আমি বললাম — “ঐ রাবিশগুলো একদম পড়বেন না!”

ঐসময়ে, আমরা সোভিয়েত-এর বিরুদ্ধে লেখা বার করলেও, ওখান থেকেও একজন আমাদের এখানে আসত। অবশ্য আসত নিজের প্রয়োজনেও। অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্স-এ একটা পিএইচডি করার জন্য থিসিস লিখবে ইন্ডিয়ান কম্যুনিস্ট মুভমেন্ট-এর উপর — সেটাকে বোঝার জন্য। মার্ক্সিস্ট, ইকোনমিস্ট, প্রফেসর — অনেকেই আসত। রুথ গ্লাস বলে একজন এসেছিলেন। প্রফেসর। অক্সফোর্ড থেকে আসছেন। স্টেট গেস্ট। ন্যাচারালি ওঁকে তো রাজভবনে থাকতে দিল। উনি এসে আমাদের জিজ্ঞাসাবাদ করতেন, হালচাল, পলিটিকাল টেনডেন্সি ইত্যাদি বোঝার জন্য। এমনিতে আমাদের কাছে তো জ্যোতি বসুর বিরুদ্ধেই অনেক কিছু বলতেন-টলতেন। অনেকেই জানে না, উনি যে রিপোর্ট পাঠিয়েছিলেন, তাতে ফ্রন্টিয়ারের কতটা ভূমিকা আছে। সমরবাবু আমাকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। বললেন, আমি রাজভবনে যেতে পারব না, তিমির যাবে। তা গেলাম। সেই প্রথম দেখলাম রাজভবনের চা কেমন বাজে হয়! অনেক কথা হল। রুথ গ্লাস দেশে ফিরে গিয়ে একটা রিপোর্ট লিখতেন ইন্ডিয়া ডায়রি বলে। তো সেই অর্থে এই জাতীয় লোকজন, বিদেশে যাদের যথেষ্ট নাম আছে, তাদের কাছে, বা পলিসি মেকারদের কাছে ফ্রন্টিয়ারের ভিউ সবসময় গুরুত্ব পেয়েছে।

তিমির বসু

আয়নানগর : এরপরে সোভিয়েত ভাঙ্গার পিরিয়ডটা আপনি কীভাবে দেখছেন? এগুলোর এফেক্ট কি পড়ছিল লেখার উপর? সার্কুলেশনের উপর? ব্যক্তির উপর?

তিমির বসু : হ্যাঁ প্রচণ্ড ভাবেই। সোভিয়েত ইউনিয়ন যখন ভাঙছে, ভেঙ্গে যাবেই যে, সেটা ঠিক বোঝা যাচ্ছিল না, অন্তত আমরা বুঝতে পারছিলাম না। কিন্তু একটা কিছু একটা বিরাট পরিবর্তন আসছে বা গর্বাচভ একটা ফেনোমেনন, এটা বোঝা যাচ্ছিল। কিন্তু তার আগের থেকেই আমরা — বিশেষ করে চীনের দ্বারা প্রভাবিত হবার ফলে — সোভিয়েত সোশ্যাল ইম্পিরিলিয়াজম নিয়ে লিখে যাচ্ছিলাম। দারুণ সব লেখা ছাপছিলাম। এটা কিন্তু আমি পরে অনেক জায়গায় বলেওছি, যে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাবার পিছনে, পলিটিকাল ইশ্যুর পিছনে আমরাও — মানে ফার লেফ্টরাও — কিন্তু কম দায়ী নই। আমরা চীনের হয়ে সোশ্যাল ইম্পিরিলিয়াজম বলে যে ভাবে প্রোপাগান্ডা করেছি, অন্যরা কেউ সেভাবে করেনি। অতটা না করলেও পারতাম। এটার ইমপ্যাক্ট হয়েছে যারা পেরিফেরিতে আছে, যারা সোভিয়েত না চায়না অত বোঝে না, তাদের ওপর। মোটামুটি মার্ক্সবাদ, সোশ্যালিজ — এগুলো ভালো, এইরকমটা বোঝে, তারা বলছিল, “এই তো মার্ক্সবাদের অবস্থা, এই তো সোশ্যালিস্টদের চেহারা, আর কি হবে!” এটার ইমপ্যাক্ট ফ্রন্টিয়ারের উপর পড়ছিল। অনেকে বলছিল, “আর লিখে কি হবে? তোমরাই বা কেন যে লিখছ?”

