শিল্পী

নীতা মণ্ডল

(১)

‘কই গো ঘরের লোকগোলা সব কোথা গেলা গো?’

একটা বিশেষ সুরের ডাক। সঙ্গে ‘টক্-টক্-টক্-টক্’ তুড়ি বাজানোর শব্দ। এরকম জোরে তুড়ি বাজাতে ওরাই পারে। আগল ঠেলে ঢুকে পড়ল ফুলি। বছর পঁচিশের তরুণী। কালো কুচকুচে গায়ের রং। চোখে ধ্যাবড়া করে কাজল। চুলগুলো যত্ন করে তেল দিয়ে আঁচড়ানো। মাথার উপর চুড়ো করে বাঁধা খোঁপা। গলার দুপাশের উঁচু হয়ে থাকা হাড়ের মাঝখানে শোভা পাচ্ছে কয়েক ছড়া বুনো ফলের মালা। কপালে বড় করে আঁকা সিঁদুরের টিপ। ঠিক পূর্ণিমার চাঁদের মত গোল। দেখলেই বোঝা যায় অনেক যত্নে আঁকা। ঠোঁটে সস্তার রং। প্রায় কনুই পর্যন্ত রংবেরঙের কাঁচের চুড়ি। টকটকে লাল রঙের সস্তার সিন্থেটিক শাড়িখানা উঁচু করে পরা। শাড়ির নীচে নীল সায়ার ঝালর উঁকি মারছে। দুপায়ের পাতা আলতায় রাঙা। কাঁকে একটা বড় পেঁচে, বাঁশের তৈরি ঝুরিতে গোবর লেপা ধামা। বাঁ হাতের কুনুই দিয়ে রক্ষা করছে তার ভার। ওর পেছন পেছন একদল ছেলেমেয়েও ঢুকে পড়েছে।

ফুলি দুহাতে তুড়ি বাজিয়ে মুখে বিচিত্র শব্দে যন্ত্রসঙ্গীতের আবহ সৃষ্টি করল, ‘খেচাক দম- খেচাক দম- খেচাক দম…’

একটি ছয় সাত বছরের মেয়ে ওকে দেখেই লাফিয়ে নেমে এল উঠোনে। দাওয়ায় পড়ে থাকল বই, স্লেট আর পেনসিল। বড় বড় চোখদুটো মেলে, একমাথা ঝাঁকড়া রুক্ষ চুল দুলিয়ে কৌতূহলী সুরে বলল, ‘তোমরা আবার এসেছ? কোথায় তাঁবু ফেলেছ গো? ইশকুল ঘরে না কেলাবের ডাঙায়?’

ফুলির উত্তর দেওয়ার আগেই ওর পেছনে থেকে দলের পান্ডা কার্তিক উত্তর দিল, ‘কেলাবের ডাঙায়। তু বই গুটিয়ে চলে আয় ক্যানে। আজকে আমরা হাবু শুনব। আর কাল থেকে বহুরূপীর সঙ্গে যাব। খপর আছে, এবার রামায়ণের পালা দেখাবে।’

Continue reading