মুসলমানের কথা, মুসলমানির কথা

দেবাশিস আইচ

সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদ বিরোধী নাগরিক উদ্যোগ থেকে প্রকাশিত ‘পশ্চিমবঙ্গ – সাম্প্রতিক দাঙ্গাচিত্র ও নেপথ্য রাজনীতি’ বইটিতে প্রকাশিত প্রায় কুড়িটি লেখার মধ্যে দেবাশিস আইচের এই লেখাটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি লেখা। আয়নানগর এই উদ্যোগের সহযোগী হিসেবে ইতিমধ্যেই এই সঙ্কলনের সম্পাদক ও লেখক বিশ্বজিৎ রায়ের বসিরহাট রিপোর্ট প্রকাশ করেছে ধারাবাহিক ভাবে, ইংরিজিতে। সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়িয়ে বাংলা ও বাকি ভারতে ক্ষমতা দখলের যে রাজনীতি বর্তমান সরকার চালাচ্ছে, তার বিরুদ্ধে হাতে হাত মিলিয়ে লড়াইয়েরই গুরুত্বপূর্ণ অংশ এইজাতীয় লেখা ও প্রকাশনা। আশা রাখি এই লেখাগুলি অন্তত কিছু পাঠকের ভাবনার ফসল হবে।

সাংবাদিক দেবাশিস আইচ বেশ কিছু সময় ধরে দেশের বর্তমান সাম্প্রদায়িকতামূলক ঘটনা নিয়ে লিখে চলেছেন। তাঁর গো-হত্যা ও আইন নিয়ে লেখা ইতিপূর্বে আয়নানগরে প্রকাশিত হয়েছে।

সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদ বিরোধী নাগরিক উদ্যোগ-এর সাথে যোগাযোগ করুন ফেসবুকে বা ৯৮৩০৪১১৫২৫ বা ৯৪৩৩০১২৭২৮ নম্বরে।

আসন দিব হৃদমাঝারে হে…

টানা বৃষ্টির পূর্বাভাস ছিলই। ভোররাতেই ঝেঁপে নামল। সেদিন ছিল ৯ ডিসেম্বর, ২০১৭। দুপুরের আগেই মুর্শিদাবাদের ভগবানগোলার কালুখালি গ্রামে   পৌঁছানোর কথা। বৃষ্টি মাথায় নিয়ে রওনা দেওয়া গেল। ভেবেছিলাম যত উত্তরে এগোব, বৃষ্টি তত দূরে যাবে। হা হতোস্মি, কালুখালি গ্রামে যাওয়ার জন্য সুবর্ণমৃগী স্টেশনে নামলাম ছাতা খুলেই। মনে পড়ল, পূর্বাভাস ছিল বৃষ্টি হবে গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে। তবে আর কালুখালি বঞ্চিত থাকবে কেন? আমরা তো বদ্বীপ পেরিয়েও যাইনি। মনে খচখচানি বাড়ে, এই বৃষ্টি যদি চলতে থাকে তবে ‘বাউল-ফকির সঙ্ঘের সম্মেলন’ ভেসে যাবে না তো? আর আমাদের যা জানতে চাওয়া, বুঝতে চাওয়া তাও কি এই আবহাওয়া ভেস্তে দেবে?

