রোববার

সুব্রতা দাশগুপ্ত

ভানুর আব্দারেই গল্প বলা শুরু। কিন্তু সব গল্প তো আর ছয় বছরের ছেলেকে বলা যায়না! তাই এখানে …” -সুব্রতা

কাল রোববার। আজ থেকেই সাথী প্ল্যান করে রেখেছে কাল সারাদিন রিল্যাক্স করবে। অফিস ফেরৎ বিগ বাজার থেকে কফি, গুঁড়ো দুধ, নানাবিধ বিস্কুটের প্যাকেট, চিপ্‌স্‌, ম্যাগি ন্যুডলস্‌, রেডি-টু-কুক পালক পনীর, নানারকম সস আরো সব হাবিজাবি খাবারদাবার কিনে ঘর ভর্তি করেছে। অনেকদিন পর রোববার বাড়িতে কেউ থাকবে না আর তাকেও কোথাও যেতে হবে না। নিশ্চিন্ত।

সাথীর বাড়ি বোলপুর। কলকাতায় আছে এম.এ. পড়ার সময় থেকে। তখন তো শ্যামবাজারের কাছে এক জায়গায় পেয়িং গেস্ট হয়ে ছিলো। ফলে নিয়মের মধ্যেই থাকা। রাত আটটার মধ্যে বাড়ি ফিরতে হোত। সকালে দেরী করে উঠলে আর ব্রেকফাস্ট পাওয়া যেত না। আরো নানারকম নিয়মের কড়াকড়ি ছিল।

সে সব দিন এখন গেছে। সাথী এম.এ. পাশ করেছে। ভদ্রগোছের একটা চাকরিও পেয়ে গেছে। সেকটর ফাইভে অফিস। বাবা রিটায়ার করে নিউটাউনে একটা ছোট ফ্ল্যাট কিনেছেন। যদিও বোলপুরের পৈতৃক বাড়ি ছেড়ে কারুরই কলকাতায় আসার ইচ্ছা নেই। তাছাড়া সাথীর মেজদিও বোলপুরে থাকে, স্কুলে পড়ায়। তার ছেলেটাও দিনের বেলা মার কাছে থাকে। তাই ফ্ল্যাটটা খালিই পড়ে ছিল। চাকরি পাওয়ার পর থেকে সাথী ঐ ফ্ল্যাটেই থাকছে। খালি ফ্ল্যাট ফেলে রাখার তো কোনো মানে নেই। ব্যাপারটায় বাবা-মার আপত্তি ছিল। একা একা থাকা। সাথী আমল দেয়নি। সে একা একা স্বাধীনভাবে থাকতে চায়। আসলে বাবা-মা-ঠাকুমা দুই দিদির মাঝখানে সাথীর কোনো দিন একা থাকা হয়ে ওঠেনি। এই শখ তার অনেকদিনের। সাথী ছোট থেকেই একটু জেদি আর আহ্লাদী গোছের। তার ওপর এম.এ. পাশ করে পট্‌ করে একটা চাকরিও পেয়ে গেছে। তাই তার ওপর কেউ আর বিশেষ জোর করতে পারেনি।

কিন্তু একা থাকার কি যো আছে? সাথী চাকরি পেয়েছে মাস তিনেক হোল। প্রথম মাসটা তো মা এসে ছিলেন। কারণ তখন মেজদির স্কুল ছুটি ছিল। তারপর কোথা থেকে একজন মহিলাকে যোগাড় করে ফেললেন। তিনি সোম থেকে শুক্র থাকবেন। শনি-রবিবার থাকতে পারবেন না। ফলে দ্বিতীয় মাসটা – নয় মা শনিবার চলে আসতেন, না হয় সাথী বোলপুর যেত। এ মাসে বাবার শরীরটা একটু বিগড়োতে মা আর আসতে পারছেন না। কিন্তু তাতে কি? ভবানীপুরে সাথীর ছোটপিসি বলেই দিয়েছে মা না আসলে বা সাথী বোলপুর যেতে না পারলে ভবানীপুরেই থাকতে হবে। ও বাড়িতে বিশাল গ্যাঞ্জাম। প্রচুর লোক, জয়েন্ট ফ্যামিলি, ঘর কম। সাথীর খুব বিরক্ত লাগে। এদের সব মাথা খারাপ, একা থাকলে যে কি সমস্যা সাথী বুঝতে পারে না। একটা হাউসিং কমপ্লেক্সের মধ্যে ফ্ল্যাট। এতগুলো সিকিওরিটি, ফ্ল্যাটে কোল্যাপসিবল গেট, বারান্দায় গ্রিল – আর কি চাই? সাথীর অফিস যাতায়াতও খুবই নিরাপদ। অফিসের গাড়ী সকালবেলা বাড়ির সামনে থেকে তোলে আবার রাত আটটার মধ্যে পৌঁছে দেয়। শনিবার আগে ছুটি বলে সাথী আর গাড়ির জন্য অপেক্ষা করে না। এর মধ্যে বিপদটা কোথায়? সে কথা আর কাকে বোঝাবে?

