পরিচারিকা

তৃষ্ণিকা ভৌমিক

লিঙ্গবৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী। অল্পবিস্তর লেখালিখি করি। এই অকালেও যারা স্বপ্ন দেখে এক বৈষম্যহীন পৃথিবীর, আমি তাদেরই একজন।

২০১৬ সালের শুরুর দিকে একটা সমীক্ষার রিপোর্ট দেখে চমকে উঠেছিলাম। রিপোর্ট অনুযায়ী পরিচারিকার কাজের থেকে অনেকেই বেশ্যাবৃত্তিকে পেশা হিসাবে বেছে নিতে পছন্দ করেছেন, এবং এর পিছনে বেশ্যাবৃত্তির মাধ্যমে প্রচুর পরিমাণে অর্থ উপার্জনই একমাত্র কারণ ছিল না। পরিচারিকার কাজের সাথে ওতোপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা শোষণ, অসম্মান, শারীরিক-মৌখিক নির্যাতন ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয় কারণ হিসাবে উঠে এসেছিল। তবুও নির্মম বাস্তব থেকে দূরে থাকার বা মুখ ফিরিয়ে থাকার দরুন সেদিন বইয়ের পাতার অক্ষরগুলি হয়তো ততটাও বোধগম্য হয়নি।আবার আমার নিজের আশেপাশের দুনিয়াটার আপাত ভালোমানুষি বা এই পরিচারিকা শ্রেণির মানুষদের সাথে তথাকথিত মানবিক মিথস্ক্রিয়া আমার বোঝাপড়ার সম্পূর্ণ হবার ক্ষেত্রে অন্তরায় হয়েছিল খানিক। মিষ্টি কথায় ভুলিয়ে দু’চারটে বাড়তি কাজ করিয়ে নেবার ছবিটা চোখের সামনে থাকলেও শুধুমাত্র নিজের মধ্যবিত্ত অবস্থানের জন্য তা চোখ এড়িয়েছে এমনটা নয়। আসলে চোখের সামনে এই শ্রেণি বৈষম্যের বেড়াজাল পেরিয়ে অন্য একটা ছবিও হাজির থেকেছে। যেখানে স্বামী ছেড়ে চলে যাওয়ার কারণে লোকের বাড়ি বাড়ি কাজ করতে বাধ্য হওয়া মেয়েটিকে তার নিয়োগকত্রী ক্রমাগত উৎসাহ দেয় জীবনযুদ্ধের, ছেলেমেয়েকে ঠিক করে লেখাপড়া শিখিয়ে নিজের থেকে ভালো জীবন দেবার, অকর্মণ্য স্বামী কষ্টার্জিত টাকা নিয়ে নয়ছয় করলে বাতলে দেয় টাকা জমিয়ে রাখার উপায়। জাতপাতের সমস্যা কিম্বা নেহাতই ‘ছোটলোক’দের ছোঁয়া এড়াবার জন্য হলেও জলখাবার খেতে দিতে অস্বীকার করবার বদলে সরিয়ে রাখা আলাদা থালা-বাসন, চায়ের কাপ মজুত থাকে এখনো অনেক বাড়িতেই। বৈষম্য থাকলেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাটুকু থাকে। আবার কখনো কখনো শ্রেণি-বাস্তবতা ভুলে এই সমাজে মেয়ে হবার দরুন দিনের শেষে সংসার-আপনজনেদের থেকে পাওয়া অপমান, বঞ্চনা এক পঙক্তিতে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে কাজের বাড়ির বৌদি আর ‘ঝি’কে। না বলে ছুটি নিয়ে নেওয়া কাজের মেয়ের প্রতি বিচ্ছিরিভাবেই একরাশ বিরক্তি প্রকাশ করতে করতেই আপন মনে নিয়োগকত্রীকে উদ্বিগ্ন স্বরে বলতে শুনেছি, “ ছুটি না নিয়েই বা কী করবে, অতগুলো বাচ্চার খরচ চালাতে এতগুলো বাড়ি কাজ করলে শরীর আর কত দেবে!…” পরের দিন মুখ ঝামটার সাথে কোথাও একটা অন্য সুরও ছিল গলায়। কিম্বা রোজ খ্যাঁক খ্যাঁক করা বৌদির ব্যবহারে বিরক্ত হলেও, সেই বৌদি দু’দিন অসুস্থ হয়ে পড়ে থাকলে নিজে থেকেই যেচে চারটে কাজ করে দিয়েছেন কাজের মেয়েটি/বউটি। বেলার দিকে আমাদের রান্নাঘরে বা খাবার ঘরে ঢুকলেই কানে আসে পাশের বাড়ির কাকিমা এবং তার বাড়ির পরিচারিকাদের কথোপকথন। ক্ষমতার সমীকরণ বুঝতে অসুবিধা হয় না, তবে সেসব পেরিয়ে তাদের সুখদুঃখের গল্প বিনিময় যেন অনেক বেশি কানে বাজে।

তবে এসব সম্পর্কের খোলনলচেও দ্রুত বদলে যাচ্ছে সময়ের দ্রুত পরিবর্তনে। ক্ষয়িষ্ণু এই সময়ে দাঁড়িয়ে রেডিমেড আয়া সেন্টারের যুগে সম্পর্কগুলোর মধ্যে থেকে মানবিকতা মুছে যাচ্ছে ক্রমাগত। ইঁদুরে দৌড়ে সামিল জীবনে যেখানে এখন নিজের পরমাত্মীর জন্য ব্যয় করবার মত সময় থাকে না, সেখানে কাজের লোক! বাঁচুক মরুক কী যায় আসে ভাব! টাকা দিলে এরকম অনেক পাবো ভাব, তাই সম্পর্কগুলো বদলে যাচ্ছে শুধুমাত্র কাজ আর টাকা বুঝে নেওয়ায়। পরিচারিকাদের উপর শোষণগুলো কমার বদলে দ্বিগুণ হচ্ছে।  এই সাদা কালো দুনিয়ার কালো দিকটা বুঝতে বা ভাবতে শুরু করি একটু দেরি করেই, গত বছরেরই মাঝামাঝি সময় থেকে।

Continue reading