তবে আমি লিখে গেছি। তখন থেকেই চীনের বিরুদ্ধে লিখছি। রাশিয়ার সাথে চীনের একটা বর্ডার বিরোধ ছিল। সোভিয়েত ডেপুটি কন্সাল বলেছিলেন — এই যে চীনের সঙ্গে যে আমাদের বর্ডারগুলো ছিল জারের আমলে — কোথাও হয়তো পেন্সিল দিয়ে ম্যাপে দাগ মারা আছে। কোথাও উঠে গেছে, অস্পষ্ট হয়ে গেছে। ন্যাচারালি এই নিয়ে গণ্ডগোল চীনারাও করে যাচ্ছে, আমরাও করে যাচ্ছি। রিজল্ভ করা মুশকিল। গর্বাচভ একটু লিবারাল হওয়ায় বলল, উশুরি রিভারের মিড-রিভারটাই চীন-রাশিয়ার বর্ডার হবে। যেদিন গর্বাচভ এটাকে অ্যানাউন্স করে দিল, তার পর দিন থেকেই রেডিও পিকিং ‘কমরেড গর্বাচভ’ বলতে শুরু করল! তার আগে পর্যন্ত ‘সোশ্যাল ইম্পিরিয়ালিস্ট’ বলে গেছে! তো এইগুলো মিটিং-এ, লেখার মধ্যে আমি পয়েন্ট আউট করার চেষ্টা করে গেছি। এই সমস্ত ব্যাপারগুলো আমাকে, ফ্রন্টিয়ারকে অ্যাফেক্ট করেছে। অনেকে যারা ভেটারেন, তারা এইসময় বসে যায়। তারা আগে ফ্রন্টিয়ারটা পড়ত, তখন দেখা গেল আস্তে-আস্তে আর পড়ে না।

আয়নানগর : ঐ সময় কি সার্কুলেশনও কমে যায়?

তিমির বসু : প্রায় শ’পাঁচেক কমে যায়। যখন লিবারালাইজেশনটা শুরু হল, ওরা রিফর্মটা শুরু করল, ওপেনিং একটা হল। আমাদের সময় তো অ্যামেরিকা যাওয়া, ভিসা পাওয়া প্রচণ্ড ডিফিকাল্ট ব্যাপার ছিল। কেউ যেতেই পারত না। এখন তো সবারই বাড়ির আত্মীয়স্বজনরা কেউ না কেউ এখানে ওখানে বিদেশে আছে। তখন ক্রমশ অ্যান্টি-মার্ক্সিস্ট একটা আবহাওয়া তৈরি হতে শুরু করল। তার ইমপ্যাক্ট ছিল। যার জন্য ফুকোয়ামা ‘এন্ড অফ হিস্ট্রি’ লিখল। এখন কিন্তু আবার মতটা চেঞ্জ করেছে। নিউ স্টেটসম্যান ওর যে ইন্টার্ভিউটা ছেপেছে, আমরা সেটা আবার ছাপব। যাতে আবার ফিরে সোশ্যালিজমের কথা বলছে…

আয়নানগর : নব্বই থেকে আজ — এই দু’দশক ধরে ফ্রন্টিয়ার কীভাবে তার অস্তিত্ব নেগোশিয়েট করেছে? বন্ধ তো হয়ে যায়নি। মুভমেন্টের ধরনও বদলে গেছে। পোস্ট লিবারালাইজেশনের সময়ে বহু কাগজ বন্ধ হয়ে গেছে। ফ্রন্টিয়ার বন্ধ হয়নি।

