`জয় শ্রীরাম’-এর নেপথ্যে

জুল

আপাতত চিত্রপরিচালক ও নাস্তিক

লেখা – তাও আবার বেশ গুছিয়ে টুছিয়ে নিজের `ফলিম’ নিয়ে পাতা ভরানো। আর আমি হলাম পেন-খাতা থেকে সর্বদা পাঁচশ মাইল (কম্পিউটারে লিখতে শিখছি, কিন্তু আরও কিছুদিন যাবে ডিমের ঝোল আর ভাতের মাখামাখি হতে) দূরত্ব বজায় রেখে চলা ছেলে।

চাপের নাম বাপ! ওবামার দেশ থেকে নন্দিনীদির অনুরোধ, তারপর ভদ্র মার্জিত ভাষার প্রেসার। শেষ অব্দি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে মিলনদার চত্ত্বরে –`এই তুই লেখাটা দিবি কি দিবি না…’-র চাপে পড়ে লিখতে বসা।

ভগবান ও প্রোডিউসার এক গোত্রীয় বলে আমি মনে করি। এরা দু’জনেই কোথায় থাকেন, কেউই জানেনা। দেখা-টেখা দেন না। ধরা ছোঁয়ার বাইরে। টু ইদ পাওয়ার ইনফিনিটি…আর যাদের ওনারা দেখা দেন তাদেরকে এমন সাপ লুডোর শর্তাবলীর প্যাঁচে জাপেট ধরেন যে, সে বেচারারা ধূর্ত শর্তের ভারে…`ছেড়ে দে মা’ বলে বমি-টমি করে এক্‌সা কাণ্ড। যাই হোক মোদ্দা ব্যাপারটা হল যে `জয় শ্রীরাম”-এর চিত্রনাট্য নিয়ে কয়েকটি প্রোডাকশন হাউস এবং চ্যানেলওয়ালাদের কাছে গিয়ে আমার এই অভিজ্ঞতালব্ধ মহান জ্ঞানলাভ হয় যে ভগবান ও প্রোডিউসার এক গোত্রীয়! কিন্তু ফিলিম বানাবো। টাকা ? দেখা যাবে। পথে না নামলে ঠিক পথ চেনা যায় না। রাস্তাই একমাত্র রাস্তা। এক্কেবারে আনকোরা এই ছেলেটির ছবি বানানোর মজাদার গল্প বলার আগে কয়েকটি ছোট গল্প বলছি। তাহলে ছবি বানানোর সামাজিক প্রেক্ষাপট কিছুটা তুলে ধরা যাবে…হয়ত!!

গল্পঃ এক

৯২ সাল। শীতকাল এটুকু মনে আছে। রাত্রিবেলা। আমার লোহালক্কর আর নর্দমার পাঁকে ভরা হাওড়া শহর। কি একটা যেন হয়েছে, কোথায় যেন। লেপ মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছি হঠাৎ গমগমে আওয়াজ। `জয় শ্রীরাম’। কী ভয়ঙ্কর সেই আওয়াজ। লেপ থেকে লাফিয়ে সোজ জানালায়। মিছিল হচ্ছে। বাবা সিগারেট ধরিয়ে মাকে বলছে-`খান্‌কির ছেলে কাটাগুলো টিকিয়াপাড়াতে প্রচুর আর্মস নিয়ে এসেছে। শাল্লাদের…জ্যাম করে দেব’। প্রসঙ্গত বলা দরকার টিকিয়াপাড়া এলাকাটি মুসলমান প্রধান অঞ্চল এবং আমার বাবা হার্ডকোর কংগ্রেসি অধুনা তৃণমূল !

`কারফিউ’ শব্দটা তখনই প্রথম শুনেছিলাম। যদিও সে বিকেলবেলা আমাদের ক্রিকেট খেলায় থাবা বসাতে পারেনি, তাই আমি বা আমরা কিছু বুঝিনি।

গল্পঃ দুই

৯৩। হুগলি শহর। চকবাজার ফাঁড়ির পাশ দিয়ে সরু রাস্তা ধরে এগোলেই কলোনি এলাকা। রাস্তার একদিকে কলোনির সারি সারি মাথা গোঁজার আস্তানা। দর্মা, টিন, টালি, ঘেঁসের গাঁথনির দেওয়াল, সবাই যে ভাষায় কথা বলে সেটি ঠিক আমার নয় আবার আমার, কেমন যেন জটিল। জল নিয়ে ঝগড়া হয়। কেমন গ্রাম গ্রাম ব্যাপার। গুল আর ঘুঁটের ধোঁয়ায় সন্ধেবেলা চোখ জ্বালা করে। আর ঘরে ঘরে অদ্ভুত সুরে লক্ষ্মীর পাঁচালি নামতার মতো পড়ে সীমা মাসি, টুসি মাসি, নমিতা মাসিরা। আমার মামা বাড়ি পাড়া। পুরো বাঙাল এলাকা। ঠিক রাস্তার ওপারে কবরস্থানের দেওয়ালে সুন্দর লেনিনের (সে কে জানতাম না) ছবি। তলায় লেখা কমরেড লেনিন জিন্দাবাদ। `রাত্রে কব্বরস্তান থেকে ভূত আসে জব্বর মিঞার’ – ফর্সামা বলত। মায়ের ঠাকুমা। আর কব্বরস্তানের পরে মুসলমান পাড়া। `ওরা খুব নোংরা’ – দিদা খালি বলত।

একদিন জব্বর মিঞার মাঠে ধরাধরি খেলছি প্রয় সমবয়সি মামা-মাসিদের সঙ্গে। কে চোর হবে গোনা হচ্ছে। পঞ্চামামা গুনতে শুরু করে –`মুসলমান বেইমান, দাড়ি কুটকুট করে। একটা দাড়ি পড়ে গেলে আল্লা আল্লা করে…’। পাপিয়া বলে আমারই বয়সি একটি মেয়ে কাঁদতে কাঁদতে খেলা ছেড়ে চলে যায়। আমার খুব খারাপ লেগেছিল কিন্তু আবার তৎক্ষণাৎ ধরাধরি খেলাতেও মেতে উঠি। মেয়েটির নাম পাপিয়া খাতুন। মুসলমান পাড়ায় বাড়ি ছিল।

গল্পঃ তিন

মহরম। তাজিয়া। ব্লেড। ছোরা-চাকু মেলা। অবাক বিস্ময়ে দেখি প্রথম সেই হুগলি জেলাতেই। ভয়ে ভয়ে ভিড়ে চ্যাপটা হয়ে দেখেছি পিঠে চাবুক মারা আর রক্ত ঝরা। জিলিপি খেতে ফিরছি দামু মামার সঙ্গে।

Continue reading