তরমুজ

মধুশ্রী বসু

 

প্রায় অন্ধকার মঞ্চ। অফ-সেন্টারে, ডানদিক ঘেঁষে, লাইটিং বার থেকে একটিমাত্র আলো মঞ্চের মাটিতে এক চতুর্ভুজ ক্ষেত্র কেটেছে। ক্ষেত্রের ধারগুলো যেন ভিজে ভিজে… স্যাঁতস্যাঁতে… তবু তাকেই ধরে নিতে হবে ঘর, কুঠুরি, বা কক্ষ… না, কুঠুরি বড় দম আঁটা। আচ্ছা ভালোনামে ডাকতে হলে, আলোর ঘর… বা… আলোককক্ষ। শুনতে কেমন? অবশ্য ভালো করে দেখলে অস্ফূট আলোর চারটি দেয়াল চোখে পড়ে বটে – ভূতুড়ে প্রহরীর মতো, চারকোণা ক্ষেত্রকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে।

আলোককক্ষের পিছনের দিককার দেয়াল ঘেঁষে আধা-আলোকিত এক পুরুষ শরীর। তার হাতদুটো ধীরে ধীরে উপরে উঠছে, যেন থাম বেয়ে। আসলে শূন্য বেয়েই, কিন্তু হাতের তালুতে, বাহুতে, পেশীতে বস্তুস্পর্শের অনুভব স্পষ্ট… আসলে শারীরিক অভিনয়ের কূটকৌশল। যান্ত্রিক ঝিঁঝিঁদের গান বাজছে আবহে। পুরুষ শরীরটির বিপরীতে ওই আলোর ঘেরাটোপের মধ্যেই রাখা একটি গোল টেবিল ল্যাম্প। তাতে জ্বলছে লাল আলো, যেন খোসা উপড়ে নেওয়া তরমুজ। তরমুজ কাটলে কেমন ঝিলমিল ঝিলমিল করে না? ঝিলমিল… খসখস… এদিকে পুরুষটির মুখ দেখা যায় না। কারণ মঞ্চে তার দাঁড়াবার জায়গাটিই এমন বেছে নেওয়া হয়েছে, যাতে মুখে আলো না ধরে। তবু সেই মুখের গোটা জায়গাটা জুড়ে যে অন্ধকার জমাট বেঁধে আছে, সেই অন্ধকারের নীচে আরো জমাট, আরো ওজনদার এক নতুন অন্ধকার পরিসীমা পাচ্ছে, ক্ষেত্রফলে বেড়ে উঠছে, খুলে যাচ্ছে গহ্বরমুখ…

অথবা, এক প্রায় অন্ধকার ঘর। সত্যি ঘর – শয়নকক্ষ, প্রসাধনকক্ষ, বিছানা, আলমারি। একটি মেয়ে বসে আছে আয়নার সামনে। ড্রেসিং টেবিলের বাঁদিকে সেই আগুনের পিণ্ড – গোল, তরমুজ-লাল আলো ছড়ানো ল্যাম্পটি… স্পন্দিত, মাংসল, প্রায় জীবন্ত। মেয়েটির চোখে অনিশ্চয়তা। ঠোঁটে অনিশ্চয়তা – অনিশ্চিত হাসি। হাসির ভিতর আরো কী যেন একটা আছে – নকল কিছু – একটা যন্ত্রণা… একটা কৃত্রিম মূর্খতা… ঘাড় হেলানো, মুখ একটুখানি পিছনে ফেরানো, যেন সে আয়নায় দেখতে পাচ্ছে, কেউ তাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরছে, আদর করছে। ঘাড় হেলে যাবার ফলে কিছু চুল এসে পড়ছে মেয়েটির বুকের উপর। একসময় তার শরীর সামান্য শক্ত হয়ে ওঠে। সরু সরু আঙুলগুলো এগিয়ে যায় ল্যাম্পের সুইচের দিকে, দানবের সর্বভেদী একচক্ষুকে নখের এক খোঁচায় নিভিয়ে দিতে… এদিকে ঠোঁটদুটি পরিচিত শব্দের ধ্বনিহীন উচ্চারণ করে… কী বলছে? “আমিও… তোমায়…” কী যেন?

আর কী!

দুটি পরস্পরলিপ্ত শরীর, মঞ্চের দুই বিচ্ছিন্ন প্রান্তে, ঘরের একান্তে, একই নাচ নাচছে। তারপর একসময় আলো নিভে যায়, আর কিছু দেখা যায় না।

কিন্তু শোনা যায়। অন্তরালে ফিসফিস, কখনো সমবেত, কখনো আগে পরে সিঙ্কোপেশনে: যা হবেই, তাকে পছন্দ যদি না-ও করে ওঠা যায়, লাভ ইট! উবাচ আইন, অসহায়তারও থাকে গাইডলাইন! বিগিনার্স বুক অন হাউ টু লাভ ইট: তাতে ভয় লাগে / প্রলয় লাগে / এনজয় লাগে / নিশ্চয় লাগে… ইটস আ ওয়ান ম্যান গেম! / বিশ্বাসে মিলায় প্রেম… ট্রেনে চড়ে যাচ্ছ দিল্লি / সহযাত্রীর খিল্লি / তোমার মতন মা গো আমার আছে এক ভাগ্নী / তাইতো তোমার সেল্ফ-টাইমের ভাগ নিই / হাতের বই বন্ধ করে, লাভ ইট…  চিংড়ি খেলে গা গোলাবে / এদিকে বস দিয়েছে চিংড়ি-পার্টি ক্যালকাটা ক্লাবে / বমি-চিংড়ির অমৃতস্বাদ – লাভ ইট… যদি বৃষ্টি নামে ঝাঁপিয়ে / ছাদ ধ্বসে যায় তামাম পাড়া কাঁপিয়ে / কাদাজলের সাধ্য কী তোমায় ছোঁবে / ইফ ইউ জাস্ট লাভ ইট! লাভ ইট! লাভ ইট!