এই শনি-রবিবারটা যে কি ভাগ্য করে ফাঁকা পেল তা সাথীই জানে। আসলে যে মহিলা সারা সপ্তাহ থাকেন তিনি বলেছিলেন এই শনি-রবিবার বাড়ী যাবেন না। মা, পিসি সবাই তাই জানত। কিন্তু হঠাৎ-ই তার খুড়শ্বশুর দেহ রাখায় বাড়ি থেকে ফোন এসেছে যেতে হবে। সাথী মহানন্দে তাঁকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বেরিয়ে পড়তে বলল। মা ভাগ্যিস জানে না, জানানোর দরকারও নেই। মাকে জানাতে বারণ করে দিল সাথী, অকারণ চিন্তা বাড়িয়ে লাভ নেই। মা হয়তো শুনেই ট্রেন ধরবে।

তিনটের সময় অফিস ছুটি হয়। সাথী আর রিমি বেরিয়ে পড়ল তাড়াতাড়ি। রিমির প্রচুর বিয়ে বাড়ির গিফট্‌ কিনতে হবে আর সাথী খাবারদাবার কিনবে। রিমির সাথে সাথীর ভালোই ভাব আছে, কিন্তু রিমির অনেক সমস্যা। আর সেই সব কাহিনী সাথীকেই শুনতে হয় – সেটাই মুশকিল। আজ আর এসব ভালো লাগছে না। বাড়ী ফিরে সাথী কি কি করবে এই ভাবনাতেই বুঁদ হয়ে আছে। বাকী ফ্ল্যাটটা মা ছবির মতো সাজিয়ে ফেলেছেন, শুধু সাথীর ঘরটাই বাকী। সাথী নিজের ঘর নিজেই সাজাতে চায়। চাকরি পেয়ে একটা বুক শেলফ্‌ কিনেছিল। কিন্তু বইগুলো এখনো স্যুটকেস থেকে বেরোয়নি। মেলায় গেলেই টুক্‌টাক্‌ ঘর সাজানোর জিনিস কেনা সাথীর অভ্যাস। সেই সব জিনিসও বাক্সবন্দী হয়ে পড়ে আছে। আজ তাড়াতাড়ি বাড়ী ফিরে রাত্তির অবধি ঘর গোছাবে সে। তারপর সিনেমা দেখতে দেখতে বা গান শুনতে শুনতে ঘুম দেবে। কাল সকাল এগারটার আগে উঠবে না।

বাড়ি ফিরতে ফিরতেই সাতটা বেজে গেল। রিমির গিফট্‌ কেনার শেষ নেই। সাথীকেও ছাড়বে না। বাড়ি এসে অবশ্য মনটা ভালো হয়ে গেলো। মহিলা বেশ কাজের। ঘরদোর গুছিয়ে রেখেছেন। টেবিলের ওপর বিকেলের জন্য পরোটা আর আলুর চচ্চড়ি, রাত্রের জন্য ক্যাসারোলে ভাত আর মুরগীর ঝোল করে রেখে গেছেন। এমন কি প্লেট, বাটি, চামচ, গ্লাস সব সাজিয়ে রাখা। মা যে এনাকে কিভাবে যোগাড় করল কে জানে! মার কাজের লোক জোগাড় করা আর তাদের ট্রেনিং দেওয়ার একটা বিশেষ ক্ষমতা আছে। সাথীদের বোলপুরের বাড়ীতে তিনজন কাজ করে বহুদিন ধরে। তাদের সাথী জন্ম থেকে দেখছে। দারুণ এফিসিয়েন্ট কিন্তু ওবিডিয়েন্ট – এরকম কম্বিনেশন সহজে পাওয়া যায় না। যাই হোক এ বাড়ীরটিও যে মার ট্রেনিং কোর্সের মধ্যে দিয়ে গেছেন সেটা বোঝা যায়। মহিলার নামটাই জানা হয়নি। ‘মাসি মাসি’ করেই কাজ চলে যাচ্ছিল। ইনি আবার লেখাপড়াও জানেন দেখা যাচ্ছে। ফ্রিজের দরজায় ম্যাগনেট আনারস দিয়ে চাপা দেওয়া একটা কাগজের টুকরোয় লেখা—“কাল সকালের দুধটা বন্ধ করা হয়নি নিয়ে নিও।” যাঃ গুঁড়ো দুধটা না কিনলেই হোত।

আজ আর বই গোছানো হবে না। রাতও হয়েছে, খিদেও পেয়ে গেছে। সাথী তাড়াতাড়ি হাত ধুয়ে খেতে বসল। মাকে ফোন করা হয়ে গেছে বিগ বাজার থেকেই। মাও বাড়ীর কথা জিজ্ঞাসা করেনি সাথীও একা থাকার কথা বলেনি। ফোনটা এখন থেকে সাইলেন্ট করে দিলেই হবে। একটু টিভি দেখলে হয়, অনেকদিন দেখা হয় না। খাওয়া সেরে সোফাতে শুয়ে শুয়ে টিভি দেখতে দেখতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে কে জানে। মাঝরাতে ঠাণ্ডায় ঘুম ভেঙে গেলো। তাড়াতাড়ি টিভি বন্ধ করে ঘরে গিয়ে লেপমুড়ি দিয়ে শুল। কাল রোববার, কি মজা! সারাদিন একা একা…।

সকাল সাতটায় প্রথম বেল বাজল। তিনবার বাজার পর সাথীর ঘুম ভাঙল। ঘুম চোখে দরজা খুলতে এসে দেখে রাত্রে দরজাই বন্ধ করা হয়নি। কোল্যাপসিবল গেটও খোলা। যাক্‌ গে বিপদ তো হয়নি কিছু। দুধওয়ালা বিরক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। “কতবার বেল মারব দিদি? মাসিমা নেই? দুধের বিলটা দেওয়া ছিল। টাকাটা দেবেন?” এক নিশ্বাসে বলে ফেলে লোকটা।

Continue reading