তিমির বসু : এই বিষয়ে সমরবাবুর সঙ্গে ভবানীবাবুর একটা ডিফারেন্স হয়েছিল। ভবানীবাবু তো প্রফেশনাল লোক, যেহেতু স্টেটসম্যান থেকে এসেছিলেন। উনি ডেস্কে লেখাপত্র তৈরি করতেন। তো ভবানীবাবু বলতেন, “আমাদের এখানে তো অনেক কাগজপত্র আসে, এখানে ডেস্কে বসে কিছু লেখা তৈরি করে ফেলা ষায়।” কিন্তু সমরবাবু এই অ্যারেঞ্জড লেখার আইডিয়াটা পছন্দ করতেন না। এমনি কাউকে-কাউকে লিখতে বলতেন হয়তো। আমি বরং অনেককে লিখতে বলতাম, যে স্পেসিফিকালি কোনো বিষয় বা আন্দোলনের উপর লেখো। কিন্তু সমরবাবু এটা চাইতেন না। উনি বলতেন, ‘নাও’ থেকে শুরু করে আমি কখনও ঐভাবে অর্গ্যানাইজড লেখা করিনি। তো কীভাবে করেছেন? মোটামুটি এই, যে রাইটাররা বা ইন্টেলেকচুয়ালরা, ন্যাশনালি বা ইন্টারন্যাশনালি যা ঘটছে, তার উপর রিঅ্যাক্ট বা রিফ্লেকশন করে লিখুক, স্পন্টেনিয়াস লেখা আসুক। সেটাই আমি ছাপব। তো পরে আমিও মোটামুটি সেই ভাবেই চলেছি। লেখা না চাইলেও লেখা যে এসে যাচ্ছে, সেগুলো রিঅ্যাকশন। সে আরএসএস, বা লিবারালাইজেশন, বা ট্রেড ইউনিয়ন মুভমেন্ট — যাই হোক। ট্রেড ইউনিয়ন অবশ্য প্রচণ্ডভাবে মার খেয়েছে এই লিবারালাইজেশন থেকে। এগুলোও ইমপ্যাক্ট। তা এটাই ফ্রন্টিয়ার করে এসেছে, এবং এখনও করে। কিছু কিছু লেখা অবশ্য আমি অর্গ্যানাইজ করি। তখন স্পেসিফিক সাবজেক্ট বলে দিই। যেমন ফ্রন্টিয়ারের পঞ্চাশ বছর হচ্ছে, বলেছি, এটা নিয়ে রিঅ্যাকশন লেখো। নকশালবাড়ির পঞ্চাশ বছরের ব্যাকগ্রাউন্ডেই লেখাটা লিখতে পারলে ভালো হয় — এরকমও বলে দিয়েছি। জেনারাল বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে এটা করি না, মাঝেমধ্যে হয়তো কাউকে দিয়ে একটা কমেন্ট লেখালাম কারেন্ট ইশ্যুর উপর। তা বাদ দিয়ে ফ্রন্টিয়ারে ন্যাশনাল হোক, ইন্টারন্যাশনাল হোক — লেখকদের রিফ্লেকশনই মূল প্রতিপাদ্য।

আয়নানগর : এই রিফ্লেকশনের মধ্যে দিয়ে আগের আর এখনকার সোশ্যাল পলিটিক্স-এর চেঞ্জেরও একটা ছবি কি দেখা যাচ্ছে? মানে চেঞ্জটা কি ফ্রন্টিয়ারে রিফ্লেক্টেড হচ্ছে? আপনি আজকের সময়ের এই পলিটিক্সটা কীভাবে দেখছেন? এবং ফ্রন্টিয়ার কি এটাকে ধরতে পারছে পুরোটা?

তিমির বসু : আগের থেকে একটা জিনিস অনেকটা বেশি হয়েছে। সেটা হল বিষয়ের ভ্যারাইটি। যেমন কাস্ট প্রশ্ন। আগের তুলনায় ক্যানভাসটা অনেক বড় হয়ে গেছে। দলিত প্রশ্ন নিয়ে তো কম্যুনিস্ট পার্টির কোনো নেতারা কোনো মুভমেন্টই আগে কিছু ভাবেনি। আমাদের যেমন ট্রটস্কি পড়তে দিত না, ট্রটস্কাইট হয়ে যাব, সেই ভয়ে – অথচ ট্রটস্কির এত বিউটিফুল, পাওয়ারফুল লেখা! দলিতদের ব্যাপারেও,  আম্বেদকরকে নিয়ে — “আরে ও তো ব্রিটিশদের দালাল ছিল” — উচ্চনেতৃত্ব এইসব বলে সেখানেই থামিয়ে দিত। পড়তেই দিত না। এসবের জন্য কম্যুনিস্ট পার্টি কম দায়ী নয়। আমরা পিছিয়ে আছি। দলিত কোয়েশ্চেনগুলো সবে ফোরফ্রন্টে আসছে।

আয়নানগর : আজকের পোস্ট গ্লোবালাইজেশন পলিটিক্স আপনি দেখছেন ফ্রন্টিয়ারের চোখ দিয়ে। তখন ঐ সময়কার মুভমেন্ট আর এখনকার মুভমেন্ট এ দুটো তো আলাদা? আগের মুভমেন্ট-এর লিমিটেশন থাকতে পারে। কিন্তু তার একটা রেভোলিউশনারি ফারভার ছিল, সোসাইটিকে চেঞ্জ করতে হবে এই দাবিটা ছিল। হয়তো ভুলভাবে ছিল, তবু…

