মণিপুরের রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রেক্ষিতে হেইসনাম কানহাইলাল-এর কথকতা এবং ‘পেবেত’ নাটক (১৯৭৫)

তৃণা নিলীনা বন্দ্যোপাধ্যায়

২০১৬ সালে চলে গেলেন প্রবাদপ্রতিম নাট্যকর্মী হেইসনাম কানহাইলাল। তাঁর সহকর্মী ও স্ত্রী সাবিত্রী হেইসনাম ও অন্যান্য সহকর্মীরা তাঁদের নাট্যদল কলাক্ষেত্র মণিপুরকে ঘিরে এখনো কাজ করে চলেছেন। কানহাইলালের নাটক ও জীবন এদেশে তথা সারা পৃথিবীতেই আঞ্চলিকতা, শিল্প-সংস্কৃতি-ভাষা ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে যে ভেদবাদী, ক্ষমতাবাদী  রাজনীতি, তার বিপরীতে দাঁড়িয়েছে। এই লেখাটির প্রথম প্রকাশ – আয়নানগর বইমেলা ২০১৯ সংখ্যা। তৃণা নিলীনা বন্দ্যোপাধ্যায় পেশায় শিক্ষক ও গবেষক, পারফর্মেন্স স্টাডিজ নিয়ে কাজ করেন। কানহাইলাল, সাবিত্রী ও কলাক্ষেত্র মণিপুর দলের সাথে দীর্ঘ ও গভীর ব্যক্তিগত ও গবেষণাগত সম্পর্ক।

(১) পূর্বকথন : মণিপুরের ঔপনিবেশিক অতীত ও বর্তমান

হেইসনাম কানহাইলাল “পেবেত” নাটকটি প্রথম মঞ্চস্থ করেন ১৯৭৫ সালে ইম্ফল শহরে। ভারতে তখন জরুরী অবস্থা চলছে। মণিপুরের রাজনীতিতেও এই সময় টালমাটাল অবস্থা। ইম্ফল শহরে এবং তার আশেপাশের গ্রামীণ এলাকাগুলিতে ভারতীয় রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে জনরোষ বেড়েই চলেছে। বহু ছোটখাটো জনসংগঠন এই সময়ে গড়ে উঠতে শুরু করেছে যারা মেইতেই গোষ্ঠীর সত্ত্বা ও অস্তিত্বের লড়াই বিষয়ে মুখর হয়ে উঠছে। এই সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলিরই পথ অনুসরণ করে পরবর্তীকালে, অর্থাৎ ১৯৮০ এবং ৯০-এর দশকে, এক সার্বিকভাবে জোরালো রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে ওঠে যার অনেকগুলি দাবীর মধ্যে একটি ছিল ভারতের আধিপত্য ও শাসন থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা। ৭০-এর দশক থেকেই, এই বেড়ে উঠতে থাকা সাংস্কৃতিক আন্দোলনগুলি সাধারণের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা বাড়াতে থাকে এবং মণিপুরী মানুষজনকে মনে করিয়ে দেয় ১৯৪৭-এর ‘স্বাধীনতা’ পরবর্তীকালে ভারতীয় রাষ্ট্রের আগ্রাসনের ইতিহাস। এই ইতিহাস বিষয়ে আমরা কিছু পরে বিশদে কথা বলব।

