‘হ্যাশট্যাগ ক্রিকেট’

সর্ব‌জয়া ভট্টাচার্য

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংলিশ ডিপার্টমেন্টে এম. ফিল.-এর ছাত্রী

বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসন দেশকে বুঝেছিলেন এক কল্পিত কমিউনিটি হিসেবে। গেরুয়া-শাদা-সবুজ রঙের একটি পতাকা এক দল মানুষকে বলে দেয়- এটা তোমার দেশ। একটা গান পঞ্জাব থেকে দ্রাবিড়, মারাঠা থেকে বঙ্গকে গেঁথে ফেলে একই সুরে, একই কথায়। আর এগারো জন পুরুষ নীল রঙের জামা পরে যখন ক্রিকেট মাঠে খেলতে নামে, তাদের বলা হয় ‘টিম ইন্ডিয়া’।

ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের সাম্প্রতিক দু্নীতির কথা না হয় নাই বললাম, না হয় নাই বললাম কী করে নয়ছয় করা টাকার অঙ্ক কোটির সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছে। এমনিতেও ক্রিকেট গরীব মানুষের খেলা নয়। ফুটবল খেলতে লাগে এক ফালি ফাঁকা জায়গা আর একটা বল, আরেকটু উঁচু স্তরে খেলার জন্য বুট। ক্রিকেট খেলার সরঞ্জাম অনেক। অন্তত ঠিক ভাবে খেলার। অতএব জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক স্তরে যে এই খেলার পেছনে টাকা খরচ হবে, এবং সেই টাকার অঙ্ক যে খুব একটা কম হবে না তা স্বাভাবিক। এবং এই টাকার অনেকটাই যে আসবে বিজ্ঞাপন থেকে তাও বলাই বাহুল্য।

খেলা কেন, কবি তো বলেছেন যে ব্যক্তিগত যা কিছু, তাও বিকিয়ে গেছে অনেক আগেই। তবে সে অন্য গল্প। ক্রিকেট মাঠে ফিরে এলে দেখতে পাব, খেলোয়াড়দের জার্সির ওপর আঁকা আছে নানা বাণিজ্যিক সংস্থার লোগো। বল যখন তীরবেগে ছুটে যায় বাউন্ডারির দিকে, দেখতে পাব মাঠ ঘিরে রেখেছে বিজ্ঞাপন। একেকটি বিজ্ঞাপনে বল লাগলে একেক অঙ্কের টাকা। একজন পেশাদার ক্রিকেটার খেলে যত টাকা রোজগার করেন, তার সমপরিমাণ বা তার থেকেও বেশী টাকা উপার্জন করেন বিজ্ঞাপন থেকে। তবে বিশ্বকাপ এবং বিজ্ঞাপনের সম্বন্ধটা একটু অন্যরকম। তার জন্য আলাদা করে বিজ্ঞাপন তৈরি হয়। অন্যরকম বিজ্ঞাপন। এবছরও তৈরি হয়েছে স্টার নেটওয়ার্কের পক্ষ থেকে।

সাধারণত দেখা যায় বিশ্বকাপের সময় তৈরি বিজ্ঞাপনের নায়ক জনতা। ক্রিকেটকে ঘিরে, বিশ্বকাপকে ঘিরে মানুষের জাতীয়তাবাদী উন্মাদনা এবং উচ্ছ্বাসের প্রতিফলন। এবছর স্টার প্রথম যে বিজ্ঞাপনটি তৈরি করেছে সেটি এইরকম- বিজ্ঞাপনে দেখা যাচ্ছে দেশের মানুষ রাস্তায় নেমে এসে একসঙ্গে হাত ধরে বলছে, ইংরেজিতে বলছে, “We won’t give it back”। অর্থাৎ, আর যাই ফিরিয়ে দিই না কেন, যেমন গালাগাল, যেমন মানসিক চাপ, ওয়ার্ল্ড কাপ কিছুতেই ফেরত দেব না। এই জনতা তরুণ এবং মধ্যবিত্ত। হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করা, ইংরেজিতে কথা বলা নতুন ভারতবর্ষ। বিজ্ঞাপনের শেষে ক্যামেরা দেখে ধোনিকে। একা মাঠে নামছেন। ক্যামেরা তার কাঁধে চাপিয়ে দিয়েছে এই নতুন জনতা এবং নতুন দেশের প্রতিনিধিত্ব করবার দায়িত্ব।

নায়ক মানে অনেক থেকে এক হয়ে যাওয়া। আলাদা হয়ে যাওয়া। এক দিক থেকে দেখতে গেলে, এটাই তো ঠিক। এই ক্রিকেট টিমের কেউই আমার আপনার মত নয় আদপেই। কিন্তু আগে বিজ্ঞাপনগুলির একটা চেষ্টা ছিল তারকাকে জনতার মধ্যে নিয়ে আসার। ব্যবধান কখনই মুছবে না জেনেও শচীনকে পেপসির বিজ্ঞাপনে দেখা যেত গলিতে বাচ্চাদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলতে। গত বিশ্বকাপের বিজ্ঞাপনে দেখা গেছিল সাধারণ মানুষ বিভিন্ন দেশের ক্রিকেটারদের পরামর্শ দিচ্ছেন। এইবারের বিজ্ঞাপনগুলি তো সেদিক থেকে দেখতে গেলে সৎ। এই ব্যবধানকে তারা আরো প্রকট ভাবে দেখিয়েছে। ভারতের প্রতিটি খেলার আগে একটি করে বিজ্ঞাপন বের করছে স্টার। সেখানে ভারতের জনতার, কোনো ধরণের কোনো জনতারই কোনো চিহ্ন দেখতে পাওয়া যায় না। দেখা যায় একজন ভদ্রলোককে। করাচির বাসিন্দা। পাকিস্তানের সমর্থক। ১৯৯২ থেকে যতবার ভারত পাকিস্তানের মোলাকাত হয়েছে বিশ্বকাপে প্রত্যেকবার তিনি এক বাক্স বাজি নিয়ে খেলা দেখতে বসেন। তবে একবারও সেই বাজি ফাটানোর সুযোগ মেলে না। ভারত-পাক ম্যাচ নিয়ে যে ধরণের সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সাধারণ ভাবে মিডিয়া সৃষ্টি করে, যে ভাবে বারবার ম্যাচের বিবরণ দিতে গেলেই চলে আসে যুদ্ধের অনুসঙ্গ, তার তুলনায় বিজ্ঞাপনটিকে বেশ নিরীহ বলা চলে। কিন্তু সাম্প্রদায়িকতা তো শুধুমাত্র যুদ্ধ, দাঙ্গা, ধর্ম বিদ্বেষ নয়। সাম্প্রদায়িক মনোভাব আরো গোপনে, আরো নিঃশব্দে আমাদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এই বিজ্ঞাপন তার একটি উদাহরণ।

Continue reading