পাহাড়ে আন্দোলন

তথাগত সেনগুপ্ত

তথাগত হায়দ্রাবাদ সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটিতে অঙ্কের শিক্ষক; শিক্ষাক্ষেত্রে ও অন্যান্য ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সাথে যুক্ত। এই লেখাটির অংশবিশেষ ইতিপূর্বে অনীক পত্রিকার জুলাই ২০১৭ সংখ্যায় ছাপা হয়েছিল। এছাড়া লালী গুরাসে লেখাটির ইংরাজি অনুবাদ পূর্বপ্রকাশিত।

পাহাড়। দার্জিলিং। কালিম্পঙ। ঘুম। মধ্যবিত্ত ভদ্রলোক বাঙালির কাছে এই শব্দগুলো বিশেষ কিছু ছবি বয়ে আনে। হয় নিজের ক্যামেরায়, নাহলে পাশের বাড়ির নতুন বিয়ে হওয়া দাদা বৌদির ফোনের ফটো গ্যালারিতে, অথবা পাড়ার চা-এর দোকানের পুরোনো জং ধরে যাওয়া স্টিল-এর বাক্সের উপর পেইন্ট করা অক্ষরে, বা পাড়ার ট্রাভেল এজেন্ট-এর অফিসের ক্যালেন্ডার-ক্যাটালগে, আর নয়তো সত্যজিৎ রায়-এর ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’-র মতন বাংলা সিনেমায় এইসব ছবির বসবাস। ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ যে সত্যজিৎ-এর প্রথম কালার সিনেমা, ছবি বিশ্বাসের শেষ সিনেমাগুলির একটি, যার কিছু মাস পরেই তিনি গাড়ি অ্যাক্সিডেন্টে মারা যান, যার পরে সত্যজিৎ নাকি বলেছিলেন যে তিনি আর বয়স্ক মধ্যবিত্ত ভদ্রলোকের কোনও রোল লিখবেন না আর কোনও সিনেমায়—এসব গল্প যেকোনও বাঙালি মধ্যবিত্ত পরিবারে একটু কান পাতলেই শোনা যায়। যাই হোক, সে অন্য কথা। ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’-য় একটি বড়লোক বাঙালি পরিবার এবং তাদের সঙ্গে যুক্ত কিছু মানুষকে তাদের নিজেদের এবং পারিবারিক জীবনের বেশ কিছু জটিলতা, অভাব-অভিযোগ, চাওয়া-পাওয়া নিয়ে বোঝাপড়া করতে দেখা যায়। সিনেমার চরিত্রগুলির মতে, কলকাতার মত ব্যস্ত জটিল শহরে এমন সুযোগ বা সাহস, কোনওটাই পাওয়া যায় না, কিন্তু দার্জিলিং-এর বিরাট পাহাড়, মেঘ-বৃষ্টি-রোদ, বয়স্ক গম্ভীর গাছগাছালি শহর থেকে উঠে আসা এই লোকগুলিকে নতুন সাহস যোগায় নিজেদের জীবনের ধুলোময়লা সাফ করার। দিনের শুরুতে দার্জিলিং-এর মাথা থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যাবে কি যাবে না, মেঘ কাটবে কি কাটবে না, এই নিয়ে চিন্তা সংশয় থাকলেও, সন্ধ্যে নাগাদ যখন সত্যিই মেঘ কাটে এবং কাঞ্চনজঙ্ঘার সাদা বরফ ঢাকা চূড়া দেখা যায়, তখন এই লোকগুলি নিজেদের জীবনের হিসেবনিকেশ সেরে ফেলতে এতই ব্যস্ত যে তাদের সেদিকে খেয়ালই থাকে না। পরের দিন কলকাতায় ফেরার আগে তারা তাদের জমে থাকা বিভিন্ন জটিলতা ঝেড়ে ফেলতে চায়, এবং দেখে মনে হয় শহরে ফিরে তারা যেন নতুন করে জীবন শুরু করার কথা ভাবছে। ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’-র কথা এইজন্য জরুরি, কারণ এই সিনেমার চরিত্রগুলিকে দেখে মনে হয় তারা যেন পাহাড়ে ঘুরতে যাওয়া বাঙালি টুরিস্টের ব্লু-প্রিন্ট।

Continue reading