বিপ্লবের ভয়

শুভদীপ্ত বিশ্বাস

 

ভিড়টা কী আজ একটু বেশি? কে জানে! আজ কী সোমবার! সোমবারে ভিড়টা একটু বেশী লাগে। টানা ছদিন ভিড় ঠেলবার পর, রবিবারের ছুটি কাটিয়ে সোমবার সকালে প্ল্যাটফর্মে এসে দাঁড়ালে, ভিড়টা একটু বেশি মনে হয় বৈকি। টিকিট কাউণ্টারের উল্টোদিকে, বসবার  টুলটা উল্টো করে রেখে, শিকল দিয়ে সেলাইমেশিন টেবিলের সাথে বাঁধা। বুড়োটা আজও বসেনি। শরীর টরির খারাপ হল নাকি? দু নম্বর প্ল্যাটফর্মের ভাতের হোটেলের ছেলেটা এই প্ল্যাটফর্মে টিউবওয়েলে জল ভরতে এসেছে। দুই ব্যাগ ভর্তি প্লাস্টিকের বোতল। এক হাতে পাম্প করতে করতে অন্য হাতে গুটখার প্যাকেট মুখে ঢালে। জল যত না বোতলে পড়ে, বাইরে পড়ে তার চেয়ে বেশী। তানিয়ার বাবা রিটায়ার করার পর গোবরডাঙ্গা মিউনিসিপ্যালিটির এক্সিকিউটিভ অফিসার হয়েছে। এখন প্রতিদিন সাফারি স্যুট পরে অফিস যায়। আর এই সময় আপের দিকে ট্রেন তো ফাঁকাই থাকে, ডাউনে যেমন ভিড়ের চাপে নামতে গিয়ে জামার বোতাম ফোতাম ছিঁড়ে যায়, সেসব ঝামেলা নেই। মুচি ছেলেটা জুতো পালিশ করে এগিয়ে দেয়। তানিয়ার বাবা মোবাইল থেকে চোখ তুলে পা গলায় বাদামী লেদার শু-তে। সাতটা সাতচল্লিশ। অলরেডি দু মিনিট লেট। আজ বোধহয় কপালে ভোগান্তি আছে। যত লেট হবে, ভিড় তত বাড়বে। পরের মাঝেরহাটের প্যাসেঞ্জার আসতে শুরু করে দিয়েছে। ওভারব্রিজের নীচে লটারির দোকানটার সামনে ছোট জটলা। ছেলেটার ইউনিফর্মে কোম্পানির নাম লেখা। এখন বেশিরভাগ চাকরিতেই ইউনিফর্ম পরতে হয়। কে কোথায় কাজ করে, জামা দেখেই বোঝা যায়। ছেলেটা মানিব্যাগ থেকে ৫০০ টাকার নোট বের করে দেয় একটা। লটারির দোকানদার টিকিট খামে ভরতে ভরতে বলে, ‘বঙ্গলক্ষ্মীটা নিতে পারতে, ভাল নাম্বার ছিল, ৪৪২২,’ ছেলেটা বলে, ‘ আর টাকা নেই, মাসের আজ সবে…’ 

