‘স্বভাব কলকাতা’র বন্ধুদের সাথে আড্ডা

প্রথম প্রকাশ – আয়নানগর কলকাতা বইমেলা ২০১৭ 

“গত কয়েক বছরে কাজ করতে গিয়ে, আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে কিভাবে একটি ভিন্নধারার সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলা যায়, তা নিয়ে আমাদের বহু ব্যক্তি ও সংগঠনের সাথে কথাবার্তা হয়েছে।  স্বভাব কলকাতার বন্ধুরা তার মধ্যে অন্যতম।  যদিও আয়নানগর টিমের অনেকের সাথেই স্বভাব কলকাতার অনেকের ব্যক্তিগতভাবে আগে থেকেই একধরনের পরিচয় ও বন্ধুত্ব ছিল।  যেমন বন্ধুত্ব থাকে আর কি ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো জনগণের মধ্যে।

স্বভাব কলকাতা মূলত একটি থিয়েটার দল।  ওদের কাজকর্মের বিস্তৃত বিবরণ পাওয়া যাবে নিচের এই সাক্ষাৎকারটির মধ্য দিয়ে।  কাজেই, একটি দীর্ঘ প্রাক-কথার মধ্য দিয়ে পরিচয়পর্বটা আর প্রলম্বিত করব না।  “সাক্ষাৎকার” ঠিক সেইভাবে নিচের আলাপচারিতাকে বলা যাবে কিনা জানি না।  বরং, প্রলম্বিত আড্ডা বলাই বোধহয় ভালো।  কথা হয়েছিল দুই পর্যায়ে –   ২০১৪ সালের  গ্রীষ্ম কালে ও ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। পাঠকের সুবিধার্থে কিছুটা সম্পাদনা করা হয়েছে, যাতে করে আমাদের আড্ডার অগোছালোপনা থেকেও একটা মোটামুটি সুসংহত বক্তব্য বেরিয়ে আসে। ” –  আয়নানগর (নন্দিনী, প্রমোদ)

প্রথম পর্ব

স্বভাব কলকাতা

আয়নানগর : তোমাদের যা স্কিল আছে তাতে ইচ্ছে করলে অনেক সহজে কলকাতার অন্য কোনো দলের সাথে নাটক করতে পারতে।  সেটা না করে কেন ‘স্বভাব’, কেন আরেকটি থিয়েটার দল? কেন অন্যভাবে থিয়েটার করার প্রচেষ্টা? এখন সেখানে তোমাদের তিনজনের ব্যক্তিগতভাবে বিকাশের যে পথ, সেখানে তোমাদের আগের কাজকর্ম, অভিজ্ঞতা এবং সেখান থেকে একসাথে হওয়া—কিছুটা ‘স্বভাব’-এর যে জেনেসিসের গল্প, সেটা একটু বলো।

অঙ্কুর (বর্তিকাকে) : ‘স্বভাব’টা তুমি যেভাবে শুরু করেছিলে, সেটা বল। আমার ওখানে এসে পড়া, পার্থ কিভাবে এসে পড়ল—সেগুলোয় তারপরে ঢুকব।

বর্তিকা : ‘স্বভাব’ শুরু করেছিলাম ২০০৮-এ। সেইসময় একটা ক্রিয়েটিভ লার্নিং সেন্টার হিসেবে জিনিসটাকে দেখা হয়েছিলো। আমার ব্যক্তিগত জীবনে আমি যেভাবে বড় হয়েছি—খুব শেলটারড এনভায়রনমেন্ট, একটা কুকুন—যদিও বেড়ে উঠছি শহরের মধ্যেই। সেখানে আমি জাস্ট গাড়ি থেকে শহরটাকে চিনতাম। জাস্ট তোমার ওই পার্কস্ট্রীট, বালিগঞ্জ, আলিপুর—ওই কয়েকটা এলাকা। তো একটা সময় মনে হয়েছিলো, দরকার আছে শহরটাকে অন্যভাবে চেনা-জানা-দেখার। আসলে পড়াশুনো করার পর একটা সময় এলো যখন মনে হচ্ছিলো আমি কিছুই জানি না। অথচ আমি খুব ভালো স্টুডেন্ট ছিলাম, অলরাউন্ডারও বলতে পারো। কিন্তু যেটা বোঝা গেলো, যে আমি কোনো হাতের কাজ জানি না, শুধু মাথাটা ইউজ করতে জানি। কিন্তু বাড়িতে যেহেতু—রান্না হোক, জামাকাপড় ধোয়া হোক—সবকিছুর জন্য লোক ছিলো, তাই কখনো কিছু করতে হয়নি। তো আমি চাইছিলাম একটা স্পেস, যেখানে আমি আরও সেলফ-সাফিশিয়েন্ট হতে পারি। আর এটা আমার একার স্পেস হবে না, আরও বিভিন্ন লোকেরা এসে সেলফ-সাফিশিয়েন্ট, ইন্ডিপেন্ডেন্ট হতে পারবে। এই শহরে থেকেও কিভাবে অন্যভাবে বাঁচা যায়… মানে আমরা যেভাবে ওয়েস্ট জেনারেট করছি, প্রকৃতি থেকে যেভাবে আলাদা হয়েছি—এসবও আমাকে বদার করতো।

Continue reading

বানভাসি জীবনের জলছবি: মালদা, ১ সেপ্টেম্বর ২০১৭

দেবাশিস আইচ

দেবাশিস সাংবাদিক ও সমাজকর্মী। ছবি তুলেছেন পাঞ্চালি, শ্রাবন্তী, শ্যামলকুমার ও লেখক।

