অনন্যাকে লেখা চিঠি

দ্যুতি মুখোপাধ্যায়

দ্যুতি মুখোপাধ্যায় পেশায় সাংবাদিক। নাম গালভারি হলেও কাজটি কেরানির চেয়ে কিছু আলাদা নয়। ডেস্কে বসে কলম পেষাই সার। ‘ভার্নাকুলার’ কাগজে কাজ করার সুবাদে অনুবাদ নিত্যদিনের কাজ। ভালোলাগাও। তা বাদে সুতার্কিক। নানা বিষয়ে দূর থেকে মতামত দিতে পছন্দ করেন।

“‘লেটার টু আ ইয়ং লেডি ইন প্যারিস‘ গল্পটি হুলিও কর্তাজারের, ইংরিজি অনুবাদে পড়া। গল্পটি নাড়া দিয়ে গেছিল বলে নিজের মনেই একটা অনুবাদ মত করতে শুরু করেছিলাম। করতে করতে মনে হল গল্পটার প্রেক্ষাপটটা বেশ সর্বজনীন, মানে এ গল্পটা কলকাতায় হলেও লয়ক্ষয় হত না তেমন। হয়তো বা আলাদা একটা চরিত্রও পেত। সেই ভাবনা থেকেই বদলে গেল লেখা। এটাকে আর অনুবাদ বলা ঠিক হবে না। অনুকৃতি? তাই-ই সই।” – দ্যুতি

.

অনন্যা, তোমার গড়িয়ার বাড়িতে আস্তানা পাততে আমি চাইনি। না, খরগোশগুলোর জন্য বলছি না, আসলে যে কোনও গোছানো জায়গায় ঢুকতেই আমার অস্বস্তি হয়। এই যে একেবারে হাওয়ার চলনটুকু পর্যন্ত সযত্নে নির্মিত, তোমার ঘরের মৃগনাভি সুবাস থেকে ট্যালকমের কৌটোয় রাখা পালকের ঘনত্ব পর্যন্ত রবিশঙ্করের সেতার আর আল্লারাখার তবলার বোলের মত যুগলবন্দীর তারে বাঁধা। এমন সুচারু সুন্দর গৃহস্থালির মধ্যে মূর্তিমান কালাপাহাড় হয়ে এসে দাঁড়ানোটা রীতিমত যন্ত্রণাদায়ক। এ বাড়ির প্রতিটি ধুলোবালি, প্রতিটা জিনিস গৃহকর্ত্রীর চেতনার নিয়ম মেনে নিজের নিজের জায়গায় গিয়ে সেজে বসেছে যেন, এই যে এদিকে বইয়ের তাকগুলো (একটা আলমারিতে বাংলা, অন্যটায় ইংরেজি আর উর্দু), ওদিকটায় তাকিয়ার উপর ঠান্ডা সবুজ ইক্কতের চাদর বিছানো পরিপাটি, ক্রিস্টালের ছাইদানিটা রাখা কাচের টেবিলটপে, যেন স্বচ্ছ বুদবুদ ফুলে উঠতে উঠতে ঐখানে হঠাৎ স্থির হয়ে গেছে, আর সারাক্ষণ কী যেন সুবাস, সারাক্ষণ কোথা থেকে যেন ভেসে আসা মৃদু সুরেলা টুংটাং, কেটলি আর বোন চায়না আর সোনালি পাড় দেওয়া জাফরি কাজের ট্রে, সাদা দেওয়ালে কালো কাঠের ফ্রেমে সাজানো মৃত স্বজন… আহ, অনন্যা! কী কঠিন, এক স্বাধীন মেয়ের নিজের বাসার এই অপার্থিব সুন্দর সঙ্গতির জগৎটার সম্পূর্ণ বিপরীত প্রান্তে দাঁড়িয়ে সে নিয়মের সামনে বাধ্যত নত হওয়া, কী কঠিন! কী অপরাধী লাগে যখন অভিধানটা টেবিলে রাখতে গিয়ে ফলের ঝুড়িটা সরাতে হয় (শুধুমাত্র আলসেমি করে চেয়ার থেকে উঠব না বলে, তাক থেকে বই নামিয়ে অন্য দিকে গিয়েও তো বসা যেত)। তোমার এই ঘরে ঝুড়িটুকু সরানো যেন মানে-র লিলির ল্যান্ডস্কেপের উপর বীভৎস লাল ছিটিয়ে দেওয়ার সামিল, যেন বা ভৈরবীর আলাপে হঠাৎ হামলা কড়ি মধ্যমের। তোমার অন্তরাত্মার ছকে মেপে মেপে সাজানো এ ঘর, প্রতিটা জিনিসের সঙ্গে প্রতিটা জিনিসের সম্পর্কে সে চেতনার দৃশ্যমান প্রকাশ, ঝুড়িটুকু সরালে তাই যেন বেসুরো বেজে ওঠে গোটা ঘরই। তাক থেকে বই নামাই কি তানপুরাটাকে একটু ছুঁয়ে দেখি কি নিদেনপক্ষে টেবিল ল্যাম্পটাকে একটু ঘুরিয়ে রাখি, যাই করি না কেন, তোমার অন্তরাত্মার বিরুদ্ধে একটা যুদ্ধ ঘোষণার ভাব পেন্ডুলামের মত মাথার ভেতর দুলতে থাকে।

Continue reading