গো-বিধি : একটি হিন্দু ফ্যাসিবাদী প্রকরণ

দেবাশিস আইচ

দেবাশিস সাংবাদিক ও সমাজকর্মী। এই লেখার সাথে নিউজক্লিক-এর ‘গৌ-কে নাম’ (Gau Ke Naam) ডকুমেন্টারি-র তিনটি পার্টের লিংক ব্যবহার করা হল।

“আমাদের হিন্দু-সমাজে গোহত্যা পাপ বলে গণ্য, অথচ সেই উপলক্ষ্যে মানুষ-হত্যা তত দূর পাপ বলে মনে করি না।”

                       –  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

অবশেষে আপাত স্বস্তি। স্বস্তি সুপ্রিম কোর্টের রায়ে। এক গো-বিধিতে  কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারিকা বেঁধে ফেলার চেষ্টা হয়েছিল। সুপ্রিম কোর্ট ১২ জুলাই এক রায়ে জানিয়েছে, কেন্দ্রের গো-নির্দেশিকা তিন মাসের জন্য স্থগিত করা হল। প্রথম থেকেই অবশ্য দক্ষিণের অধিকাংশ রাজ্য প্রতিবাদে সামিল হয়। প্রতিবাদ শোনা গিয়েছে উত্তর-পূর্ব থেকে।  পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী জানিয়ে দিয়েছিলেন, এই বিধি তিনি মানবেন না। তাঁর বার্তা, ‘এটা সম্পূর্ণ অসাংবিধানিক, অগণতান্ত্রিক ও অনৈতিক সিদ্ধান্ত। এটা মানছি না।’ এই একই সময়ে কেরালার মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন সব রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে চিঠি দিয়েছিলেন কেন্দ্রের বিরুদ্ধে সরব হতে।

সিপিএম পলিটব্যুরো এ বিধির বিরুদ্ধে মূলত চারটি বিষয় তুলে ধরে, তাদের বক্তব্য, (১) এই নির্দেশিকার মাধ্যমে মোদী সরকার গোটা দেশের উপরে খাবারে নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। (২) পশুপালনে যুক্ত কৃষকদের জীবিকা ধাক্কা খাবে। (৩) ক্ষতিগ্রস্ত হবে চর্মশিল্প ও মাংস রফতানিও। (৪) এই নির্দেশিকার মাধ্যমে রাজ্যের অধিকারেও হস্তক্ষেপ করা হয়েছে।

বিধিটি হল, প্রিভেনশন অব ক্রুয়েলটি টু আনিম্যালস (রেগুলেশন অব লাইভস্টক মার্কেটস) রুলস, ২০১৭ (পিসিএ)। ২৩ মে কেন্দ্রীয় পরিবেশ মন্ত্রক এক গেজেট বিজ্ঞপ্তিতে এই নির্দেশিকা জারি করেছে। কী আছে এই বিধিতে? ইতিমধ্যেই সংবাদপত্রে (এই সময়, ২৭ মে, ২০১৭) তা বিস্তারিত ভাবে প্রকাশিত হয়েছে। মোদ্দা বিষয়টি হল, (১) পশুবাজারে আর হত্যার উদ্দেশ্যে গবাদি পশু কেনাবেচা করা যাবে না। (২) শুধুমাত্র কৃষিতে ব্যবহার করা হবে  এমন গবাদি পশু বেচাকেনা করা যাবে। (৩)  খাদ্যের জন্য ব্যবহৃত গবাদি পশু বেচাকেনা করা যাবে সরকার অনুমোদিত পৃথক খামার থেকে। (৪) কোনও ধর্মীয় আচার বা বলির জন্য পশুবাজার বা মেলা থেকে গবাদি পশু কেনাবেচা করা যাবে না। (৫) রাজ্যের সীমানার ২৫ কিলোমিটার ও আন্তর্জাতিক সীমানার ৫০ কিলোমিটারের মধ্যে কোনও বাজার থাকবে না। এ ছাড়াও রয়েছে নানা বিধিনিষেধ। এই বিধিতে গবাদি পশু বলতে কিন্তু শুধু গরু বোঝাচ্ছে না। গরু, বলদ, ষাঁড়, বকনা ও এঁড়ে বাছুর, মহিষ এমনকী উটও বোঝাচ্ছে।

অভিযোগ উঠেছে, ছলেবলে কৌশলে কেন্দ্রীয় সরকার সারা দেশে খাদ্যের জন্য গো-হত্যা বন্ধ করতে চাইছে। কেন্দ্রীয় সরকার এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, খাদ্যের সঠিক মান রক্ষা করা, অসুস্থ ও ছোঁয়াচে রোগে আক্রান্ত গরুকে চিহ্নিত করা, কোনও গবাদি পশুর উপর জীবাণুনাশক ওষুধ প্রয়োগ করা হলে, সেই পশু যাতে নির্দিষ্ট সময়ের পর কেনাবেচা হয় সেদিকে নজর রাখার উদ্দেশ্যে, হত্যার জন্য গবাদি পশু কেনাবেচার পৃথক খামার জরুরি। নতুন নিয়মে কেবল কৃষিকাজের যোগ্য সুস্থ সবল পশুই বাজারে আসবে। অর্থাৎ, প্রশ্নটি খাদ্য সুরক্ষার। পাশাপাশি, গবাদি পশুর বেআইনি পাচার ও তার উপর অত্যাচার বন্ধ করা।

Continue reading