সকালবেলাতেও ঝিঁঝিঁ ডাকে। একটি মেয়ে স্বপ্ন দেখছে।

সুকন্যার চোখ খুলে যায়। সে বোধহয় চেয়ারে বসে বসেই ঘুমিয়ে পড়েছিল। স্বপ্নে, কিছু অন্ধকার নিয়ন আলোর আউটলাইনে বাঁধা পড়েছিল, নেগেটিভ ছবির মতো। এখন তার ঘুম ভাঙা চোখ দ্রুত ঘোরে, দেয়ালে টাঙানো মণিহারি সজ্জার উপরে – কয়েকটি ঝুলন্ত টবে গাছ, রাজস্থানী ঢাল-তলোয়ার, বন্ধু-পরিবারজনের কয়েকটি ঝাপসা ছবি, চকচকে ফ্রেমের পিছনে – এরাই কী সুকন্যার স্বপ্নে নেগেটিভ হয়ে ছিল? গান্ধীজির একখানা বড় ছবি। এ ছবিটা কখনো সুকন্যার চোখে চোখ রেখে তাকায় না। খাড়া খাড়া নাক। খাড়া খাড়া কান। সুকন্যার কানের ভিতর বিজবিজ করে কতকগুলো ছেঁড়া শব্দ – “তোমার দাদা…”, ভক করে কে পেদেছে, “এনজয় ইট…”, ঘর জুড়ে হাসির শব্দ, কেউ বমি করছে, কে যেন গুঙিয়ে গুঙিয়ে… তারপর চুপ। তার চোখদুটি আবার বুজে গেল।

সাংখ্য আজ সকালেও অফিস যাবে। কামানো গাল, সুগঠিত, যদিও পাকানো শরীর। আজও, তার ঝকঝকে টিফিন বাক্স প্যাক হবে। সে ভীষণ পরিচ্ছন্ন, নিজের টিফিন বাক্স মাঝেমাঝেই নিজে ধোয়। গান্ধীজি বলেছেন, নিজের ধাঙড় নিজেই…, সেই বাক্স নিঃশব্দে ঢুকে যাবে তার ঝকঝকে ব্যাগপ্যাকে। তারপর তাতে চড়েই ঝকঝকে ধুলোহীন গাড়িতে, ঝকঝকে বাড়ি থেকে ঝকঝকে অফিস। আবার দিনশেষে ঝকঝক করতে করতে বাড়ি ফেরা।

ঝকঝক ঝকরঝকর। পরিচ্ছন্নতাই ঈশ্বর।

ফোন বাজছে। “বৈষ্ণবজন তো তেনে কহিয়ে যে পীড় পরাই জানে রে…” পদটি একবার শেষ হয়ে আবার ঘুরে শুরু হয়। দরজা খোলার শব্দ। একটি পুরুষের ভেজা হাত দ্রুত ফোনটা ধরবার আগেই লাইন কেটে যায়।

“স্যানিটেশন ইজ মোর ইম্পরট্যান্ট দ্যান পলিটিকাল ইন্ডিপেন্ডেন্স” – সাংখ্যর বাথরুমের দরজা সগর্বে ঘোষণা করছে। সাংখ্য এখন দাঁড়িয়ে আছে টেবিলের পাশে। পরনে তোয়ালে, মোবাইল চেক করছে। সুকন্যা টেবিলের পাশেই বসে। তার চোখ এখনো গান্ধীজির ছবি ঝোলানো দেয়ালটার দিকে। সাংখ্যর তোয়ালে পরা শরীরটার দিকে সে বুঝি তাকাতে চায় না। যদিও সাংখ্য ফোন নামিয়ে ঘাড় ঘোরাতেই তার কালো চুল থেকে জলের কয়েকটি বিন্দু সুকন্যার হাতে এসে পড়ে। আর সে সামান্য শিউরে ওঠে।

“ব্যাপারটা একইরকম, বুঝলে? তোমার দাদার আর আমার… বাথরুম অ্যান্ড ড্রয়িং রুম একইরকম ক্লিন… হা হা হা হা।” সাংখ্যর হাসির মধ্যে একটা গরগরানি ঘেন্না আছে। “ভদ্রলোকের বসবার ঘরে… হাঃ… এ বাড়িতে… অ্যাকচুয়ালি লেট মী মেক দিস ক্লিয়ার সুকন্যা, আমি চাই না কিন্তু উনি এ বাড়িতে আর আসুন। তুমি নিশ্চয় অলরেডি বুঝতে পারছ… এরকম ভাবে… ইটস নট… জাস্ট নট পসিবল… এ বাড়ির একটা…” গরগরানি হাসিটা একেবারেই শুকিয়ে গেছে। কেমন গোছানো গলায় কথা বলছে সাংখ্য এখন। অথচ বলছে মাথা নেড়ে নেড়ে, চুলের জল ছিটকে পড়ছে নানাদিকে। এরকমটা হবার কথা না, এ বাড়িতে লোকে চুলের জল ছিটোয় না। আহা ছেলেটা ভিতরে ভিতরে বড্ড উত্তেজিত হয়ে পড়েছে। তবে সংযম দেখতে হয়! ছাইচাপা বিদ্রূপ, ঘেন্না… অথচ গলার তারে ওঠাপড়া নেই। ভাষাটাও… এদের বাড়ির মতো  ভাষায় সুকন্যাদের কেউ কথা বলে না। অথচ বাংলা ভাষাই তো! তার বাপের বাড়িতে পুরুষমানুষ খচেছে তো বন্যার মতো… মেয়েরাও… তার ওসব ভালো লাগত না…