অবশ্যই, ১৯৪৯-এর রাজনৈতিক অধিগ্রহণই মূল ভূখণ্ডের এই অঞ্চলের ওপর প্রথম আগ্রাসনের নিদর্শন নয়। ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দু সভ্যতার মণিপুরের ওপর সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় আধিপত্য বিস্তারের ইতিহাস আরও অনেক পুরনো ও সুদূরপ্রসারী। তারই প্রেক্ষিতে আমাদের বুঝতে হবে ৬০ ও ৭০ দশকের এই মেইতেই সাংস্কৃতিক পুনরুত্থানকে। অষ্টাদশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে রাজা চরাই রংবা-র শাসনকালে (১৬৯৭ খৃ-১৭০৬ খৃ) আসাম ও বঙ্গের সাথে যোগাযোগের ফলে বৈষ্ণব ধর্মের প্রভাব মণিপুরে বাড়তে থাকে। তবে এই প্রভাববৃদ্ধি জনগণের নিজেদের মধ্য থেকে উৎসারিত কোনও স্বাভাবিক বা স্বতঃস্ফূর্ত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ঘটে না। বরং এটি সংগঠিত হয় মণিপুরের তৎকালীন রাজাদের খেয়ালখুশি মাফিক, কিছুটা জোর করে আর খানিক শাস্তির ভয় দেখিয়ে। ১৭০৯ সালে গরিব নিওাজ রাজা হওয়ার পর, বিভিন্ন মণিপুরি ঐতিহাসিকদের মতে, বৈষ্ণব ধর্ম একরকম জোর করেই মণিপুরী জনতার ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হয়। হিন্দু ধর্ম হয়ে ওঠে মণিপুর রাজ্যের সরকারী ধর্ম অথবা ‘স্টেট রিলিজিয়ন’। এর আগে, রাজা চরাই রংবা শুধুমাত্র ব্যক্তিগতভাবে পৈতে ধারণ করেছিলেন। জনতার ওপর তিনি তাঁর নিজের বিশ্বাস চাপিয়ে দেননি, না মেইতেইদের নিজস্ব ধর্মকে কোনভাবে অবৈধ ঘোষণা করেছিলেন। গরিব নিওাজ কিন্তু ব্যক্তিগত ধর্মাচার নিয়ে সন্তুষ্ট থাকলেন না। এই অঞ্চলের পরম্পরাগত ধর্মকে (যাকে আজ “সানামাহি” ধর্ম বলা হয়) সরিয়ে রেখে জনতাকে বাধ্য করলেন হিন্দু ধর্ম মেনে নিতে। এতে মণিপুরের রাজবংশের ও শাসনব্যবস্থার প্রত্যক্ষ মদতদারি ছিল। উপরন্তু, যারা এই আচার-অনুষ্ঠান মেনে চলতে অস্বীকার করেন বা সানামাহির রীতিনীতিগুলি চালিয়ে যেতে থাকেন তাদের জন্য বরাদ্দ হয় কঠোর শাস্তি।

এই রাজকীয় ধার্মিক আস্ফালনের এবং অত্যাচারের ফল হয় নানাবিধ। সানামাহির ধর্মযাজক ও পুরোহিতদের (“মাইবা”) তরফ থেকে গরিব নিওাজের বিরুদ্ধে একধরনের বিদ্রোহ গড়ে ওঠে, কিন্তু তা বেশীদিন টেঁকে না। অন্যদিকে সানামাহি ধর্মের আচার-আচরণকে সম্পূর্ণ নির্মূল করে ফেলা অসম্ভব প্রমাণিত হয়। বরং যেটা ঘটে সেটা হল দৈনন্দিন আচার-আচরণে সানামাহি ও বৈষ্ণব ধর্মের এক ধরনের অদ্ভুত সংমিশ্রণ। এক ধর্মীয় পরতের ওপর চাপে আরেক পরত; তবে পূর্বের পরতটি সম্পূর্ণ মুছে যায় না। তৈরি হয় একধরনের ‘পালিম্পসেস্ট’। যেমন পরম্পরাগত ‘লাই হারাওবা’ উৎসবের মধ্যে আমরা আজও দেখতে পাই বৈষ্ণব ধর্মাচারের কিছু ছায়া। আবার মণিপুরের ‘রাসলীলা’ উৎসব সারা ভারতের রাসলীলার থেকে বহুলাংশে আলাদা — সাজপোশাক, মণ্ডপসজ্জা এবং বিশেষত নৃত্যগীতের মধ্যে দেখা যায় ‘লাই হারাওবা’র নাচের বা ‘থাংতা’-র চলনের ছাপ।

Continue reading