কারমাইকেল থেকে কয়েক কিস্তি

পার্থপ্রতিম মৈত্র

প্রথম প্রকাশ – গুরুচণ্ডা৯, ২০১৭। দ্বিতীয় প্রকাশ – আয়নানগর, বইমেলা সংখ্যা ২০১৮।

প্রথম কিস্তি

আমার ওয়ার্ডের সামনের টানা বারান্দা দিয়ে নিচে দেখা যায় স্কুল অব ট্রপিকাল মেডিসিন-এর আউটডোর। কারমাইকেল হাসপাতাল। কাতারে কাতারে লোক লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমার ওয়ার্ডের পিছনের টানা বারান্দা দিয়ে একটু দূরে দেখা যায় কলকাতা মেডিকাল কলেজ-এর আউটডোর। কাতারে কাতারে লোক লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে। কত লোক? তিন হাজার বা পাঁচ হাজার, বা দশ হাজার? আমার কোনও আন্দাজ নেই। “এখানে স্কিনের দিন সবচেয়ে বড় লাইন পড়ে। এইডস আর থ্যালাসেমিয়ার দিন কম। ডেঙ্গুর সময় তো দাঁড়াবার জায়গা পাবেন না।” সব ইনফরমেশন আমাকে জোগায় রুগীর আত্মীয়েরা, ওয়ার্ড অ্যাটেনডেন্টরা এমনকি নার্সেরাও। দু টাকার টিকিট, ডাক্তার লিখে দিলে ওষুধও ফ্রী। সারাটা দিন হয়তো এখানেই কাটবে, কিন্তু তাতে কী? পাড়ার ডাক্তারও ভিজিট একশো টাকা করে দিয়েছে। ওষুধের দাম আকাশছোঁয়া। চুলকুনি হলেও খরচ আছে তিনশো টাকা। জ্বরজারি হলেতো কথাই নেই। টেস্টের খরচ আছে কম করে পাঁচশো টাকা। তার চেয়ে একটা দিন নষ্ট হলে কী আর লোকসান।

আমার ওয়ার্ডের সামনে টানা বারান্দা, পিছনেও তাই। তিন চারটি জেনারেল ওয়ার্ড, আর আটটা কেবিন। ওয়ার্ডের নামগুলোও অদ্ভুত। পাইকপাড়া ব্লক, তার পাশে লুকাইস ব্লক। আমি আছি লুকিস-আট নম্বর কেবিনে। কেবিন মানে বহুত উঁচু বড়-বড় ঘর। কেবিন ফার্স্ট কাম ফার্স্ট সার্ভ। মেল ওয়ার্ডে একটিই মাত্র কেবিন, যেখানে অ্যাটাচড বাথরুম আছে। ট্রপিকাল সবাইকে অফার করে, আমাকেও করেছিল। কিন্তু কেউ সেটা নিতে চায়না। আমিও না। আমার পাশের ঘরে একটি হোমোসেক্সুয়াল ছেলে। তার পাশের ঘরে স্পুটাম পজিটিভ, মানে টিবি। তার পাশে সুন্দরপানা একটি ছেলে সম্ভবত অতিরিক্ত তাম্বাকু সেবনের অপকারিতায় আক্রান্ত। তার পাশে ছোট্ট একটা ছেলে যার অজানা রোগের জ্বর নামছে না। তাকে ঘিরে সব সময়ে ডাক্তার এবং নার্সের ভীড়।

আমার ছাতার মাথা একটা রোগ হয়েছে। মানে মাথার মধ্যে ছত্রাক সংক্রমণ। লেফট স্পেনয়েড রিজিয়নে অ্যাসপারোজিলেসিস। চোখ, নাক, ব্রেন সব ডাক্তার দেখিয়ে, কলকাতার সবচাইতে দামি হাসপাতালে অপারেশন করিয়ে, নিঃস্ব হয়ে, লাভের মধ্যে এই হলো যে বাঁ চোখে নিশ্ছিদ্র অন্ধকার, আর ডান চোখে শুধু আণ্ডার-এক্সপোজড ব্ল্যাক অ্যাণ্ড হোয়াইট ছবি। আমি দশ বছর ধরে ক্রিপ্টোজেনিক সিরোসিস অব লিভারে আক্রান্ত। পিজির ডাক্তার অভিজিত চৌধুরী বলেছিলেন “সো নাউ ইউ হ্যাভ লার্ণড হাউ টু লিভ উইথ সিরোসিস।” আজ পর্যন্ত কখনও এমন হয়নি ইউ-এস-জি করতে গিয়ে ডাক্তার জিজ্ঞাসা করেনি “খুব দারু খেতেন?” আমার তো দারু, সিগারেট, পান, এমনকি গুটকার নেশাও নেই। বন্ধু বান্ধবের সৎসঙ্গে যতটুকু হয়। নেশা বলতে বই পড়া আর মাঝখানে হয়েছিল সিনেমা করার নেশা। সেই রঙ্গিন পৃথিবীটা চোখের সামনে সাদাকালো হয়ে যেতে দেখেছি আমি। আর তার সঙ্গে মাথার তীব্র যন্ত্রণা। বই পড়তে না পারা, আর মৃত্যু তো সমার্থক।

Continue reading