টিং টং। ‘ডাউন হাবরা লোকাল শিয়ালদহ যাওয়ার গাড়ী এক নাম্বার প্ল্যাটফর্মে আসছে।’ এখনও তো লেভেল ক্রসিং-এর গেটই পড়েনি। ট্রেন কোথায়? আসছে! আজ শাড়ি পরেছে। এখনও রোদ ওঠেনি, তাও সানগ্লাস। তার উপর আবার ছাতা। সামনের চুলটায় মনে হচ্ছে হাল্কা কালার করেছে। ফিগারটা মেন্টেন করেছে ভালো, সালোয়ার, শাড়ি যাই পরে মানিয়ে যায়। জিন্সে নিশ্চয় আরও ভালো লাগে। কী ডিও মাখে কে জানে, লেবু লেবু গন্ধটা হেবি। দু’নম্বর প্ল্যাটফর্ম থেকে লাফ দিয়ে নামার আগে, অস্থায়ী মন্দিরের সামনে দাঁড়িয়ে কপালে গেরুয়া টিকা লাগিয়ে নেয় ছেলেটা। হঠাৎ করেই এই মন্দিরটা হল। এর আগে ওখানে একটা বউ রুটি তরকারি নিয়ে বসত। সকালের দিকে ভালই তো বিক্রি হত। কেন যে হঠাৎ উঠে গেল কে জানে! মন্দিরের এখনও শেড হয়নি। কোনমতে চারটে বাঁশ পুঁতে প্লাস্টিকের ছাউনি করে হনুমানের একটা মূর্তি বসিয়ে দিয়েছে। ছেলেটা প্ল্যাটফর্ম থেকে নেমে দুই দিকের লাইনের মাঝে দাঁড়ায়। বুকপকেট থেকে বিড়ি বের করে ধরায়। ট্রেন আসলে লাফ দিয়ে অফসাইডে উঠবে। ঢুকছে ট্রেন। ভালোই ভিড় হবে মনে হচ্ছে। কোনোমতে একবার উঠতে পারলেই হল, ভিড়ের গুঁতোয় এমনিই ভেতরে ঢুকে যাবে। যমজ ভাইয়ের ছোট ভাই ব্যাগটা কাঁধ থেকে নামিয়ে হাতে ঝুলিয়ে নিয়ে দু’পা পিছিয়ে আসে। ও তো গেটে দাঁড়িয়ে যাবে— ওর পজিশন বাঁধা। বাপরে কী ভিড়! আজ সত্যি বোধহয় ভিড়টা বেশি। ‘আরে, নামতে দিন-নামতে দিন’ ‘উফ এই অফিস টাইমে এতবড় ব্যাগ নিয়ে কেউ ওঠে!’ ‘ঢুকুন, ঢুকুন— দাঁড়িয়ে থাকবেন না’ ‘আরেঃ উঠুন উঠুন— পিছনে আরও লোক আছে’ ‘কোথায় ঢুকব দাদা! পা রাখার জায়গা নেই— আর উনি বলছেন ঢুকুন!’ ‘ ‘আরে! গেটে লোক ঝুলছে তো!’ ‘আরে আরে আরে আমার চটি— উফ— আমার চটি— যাঃ!’

বিছানায় শুয়ে চোখটা হঠাৎ খুলে যায় বিপ্লবের। বাঁদিকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাতার আর গোপাকে তখনও ঘুমোতে দেখে স্বস্তি পায় খানিক। স্বপ্নের চিৎকারটা বাস্তবে শোনা গেলে মুশকিল হত। এরকম একটা স্বপ্ন শুনে গোপা নিশ্চয়ই মুখ বেঁকিয়ে হাসত। তাতারও বাদ যেত না। স্বপ্নের ভেতর ট্রেনে উঠতে গিয়ে, ভিড়ের ঠেলায় ক্যাবলা বাবার চটি খুলে প্ল্যাটফর্মে পড়ে যাওয়ার কথা শুনে যে কোন ছেলেই হাসবে। সক্কাল সক্কাল বউ ছেলের কাছে অপদস্থ না হবার ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হলেও, অন্য একটা চিন্তা বিপ্লবকে পেয়ে বসল। স্বপ্নে তার কোন পায়ের চটিটা খুলে গেল? বাঁ না ডান? বিছানায় উঠে বসে, সামনে ছড়ানো দু’পায়ের দিকেই সে তাকিয়ে থাকে খানিকক্ষণ। আঙ্গুলগুলো ভাঁজ করে, আবার খোলে। মশারি থেকে বেরিয়ে হাওয়াই চটি পরে বাথরুমে ঢুকতে ঢুকতে চোখ পড়ে দেওয়ালে ডিজিটাল ঘড়ির দিকে। ঠিক ২১ মিনিট পরে বেজে উঠবে গোপার অ্যালার্ম।