সুকন্যা চোখ বোজে। বন্ধ চোখে গত রাতের ছেঁড়া ছেঁড়া ঘটনা – একটা লালরঙা বৃত্তের ভিতরে ভাসমান ছবি… চোখদুটোয় তার এমন জ্বালাভাব… বোধহয় ঘুমটা… কানে ভক করে পাদের শব্দটা আবার… এই ভক করার কথাটা ওর আইসে-পাদ-দিসি-পাদ বাপের বাড়ি থেকে ধার করা… কিছু কথা কেন যে কিছুতেই স্মৃতি থেকে মুছে ফেলা যায় না… দাদা দেড় ইঞ্চি শূন্যে তোলা বাঁ পাছাটা সোফার গদিতে নামাতে নামাতে খ্যাখ্যা করে হাসছে। ডান? বাঁ? না বাঁ-ই তো, সেবার ভাসানের সময় বাঁ হাঁটুর মালাইচাকিটাই তো… তারপর থেকে… ওদিকে দাদা বলছে “হ্যাঃ মাল খাও না জানলে তো সুকুকে তোমার হাতে দেবার আগে দু’বার ভাবতে হত গো! অ্যাঁ! হা হা হা হা।” সাথে-সাথে টেবিলে রাখা হিপ ফ্লাস্ক বার করে এক ঢোক। জামাইয়ের জন্য ভালবেসে নিয়ে আসা বড় বোতলটা যে ব্যাগ থেকে বেরিয়েছিল সেখানেই ঢুকিয়ে রাখা হয়েছে। আর তারপর থেকেই হিপ ফ্লাস্ক চলছে। দাদাও কী সহজে হার মেনে নেবার লোক! পাড়ার প্রোগ্রামে দোসরা অক্টোবর হোক তিরিশে জানুয়ারি হোক হাঁকডাক খাটাখাটনি সব করে দেবে – পার্টি বললে সবেতে আছে। কিন্তু ওই – সাংখ্য যে বলে না, কথাটা মিথ্যে নয় – হে রাম ছাড়া মহাত্মাজি আর কী যে বলেছিলেন দাদা তার খোঁজ রাখতে যায় না – ওটুকুও তো বলিউডের দরুন…

“হা হা হা।” সাংখ্যও হাসছে। গরগরানি ঘেন্নার হাসি। গোছানো নরম কিন্তু নীরস গলায় বলছে, “না দাদা, আপনি তো জানেন, এ বাড়িতে ওসব খাওয়াটা… আসলে বাবা আমাদের কতকগুলো শিক্ষা এমনভাবে দিয়ে গেছেন…”

“আরে বাবারা ওরম শিক্ষা দিয়ে থাকে রে ভাই। মাল না খেলে…” বুক চাপড়ে “কী! অ্যাঁ? তাই তো? তাই আমাদের সুকুর মুখটা বিয়ের এই ছমাসের মধ্যেই কেমন শুখু শুখু হয়ে গেছে! অ্যাঁ! সব ঠিক তো? অ্যাঁ? বলো দিকি? ম্যান্টুম্যান…” আবার একটু পা তুলে ভক করে… ফের খ্যারখ্যার করে হাসি।

“দাদা! কী বলছিস!” সুকন্যা মিনমিন করে বলে। দাদা শুনতে পায় না। সাংখ্য শুনেছে। ওর কান খুব খাড়া। গান্ধীভক্ত তো। শুনেছে, এবং এবারের হাসিটায় আর যোগ দেয়নি। তার মুখের ঘেন্নাটায় আর লুকোছাপা নেই। চিবিয়ে চিবিয়ে বলে, “তুমি চুপ করো সুকন্যা। হ্যাঁ লেটস হ্যাভ ইট ম্যান টু ম্যান অ্যাজ ইউ সে। ভালো করে শুনুন দাদা, মহাত্মাজি বলেছেন, ফার্স্ট দে ইগনোর ইউ, দেন দে লাফ অ্যাট ইউ, দেন দে ফাইট ইউ, দেন ইউ উইন। লুকিং অ্যাট ইউ, আই হ্যাভ অলরেডি উয়োন। অ্যান্ড আই উইল নট অ্যালাও ইওর ডিফাইলড মাউথ আটার সাচ রট ইন দিস হাউজ। ইউ আন্ডারস্ট্যান্ড?”

কাকে কী বলছে! দাদার ডিফাইলড মুখ হাইব্রিড আলুর মতো ল্যাপাপোঁছা। আন্ডারস্ট্যান্ডের ব্যাপারই নেই। কেমন হাসছে, থমকাচ্ছে, আবার হাসছে, কী যে করছে দাদাটা! আন্ডারস্ট্যান্ড করলে আর বগলে বোতল নিয়ে চাপড়াষষ্ঠীর প্রসাদ দিতে আসে? এ বাড়িতে? আবার রাতে থাকবে বলে বায়না ধরে? জামাইষষ্ঠীতেই যায়নি সাংখ্য! আবার চাপড়া ষষ্ঠী! মায়েরও বলিহারি… সুকন্যা মাথা নামিয়ে চুপ… সোফায় মিশে যাচ্ছে… প্রাণপণে পায়ের আঙুল মটকাচ্ছে… দাদা হাসতে হাসতে প্রায় সোফা থেকে গড়িয়ে যেতে যেতে হঠাৎ হাত থেকে হিপ ফ্লাস্কটা ফসকে সোফার উপর – যাঃ! সাংখ্য আর সুকন্যা উঠে দাঁড়িয়েছে একসাথে, ক্রোধে, অনিশ্চয়তায়, ত্রাসে।

সুকন্যা ঝগড়াঝাঁটি একদম নিতে পারে না। কোনোদিনই পারে না। তার ঝকঝকে শাদা খোলের শাড়ি, এবাড়িতে মেয়েরা বাড়িতে শাড়িটাই পরে, গায়ে আঁচল টানা, যেন এদের দুজনের কারো কথাই তার চামড়া অব্দি না পৌঁছয়। সার্ফ এক্সেল ঢাললে যেমন কীটাণুগুলো কিলবিল করে মরে যায়, সেইরকম এদের এই কথাগুলোও যেন…

