মৃত মহাদেশে হে মাধবী আজো……

শ্রাবণী দাশগুপ্ত

“কলকাতার মেয়ে। জে.ইউ. থেকে মাস্টার্স সাতাশি সালে।  তারপর বিয়ে, সংসার। লিখতে ভালো লিখি। তবে বেশ অনিয়মিত।  খেয়াল খুশি মতন।  দু-এক জায়গায় বের হয়েছে – বর্তমান, রবিবাসরীয় আনন্দবাজার। দেশেও একবার। আর কিছু লিটল ম্যাগাজিনে।  বই টই বার করিনি। গল্প লিখতে ভালো লাগে, কবিতা আসেনা. রাঁচিনিবাসী বহুদিন।  এখানে একটি স্কুলে পড়াই। ”     – শ্রাবণী

(১)

অনিন্দ্য বাড়ি ফিরে দেখল সব আলোগুলো জ্বলেনি! ডিজাইনার আলোয় ছায়াস্নিগ্ধ থাকে ড্রইংরুম। দামী সোফাসেটে, সেন্টার টেবলে, শোকেসের কোণে যথাযথ ও পরিমিত উজ্জ্বলতা অন্ধকার লাগছে। নিরানন্দ। অন্দরসাজের কৃতিত্ব মোনার, অনিন্দ্যর শুধু স্পনসরশিপের দায়িত্ব – সে নিশ্চিন্ত। ছোট্ট মোড়াটায় বসে নীরবে জুতো খুলছিল, এব্যাপারে মোনার যথেষ্ট কড়াকড়ি আছে। কয়েকদিন ধরে নিয়ম শিথিল, চাপহীন। নিয়মভাঙার গোপন মজাটুকু… নাঃ নেই।

নিঃশব্দে এসে সামনে দাঁড়িয়েছে ঋত্বিক… রিকু। কখন এসেছে হস্টেল থেকে? জানায়নি মোনা! অবশ্য কয়েকদিনে ক’টাই বা কথা হয়েছে তাদের? ঊণিশ বছরের রিকু তার সমান লম্বা। তার মত ভারী, মুখটায় মোনার আদল। মাতৃমুখী পুত্র! ছেলের চোখে দীপ্র সরলতা ভালো লাগল অনিন্দ্যর। বলল, “রিকু তুই?” “বাবা তুমি যাবেনা? আমরা যাচ্ছি…।” ডাকটুকু কেমন আন্তরিক। “কোথায় রে?” অন্ধকারে ছেলের দৃষ্টির অনুসরনে সে তাকাল। মোনা!বাইশ বছরের গভীর নৈকট্য অদ্ভুত অচেনা। কালো সালোয়ার কামিজ, মাথা ঢাকা কালো ওড়নার ফ্রেমে ধপধপে আলোকিত মুখ। এতবড় টিপ পরতে মোনাকে আগে দেখেনি। হাতে মোমবাতি, দেশলাইবাক্স। মোনা সোজা তাকিয়েছিল। তার সাথে চোখাচুখি করল না। ছেলেকে ডাকল, “আয় রিকু।” অনিন্দ্য ছেলের দিকে চেয়ে অন্যমনস্কভাবে বলল, “নাঃ।” ওরা বেড়িয়ে গেলে অন্ধকার ড্রইংরুমে বসে রইল সোফায়। বলে না গেলেও কোথায় গেল, আন্দাজ করতে অসুবিধে হলনা। মোনা… অবিশ্বাস্য লাগছিল অনিন্দ্যর। আজ রাস্তায় মিছিল, ভিড়, জ্যাম। এর মধ্যে? কিভাবে ফিরবে, কখন, কে জানে? রিকুর আজকাল সাহস বেড়েছে কলেজে ঢুকে। কিন্তু মোনা সন্ধ্যেবেলা তাকে বাদ দিয়ে গাড়ি ছাড়া…! খুব অস্বস্তি হচ্ছিল।