‘যেমন বাপ! তেমনি ছেলে! ভীতুর ডিম কোথাকার! বলছি তো, ককরোচ নেই ওখানে— যা— বইটা নিয়ে আয়— দেরি হয়ে যাচ্ছে কিন্তু তাতার— এবার কিন্তু আমি রেগে যাচ্ছি— যা বলছি!’ স্নান করতে করতে মা-ছেলের এইসব সংলাপ বিপ্লবের কর্ণগোচর হয় না বলেই, স্নান সেরে বাথরুম থেকে বেরিয়ে, ছেলের উপর মারমুখী স্ত্রীকে দেখে, খুব সহজাত ভাবেই সে প্রশ্ন করে বসে— ‘কী হয়েছে?’ মূল কথায় আসবার আগে গোপা যে বাক্যগুলো খরচ করে, তা প্রায়ই শুনে থাকে বলে, বিপ্লব খুব বেশী আহত হয় না। মানুষের মনের ভেতর কত না গ্লানি জমে থাকলে সামান্য অজুহাতেই সমস্ত পুরনো অভিযোগ কমাদাঁড়ি শুদ্ধু বারবার উগরে দিতে থাকে, বিপ্লব তা জানে না। সে এও জানেনা, যে ঠিক কী করলে গোপার এইসব অভিযোগের সুরাহা হয়। হয়তো বোঝে, কিন্তু কিছু করে উঠতে পারে না। আজ সকালের সমস্যাটার সমাধান অবশ্য সে-ই করে। গতকাল রাত থেকে তাতারের যে ইংরেজি টেক্সটবুকটা পাওয়া যাচ্ছিল না, সেটা আজ সকালে কোন অলীক উপায়ে খাটের নীচে আবিষ্কৃত হয়েছে। কিন্তু খাটের তলায় না ঢুকলে তাকে ওখান থেকে উদ্ধার করা যাচ্ছে না। তাতার আরশোলার ভয়ে খাটের তলায় ঢুকতে নারাজ। গোপা দৈহিক স্থূলতার কারণে সে কাজে অপারগ হওয়ায়, ঝুলঝাড়ু দিয়ে বেশ কয়েকবার চেষ্টা করে ফেল মেরে গেছে। অগত্যা বিপ্লবই কাজটা করে, এবং স্নানের পরেই খাটের তলায় ঢোকার কারণে, তার গায়ে মাথায় ঝুল লেগে যায়। ঝুলের মুকুট পরিহিত বিপ্লবকে ইংরেজি টেক্সটবুক হাতে খাটের তলা থেকে হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে আসতে দেখে, গোপা না হাসলেও তাতার অবলীলায় দাঁত বের করে দেয়।