তিমির বসু : বরং এখনকার মুভমেন্টে যথেষ্ট খামতি আছে। আমাদের সময় আমরা যেভাবে সোশ্যাল চেঞ্জের ব্যাপারটায় মুভড হয়েছি, সেটা এখন অতটা দেখি না। সমাজকে পরিবর্তন করতে হবে, বা করা যায়, এই ধারণাটাই প্রায় চলে গেছে। অল্পস্বল্প একদুটো লেখা দেখা যায়। যেমন ফারুক একটা নতুন লেখা শুরু করেছে – মাইকেল ডি ইয়েটস বলে একজন লিখেছে, ‘ক্যান ওয়র্কিং ক্লাস চেঞ্জ দ্য ওয়র্ল্ড?’ — এটা নিয়ে সিরিজ। সেই সময় আমরা রাজনীতি ভালো করে বুঝি বা না বুঝি, একটা পরিবর্তনের দরকার বুঝেছিলাম। মনে হয় এই ধারণাটার জায়গাটা আজ খুবই দুর্বল।

আয়নানগর : আজকের ভারতবর্ষে, আজকের সোসাইটিতে আপনি ফ্রন্টিয়ারের ভূমিকাকে কীভাবে দেখছেন? আমাদের কথাবার্তাতেও তো একটা সিনিসিজম উঠে আসছে, যে কিছুই হচ্ছে না, ফ্রন্টিয়ার প্রায় উঠে যাওয়ার মুখে। সে সময় বুক বাজিয়ে বলা যেত, যে ফ্রন্টিয়ার করি। অনলাইন প্রেজেন্স-এর মাধ্যমে হয়তো কিছু লোকের কাছে ফ্রন্টিয়ারের একটা পরিচিতি আছে। কিন্তু নব্বই-এ ফ্রন্টিয়ার করার মধ্যে দিয়ে যে একটা স্পেস আইডেন্টিটি পাওয়া যেত, আজকে কি সেটা আর আছে?

তিমির বসু : সেই জায়গাটা আজ নেই।

আয়নানগর : তা সত্ত্বেও ফ্রন্টিয়ার চালিয়ে যাওয়া — এটা কি আপনার পার্সোনাল জেদ? জেদ কথাটা পজিটিভলি বলছি। আসলে আমরাও তো আজকের সময়ে যেভাবে পারি পত্রিকা করার চেষ্টা করছি? আপনার ইন্টার্ভিউ নিচ্ছি, সেটাও ঐ জায়গা থেকেই।

তিমির বসু : ফ্রন্টিয়ার আসলে একটা প্ল্যাটফর্মের রোল প্লে করেছিল। বিশেষ করে পার্টিজান কাগজগুলো এখনও এত ডগমাটিক, যে অনেকেই তাদের অনেক বক্তব্য সেখানে পেশ করতেও পারে না। সেই জায়গাটা আমরা তাদের দিতে পেরেছিলাম। সৌরীন বোসরা যে চীনে গেছিল, তার প্রতিবাদে কানু স্যান্যালরা জেল থেকে প্রথম যে লেখা লিখেছিল, সে তো ফ্রন্টিয়ারই প্রথম ছাপে। পার্টিজানরা তো ছাপত না ওটা। প্ল্যাটফর্মের রোলটা এখনও আছে। দরকার কিছু উৎসাহী ছেলের, উৎসাহী কর্মীর, যারা লেগেপড়ে থাকবে। আমরা যখন গ্রামে কাজ করতে যাই, একদম ব্যারেন একটা ব্যবস্থা। আজকে কি খাব, কালকে কি খাব, কিছু ঠিক নেই। তবু উৎসাহের তো অভাব হত না! আর এখন… তো যাই হোক, ফ্রন্টিয়ার সেই প্ল্যাটফর্মের জায়গাটা এখনও দিচ্ছে। যারা লেখক, তাদের মধ্যেও একটু চিন্তা করার দরকার আছে, যে টার্গেটটা কি।

এক সময় হল কি, ফ্রন্টিয়ার এশিয়ান মোড অফ প্রোডাকশন নিয়ে একটা ডিবেট শুরু করে দিল। একটা তাত্ত্বিক আলোচনা হল, পরে সেটা আবার থিতিয়ে গেল। এখনও যেটা হচ্ছে, যে অ্যামেরিকা-ইউরোপ থেকে যেভাবে পলিসিগুলো ঠিক করে দেওয়া হচ্ছে, সেগুলো প্রপারলি অ্যানালিসিস করে তো আর দেখা হয় না। বিপ্লবের চরিত্রও চেঞ্জ করে যাচ্ছে। মাওয়িস্টদের সঙ্গে ডিবেট করা বৃথা। তারা ডগম্যাটিক। অন্য যাঁরা লেফ্ট, তাঁরা ইকোয়ালি ডগম্যাটিক। তারা যে লাইনটা ধরে আছে, তার বাইরে ঢুকতে চায় না। এদের সবারই যেটা হয়েছে, আমার যেটা মনে হয়, তারা যদি একটু লিবারাল হতে পারত, তাহলে এখানে অন্তত একটা পলেমিক শুরু হতে পারত। সেই জায়গাটা কিন্তু আর স্টার্ট হচ্ছে না।

আয়নানগর : তাহলে ফ্রন্টিয়ারের পাঠক কারা? কার সাথে সে কমিউনিকেট করবে?

