আলোর কথা

নীতা মণ্ডল

জন্মেছিলাম গ্রামবাংলায়। বীরভূম জেলার বিপ্রটিকুরী উচ্চবিদ্যালয় ও বোলপুর উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় থেকে বিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করে উচ্চশিক্ষা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। পেশা অধ্যাপনা আর নেশা বই পড়া, গান শোনা ও আড্ডা দেওয়া। ফলে যা হল, চোখের সামনে ঘটে যাওয়া প্রতিটি ঘটনাকে দেখে মনে হতে লাগল ‘ঠিক যেন গল্পের মত!’ আবার, আড্ডার ফাঁকেই মনে হল, এই কথাগুলো জুড়ে দিলেই তো নতুন গল্প জন্ম নেবে। তাই এখন অণুগল্প, ছোটগল্প ও বড় গল্প লিখি লেখার আনন্দে।

(১)

রাস্তাটা সাপের মত একটা বাঁক নিয়ে সোজা চলতে শুরু করেছে। ঠিক ওই বাঁকের মুখে দোতলা পাকা বাড়িটা হাই ইশকুল। একতলার শেষ ঘরটার দরজার উপরে সবুজ কালিতে বড় করে লেখা ভি-এ। দরজার পাশে একটা আর উল্টোদিকে দুটো বড় বড় জানলা। জানলায় লোহার রেলিং থাকলেও পাল্লা নেই। ঢুকেই বামদিকে ব্ল্যাকবোর্ড। তার সামনে কাঠের চেয়ার টেবিল। দুই সারি বেঞ্চ টেবিলের হাত তিনেক দূর থেকে শুরু হয়ে থেমেছে একটা অসমাপ্ত দেওয়ালে। দেওয়ালের ইঁটগুলো যেন দাঁত বের করে আছে। ওপাশে ভি-বি।

সবে তিন দিন হল পঞ্চমশ্রেণীর ছেলেমেয়েরা আসছে। এখনও সবার সব বই কেনা হয় নি। বইয়ের তালিকা প্রথমদিনেই পেয়েছে ওরা। পর দিন বিভাগ নির্দিষ্ট হয়েছে আর রুটিন দিয়েছে। ‘বুক লিস্ট, রুটিন, সেকশন’ এসবই নতুন ওদের কাছে। এমন কি বই কেনাটাও, আর স্কুল থেকে বই দেবে না।

এক ঘন্টার টিফিন। যারা এ গ্রামের, তারা বাড়ি গিয়েছে। হঠাৎ একদল মেয়ে এসে ঢুকল ক্লাসে। ওদের একজন প্রতিনিধি বলল ‘আমার নাম সোমদত্তা ব্যানার্জি। আমরা এইটে পড়ি। তোদের সঙ্গে পরিচয় করতে এলাম।’

ওরা বসে পড়ল নিজেদের জায়গায়। তারপর একজন একজন করে নিজের পরিচয় দিতে শুরু করল।

‘এই, এই আলো এবার তোর দান।’ বলে আলোর কোমরে খোঁচা দিল ডালিয়া। জানলার বাইরের ধান খেত ছাড়িয়ে দূরের পুকুরটার দিকে তাকিয়ে ছিল ও। সোমদত্তা বলল, ‘কবি কবি ভাব।’ ‘হি হি’ হাসির থামার আগেই সসংকোচে উঠে দাঁড়াল আলো। নিজের নাম, বাবার নাম, পুরনো স্কুলের নাম, গ্রামের নাম বলে বসতে গেল। ওরা বলল, ‘দাঁড়া, বসিস না। তোদের গ্রামের রমাকে চিনিস?’

‘হ্যাঁ। রমাপিসিদের আর আমাদের লাগালাগি বাড়ি।’ বলল আলো।

‘রমা, পিসি?’ বলেই হাসতে শুরু করল ওরা, ‘তা রমাপিসি আজ আসে নি কেন রে?

Continue reading