ফ্রন্টিয়ার-এর সম্পাদক তিমির বসুর সাথে কথোপকথন

ফ্রন্টিয়ারের পথ চলা শুরু হয়েছিল ১৯৬৮ সালের এপ্রিল মাসে। অর্থাৎ, ২০১৮ সাল হলো ফ্রন্টিয়ারের পঞ্চাশ বর্ষপূর্তির সময়। পত্রিকাটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন সমর সেন, ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত নিজেই ছিলেন সম্পাদনার দায়িত্বেও। বলা বাহুল্য, সেসময়ে পৃথিবী উত্তাল হয়ে আছে। ঘরের পাশেই নকশালবাড়ি, ভারতবর্ষের অন্যত্র শ্রীকাকুলাম ইত্যাদি, আমেরিকায় বর্ণবিরোধী, যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন। ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক, মধ্যবিত্ত পরিবর্তন চাইছে, পথ খুঁজছে নিজেদের মত করে। সময়ের দাবি রেখে, অনেকাংশেই, ফ্রন্টিয়ার হয়ে উঠেছিল এই পরিবর্তনের মুখপত্র। এই আমাদের শহর কলকাতায় বসে, ফ্রন্টিয়ার শপথ নিল, যে খোলা চোখে দেখবে, পর্যালোচনা করবে নিজেদের সময়টাকে ধরে। সেই তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণী শক্তির বহু নমুনা ছড়িয়ে আছে ফ্রন্টিয়ারের পাতায় পাতায়।

সমর সেনের পর পত্রিকাটির দায়িত্ব নিলেন তিমির বসু। ৬১, মট লেন, কলকাতা ১৩-র ভাঙাচোরা বাড়িতে অফিস। সেখান থেকেই বেরোয় বছরে বাহান্নটি সংখ্যা। বহু প্রতিকূলতার মধ্যে। কোনো স্পন্সর বা বড় ফান্ডিং-এর গল্প নেই। অর্থনৈতিকভাবে টেনেটুনে কাজ চলে। মূলত, গ্রাহক, আজীবন সদস্য ও গুণগ্রাহীদের টাকায়। ইদানীং কোনো বিজ্ঞাপনও আর পাওয়া যায় না।

তিমির বসুর বয়স বাহাত্তর পেরিয়েছে এই জানুয়ারিতে। কিন্তু যেকোনো যোদ্ধার মতোই তিনি হাল ছাড়তে নারাজ। মূলস্রোতের বাইরে দীর্ঘদিন কাজ চালিয়ে যাওয়ার কঠিন লড়াই, বাজারের কাছে মাথা নত না করার স্পর্ধা — এসবেরই প্রতীক ফ্রন্টিয়ার। খুঁড়িয়ে চললেও বন্ধ হয়নি তার কাজ।

বর্তমানে তিমির বসু অসুস্থ ও শয্যাশায়ী। আর কীভাবেই বা শুভকামনা ও শ্রদ্ধাঞ্জলি জানাতে পারি আমরা, এ প্রজন্মের পাঠকদের কাছে, ফ্রন্টিয়ারের নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামের কাহিনী তুলে ধরা ছাড়া?

এই সাক্ষাৎকারটির প্রথম প্রকাশ আমাদের বইমেলা ২০১৯ সংখ্যায়। ছবির সূত্র – বিভিন্ন অনলাইন ও মুদ্রিত পত্রপত্রিকা।

 

তিমির বসু

আয়নানগর : ফ্রন্টিয়ার ১৯৬৮তে শুরু। গত এপ্রিল মাসে পঞ্চাশ বছর হয়ে গেল। পঞ্চাশ বছর ধরে চলছে একটা পত্রিকা, উইকলি বেরোচ্ছে — তার চরিত্র রাজনৈতিক এবং আর্থ-সামাজিক, দুইই। এই পঞ্চাশ বছরটাকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

