সাম্প্রদায়িকতার ভারতীয় ধরণ বিষয়ে কিছু খোঁজ খবর

সৌভিক ঘোষাল

সাহিত্যের ছাত্র। মার্ক্সবাদী মতাদর্শে আস্থাশীল। মার্ক্সবাদকে সমকাল ও ভারতীয় প্রেক্ষিতে জানাবোঝা ও প্রয়োগের কাজে যুক্ত।

একসময় মনে করা হয়েছিল আমাদের এই সময়টা সামন্ততন্ত্র, সাম্প্রদায়িক মৌলবাদ, কুসংস্কার, অপবিজ্ঞান সহ সমস্ত অধিবিদ্যার দর্শন ও তার যেন বা ক্রম হ্রাসমান সামাজিক প্রভাবকে ধীরে ধীরে পরাভূত করে সমাজতন্ত্র, বিজ্ঞান মনস্কতা, হেতুবাদী দর্শনের পথে এগিয়ে যাবে। জীবনানন্দের ভাষায় বলতে গেলে “এ পথে আলো জ্বেলে এ পথেই পৃথিবীর ক্রমমুক্তি হবে”। হতে পারে “সে অনেক শতাব্দীর মনীষীর কাজ,” কিন্তু হবে, একদিন হবে। এই স্বপ্নকে ভেঙে দিয়ে বাস্তবে অবশ্য বিপরীত ঘটনাগুলোকেই চোখের সামনে দেখতে দেখতে আমরা বেড়ে উঠলাম। গত শতাব্দীর শেষ দশক থেকে যেন ইতিহাসের স্বপ্নভঙ্গর মধ্যে দিয়ে প্রগতির বিপরীত পথে যাত্রা শুরু হল। বিশ্বজুড়ে এবং আমাদের দেশেও। সোভিয়েত সমাজবাদের পতন হল, বার্লিনের প্রাচীর ধ্বসে পড়ল, ওয়াশিংটন কনসেন্সাস ও বিশ্বব্যাঙ্ক – আই এম এফ চালাতে লাগলো কর্পোরেট ঘরানার মুনাফা সর্বস্ব দুনিয়ার অর্থনীতি, ধারা পাল্টালো মাও সে তুং-এর চিনও, ইরান সহ নানাদেশে ইসলামিক বিপ্লব হল,  মুক্তিযুদ্ধে জন্ম নেওয়া ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ঘোষিত হল ইসলাম আর ভারতে বাবরি মসজিদকে ধুলোয় লুটিয়ে দেওয়া হল, কেন্দ্রীয় ক্ষমতা দখল করল হিন্দুরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন নিয়ে নয় দশক অতিক্রম করা রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘের রাজনৈতিক মুখ ভারতীয় জনতা পার্টি।

তবু যাঁরা মনে করেন “এই পৃথিবীর রণ রক্ত সফলতা সত্য/ কিন্তু শেষ সত্য নয়”, যাঁরা অপেক্ষা করে আছেন নতুন এক আরম্ভের জন্য, তাঁদের অবশ্যই অনেক রক্তাক্ত পথ অতিক্রম করতে হবে। দেখতে হবে বোবা করে দেওয়া রক্তঝরা অনেক কঠিন মুহূর্ত। দেশে এবং বিশ্বজুড়ে। কোথাও পেশোয়ারের স্কুলে বাচ্চা ছেলেদের খুন করা হবে ইসলামের নামে তো কোথাও ড্রোন হামলায় সাম্রাজ্যবাদী শক্তি এই কাজ করবে নিজেদের বাড়িয়ে তোলা মৌলবাদকে ধ্বংস করার নামে। কোথাও জামাতী ইসলামী কাফের এর কল্লা নামাবে বা ইসলামিক স্টেট, বোকো হারাম, আল কায়দা, তালিবানরা গুঁড়িয়ে দেবে সভ্যতার চেনা যাবতীয় ছককে তো কোথাও ঘটানো হবে গুজরাট ২০০২ বা মুসলিম সংখ্যালঘু সংঘারের স্টেট স্পনসর্ড টেররিজম। উপমহাদেশের এখানে ওখানে খুন হয়ে যাবেন দাভোলকর পানেসর বা অভিজিৎরা। শুধু মুক্তচিন্তার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকার জন্য, ধর্মীয় মৌলবাদ বা কুসংস্কার এর বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলে কায়েমী স্বার্থে আঘাত হানার জন্য। রক্ত ঝরবে আর রক্তের মধ্যে থেকেই উঠে আসবে প্রতিবাদ। শার্লে হেবদোর হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে যেমন পথে নামবে মানুষ, তেমনি বাংলাদেশ দেখবে জামাতি তাণ্ডবের বিরুদ্ধে শাহবাগের স্পর্ধাকে, খাপ-এর বিরুদ্ধে, পুরুষতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে ‘নির্ভয় স্বাধীনতা’র আন্দোলন ছড়িয়ে পড়বে দিল্লি থেকে সর্বত্র।

সঙ্কটগুলিকে পেরোতে হলে তার পরতগুলিকে নিবিড়ভাবে বোঝা দরকার।  আমাদের বর্তমান প্রবন্ধ আমাদের দেশের তথা উপমহাদেশের অন্যতম সমস্যা ধর্মীয় মৌলবাদের বিষয়টিকে বোঝার কিছু চেষ্টা করেছে। চেষ্টা করেছে ইতিহাসগত প্রেক্ষাপট থেকে তাকে বোঝার। মূলত হিন্দু মৌলবাদ আর মুসলিম মৌলবাদের ইতিহাসকে আলাদা আলাদাভাবে ফিরে পড়তে চেয়েছি আমরা। সাম্প্রদায়িক সঙ্কটের মোকাবিলা কোন কোন পথে করা যেতে পারে, সেই জরুরী আলোচনাতে আমরা এখানে প্রবেশ করিনি। ইতিহাসটাকে জানা বোঝা সমাধানের হদিশ সন্ধানের কাজে সাহায্য করে থাকে এটুকুমাত্র এখানে বলার।

হিন্দু মৌলবাদ : ইতিহাসের দিকে ফিরে

৩ অক্টোবর ২০১৪, বিজয়া দশমীর দিনটাতে একটা বিশেষ ঘটনা ঘটল। সেদিন বেতারে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। আর দূরদর্শনের মতো সরকারী প্রচারমাধ্যমে ‘জাতির উদ্দেশ্যে’ বক্তব্য রাখার জন্য সসম্মানে জায়গা করে দেওয়া হল বর্তমান সঙ্ঘচালক মোহন ভাগবতকে। চিরাচরিত প্রথা অনুযায়ী প্রজাতন্ত্র দিবস বা স্বাধীনতা দিবসে প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন। সেই চিরাচরিত প্রথার সঙ্গে বিজয়া দশমীর দিনটাকে কেন জুড়ে নেওয়া হল নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর ?

Continue reading