এটা ছিল গতকাল।

এখনো তার গায়ে আঁচল টানা। ওটাই অভ্যেস হয়ে গেছে এখন। কেউ জোর করেনি, শুধু মাঝেমাঝে কথায় কথায় এ বাড়ির রীতিনীতিটুকু নানান প্রসঙ্গে জানিয়ে দেওয়া – যেমন হয় আর কী। পথচলতি ম্যাক্সি পরা বুকে ওড়না টানা কারো দিকে চেয়ে আলগোছে মা-বৌদিদের কথা তোলা… তাছাড়া চোখের কোণের বিরক্তি, গোছানো গলার নীরস গরগর ভাব – প্রথমে খালি গুরুজনেরা এলে বা তাদের বাড়ি গেলে, বা বাজারে গেলে, বা বাইরের গেস্ট এলে, বা প্রতিবেশীর বাড়ি গেলে কামিজ পাজামা ছেড়ে শাড়ি। প্রথম মাসে সে বেশ একটা মজাও – নতুন নতুন কাপড়। সেই নিয়ে আলোচনা-রঙ্গতামাশা, দ্বিতীয় মাসে প্যাঁচের পর প্যাঁচ, খোলা আর জড়ানো, খোলা আর জড়ানো, শেষে অভ্যেস। অতএব এখন স্বভাবতই গায়ে আঁচল টেনে খাবার টেবিলের পাশে বসে আছে সুকন্যা – পাটভাঙা শাড়ি, এখনো তাতে গুঁড়ো সাবানের মৃদু সুবাস, চুল সামান্য ভেজা, যদিও চান করেছে সেই ভোরে। মুখ, ত্বকে ফোলা ফোলা ভাব, চোখ লালচে, অনেকক্ষণ চান করলে যেমন হয়। কিন্তু চোখের তলায় হালকা কালির ছোপটা অনেক চান করলেও উঠে যেতে চায় না। নাকি তারই চোখের ভুল? চোখের ভুল তো বটেই। হয় তার দেখতে ভুল হচ্ছে, নয় যদি সত্যি ছোপ পড়ে থাকে তো… তারই চোখের নিচে কালো ছোপ মানে তারই তো ভুল? আচ্ছা চোখটা কি দেখাতে হবে? লাল আর জ্বালাভাবটা… যেন ভিতর থেকে গোটাগোটা কীসব ঠেলে উঠছে। চোখের পাতাগুলো খুলতে চায় না, ভারি হয়ে থাকে, তার ওজনে ঘাড়টা অবধি ওঠানো যায় না।

এর মধ্যে সাংখ্য পাশের ঘরে গিয়ে পোশাক বদলে এসেছে। এঘরে ফিরে এসে টিফিন বাক্স প্যাক করছে। সুকন্যাকে মুখ নিচু করে থাকতে নরম গলায় ঘোষকের তালিকা পড়ার মতো করে বলে, “বাজার রান্নাঘরে রেখেছি। গুছিয়ে রেখো। শরীর-টরীর খারাপ নাকি? তাহলে ভুলটুর মাকে বোলো, গুছিয়ে দেবে। খালি বাজার ধরার আগে হাত ধোয় যেন ভালো করে, ঠিক আছে? ঝাঁটার হাতে না ধরে। ওকেই বোলো বরং। তরমুজটা ভারি আছে, তোমার তোলার দরকার নেই।” কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করে আবার, “দ্যাখো, তুমি তো জানো আমাদের একটা আদর্শ আছে। বাবা কতকগুলো জিনিস আমাদের যত্ন করে শিখিয়ে গেছেন। যেমন আমাদের জাতির যিনি পিতা, তিনিও আমাদের কিছু কিছু জিনিস শিখিয়ে গেছেন, তাই না? তুমি বইগুলো পড়তে চাও না, ইটস ফাইন, বই পড়াটা বড় কথা না, বড় কথা হল প্র্যাকটিসটা, ইউ আন্ডারস্ট্যান্ড? দ্যাখো আজ তিনি বা তাঁরা নেই বলে আমরা কী সেসব কথা উড়িয়ে দিতে পারি? বলো? ইউ নো দ্যাট। তুমি তো অশিক্ষিত নও…” বলতে বলতে সাংখ্য তাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে আদর করতে থাকে, “ভাগ্যিস… উম… ওনারা সেই… ধ্যাদ্ধেড়ে গোবিন্দপুরে… হেঃ…” সুকন্যার আঁচলের খুঁট কষে আঙুলে জড়ানো, চোখের সামনে, মাথার পিছনে, কানের পাশে ছোট্ট ছোট্ট লাল বুদবুদ। আর তার মধ্যে মধ্যে কালো কালো বিচির মতো গোল অন্ধকার একটু করে খুলছে, আবার বন্ধ হচ্ছে… সুকন্যার মুখে না চাইতেই ফুটে উঠছে অনিশ্চিত হাসি… ফিসফিস করে কারা কথা বলছে…

একটু পরেই সদর দরজা বন্ধ হবার শব্দ শোনা যায়। তারপর গাড়ির স্টার্ট নেওয়া। তার শরীরের মধ্যে টানটান ভাবটা অজান্তে একটু ঢিল দেয়। যদিও, সে বসে থাকে ওই চেয়ারেই।

নিস্তব্ধতা।

সুকন্যা এখনো চেয়ারে।

আসলে সে গান্ধীজির ছবিটার সাথে কে-কতক্ষণ-তাকিয়ে-থাকতে-পারের খেলাটা খেলছে। মহাত্মার হাতের লাঠির ডগাটা ছবিতে দৃশ্যমান। আর সুকন্যার কাঁধে একটা হাত।

একটি মেয়ের হাত। মেয়ে না, মহিলা। কড়া ওঠা, শাঁখা, লোহা আর কালো সুতো পরা।

“বৌদি? বৌদি কী হল? শরীর খারাপ করছে? ও বৌদি?”