তিমির বসু : যারা নন-পার্টিজান, পার্টিতে বিলং করে না, কিন্তু লেফটিস্ট, মার্ক্সিস্ট, বিশ্বাস করে যে মার্ক্সবাদের ভিতর দিয়েই পরিবর্তন আসবে। এদেরই জন্য ফ্রন্টিয়ার চলছে।

লেফ্ট গ্রুপ ফ্রন্টিয়ার পড়তে চায় না বলাটা ভুল হবে। কিন্তু এদের লিডারশিপের মধ্যে এই ব্যাপারটা তৈরি হয়েছে, যে তারা চায় না গ্রুপগুলো পলেমিক্সের মধ্যে জড়িয়ে পড়ুক। তারা পার্টির যে লাইন, তার বাইরে কিছু আলোচনা করতে চায় না। দ্যাখো মাওবাদীরা চাক বা না চাক, আমরা তো ইন্টারভেন করছি। তাদের অ্যাক্টিভিটিগুলো সাপোর্ট করছি, যেখানে পুলিশ তাদের রিপ্রেশন করছে। আদিবাসীদের এভিকশন — এগুলোর বিরুদ্ধে লিখছি। গত বছর অব্দিও আমি দেখেছি আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে লিফলেট বা স্টেটমেন্ট আসছে। স্টেটমেন্ট ছেপেওছি আমরা। তাতে কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু এই ডগম্যাটিক পরিমণ্ডলটা চেঞ্জ হওয়া দরকার। এটা না হলে আন্ডারগ্রাউন্ড বা ওভারগ্রাউন্ড, যেখানেই যারা কাজ করছে, কেউ কিছু এগোতে পারছে না। মিটিং হচ্ছে, পার্টি কংগ্রেস হচ্ছে, কিন্তু আর খুব কিছু এগোচ্ছে না।

আয়নানগর : আর দু-তিনটে প্রশ্ন করব। প্রথমটা, এডিটর সমর সেন আর কবি সমর সেন — এঁদের মধ্যে কি কোনো কনট্র্যাডিকশন হত?

তিমির বসু : আসলে উনি যে কবি, সেটা নিয়ে আমি কখনও আলোচনা করিনি। ওঁর কবিতাও আমি খুব কম পড়েছি। যখন পড়েছি, তখন বয়েসও কম ছিল, অতটা বুঝিওনি। তবে আমার যেটা মনে হয়েছে, ওঁর বরাবরই একটা ভাবনা ছিল, যেহেতু তিনি কোনো পার্টির সাথে যুক্ত হতে পারছেন না, তাঁর অ্যাক্টিভিটি মাস-এর মধ্যে করা সম্ভব হচ্ছে না। এইসব মিলিয়ে যে হেজিটেশন, সেটা কবিতা দিয়ে কাটানো সম্ভব নয়। তাই ফ্রন্টিয়ার করার তাগিদও এই জায়গায়। যে অ্যাটলিস্ট কিছু লোকের কাছে তো আমরা পৌঁছতে পারছি, যারা সমর সেন কি লিখেছে, সেটা পড়ছে। এটা কবিতা দিয়ে করা যায় না। এই কথাটা উনি ইন্টার্ভিউতেও বলেছেন, যে কবিতা করে কিস্যু হয় না। আমাকে বলতেন — বেশি লোকের কাছে তো পৌঁছতে পারব না, কিন্তু কিছু লোকের কাছে তো পারব? এটা ফ্রন্টিয়ার করে হয়।

সমর সেন

আয়নানগর : আপনি তো গোটা জীবনটা ফ্রন্টিয়ার করে গেলেন। রাজনীতি আর ফ্রন্টিয়ার। একটা ছোট কাগজ। কোনোরকমে টিকে আছে। তো এইটা করতে গিয়ে, অনেকের যেমন ব্যক্তিগত পারিবারিক জায়গা থেকে আপত্তি আসে, আপনার কি এসেছিল? নানান অসুবিধা। আর্থিক অসুবিধাও এক অর্থে। সেটা কীভাবে দেখেছেন?