হাসি কান্নায় পরিণত হতে কয়েক মুহুর্ত লাগে। কাঁদতে কাঁদতেই দুধের গেলাসটা শেষ করতে বাধ্য হয় তাতার। একহাতে ছেলে আর একহাতে ময়লার প্লাস্টিক নিয়ে, নাইটির উপর একটা ওড়না চাপিয়ে ক্ষিপ্র বেগে গোপা বেরোতেই স্কুলবাসের দ্বিতীয় হর্ন শুনতে পায় বিপ্লব। রোববারের বাসী চিকেন দিয়ে সে তখন রুটি খাচ্ছিল। পাশে খোলা খবরের কাগজে প্রথম পাতা জুড়ে বিজ্ঞাপন— মুখে তর্জনী রেখে কিং সাইজ নায়ক বলছেন— ‘নিঃশব্দে পৃষ্ঠা উল্টান আর বিপ্লবের সাক্ষী হয়ে যান!’ কৌতূহল ভরে পাতা উল্টা‌য় বিপ্লব। কিন্তু পরপর সব কটা পাতা উল্টেও ঠাহর করতে পারে না, নায়ক ঠিক কোন বিপ্লবের কথা বলছেন। শেষে দ্বিতীয় পাতায়, নিঃশব্দে স্টার্ট হওয়া স্কুটারের বিজ্ঞাপনের বাকি অংশটা  আবিষ্কার করে। স্কুটার অবশ্য একটা কিনলে হয়। রোজ রোজ এই ভিড় ট্রেনে গুঁতোগুঁতি করে অফিস যাওয়া আর পোষায় না। গোপা অনেকদিন ধরেই বলছে, কিন্তু মা’র বারণ অমান্য করে সাহস করতে পারেনি বিপ্লব। এক জ্যোতিষী নাকি মাকে বলেছে, গাড়িতে তাঁর ছেলের ফাঁড়া আছে। ছেলেকে স্কুলবাসে আর ময়লার প্লাস্টিক সামনের পুকুরে চালান করে গোপা যখন ফিরছে, তখন বিপ্লব প্রায় রেডি, শুধু পায়ে চামড়ার চটি গলিয়ে বেরোনোর অপেক্ষায়। গোপা বেসিনে গিয়ে হাত ধুতে ধুতে তার দিকে না তাকিয়েই বলে— ‘আসবার সময় কর্নফ্লেক্স আর চীজ নিয়ে এসো।’ একটা টকগোলা ঢেঁকুর তুলতে তুলতে ‘আচ্ছা’ বলে বেরিয়ে আসে বিপ্লব।

‘বিপ্লব দীর্ঘজীবি হোক’— দেওয়ালের লেখাটা ঝাপসা হতে হতে এখনও একটু রয়ে গেছে। আরেকটা বর্ষা গেলেই বোধহয় আর থাকবে না। সেই দেওয়ালের সামনে ডাঁই করা গৃহস্থের আবর্জনার স্তূপ জমতে জমতে রাস্তায় চলে এসেছে। আবর্জনা বাঁচিয়ে পা ফেলতে গিয়ে, আচমকাই একটা হোঁচট খায় বিপ্লব। ওই হোঁচটের ব্যথার কারণেই হোক বা গত রাতের স্বপ্নের কারণেই হোক, ট্রেন ঢোকার মুহূর্তে বারবার পায়ের আঙ্গুলগুলো দিয়ে চটিটাকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে সে। বাস্তবে অবশ্য স্বপ্নের প্রায় উল্টোটাই হয়। ভিড় আজ একটু কম। অন্যদিন ভিড় ঠেলে ভিতরের গেট অব্দিই পৌঁছোন যায় না, আজ ভেতরে ঢুকে দু’ধারের সীটের মাঝখানে দাঁড়ানো গেল। বগির এই সাইডটাতে তাস খেলে না কেউ। দু জন ঝিমোচ্ছে আর বাকিরা মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত। জানলার ধারে বসা ছেলেটি নতুন স্নিকার্স কিনেছে। অনেকদিন ধরে তক্কে তক্কে ছিল। গত শুক্রবার দেখল, অফারে ফ্ল্যাট ৫৫% অফ দিচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে অনলাইন অর্ডার করে দিয়েছে। ২০৬৯ পড়েছে। আসল দাম ৪৫৯৯। সাদার উপর কালো ছোপছোপ জুতোটায় চারদিকে লাল রঙের বর্ডার। তলার সোলটায় অনেকগুলো ছোট ছোট ত্রিভুজ কাটা। ওর পাশে বসা ছেলেটির সাথে সাথে, সামনে দাঁড়ানো বিপ্লবও ভাল করে জুতোটা জরিপ করে। বিপ্লব পা ঢাকা জুতো পরতে পারে না। কীরকম যেন অস্বস্তি হয়। খানিকক্ষণ পরে থাকলেই কেমন দমবন্ধ লাগে। তার উপর পা ঘেমে গিয়ে, জুতো খোলার পরেই পা থেকে এমন গন্ধ বের হয়, লজ্জায় মাথা কাটা যায়। এই নিয়ে গোপার সাথে কম গণ্ডগোল হয়নি। বিয়ের তত্ত্বে ওদের বাড়ী থেকে এরকম একটা জুতো দিয়েছিল। বিপ্লব দু’তিনদিনের বেশি সেটা পরেনি। পড়ে থেকে থেকে জুতোটা একসময় নষ্ট হয়ে যায়। ঝগড়া হলে এখনও গোপা সেই জুতোর খোঁটা দেয়— ‘আমার বাবার দেওয়া কোন জিনিসই তো তোমার পছন্দ নয়। সেই জুতোটা…’। এখন অবশ্য ছেলেটার জুতোটা দেখে বিপ্লবের গোপার কথা নয়, ভোরের স্বপ্নের কথাটা মনে হল। ভোরের স্বপ্ন নাকি সত্যি হয়! এরকম একটা জুতো পায়ে থাকলে তো, যতই ভিড় হোক, খুলে পড়ে যাবার কোন চান্স নেই।

