জনযুদ্ধ: প্রাক্তন কর্মীর কথোপকথন

ত্রিদিব সেনগুপ্ত

“এক-দশক-দেরি-করে-ফেলার-নোটস: নিচের তারিখেই দেখা যাচ্ছে, এটা নেওয়া হয়েছিল ৫ মে, ২০০৬। আর আজ এই নোটস যোগ করার তারিখ ১৩ এপ্রিল, ২০১৬। মানে, ঠিক এক দশক। কথোপকথনটা শেষ হওয়ার পর পড়তে গিয়ে, তখনই এটা ছাপা হলে কেউ কেউ বিপদে পড়ার একটা সম্ভাবনা মাথায় এসেছিল। তারপর ঘটেছে বহু কিছু, গোটা জনযুদ্ধ রাজনীতিটাই বিস্মৃত হয়ে গিয়েছে জনমনে। আজ এটা ইতিহাস, যে ইতিহাসের কোনও সূত্রই আর জ্যান্ত নেই। ছাপার এই প্রকৃষ্ট সময় আসতে আসতে পেরিয়ে গেল একটা দশক।” – ত্রিদিব

তিমির,যার নাম অবশ্যই তিমির নয়, আমার কাছে যারা মাঝে মাঝে আসে, তাদের মতই আর এক জন, কিন্তু তাদের অনেকের থেকেই অনেকটা আলাদা। মাত্র কিছুদিন আগেও ওকে জীবনমরণের সংশয় নিয়ে পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছিল, জনযুদ্ধ রাজনীতি থেকে বসে যাওয়ার আগে ও পরে। প্রথম দিকে ও নিজেও কিছু বলতে চাইত না, আমিও কিছু জানতে চাইনি। নিজের নিরাপত্তার খাতিরেও। শুধু ওর ওই পরিচিতিটা জানতাম, যে নামে ওকে জেনেছিল বা ডেকেছিল আনন্দবাজার বা টাইমস এর সাংবাদিকরা। তারপর, গত কিছু দিন ধরে, বারবার আমার মনে হত, কিছু কথা বলে নিলে, টেপ করে নিলে বেশ হত। সেটাকে খুব ভালো করে পড়াও যেত। তখন বাদ সাধছিল একটা টেপ রেকর্ডারের অভাব, আর, সেই টাকা যোগাড় হওয়ার পর, বাদ সাধছিল যে এনজিও-য় ও এখন কাজ করে সেখান থেকে ওর ছুটি পাওয়া, আর আমার নিজের ব্যস্ততা। গত পাঁচই মে, পশ্চিম বাংলার নির্বাচন তখন চলছে, একদিন রাত নটা নাগাদ আমরা বসলাম। মধ্যে মধ্যে খাওয়ার, বাথরুম যাওয়ার, ছাদে গিয়ে দুচার মিনিট দাঁড়িয়ে আসার ব্রেক বাদ দিয়ে একটানা দুশ ষাট মিনিট, চার ঘন্টা কুড়ি মিনিট, নিট, আমরা কথা বলেছিলাম। সেই অর্থে ধারাবাহিকতাটা ছিল, কারণ, আমরা আগের কথার শেষটুকু শুনে নিয়েই নতুন করে শুরু করছিলাম। বহু জায়গায় ওর বলাটা ধরে রাখাটাই নয়, একটা ইনফর্মাল আড্ডার চরিত্রও পেয়ে যাচ্ছিল, অতক্ষণ ধরে কথা বলে চললে যা হয়। যখন শেষ হল, তখন প্রায় শেষ রাত। আমার ইচ্ছে আছে, আবারও একবার বসার। বেশ কিছু দিন পরে, এই সবগুলো খুব ভালো করে পড়ে নেওয়ার পরে। ওর অভিজ্ঞতাটাকে জেরা করার। তিমিরের কথা বলার ভঙ্গীটা মোটেও ভালো নয়, অকারণে গুচ্ছ গুচ্ছ ‘আরকি’, ‘অর্থাত’ এবং ‘সেটা হচ্ছে’ বলে, প্রায়ই শব্দ বা বাক্য শেষ করেনা, কোথায় থামছে বোঝা যায় না ঠিক, কথা বলতে গিয়ে ভুল করে, একটা কর্তা দিয়ে বাক্য শুরু করে, তিন শব্দ পরেই, অন্য কর্তা দিয়ে বাক্য শেষ করে। প্রশ্ন দিয়ে বাক্য শুরু হয়ে শেষ হয় বিবৃতি দিয়ে। একই কথা এক এক জায়গায় এক এক উচ্চারণে, এক এক রকমে বলা, এসব সমস্যা তো ছেড়েই দিলাম। কথা শোনার সময় সমস্যা হয় না, কিন্তু লেখাটা দুষ্কর। তাও, যতটা পারা যায় আমি হুবহু রাখার চেষ্টাই করেছি। যেখানে যেমন উচ্চারণ সেরকমই রেখেছি। ‘আসলাম’, ‘আসল’ ইত্যাদি কিছু শব্দ ছাড়া। ক্যাসেটগুলো নষ্ট করে ফেলার কথা হয়েছিল আগেই, লিখে ফেলা মাত্রই, কড়ার হয়েছিল যে, আমি ছাড়া কেউ কানে শুনতে পাবে না, তাই যতটা পারা যায় সেই রিয়ালিজম নামক প্রহেলিকাটা ধরে রাখার চেষ্টা করেছি। কিছু এমন ভুল, যাকে ভুল বলে বুঝে নেওয়া যায়, সহজেই, ইচ্ছে করেই রেখে গেছি। প্যারাগ্রাফ করে কেউ কথা বলে না, প্যারাগ্রাফগুলো আমারই আমদানি। একটা হালকা ছায়া রাখতে চেয়েছি সুরের, লয়ের, আবেগের বদলের। যতিচিহ্নও তাই। বলা গদ্য আর লেখায় একটা তফাত তো থাকেই, যতিচিহ্নগুলো দিয়ে আমার বোঝা অর্থের সবচেয়ে কাছাকাছি আনার চেষ্টা করেছি। একটা জিনিস জানিয়ে রাখি, ‘অর্থাৎ’ আমি ‘অর্থাত’ করে লিখেছি, কারণ, ওপনঅফিস বাংলায়, সোলেমান লিপি ফন্টে, লাইনশেষে ‘ৎ’-র একটা সমস্যা আছে। ‘য়্যা’ বানানও সেই কারণে, এতে, ‘অ’-এ ‘য’ ফলা দেওয়া যায়না, এখনো।

