অন্য আকাশ

শ্রাবণী দাশগুপ্ত

“কলকাতার মেয়ে। জে.ইউ. থেকে মাস্টার্স সাতাশি সালে। তারপর বিয়ে, সংসার। লিখতে ভালো লিখি। তবে বেশ অনিয়মিত। খেয়াল খুশি মতন। দু-এক জায়গায় বের হয়েছে – বর্তমান, রবিবাসরীয় আনন্দবাজার। দেশেও একবার। আর কিছু লিটল ম্যাগাজিনে। বই টই বার করিনি। গল্প লিখতে ভালো লাগে, কবিতা আসেনা. রাঁচিনিবাসী বহুদিন। এখানে একটি স্কুলে পড়াই। ” – শ্রাবণী

ru-18oct14-ilus-0002

(১)

অবসাদের গাদে থেঁতলে যাচ্ছে তৃণা। অফিস ছুটি নিয়ে বসে আছে, নিঃশর্ত এবং অসীমিত। পরিণাম যাই হোক্‌, সে তৈরি। উত্তর-পশ্চিমের একরত্তি তিনকোণা ব্যালকনি ও লাগোয়া ঘর। সব বিরুদ্ধতাকে আন্তরিক স্বাগত জানিয়ে সে স্বেচ্ছাবন্দী। ব্যালকনিটা এই ফ্ল্যাটের সবচেয়ে ওঁচা জায়গা, পুরো বছর বন্ধ রাখতে হয়। এলোপাথাড়ি হাওয়া, গা-জ্বালানো রোদ্দুর, কনকনে ঠাণ্ডা – সমান দাপট। আবাসনের অদূরে কিসের একটা মাঝারি কারখানা। ব্যালকনিতে দাঁড়ালে চোখ জ্বলে ধোঁয়াতে। ভিশাল ফ্ল্যাটটা দেখতে এসে বলেছিল,

“ছোড়্‌ তো। পিছেওয়ালি বালকনি খুলনে কা জরুরত থোড়ি হোগা।”

কার যে কখন কেন বা কী ভাবে কোনটা খোলার দরকার পড়ে যায়!

দেড়মাস ধরে বাড়ি, মিডিয়া, পুলিশ। তৃণা ক্লান্ত। তাদের এ্যাপার্টমেন্টের বাউণ্ডারির পাশে একটু খালি বাতিল জমি। যদি একবার ন’তলার ওপর থেকে নিচে হেঁটমুণ্ডে…। লাথি মেরে তৃণা সরিয়ে দিল বেতের হাল্কা চেয়ারটা। রেলিং ঘেঁষটে দাঁড়াল, রেলিংযের মাথা তলপেটের সামান্য নিচে। সাহস করে ঝুঁকলেই…। তৃণা সরু সাদা মোমবাতির মতো, পাঁচ ছয়, ভিশাল পাঁচ আট। ভাগ্য খারাপ হলে আবার হাসপাতাল, পুলিশ ইত্যাদি, প্রভৃতি।

“তি-ন-নি”

ভিশাল কি ধাক্কা দিচ্ছে দরজায়? অফিস থেকে ফিরে এসেছে?

(২)

শর্টকাট রাস্তাটা ওরা ধরেছিল সেদিন। বারণ করেছিল তৃণা, ভিশাল শোনেনি। সরু গলির দু’পাশে সেঁটে থাকা একতলা-দেড়তলা ঘরবাড়ি, খোলা ড্রেন। পাঁচিলে মেলা শাড়ি, লুঙ্গি, বাচ্চাদের জামাপ্যান্ট। গুড়িগুড়ি মটরদানার মতো বাচ্চা কুকুর, মানুষের ছানাও। গলি পেরোলেই ঝক্কাস্‌ শপিং কমল্পেক্স। উল্লসিত শিস্‌ দিলেও, সতর্ক হয়েই চালাচ্ছিল। অসাবধানে লেগে গেলে ভয়ানক বিপদ। কোমর জাপটে বসে উচ্ছল তৃণা। আলাদা অফিস দুজনের, অনেকদিন পরে সেদিন একসাথে অফ্‌ পাওয়া।

প্রথম দিনটা অফিসে দু হাতে মাথা গুঁজে বসেছিল ভিশাল, ভয়ানক দপদপ করছিল।

“কি হলো ভিশ্‌? শরীর খারাপ?”

