হা হা সময়

অর্ণব দত্ত

“জন্মেছি ওই মুক্তির দশকে। বেঁচে আছি যে সময় – মুক্তিদাতাকে যেন কোনো একটা চেয়ারের মত দেখতে – এই টানাপোড়েনে নেশার মত গল্পের অন্য নাম জীবন। তাই সমুদ্রস্নানের আরাম আসে ওই অল্প অল্প গপ্পেই।” – অর্ণব

beggar

ভিক্ষের বাটিতে কিছু পয়সা ছড়ানো। একনজরে দেখে মনে হল, সবটা জড়ো করে গুনলে দশ টাকাও হবে না।

কোলে ছেলে। ন্যাতানো কাপড়ের উপর শোয়ানো। ভিখিরি মেয়েটা সিঁথিতে ঘষটে ঘষটে সিঁদুর লাগিয়েছে। বাচ্চা ছেলেটা, কতই বা বয়স — বড় জোর তিন চার। নেতিয়ে আছে। নাক দিয়ে সিকনি গড়াচ্ছে। বৈশাখের রোদের প্রখর তাপ ওর মুখে এসে পড়েছে। ঘুমে যেন তলিয়ে আছে ছেলেটা।

ওভারব্রিজের সিঁড়ি ভাঙছিল তন্ময়। কে যেন পা জড়িয়ে ধরেছে। ওই ভিখিরি মেয়েটা। পা ছাড়াতে গিয়ে এতসব দেখে ফেলল তন্ময়। বেজায় বিরক্ত হল।

অনেকটা সিঁড়ি ভাঙতে হবে এখন। সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে তন্ময় নিজের উপরই বিরক্ত হচ্ছিল। কেন যে চোখের পর্দায় বারেবারেই ভেসে উঠছে মেয়েটার ভিক্ষে চাওয়ার কুচ্ছিত ধরণের ভঙ্গিটা। চিমনি দিয়ে গলগল কালো ধোঁয়া বেরিয়ে পরিষ্কার আকাশটাকে পর্যন্ত যেন কালো করে দেবে।

সে এক বিকট ব্যাপারই।

ভিখিরিদের মুখ ভীষণ অপচ্ছন্দ করে তন্ময়। ভিখিরি যখন ভিক্ষে চায়, তার মুখচোখে, গোটা শরীরে এমন অভিব্যক্তি ছড়িয়ে পড়ে যে — তা চোখ থেকে যদি মনে, মনটা যতটা মাথায় থাকে, তার চেয়েও বেশি থাকে তো বুকে — ভিখিরিদের কাতরানি দেখলে বুকটা ফাটে না — পরমাত্মীয় না হোক বন্ধুবান্ধব বিপদে পড়লে যদি হাত-পা গুটিয়ে নিরুপায় বসে থাকতে হয়, তবেই বুক ফাটে। আগে নয় পরে নয়, বধ্যমুহূর্তে শুধু জলের মতো।

ভিখিরির কাতরানি দেখে বুকটা ফাটে না, কেটে যায়। ক্রমাগত কাটে। ফাটার যন্ত্রণার চেয়েও কাটার জ্বালাটা নিক্তিতে মাপলে দেদার বেশি। তার উপর কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে পড়ে তবে কাণ্ডটা যা হওয়ার, তা হল — খাচ্ছিল তাঁতি তাঁত বুনে, কাল হল তার হেলে গরু কিনে।

মোড়ের মাথায় দাঁড়িয়ে একা একা চিৎকার করলে কে কি ভাববে — পাগল-ছাগল, পশুপাখি, যে যা খুশি ভাবুক না। উইদাউট মাইক্রোফোনে কিছুদিন কলকাতা শহরের মোড়ের মাথাগুলোতে চিৎকার করার একটা বাসনা রয়েছে তন্ময়ের। বিস্তর চিন্তা ভাবনার পর ওর মনে হয়েছে, ভিখিরিদের করুণ মুখগুলিই ওই চেপে রাখা চিৎকারটায় দরকার পড়লে আকাশটাকে পর্যন্ত ধসিয়ে দিতে পারি এমন এক একরোখা প্রতিজ্ঞায় কাঁপিয়ে দেবে দুনিয়াটাকে।

কিন্তু কবে? সেদিনের বিদ্রোহ ও সুখের ছবি কল্পনা করতে গিয়ে কোথাও একটা আটকায়। দুশ্চর তপস্যা না করলে, হাত ঘোরালেও নাড়ু যে মিলবে না, সে হাড়েহাড়ে জেনেছে তন্ময়।

আপাতত তন্ময়ের জীবনেও চলছে ভিক্ষাপর্ব। মহাভারতের প্রকাণ্ড কাণ্ডের মতো জীবনের এই পর্যায়টি বনবাস পর্ব ভেবে আরাম পায় তন্ময়।

ওভারব্রিজের উপর ভরদুপুরেও একটা মেয়ে, ক্ষয়া চেহারা, তেমন তেমন লোক দেখলেই চোখ মটকাচ্ছে। সর্বক্ষণ পানের পিক ফেলছে। ওদের দেখেই তন্ময়ের শয়তান সম্পর্কে নিজস্ব একটা ধারণা হয়েছে। শয়তান যেন দুরারোগ্য ব্যাধি। মানুষের শরীর তার প্রিয় আস্তানা । শরীরে ঢুকে মন নষ্ট করাই শয়তানের প্রিয় কাজ। তখন মানুষ আর্তনাদ করে, মেয়েরা খানকি সাজে। চারপাশটাকে তখন শেষ দৃশ্যের মতো দেখায়। ফলে শয়তানের নির্দেশে আদতে কিছু শুরুই হয় না।

কারা যায় ওই মেয়েদের কাছে? কলকাতা শহরের অনেক জায়গায় বিশ-পঞ্চাশ টাকাতেও যৌনতা কেনা যায়। এদের দাম অবশ্য ততটা কম নয়। তবে দর তেমন উঁচুও নয়।

সত্যি কত কিছু দেখিয়েই যে ভিক্ষে করে মানুষ। সম্প্রতি জাইদুল আমেরিকা ঘুরে এসেছে। কী একটা স্কলারশিপ নিয়ে তিনমাসের জন্যে গিয়েছিল। ফিরে এসে প্রচুর বকছে। জাইদুলের স্বভাবের এই দিকটা গোঁয়ারের। ওর দেখাই নাকি প্রথম দেখা। অন্তত ও যেভাবে দেখেছে, সেই দেখাটা নতুনের সঙ্গে পুরনো মিশিয়ে এমন মজাদার যে হো হো হেসে জাইদুল কোনও তত্বফত্বের লাইন না মাড়িয়ে একথাটা বেশ উঁচুগ্রামে জাহির করবেই।

তন্ময়ের বেশ বিরক্ত লাগে। তাও শোনে। শোনে ঠিক না, কারণ জাইদুলের কথায় গন্ধমাদন থেকে বিশল্যকরণী খুঁজে নেওয়াও যথেষ্ট পরিশ্রমের কাজ। আসলে জাইদুলের সঙ্গে মেশবার একটাই কারণ, যাবতীয় বকুনির শেষে প্রথম সূর্যের মতো ওই হাসিটি আর কোনও বাচালের মুখে ও ছড়িয়ে পড়তে দেখেনি।

Continue reading