কণিকা

অনুরাগ দাস

অনুরাগ দাসের পৃথিবী গদ্যময়। গদ্যের ডানায় ভর করে উনি এক মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশে, এক শতাব্দী থেকে অন্য শতাব্দীতে উড়ে বেড়াতে ভালবাসেন। ওঁর সবচেয়ে পছন্দের উড়াল – ফুটনোট।  ভারি কোনো গদ্যের পুঁচকে কোনো ফুটনোটের পালকের ওম নিতে নিতে প্রায়ই উনি হারিয়ে ফেলেন নিজেকে – অচেনা কোনো স্পেসটাইমে। ওর লেখা মানে একটু জিরোনো – ওই গদ্যেই।

কণিকা দূরে কোথাও চলে গেছে। বা, কণিকা হয়তো কলকাতাতেই,আমি জানি না। প্রায় বছর দুই আগে ওকে শেষ দেখেছিলাম। গোলপার্কে। ফোন করে আমাকে ডেকেছিল কণিকা। একটা গাছতলায় দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ কথা বলেছিলাম আমরা। তারপর গোলপার্কের-ই একটা রেস্তরাঁয় ঢুকে খেয়েছিলাম। সেদিন পেট পুরে চিলি চিকেন খেয়ে রেস্তরাঁ থেকে বেরিয়ে কণিকা ঘোষণা করেছিল, “এই শেষ, এই আমাদের শেষ সাক্ষাৎকার।” একেবারে আচমকা ঘোষণা; আর একতরফা। আমি অবশ্য চমকে যাইনি। বা, আমার তরফে পাল্টা কোনো ঘোষণা করিনি। আমি বরং খুশি হয়েছিলাম। কেননা, ওর উচ্চারণের ভঙ্গিটা ছিল চমৎকার সাবলীল। অনুপ্রাসহীন, দ্ব্যর্থহীন। ওরকম স্পষ্ট উচ্চারণে আমি হাজারবার প্রত্যাখ্যাত হতেও রাজী। ঘোষণার সময় কণিকাকে বেশ সপ্রতিভ দেখাচ্ছিল। একরাশ সোনালি আভার চুল, নিখুঁত মুখের রেখা, চোখের তারায় আশ্চর্য ছিনিমিনি। আর সবচেয়ে বড় কথা – দারুণ আত্মপ্রত্যয় ছড়ানো ছিল ওর শরীরী বিভঙ্গে। আমি হেসে বলেছিলাম, “বেশ তো। কিন্তু এই আনুষ্ঠানিক শেষের দরকার ছিল কিছু? নাহয় না-ই দেখা হত আর।” কণিকা একবার চোখ তুলে তাকিয়েছিল আমার দিকে। একবার-ই। উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি। রোদচশমায় চোখদুটো ঢেকে সটান হাঁটা দিয়েছিল লেকপাড়ের গাছগাছালির তলা দিয়ে। আর দেখিনি কোনোদিন। বছর দুই কেটে গেছে, একবারও না। স্বপ্নেও না, কল্পনাতেও না। 

আজ ফার্ন রোডের মুখটাতে বাস ধরার জন্য দাঁড়িয়ে আছি। খামোখা-ই কণিকাকে মনে পড়ে গেল। সেই কবেকার তামাদি কণিকা! স্মৃতির পাতায় দু’বছরে কতই না ওলটপালট ঘটে গেছে! আজ দুম করে বিস্মৃতির ধূলট আস্তরণ ফুঁড়ে স্মৃতির উপরিতলে ভেসে উঠল। উটকো আগন্তুকের মতো। অবাঞ্ছিতের মতো। নিজেকে ভীষণ বুরবক মনে হল আমার। একটা সিগারেট ধরালাম। অথচ ফার্ন রোড ধরে হেঁটে আসার সময় পুরানো বন্ধু অরুণের বাবার কথা ভাবছিলাম। কী মানুষ কী হয়ে গেল!  কোটি টাকার ব্যবসা লাটে তুলে দিয়ে স্কিজোফ্রেনিয়ায় জড়িয়ে পড়ল। গতকালই অরুণের কাতর আহ্বান, “একবার আসিস। একা সামাল দিতে পারছি না। ফ্যাটাল কিছু যখন খুশি ঘটে যেতে পারে।” যাবার ইচ্ছা ছিল না। এইসব লোক আত্মহত্যা করে না কেন? গিয়ে দেখি ধুন্ধুমার কাণ্ড। ভদ্রলোক একখানা ধারালো ছুরি নিয়ে ঘরময় দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। বাড়ির দলিলখানা বুকের সঙ্গে সাপটে ধরে রাখা। সামনে কেউ এলেই খুন করে ফেলবেন। দুনিয়াসুদ্ধ লোক সবাই নাকি চক্রান্ত করে ওঁর শেষ সম্বলটুকু কেড়ে নেবে! পরিবারের কাউকেও বিশ্বাস নেই! এই পরিবেশে আমার বিবমিষা হয়। কিন্তু ,অগত্যা। নাক চোখ বুজিয়ে সহ্য করলাম। অনেকক্ষণ তক্কে তক্কে থেকে অরুণ আর আমি চকিত আক্রমণে ওঁর হাত থেকে ছুরিটা ছিটকে দিতে পারলাম। তারপর ভদ্রলোকের হাতদুটো পিছমোড়া করে বেঁধে একটা ট্যাক্সিতে তুলে নিয়ে গেলাম দত্তপুকুর মেন্টাল অ্যাসাইলামে। লোহার খাটের সঙ্গে বাঁধা হল। ইলেকট্রিকের শক দেওয়া হল। শক থেরাপি চলবে।