বৃষ্টি আসে, বৃষ্টি আসে বলে ব্রেক কষে ট্রাকের চালক। কেবিন থেকে তেরপল নিয়ে লাফ দিয়ে নামেন সুজিৎ সরকার, আমাদের পথ প্রদর্শক। জল ঝরাতে ঝরাতে ধেয়ে আসছে কালো মেঘ। ছোট ট্রাকটির পেট ভরা চিঁড়ে-গুড়-গুঁড়ো দুধ-বিস্কুট-ওআরএস-জলের পাউচ। আর একদল তরুণ তুর্কি। পাঞ্চালী, শ্রাবন্তী, জয়রাজ, অগ্নীশ্বর, সিদ্ধার্থ, সবুজ, প্রমোদরা। প্রায় চব্বিশ ঘণ্টা হবে দৌড়ে চলেছে ওরা।। এই তো কাঠপোড়া রোদ আর গরম হলকার হাত থেকে বাঁচতে মাথায় গামছা-দোপাট্টা যে যা পেয়েছে জড়িয়েছে।  ভাদ্রের পচা গরমে তাল-পাকা হয়ে যাওয়ার ভয়ে বোতল বোতল জল গলায় ঢেলেছে। মাথা-মুখ বাদ পড়েনি। খালি বোতলগুলো এখন গড়াগড়ি খাচ্ছে। বৃষ্টি এল।

দড়িদড়া দিয়ে আচ্ছাদন বেঁধেছেদে ছুটে আসা বৃষ্টির দিকে ধেয়ে গেল মাজদা। বৃষ্টির চক্রব্যুহে। জাতীয় সড়ক বেয়ে উদ্দাম ঔদ্ধত্যে। দু’ধারে বিস্তীর্ণ জলাভূমি থেকে ছুটে আসা পাগলা হাওয়া, অশ্বশক্তির গতি-তাণ্ডবের সঙ্গে মিলে ঝড় হয়ে আছড়ে পড়ে। কালো তেরপলটা উন্মত্তের মতো দাপাচ্ছে। কখনও ফুলে উঠছে, না কি ফুঁসে উঠছে! আবার কখনও আছড়ে পড়ছে। ঠিক যেমনটি আছাড়ি-পিছাড়ি কাঁদে অকালে সন্তান হারা মা কিংবা স্বামী হারা বউটি। এখন প্রাণপণ আচ্ছাদন আঁকড়ে পড়ে থাকা। সম্বল সামান্য হতে পারে, কিন্তু অনেক মানুষের পরিশ্রম, অর্থ, আকাঙখা, আবেগ জড়িয়ে আছে যে। তাকে তো বুক দিয়েই আগলে রাখতে হয়।  বাঁধ ভাঙা, পাড় উপচানো, খাল-বিল-পুকুর ভাসা, জমি ডোবা মানুষের অনেকেই আজও হাইওয়ে, পাকা রাস্তা, বাঁধের উপর তেরপলের তাঁবুতে ঠাঁই নিয়েছে। মাথা গোঁজার ঠাঁই। কোমর বাঁকিয়ে, মাথা নত করে কুঁকড়ে থাকা। ঘরও ডুবেছে যে। কী দুর্যোগ তাঁরা মাথায় নিয়ে কাল কাটাচ্ছে তারই কি একটা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র নমুনা রেখে গেল প্রকৃতি?

বৃষ্টি ধরেছে। ভর দুপুরে এখন মেঘলা কালো আকাশ, কালো রাস্তা, সার সার কালো তাঁবু আর কালো কালো মুখের সারি। এখানেই বেহুলার সেতুর উপর স্থলযাত্রার আপাত বিরতি। যেদিকে তাকানো যাক না কেন, কেবলই দিগন্ত বিস্তৃত প্লাবনভূমি। পশ্চিমে দুর্গাপুর, পুবে ময়না, দেবীদহ। দল ভাগ হল। ভাগাভাগি হল খাবার-দাবার, জল। ২৫ ফুট নিচে নরেশ মণ্ডলের নৌকা বাঁধা। এ ঘাট নয়, আঘাটা। বেহুলার খাত থেকে অন্তত ২০০ মিটার।  পুলকের হাঁকডাকে জুটে গেল কয়েকজন। সেতুর রেলিং টপকে গ্র‍্যানিটের বোল্ডার বাঁধানো ঢালু গা-বেয়ে পেটি,বস্তা কাঁধে নেমে গেল তাঁরা। ভাগে পড়েছে দুর্গাপুর গ্রাম। অঞ্চল আলাল, ব্লক গাজোল। বৃষ্টির জলের ছোঁয়ায় মসৃণ আগ্নেয়শিলা। রবারের চটি হড়কে যাবে ভেবে হাত-বন্দি। খালি পা দুই পাথরের খাঁজে রেখে রেখে নামা যাবে, ভাবনা ছিল এমনই। ঠিক যতটা মসৃণ পাথরের গা, ঠিক ততটাই ধারালো তার ধারগুলো। পায়ে কেটে বসছে যেন। মাথায় বোঝা নিয়ে সরসরিয়ে নামতে নামতে টেকনিক জানিয়ে গেলেন একজন। মাল নামিয়ে উঠতে উঠতে আরেকজন বললেন, চটি পরেই তো সুবিধা হত। দু’পা ছড়িয়ে, হাঁটু-কোমর ভেঙে, সামনের দিকে ঝুঁকে টেকনিক মানতে মানতে নামা গেল। অক্ষত। প্রমোদ, অগ্নির মতো তরুণেরা অবশ্য সাবলীল।

Continue reading