তিমির বসু : আমার পারিবারিক সাপোর্টটা ভীষণ ভাবেই পেয়েছি। আমায় পরিবারের দেখাশুনো করতে হয়নি — তাই সেল্ফ-এমপ্লয়েড হোল-টাইমার হয়ে থেকে যেতে পেরেছি। আমি যে দায়িত্ব পালন সেইভাবে করলাম না, তাই নিয়ে কারুর কোনো অভিযোগও নেই। ইকোনমিক রেস্পন্সিবিলিটি নিয়ে আমায় ভাবতে হয়নি। সেটা একটা বড় সুবিধার জায়গা। তাছাড়াও আত্মীয়স্বজনরা অনেক ভাবে সাহায্য করেছেন, যাতে আমি এই কাজগুলো করতে পারি।

আয়নানগর : সমর সেন বেঁচে থাকাকালীন ফ্রন্টিয়ার কেন স্মল কাগজ হয়েই থেকে গেল? সমর সেনও তো একটা বড় নাম। এটা তো ইপিডব্লিউ-র মত একটা বড় হাউজ হয়ে উঠতে পারত? আপনিও পরে চেষ্টা করলেন না। কেন?

তিমির বসু : এটা আমি সমরবাবুর থেকেই নিয়েছি। সমরবাবুর কাছে এরকম প্রোপোজাল অনেক এসেছে। ঝাঁ চকচকে বড় অফিস হবে, সবাই ভালো মাইনে পাবে। উনি এটা শুনলেই ভয়ে আঁতকে উঠতেন। একবার তো অনেকে মিলে নাছোড়বান্দা। তখন আমায় এই কথাটা বললেন, যে আমরা যে টিকে গেছি, সে আমরা এত বিশাল করে কিছু ভাবিনি বলেই। বিশাল করে তুললে প্রথম-প্রথম হয়তো ভালই চলবে। তারপরে কিন্তু – ফ্রন্টিয়ার যে ধরনের কাগজ – পাত্তাড়ি গুটিয়ে তালাবন্ধ করে চলে যাওয়া ছাড়া আর কিছু করার থাকবে না। এটা আমারও মনে হয়েছে। যদি বিগ স্কেলে চেষ্টা করতাম, বেশিদিন চলত না। ফ্রন্টিয়ার যে পঞ্চাশ বছর টিকে গেল, তার কারণ, ফ্রন্টিয়ার স্মল স্কেল।

আয়নানগর : কিন্তু অনেকে তো বিগ হয়েছে। মান্থলি রিভিউ, কর্নারস্টোন পাব্লিকেশন… বিগ বলতে আনন্দবাজার হতে বলছি না। ফ্রন্টিয়ারের এই সিদ্ধান্তের পিছনে কি কোনো ফিলোজফিকাল, পলিটিকাল কারণ ছিল? যে বড় মানেই সমস্যা?

তিমির বসু : আমাদের এটা খানিকটা রাজনৈতিক এবং ফিলোজফিকাল অবস্থানও বলা যেতে পারে। সমরবাবু বেঁচে থাকাকালীন একটা ঘটনা – ফ্রন্টিয়ার হয়তো দিল্লিতে চলে যেত। ওখানে অফিস হয়ে যেত, ভালো ফান্ডের ব্যবস্থাও হত। কিন্তু ফ্রন্টিয়ার আর ফ্রন্টিয়ার থাকত না। তার যে চরিত্র, সেটা থাকত না। ‘একটু কালার, একটু পাঁচমিশেলি — এসব না করলে চলবে না’ — এই কথাগুলো এসে পড়ত। বিগ হাউজ করা মানেই সেখানে তো একা সমর সেন বা তিমির বসুর ব্যাপার থাকবে না। যারা আসবে, তাদের রুচিবোধেরও ব্যাপার থাকবে। তাই সমরবাবুও এটা মনে করতেন, আমিও করি, যে বিগ হতে গেলে তার কিছু খেসারত দিতে হবে। ফ্রন্টিয়ার ইপিডব্লিউ-এর চাইতেও কালারফুল একটা ম্যাগাজিন হতে পারত। দেশে বিদেশে অনেক বেশি ইনভল্ভমেন্ট হতে পারত। কিন্তু পলিসিগত ভাবে তার বদল হত। এখন যেমন আমরা পুলিশের রিপ্রেশনকে কনডেম করছি। সেক্ষেত্রে হয়তো একটা কোয়ালিফায়েড কনডেম ছাপতে হত। বা ইপিডব্লিউ-র মত অ্যাকাডেমিক হতে হত। অর্থাৎ, শুধু মার্কেট বা স্টেটের সাথে নয়, আরও অনেককিছুর সাথে কম্প্রোমাইজ করে এগোতে হত।