‘সাত নম্বরটা কিন্তু আপনার পায়ে বড় হবে— ছ নম্বরটাই ঠিক হবে— এখন একটু টাইট লাগছে, কিন্তু ক’দিন পরলেই ঠিক হয়ে যাবে’— ছেলেটার কালো মুখে বসন্তের ক্ষত। লাল রঙের ইউনিফর্ম পরে, বিপ্লবের স্নিকার্স পরা ডান পায়ের কাছে বসে আছে সে। সারাদিন ধরে অনেক ভেবেছে বিপ্লব। এমনকি যে জিনিস পারতপক্ষে সে ব্যবহার করে না, সেই মোবাইল অ্যাপে অনেকক্ষণ ধরে জুতো নিয়ে রিসার্চও করেছে। সেইসময়ই ইউনিয়নের সেক্রেটারি শঙ্করদা এল। বলতে এসেছিল, ‘কালীপুজোর আগে ব্যাঙ্ক স্ট্রাইক হবেই। দেশের অর্থনীতির অবস্থা সুবিধের নয়, এখনই যদি প্রতিরোধ না করা যায়, এরপর ব্যাঙ্কগুলো মার্জ হয়ে গেলে কত লোকের যে চাকরি যাবে, ইয়ত্তা নেই। অলরেডি জেট এয়ারওয়েজ ডুবেছে, বিএসএনএল, এয়ার ইন্ডিয়া ঝাঁপ ফেলার মুখে।’  বিপ্লব একবার ভাবে বলবে, ‘সরকার তো বলছে, এতে কারো চাকরি যাবে না, এতে বরং দেশের অর্থনীতি আরও চাঙ্গা হবে’, কিন্তু বলে উঠতে পারে না। উল্টে শঙ্করদা বিকেলের মিটিং-এ যাবার কথা বললে, সে ঘাড় কাত করে সম্মতি জানায়। মিটিং-এ বক্তৃতা শুনতে শুনতেই বিপ্লব সিদ্ধান্ত নেয়, নতুন জুতো সে একজোড়া কিনবেই। দিনকাল পাল্টাচ্ছে— সময়ের সাথে সাথে নিজেকে না বদলালে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে হবে। স্কুটার কিনতে না পারুক, একটা জুতো তো সে নিজের জন্য কিনতেই পারে। সেই জুতো কিনতেই অফিস ফেরত সে সোজা চলে এসেছে এই দোকানে। গোপা কি বলবে, সেটা যে একেবারে ভাবেনি তা নয়, কিন্তু মনে মনে একটা যুক্তিও ঠিক করে রেখেছে— ‘আর নয় অন্যায়!’ দীর্ঘ নীরবতায় ছেলেটা বোধহয় একটু  অধৈর্যই হয়, ক্লান্ত মুখে একটা হাল্কা ব্যঙ্গের হাসি ফুটে ওঠে— ‘কী? পছন্দ হচ্ছে না?’ সুযোগটা ছাড়ে না বিপ্লব। গোপা, ব্রাঞ্চের ম্যানেজার, প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, শঙ্করদা, ট্রেনের সহযাত্রী, চারপাশের আরও কত লোকের কত ঠাট্টার যোগ্য জবাব সে দিয়ে উঠতে পারেনি, স্রেফ সুযোগ পায়নি বলে! সাহস করে বলে ওঠার সুযোগ। আজ তার বলার দিন। বদলা নেবার দিন। ‘কাস্টমারের সাথে কী ভাবে কথা বলতে হয় সেটাও শেখোনি?’ নিজের গলাটা যেন নিজের কাছেই অচেনা ঠেকে বিপ্লবের। হঠাৎ জেগে ওঠা কামের মত গোটা শরীরে একটা তীব্র শিরশিরানি বয়ে যায়। ছেলেটা কোনো উত্তর দেয় না। মাথা নীচু করে শোনে শুধু। দোকানের ম্যানেজার কাউন্টার থেকে ছুটে এসে মধ্যস্থতা করে, ছেলেটাকে ঠেলে ভেতরে পাঠিয়ে দেয়। তারপর নিজেই বিপ্লবের পা থেকে জুতো খুলে প্যাক করতে শুরু করে। হেসে জিগ্যেস করে ‘স্যর! কার্ডে পেমেন্ট করবেন, না ক্যাশে?’ ‘স্যর’ শব্দটায় যেন ইজাকুলেশন হয়। মানিব্যাগ খুলে কার্ড বের করে বিপ্লব। জুতোর প্লাস্টিকটা হাতে নিয়ে কাঁচের দরজা ঠেলে রাস্তায় বেরোতেই, গরম বাতাসের হল্কা গায়ে এসে লাগে। বিপ্লবের কিন্তু গরম লাগে না। সামনে উৎসব আসছে। সন্ধ্যের রাস্তায় দোকানে দোকানে মানুষের কেনাকাটার ঢল নেমেছে। দৃপ্ত পদক্ষেপে বিপ্লব মিশে যায় সেই বিকিকিনির ভিড়ে। 