সুকন্যার জ্বালা ধরা চোখে দৃষ্টি ফিরে আসতে একটু সময় লাগে। কে?

ওহ্‌, ভুলটুর মা।

“কখন থেকে ঠায় বসে আছো? আমি ভাবলাম কী না কী হল বোধহয়। কী হয়েছে? শরবত করে দেব?” ভুলটুর মায়ের ঘাম মাখা গন্ধ গন্ধ মুখটায় দুশ্চিন্তা।

“শরবত?”

“এই দ্যাখো। বলবে তো আগে শরীর খারাপ, কী না ভুলটুর মা শরীরটা ঠিক লাগছে নাকো একটু শরবত করে দাও। করতে আর কতক্ষণ। কখন এসছি তাই। তুমি সেই তখন থেকে ঠায় বসে ছবির দিকে তাকিয়ে। দেখছটা কী? আমি ভাবি তাই কী হল। এদিক ঝাড়ছি ওদিক ঝাড়ছি আর তোমার মুখটা দেখি শুকিয়েই আছে, দেখছ কি দেখছ না তাও ঠাওরাতে পারছি না… আহা গো। একেকবার জিজ্ঞেস করব ভাবছি… তোমার চেয়ারের ওখানটা ঝাড়া হল নাকো – ধুলো দেখলে দাদাবাবু আবার বাড়ি মাথায় করবে কিনা তাই। সেদিন ভুলটুর ইস্কুলের হোমওয়াকে কী দিয়েছে জানো তো বৌদি? ঝাড়ুদার পাখি, আর ভুলটু বলে কী – সাংখ্য মামা… হি হি হি… এমন পাজি ছেলে কী বলব বৌদি! বলে কিনা মামার নাকটা ঠিক যেন ঝাড়ুদার পাখির ঠোঁটটার মতো। তা আমি বলি কী সে হল গিয়ে ভাগ্যিমন্ত পুরুষের লক্ষণ। তোর মরুন্যা বাপের মতো বোঁচা নাক হবে নাকি! ওরম ক্যালি থাকলে ওরম নাক হয়। তুই একটু পড় দেখি – তোর নাকটাও যদি সাইজে… এই দ্যাখো কথাই বলতে লেগেছি। দাঁড়াও, এক্ষুনি শরবত করে আনছি, হ্যাঁ? মনে কিছু কোরো না বৌদি, ভুলটুটা বড় পাজি… পড়াশুনোয় মন নেই, যা নয় তাই বলে। আমারই মতন বকরবকর করার স্বভাব… ওর বাপটা জানো তো একেকদিন ওর-আমার কথার জ্বালায় পাগল হয়ে হাতের কাছে যা পেত তাই দিয়ে… দাঁড়াও দাঁড়াও, শরবতটা করে আনি চট করে। আমার মুখ বৌদি – কী বলব – ভুলটুর বাপ বলত জানো হাইড্রান্টের জল। গলগলগলগল গলগলগলগল থামার নামটি নেই। দাঁড়াও এই যাচ্ছি আর আসছি…”, পিছোতে পিছোতে ভুলটুর মা স্যাট করে রান্নাঘরে ঢুকে যায়।

আবার একা। খাবার ঘরে। ঘরটাকে কেমন অতিকায় লাগছে। সুকন্যা চেয়ার ছেড়ে উঠে রান্নাঘরের দিকে হেঁটে যায়। গান্ধীর ছবিটার কাছ অবধি এসে এক মুহূর্ত দাঁড়ায়, তারপর অকারণেই ভূত দেখার মতো দৌড় লাগায় – ভুলটুর মায়ের মতোই স্যাট করে ঢুকে পড়ে রান্নাঘরে।

 

দুপুর ঘনিয়ে আসছে। বাইরে তীব্রস্বরে একটা কোকিল ডেকে চলেছে।

ভুলটুর মা বড় ছুরিটা দিয়ে শাদা কাটিং বোর্ডের উপর রেখে তরমুজ কাটছে। তরমুজের রস বোর্ড ছাপিয়ে মার্বেলের স্ল্যাবে ছড়িয়ে একাকার। পিছনে দাঁড়িয়ে, ছুরিটাকে বারবার নরম তরমুজের শাঁস ফালাফালা করতে দেখে সুকন্যার গা গুলিয়ে আসে। অথচ ভুলটুর মা’র থেকে দূরে সরে যেতে চাইছে না সে। ওর দিকে কেমন সোজাসুজি তাকানো যায়। এই যেমন এখন, পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে সে, জানলা দিয়ে আসা আলোয়, টিউবলাইটের আলোয়, মহিলা কেমন হাপুসহুপুস করে ঝলমলে তরমুজ কাটছে… 

“থাক থাক, ও চাই না, আর কেটো না…”

“সে কী বৌদি! এই এতখানি তরমুজ… ও কী! ওক্‌ পাড়ছ কেন?”

“ফ্রিজে রেখে দাও, নয় তুমি খেয়ে নাও। মাগো! এত গরম না! ফ্যানটা চালাবে তো?” সুকন্যা হাতড়ে হাতড়ে কিচেনের ফ্যানের সুইচটা অন করে। গলাটা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব স্বাভাবিক করার চেষ্টা করতে করতে বলে, “তোমার শরীর খারাপ লাগে না? এত গরমে ঘেমেনেয়ে এইভাবে কাজ করো?”

