প্রতিবাদের স্বর । দেবী প্রসাদ মিশ্রর কবিতা । ভাষান্তর – অমর্ত্য বন্দ্যোপাধ্যায়

এই সময়ে, কবি ও কবিতার উপর রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস নেমে আসার সময়ে, দেশ ও দেশবাসীর উপর রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস নেমে আসার সময়ে দাঁড়িয়ে কিছু কবিতা, কিছু প্রতিবাদের স্বর। চতুর্থ কিস্তি – দেবী প্রসাদ মিশ্রর কবিতা। ভাষান্তর – অমর্ত্য বন্দ্যোপাধ্যায়।

রাজা হুকুম দিলেন

রাজা হুকুম দিলেন ᱺ বলা বারণ
কেননা লোকে বললে রাজার বিরুদ্ধেই বলে

রাজা হুকুম দিলেন ᱺ লেখা বারণ
কেননা লোকে লিখলে রাজার বিরুদ্ধেই লেখে

রাজা হুকুম দিলেন ᱺ চলা বারণ
কেননা লোকে চললে রাজার বিরুদ্ধেই চলে

রাজা হুকুম দিলেন ᱺ হাসা বারণ
কেননা লোকে হাসলে রাজার বিরুদ্ধেই হাসে

রাজা হুকুম দিলেন ᱺ বাঁচা বারণ
কেননা লোকে বাঁচলে রাজার বিরুদ্ধেই বাঁচে

আর এভাবেই রাজার হুকুমেরা আমাদের
ছোট্ট ছোট্ট অভ্যেসের মর্ম বুঝতে শেখাল

(‘রাজা নে আদেশ দিয়া’)

দেহ

দেহ ভালবাসার কাজে লাগে
যন্ত্রণা দিতে আর সহ্য করতে লাগে

পিটিয়ে, পুড়িয়ে
আত্মাকে নষ্ট করতে চেয়ে
রাজ্য আর ধর্ম বারবার
দেহের দখল নেয়

বাজারও এই কাজই করে
দেহকে এত চটকদার করে তোলে
যে তা পণ্য হয়ে ওঠে

অসীম দুঃখের বদলে
অনন্ত সুখের ভেতর মরে যায় আত্মা

(‘দেহ’)

অমরত্ব

খুব বেশি হলে আর বিশবছর বাঁচব আমি
আমার কবিতাগুলো কতদিন বাঁচবে ঠিক বলা যাচ্ছে না
হতে পারে ওরা আমার আগেই মরে গেল
আর একনায়কদের নাম
শুধু এজন্যই অমর হয়ে থাকল যে
তাঁরা নিয়ন্ত্রণের কতই না কৌশল আবিষ্কার করেছেন

তা আবিষ্কার অবশ্য আমিও এক-আধটা করেছি, যেমনᱺ

মানুষের কাছাকাছি পৌঁছোনোর টিকিট
কোন কাউন্টারে পাওয়া যায়

একজন ভুলে যাওয়া কবির জায়গা
একজন অবিস্মরণীয় শাসকের চেয়ে অনেক উঁচুতে

আর অমরত্বের অনন্ততা
এক জীবনের থেকে বড় নয়

(‘অমরতা’)

বুঝে নাও মানুষ মারার অর্থটা কী

যদি নাই ঝরল তবে রক্ত কীসে
তে’মাথায় খুনোখুনির অর্থটা কী

যদি ঠোঁট রক্ত মেখে সাজল গোলাপ
বুঝে নাও ইরাক কী আর সিরিয়া কী

যদি খুন করলে গরু যাবজ্জীবন
বুঝে নাও মানুষ মারার অর্থটা কী

নাগরিক পয়দা করেই হামবড়া ভাব
এত যুগ পেরিয়ে এলে, করলেটা কী

যদি চাও ধর্ম-জাতের জানতে ওষুধ
শুনে নাও আমার জখম টাটকা আজও

আমার এই স্বপ্নে গরু হজম করা
হিঁদুটার ইচ্ছেগুলোর হচ্ছেটা কী

যদি খুন করতে হলই মানুষটাকে
তবে তার কারণ বলার ধরনটা কী

(‘তো সোচ লো কে আদমি কো মারনা ক্যা হ্যায়’)

(লেখাটির সঙ্গে কৈফিয়ত হিসেবে দেবী প্রসাদ যা লিখেছেন, তাঁর বাংলা করলে দাঁড়ায়, ‘ভাঙাচোরার জন্য গালিব মিঞা-র কাছে ক্ষমা চেয়ে নিয়ে’। বলাই বাহুল্য, গালিবের একটি শের-এর আদল নিয়েই লেখাটি গড়ে উঠেছে। সেই গতিময়তাকে ধরতে চেয়েই ঠিক ছন্দ নয়, খানিকটা তালের আশ্রয় নেওয়া। এটুকু এই অনুবাদপ্রয়াসীর কৈফিয়ত)

ভুখা মানুষকে না খাওয়ানোর সিদ্ধান্ত

গোরক্ষা গ্রাস সমিতির গাড়ি গরুর খাবার নিয়ে অপেক্ষা করছিল। গরুগুলোকে আশেপাশে দেখা যাচ্ছিল না। তারা দূরে কোথাও চরে বেড়াচ্ছিল। অগত্যা লোকজন গোরক্ষা সমিতির গাড়িটাকে ঘিরে দাঁড়াল।

ওরা লজ্জা পাচ্ছিল, কেননা ওরা ভুখা, ওরা মানুষ। ওরা আবেদন জানাচ্ছিল যেন গরুর জন্য আনা খাবারগুলো ওদেরই খেতে দেওয়া হয়। কিন্তু গাড়িতে বসে থাকা কর্মকর্তারা বললেন যে গরুর খাবার মানুষকে দেওয়া যাবে না।