শুভদীপ্ত বিশ্বাস চলচ্চিত্র সম্পাদনা নিয়ে শিক্ষালাভ করেছেন এস আর এফ টি আই, কোলকাতা থেকে। চলচ্চিত্র সম্পাদনার পাশাপাশি নিজ পরিচালনায় নির্মাণ করেছেন কয়েকটি তথ্যচিত্র এবং স্বল্প দৈর্ঘ্যের কাহিনীচিত্র। স্কুল জীবনে কাঁচা হাতের কবিতা লেখা দিয়ে শুরু করে, পরবর্তীতে নাটক, গল্প, চিত্রনাট্য লেখা। আগ্রহ, সামাজিক ভাবে তুচ্ছ,পীড়িত অথচ প্রতিদিন লড়ে যাওয়া মানুষের বর্ণময় জীবনকে দেখা, অনুভব করা। মাধ্যমের ভাষা এবং শৈলী নিয়ে স্বতস্ফূর্ত পরীক্ষা নিরীক্ষায় মেলে আনন্দ। আর্থিক বা অন্যান্য সঙ্গতির অভাবে সিনেমা না হতে পেরে কিছু গল্প লেখার অক্ষরেই থেকে যায় যেমন, কিছু কাহিনী ঝড়ের মত আসে, ঘোরের মধ্যে নিজেই নিজেকে লিখিয়ে নেয় অনুভবের দোয়াত উপুড় করে। কয়েকটি কবিতা অতীতে অখ্যাত দু’একটি স্বল্পায়ু সাহিত্য পত্রিকায় মুদ্রিত হলেও, গল্পের ক্ষেত্রে এটিই প্রথম।

  সঙ্গের ছবি – ইন্টারনেট থেকে

One thought on “বিপ্লবের ভয়

  1. Pingback: আয়নানগর অনলাইন গল্পসংখ্যা : ‘সংঘাত ঐক্য সংঘাত’ | aainanagar

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s