তিমির বসু : এটা তো আমাদের পরিচিত যাঁরাই আছেন দেশেবিদেশে, সবাই মোটামুটি একটা গ্রেট অ্যাচিভমেন্ট হিসেবেই দেখছেন। ফিফটি ইয়ার্স। উইদাউট এনি ফেইল, উইদাউট এনি ব্রেক। এভরি উইক। বছরে বাহান্নটা সপ্তাহে বাহান্নটা ইশ্যুই বেরোয়। এছাড়া চারটে উইক নিয়ে স্পেশাল একটা কম্বাইনড ইশ্যু। পঞ্চাশ বছরে কখনও বন্ধ হয়নি। এমনকি এমার্জেন্সির সময়েও না। সেসময় প্রথমদিকে সমরবাবু কিছু মেটিরিয়াল সেন্সরের জন্য পাঠাতেন রাইটার্স বিল্ডিং-এ। তারপর আর পাঠাতেন না, এমনিই ছেপে দিতেন। সেই হিসেবে লাস্ট ফিফটি ইয়ার্স ফ্রন্টিয়ার কন্টিন্যুয়াস চলেছে। এর পিছনে তো কেউ একা না, বিভিন্নজন বিভিন্নভাবে সাহায্য করেছেন — দেশে, বিদেশে। নয়তো এটা চলত না। ফ্রন্টিয়ার-এ আমরা বিজ্ঞাপন পাই না — এটা একটা বড় সমস্যা। তবু তার মধ্যেও কিন্তু, এমনকি বুর্জোয়া লিবারালদের মধ্যেও, এমন-এমন লোক আছেন, যাঁরা বিজ্ঞাপন দিয়ে গেছেন। যেহেতু সমর সেনের কাগজ, বা আমাদের কাগজ — আমি যখন পার্সোনালি অ্যাপ্রোচ করেছি, তখন তাঁরা বিজ্ঞাপন দিয়েছেন। যেমন এম জে আকবর, যাকে নিয়ে এখন এত কাণ্ড। আকবর ফ্রন্টিয়ারকে যেভাবে বিজ্ঞাপন দিয়ে হেল্প করেছে, কেউ করেনি। কোনো বিপ্লবী সোর্স এটা করেনি। ও তখন টেলিগ্রাফ-এ ছিল। ক্যাপিটাল বলে একটা কাগজ বেরোত। ওখান থেকেও ও কিছু বিজ্ঞাপন যোগাড় করে দেয়। আকবরের সাথে এপিজে গ্রুপের বেশ ভালো সম্পর্ক ছিল। ওদের মালিক ছিল সুরেন্দ্র পাল ইত্যাদি। পরে সুরেন্দ্রকে আলফারা আসামে খুন করে। যতদিন বেঁচে ছিল, আকবর রেগুলার ওদের থেকে একটা-দুটো করে বিজ্ঞাপন দিয়ে গেছে। আরও বিভিন্ন ভাবে হেল্প করেছে। এই জায়গাটা আজ আর নেই। বুর্জোয়া লিবারলরা তো বটেই, এমনকী প্রতিষ্ঠিত বাম লিবারালরাও ‘ফ্রন্টিয়ার’ বিপদে পড়েছে জেনেও এগিয়ে আসেন না।

বিজ্ঞাপন আমরা পাই না। অনেকে লাইফ মেম্বারশিপের জন্য চেষ্টা করেছে, যে কীভাবে আরও লাইফ মেম্বারশিপ করানো যায়। বিদেশেও। বিদেশীদের মধ্যে জন [Jan Myrdal] এখনও বেঁচে আছে। প্রায়ই আমাকে মেইল করে। গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক এখনও আছেন। আমি গায়ত্রীদিকে দিয়ে অনেক লিখিয়েছি। উনি কিন্তু যেখানেই যান, ফ্রন্টিয়ার-এর কথা বলেন। সবসময় হেল্প করার চেষ্টা করেন। তা এরকম লোকজন তো আছেন, যাঁরা মনে করেন, যে ফ্রন্টিয়ার চলুক শত অসুবিধা সত্ত্বেও। কিন্তু মাঝে মাঝে এতই প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে পড়তে হয়… এই তো দেখুন বাড়ি ভেঙ্গে পড়ছে। দুর্বারের অফিসের ওখানে একটা ছোট ঘরে আমরা শিফ্ট করছি।

তারপরেও যেটা হচ্ছে, আমার পার্সোনালি যেটা মনে হচ্ছে, যে সাহসী ছেলেরও অভাব আছে। সমরবাবু যখন আমায় ফ্রন্টিয়ার দিয়ে যান, তখন কিন্তু তার সাথে একটা কানাকড়িও ছিল না। উল্টে আমি এসে দেখলাম ওভারড্রাফ্টে চলছে। কেলেঙ্কারি অবস্থা। ১৯৬৮-তে ফ্রন্টিয়ার চালু হয়েছে তো? তার আগে থেকেই প্রসেসটা চলছে। সমরবাবুর কাজিন ছিলেন ইউবিআই-এর প্রাইভেট ওনারদের মধ্যে একজন। তাই কাজটা ওইভাবে হয়ে গেছিল। ম্যানেজার এসে সমরবাবুকে দিয়ে সই করিয়ে নিয়ে গিয়ে অ্যাকাউন্ট খুলে দিয়েছিল আর একটা ওভারড্রাফ্ট ফেসিলিটিও চালু করে দিয়েছিল। এসব ব্যাঙ্ক ন্যাশনালাইজেশন-এর আগের কথা। বহু কষ্টে সেই ওভারড্রাফ্টটা কাটিয়েছি।

আয়নানগর : আচ্ছা, পঞ্চাশ বছর আগে সমরবাবু ফ্রন্টিয়ার শুরু করলেন। তাঁর তো একটা রাজনৈতিক-সামাজিক অবজেক্টিভ ছিল। পঞ্চাশ বছর বাদে এসে আপনি সেই রেস্পেক্টে ফ্রন্টিয়ার-কে কীভাবে দেখছেন?

Continue reading