সম্মেলনের অন্যতম ঘোষিত উদ্দেশ্য ছিল, সাম্প্রদায়িকতার সমস্যা, বাউল-ফকিরদের সমস্যা নিয়ে অতিথি ও সাধকদের আলাপচারিতা। আমাদেরও উদ্দেশ্য ছিল সাম্প্রদায়িকতার বসত কতদূর বিস্তৃত হয়েছে, তা যতটুকু পারা যায় জেনে বুঝে নেওয়া। আমরা জেনেই গিয়েছিলাম মুর্শিদাবাদের পিরপন্থী সাধকরা আক্রান্ত হচ্ছেন। তাদের দরবার বা খানকা শরিফ ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এক-আধটা নয় অন্তত খান তিনেক। শরিয়তপন্থীদের হাতে ফকিরদের আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা নতুন নয়। কিন্তু, সুফি পিরদের উপর আক্রমণ নতুন। তবে কি বর্তমান পরিস্থিতিতে ফকিরদের উপর নির্যাতন নতুন মাত্রা নিল? অতীতের সঙ্গে তার ফারাক ঠিক কতদূর, কোন মাত্রায়? এ বুঝে নেওয়া এক জরুরি কর্তব্য। এই সময়ে  তাড়নাজাত বটে। সত্যি কথা বলতে কী, একে প্রতিকূল আবহাওয়া, সেই আবহাওয়ায় কর্তাব্যক্তিদের সম্মেলন জারি রাখার আপ্রাণ প্রচেষ্টা, সীমিত সময় —- আক্রমণের কিছু ঘটনার হদিশ দিল মাত্র। তার চেয়েও সত্যি কথা, বিন্দুতে সিন্ধু-প্রমাণ জ্ঞান লাভের বিদ্যা এ কলমচির অধিগম্য নয়। নুড়িও কুড়োনো হল না। জানাই হল না, “আমার এই ঘরখানায় কে বিরাজ করে / জনম ভরিয়া একদিনও না একদিনও না দেখলাম তারে।” ‘ফকিরনামা’র লেখক জানাচ্ছেন, তিনি এই গান শুনেছিলেন মুর্শিদাবাদের এক দিনমজুর আবেদ ফকিরের মুখে। শরিয়তিরা তাঁর ঘর ভেঙেছে, মারধোর করে তাড়িয়েছে গ্রাম থেকেও। আবেদ তবু লালনের গান গেয়ে বেড়ান। তাঁর দুনিয়া মারফতি দুনিয়া। লালন আর তাঁর আমলের বাউল-ফকিররা কি শাস্ত্রাচারী হিন্দু আর শরিয়তপন্থী মুসলমানদের কম অবজ্ঞা-অশ্রদ্ধার শিকার হয়েছেন? একতারার বিরুদ্ধে লাঠি ধরতে যেমন পিছপা হয়নি বাংলার আলেমসমাজ তেমনই ওহাবি, ফারায়াজি, আহলে হাদিসের মতো ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলনের ফলে অত্যাচার, নিগ্রহ বেড়ে উঠেছিল। কাজী আবদুল ওদুদ আক্ষেপ করে বলেছিলেন, “এই মারফত-পন্থীদের বিরুদ্ধে আমাদের আলেম-সম্প্রদায় তাঁদের শক্তি প্রয়োগ করেছেন, আপনারা জানেন। এই শক্তি প্রয়োগ দূষণীয় নয় — সংঘর্ষ চিরদিনই জগতে আছে এবং চিরদিনই জগতে থাকবে। তাছাড়া এক যুগ যে সাধনাকে মূর্ত করে তুলল, অন্য যুগের ক্ষুধা তাতে নাও মিটতে পারে। কিন্তু আলেমদের এই শক্তি প্রয়োগের বিরুদ্ধে কথা বলার সব চাইতে বড় প্রয়োজন এইখানে যে সাধনার দ্বারা সাধনাকে জয় করবার চেষ্টা তাঁরা করেননি, তার পরিবর্তে অপেক্ষাকৃত দুর্বলকে লাঠির জোরে তাঁরা দাবিয়ে দিতে চেয়েছেন। এ-দেশী মারফত-পন্থীদের সাধনার পরিবর্তে যদি একটা বৃহত্তর পূর্ণতার সাধনার সঙ্গে বাংলার যোগসাধনের চেষ্টা আমাদের আলেমদের ভিতরে সত্য হতো, তাহলে তাঁদের কাছ থেকে শুধু বাউলধ্বংস আর নাসারাদলন ফতোয়াই পেতাম না।”

Continue reading