সকাল থেকে অফিসে উত্তেজিত স্বাক্ষর অভিযান! কারা প্রতিবাদ মিছিলে যাবে সেই লিস্ট তৈরি-টৈরি নিয়ে ব্যস্ততা। অনিন্দ্য মাথা ঘামায়নি। এমনিতেই কাজ ছাড়া অন্য ব্যাপারে সে আলগা থাকে। পদাধিকারে সম্পূর্ণ দায়বদ্ধ। নিয়মানুবতির্তা, কাজের নেশা সময়ের আগেই তুলে দিয়েছে অনেক ওপরে। ফাইন্যান্সের হেড্‌ সে। দুপুরের দিকে জোনাকী কেবিনে এসেছিল স্বাক্ষর সংগ্রহে। তারই ডিপার্টমেন্টের জোনাকী সরকার, প্রখর নারীবাদী। পিটিশনে সই দিয়েছে অনিন্দ্য।জোনাকী অনুরোধ করছিল মোমবাতি মিছিলের পদযাত্রায় থাকার জন্যে। অনিন্দ্য নিশ্চুপ। চোরা বাধা কোথায় যে! জোনাকী বেরিয়ে যাবার ঠিক পরেই হেমাঙ্গদা, ওমপ্রকাশ ও দিগন্তকে একসঙ্গে দেখে সে স্তম্ভিত। জোনাকী নাকি পাঠিয়েছে। ওরাও পদযাত্রায়? চমৎকার। ওয়ার্কিং আওয়ারে মেয়েসম্পর্কিত চটচটে আলোচনায় অফিসদূষণের জন্যে ইউনিয়ন থেকে ওয়ার্নিং পেয়েছে। জোনাকী নামগুলো শুনলেই জ্বলে ওঠে। হেমাঙ্গদা অর্থপূর্ণ হেসেছিল “কি ভাদুড়ি যাবেনা শুনলাম? চলো চলো!” অনিন্দ্য সন্ত্রস্ত। বলেছিল, “নাঃ।” উত্তর শুনে তির্‍যক তাকিয়েছিল তিনজনে। কয়েকদিন আগে ঘটে যাওয়া ঘৃণ্য বীভৎস ঘটনার প্রবল প্রতিবাদ হওয়া উচিৎ! কিন্তু এমন অসংখ্য যেসব ঘটে যাচ্ছে প্রায় প্রতিহপ্তায়, প্রতিরোজ? শুভবুদ্ধি মানবতা সমানাধিকার শব্দগুলো অভিধানের ভেতরে ভেপ্‌সে উঠেছে। একটার পর একটা কেস জমে থাকছে ধুলোমাখা বন্ধ ফাইলে, কোর্টের অন্ধকার ঘরে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাও নয়! কে রাখছে নথিপত্র?

আজ কাজের চাপ ছিলনা, তবু ক্লান্তিতে মাথায় দপ্‌দপ্‌। রান্নাঘরের অভ্যস্ত ঠুংঠাং আওয়াজ আসছিল। ফোড়নের হাল্কা গন্ধ। নরম সোফায় গা ডুবিয়ে একান্ত গৃহকোনে আলস্যটি বড় আরামের। রাতের রান্না করছে পুতুল, ‘ডোমেস্টিক হেল্প’। মোনার তালিমে শিখেছে ভালোই। ইচ্ছে করছিল না কাপড় ছাড়ার জন্যে উঠে শোবার ঘরে যেতে। পুতুল এসে দাঁড়াল। ওর কাজ শেষ। বয়স ত্রিশের এধারে বা ওধারে, সিঁথিতে সিঁদুরের আভাস। ইদানিং বেশ চৌখস। আঁটসাঁট ছাপা কামিজের ওপরে আড়াআড়ি ঘুরিয়ে বেঁধেছে ওড়নাটা। বলল, “মাইনের দু’শো এ্যাডভান্স দিন তো দাদা। বৌদিকে বলতে মনে ছিলনা।” অনিন্দ্য পকেট থেকে ওয়ালেট বের করে টাকা দিল। ইচ্ছাকৃত ছিলনা, আঙুলে ঠোকাঠুকি হয়ে গেল। কয়েকদিনের অভুক্ত শরীর, সজাগ লিবিডো। পূণর্দৃষ্টিতে জরিপ করল মেয়েটার আপাদমস্তক, ভেরি সেক্সি। দু’হাত দূরত্বে প্রায়ান্ধকারে রৈখিক ঘনকে উদগ্র নারীদেহের আঁচ। অনিন্দ্য জোর করে চোখ সরিয়ে ওর মুখের দিকে তাকাল। থ্রেডিং-করা ভ্রূরেখার নিচে ছোট চোখ সরু করে সামান্য বাঁকা হাসল কি মেয়ে? মুহূর্তে দরজার কাছে পিছলে গিয়ে বলল, “বন্ধ করে দিন।” শিরশিরানি নেমে গেল অনিন্দ্যর পিঠ বেয়ে। ডাইনিং টেবিলে সাজানো নৈশাহার, প্লেট। নিয়ে খেয়ে নেওয়া যায়, ইচ্ছে করলনা। শোবার ঘরে মৃদু আলো জ্বলছে। দেওয়ালে শোভন সবুজ ইমালশন, এসি-র পরিমিত শৈত্য, ধপধপে বিছানার আহ্বান। তার জন্যেই গুছিয়ে রাখা শুভ্র কাপড়জামা, তোয়ালে, নিচে হাওয়াই চটি। স্বপ্নপুরের নিটোল স্নিগ্ধতায় অস্থিরতা থিতিয়ে যাচ্ছিল। বিছানার পাশের রকিং-চেয়ারে বসল অনিন্দ্য। চোখ বুঁজে এলেও ঘুম এলনা। গোপন দংশন – এতবছর পেরিয়ে! সত্যিই কি দুব্যবর্হার করেছে মোনার সঙ্গে? হয়তো যথেষ্ট মনোযোগ দেয়না, অনেকটা উদাসীনতা… তবু তো! মোনার বিশ্ব ড্রইংরুম বেডরুম ঠাকুরের আসন। অনিন্দ্য-রুহি-রিকু মোনার ব্রহ্মান্ড। শপিংমল, বিউটি পার্লার মোনার অবসরযাপন। মোনা ভরপুর। কিন্তু সেদিন মোনা ঐভাবে কথাগুলো তাকে…! আহত পৌরুষে ক্ষত বড় গভীর। কেউ কি কিছু জানিয়েছে মোনাকে? সম্ভাবনা কম। তাহলেও নিঃসন্দেহ হতে পারা যায় কই? সংশয়াচ্ছন্ন অনিন্দ্য আলোহীন ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়াল। মার্চ শুরু। পরিষ্কার আকাশে লক্ষকোটি হীরককুচি দিয়ে অনবদ্য প্যাটার্ন। দু’বছর আগে বিশতম বিবাহবার্ষিকীতে অমন আংটি উপহার দিয়েছে মোনাকে। সে আবেশে ডুবে যাচ্ছিল। এমনভাবে একা দাঁড়িয়ে স্তব্ধ আকাশ দেখেনি কোনোদিন। অন্ধকারে অসংখ্য অনিশ্চিত শিখা দপদপ করে জ্বলছে। খানিক পরে অনিন্দ্য ব্যালকনির দরজা বন্ধ করে ভেতরে এল। নিঃশব্দ পায়ে ঘুরে বেড়াতে লাগল। এই ফ্ল্যাট নিজস্ব ক্ষমতার্জিত বৈধ সাড়ে বারোশ স্কোয়ারফিট; লোন নিয়ে, যথাযথ প্রিমিয়াম জমা দিয়ে।