“নাথিং মাচ। জানিস সঞ্জীব, তৃণা এতো ডিপ্রেসড্‌ – মানতেই পারছে না।”

“জয়েন করেনি বলছিস। জয়েন করলে দেখিস নর্মাল হয়ে যাবে।”

“হোপ্‌ সো। বলছে, কোলকাতায় ফিরে যাবে। অথচ লাস্ট থ্রি-ইয়ার্সে একবারও যাবার কথা বলেনি।”

“টেম্পোরারি ট্রমা – ঠিক হয়ে যাবে। তিনদিন আগের ঘটনা মোটে। শী ইজ্‌ আ সফট এন স্যুইট গার্ল। তোদের এরকম ধামাকেদার শাদী, দু’বাড়ির এগেনস্টে গিয়ে। দ্যাখ্‌ তৃণা তখন কী স্টেডি ছিল, স্টেপব্যাক করেনি! একটু বোঝা ওকে, কাউন্সেলিং কর্‌।”

টিভিতে একশ’বার দেখিয়েছে, হাইলাইট্‌সে। ধাক্কাধাক্কি – তৃণা প্রচণ্ড মারপিট করছে। পায়ের স্টিলেটো খুলে মারছে ঠকাঠক। ওর লেদার ব্যাগ আর গোলাপিরঙের ক্যাজুয়েল শার্ট ধরে টানছে দুটো তাগড়া ছেলে। ভিশাল পেটাচ্ছে বাকি তিনজনকে। মাটিতে উলটে পড়ে, ঠেলে উঠছে। গলিটার দুপাশে ঠুঁটো ভিড়। বাইকের চাবিটা তবু বাঁচাতে পেরেছিল। রীয়ার উইণ্ডো ভেঙে গেছে। সামনের চাকার হাওয়া বেরিয়ে গেছে। কোনও রকমে রগড়াতে রগড়াতে নিয়েছিল এলাকার বাইরে। তারপর কাছাকাছি থানা, এফ-আই-আর। তৃণার দিকে তাকাতে পারছিলনা। ওর গোড়ালি বিশ্রী মচকেছে। টী-শার্টের গলার কাছটা ছিঁড়ে অন্তবার্সের উঁকি, চুলগুলো লণ্ডভণ্ড।

“বোলিয়ে জী কি খোয়া গেছে। কিমত ভী বোলিয়ে।”

“মোবাইল, জেন্টস্‌ ঘড়ি, এটিএম কার্ড, রে-ব্যানের সানগ্লাস…”

থেমে থেমে লিস্ট আর দাম বলছিল ভিশাল। বয়ান দিয়েছিল ঘটনার। কষে রক্ত, কপালে কাটা, কব্জিতে, কোমরে চোট। ভিশালের পরে তৃণা, পাশের চেয়ারে বসেছিল। ভিজে চোখ লাল। একবারও মুখ খোলেনি।

“নাম বতাইয়ে ম্যাডাম।”

“তৃণা মজুমদার।”

“হাজবেণ্ড – ”

“ভিশাল দ্বিবেদী।”

“রেপ অ্যাটেম্পট্‌ হয়েছিল? এ্যাবিউজ্‌ড? মলেস্টেড? ওই রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন কেন?”

“মেইনলি রবারি – ইভন মাই মোস্ট ফেভারিট সানগ্লাস গন্‌। বাকিটা কম্পালসিভ আর ইন্সিডেন্টাল।”

“আই সী। যান এখন, পুলিশ কাজ করবে। কিন্তু কল্‌ করলে হাজিরা দেবেন। মাস্ট কাম ম্যাডাম।”

বলাৎকার দেখালে টিভি চ্যানেলের টিআরপি বাড়ে। শ্লীলতাহানিও ভাল কাটে। কিন্তু এই সব নেটিপেটি ছিনতাই, রাহাজানি নেহাত আলুনি। থানা থেকে বেরিয়ে একটা ক্লিনিকে ঢুকে ফার্স্ট এইড করিয়ে, অটো ধরেছিল। ফিরে এসে পেইন-কিলার, হাল্কা সেডেটিভ আর চূড়ান্ত ক্লান্তির গভীর ঘুম। ধুম জ্বর হঠাত নেমে গেলে যেমন হয়। জিনিসগুলো ফেরত পাবার দুরাশা ছিল না।

Continue reading