তাঁরা এও জানালেন যে এখনও পর্যন্ত মানবরক্ষা গ্রাস সমিতি গঠন করা হয়নি এবং ক্ষুধার্ত গরুর খাবার ভুখা মানুষকে খাওয়ানোর সিদ্ধান্ত হিন্দুত্বের ক্যাবিনেট মিটিংয়ে গৃহীত হয়নি।

(‘ভুখে মনুষ্য কো ন খিলানে কা ফয়সলা’)

মুসলমান হওয়ার, এবং ফলত হিন্দু হওয়ার কিছু অসুবিধে তো আছেই

সেদিন অরল্যান্ডোতে
উমর সাদিক মতীন নামে একজন
অনেক মানুষকে খুন করে ফেলার পরেই
আমাদের অফিসের নোমান খান
হঠাৎ করেই যেন ক্ষমাপ্রার্থী হয়ে পড়লেন

যেন এতে ওঁরও কোনও হাত আছে
যেন সমস্ত ইসলামী রাষ্ট্রে গণতন্ত্রের অপমৃত্যুর
কোনও না কোনও দায় ওঁর ওপরেও বর্তায়
যেন নাইজিরিয়ায় বোকোহারামের বর্বরতাকে
উনি প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখেন

আজকাল যেকোনও সন্ত্রাসবাদী হামলার পরেই
ওঁকে খুব অনুতপ্ত দেখায়

ছোট্ট একটা তেরঙা পতাকা উনি
সাজিয়ে রেখেছেন টেবিলে, ফেসবুকেও

আমি মজা করে বলি
আপনি এই পতাকার জোরে
বেশি ভারতীয় হয়ে উঠতে চান

উনি শূন্য দৃষ্টিতে তাকান, বলেন∶
আজকের দিনে
মুসলমান হওয়ার কিছু অসুবিধে তো আছেই

আমি বলি∶ সে তো সব যুগেই ছিল
মানে এই ধরুন মুসলমান হওয়ার অসুবিধে
বা খ্রীষ্টান হওয়ার অসুবিধে
বা ইহুদি হওয়ার অসুবিধে

আমি বলি∶ যুগ যুগ ধরে
বেশি হিন্দু হতে গিয়ে
কম মানুষ হয়ে পড়ার
অসুবিধেও তো আছে

আমি প্রস্তাব করি
শুধুমাত্র মানুষ হওয়ার
গুটিকতক অসুবিধে নিয়ে
আমরা পরে কখনও কথা বলব

(‘মুসলমান হোনে মে ইসলিয়ে হিন্দু হোনে মে থোড়ি দিক্কত তো হ্যায়’)

সংকেত

কোনও বড়সড় দুর্ঘটনার
কবলে পড়তে চলেছে
এই শহর

এখানে দেবতারা
গুনতিতে বেড়েই চলেছেন

(‘সংকেত’)

দেবী প্রসাদ মিশ্র হিন্দি ভাষার কবি – উত্তর প্রদেশ নিবাসী। কবিতার গঠনশৈলী নিয়ে তিনি নানান পরীক্ষানিরীক্ষা করেছেন। ‘প্রার্থনা কে শিল্প মে নহি’ (১৯৮৯) বা ‘প্রার্থনার ভঙ্গিতে না’ তাঁর প্রকাশিত একমাত্র কাব্য সংকলন, যদিও তাঁর কবিতা ও ছোট গল্প বহু পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়ে চলেছে, ইংরিজি ও মারাঠিতে অনূদিতও হয়েছে। তিনি ভারত ভূষণ সম্মান, সংস্কৃতি সম্মান, শরদ বিল্লোরায় সম্মান প্রভৃতি সম্মাননা পেয়েছেন। ইলাস্ট্রেটেড উইকলি থেকে তাঁকে ভারতের ১৩ জন সবচাইতে সৃষ্টিশীল মানুষের মধ্যে একজন বলে সম্মানিত করা হয়েছিল। আমাদের জ্ঞাতানুসারে তাঁর কবিতা এই প্রথম বাংলায় অনূদিত করা হল।  

অমর্ত্য বন্দ্যোপাধ্যায় কবিতার একজন আগ্রহী পাঠক। তিনি একজন কবিতাপ্রয়াসীও। নানান বাংলা পত্রপত্রিকায় তাঁর লেখা প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর প্রকাশিত কবিতা সংকলন আকাশবৃত্তির ছায়া (যাপনচিত্র প্রকাশন, কলকাতা বইমেলা, ২০১৮)।

আরো পড়ুন: প্রতিবাদের স্বর । কিনফাম সিং নোঙকিনরিহ–এর কবিতা । ভাষান্তর – শুক্লা সিংহ

5 thoughts on “প্রতিবাদের স্বর । দেবী প্রসাদ মিশ্রর কবিতা । ভাষান্তর – অমর্ত্য বন্দ্যোপাধ্যায়

  1. Pingback: প্রতিবাদের স্বর । সুমিত চট্টোপাধ্যায় | aainanagar

  2. এত ভালো লেখা পড়ার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য আয়নানগর এবং অমর্ত্য বন্দ্যোপাধ্যায়কে ধন্যবাদ। ❤️

  3. প্রতিটা কবিতাই যেন তীর, কেন্দ্র লক্ষ্য করে ছুটছে…।
    অনুবাদ করে সমৃদ্ধ করলি অমর্ত্য। আগ্রহ বাড়ল…❤❤

  4. Pingback: প্রতিবাদের স্বর । কিনফাম সিং নোঙকিনরিহ–এর কবিতা । ভাষান্তর – শুক্লা সিংহ | aainanagar

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s