দেশপ্রেম, দেশদ্রোহ ও সংঘ-পরিবার

সমীরণ সাধুখাঁ

প্রথম প্রকাশ – এপ্রিল, ২০১৭; প্রকাশক – অগ্নীশ্বর চক্রবর্তী (স্রোতের বিপরীতে)। সঙ্গের ছবি – ছবি – ভি অরুণ (https://rebelpolitikblog.wordpress.com)।


কেন এই প্রকাশনা?

২০১৪ সালে, বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই সারা দেশজুড়ে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে যার শুরু হয়েছিল ‘দেশপ্রেম-দেশদ্রোহ’ বিতর্ককে ঘিরে। তারপর একের পর এক দাদরি, গোমাংস, জেএনইউ, কাশ্মীর, পাকিস্তানি সন্ত্রাসবাদ, যুদ্ধ উন্মাদনা ভারতীয় সমাজ পরিসরে ক্রমাগত জায়গা করে নিয়েছে। বিভাজনের রাজনীতি, উগ্র জাতীয়তাবাদ ইত্যাদিকে হাতিয়ার করে বিজেপি ও তার মূল মদতদাতা সংঘ-পরিবার যখন একের পর এক ঘটনা হাজির করছে ভারতবর্ষের শ্রমিক, কৃষক সহ মেহনতি আমজনতার সামনে, তখন নিঃশব্দে, চোখের আড়ালে আম্বানি বা আদানিরা তাদের মুনাফা বাড়িয়ে তুলছে কোটি কোটি গুণ। অন্যদিকে তীব্র মালিকী শোষণে জেরবার হয়ে যাচ্ছে শ্রমিক, আত্মহত্যা করতে বাধ্য হচ্ছে আমাদের দেশের কৃষক। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাও ক্রমাগত দুর্বিষহ হয়ে উঠছে বেকারি, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির জাঁতাকলে পড়ে। ছাত্রছাত্রীর শিক্ষা হয়ে উঠছে মহার্ঘ্য। এই অবস্থায় আবার আমাদের রাজ্যে সংঘ-পরিবার সহ বিভিন্ন হিন্দুত্ববাদী সংগঠন নেমে পড়েছে দাঙ্গা বাঁধিয়ে মেহনতির ঐক্যে, সাধারণ মানুষের মধ্যে ফাটল ধরাতে। যাতে তারা ও তাদের দোসর পুঁজিপতি মালিকদের শোষণ থেকে যায় চোখের আড়ালে। আমরা ঠিক করেছি জোর গলায় ধারাবাহিক প্রশ্ন তুলব যেকোনো ধর্মীয় মৌলবাদ, ফ্যাসিবাদ, মালিকী জুলুম, সামাজিক অন্যায়, বেকারত্ব, শিক্ষার পণ্যায়ন সহ অজস্র বিষয়ে যা আমাদের স্বস্তিতে থাকতে দিচ্ছে না। জানি আপনাদের পাশে পাবো। যোগাযোগ করুন, মতামত দিন, বিতর্ক চালান একটা সুন্দর সমাজের জন্যে।

সংঘ-পরিবার কিছুদিন ধরেই একথা প্রমাণ করার জন্য একদম উঠেপড়ে লেগেছে যে এদেশে তারাই হচ্ছে প্রকৃত দেশপ্রেমিক। তারা দেশপ্রেম-এর একটা সংজ্ঞা হাজির করছে। সেই সংজ্ঞা যদি কেউ না মানে, তাহলে তারা জোর করে তাদের সেই সংজ্ঞা মানতে বাধ্য করাবে। তাতে যদি তাদের মেরেধরে, মাথায় গজাল মেরে বোঝাতে হয় তাই সই। আর তাতেও যদি তারা না মানতে চায়, তাহলে এ দেশ থেকেই সংঘ-পরিবার তাদের বার করে দেবে। সংঘ-পরিবারের দেশদ্রোহিতার সংজ্ঞা ভয়ানক। সে সংজ্ঞা এমন যে, সেখানে প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে শান্তির কথা বলাও দেশদ্রোহিতা। যে সে কথা বলবে, তার মুখ বন্ধ করার জন্য তাকে ধর্ষণ করার ভয় পর্যন্ত দেখানো যেতে পারে। দেশের মধ্যে বিভিন্ন জাতির ওপর সেনাবাহিনীর সন্ত্রাসের বিরোধিতা করা দেশদ্রোহিতা। দেশে ভয়ঙ্কর যে সব কালা কানুন রয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা দেশদ্রোহিতা। আদিবাসীদের তাদের বাসভূমি থেকে উৎখাত করার জন্য যে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ক্রমাগত চলেছে, তার বিরোধিতা করাও দেশদ্রোহিতা। এরকম একটা বা দুটো উদাহরণ নয়, গত কয়েক বছরে অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে, যেখানে আলোচনাসভা ভয় দেখিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, কারণ বিষয়বস্তু বা বক্তা সংঘ-পরিবারের পছন্দসই নয়। পথনাটিকার প্রতিযোগিতা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে কারণ কোন একটি পথনাটিকা সংঘ-পরিবারের এই আদর্শ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। সিনেমা-হলে দর্শকদের ওপর মারপিট করা হয়েছে, তারা জাতীয় সঙ্গীত বেজে উঠবার সময় উঠে দাঁড়ায় নি বলে।

Continue reading