জেনানা ফাটকের ইতিবৃত্ত

রীতা ব্যানার্জি‌

রীতা ব্যানার্জির জন্ম ১৯৫৩ সালে। বেথুন স্কুল থেকে ১৯৭০ সালে হাইয়ার সেকেন্ডারী পাশ করে লেডি ব্র্যাবোর্ন কলেজে ভর্তি হন। কিন্তু কলেজ ছেড়ে ৭০ দশকের আন্দোলনে যোগ দেন। ১৯৭৩ সালের জানুয়ারী মাসে জেলে যান। ১৯৭৭ সালের শেষ ভাগে বন্দী মুক্তি আন্দোলনের ফলে ছাড়া পান। পবরবর্তী কালে B.A পাশ করে ভবন কলেজ অফ ম্যানেজমেন্ট এন্ড জার্নালিজম থেকে জার্নালিজমে ডিপ্লোমা নেন। বিভিন্ন N.G,O তে কাজ করেন আর পত্রিকা ও লিটল ম্যাগাজিনে লেখালেখি শুরু করেন, কিন্তু সেখানে নানা দুর্নীতি দেখে সরে আসেন। ব্যক্তিগতভাবে বিভিন্ন সামাজিক কাজকর্মের সাথে যুক্ত থাকেন। বর্তমানে তাঁর নিজস্ব ব্লগে ও ফেসবুকে তিনি জীবনে যা কিছু দেখেছেন ও অনুভব করেছেন, সেগুলি গল্প কবিতা প্রবন্ধ ইত্যাদির মাধ্যমে প্রকাশ করেন।

এই লেখাটি আয়নানগর বইমেলা ২০১৭ সংখ্যায় প্রথম প্রকাশিত হয়। এখানে পরিবর্ধিত রূপে অনলাইন সংখ্যার পাঠকদের জন্য রইলো, যাঁরা অনেকেই হয়তো বইমেলা সংখ্যা হাতে পাননি।

পর্ব ১

প্রায় একমাস লালবাজারের লকআপে ভিন্ন ভিন্ন নামে রেখে, অবশেষে আমাদের পনেরো-কুড়িজনের দলটাকে রাইফেলধারী গার্ড দিয়ে শেয়ালদা কোর্টে নিয়ে যাওয়া হল। প্রতি দিনের শারীরিক ও মানসিক অত্যাচারে সকলেই অল্পবিস্তর বিধ্বস্ত। দলের মধ্যে আমি ছিলাম একমাত্র মেয়ে। সকলেই আমার দিকে স্নেহপ্রবণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো। এরপরে হয়তো আর আমার সাথে দেখা হবার সুযোগ হবেনা। তখন ১৯৭৩ সাল, বেলা দশটা।

কোর্টে আমাকে মহিলা লকআপে ঢুকিয়ে দেওয়া হল, বাকিদের ছেলেদের লক আপে। বহুদিনের সুখদুঃখের সাথীদের সাথে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেল। ছোট্ট নোংরা ঘরটায় একটা মাত্র জালের বিশাল একটা তালাবন্ধ দরজা। প্রায় আত্মবিস্মৃত অবস্থায় একটা কোণে দাঁড়িয়ে ছিলাম, হঠাৎ কে যেন ডাকলো—‘‘এই রীতা, এদিকে আয়, এই যে এই দিকে।”

সম্বিত ফিরে পেয়ে তাকিয়ে দেখি, অন্য কোণে মিনু বসে আছে। ওর কাছে গিয়ে বসলাম। ভালো করে খেয়াল করে দেখি ওর পা’দুটো গোদের মত ফোলা।

লালবাজারে পাকানো বাঁশের লাঠির বাড়ি মেরে হাত-পা ফুলিয়ে দিয়ে একরকমের তেল লাগিয়ে দিতো, যাতে উপর থেকে ফোলা কমে যেতো, ভিতরে জখম খুব কিছু কমতো না। সেটা নাকি বন্দুক পরিষ্কারের তেল। বুঝলাম মিনুর ভাগ্যে তাও জোটেনি। ও কিন্তু একান্ত ভাবেই ঘরোয়া মেয়ে ছিলো, কোনোকালেই কোনো রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিল না। ওর ভাইবোনরা হয়তো ছিল। তাদের না পেয়ে ওকে আর ওর বাবাকে ধরে এনেছে। দেখলাম ওকে উল্টো করে ঝুলিয়ে শুধু বেধড়ক মারই মারেনি, বুক-পিঠে জ্বলন্ত সিগারেটের ছ্যাঁকা দিয়েছে। দিন সাতেক মানিকতলা থানায় রেখেছিল। মাস কয়েক আগেও একবার ওর বাড়িতে ভাইবোনদের তল্লাশ করে না পেয়ে ওকে ধরেছিলো। সেবার শুধু জিজ্ঞাসাবাদের উপর দিয়ে গিয়েছিলো। এবার তাই বোধহয় তিন গুণ শোধ নিয়েছে। ওকে দেখে একদিকে যেমন ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল, অন্যদিকে নিজে নতুন করে শক্তি সঞ্চয় করছিলাম।