ডাইনিংরুমের লাগোয়া ঋত্বিকের ঘর। খুব জেদী ছিল রিকুটা ছোটবেলায়, মারকুটে। দেড়বছরের বড় রুহির সঙ্গে তুমুল হিংসে। কবে থেকে যে বদলে গেছে খেয়াল করা হয়নি। বেশ ইন্ট্রোভার্ট। গতবছর হলদিয়ায় হস্টেলে যাবার পর থেকে ওর ঘরও শূন্য। বহুদিন এঘরে ঢোকেনি অনিন্দ্য, এখন ঢুকতে ইচ্ছে করল। আলো জ্বালাল। সমযত্নে সাজানো ঘরখানা আপাতত অগোছালো। টীশার্ট, বারমুডা, তোয়ালে, চটি এদিক ওদিক ছড়িয়ে। অস্তিত্বের উষ্ণ ঘ্রাণ। সিংগলবেডের ওপরে ল্যাপটপ। ছড়ানো বই, ফাইল, প্রিন্টআউট, পেনড্রাইভ! আনমনা হয়ে নাড়াচাড়া করছিল সে। কিছু স্মৃতি ঠোকর দিয়ে গেল। কোন্‌ দুঃস্বপ্ন? মাথায় ঝাঁকুনি দিয়ে হাল্কা চকলেটরং দেওয়ালে তাকাল। ব্লোআপে গাওস্কার সচীন সৌরভ দ্রাভিড! খেলাপাগল ছেলেটা। কলেজে খেলে নাম করেছে, মোনা বলে মাঝে মাঝে। কাঠের ওয়ার্ড্রোবে অনেকগুলো ছবি সেঁটেছে… বরফঢাকা হিমালয়ের, অভিযাত্রীদের। খুঁটিয়ে দেখছিল অনিন্দ্য। প্রবল ইচ্ছে গুঁতো মারছিল। অনধিকারচর্চা বুঝেও নিজেকে সামলালো না। হাল্কা টান মারতেই খুলে গেল না-বন্ধ ওয়াড্রোবের পাল্লা। থমকে গেল চৌর্‍যবৃত্তির হাত। কাজটা ঠিক হচ্ছে? পরক্ষণেই মরিয়ার মত আঁতিপাঁতি খুঁজতে লাগল। যেকোনো একটা চিহ্ণ, বই ছবি সিডি ম্যাগাজিন অন্তত পেপারকাটিং যাতে…! ছিল অনেক কিছু। হিমালয়-এক্সপিডিশন নিয়ে ম্যাগাজিন, ক্রিকেটের ওপরে বই। কিন্তু নিজের যে বিশ্বাসে বয়সোচিত স্বাভাবিকত্বের কথা ভাবছিল, তেমন একটাও দৃষ্টান্ত পেলনা। বইয়ের শেলফ ঘেঁটে দেখল। নাঃ সেরকম কিচ্ছু না! অবচেতনে কবেকার শুকনো নদর্মায় পড়ে যাবার অনুভব বয়ে নিয়ে দ্রুত দরজা টেনে বের হয়ে এসেছিল। স্বস্তি অস্বস্তির দোলাচলে ফেঁসে নিঃশ্বাস ফেলল, “ছেলেটা একেবারে আলাদা হয়েছে।” মনে হল রিকু ভারী গলায় বলছে, “কি খুঁজছ বাবা এখানে?আমার ঘর ঘেঁটে?” চমকে দেখল কেউ নেই। কবজি উলটে ঘড়ি দেখল, রাত হয়েছে বেশ। এখনো ফিরলনা ওরা?

Continue reading