আসলে বিশেষ করে ‘নাও’ থেকে বেরিয়ে আসার পর এটাই ছিল একটা জায়গা, যেখানে সমরবাবুকে কারুর কাছে কৈফিয়ত দিতে হত না। একটা কথা বলতেন, যে খুব বেশি কম্প্রোমাইজ করবেন না। যদি দেখেন বেশি কম্প্রোমাইজ করতে হচ্ছে, বা না করলে চলা যাচ্ছে না, তাহলে বন্ধ করে দেবেন। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে আমি আর কি করি? বেশি বড় কিছু ভাবতে গেলে একটা আতঙ্ক সবসময় এসেই যায়।

আয়নানগর : আজকের সময়ে মিডিয়ার যেভাবে কর্পোরেট ওনারশিপ তৈরি হয়ে গেছে, তাতে আজকে ফ্রন্টিয়ার বা অন্য নন-মেইনস্ট্রিম নিউজ ফোরামের প্রয়োজনীয়তা যে অনেকগুণ বেড়ে গেছে, এটা কি আপনার মনে হয়?

তিমির বসু : সবসময় মনে হয়। আমাদের সময় কাগজগুলো এই ভাবে খয়ের খাঁ-গিরি করত না। আমরা বলতাম বটে, মাঝে মাঝে বিড়লা-গোয়েঙ্কাদের হয়ে লেখে। কিন্তু আজ যেভাবে আম্বানি-আদানিকে ব্যাক করা হচ্ছে, সুপ্রিম কোর্টের একটা অ্যাডভার্স জাজমেন্টকে ব্যাক করা হচ্ছে শুধুমাত্র এই কারণে, যে তাতে মোদীদের ইন্টারেস্ট আছে — এটা কিন্তু হত না। যে কাগজগুলোর একটু-একটু ইন্ডিপেন্ডেন্ট মালিকানা ছিল, তারা একসময় কিন্তু অনেক সময় ভালো রিপোর্ট বার করেছে। এখন বিজ্ঞাপন বন্ধ হয়ে যাবে, সেই ভয়ে এরকমটা আর করেই না কেউ। হয় কর্পোরেট নিজেই মালিক, নয় এমন ভাবে বিজ্ঞাপন দেয়, যে তার গোলাম হয়ে থাকতে হয়। তাই হ্যাঁ, আজকে দরকারটা তো অনেক বেশি বটেই। আর নয়তো ঐ পুলিশ ভার্শনই ছাপা হবে। অসীম মুখার্জি আনন্দবাজারে কাজ করত। বলত – আমাকে কিছু করতে হয় না। অফিসে যাই, গিয়ে লালবাজারের ট্র্যাফিক ডিপার্টমেন্ট-এ ফোন করি। জিজ্ঞেস করি, যে আজকে কোথায় কোথায় অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে? কটা লোক মারা গেছে? ওরা বলে, আর আমি ওগুলো লিখে দিয়ে চলে আসি। এখনও তাই – যত এনকাউন্টার কিলিং-এর রিপোর্ট – সব পুলিশ ভার্শন।

আয়নানগর : আপনার পরে ফ্রন্টিয়ার কি দাঁড়াবে, সেটা নিয়ে কি ভেবেছেন?

তিমির বসু : ভাবি তো। চেষ্টাও করি। এখনও হাল ছাড়িনি। কিন্তু সাহসের এত অভাব — এটা তো আমি বুঝে পাই না। সাহসী ছেলেই খুঁজে পাচ্ছি না। বললাম তো, সমরবাবু যখন আমায় ফ্রন্টিয়ার দিয়ে গেছিলেন, একটা কানাকড়িও দিয়ে যাননি, বরং ব্যাঙ্কে ওভারড্রাফ্ট হয়ে পড়ে ছিল। সাহস করে এগোতে তো হবে! আমি কিন্তু দেখেছি, রিস্ক নিলে কিছুটা অসুবিধা হয়তো হয়, কিন্তু ওয়ে-আউট একটা ঠিক বেরোয়। নাহলে আমি এতদিন চালালাম কি করে? রিস্কই তো নিয়েছিলাম। আমরা যখন রাজনীতি করছিলাম, সেটাও রিস্ক ছিল। এত অনিশ্চয়তার মধ্যে, এত কম রাজনীতি পড়ে এবং বুঝে আমরা যে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম, এটা এখন ভাবলে তো অবাকই লাগে। এখন তো এই বয়েসে সেসব আর ভাবতেই পারি না। আমি তো দু’বার মরতে মরতে বেঁচে গেছি। একবার পুলিশের হাতে, আরেকবার সিপিএম-এর মস্তানদের হাতে। এখন ভাবি, সেসময় কত কম জানতাম। সামান্য কিছু রাজনৈতিক কথা শিখেছি মাত্র। চীন থেকে কিছু বইপত্র এসেছে — পড়েছি। এর উপর ভিত্তি করেই লাফিয়ে পড়েছিলাম। আমার যারা বন্ধু ছিল — জিএসআই-তে চাকরি করেছে, অনেকে মারাও গেছে এখন। কিন্তু এই কাজগুলো করতে গিয়ে আমি যে স্যাটিসফ্যাকশনটা পেয়েছি, তারা হয়তো পায়নি। এটা একটা আলাদা ব্যাপার।

আয়নানগর : আপনার উত্তরাধিকার নিয়ে একটা আনসার্টেনিটি থেকেই যাচ্ছে?