Continue reading

মিথ্যের গদ্য

সিদ্ধার্থ বসু

“সত্যি কথা বলতে পারা–একটা আস্ত জীবন জুড়ে–কী যে দুরূহ ব্যাপার একটা। আমি নিজেকে উপস্থাপিত করতে চাই মানুষের কাছে,আগাগোড়াই এমন একটা মানুষ হিসেবে যার গ্রহণযোগ্যতা বেশ উঁচু মাত্রার। আর সেইখানেই বেঁধে যায় যত গন্ডগোল : কে গ্রহণ করবে আমায়? কারা? কেনই বা করবে আদৌ? ফলে উপস্থাপিত হওয়ার অপার উচ্চাশায় আমি হয়ে উঠি দ্বিচারী; আর দুর্ভাগ্যক্রমে এই তফাত দিনে দিনে বাড়তে থাকে। অতঃপর….” – সিদ্ধার্থ

পাড় ভাঙ্গার গদ্য

আগেও অনেক জায়গায় লিখেছি যে, ‘মিথ্যে’ মানুষ-চরিত্রের সবচেয়ে নিশ্চিতকারক বৈশিষ্ট্য। বহুবার বহুভাবে বহু অনুষঙ্গে অতিব্যবহার করতে করতে বুঝেছি যে এইটুকুই আমার জীবনের চর্যা ও চর্চার একমাত্র অর্জন— এই বিশুদ্ধ সিদ্ধান্তমত — প্রায় যেন অভিজ্ঞানেরই প্রত্যয়ে।

মানুষ মিথ্যে ছাড়া একদিনও বাঁচে না| সত্যি কথা বলতে কি, একটা পূর্ণ মুহূর্তও তার কাটে না মিথ্যে ভাবনার ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে, প্রতিনিয়ত একটা মিথ্যে অস্তিত্ব বুনে চলা ছাড়া তার গতি নেই কোনো। আমি সারাদিন বাস্তবত যা যা করে উঠি, আমার ইচ্ছে হয় বলেই করি তো সেসব—অন্ততপক্ষে খুব বেশি কিছু অনিচ্ছার কাজ নয় এমনটা তো বলাই চলে। এই ক্রমসম্পন্ন কাজগুলোর মধ্যে প্রকাশ পায় আমার স্বার্থচিন্তা— কখনো সরাসরি বা কখনো একটু ঘুরপথে, পরোক্ষভাবে। এখন আমার স্বার্থসিদ্ধিপ্রয়াসী কাজকর্মের পরম্পরা কখনই সমান পুষ্টিকর হতে পারে না আর সকলের পক্ষে, বা কখনো আর কয়েকজন, কি একজনের পক্ষে। মজাটা হলো, আমি নিজে কিন্তু আমার এই কর্ম ও তার ফলশ্রুতি সংক্রান্ত সমাজব্যাপারে যারপরনাই সচেতন। অথচ আমায় টিকে থাকতে হচ্ছে এই সমাজেই। ফলত নিজের ন্যায্যতা প্রতিপন্ন করার দায় আমার অস্তিত্বের সংকটের সাথেই সংস্পৃষ্ট। প্রথমত আমাকে গড়ে তুলতে হয় আত্মপক্ষ সমর্থনের যুক্তিপরম্পরা : মিথ্যে ভাবা। তারপর সেই যুক্তিসিদ্ধভাবে নিজেকে হাজির করতে হয় আত্মীয়-বন্ধু-পরিজনের মাঝখানে (কিছু অনাত্মীয় শত্রুভাবাপন্ন মুখও সেখানে থাকা বিচিত্র নয়): মিথ্যে বলা। এবং সবশেষে সবচয়ে উল্লেখযোগ্য যে কাজ, সেটা হলো নিজের ন্যায্যতাকে নিজেই গ্রহণ করা, বিশ্বাসে পরিণত করা এই বিবৃতিকে যে— আমি স্বার্থতাড়িত নই, স্বার্থান্ধ তো কোনমতেই নই: অর্থাৎ ফের মিথ্যে ভাবা। এইভাবে একেকটা চক্কর সম্পূর্ণ হয় আর আমার নিজের কাছেই রচিত হয়ে ওঠে এক নতুন আমি, আগের আমিগুলোর কোনটার চেয়েই যে একচুল কম প্রামাণ্য নয়।

Continue reading