“আমাদের আবার শরীর বৌদি, কী যে বল! ফ্যান তো আর সব বাড়িতে…” ভুলটুর মা দাঁত বার করে হাসে, “তোমার হলটা কী গো? খবর টবর আছে নাকি? বোঝো! এর মধ্যেই!” বলেই সে জিভ কাটে। এদিকে জানতে আগ্রহ ষোল আনা।

সুকন্যা হাত নেড়ে কথাটা উড়িয়ে দেয়, এর মধ্যেই তার আবার অবসন্ন লাগছে। ভুলটুর মা’কে দেখে শরীরেমনে যে জোয়ারটুকু এসেছিল, বুঝি ঘামের সাথেই গলে বেরিয়ে গেল বা। ঘষটে ঘষটে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে যায় সে। পাখির ডাকটাও থেমে গেছে। দুপুরের ঘুনঘুন শব্দ খালি। ড্রয়িং রুমে ফিরতে অনেকটা সময় লাগে। চেয়ার অবধি পৌঁছতে হাঁপ ধরে যায়। কিন্তু না, তার কোনো খবর নেই।

মিক্সির হৈহৈ খসখস আওয়াজ।

খানিক বাদে ভুলটুর মা বড় গেলাসের এক গেলাস লাল টকটকে তরমুজের শরবত আঁচল ঢাকা হাতে ধরে এঘরে আসে। ছোট ছোট চোখের মণির মতো দু-একটা লালচে কালো বীজ কীভাবে মিক্সির দাঁত এড়িয়ে গেছে। তারা এখন কাঁচের ভিতর থেকে সুকন্যার দিকে অলস ভাবে চেয়ে আছে – দাবি নেই, লুকোছাপা নেই – তবে কী চোখের চামড়া না থাকাই ভালো?

“তুমি বললে বৌদি, তাই সাহস করে ভাবলাম এক গ্লাস খেয়েই নিই। যা গরমটা পড়েছে! মনে কিছু কোরো না…”

“মনে করার কিছু নেই।” সুকন্যা দুর্বল গলায় বলে।

“তোমার হল দয়ার শরীর। আর পাঁচটা বাড়িতে দেবে নাকি এতখানি লাই! না আমি তাদের থেকে নিজের মানুষের মতন চাইতে পারব! কাঁড়ি কাঁড়ি খাবার ফেলে দেবে গো, তাও একটুকু জিজ্ঞেস অব্দি করবে না। জানে আমার ঘরে তিনটে ছেলেপুলে… সে…”

সুকন্যার ভুলটুর মা’র কথায় মন দিতে পারছে না। সে কথার মধ্যেই দুম করে টিভিটা চালিয়ে দেয়।

“এই দ্যাখো ভুল করে কাঁচের গেলাসে খেয়ে নিলাম গো বৌদি! দাদাবাবুকে বোলো না যেন, কেমন? বাড়ি মাথায় তুলবে অখন। যা পিটপিটানি! এই দ্যাখো কী বলে ফেললাম! মনে কিছু কোরো না, তোমার দয়ার শরীর… সেবার ভুলটুর জ্বরের সময়…”

টিভিতে একটা হিন্দি সিরিয়াল চলছে। এক বদমায়েশ স্বামী তার বউকে বস্তা পিটান পিটছে। বউটার মুখের চড়া মেকআপ অবশ্য এত চোখের জলেও টসকায়নি। বাপ পণটন দেয়নি বুঝি, না ওইরকমই কিছু একটা। বরটা চড়া গলায় হেসে হেসে বলছে, “যত পারিস চিল্লা! দেখি কে শোনে তোর চিৎকার! হিহিহাহাহাহা…”

“হ্যাঁ বৌদি! এরম করে পিটায় ক্যামেরার সামনে? শুটিং-এর এতগুলো লোকের সামনে? আহা রে… ওই ওই… মা গো! ওই আবার!” ভুলটুর মা প্রতিটা থাপ্পড়ের সঙ্গে শিউরে উঠছে। এদিকে দেখতে ছাড়বে না। হঠাৎ তার চোখ ঘুরে গেছে সুকন্যার মুখে। সুকন্যা কখন টিভি দেখা বন্ধ করে দুহাতে মুখ ঢেকে ফেলেছে। চোখ অবশ্য শুকনো। এতো জ্বালা চোখে, জল বেরোবে কী!

“মার কতরকমের হয়, ভুলটুর মা?” সে দুর্বল গলায় জানতে চায়।

ভুলটুর মা’র কথা বেরোয় না। খুবই বিচিত্র পরিস্থিতি। লোকে বলে ভুলটুর মায়ের মুখে আঁটবে এমন মাপে ছিপি তৈরি হয় নাকো। এই বাচ্চা মেয়েটার হলটা কী আজ? আহা গো। সে কী বলবে না বলবে – মনের মধ্যে খুঁজতে খুঁজতে কয়েকবার মুখ খোলে ও বন্ধ করে। তারপরে যা থাকে কপালে ভেবে বলে, “তোমার তো রামচন্দ্রের মতন বর বৌদি, ও মাগে-পুরুষে খটাখটি একটু হয়েই থাকে। মনে কিছু করতে নেই। তোমায় কি বলব! ভুলটুর বাপ – বিয়ে হল যখন, তখন আমারই বাপের বয়েসী প্রায় – আমার বাপের কারখানার বন্ধু ছিল গো। তা কি প্যাঁদানটাই প্যাঁদাত! বলতে নেই, মরে গেছে, কিন্তু সত্যি বলব বৌদি? আপদ গেছে। সন্ধে হতে না হতে মদে চুর। আমার হকের রোজগার ভেঙে… ওই আমাদের মতন বাড়িতে যা হয়… কোনো লাগাম ছিল না গো। বাপ গেছে, মা গেছে, পালিয়ে যাব কোথায় বৌদি… তখন যদি তোমার মতন একটা বাড়ির কাজ থাকত তবেও হয়তো… জানো? এমনকি লালটু – আমার ভুলটুর বড়টা – যখন পেটে, তখনও ঘেঁটি ধরে…”

কথায় ছন্দ এসে যাওয়ায় উৎফুল্ল হয়ে ঘেঁটি ধরার অভিনয় করে বোঝাতে যেতেই তার হাত থেকে গ্লাসটা মাটিতে পড়ে চুরচুর হয়ে যায়। থইথই করছে তরমুজের ক্বাথ – আধো কঠিন আধো তরল। টিভিতে তখনো প্যাঁদানি চলছে – ওই ওই ওই! এবার কমার্শিয়াল ব্রেক।