তিমির বসু : পার্মানেন্ট উত্তরাধিকার এখনও সেভাবে তৈরি হয়নি। চেষ্টা করে যাচ্ছি। আরেকটা জিনিসও আছে। আমরা সেভাবে কিন্তু অরগ্যানাইজড এফোর্টও দিতে পারছি না। এভাবে পৌঁছতে গেলে যেটা দেওয়া প্রয়োজন। ধরো কেউ আমাকে এসে বলল, যে সে বেহালায় থাকে, কাগজ পায় না। সে তো পাওয়া যাবেই না! হকাররা যাবে না ওদিকে। এরকম যারা বলে তারা তত ভেটারেন না কিন্তু, মিডল এজ।

আয়নানগর : একটা শেষ প্রশ্ন। নকশালবাড়ির পঞ্চাশ বছর, রুশ বিপ্লবের একশ বছর , চীন বিপ্লবের সত্তর বছর, তার ভিতর বিশ্বায়নের গল্প। এইসবের পরিপ্রেক্ষিতে আজকের দিনে দাঁড়িয়ে এবং সাইমালটেনিয়াসলি ফ্রন্টিয়ারের সাথে সাথে যে আরও বহু গ্রুপ, পত্রপত্রিকা কাজ করেছে, তাদেরকে মাথায় রেখে , আজকের বামপন্থাকে আপনার কি মনে হয়? কতটা আশাবাদী?

তিমির বসু : বামপন্থার সেটব্যাকটা শুরু হয়েছে অনেকদিন থেকেই। ১৯৬৮-৭০ অব্দিও একটা জায়গা ছিল। তার পরে কিন্তু আর সেটা থাকছে না। ভেঙ্গে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিটাও প্রচণ্ডভাবে বদলে যাচ্ছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাওয়া, চীনের রিভার্সাল, ইস্ট ইউরোপে কমিউনিজমের পতন – এইসব মিলিয়ে। স্তালিন আমল থেকে ই সোভিয়েত ইউনিয়ন ইউরোপে এই পতনের জন্য দায়ী। কম্যুনিস্ট পার্টির যারা নেতৃত্বে ছিল, তাদের ওখানকার বিজনেস ডীল করার জন্য এমনভাবে ইনভল্ভ করে দিত সোভিয়েত ইউনিয়ন, যে তারা আলটিমেটলি কোরাপ্ট হতে বাধ্য। ধরো ব্রিটেনের সাথে সোভিয়ে ত ইউনিয়নের একটা ট্রেড ডীল হবে , আর কম্যুনিস্ট পার্টি নাকি তার দায়িত্বে! এখানেও এসব হত। ধরো ইমপোর্ট-এক্সপোর্ট-এর বি জনেস — সেখানে অনেক ভারতীয় মার্ক্সবাদীরা মাতব্বরি করছে। টাকা দিয়ে নষ্ট করে দেওয়াটা বামপন্থার সেটব্যাকের পিছনে একটা বড় কারণ ছিল, যেটা এখনও রয়েছে। এদেশ থেকেও তো কম্যুনিস্ট পার্টির নেতাদের রাশিয়ায় নিয়ে যাওয়া, তাদের চাকরি দেওয়া, ডাক্তারি পড়ানো — কতজনের কত কিছু হল! বিজনেস ডীলের সাথে যে পার্টি এই স্তরে যুক্ত, সেই পার্টি আর কতদূর যাবে?

তবে আমার মতে, এই পরিস্থিতিও চেঞ্জ হতে বাধ্য। ইতিহাস তো আমরা অস্বীকার করতে পারব না।

2 thoughts on “ফ্রন্টিয়ার-এর সম্পাদক তিমির বসুর সাথে কথোপকথন

  1. অভিনন্দন! এই সময়ে তিমির বাবুর সাক্ষাৎকার তুলে ধরল দক্ষিণপন্থার রমরমা সময়েও কীভাবে স্ট্রাগল চালিয়ে যেতে হয়। হয়ত আয়নানগর‌ও চালাচ্ছে কিন্তু আরও ব্যাপক হতে হবে। ফ্রন্টিয়ারের উত্তরাধিকার দরকার।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s