একটা ফাঁকা মিনিবাস বেরিয়ে গেল। আশ্চর্য! টেরই পেলাম না! ওটা নিশ্চয়ই কসবা-গার্ডেনরিচ,নইলে অতো ফাঁকা হত না। অফিসে অ্যাটেন্ডেসের বেশ কড়াকড়ি। দৌড়ে পরের স্টপে ধরব কিনা ভাবলাম। দৌড়লাম না।

রাস্তার ওপারে টেমস হোটেল। গেটে প্রচুর বেগনি রঙের বুগানভেলিয়া। ওই লতানে ছায়ায় এক প্রেমিক-প্রেমিকা গায়ে-গা লাগিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ওরা চুমু খাচ্ছে। প্রকাশ্যে চুমু খাওয়া আর অবৈধ নয়। কেন খাচ্ছে? হয়তো ওরাও জানে না। নিরর্থক চুমু। ইউরোপীয় চুমু নয়, বেশ বাংলা চুমু। বাংলা চুমুও রসকষ হারিয়ে জুতোর সুকতলা বনে গেল। আর প্রেম করতে গেলে অত চুমুরই বা প্রয়োজন কীসের? একটা নিরর্থক রিচুয়াল বৈ তো নয়। ক্লান্তি নেই ওদের? আমি ওদের চেহারাদুটো দেখছিলাম। চমৎকার চেহারা, চমৎকার পিছন। শরীর কত ফোরফ্রন্টে এসে গেছে এখন!

মেয়েটা একটু ঘুরে দাঁড়াল এবার। একেবারে ফুলফ্রন্টাল ভিউ পাওয়া যেতে পারে এখন। চোখ তুলে দেখি, একী, এ যে প্রায় কণিকাই! আর তাই বুঝি উদো অ্যাসোসিয়েশনে কণিকা মগজের একেবারে অ্যাকটিভ জায়গাটায় এসে হানা দিয়েছে! হাউ এবসার্ড! আর এদিকে আমি ভেবে মরছি , আনকন্সাস আর ফ্যান্টাসি আমার এই কলকাত্তাইয়া রিয়ালিটির ভিতর গাঁথা হয়ে কোনো একটা আস্ত সাররিয়ালিটিই গড়ে তুলল কিনা! না, তেমন কিছু না।  এই মেয়েটাই কণিকাকে ফিরিয়ে আনল। তার মানে, ফার্ন রোডের মুখটাতে এসে দাঁড়ানোর মুহূর্তটাতেই মেয়েটার মুখটা এক ঝলক আমার চোখের ভিতর দিয়ে ঢুকে গিয়ে থাকবে। তাই যাকে বছর দুই আগে অপাঙক্তেয় জঞ্জাল বোধে বিস্মৃতির পগার পার করে দিয়েছিলাম, কোথাকার ফালতু একটা মুখের মিলে সে ধাঁ করে ফিরে এল। কী বলব , জাস্ট মেনে নেওয়া যায় না। এত সস্তা, এত খেলো চেতনার কারবার! খুবই বিরক্ত হয়ে উঠছি। শরীরের ভিতরে কি যেন একটা পাক দিয়ে দিয়ে উপরে উঠছে, টের পাচ্ছি। কণিকাকে ভোলা দরকার। এই মুহূর্তে ভোলা দরকার।

Continue reading