সুকন্যার গলা দিয়ে একেবারেই আর আওয়াজ বেরোচ্ছে না। যেন টেবিলচেয়ারের মতো সেও ঘরের একটা আসবাব মাত্র। কিন্তু তার আর্ত চোখদুটি সে মেঝেতে থইথই তরমুজের রক্তসমুদ্রের দিক থেকে ফেরাতে পারছে না। মাঝেমাঝে জলে রোদ পড়ার মতো চিকচিক করে উঠছে কুচি কুচি কাঁচ। ভুলটুর মা ঘরের মধ্যে নেচে বেড়াচ্ছে, “ন্যাতাটা কোথায় গেল! আ মোলো যা! কোথায় গেল! কোথায় যে রাখে! বৌদি তোমার ওই রান্নার মেয়েটার কাজের কোনো ছিরিছাঁদ নেইকো এই আমি তোমায় বলে দিলাম।”

তরমুজের রসমাংস গড়িয়ে যাচ্ছে ঘর জুড়ে। তাতে ঢেউ উঠছে। ভেসে যাচ্ছে টিভি, দেয়ালে টাঙানো গুল্মলতা, ঢাল-তরবারি, গান্ধীবাবার ছবি। ভেসে যাচ্ছে ন্যাতা হাতে ভুলটুর মা। ঝিঁঝিঁগুলো তারস্বরে ডাকতে শুরু করেছে আবার। কোকিলটা…

“এ বাবা! আরশোলা! দেখেছ! দাদাবাবু মেরে ফেলবে একেবারে! কাঁড়ি কাঁড়ি ফিনাইল ঢালছি রোজ, কোথা থেকে আসে হারামির বাচ্চাগুলো! মর! মর!”

ভুলটুর মা প্রথমে ন্যাতাটা আছড়ায়, তারপর দৌড়ে গিয়ে একটা খবরের কাগজ নিয়ে আসে। পাকিয়ে তরমুজের ক্বাথের উপর থপাস থপাস করে মারে।

“মর! মর! মর!” মুখের সাথে তালে তালে চলতে থাকে হাত। তরমুজের শাঁস আর রস ছিটকে লাগছে সর্বত্র –ছিটকে লাগছে সুকন্যার শাড়িতে! মর! মর! মর! পরিচ্ছন্নতাই ঈশ্বর! প্রতিটি আঘাতের সাথে সাথে সুকন্যা কেঁপে কেঁপে ওঠে। তার সাথে ঝিঁঝিঁগুলো মিলিত রবে তীব্রস্বরে কী গান গাইছে? “বৈষ্ণবজন তো তেনে কহিয়ে যে পীড় পরাই জানে রে বৈষ্ণব জন তেনে বৈষ্ণব জন তেনে বৈষ্ণব জন…”

“ব্যাস।” ভুলটুর মা বিজয়ীর মতো হেঁটে যাচ্ছে, হাতে খবরের কাগজে চ্যাপ্টানো আরশোলা । “একদম বাইরে ফেলে দিয়ে আসছি। তারপর পরিষ্কার করব এসে, কেমন?” তারপর একটু গলা নামিয়ে, “দাদাবাবুকে বোলো না যেন বৌদি। কিচ্ছুটি টের পাবে না। বাড়ি একদম ঝকঝক করবে, দেখো?”

তারপর সব একদম চুপ। এরই মধ্যে সুকন্যা চেয়ারের কানা ধরে উঠে দাঁড়ায়। মেঝেতে এখনো কাঁচের টুকরো আর তরমুজ। পা বাড়াতেই ভিজে চটচট লাল মাংস।

হঠাৎ আর্তনাদ। টিভির সেই মেয়েটা – ছেঁড়া ব্লাউজ আর শায়া পরে। তার বরকে মেরেছে শেষ পর্যন্ত এক ঠেলা দিয়ে দৌড়তে শুরু করেছে। পিছনে বেজে উঠেছে দারুণ সাসপেন্স মিউজিক, ভিলেনের জীপ হিরোকে তাড়া করলে যেমন বাজে। মেয়েটা এক ঘর থেকে আরেক ঘরে ছুটে বেড়াচ্ছে, নেচে বেড়াচ্ছে, আর তার বর তাকে খুঁজছে, দেখতে পেলেই তেড়ে যাচ্ছে, কিন্তু ধরতে পারছে না। মেয়েটার শায়ার নীচে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত, মুখেহাতে রক্ত। একটা ফুলদানি ভাঙার আওয়াজ। মেয়েটা একটা কাঁচের টুকরো হাতে তুলে নিয়েছে, বরকে শাসাচ্ছে, তারপর আবার দৌড় – হলঘরের দিকে, সদর দরজাটা ধাক্কা মেরে খুলছে। বাইরে কে দাঁড়িয়ে? সাংখ্য…?

নিস্তব্ধতা।

যে চেয়ারে সুকন্যা বসেছিল, সেটা এখন খালি। বাথরুমে জলের শব্দ। শাওয়ার চলছে তো চলছেই। সুকন্যার নোংরা শাড়িটা বাইরে নোংরা কাপড়ের মধ্যে ডাঁই করা, দাদা যে সোফা কভারটার উপর বসেছিল, সেটাও। ভুলটুর মা ওগুলো পাকিয়ে পাকিয়ে বারান্দায় রাখা ওয়াশিং মেশিনটায় ভরবে কোনোসময়। রাস্তা দিয়ে একটা গাড়ি গেল বুঝি। বেল বাজছে। ভুলটুর মা যায় দরজা খুলতে।

সাংখ্য। ভুলটুর মা’র মুখেচোখে অমনি টানটান ভয়। খাবার ঘরটা অবশ্য ঝকঝকে পরিষ্কার এতক্ষণে। সাংখ্য চারপাশে একবার চোখ ঘুরিয়ে দেখে। রান্নাঘরের দিকে হেঁটে যায়। ভুলটুর মা হাঁটে পিছন পিছন, হাত কচলায়। আধকাটা তরমুজটার দিকে তাকিয়ে সাংখ্য নাক কুঁচকোয়, ছুরিটাও ধোয়া হয়নি – “এসব এখানে পড়ে কেন? বৌদি কোথায়?”