শনিবার, পাঁচই মে, দুহাজার ছয়, রাত নটা

ত্রিদিব।। তোর সাথে আমার যে আলোচনাটা এখন হবে, এক অর্থে সেটা কখনোই কোনো সাক্ষাত্কার নয়। কারণ, সাক্ষাত্কার মানে, একটা লোকের বলা, আর একটা লোক সেটা লিপিবদ্ধ করছে। কিন্তু এক্ষেত্রে, আমার নিজের মধ্যেও তো একটা খোঁজা আছে, আমার নিজের পোজিশন আছে। যে লোকটা সাক্ষাত্কার নেয়, আমরা ধরে নিই, সে পলিটিকালি নিউট্রাল। এখানে তা নয়। তার পোজিশন আছে। মার্ক্সবাদী রাজনীতির প্রতি তার আগ্রহ এবং আবেগ আছে, নানা কিছুতে তার আপত্তি সহ। আবার, একই সঙ্গে, পার্সোনাল ভায়োলেন্সের প্লেনটা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারে না। যে রকম ‘ভালো আমেরিকা, কালো আমেরিকা’-য় লিখেছিলাম, যে, যে-কোনো এই ধরনের ভায়োলেন্স যা শেষ অব্দি যেতে পারে না, তা, আসলে, পাওয়ারকে লেজিটিমাইজ করে। নাইন বাই ইলেভেন আমেরিকাকে ইরাক আক্রমণের লাইসেন্সটা দিয়ে দিয়েছিল। এনিওয়ে। অর্থাত, তোর আর আমার মধ্যে পরিষ্কার একটা পোজিশনাল ডিফারেন্স আছে। আমি তোর সম্পর্কে শুধু এটুকুই জানি যে তোর একটা পিডব্লুজি রাজনীতির অতীত আছে। এবার, আমরা দুজনে, এই জায়গা থেকে: আমি তোর প্রক্রিয়াটাকে বোঝার চেষ্টা করব।

এবার, আমার ক্ষেত্রে প্রথম যে প্রশ্নটা হবে, একদম শুরু থেকে শুরু করা যাক, তুই কী ভাবে এই রাজনীতির সঙ্গে ইনভলভড হলি, সেটা, ঠিক যা যা কথা তোর মাথায় আসবে, এমনকি যা খুব একটা সম্পর্কিত মনে হবে না, এই সবটাই তুই বলবি। কারণ, গোটাটার থেকেই আমরা পরবর্তী আলোচনাতে যেতে পারব। এবার শুরু কর।

তিমির।। পিডব্লুজি প্রসঙ্গটা তো অনেক পরের। সেটা তো অনেক পরে এসেছে। তার আগে তো, যে রাজনৈতিক জীবন, অনেক আগে শুরু হয়, যেটা প্রায় না-বোঝার বয়েস থেকেই আরকি। একটা রাজনৈতিক পরিবারেই জন্মগ্রহণ করেছি। সেক্ষেত্রে, তার রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা, সবার মধ্যেই ছিল। সেখানে বিভিন্ন ধরনের লোক ছিল। কংগ্রেসের ‌‌– ইনডিপেন্ডেন্সের আগে কংগ্রেস করেছেন এরকম লোক আছে, আমার আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে, মানে, আমার ক্লোজ আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে, আমার নিজের দাদু আইএনএ-তে ছিল। ধরা পড়েছিল। বাবা কমিউনিস্ট পার্টির, অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির মেম্বার। পরবর্তীকালে সিপিএম করেছে। আমি যখন জন্মেছি তখন তিনি সিপিএম-ই।

Continue reading