ভুলটুর মা চুপচাপ পরিষ্কার করতে লেগে যায়। সাংখ্যর মোবাইল বেজে ওঠে।

সুকন্যা স্নান করছে। জলের শব্দের ফাঁকে তার কানেও আসে ফোনের রিংটা। তার চোখ বোজা, ঠোঁট নড়ছে। পড়ুক পড়ুক বন্ধ চোখে জলের ধারা… একটা হাত শাওয়ারের নবটা ঘুরিয়ে বন্ধ করে দিল দ্রুত। আরেক হাত মুখ-মাথা মুছছে। নাকের উপর তোয়ালে চেপে ধরতেই শরীর শক্ত। সাংখ্যর তোয়ালে… সকালে যেটা পরেছিল। নিজের তোয়ালে নিয়ে ঢোকার কথা খেয়ালই হয়নি… কেমন ঘোরের মধ্যে ছিল সে… তোয়ালে তো না, গামছা। আচ্ছা গামছাগুলো কোথায় যে যায়? সাংখ্য গামছা পছন্দ করে না বলেই কী ওরা এ বাড়িতে স্বেচ্ছায় হারিয়ে যায়?

মাড় দেওয়া শাড়িটা গায়ে জড়িয়ে মুখে অনিশ্চিত হাসি নিয়ে সুকন্যা বেরিয়ে আসে। দরজায় লেখা পরিচ্ছন্নতা বিষয়ক উদ্ধৃতিটাকে পিছনে ফেলে, গান্ধীজির ছবিটাকে ডান পাশে রেখে (কিছুতেই ওদিকে না তাকিয়ে) সোজা হেঁটে… প্রায় উড়ে আসে সাংখ্যর কোলের কাছটিতে।

“এসে গেছ? ভালো করেছ, জানো?” সারা মুখে অনিশ্চয় হাসিটাকে লাজুক ভাবে ছড়িয়ে দিতে দিতে কুহুস্বরে বলে। সাংখ্য বসে আছে চেয়ারে, সেই চেয়ারটাতেই, যাতে ও সারাদিন বসে ছিল। কাছে গিয়ে ভীষণ গোপন কথা বলার মতো করে বলে, “তোমাকে দেখতে ইচ্ছে করছিল খুব।” সাংখ্য কী শুনতে পেল? পেল না বোধহয়। সত্যি মুখ ফুটে বলেছে তো সে কথাটা? নাকি মনে মনে?… ঘরময় ওর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ঘুরছে । খাড়া খাড়া নাকে ও কি অবাধ্যতার গন্ধ পায়?… অন্যমনস্ক… যেন চোখ দিয়ে ধূলিকণা খুঁটে খুঁটে তুলছে মেঝে থেকে, টেবিল থেকে, জানলার পর্দা থেকে – ও আজ সময়ের আগে ফিরে আসার ফলে যারা তখনো উড়ে যেতে, মুছে যেতে, সাফ হয়ে উঠতে পারেনি। মিশে যাবে? লুকিয়ে পড়বে? অতো সোজা? এ বাড়িতে? সুকন্যা তখন আরো কাছে এসে, গলা আরো খাদে নামিয়ে এনে গরগর করে বলে, “শুনছ? একটা কাজের লোক দেখতে হবে, বুঝলে? ভুলটুর মা-টার না ভীষণ নোংরা কাজ। এ বাড়িতে এরকম নোংরা লোক দিয়ে চলে না। বলে দিতে হবে ওকে…”

এবার সাংখ্য পূর্ণ সজাগ। মৃদু হেসে মাথা নেড়ে তাৎক্ষনিক সম্মতি জানায়। তারপর বারান্দার দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে চট করে তাকে কাছে টেনে, কোলে বসিয়ে ঘাড়ে চুমু খায় আর ফিসফিসিয়ে একটা কথা বলে। সুকন্যার শরীর শক্ত, চোখদুটো ভারি হয়ে আসছে আবার, কুটকুটে জ্বালা ভাব, কী যেন তার চোখের পর্দা ঠেলে ঠিকরে বেরোতে চায়…শব্দ…চিৎকার…ফিসফিস… কে শোনে…কোথায় যাব… ভাবতে ভাবতে সে এও ভেবে ফেলে, সদর দরজাটা তাহলে ঠিক কোথায়? আর মুখ নামের ছোট্ট গহ্বরটা তার আপনা থেকেই খুলে যায়, আর ঘন ঘন নিঃশ্বাস ফেলতে ফেলতে বলে, “আমিও… তোমায়…”

বারান্দায় ওয়াশিং মেশিন আপন মনে হাঁসফাঁস করে, সান্ধ্যকালীন শারীরিক কসরত চালিয়ে যায়, বাতাসে সার্ফ এক্সেলের মৃদু সুবাস। এদিকে গান্ধীর ছবিতে, নাকের নীচে তরমুজের এক ফোঁটা ভিজে শাঁস সবার চোখ এড়িয়ে আটকে থাকে। ছবি কারো চোখে চোখ রাখে না, কিন্তু তরমুজের শাঁস লাল লাল চোখে ড্যাবড্যাবিয়ে সমস্ত দেখে।

মধুশ্রী বসু গল্প পড়তে আর লিখতে উৎসাহী। জীবিকা – নাচ, ছবি আঁকা ইত্যাদি।

 

সঙ্গের ছবি – ইন্টারনেট থেকে

One thought on “তরমুজ

  1. Pingback: আয়নানগর অনলাইন গল্পসংখ্যা : ‘সংঘাত ঐক্য সংঘাত’ | aainanagar

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s